ছয়
ভোরবেলা চা দিয়ে আমাদের ঘুম ভাঙাবার কথা ছিল। ভোর সাড়ে-চারটের সময় বেরিয়ে পড়ার কথা অ্যালবিনোর জন্যে ছুলোয়া শিকারে।
কিন্তু যখন আমার ঘুম ভাঙল তখন অনেক বেলা। চোখ খুলেই দেখলাম, ঋজুদা ইজীচেয়ারটাতে বসে, ডাইরীতে কী সব লিখছে। পায়জামা পাঞ্জাবীই চড়ানো আছে। তৈরি হয়নি বেরুবার জন্যে।
ধড়মড় করে উঠে বসে বললাম, কি হল? যাবে না?
যাব মানে? যাঁরা নিয়ে যাবেন তাঁদেরই পাত্তা নেই।
পাত্তা নেই মানে?
বোধহয় ভূত-পেত্নীর খপ্পরে টপ্পরে পড়েছেন কেউ।
এমন সময় টি-কোজী মোড়া কেটলী আর কুচো নিমকি নিয়ে বেয়ারা ঘরে এল।
সেলাম করে বলল, ছোটা হুজৌরকা তবিয়ৎ গড়বড়া গ্যয়া। উসী লিয়ে আজ ছুলোয়া নেহী হোগা।
বলতে বলতেই, ব্রিজনন্দন এসে হাজির। মানুষটার সবসময়ই ঐ একই পোশাক। ধুতি আর গোলাপী টেরিলিনের শার্ট। ঘুমোবার সময়ও পরে কি-না কে জানে?
আইয়ে, আইয়ে; পাধারীয়ে। ঋজুদা আপ্যায়ন করে বলল। তারপর বলল, ভালোই হয়েছে আজ ছুলোয়া না করে।
রাতে আমারও তবিয়ৎ গড়বড় করেছিল। ঘুম থেকেও আমরা ত’ এইই উঠলাম।
ঋজুদা শুধোলো, বিষেণদেওবাবু কেমন আছেন?
এখন ভালোই আছেন। মনে হয়, এই গরমের পর হঠাৎ বৃষ্টিতে ঠাণ্ডা লেগে গেছে। শরীর রসস্থ। জ্বর-জ্বর ভাব। ওষুধপত্রও বেশি খেয়েছেন হয়ত।
বিষেণদেওবাবু উঠেছেন? ঋজুদা শুধোলো।
উঠেছেন। বড় হুজৌর বোধহয় পুজো করছেন। ঘর এখনও বন্ধ।
আমি অধৈর্য গলায় কথার মধ্যে কথা বলে উঠলাম, অ্যালবিনো বাঘটা এই জঙ্গল ছেড়ে চলে যাবে না ত’!
ব্রিজনন্দন আশ্বাস দিয়ে বলল, না না, আপনাদের বাঘ আর যাবে কোথায়? হুজৌরদেরই জঙ্গল, হুজৌরদেরই বাঘ। বাঁধাই আছে বলতে গেলে। যাবেন, আর ধড়কে দেবেন।
তারপর একটু চুপ করে থেকে আমার অস্তিত্ব বেমালুম ভুলে গিয়ে ঋজুদার দিকে চেয়ে বলল, আপনার কথা বিষেণদেওবাবুর কাছে অনেক শুনেছি হুজৌর। আপনি ত’ আমাদের উজ্জানপুরের হুজৌরকেও চিনতেন?
আমি কথাটা শুনে অবাক হলাম। ঋজুদার দিকে তাকালাম।
ঋজুদা বলল, হ্যাঁ। চিনতাম বৈকি! আমরা ওকে স্যান্ডি’ বলে ডাকতাম। স্কুলে পড়তাম একসঙ্গে। মুলিমালোয়াঁর রাজাসাহেবের মেয়ে শুভাবাঈর সঙ্গে বিয়ের সময়ও কোলকাতার দাওয়াতে গেছিলাম। তবে মুলিমালোয়াঁ আর উজজানপুরে যাওয়া হয়ে ওঠেনি।
ব্রিজনন্দন বললেন তাহলে ত’ ভানুপ্রতাপ আপনার নিজের ছেলেরই মত। একটু দেখবেন হুজৌর!
ব্রিজনন্দনের চোখে-মুখে ভানুপ্রতাপের জন্যে বিশেষ এক দরদ ফুটে উঠল যেন।
মনে হল, ব্রিজনন্দন কি যেন বলতে চায়, যেন ভানুপ্রতাপের খুব বিপদ এখানে, এমন কিছু বলতে চায়, অথচ বলতে পারছে না মুখ ফুটে। কাল থেকে ও যতবার উপরে এসেছে, ততবারই আমার এ-কথা মনে হয়েছে।
ঋজুদা বলল, ও ত’ যথেষ্ট বড় হয়ে গেছে। ও নিজেই নিজেকে দেখতে পারে। তাছাড়া, আজকালকার ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে গেলে কেউ ওদের উপর গার্জেনী করুক তা ওরা পছন্দ করে না। তারপর আমার দিকে দেখিয়ে বলল, আমার সাথীটিকে দেখে বুঝছেন না?
এইই ত’ হচ্ছে আসল কথা। ব্রিজনন্দন দু হাতের পাতা তাঁর পেটের দু পাশে উলটে দিয়েই বললেন। ঈ-জামানাই দুসরা হ্যায়।
ব্রিজনন্দন চলে গেলে, ঋজুদা বলল, কেমন ঘুম হল রাতে রুরুদ্দরবাবু?
ভালো।
বলেই, বললাম, টানাপাখার পাখাওয়ালা কোথায় বসে পাখা টানে বলো ত’? বারান্দায় ত’ নেই ওরা।
পাখার দড়িটা কোথা থেকে আসছে চোখ খুলে দ্যাখো রুরুদ্দরবাবু। ঋজুদা বলল।
তাইই ত’! পাটার দু’পাশ থেকে দুটো দড়ি মধ্যিখানে এসে জোট-বেঁধে দেওয়ালের ফুটো দিয়ে চলে গেছে যেদিকে, সেদিকে বারান্দা নেই।
ঋজুদা বলল, বাইরের বারান্দায় বসলে বেচারীরা একটু হাওয়া পেত নিজেরা। কিন্তু তেমন ত’ নিয়ম নয়। ঘরের লোকের প্রাইভেসী ডিস্টার্বড হত তাহলে। ওরা হয়ত চতুর্দিকে বন্ধ কোনো ঘরে বসে গরমে ঘেমে-নেয়ে সারারাত পাখা-টেনে ঘুম পাড়াচ্ছে তোকে।
আমি বললাম, না না, ভিতরের দিকে যে বারান্দা আছে, নিশ্চয়ই সেই বারান্দায় বসেই পাখা টানছে ওরা।
সম্ভাবনা কম। অবশ্য, হতেও পারে। এ বাড়িতে মেয়েই নেই। তাই আপাতত অন্দরমহলের বালাই নেই।
আমি বললাম, তুমি ভানুপ্রতাপের বাবাকে চিনতে নাকি? বলোনি ত’?
আরে সে কি আজকের কথা! খুব ভাল স্পোর্টসম্যান ছিল স্যান্ডি। যে-কোনো খেলাই ভালো খেলত। চুনী গোস্বামীর মত। উজজানপুর থেকে ফারস্ট-ক্লাস ল্যাংড়া আম এনে স্কুলের ফাদারদের দিত ঝুড়ি ঝুড়ি–তাও মনে আছে। ছুটির আগে বাড়ি যাওয়ার সময় হস্টেলের বেয়ারাদের প্রত্যেককে তখনকার দিনে পঞ্চাশ টাকা করে বকশিশ দিত। সেলুন রিজার্ভ করে যাওয়া-আসা করত। ফুটানী করে নিয়েছে একসময় ওরা।
আমি বললাম, এখনও করছে অন্যরা। তখন ওরা ছিলেন মহারাজা আর এখন ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট আর পোলিটিক্যাল লিডাররা মহারাজা। ফুটানী করার মানুষ ঠিকই আছে। সেই মানুষগুলোর চেহারা আর পোশাকই বদলেছে শুধু।
তারপর বললাম, কি, ঠিক করলে কি?
কিসের কি? বলেই, ধমক লাগালো আমাকে। তাড়াতাড়ি খা। নিমকিগুলো ঠাণ্ডা হয়ে গেলো। ফারস্ট-ক্লাস খেতে কিন্তু। দারুণ খাস্তা।
ভূত-পেত্নীর ব্যাপারটা একটু ইনভেস্টিগেট করবে না?
হুঁ। ঋজুদা বলল। অন্যমনস্কভাবে।
তারপর বড় এক ঢোক চা খেয়ে বিড়বিড় করে আবৃত্তি করল :
মিঞার মুখোশ বিবির মুখোশ
ছেলের মুখোশ, মুখোশ চাই?
মুখোশওয়ালা যাচ্ছে হেঁকে।
লেঙ্গে মুখোশ? হাতেম তাই?
–এ আবার কি? আমি বললাম।
লালা মিঞার শায়েরী।
আমি আর বেশী ঘাঁটালাম না ঋজুদাকে। আজ সকাল থেকেই কেমন হেঁয়ালী হেঁয়ালী মুড।
চা খাওয়া শেষ করে বলল, আমার বাক্সটা এনেছিস? গদাধর দিয়ে দিয়েছে ত?
–না ত’?
সত্যি। তুইও সেরকম! বিরক্ত হয়ে ঋজুদা বলল। গদাধরের যদি অতই দায়িত্বজ্ঞান আর বুদ্ধি থাকবে, তাহলে ও আমার মত লোকের কাছে সারাজীবন নকরী করে মরবে কেন। তুই যে কী না!
আমি বললাম, দাঁড়াও দাঁড়াও হয়ত গাড়ির ডিকিতেই পড়ে আছে। স্টেপনীর পাশেও থাকতে পারে। আমি এখুনি দেখে আসছি।
ঋজুদা বলল, একদম না। ইডিয়ট।
আফ্রিকা থেকে ফেরার পর ঋজুদা বড্ড খিটখিটে হয়ে গেছে। আমি যে ইডিয়ট একথাটা যেন এতদিন পরেই আবিষ্কার করল। রাগ হয়ে যায় মাঝে মাঝে।
একটু চুপ করে থেকেই বলল, আমরা ব্রেকফাস্ট খেয়েই হাজারীবাগ যাব। যাওয়ার সময় পথে দেখলেই হবে গাড়ি থামিয়ে, বাক্সটা আছে কী নেই। বুঝলি?
হাজারীবাগ কেন?
হাজারীবাগ বলে বেরোব। তারপর নাও যেতে পারি। কোলকাতাও চলে যেতে পারি। যেমন ইচ্ছা করবে।
বাঃ! অ্যালবিনো?
অ্যালবিনোর জন্যে আবার ফিরে আসা যাবে। নিজেদের হাতিয়ার-টাতিয়ার নিয়ে। পরের তা সে যত দামীই আর যত ভালোই হোক না কেন, আমি ভরসা পাই না।
অবাক হলাম। বললাম, সত্যিই চলে যাবে?
ঋজুদা বলল, কথা না বলে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নে।
সেদিন ব্রেকফাস্টের সময় ভানুপ্রতাপ সামান্যই খেলেন। চোখ দুটো লাল দেখাচ্ছিল। খুব সর্দি হয়েছে। বিষেণদেওবাবু নামলেনই না নীচে তখনও। কী এত পুজো করছেন উনিই জানেন।
ঋজুদা ভানুপ্রতাপকে বলল, নাস্তা করে আমরা একটু লুলিটাওয়া অবধি ঘুরে আসি। আপনাদের রুরুদদরবাবু ত’ অ্যালবিনো না মারতে পেরে আমার উপর খাপ্পা হয়ে রয়েছে। ভীষণ। ছুলোয়াটা পিছিয়ে গেল!
ভানুপ্রতাপ হাসলেন।
এমন সময় বিষেণদেওবাবু ঘরে ঢুকে হাসতে হাসতে বললেন, বাঘ ত তোমারই আছে। আমার যে শিকারীরা তোমাদের কালিতিতির বটের মেরে খাওয়াচ্ছে, তারাও বাঘটাকে দেখেছে। সব ইন্তেজামও করছে তারাই। ওদের ইন্তেজামের কোনো ত্রুটি থাকে না। বাঘ মারিয়েই ওরা ছাড়বে তোমাকে। ঋজুবাবু যদি নাওও মারেন!
ভানুপ্রতাপ বললেন, শরীরটাও নোটিশ না দিয়ে হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল। আজ হলো না ত’ কি? কাল-পরশু ছুলোয়া নিশ্চয়ই হবে।
ঋজুদা বলল, আমরা তাহলে একটু ঘুরে-টুরে আসি।
বিষেণদেওবাবু বললেন, গাড়িতে যাচ্ছেন, সঙ্গে ঠাণ্ডা জল আর কিছু খাবার দিয়ে দিই? ফ্লাস্কে করে চা নেবেন না কি?
চা হলে ত’ ফারস্ট ক্লাস হয়। ঋজুদা বলল।
চায়ের সঙ্গে কিছু বরফি আর শেওইও নিয়ে যান। জঙ্গলের পথ। গাড়ি খারাপ হল, হঠাৎ টায়ার পাংচার হল; কে বলতে পারে।
আমরা যখন ফটকের বাইরে এসে পড়লাম তখন আমি বললাম, প্রথমে হাজারীবাগ বলে, পরে আবার টুটিলাওয়া বললে যে।
প্রথমে লুলিটাওয়া পড়বে তারপর টুটিলাওয়া, তার অনেক পরে হাজারীবাগ। আমাদের কাজ টুটিলাওয়াতে হয়ে গেলে আর হাজারীবাগ যেতে হবে না।
কি কাজ?
ঋজুদা বলল, শোন রুদ্র। তোকে একবার কোলকাতায় যেতে হবে। কতগুলো কাজ দিয়ে পাঠাব তোকে। কাজগুলো যে কি, তা এখনও আমি নিজেও জানি না। কিন্তু মনে হচ্ছে, তোকে যেতেই হবে।
তুমি একা থাকবে? এখানে?
দুদিন। মাত্র দু’দিন। তারপর ত’ তুইও চলে আসবি। তুই এলে, তারপর আরও দু-একদিন থেকে; যদি এখানে থাকার মত অবস্থা থাকে; দুজনেই ফিরে যাব।
লুলিটাওয়া হয়ে টুটিলাওয়া পৌঁছতে পৌঁছতে আমাদের পঁয়তাল্লিশ মিনিট মত লাগল। পথের প্রতিটি মোড়, পথের পাশের প্রতিটি ল্যান্ডমার্ক মনে হল, ঋজুদার মুখস্থ। এদিক-ওদিকে নানা দেখার জিনিস দেখাতে দেখাতে চলেছিল আমাকে। আসবার সময় এ পথে রাতের অন্ধকারে এসেছিলাম। রাতে আর দিনে জঙ্গলের রূপের যে কত তফাত; তা বলার নয়। রাতের অন্ধকারে ভয়, কৌতূহল আর রহস্য যেন মাখামাখি হয়ে থাকে। আর দিনের আলোয় সব স্পষ্ট স্বচ্ছ।
টুটিলাওয়ার জমিদারবাড়িটা দেখে মনে হয় একটা মসজিদ। মসজিদও আছে পাশে। এখানকার জমিদার ইজাহারুল হক খুব শৌখিন লোক। ইনিই এস-পি সাহেবের ছেলের সঙ্গে সিতাগড়ার বড় বাঘটা মারার সময় ছিলেন।
সেখানে পৌঁছে দেখা গেল ইজাহারুল নেই। হাজারীবাগে গেছেন। হাজারীবাগেই থাকেন উনি।
ঋজুদা ইজাহারুল সাহেবের ম্যানেজার হাজী সাহেবকে জিজ্ঞেস করল, ওঁদের কোনো লোক শিগগিরি কোলকাতায় যাবে কি না?
–হাজী সাহেব বললেন, আমি নিজেই যাব কালকে সারিয়া হয়ে।
–ফারস্ট ক্লাস। গিয়েই এই চিঠিটা যদি পৌঁছে দেন হাজীসাহেব।
আমি ত’ কোলকাতা চিনি না ভাল। হাজীসাহেব বললেন।
আপনার চিনতে হবে না। খামের উপর ফোন নম্বর দিলাম। ফোন করলেই আমার লোক এসে চিঠিটা নিয়ে যাবে। খুব জরুরী চিঠি।
ব্যস, ব্যস, তাহলে ত’ কোনো অসুবিধাই নেই। জরুর এ চিঠি পৌঁছে যাবে। কিন্তু মিঞাসাহেব নেই বলে আপনারা তসরিফ রাখবেন না একটু, এ কি করে হয়? নামুন নামুন। কোথা থেকে আসছেন? কবে এসেছেন?
আমরা নেমে ভিতরের পাথরের তৈরি ঠাণ্ডা ঘরে বসলাম। হাকিমী দাওয়া মেলানো গোলাপী-রঙা শরবত আর ফিরনী এলো আমাদের জন্যে।
আপত্তি করতেই হাজীসাহেব জিভ কেটে বললেন, তওবা, তওবা, গরীবের নোকরী খেয়ে হুজৌরের লাভ? মিঞাসাহেব এসে শুনলে আমাকে কোতলও করতে পারেন।
ঋজুদা হাসল। বলল, এসেছি ত’ ডালটনগঞ্জে। এদিকে একটু ঘুরিয়ে নিয়ে গেলাম আমার এই চেলাকে। ইমতেহান পাশ করেছে–পঁড়ে-লিখেমে বহত্ তেজ।
আমি ফিরনী মুখেই হেসে ফেললাম। আমার পড়াশোনায় তেজ-এর কথা শুনে। এমন গ্যাস্ দেয় না।
হাজীসাহেব বুলেন, ঘর খুলে দি। স্নানের বন্দোবস্ত করি? খসস ঈত্বর দিয়ে চান করে আরাম করুন, তারপর ভালো করে বিরিয়ানী বানিয়ে দিচ্ছি। বিরিয়ানী এখনও আগের মতই ভালোবাসেন ত’?
ঋজুদা বলল, হাজীসাহেব, যে খাসীর বিরিয়ানী ভালো না বাসে, সে নিজেই নির্ঘাৎ খাসী। এমন উমদা খনা খুদার বেহেতরীন দুনিয়ায় আর বেশী কি আছে?
হাজীসাহেব দাড়ি-কচলে হেসে উঠলেন।
এ-কথা সে-কথার পর ঋজুদা বলল, পথে মুলিমালোয়াঁর মালোয়াঁমহল দেখলাম। ওঁদের একসময় চিনতাম ত’ আমি ভালো করেই। ওঁদের খাল-খরিয়াত সব ভাল?
হাজীসাহেব দু বার দাড়িতে হাত চালিয়ে কাছা ঠিক করার মত মসৃণ করে নিয়েই বললেন, কা কহে সাহাব–পইসা বড়া গন্ধা চিজ। পইসা আদমীকে জানোয়ার বনা দেতা। বিলকুল জানোয়ার।
ঋজুদা চোখ বড় বড় করে বলল, কি হল? ব্যাপার কি?
দিদিজীর স্বামী ত’ ঘোড়া থেকে পড়ে মারা গেলেন। বড়ী তাজ্জব কী বাত। ঘোড়াকে এসে সাপে কামড়াল। কি সাপ কেউ জানে না, কিন্তু অত বড় ওয়েলার ঘোড়া সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে উঠে মুখ থুবড়ে পড়ে গেলো। পাথরে চোট লাগল মাথাতে। সঙ্গে সঙ্গে সব শেষ।
দিদিজীও হঠাৎ একদিনের অসুখে মারা গেলেন। এখন রয়েছে শুধু ভানুপ্রতাপ। কানাঘুষোয় শুনি বিষেণদেওবাবু এখন তাঁকেও মেরে সব কিছু নিজে হাত করার চেষ্টা করছেন। লোকে বলে। শোনা কথা। হয়ত বাজে কথা। পরের কথায় কান দিতেও ইচ্ছে করে না।
তারপর বললেন, আমার কাছে এসব শুনেছেন এ যেন কাউকে বলবেন না।
ঋজুদা শরবতের গ্লাস নামিয়ে রেখে বলল, হুমমম। সেইজন্যেই বাইরে থেকে কেমন ভুতুড়ে-ভুতুড়ে লাগছিল বাড়িটাকে। যেন জঙ্গলের জিন-পরীদের আড্ডা, অথচ জানে……
জিন-পরীর কথাও শুনি। লোকে বলে, নাচ-ঘরে নাকি, রাতের বেলা নানারকম আওয়াজ-টাওয়াজ শোনা যাচ্ছে কিছুদিন হল।
হ্যাঁ? তাই নাকি? ঋজুদা বলল। যেন অবাক হয়ে।
তারপর বলল, ওঁরা আছেন ত’ ওখানে? বিষেণদেওবাবু আর ভানুপ্রতাপ?
ঝুমরি-তিলাইয়াতে যাওয়া-আসা করতে হয় ওঁদের প্রায়ই, কিন্তু যখন থাকেনও, তখনও মনে হয়, ভূতেরই বাড়ি! তারপর বললেন, বোস সাহাব, যেখানে ইমানদারী নেই, দিল নেই, খুশী নেই, পেয়ার নেই, সেখানে টাকা ভূত ছাড়া আর কি? মাইকার বিজনেস করে এঁরা ত’ বোধহয় শ মাইলের মধ্যে এখন সবচেয়ে বড়লোক। কিন্তু লাভ কি? টাকা কি দিল ওঁদের?
একটু থেমে আবার দাড়ি-কচলে বললেন, হুজৌর। টাকা রোজগার করা সহজ, বড়লোক হওয়াও খুবই সহজ; কিন্তু টাকাওয়ালা হওয়ার পরও মানুষ থাকা বড়ই কঠিন। যাদের অনেক টাকা, তাদের মধ্যে বেশীই বদবু জানোয়ারের মত হয়ে যায়। টাকা ত’ কাগজই সাহাব। টাকাকে কাজের মত কাজে লাগাতে ক’জন জানে?
ঠিক বলেছেন হাজীসাহব। একদ্দম সাহী বাত্। এবার আমরা উঠি। বহত মেহেরবানী। আপনি ইজাহারকে বলবেন, আমার কথা।
কালই ত’ আমার সঙ্গে দেখা হবে হাজারীবাগে। নিশ্চয়ই বলব, আপনার কথা। হাজীসাহেব বললেন। হাজারীবাগে ওঁর সঙ্গে দেখা করে যাবেন না?
নাঃ। এবারে বোধহয় হবে না। ঋজুদা বলল।
গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে আমরা মুলিমালোয়াঁর দিকে চললাম।
ঋজুদা বলল, হাজীসাহেব যখন বললেন পরের কথায় কান দিতেও ইচ্ছে করে না, তখন হাজীসাহেবের কান দুটো কেমন লম্বা হয়ে গেল, দেখেছিলি?
আমি হাসলাম।
ঋজুদা বলল, বিরিয়ানীর চেয়েও মুখরোচক আর কি জিনিস আছে বল্ ত’?
কি? আমি শুধোলাম মুখ ঘুরিয়ে।
ঋজুদা বলল, পরনিন্দা আর পরচর্চা। বিনি পয়সার এমন খানা আর হয় না।
টুটিলাওয়া থেকে বেরিয়ে লুলিটাওয়া ছাড়িয়ে এসে যখন আমরা প্রায় মুলিমালোয়াঁর কাছাকাছি পৌঁছে গেছি তখন ঋজুদা পথের ডানদিকে হঠাৎ একটা একেবারে অব্যহৃত ঝরা-পাতা ভরা পথে গাড়িটাকে ঢুকিয়ে দিয়ে স্পীড কমিয়ে আস্তে আস্তে চলতে লাগল। মচমচ করে খয়েরী পাতা গুঁড়োতে লাগল চাকার নীচে পাঁপড় ভাজার মত।
বেশ কিছুদূর গিয়ে, গাড়ি থামিয়ে বলল, ফ্লাস্ক থেকে এক কাপ চা ঢাল ত’ রুদ্র। পাইপটা ধরিয়ে বুদ্ধির গোড়ায় একটু ধোঁয়া দিয়ে নিই।
আমি চা ঢালছি এমন সময় ঋজুদা হঠাৎ বলল, তোর মায়ের মরণাপন্ন অসুখ রুদ্র। তোকে কোলকাতায় যেতে হবে, আর……
কথাটা শুনেই আমার হাত কেঁপে চা চলকে পড়ে গেল গাডির সীটে।
তুই একটা যা-তা! ঋজুদা বলল।
বললাম, বললে আমার মা মরণাপন্ন আর……
ঋজুদা বলল, সেনটেন্সটা কমপ্লিট করতে দিবি ত’! দিলি ত’ সীটটাতে দাগ ধরিয়ে, বলেই হলুদ ন্যাকড়া বের করে মুছতে লাগল।
তারপর বলল, পরশু-তরশুই কোলকাতা থেকে একটা আর্জেন্ট টেলিগ্রাম আসবে তোর নামে–মাদার সিরিয়াসলী ইল। কাম ইমিডিয়েটলী।
কে করবে?
ভটকাই। ভটকাইকে ব্যাপারটা সিক্রেট রাখতে বলেছি। হাজীসাহেবের সঙ্গে ওর কাছেই চিঠি পাঠালাম। টেলিগ্রামটা পেয়ে অন্তত একটু কাঁদো কাঁদো ভাব করিস– সত্যি হলে ত’ আর করবি না; জানাই কথা। টেলিগ্রাম পাবার পর গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যাবি। কোলকাতা অবধি কিন্তু গাড়ি নিয়ে যাবি না। ধানবাদে গাড়ি রেখে দিবি–ধানবাদ টেলিফোন এক্সচেঞ্জের ঠিক উলটো দিকে নারাং আয়রন এন্ড স্টীল কোম্পানী আছে। সেখানে। চিঠি দিয়ে দেব আমি। রাতটা ওদের কাছে থেকে, ভোরের ট্রেন ধরে কোলকাতা। টেলিগ্রাম যদি সকালে এসে পৌঁছয় তবে ত বিকেল বিকেলই ধানবাদ পৌঁছে সেই রাতেই কোলকাতা পৌঁছে যাবি।
তারপর?
আমি একসাইটেড হয়ে বললাম, ঋজুদাকে চা এগিয়ে দিতে দিতে।
তারপর তোদের বাড়িতে না গিয়ে আমার বাড়িতে উঠবি সটান। ভটকাইকে ফোন করে জানবি তোর মা-বাবা কেমন আছে। তোর সঙ্গেই তিনটি জায়গায় তিনটি চিঠি দেব। সেই তিন জায়গাতেই নিজে গিয়ে দেখা করবি। ওঁদের সঙ্গে নিজে কথা বলবি। যা জানার, জেনে আসবি। তোর পাশ করার কারণে তাকে যে প্রেজেন্টটা দেব বলেছিলাম, সেটাও এতদিনে এসে যাওয়ার কথা। এসে গেলে, সেটাও সঙ্গে করে নিয়ে আসবি। হয়ত, এখানে কাজে লাগতে পারে।
কোথা থেকে? আমি উত্তেজিত হয়ে বললাম। কি প্রেজেন্ট?
ধীরে, রুরুদ্দরবাবু, ধীরে। সময়ে, সবই জানবে। এখন চল, চা খেয়ে নিয়ে আমরা নাচঘরে যাব।
নাচঘর? নাচঘর এখানে কোথায়?
ভূতের ভয়ে আমার গলা কেঁপে গেল একটু।
এই রাস্তাই নাচঘরের সামনে নিয়ে গেছে। এ রাস্তা এখন আর কেউই ব্যবহার করে না। তবে গাড়ি কতদূর যাবে তা বলা যায় না। পুরো রাস্তা গাড়িতে যাওয়াও হয়ত ঠিক হবে না। শেষের আধ মাইল হন্টন মারব। আমার লাঠিটাও বের করিস পেছন থেকে। আর এই বেলাই নিরিবিলিতে বাক্সটা দেখে নে বরং।
আমি নেমে, বুট খুলে ঋজুদার লাঠি আর বাক্স বের করলাম। বাক্সটা ঠিকই আছে। আফ্রিকা থেকে এসে একটা নতুন বাক্স; নতুন করে গুছিয়েছি আমরা। এখন থেকে যেখানেই যাব; বাক্সটা সঙ্গে যাবে। ঋজুদার স্ট্যান্ডিং-অর্ডার।
আমাদের চা খাওয়া হয়ে গেলে গাড়ি স্টার্ট করল ঋজুদা। আস্তে আস্তে চলতে লাগল গাড়ি। দুধারে নানারকমের গাছ ঝুঁকে পড়েছে রাস্তায়। নানারঙা শুকনো পাতায়–হলুদ, লাল, হলুদ-লাল, খয়েরী, সবজে-হলদে, সবজে এবং কালো পাতায় পথ ছেয়ে রয়েছে। কিছু পাতা পচেও গেছে। খুব আস্তে চলছে গাড়ি পাতার মোটা নরম গাছের উপর দিয়ে। সূর্যের আলো ডালপালার ফাঁকে ফাঁকে সামান্যই আসছে সেখানে। বাঁ দিকের জঙ্গল থেকে একটা কাঠঠোকরা সমানে কাঠ ঠুকে চলেছে আর ডানদিক থেকে একজোড়া হুপী। হুপীর ডাক, ঘন জঙ্গলের মধ্যে শুনলে ভারী গা-ছমছম করে।
কেন জানি না, এরকম পথে যেতে আমার খুব ভালো লাগে। যে পথে কেউ যায় না, যে পথে আমার আগে আর কারও পায়ের চিহ্ন পড়েনি, সেই পথে। ঋজুদা আমার মুখে এই কথা শুনে একদিন বলেছিল : জীবনের পথ সম্বন্ধেও এই কথা সবসময় মনে রাখিস, রুদ্র। যে পথে অনেকে গেছে, সবাই যায়; সে পথে যাস না কখনও। নিজের পায়ের রেখায় নতুন পথ কেটে চলিস।
এত বছর ঋজুদার সঙ্গে থেকে থেকে জেনেছি যে, এই মানুষটার মধ্যে অনেকগুলো বিভিন্নমুখী মানুষ বাস করে। কোন মুহূর্তে যে কোন মানুষটা বাইরে বেরিয়ে এসে দেখা দেবে, তা আগের মুহূর্তেও বুঝতে পারি না।
প্রায় মিনিট পনেরো চলার পর হঠাৎ গাড়িটা দাঁড়িয়ে পড়ল।
ঋজুদা বলল, সামনে পথের উপরে ওগুলো কি দ্যাখ ত’। ঘোড়ার ময়লা না?
আমি নেমে গিয়ে ভালো করে দেখলাম। বললাম, হ্যাঁ।
খুরের দাগ নেই?
দেখা যাচ্ছে না। বৃষ্টিতে ধুয়ে গেছে নিশ্চয়ই। ঝরা-পাতাতেও ঢেকে গেছে। এঞ্জিনটার মৃদু ঝিকঝিক্ আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। আমি মাটিতে নেমে, এদিক ওদিক দেখছি, এমন সময় দূরে একটা শীস শুনলাম। সংক্ষিপ্ত, তীক্ষ্ণ; হঠাৎ।
মানুষের শীস কি না বোঝবার চেষ্টা করছি, ঠিক সেই সময়ই পথের সামনের ঝরা পাতার উপর দিয়ে কি যেন কী একটা জিনিস বিদ্যুৎগতিতে আমাদের দিকে দৌড়ে আসতে লাগল। জিনিসটার গায়ের রঙ জঙ্গলের মতই জলপাই-সবুজ। তাকে ভালো করে দেখা যাচ্ছিল না, শুকনো পাতায় হঠাৎ ওঠা ঝড়ের মত সড়সড় শব্দ শোনা যাচ্ছিল
কি ব্যাপার, ভালো করে বোঝবার আগেই ঋজুদা চেঁচিয়ে উঠল, দৌড়ে গাড়িতে, রুদ্র! দৌড়ে।
এক দৌড়ে গাড়িতে উঠেই আমি দরজা বন্ধ করলাম।
ঋজুদা নিজের দিকের কাচ ওঠাতে ওঠাতে উত্তেজিত গলায় আমাকে বলল, কাচ, কাচ।
আমিও যত তাড়াতাড়ি পারি আমার দিকের কাচ তুলে দিলাম।
ততক্ষণে জিনিসটা এসে পড়েছে একেবারে সামনে– বিদ্যুতের চেয়েও বুঝি তাড়াতাড়ি। অতবড় সাপ যে হয় তা কখনও জানতাম না। সে লম্বায় বোধহয় প্রায় বারো ফিট হবে। গাড়ির বাম্পারের সামনে থেকে লাফিয়ে সোজা এক মানুষ সমান। দাঁড়িয়ে উঠেই প্রকাণ্ড চওড়া ফণা আর প্রায় এক হাত লম্বা চেরা জিভ বের করে হিস-হিস শব্দ করে বনেটের উপর আছড়ে পড়ে কাচের উপর এমন এক ছোবল মারল যে, একটু হলে কাচটা ভেঙে যেত।
ঋজুদা সঙ্গে সঙ্গে ব্যাক্ গীয়ার দিল। বুঝলাম ঋজুদা গাড়ি ব্যাক করে নিয়ে সাপটাকে গাড়ি চাপা দিয়ে মারার চেষ্টা করছে। কিন্তু আমার মনে হল, সাপটা এতই বড় যে, ইচ্ছে করলে এতটুকু ছোট্ট ফিয়াট গাড়িকে উলটেও দিতে পারে।
সাপটা গাড়ির বনেটের উপর উঠে এসেছিল, তবুও তার শরীরের পেছনের অংশটা গাড়ির সামনের অনেকখানি মাটি জুড়ে ছিল। গাড়িটা একটু পেছিয়েছে– সাপটা বনেট থেকে পিছনে নীচে নেমে গেছে, ঠিক তক্ষুনি পিছনের দরজার কাচের সামান্য ফাঁক দিয়েই আবার ঐ রকম জোরে শীসের আওয়াজ শুনলাম। এবং সেই শীস শোনার মুহূর্তের মধ্যে সাপটা নিজেকে কুঁকড়ে অদ্ভুতভাবে গুটিয়ে নিয়ে উলটে গিয়েই যেমন বিদ্যুৎ বেগে এসেছিল তেমন বিদ্যুৎ বেগেই চলে গেল। যখন উলটালো তখন তার পেটের সাদা-কালো দাগগুলো পরিষ্কার দেখা গেলো। এত জোরে গেলো যে, তার চলার পথের দুপাশে শুকনো পাতা উড়তে লাগল।
আমরা দুজনে স্তব্ধ হয়ে সেদিকে চেয়ে রইলাম।
সাপটা দৃষ্টির বাইরে যেতেই ঋজুদা গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে বলল, হুমম…
আমি অধৈর্য গলায় বললাম, কি হল? কিছুই বলছে না, খালি হুম-হাম করছ। এক্ষুনি ত’ মাদার সিরিয়াসলি ইল টেলিগ্রাম আসার বদলে সান বিটন বাই স্নেক-এক্সপায়ার্ড- বলে টেলিগ্রাম পাঠাতে হত তোমার?
ঋজুদা বলল, হুমম, ভেরী ইন্টারেস্টিং।
আমি এবার রেগে গেলাম। বললাম, ইন্টারেস্টিং? অতবড় সাপ চিড়িয়াখানাতেও দেখিনি–বাপরে বাপ্ ব্যালিস্টিক মিসিল এর চেয়েও জোরে চলে এল। এখনও আমার বুক ধুকপুক করছে।
ঋজুদা অন্যমনস্ক গলায় বলল, ক্ষীরের বরফি খা, জল খা; চুপ কর। ভাবতে দে।
গাড়ি বড় রাস্তাতে পড়তেই ঋজুদা গাড়ি থামিয়ে দিয়ে বলল, রুদ্র তুই চালা গাড়ি। আমি পাশে বসব।
ড্রাইভিং সীট থেকে নেমে এসে, পাশের দরজা খুলে বসল ঋজুদা। আমি না-নেমেই বাঁদিক থেকে ডানদিকে চলে এলাম ড্রাইভিং সীটে। গাড়ি স্টার্ট করতেই ঋজুদা পাইপটা ধরিয়ে বাঁ হাতটা জানলাতে রেখে, পথের সামনে সোজা তাকিয়ে বসে রইল।
বলল, গাড়ি আস্তে চালা–চল্লিশ কি মি-র উপরে তুলবি না।
তারপরই আমার পাশে বসা জলজ্যান্ত মানুষটা পাইপ আর ভাবনার ধোঁয়ায় যেন অদৃশ্যই হয়ে গেল।
আমরা যখন মালোয়াঁমহলে ফিরে এলাম তখন দুপুরের খাওয়ার সময় হয়ে গেছে। যদিও ক্ষিদে একটুও নেই। ভানুপ্রতাপ অথবা বিষেণদেওবাবু, দুজনের একজনও মহলে ছিলেন না। বিষেণদেওবাবু গেছেন ব্রিজনন্দনকে নিয়ে উজজানপুরের রাজবাড়ি থেকে আনা বেনারসী ল্যাংড়া আমের কলম বসাতে নিজের বাগানে। আর ভানুপ্রতাপ গেছেন গীমারীয়া। কেন গেছেন, কেউ জানে না।
আমরা গ্যারাজে গাড়ি রেখে ভিতরে ঢুকতেই-না-ঢুকতেই তুমুল বৃষ্টি নামল। ঝড়কে সঙ্গে করে। দুড়দাড় করে অত বড় মহলের দরজা জানালা পড়তে লাগল। লোকজন ছুটোছুটি করতে লাগল সেসব বন্ধ করার জন্য। ঠাণ্ডা, ভেজা হাওয়া বইতে লাগল জোরে। ঝরে যাওয়া পাতা আর ফুল উড়তে থাকল। একঝাঁক হুইসলিং টীল জঙ্গলের মধ্যের কোনো তালাও থেকে উড়ে আসতে লাগল উত্তর থেকে দক্ষিণে।
আমরা আমাদের ঘরে গেলাম। নীচে বলে গেলাম যে, ওঁরা এলে খাওয়ার জন্যে তৈরি হলে, তখন আমাদের খবর দিতে।
ঋজুদা আমার ঘরে ঢুকেই বলল, আজ থেকে এক ঘরেই শুতে হবে। বুঝলি। যা ঘটল, তারপর তোকে একা ছেড়ে দেওয়া যায় না।
আমি বললাম, হাত খালি যে। কিছুই আনতে দিলে না তুমি। আমার হাতে একটা কিছু থাকলে–ঐ শীস দেওয়া গাব্বুন ভাইপারের বাবাকে আমি ঐ ঝরা পাতার উপর শুইয়ে দিতাম।
ঋজুদা চুপ করে রইল। আমরা দুজনেই জানতাম যে, এ সময় কাচ নামিয়ে ঋজুদা পিস্তল বের করলেই সঙ্গে সঙ্গে হাতে ছোবল দিতো ঐ সাপ। সাপ মারতে শটগান হচ্ছে সবচেয়ে ভাল। চার নম্বর কি ছ’ নম্বর ছররা দিয়ে দেগে দিলেই হল মাথাতে। মাথায় সুবিধে না হলে কোমরে। কোমরে গুলি লাগলেই, সময় পাওয়া যায়–পরের গুলি ধীরে সুস্থে মাথা লক্ষ্য করে করা যায়। অনেক সময় গাছের ডালে বা বাঁশের ঝাড়ে সাপ জড়িয়ে থাকলে তার মাথাটা যে কোথায় আছে, তা খুঁজে বের করতেই সময় লেগে যায় অনেক।
ঋজুদা ঘরে ঢোকার পর থেকেই আমাদের জিনিসপত্রের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে ছিল।
হঠাৎ বলল, আমাদের অবর্তমানে আমাদের জিনিসপত্র কেউ ঘাঁটাঘাঁটি করে গেছে। বুঝলি?
কি করে বুঝলে?
আমার ব্যাগের জীপ-ফাসনারটা আমি ইচ্ছে করেই আধ ইঞ্চি মত খুলে রেখে গেছিলাম। দ্যাখ যে খুলেছিল, সে কিন্তু পুরোটাই বন্ধ করে দিয়েছে।
তারপর বলল, তোর জিনিস সব ঠিক ঠিক আছে ত!
আমি আমার স্যুটকেস খুলে দেখলাম। সবই ঠিক আছে। শুধু আমার এ্যাড্রেস-বইটা নেই। ছোট্ট বই; তাতে আমার পুরো নাম ঠিকানা লেখা ছিল। সকলের ফোন নম্বরও।
ঋজুদাকে বললাম সেকথা।
ঋজুদা বলল, এখানে ফোন থাকলে গদাধরকে বলে দিতাম।
অতিথিদের আদর-আপ্যায়ন করতে ভাল করে। আমাদের ত’ কম যত্ন করছেন না এঁরা। আমাদের খোঁজ করতে কি নিখোঁজ করতে গেলে এঁদের মধ্যেই কেউ যাবেন। অথবা এঁদের লোকজন।
কেউ মানে? বিষেণদে……
ঋজুদা ঠোঁটে আঙুল ছুঁইয়ে কথা বলতে মানা করল আমাকে। বারান্দাতে কারো পায়ের শব্দ শোনা গেল।
হুজৌর।
কওন? ঋজুদা বলল।
ছোট্টু।
বোলো।
হুজৌর লোঁগ আ গ্যয়া। পঁন্দরা মিনিট বাদ খানেকে লিয়ে আইয়ে আপলোগ নীচ্চে।
ঠিক হ্যায়। বলল ঋজুদা।
ঋজুদা বলল, রুদ্র। আজ দুপুরে খাওয়ার পরই আমাদের পেট আপসেট হবে দুজনেরই। এবং তোর টেলিগ্রামটা না-এসে পৌঁছনো অবধি আমরা বাড়ির মধ্যেই থাকব। বাড়ির মালিকরা বাড়ির বাইরে গেলে বাড়িটার মধ্যে ঘুরে ঘুরে ভাল করে দেখতে হবে বুঝলি।
বললাম, ঠিক আছে। কিন্তু এত লোকজন। পারবে?
পারতে হবে। ওরা আমাদের জিনিস ঘেঁটে যাবে, চুরি করবে, আর আমরা কেন করব না।
খেতে এসে আমি অথবা ঋজুদা যেন কিছুই হয়নি এমন ভাব করে গল্প-গুজব করতে করতেই খেলাম।
বিষেণদেওবাবু বললেন, কাল সব ঠিকঠাক থাকলে, মানে আমাদের সকলের শরীর-স্বাস্থ্য, কাল সকালেই ছুলোয়া করব। অ্যালবিনোর জন্যে।
ভানুপ্রতাপ বললেন, আমি জগদেওকে জিজ্ঞেস করলাম, ও বলছে ও নাকি অ্যালবিনোকে দেখেইনি। তবে কে দেখেছে। আসোয়া আর রত্না। আসোয়ারা কোথায়?
ওরা গেছে মাইনসে।
মাইনস কেন? ভানুপ্রতাপ সন্দিগ্ধ গলায় শুধোলো।
মাইনসে নাকি একটা নেকড়ে, বাচ্চা ছেলেদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। পাঁচ-পাঁচটি বাচ্চা নিয়েছে–তিন থেকে ন’ বছরের। তাইই ওদের পাঠিয়ে দিলাম।
কবে পাঠালে?
এই ত’ আজ সকালেই।
আজ সকালে? খবর নিয়ে এল কে?
গুণ্ডারিলালকে দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলো ম্যানেজার আজ খুব ভোরে।
বাসে এলো গুণ্ডারিলালের লোক? কখন এল? দেখিনি ত’! ভোরে কোন্ বাস আছে?
তুই ত’ শুনেছিলি। বাসে আসেনি, এসেছিল ডিজেলের জীপ নিয়ে। আসামাত্র ওদের আসোয়ার বাড়ি পাঠিয়ে পত্রপাঠ ওদের দুজনকে তুলে নিয়ে চলে যেতে বলে দিয়েছিলাম। আজকাল ত’ পান থেকে চুন খসলেই মালিকের দোষ। জঙ্গলের নেকড়ে খনির কুলীদের বাচ্চা ধরে নিয়ে যাচ্ছে, তার পিছনেও মালিকের ষড়যন্ত্র আছে বলে রটে যাবে। তাইই, আর দেরী করলাম না।
ভানুপ্রতাপকে যেন ভূতে পেয়েছে। আবারও বললেন, আসোয়ারা কোন্ দিকে অ্যালবিনোর পায়ের দাগ দেখেছিলো?
যেখানে মাচা বাঁধা হয়েছে সেখানেই ত’ দেখেছিল বলল।
পিসকি নদীতে? ভানুপ্রতাপ আবার শুধোলেন।
হ্যাঁ। তাইই ত’ শুনেছি।
বিষেণদেওর গলা আস্তে আস্তে নরম হয়ে আসছিল ভানুপ্রতাপের জেরার তোড়ে।
কিন্তু ব্যালিস্টিক মিসিল-এর মত বারোফুটি শীস দিয়ে কন্ট্রোল-করা সাপ ছেড়ে এরা মামা-ভাগ্নেতে অ্যালবিনো বাঘটাকে নিয়ে যে কেন পড়লেন বুঝলাম না। অথচ সাপটার কথা আমরা ভুলেও উচ্চারণ করতে পারছি না। মধ্যে এই গোলমালে এ জন্মে অ্যালবিনো মারার চান্সটাই আমার হাতছাড়া হবে মনে হচ্ছে। মনই খারাপ হয়ে গেল। কাল সকালেও ছুলোয়া হবার নয়, কারণ দুপুরের খাওয়ার পর আমাদের দুজনেরই ত’ আবার পেট-আপসেট করবে। পেটের মধ্যে কি হয় না হয় তা একমাত্র পেটের মালিকই জানে। তাই পেটের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া উপায় নেই আমাদের।
ভানুপ্রতাপ বললেন, আজ বিকেলে ভাবছি, একবার পিসকি নদীতে গিয়ে পাগ-পার্কসগুলো দেখে আসব।
বিষেণদেওবাবু বললেন, খালি হাতে যাস না; আর একাও নয়। অত বড় বাঘ। বুড়োও হয়েছে। কি রকম মেজাজ থাকে, কে বলতে পারে?
ভানুপ্রতাপ ঋজুদাকে বললেন, চলুন না, বিকেলে ঘুরে আসি।
ঋজুদা খুশী মুখে বলল, যাব। ভালোই ত’। ঘুরে আসা হবে।
বিষেণদেওবাবু হঠাৎ বললেন, পিসকি নদী কোথায় আপনি জানেন? ওদিকে গেছিলেন নাকি এদিকে আসার পর?
পিসকি? ঋজুদা যেন আকাশ থেকে পড়লো।
বলল, এসব জঙ্গল আমার অচেনা। পিসকি নদী কোথায় তা তো জানি না আমি। বলেই, ইচ্ছে করে হাত ঘুরিয়ে পিছন দিকে নাচ-ঘরের দিকে দেখালো। বলল, ঐদিকে?
না, না ওদিকে নয়। ভানুপ্রতাপ বললেন।
তারপর বললেন, কাল রাতে কোনো অস্বাভাবিক আওয়াজ শুনেছিলেন? আপনাদের দুজনের কেউ?
আওয়াজ? হ্যাঁ। ব্রিজনন্দনজী গিয়ে আমাদের সাবধান করে দিলেন।
ব্রিজনন্দন? বিষেণদেও জিজ্ঞেস করলেন–ওঁর মুখে একটা রাগের ছায়া এসেই সরে গেল। অবাক গলায় বললেন, ব্রিজনন্দন গেছিল আপনাদের সাবধান করতে?
ভানুপ্রতাপ বললেন, হ্যাঁ। আমিই বলে দিয়েছিলাম।
তারপর?
বিষেণদেও ঋজুদার চোখে চোখ রেখে বললেন।
তারপর এই আপনার রুরুদদরবাবু। এতটুকু ছেলে এমন বাজের মত নাক ডাকে পাশে শুয়ে যে, বাইরের কোনো শব্দই কী আর শোনার উপায় ছিল? নইলে ভূত-পেত্নীর আওয়াজ কখনও শুনিনি, শোনার ইচ্ছে ছিল খুবই।
আপনারা কাল এক ঘরে শুয়েছিলেন বুঝি? বিষেণদেওবাবু শুধোলেন।
হ্যা। ভয়ে। ছেলেটি কান্নাকাটি শুরু করে দিল। আমিও মশাই ছোটবেলা থেকে জঙ্গলে জঙ্গলেই কাটিয়েছি–জন্তু জানোয়ারের ভয় আমার নেই–সে যে জন্তুই হোক আর যত হিংস্রই হোক বলেই আড়চোখে চাইল একবার আমার দিকে। তারপর বলল, কিন্তু এই অশরীরী ব্যাপারগুলো সম্বন্ধে আমার, ঠিক ভয় বলব না; অস্বস্তি আছে একটু। এড়িয়ে যাবারই চেষ্টা করি সবসময়। তবে রুদ্র নাক না-ডাকালে শুয়ে শুয়ে শুনতে আপত্তি ছিলো না।
বিষেণদেওবাবু খাবারের থালায় মুখ নামিয়ে বললেন, তাহলে বলুন ভানু ভালই করেছিল ব্রিজনন্দনকে পাঠিয়ে আপনাদের কাছে। ভানুর দায়িত্বজ্ঞান, কর্তব্যজ্ঞান বাড়ছে আস্তে আস্তে। খুব ভাল। খুবই ভাল বলতে হবে।
ভানুপ্রতাপ বললেন, ঠাট্টা করছো মামা?
ঠাট্টা? সত্যিই বলছি। কথাটা শুনে খুব ভাল লাগল। এই ত’ চাই। মেহমানদের দেখভাল সকলে করতে পারে না; জানেও না। এর মধ্যেও খানদান-এর ব্যাপার থাকে। তোর বাবার গুণটা পেয়েছিস দেখে ভাল লাগছে।
