একটি হত্যার অন্তরালে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(২১)

১২ মার্চ, রবিবার। যেমন সকাল, তেমন দুপুরটাও আজ বড় অস্বস্তির মধ্যে কাটল। হাতে প্রচুর কাজ জমে গেছে—লেখার কাজ, সামনের মাসে যে বইটা বেরোবে তার প্রুফ দেখার কাজ। তা ছাড়া আপিসের আর সংসারের কাজ তো আছেই। অথচ, গত এক হপ্তার মধ্যে একটা চিঠি পর্যন্ত লিখে উঠতে পারিনি। ভেবেছিলুম, সিকিম থেকে ঘুরে আসার পর অসুস্থ পিসতুতো ভাইটাকে একবার দেখে আসব। আজই যাওয়া যেত, কিন্তু তাও যাওয়া হয়নি। আসলে কোনও কাজেই যেন মন বসাতে পারছি না। বাসন্তী সেটা লক্ষ করেছিল। স্নানের জন্যে তাড়া দিতে এসে বলল, “তোমার কী হয়েছে বলো তো?”

 

বললুম, “ঝড়ের সঙ্গে লড়াই করতে-করতে জেদি একটা গাছ যখন আর পেরে ওঠে না, মুখ থুবড়ে মাটির উপরে পড়ে যায়, তখন তার অবস্থাটা কী হয়?”

 

“তুলনাটা কার সঙ্গে দিচ্ছ?”

 

“মিসেস ঘোষের সঙ্গে। জেদি মহিলা। কিন্তু মুখ থুবড়ে পড়ে গেছেন। কাল তাঁর মুখচোখের যে অবস্থা দেখলুম, সেটা ভোলা যাচ্ছে না।”

 

এ পর্যন্ত যা-যা ঘটেছে, তার কিছুই বাসন্তীর অজানা নেই। বলল, “তোমার কী মনে হয়? লোক লাগিয়ে উনিই কি এটা করাননি?”

 

“তা কি সম্ভব?”

 

“কেন নয়?”

 

“জানকী ঘোষ ওঁর নিজের ছেলে না হতে পারেন, কিন্তু তাঁকে তো উনি নিজের ছেলের চেয়ে কিছু কম ভালবাসতেন না। হয়তো আরও বেশিই বাসতেন। তা নইলে আর নিজের ছেলেকে অর্ফানেজে পাঠিয়ে মা-মরা ছেলেটাকে উনি বুকে তুলে নেবেন কেন?”

 

বাসন্তী বলল, “কিন্তু রক্তের টান বড় ভয়ঙ্কর টান। শেষ পর্যন্ত যদি সেই টানটাই জিতে গিয়ে থাকে? সেটা কি একেবারেই অসম্ভব?”

 

বললুম, “কী জানি। মানুষের মন বলে কথা। কিছুই হয়তো অসম্ভব নয়।

 

স্নান করে, খাওয়ার পাট চুকিয়ে একটু ঘুমোবার চেষ্টা করেছিলুম। ঘুম এল না। তিনটে নাগাদ বিছানা ছেড়ে, বৈঠকখানা ঘরে গিয়ে প্রুফের বাণ্ডিল টেনে নিলুম। অক্ষরগুলো ঝাপসা ঠেকতে লাগল। যে-কাজই করতে যাই, চোখের সামনে মিসেস ঘোষের মুখখানা হঠাৎ ভেসে ওঠে। জেদি মহিলা, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পেরে উঠলেন না। অতীত জীবন তাঁর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তাঁর বেপরোয়া, উচ্ছৃঙ্খল যৌবনের সাক্ষীর মতো, তাঁর নিয়তির মতো। তিনি হেরে যাচ্ছেন, নিয়তির হাত থেকে তাঁর নিষ্কৃতি নেই।

 

সাড়ে চারটের সময় ভাদুড়িমশাইয়ের ফোন এল। বললেন, “সাতটার সময় থানায় যেতে হবে, মনে আছে তো?”

 

বললুম, “বিলক্ষণ।”

 

“পৌনে সাতটাতেই চলে আসুন। আমি আপনাদের তুলে নিতে পারতুম, কিন্তু সেটা সম্ভব হচ্ছে না। আমি সরাসরি থানায় যাব। কৌশিকও যাচ্ছে।”

 

“ঠিক আছে, সদানন্দবাবুকে নিয়ে আমি তা হলে আমার গাড়িতেই চলে যাচ্ছি। আর-কোনও খবর আছে?”

 

“আছে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “খারাপ খবর। ফুলকুমারী ঘোষকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে।”

 

বললুম, “সে কী!”

 

“অবাক হচ্ছেন তো? আমিও হয়েছিলুম। পুলিশ যে এত তাড়াতাড়ি এটা করবে, তা ভাবিনি।”

 

“খবরটা আপনাকে কে দিল?”

 

“শোভন। বলল যে, ওদের বিল্ডিংয়ের বিদিশা দেবীকে ওরা বীরেশ্বর সেনের স্ত্রী বলে জানত। কিন্তু আজ সকালে তিনি লোকাল থানায় গিয়ে জানিয়েছেন যে, আসলে তিনি জানকীনাথ ঘোষের স্ত্রী। তাঁর বিশ্বাস, সম্পত্তির লোভে ফুলকুমারীই জানকী ঘোষকে লোক লাগিয়ে খুন করিয়েছেন। জানকী যে ফুলকুমারীর নিজের ছেলে নয়, সৎ ছেলে, সেটাও জানাতে ভোলেননি।”

 

“বিদিশা দেবী…আই মিন বেলা দেবী এই খুনের খবরটা কখন জানলেন? শুক্রবার সকালে যখন তাঁর সঙ্গে দেখা করি, তখন তো মনে হয়েছিল কিছুই জানেন না।”

 

“কাল কিংবা আজই সকালে খবরটা পেয়ে থাকবেন। থানায় নাকি এটাও জানিয়েছেন যে, তিনি ডিভোর্সি, কিন্তু তাঁর একটি ছেলে আছে, সে ফুলকুমারীর কাছে থাকে। ফলে, ছেলের নিরাপত্তা নিয়ে বেলা দেবী খুব চিন্তিত। তাঁর ইচ্ছে ফুলকুমারীকে ওখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হোক।”

 

বললুম, “শোভন চৌধুরিকে আপনি এ নিয়ে কিছু বলেননি?”

 

“কী বলব?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “পুত্রবধূর অভিযোগ তো মারাত্মক, ফলে পুলিশেরও এর পরে আর হাত গুটিয়ে বসে থাকার উপায় ছিল না। তবে পুলিশ যে সরাসরি অ্যারেস্ট করার কথাটা স্বীকার করছে, তা নয়। শোভনের বক্তব্য, ওই অভিযোগের পরে দাশুর কাছ থেকে ফুলকুমারীকে সরিয়ে এনে ঠিকই হয়েছে। নয়তো সত্যিই যদি দাশুর কিছু একটা হয়ে যায়, তো বেলা দেবী তখন বলতেই পারবেন যে, তিনি জানানো সত্ত্বেও পুলিশ কোনও স্টেপ নেয়নি!”

 

“আপনিও মনে করেন যে, ফুলকুমারী দেবীর কাছে থাকলে দাশুর ক্ষতি হবার আশঙ্কা রয়েছে?”

 

“আমি কী মনে করি না-করি, সেটা কোনও কথা নয়। পুলিশ কী মনে করে, সেটাই হচ্ছে কথা। পুলিশ কোনও ঝুঁকি নিতে চাইছে না। এমনও বলছে না যে, মিসেস ঘোষকে তারা অ্যারেস্ট করেছে। তারা বলছে, এটা একটু আটকে রাখার ব্যাপার। থানায় এনে জিজ্ঞেসাবাদ করার জন্যে তাঁকে বাড়ি থেকে তুলে আনতে হল।”

 

বললুম, “জিজ্ঞেসাবাদ তো ওঁর বাড়িতেও করা যেত।”

 

“রাইট। কিন্তু তা হলে তো আর দাশুর কাছ থেকে ওঁকে সরিয়ে আনা হত না।”

 

“কিন্তু আপনি এটাকে নিশ্চয় ডিটেনমেন্ট না-বলে অ্যারেস্টই বলবেন?”

 

“তা তো বলবই।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু মুশকিল কী জানেন, আজ রবিবার, তাই একজন উক্লি দিয়ে আদালতে জামিনের আবেদন করাও ওঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। আজকের রাতটা ওঁকে থানা-হাজতেই কাটাতে হবে।”

 

“শোভনবাবু এই কথা বললেন?”

 

“হ্যাঁ।”

 

“এই হাজতে রাখার ব্যাপারটা নিয়েও শোভনবাবুকে আপনি কিছু বললেন না?”

 

ভাদুড়িমশাই স্পষ্টই হাসলেন। বললেন, “একেবারেই যে কিছু বলিনি তা নয়; বললুম যে, শোভন, ওঁর বয়েসের কথাটা বিবেচনা করে একটা দিন পরেও ওঁকে অ্যারেস্ট করতে পারতে, তা হলে অন্তত জামিনের ব্যবস্থাটা করা যেত, হাজতে ওঁকে রাত কাটাতে হত না। …তো সে-কথা থাক, আপনারা চলে আসুন।”

 

ফোন নামিয়ে রাখলুম। মনটা এমনিতেই ভাল ছিল না, আরও খারাপ হয়ে গেল।

 

পাঁচটায় বাসন্তী চা নিয়ে এল। বলল, “ভাদুড়িদা কী বললেন?”

 

চায়ে চুমুক দিয়ে বললুম, “ফুলকুমারী ঘোষকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে।”

 

“তার মানে ওঁকেই সন্দেহ করছে?”

 

“করাই স্বাভাবিক।” বললুম, “পুত্রবধূ থানায় গিয়ে শাশুড়ির নামে নালিশ করে এসেছে সে-ই খুনি।”

 

“সরাসরি এই কথা বলেছে?”

 

“তা বলেনি, তবে যে-ভাবে যা বলেছে, তাতে নাকি পুলিশের পক্ষে ওঁকে অ্যারেস্ট না-করে উপায় ছিল না।”

 

“তোমরা তো আজ থানায় যাচ্ছ, ভাদুড়িদা তোমাদের তুলে নিয়ে যাবেন?”

 

“না, তিনি আর কৌশিক আলাদা যাচ্ছেন। আমি এখান থেকে সদানন্দবাবুকে নিয়ে যাব। … এখন দেখি কোথাকার জল কোথায় গড়ায়।”

 

চা খাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছিল। টেবিল থেকে কাপডিশ তুলে বাসন্তী দরজার দিকে পা বাড়াল। যেতে-যেতে বলল, “বিচ্ছিরি ব্যাপার।”

 

“কোনটা বিচ্ছিরি?”

 

ঘুরে দাঁড়িয়ে বাসন্তী বলল, “এই অ্যারেস্ট করাটা। ভদ্রমহিলা যদি খুনিই হবেন, তো তদন্তের জন্যে উনি ভাদুড়িদাকে ডাকতেন না।”

 

ফুলকুমারী ঘোষ নিজেও এই কথাটা কাল বলেছিলেন বটে। কিন্তু সেটা কি নিজেকে নির্দোষ প্রতিপন্ন করার জন্যে? ভাদুড়িমশাইয়ের কাছে সাধু সাজবার জন্যে? তিনিও যে একজন ধাত্ৰী পান্না, এই রকমের একটা ধারণা জাগিয়ে দেবার জন্যে? তা-ই যদি হয়, তবে তো বুঝতে হবে, অভিনয়ের ব্যাপারে তাঁর কাছে তাঁর পুত্রবধূটি নেহাতই ছেলেমানুষ, বেলা দেবীর তুলনায় ফুলকুমারী আরও অনেক বড় অভিনেত্রী।

 

সদানন্দবাবু এলেন সাড়ে পাঁচটায়। ফুলকুমারী দেবীকে যে গ্রেফতার করে থানা হাজতে রাখা হয়েছে, এই খবর শুনে বললেন, “সে কী, তবে তো খুব মুশকিল হয়ে গেল।”

 

বললুম, “কীসের মুশকিল?”

 

“বাঃ, সেটাও ধরতে পারলেন না? ওঁর জন্যে যে সিকিম যেতে-আসতে হাজার হাজার টাকা খরচা হয়ে গেল, সেই টাকাটা এখন দেবে কে?”

 

“আমাদেরই দিতে হবে। ক্লায়েন্টকে বাঁচাতে না-পারলে তো উনি টাকা পাবেন না।”

 

“ওইটেই হচ্ছে ভরসার কথা।” সদানন্দবাবু বললেন, “ক্লায়েন্টকে বাঁচাতে না পারলে। অর্থাৎ কিনা…”

 

কথাটা শেষ না-করে সদানন্দবাবু হাসতে লাগলেন।

 

একতলার গ্যারাজ থেকে গাড়ি বার করে ঠিক ছ’টায় আমরা বেরিয়ে পড়লুম।

 

রবিবার বলে, চৌরঙ্গি আর ভবানীপুরের সিনেমা হলগুলির সামনে ভিড়ভাট্টা থাকলেও বাকি রাস্তার কোথাও জ্যাম ছিল না, ফলে পৌনে সাতটারও মিনিট কয়েক আগে আমরা থানার সামনে পৌঁছে যাই।

 

ভিতরে গিয়ে নিজেদের পরিচয় দিতেই আমাদের ও.সি.র ঘরে পৌঁছে দেওয়া হল। সেখানে ঢুকে দেখলুম ভাদুড়িমশাই ও.সি.র সঙ্গে কথা বলছেন। কৌশিক ছাড়া আর-একজনের উপরেও চোখ পড়ল। তিনি শোভন চৌধুরি। ভদ্রলোক চুপচাপ বসে আছেন। মুখ গম্ভীর।

 

ঘরের মধ্যে আমাদের ঢুকতে দেখে ভাদুড়িমশাই বললেন, “যাক, আপনারা এসে গেছেন। শোভনকে তো বলেইছি, এখানকার অফিসার ইন চার্জ মিঃ মিত্রকেও বলছিলুম যে, মিসেস ফুলকুমারী ঘোষকে এত তাড়াতাড়ি অ্যারেস্ট করার কোনও দরকার ছিল না, আর দু’-একটা দিন অপেক্ষা করলেই ভাল হত।”

 

ও.সি. বললেন, “কিন্তু এর মধ্যে কিছু একটা হয়ে গেলে যে আমরা বিপদে পড়ে যেতুম।”

 

“দাশুর…আই মিন জানকী ঘোষের ছেলের কথা ভাবছেন তো? না মিঃ মিত্র, এত তাড়াতাড়ি কিছু ঘটত বলে আমার মনে হয় না। তা ছাড়া, অন্য দিকটাও ভেবে দেখুন। অ্যারেস্ট না-করে যদি মিসেস ঘোষের উপরে কড়া নজর রাখার ব্যবস্থা করতেন, তা হলে হয়তো আরও কিছু খবর পাওয়া যেত। সেই সঙ্গে ফোনটাও ট্যাপ করতে পারতেন। তা হলে অন্তত এই ভাইটাল খবরটা জানা যেত যে, বাইরের কোন কোন লোকের সঙ্গে ওঁর কী কথা হচ্ছে।”

 

শোভন চৌধুরি বললেন, “সেটা ঠিক। কিন্তু দাশুর নিরাপত্তার ব্যাপারটাকেই তো প্রায়োরিটি দিতে হবে। সেইটে ভেবেই…”

 

কথা শেষ হল না। তার আগেই একজন সেপাই এসে জানাল যে, বীরেশ্বর সেন বলে এক ভদ্রলোক এসেছেন, তিনি ও.সি.র সঙ্গে দেখা করতে চান।

 

শুনে ও.সি. বললেন, “এখন আর এই নিয়ে কোনও কথা নয়।” তারপর সেপাইটির দিকে তাকিয়ে, “ঠিক আছে, ওঁকে এখানে পাঠিয়ে দাও।”

 

বীরেশ্বর সেন খানিক বাদেই ঘরে এসে ঢুকলেন। ও.সি. তাঁকে বসতে বললেন না। শোভন চৌধুরির দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনি তো স্যার এঁরই কথা বলেছিলেন?”

 

শোভন বললেন, “হ্যাঁ, যে বিল্ডিংয়ে আমরা আছি, ইনি তার তিনতলার একটা ফ্ল্যাটে থাকেন। শুনলুম যে, পাড়ার ছেলেরা এঁকে মারধোর করেছে, ফ্ল্যাটে ঢুকতে দিচ্ছে না। এ তো বড় তাজ্জব কথা! কী ব্যাপার বলুন তো?”

 

ও.সি. বললেন, “স্যার, এক হাতে তালি বাজে না। পাড়ার ছেলেদের আমি চিনি, অল পিস-লাভিং ল-অ্যাবাইডিং বয়েজ, এমনি-এমনি মারধোর করার মতো ছেলে নয়! নিশ্চয় এঁরও কিছু দোষ আছে, নইলে কেন নাহক তারা পেটাবে?”

 

বীরেশ্বর সেন কাতর গলায় বললেন, “আমার কিচ্ছু দোষ নেই স্যার।”

 

“চোওপ্!” ও.সি. একেবারে বিকট গলায় খেঁকিয়ে উঠলেন, “দোষ নেই! সাধু সাজা হচ্ছে? আমরা কিছু বুঝি না, অ্যাঁ? ঘাসে মুখ দিয়ে চলি?”

 

শোভন বললেন, “আহাহা, ধরে নিচ্ছি যে উনিই দোষী, কিন্তু…”

 

কথাটা শেষ হবার আগেই বীরেশ্বর ডুকরে উঠলেন, “না স্যার, আমি…”

 

কিন্তু কথা শেষ করতে পারলেন না বীরেশ্বর সেনও। ও.সি. আবার সেই আগের মতোই হাঁকার ছেড়ে বললেন, “চোওপ্! স্যারের মুখে-মুখে কথা! ফের যদি বেয়াদপি করেছেন তো সঙ্গে-সঙ্গে হাজতে পুরে দেব!” তারপর শোভনের দিকে তাকিয়ে, একেবারে অন্য গলায় বললেন, “হ্যাঁ স্যার, কী করতে হবে বলুন।”

 

“বিশেষ কিছু না।” শোভন বললেন, “উনি যদি কথা দেন যে, শান্তিভঙ্গ হতে পারে এমন কিছু করবেন না, তা হলে আর ওঁকে ফ্ল্যাটে ঢুকিয়ে দিতে আপত্তি কী।”

 

ও.সি. বললেন, “সে তো স্যার দু’জন লোক দিয়ে এক্ষুনি ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু পাড়ার ছেলেরা যে-রকম খেপে রয়েছে তাতে ঢুকিয়ে দিলেই যে উনি সেখানে থাকতে পারবেন, তা মনে হয় না।” বলে, বীরেশ্বর সেনের দিকে তাকিয়ে, “কী মশাই, থাকতে পারবেন ওই ফ্ল্যাটে?”

 

বীরেশ্বর বললেন, “থাকতে আমি চাইও না। কিন্তু ঢুকতে তো একবার হবেই। আমার জামাকাপড়, কাগজপত্তর, চেক-বই, সবই তো ওই ফ্ল্যাটের মধ্যে রয়েছে। স্রেফ সেগুলো নিয়ে আমি বেরিয়ে আসব।”

 

শোভন বললেন, “তা হলে আর আপত্তি কীসের। দু’জন লোক দিয়ে দিন। উনি ওঁর জিনিসপত্র বার করে আনুন।”

 

ও.সি. বললেন, “শুনুন বীরেশ্বরবাবু, স্যার যখন বলছেন, তখন আপনাকে ফ্ল্যাটে ঢোকাবার ব্যবস্থা আমি করে দিচ্ছি। কিন্তু কোনও গণ্ডগোল যেন না হয়…। যান, আপনি বাইরে গিয়ে বসুন।”

 

পাঁচ মিনিটের মধ্যেই গাড়ি আর লোকের ব্যবস্থা করে দেওয়া হল। দু’জন আর্মড গার্ড সঙ্গে নিয়ে পুলিশের জিপে উঠে বীরেশ্বর সেন থানা থেকে বেরিয়ে গেলেন। সবটাই যে সাজানো ব্যাপার, সদানন্দবাবু সেটা ঠিকই ধরতে পেরেছিলেন। চাপা গলায় আমাকে বললেন, “নরমে-গরমে বেশ একখানা নাটক দেখা গেল, কী বলেন?”

 

ও.সি. বললেন, “আর কিছু করতে হবে স্যার?”

 

শোভন চৌধুরি বললেন, “সেটা আর আমাকে জিজ্ঞেস করে কী হবে, মিঃ ভাদুড়িকে জিজ্ঞেস করুন।”

 

“আপাতত আর-কিছু করার নেই।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমরা এবারে উঠব। তবে হ্যাঁ, খানিক বাদে একবার হয়তো ফিরে আসতে পারি। শোভন, তুমি যদি ততক্ষণ এখানে থাকো, তো ভাল হয়।”

 

“কতক্ষণ?”

 

“বড়জোর আধঘন্টা। আশা করি, তার মধ্যেই ফেরা যাবে।”

 

ভাদুড়িমশাই আমাদের নিয়ে থানা থেকে বেরিয়ে পড়লেন। রাস্তায় নেমে বললেন, “দুটো গাড়ির তো দরকার হচ্ছে না, একটা এখানেই থাক। চলুন, আমরা এবার একসঙ্গে যাব।”

 

কৌশিক স্টিয়ারিং ধরল। পাশে ভাদুড়িমশাই। পিছনের সিটে আমি আর সদানন্দবাবু। সদানন্দবাবু বললেন, “কোথায় যাচ্চি আমরা?”

 

“বাঃ, এও কি একটা প্রশ্ন হল?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “বীরেশ্বর সেন সত্যিই তাঁর ফ্ল্যাটে ঢুকতে পারলেন কি না, সেটা তো দেখে আসতে হবে। …ওরে কৌশিক, তাই বলে যেন ওই ফ্ল্যাটবাড়ির একেবারে সামনে পার্ক করিস না, গাড়িটা একটু দূরে রাখাই ভাল।”

 

হাইরাইজ বিল্ডিংটা যে-রাস্তায়, সেটা থানার খুব কাছেই। ইতিমধ্যে আমরা সেখানে পৌঁছে গিয়েছিলুম। দেখলুম, পুলিশের গাড়িটাও বাড়ি থেকে একটু দূরেই পার্ক করা হয়েছে। কৌশিক তার ঠিক পিছনেই গাড়ি রেখে, স্টার্ট বন্ধ করে বলল, “তোমরা কি ওই ফ্ল্যাটে যাবে?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা-ই কখনও যেতে পারি? বেলা দেবী আমাদের চিনে ফেললেই তো মুশকিল। ওঁকে বলে এসেছি না যে, অ্যাডভান্সের টাকা দিয়ে যাব? চিনলেই চেপে ধরবেন!”

 

“তা হলে?”

 

“চুপচাপ এই গাড়িতে বসে আমরা বীরেশ্বর সেনের জন্যে অপেক্ষা করব।”

 

বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। মিনিট পাঁচ-সাত বাদেই দেখলুম, হাইরাইজ বিল্ডিংয়ের গেট দিয়ে বীরেশ্বর সেন বেরিয়ে আসছেন। কাঁধে ঝোলা, ডান হাতে একটা সুটকেস। দু’পাশে দু’জন আর্মড গার্ড।

 

গাড়ি থেকে নেমে পড়লেন ভাদুড়িমশাই। বীরেশ্বর সেনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। বললেন, “কোনও গোলমাল হয়নি তো?”

 

“কিচ্ছু না।” বীরেশ্বর সেন হেসে বললেন, “ভিতরে ঢুকলুম, চটপট নিজের দরকারি জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে বেরিয়ে এলুম, বাস। কিচ্ছু গোলমাল হয়নি। …তবে হ্যাঁ, হত। আপনি যদি না শোভনবাবুকে দিয়ে থানায় বলিয়ে সেপাই দু’জনকে সঙ্গে দেবার ব্যবস্থা করে দিতেন, তা হলেই হত। কী আর বলব, খুব কৃতজ্ঞ রইলুম।”

 

“সব জিনিস ওই একটা সুটকেসেই ধরে গেল?”

 

আবার হাসলেন বীরেশ্বর সেন। বললেন, “সব আর নিয়ে এলুম কোথায়? যা না-নিলেই নয়, স্রেফ সেইগুলো…মানে দু’প্রস্ত জামাকাপড়, কিছু ফাইলপত্তর, ব্যাঙ্কের পাশবই আর চেকবুক, বাস্। বাদবাকি সব ফেলে এসেছি, ও আর নেব না।”

 

“এখন তা হলে কোথায় যাবেন?”

 

“কোথায় আর যাব বলুন” বীরেশ্বর সেন কাঁধ ঝাঁকিয়ে ম্লান হাসলেন, “চিৎপুরে একটা আপিস তো রয়েছে, আপাতত সেখানেই যাচ্ছি। এখন দেখি, একটা ট্যাক্সি পাওয়া যায় কি না।”

 

“তা নিশ্চয় পাওয়া যাবে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু তার আগে তো আপনাকে একবার থানায় যেতে হবে।”

 

“কেন?”

 

“বাঃ, আপনার জিনিসপত্র নিয়ে আপনি ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে এসেছেন, থানায় সেটা জানিয়ে যেতে হবে না? নইলে আপনার স্ত্রী যদি কাল থানায় গিয়ে নালিশ করেন যে, নিজের জিনিসের সঙ্গে ওঁরও কিছু দামি জিনিসপত্র হাতিয়ে আপনি সরে পড়েছেন, তা হলে তো আপনি বিপদে পড়ে যাবেন, মশাই।”

 

একটু যেন সন্দেহের ছায়া পড়ল বীরেশ্বর সেনের মুখে। কিন্তু পরমুহূর্তেই তিনি হেসে বললেন, “তাও বটে। ঠিক আছে, আমার জিনিসপত্র নিয়ে আমি বেরিয়ে এসেছি, স্রেফ এইটুকুই জানিয়ে যাওয়া তো, তাতে আর কতক্ষণই বা লাগবে… চলুন।”

 

বীরেশ্বর সেনের হাত থেকে সুটকেসটা নিয়ে নিলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর গাড়ির দরজা খুলে বললেন, “আমাদের গাড়িতেই উঠুন, কষ্ট করে আর পুলিশের ওই লর জিপে আপনাকে উঠতে হবে না।”

 

বীরেশ্বর সেনকে তাঁর পাশের সিটে বসিয়ে নিজের হাতে স্টিয়ারিং নিলেন ভাদুড়িমশাই! সুটকেসটা কৌশিকের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “তোরা তিনজনে পিছনের সিটে বোস।”

 

পুলিশের জিপ আমাদের পিছন পিছন এল। মিনিট কয়েকের মধ্যেই আমরা থানায় পৌঁছে গেলুম।

 

গাড়ি থেকে নেমে সবাইকে নিয়ে ও.সি.র ঘরে ঢুকে, সুটকেসটা টেবিলের উপরে রেখে ভাদুড়িমশাই বললেন, “সুটকেসটা খুলে ওর মধ্যে যা-যা জিনিস আছে তার দুটো লিস্টি করে ফেলুন। একটা লিস্টি নিজেরা রাখুন, অন্যটায় সই করে বীরেশ্বরবাবুকে দিয়ে দিন। ওঁর সেফটির জন্যেই এটা দরকার হচ্ছে। নইলে হয়তো উনি গয়না-টয়না কি অন্য কোনও ভ্যালুয়েল জিনিস নিয়ে এসেছেন বলে ওঁর স্ত্রী এসে ঝামেলা বাধাতে পারেন।”

 

বীরেশ্বর সেনের দিকে তাকিয়ে মনে হল, তাঁর মুখের রক্ত কেউ শুষে নিয়েছে। বললেন, “সুটকেসের মধ্যে কী আছে, সে তো বললুমই। জামাকাপড়, কিছু ফাইল, ব্যাঙ্কের পাশ বই, ডিপোজিট-বই আর চেক-বুক ছাড়া তো ওখান থেকে কুটোটিও আমি আনিনি। তা হলে আর খুলে দেখবার দরকার কী।”

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আরে মশাই, বললুমই তো, আপনার সেফটির জন্যেই এটা দরকার। …ও কী, আপনারা বসে রইলেন কেন, সুটকেসটা খুলুন।”

 

সুটকেসে চাবি দেওয়া ছিল না। ফ্ল্যাট থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসেছেন বলে বোধহয় চাবি দেওয়ার সময়ই পাননি বীরেশ্বর সেন। কিংবা, চাবি দেওয়া যে দরকার, এটাই হয়তো তাঁর মনে হয়নি।

 

ও.সি. তাই খুব সহজেই সুটকেস খুলে ফেললেন। খুলে, জামাকাপড়ের তলায় হাত চালিয়ে যা বার করে আনলেন, তা দেখে আমাদের চক্ষুঃস্থির। সদানন্দবাবু অস্ফুট স্বরে বললেন, “তারা, ব্রহ্মময়ী মা গো!”

 

শোভন চৌধুরির দিকে তাকিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “বুঝলে শোভন, এইজন্যেই তোমাকে বলেছিলুম যে, ফুলকুমারী ঘোষকে এত তাড়াতাড়ি অ্যারেস্ট করাটা ঠিক হয়নি। নাও, এখন গিয়ে মিসেস ঘোষের কাছে ক্ষমা চেয়ে ওঁকে ছেড়ে দাও, আমরাই আমাদের গাড়িতে করে ওঁকে বাড়িতে পৌঁছে দিচ্ছি।”

 

যেমন ধরার তেমন ছাড়ারও কিছু ফর্মালিটি থাকে। সে-সব মিটিয়ে মিনিট দশেকের মধ্যে আমরা গাড়িতে উঠে পড়লুম। একটায় ভাদুড়িমশাই, মিসেস ঘোষ আর সদানন্দবাবু। অন্যটায় কৌশিক আর আমি।

 

শোভন চৌধুরিও আমাদের সঙ্গে আসতে পারতেন। কিন্তু এলেন না! রাস্তা পর্যন্ত এসে বললেন, “এদিককার কিছু কাজ এখনও বাকি রয়েছে। সেগুলো না মিটিয়ে তো যাওয়া যাবে না। আপনারা এগোন, আমি এই ধরুন আধ ঘন্টার মধ্যেই যাচ্ছি। … সাত নম্বর পপলার অ্যাভিনিউ তো? ও আমি চিনে নিতে পারব।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *