একটি হত্যার অন্তরালে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(১২)

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমরা কিন্তু মিঃ মেটার কাছ থেকে আসিনি।”

 

তেজবাহাদুরকে দেখে মনে হল, ভাদুড়িমশাইয়ের কথা শুনে তিনি একটু বিভ্রান্ত বোধ করছেন। এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন, “তা হলে?”

 

“আমরা কলকাতা থেকে আসছি। জেঙ্কিস অ্যান্ড জেঙ্কিস কম্প্যানি সম্পর্কে দু’-একটা খবর চাই!”

 

“সে তো কলকাতায় বসেই জানতে পারতেন। ওদের হেড অফিস তো কলকাতায়।”

 

“ঠিক। কিন্তু কলকাতার আপিসে যে-সব কাগজপত্র ওরা আমাদের দেখিয়েছে, তাতে আমরা খুশি হতে পারিনি। বিশেষ করে ওদের ওয়াইন অ্যান্ড লিকার ডিভিশনের বুক-কিপিংয়ে বড় রকমের কিছু গণ্ডগোল আমাদের চোখে পড়েছে। ফলে সিকিমে না এসে আমাদের উপায় ছিল না।”

 

তেজবাহাদুরের চোখ দেখলুম বড় হয়ে গেছে। বললেন, “আপনারা কি…আই মিন …”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনি ঠিকই আঁচ করেছেন, আমরা একটা ডিটেকটিভ এজেন্সির লোক। সরকারি-বেসরকারি নানান ক্লায়েন্টের হয়ে আমাদের কাজ করতে হয়। এক্ষেত্রে ভারত সরকারের ইনকাম ট্যাক্স ডিপার্টমেন্টের হয়ে কিছু খোঁজ-খবর করতে এসেছি।”

 

“কিন্তু জেঙ্কিস অ্যান্ড জেঙ্কিস কম্প্যানি সম্পর্কে আমি তো কিছুই জানি না।”

 

“আমরা যা জানতে চাই, তা বোধহয় জানেন।”

 

“যেমন?”

 

“যেমন ধরুন, এখানে ওদের ডিস্টিলারিটা যেখানে বসানো হয়েছে, সেটা কার জমি? এটা জানেন “নিশ্চয়?”

 

“তা কেন জানব না, ওটা আগে আমার দাদামশাইয়ের ছিল।”

 

“কী রকমের জমি?”

 

“প্রাইম ল্যান্ড। তার উপরে টোটাল এরিয়াও নেহাত কম নয়। ফিফ্‌টি একার্স তো হবেই, কিছু বেশিও হতে পারে।”

 

“আপনার দাদামশাই কি পরে ওটা কারও নামে ট্রান্সফার করে দিয়েছিলেন?”

 

“রাইট। ফিফটিফাইভে উনি ওটা আমার আন্টির নামে ট্রান্সফার করে দেন। তার কিছুদিন বাদে আন্টি ওটা লিজ দেন জেঙ্কিস অ্যান্ড জেসি কম্প্যানিকে। ফর নাইনটিনাইন ইয়ার্স। … কিন্তু এ-সব কথা আপনি আমাকে জিজ্ঞেস করছেন কেন? গ্যাংটকের রেজিস্ট্রি অফিসে গেলেই তো জানতে পারতেন।”

 

“তা পারতুম ঠিকই,” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “তবে তাতে আরও সময় লাগত। তা ছাড়া, এই যে আপনাদের বাড়িতে এলুম, আপনার সঙ্গে আলাপ হল, এটাও সে-ক্ষেত্রে হত না।”

 

“আপনারা এখানে কোথায় উঠেছেন?” একটু কুণ্ঠিত গলায় তেজবাহাদুর বললেন, “মানে আর-কিছু নয়, কথাটা এইজন্যে জিজ্ঞেস করছি যে, আমার এখানেই থাকতে বলতে পারতুম, কিন্তু আপনাদের অসুবিধে হবে, এত বড় বাড়ি, কিন্তু লোকজন তো নেই, একটা চাকর ছিল, সে-ই রান্নাবান্না করে দিত, এদিকে সেও তার গ্রামের বাড়িতে চলে গেছে, ক’দিন ধরে আসছে না, তাই…”

 

কথাটা শেষ না-করেই তেজবাহাদুর চুপ করে গেলেন।

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ও নিয়ে ভাববেন না, আমরা নামচিতে আছি, এদিককার কাজ মিটিয়ে রাত্তিরে ফের সেখানেই ফিরে যাব। …একটা কথা জিজ্ঞেস না করে পারছি না, অফ কোর্স ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, আপনি বিয়ে করেননি?”

 

“না।” উত্তরটা দিয়েই, পাছে এই নিয়ে আবার কোনও প্রশ্ন ওঠে, মনে হল যেন সেইজন্যেই প্রসঙ্গটাকে চাপা দিতে তেজবাহাদুর বললেন, “গ্যাংটক তো এখান থেকে খুব কাছেই, আপনারা সেখানে একবার যাবেন না?”

 

“তা একবার যেতেই হবে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু তার আগে আর-একটা কথা জিজ্ঞেস করি। আপনি জানতে চেয়েছিলেন যে, আমরা মিঃ মেটার কাছ থেকে আসছি কি না। তা এই ভদ্রলোকটি কে?”

 

তেজবাহাদুর হেসে বললেন, “মিঃ যুগলকিশোর মেটা। প্রোমোটার। গ্যাংটকে গোটাকয়েক হাইরাইজ বিলডিং বানিয়েছে। কিন্তু ওখানে আর জমি জোগাড় করতে পরছে না। তাই…”

 

“তাই এখন রানিপুলের দিকে নজর পড়েছে, কেমন?”

 

“ঠিক তা-ই। বাড়িসুদ্ধু আমাদের এই জমিটা কিনতে চায়। টাকাও এখনকার বাজার দরের চাইতে অনেক বেশিই অফার করেছে। কিন্তু প্রপার্টি তো আমার একার নয়। দাদামশাইয়ের দুই মেয়ের আমার মায়ের আর আমার মৌসির। মায়ের অংশটা আমি পেয়েছি।”

 

“সেটা কেন বিক্রি করছেন না?”

 

“অসুবিধে আছে। মেটা তো মাত্র একটা হাইরাইজ বিলডিং বানাতে চাইছে না, সে চাইছে হাইরাইজ বিলডিংয়ের একটা পুরো কমপ্লেক্স বানাতে। পশ্ কমপ্লেক্স। তাতে একটা সুইমিং পুলও থাকবে। তো তার জন্যে পুরো জমিটা চাই, আর আমাদের এই পুরনো বাড়িটাও ভেঙে ফেলা চাই। কিন্তু বাড়িটাও তো জয়ন্ট প্রপার্টি। যেমন আমার, তেমন আমার আন্টির। তিনি রাজি না হলে এ-সব হবে কী করে?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ধরুন আপনার আন্টি রাজি হয়ে গেলেন। কিন্তু বাড়িটা যদি ভেঙে ফেলা হয়, তো আপনি থাকবেন কোথায়?”

 

“সে যা-হয় একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।” তেজবাহাদুর বললেন, “মেটা তো বলছে, যেমন টাকা, তেমন আমার পছন্দমতো একটা ফ্ল্যাটও দিয়ে দেবে। সেটা নিতে পারি, কিংবা এখানেই একটা ছোটখাটো বাড়ি কিনে নিতে পারি। আমি একা মানুষ, এত বড় বাড়ির কোনও দরকারই আমার নেই। ইন ফ্যাক্ট, এই প্রপার্টি মেনটেন করতেই তো আমার দম বেরিয়ে যাচ্ছে।”

 

প্রপার্টি যে ঠিকমতো মেনটেনড হচ্ছে না, সে তো জমির সর্বত্র জঙ্গলে ঘাস আর বাড়ির হাল দেখেই আমরা বুঝতে পেরেছিলুম। ড্রয়িংরুমের অবস্থাও সঙ্গিন। চেয়ারের হাতল ভেঙেছে, সোফার কভার ছিঁড়ে বেরিয়ে পড়েছে নারকোলের ছোবড়া। আর স্প্রিং। মেঝেয় ধুলো। দেওয়ালে মাকড়শার জাল।

 

কিছুক্ষণ চুপচাপ কাটল। তারপর ভাদুড়িমশাই বললেন, “ব্যক্তিগত একটা প্রশ্ন করি, মিঃ গুড়ুং। ইচ্ছে হলে আপনি উত্তর নাও দিতে পারেন। আপনার কি টাকার খুব অভাব?”

 

তেজবাহাদুর বললেন, “খুবই অভাব। কতটা অভাব, এ-তল্লাটের সবাই সেটা জানে। এমনকি আমার চাকরটাও বোধহয় জেনে গেছে। মনে হচ্ছে সে-ব্যাটা আর ফিরবে না।”

 

“এতটা অভাব হল কেন? আপনার মায়ের কাছ থেকে এই প্রপার্টির অর্ধেক অংশ ছাড়া কি আর কিচ্ছু পাননি আপনি?”

 

“তা কেন পাব না?” তেজবাহাদুর আবার হাসলেন, “টু বি ফেয়ার টু দ্যাট গ্র্যান্ড ওল্ড ম্যান… আই মিন মাই গ্র্যান্ডফাদার…তিনি তাঁর তাবৎ সম্পত্তি তাঁর দুই মেয়ের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে দিয়েছিলেন। মৌসি যেমন টাকাকড়ি পেয়েছিলেন, তেমন আমার মা’ও পেয়েছিলেন। মৌসির মতো আমার মা’ও পেয়েছিলেন দেড়শো বিঘে প্রাইম ল্যান্ড। গয়নাগাঁটিও পেয়েছিলেন বই কী। কিন্তু সে-সবই বিক্রি হয়ে গেছে। স-ব। থাকবার মধ্যে এই বাড়িটাই শুধু আছে। আর হ্যাঁ, বাড়ির লাগোয়া এই জমি। আর কিচ্ছু নেই।”

 

“এখন এটাও যদি না বিক্রি করতে পারেন তো আপনি খুব অসুবিধেয় পড়ে যাবেন, তাই না?”

 

“অসুবিধে মানে স্রেফ না-খেয়ে মরতে হবে। কিন্তু বিক্রি যে করব, তার জন্যে তো আমার আন্টির পারমিশান চাই। বাট শি ইজ আ টাফ্ উয়োম্যান, পারমিশান দিচ্ছেন না। এই নিয়ে অন্তত তিনখানা চিঠি তাঁকে লিখেছি। একটারও উত্তর পাইনি।”

 

তেজবাহাদুরের আন্টি যে কে, তা তো আমরা জানিই। কিন্তু, জানা সত্ত্বেও, এতক্ষণ আমরা মুখ খুলিনি। তবে সদানন্দবাবু আর কাঁহাতক চুপ করে থাকবেন। চুপ করে বসে থাকতে-থাকতে তাঁর পেট ফুলে যাচ্ছিল নিশ্চয়। তাই আর মুখ না-খুলে পারলেন না। বললেন, “আপনার আন্টি তো মিসেস ফুলকুমারী ঘোষ, তাই না?”

 

চমকে উঠে তেজবাহাদুর বললেন, “আপনারা কী করে জানলেন?”

 

অবস্থাটা সামলে নেবার জন্যে ভাদুড়িমশাই বললেন, “এই রানিপুলে এসে একটু আগে যখন আপনাদের বাড়ির খোঁজ করছিলুম, তখন এক বুড়ো ভদ্রলোকের কাছে শুনলুম। ভদ্রলোক বাঙালি, জেঙ্কিস অ্যান্ড জেঙ্কিসের ডিস্টিলারিতে ওঁর ছেলে নাকি কী কাজ করে, হয়তো সেই সূত্রেই আপনাদের রিলেশানের কথাটা শুনে থাকবেন।”

 

আর কথা না বাড়িয়ে আমরা উঠে পড়লুম। বাইরে এসে ভাদুড়িমশাই ইন্দ্রবাহাদুরকে বললেন, “গ্যাংটকে যাব।”

 

গ্যাংটকের সৌন্দর্যের নাকি তুলনা হয় না। শহরটা নাকি একেবারে ছবির মতো। অ্যাদ্দিন অন্তত এই কথাই শুনে এসেছি। বাস্তবে দেখলুম, এর অনেক এলাকাই দার্জিলিংয়ের বাজার-অঞ্চলের চেয়েও ঘিঞ্জি। বড়-বড় বাড়ি, প্রচুর দোকানপাট, রাস্তায়-রাস্তায় যেমন মানুষ তেমন গাড়ির ভিড়। মনে হল, গোটা জায়গাটাই যেন ক্রমে-ক্রমে একটা বড়বাজার হয়ে উঠছে। একটা পার্বত্য শহরের যেটা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, সেটা যে এর ফলে একেবারে নষ্ট হবার উপক্রমে হয়েছে সেই বোধটাই যেন কারও নেই। বিশেষ করে যারা এখানে বাইরে থেকে এসেছে, শহরটাকে তারা ব্যবহার করছে স্রেফ পয়সা রোজগারের ধান্ধায়।

 

শহরের এখানে-ওখানে গোটাকয়েক চক্কর মারবার পরে নাম নং রোডে হোটেল তাসির সামনে গাড়ি থামানো হল। ভাদুড়িমশাই এর আগেও দু’তিনবার গ্যাংটকে এসেছেন। এটা তাঁর চেনা হোটেল; তাঁরই কাছে শুনলুম যে, এখানে বাঙালি খানা পাওয়া যায়। হোটেলের কর্তার পদবি যে বসু, এইটে শুনে সদানন্দবাবু বললেন, “তবে তো এঁয়ারা আমার আত্মীয় বললেই হয়।”

 

দুপুরের খাওয়া মিটবার পরে ভাদুড়িমশাই তাঁর চেনা এক ভদ্রলোককে ফোন করলেন। তারপর নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, “তিনটে বাজে। একটু বিশ্রাম করে নিন। চারটে নাগাদ আমরা মিঃ দোর্জির বাড়িতে যাব।”

 

বললুম, “আপনার বন্ধু?”

 

“না, বন্ধু নয়, বন্ধুর বাবা। রিটায়ার্ড কর্নেল দুর্গাবাহাদুর দোর্জির কথা মনে আছে?”

 

“তা আছে বই কী। রিটায়ার করার পরে ব্যাঙ্গালোরে বাড়ি করেছেন। আপনিই আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন। চমৎকার মানুষ।”

 

“ইনি তাঁর বাবা বিক্রমবাহাদুর দোর্জি।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “এককালে প্যালেসে কাজ করতেন। ভদ্রলোকের বয়েস অন্তত নব্বই বছর। দুর্গার কাছে শুনেছি, কানে একটু কম শোনেন, তবে অন্য কোনও সমস্যা নেই। দিব্যি ফিট আছেন।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *