এগারোর অঙ্ক (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
মিস প্যাটির খদ্দের
অরিজিৎ লাহিড়ীর গাড়ি কাটায় কাটায় এগারোটায় এসেছিল। তার মুখে উত্তেজনা ও কৌতূহল থমথম করছিল। কর্নেল তার প্রশ্নের জবাবে শুধু বললেন, তোমাকে একজন মেন্টাল পেসেন্টের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব। বাকিটা তুমি ডাঃ ভাদুড়ীর মুখে শুনবে। তারপর গাড়ি স্টার্ট দিয়েছেন অরিজিৎ, সেই সময় কেউ চেঁচিয়ে উঠল, কর্নেল স্যার! কর্নেল স্যার!
কর্নেল ঘুরে দেখেন, সবে একটা ট্যাক্সি থেকে নেমে গোয়েন্দা কৃতান্ত হালদার ভাড়া মেটাতে মেটাতে চেরা গলায় ক্রমাগত চ্যাঁচাচ্ছেন, কর্নেল স্যার! কর্নেল স্যার!
কাছে এসে ডিসি ডিডিকে দেখে প্রাক্তন অভ্যাসে খট করে দাঁড়িয়ে সেলাম ঠুকে কৃতান্ত হালদার একগাল হাসলেন। আশাতীত গৌভাগ্য স্যার! দুজনকেই একত্র পেয়ে গেলাম। আর একটু হলেই মিস করতাম।
কর্নেল বললেন, আপনি সেতাপগঞ্জ যাননি?
সেখান থেকেই তো ফিরছি। কাল রাত নটা দশে ট্রেন ছেড়েছে, হাওড়া পৌঁছুলো দশটায়। উঃ! ছ্যাকরা গাড়িরও অধম।
কর্নেল ছিলেন সামনের দিকে। পেছনের দরজা খুলে দিয়ে বললেন, আসুন!
কৃতান্তবাবু গাড়িতে ঢুকে আরাম করে বসে বললেন, আপনারা কোথায় যাচ্ছেন স্যার?
জবাবটা অরিজিৎ দিলেন। পাগলাগারদে হালদারবাবু! ভেবে দেখুন, কী। করবেন।
খিকখিক করে হাসলেন কৃতান্তবাবু। তা যা বলেছেন স্যার! পাগল করে ছাড়লে ব্যাটারা। বিস্তর ক্রিমিন্যাল ঘেঁটেছি, এমন সাংঘাতিক ক্রিমিন্যাল কখনও দেখিনি!
কার কথা বলছেন হালদারবাবু?
আজ্ঞে, সেতাপগঞ্জের ইন্দু ভট্টাচার্য। আপনি চেনেন কী না জানি না, কর্নেল স্যার চেনেন। উঃ, রোগা মেয়েটাকে আমার চোখের সামনে চাবুক মেরে ফ্ল্যাট করে দিল–চোখে জল এসে যাচ্ছিল স্যার! কিন্তু উপায় ছিল না। তখন আমি বেকায়দায় আছি। সাধুর ছদ্মবেশে। মাথায় জটা, পরনে গেরুয়া একটুকরো বস্ত্র। এদিকে মশার কামড়, বৃষ্টি। বাস্!
কর্নেল ঘুরে তাকালেন কৃতান্তবাবুর দিকে। তখন কৃতান্তবাবু বললেন, হ্যাঁ, গোড়া থেকেই বলছি। সে এক সাংঘাতিক এক্সপিরিয়েন্স বলতে গেলে। গেলাম রহস্যের জট ছাড়াতে–তো আরও জট বেধে গেল। হাল ছেড়ে দিয়ে চলে এলাম।
কৃতান্ত হালদার সবিস্তারে বলতে শুরু করলেন। ট্যাংরায় ডাঃ ভাদুড়ীর মেন্টাল ক্লিনিকের গেটে তার বিবরণ মোটামুটি শেষ হল। তবে বিশ্লেষণ বাকি থেকে গেল। কথা দিলেন, ফেরার পথে তার বিশ্লেষণ-ভিত্তিক থিওরি তুলে ধরবেন। অরিজিৎ রসিকতা করে বললেন, আপনাকে আমরা এখানে রেখে যাব ভাবছি হালদারবাবু!
কৃতান্ত হালদার মনে বেজায় রুষ্ট। কিন্তু মুখে হাসি ফুটিয়ে বললেন, তাহলে তো বেঁচে যাই স্যার! পাগল হওয়ার চেয়ে সুখ নেই।
তাহলে আপনার ডিটেকটিভ এজেন্সির কী হবে?
কৃতান্তবাবু কী জবাব দিতে যাচ্ছিলেন, ডাঃ ভাদুড়ী অভ্যর্থনা করতে আসায় বাধা পড়ল। মনে মনে যথেষ্ট অপমানিত ও ক্ষুব্ধ হয়েই রইলেন কৃতান্ত হালদার। তবে আসার সময় সেতাপগঞ্জ স্টেশনের পাবলিক বুথ থেকে থানায় ফোন করে এসেছেন, রুদ্রে রায়চৌধুরিকে যে ছুরি দিয়ে খুন করা হয়েছিল, সেটা বসন্তনিবাসের বাগানে এখনও পড়ে আছে। শিগগির গেলে সেটা পাওয়া যাবে। আর রুদ্ৰেন্দুবাবুর বড় মেয়েকে জেরা করলেই বেরিয়ে পড়বে আসল কথাটা। নিজের নামধাম বলেননি কৃতান্ত হালদার। শুধু বলেছেন, আমি পুলিশের বন্ধু। দেখা যাক, বিহার ভার্সেস পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের মধ্যে বেধে যায় নাকি। বাধা উচিত। কারণ, মেয়েটা সম্ভবত জানে, একই লোক তার বাবাকে আর বোনকে খুন করেছে। ভর ওঠার সময় আমি খুন করেছি বলছিল বারবার। ওর ওই আমিটা কে, জেরার মুখে বেরিয়ে পড়বেই। আমি নিয়েই যত রহস্য। তবে সে আর যেই হোক, কখনো হিমাদ্রি রায় নয়।…
ডাঃ ভাদুড়ী অফিসে নিয়ে গিয়ে বসালেন। তারপর বললেন, আজ সকাল থেকে পেসেন্টের অবস্থা কিছুটা ভাল। রাতে বিশেষ ডিসটার্ব করেনি। একটু আগে দেখলাম, শুয়ে বই পড়ছে।
অরিজিৎ গম্ভীর। কর্নেল বললেন, ডাঃ ভাদুড়ী, ডি সি সাহেবকে তাহলে ব্যাকগ্রাউন্ডটা শুনিয়ে দিন।
অরিজিৎ তাকালেন। ডাঃ ভাদুড়ী বললেন, কফি আসুক। আপনার রকমসকম তো জানি। কফি না হলে আপনার ব্রেন খোলে না। আর কৈ, একটা বিখ্যাত চুরুট দিন। আমিও ঘিলুকে চাঙ্গা করে নিই।
কফি এসে গেল প্রায় সঙ্গে সঙ্গে। বলা ছিল আগে থেকে। চুরুট টানতে টানতে ডাঃ ভাদুড়ী শুরু করলেন তার এক পেসেন্ট মিস প্যাটির কাহিনী। সবিস্তারে–বেশ খানিকটা রঙ চড়িয়েই।
অরিজিৎ নিষ্পলক তাকিয়ে শুনছিলেন। কফি ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। চুমুক দিতে ভুলে গিয়েছিলেন। এবার ঠাণ্ডা কফি গিলে নিয়ে বললেন, কিন্তু লোকটা কে, সেটাই তো বোঝা যাচ্ছে না।
ডাঃ ভাদুড়ী বললেন, একমিনিট। এখনও শেষ করিনি।
বলুন।
কর্নেল আমাকে গতকাল একটা ছবি দিয়ে বলেছিলেন, ছবিটা মিস প্যাটিকে দেখিয়ে ওর রিঅ্যাকশন, যেন লক্ষ্য করি। শুনলে অবাক হবেন, ছবি দেখা মাত্র প্যাটি ভায়লেন্ট হয়ে উঠল। তারপর অজ্ঞান হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পরে জ্ঞান হলে ফিস ফিস করে বলল, লোকটা আছে, না চলে গেছে?
দেখি ছবিটা।
ড্রয়ার থেকে, ডাঃ ভাদুড়ী ছবিটা বের করে একটু হাসলেন। আপনাকে একটু স্টান্ট দেব স্যার, অপরাধ নেবেন না। প্লিজ, আসুন আমার সঙ্গে। প্যাটিকে আলাদা একটা কেবিনে রেখেছি কাল থেকে। কারণ ভয় ছিল, ছবিটা দেখার পর ওর আরও কিছু রিঅ্যাকশন দফায় দফায় ঘটতে পারে। অন্য পেসেন্টের ক্ষতি করতে পারে।
লম্বা করিডোরের শেষ প্রান্তে একটা ঘরে নিয়ে গেলেন ডাঃ ভাদুড়ী। দরজা বাইরে থেকে লক করা আছে। চাপা গলায় বললেন, বারণ করা ছিল কেউ যেন ভুলেও দরজায় নক না করে। দরকার হলে সাবধানে যেন নিঃশব্দে দরজা খুলে ঢোকে। কিন্তু এবার আমি নক করতে চাই। দেখা যাক, কী ঘটে।
বলে ডাঃ ভাদুড়ী কপাটে তিনবার নক করলেন। সঙ্গে সঙ্গে ভেতর থেকে চিৎকার শোনা গেল, নো নো! গো ব্যাক ইউ সোয়াইন! গো ব্যাক! ইউ সন অফ এ বিচ… ডার্টি ডগ… গো ব্যাক অর আই কিল ইউ। তারপর কান্নাজড়ানো গলা–অ্যান্টি! অ্যান্টি! হেল্প মি প্লিজ! হে হে হে! তারপর সব চুপ।
দরজা প্রায় নিঃশব্দে খুলে প্রথমে ঘরে ঢুকলেন ডাঃ ভাদুড়ী। তারপর অরিজিৎ ও কর্নেল। দরজার কাছে ভয়েভয়ে উঁকি মেরে রইলেন কৃতান্তবাবু।
বিছানায় কাত হয়ে পড়ে আছে একটা অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান মেয়ে-রোগা লম্বাটে গড়ন। পা দুটো কাঁপছে। দুহাতের নিজের গলাটা আঁকড়ে ধরে আছে। ডাঃ ভাদুড়ী ডাকলেন, মিস প্যাটি! জাস্ট লুক! মিস প্যাটি! ডোন্ট বি অ্যাফ্রেড, প্লিজ! লুক!
পিঠে হাত রেখে ওকে ঘুরিয়ে চিত করে দিলেন। মিস প্যাটি চোখ পিটপিট করে তাকাল। তারপর উঠে বসল। প্রত্যেকটা মুখের দিকে তাকিয়ে নিয়ে সে যেন আশ্বস্ত হল। তারপর কর্নেলের দিকে তাকিয়ে হুহু করে কেঁদে উঠল, ফাদার! সেভ মি ফাদার! আই অ্যাম এ সিনার! ও ফাদার, আই কনফেস!
পেছন থেকে কৃতান্তবাবু ফিসফিসিয়ে উঠলেন, কর্নেলকে পাদ্রীবাবা ভেবেছে। খি খি খি!
অরিজিৎ ঘুরে চোখ কটমটিয়ে তাকালে কৃতান্তবাবু গম্ভীর হলেন। কর্নেল প্যাটির বিছানায় বসে যথার্থ পাদ্রীর ঢঙে ইংরেজিতে বললেন, আমি তোমাকে চার্চে নিয়ে যাব, বাছা! কিছু ভেবো না। আর শোনো, আলাপ করিয়ে দিই। ইনি। হলেন কলকাতা গোয়েন্দা পুলিশের বড়কর্তা। যে লোকটা রোজ এসে তোমার দরজা নক করত আর তুমি দরজা খুললেই তোমার মুখ চেপে ধরে গলায় ছুরির উল্টোপিঠটা ঘসত, তাকে উনি পাকড়াও করে ফেলবেন।
প্যাটি অরিজিৎকে দেখছিল। অরিজিৎ বললেন, হ্যাঁ, তাকে আমরা শিগগির পাকড়াও করছি, মিস প্যাটি!
কর্নেল বললেন, তুমি কি লোকটাকে চিনিয়ে দিতে পারবে, মেয়ে?
প্যাটি আস্তে মাথা দোলাল।
কর্নেল ডাঃ ভাদুড়ীর হাত থেকে ছবিটা নিয়ে বললেন, তাহলে তুমি এবার বলো, এই ছবির লোকটাই সেই লোক কি না।
প্যাটিকে ছবিটা দেখাতেই সে দুহাতে মুখ ঢেকে চেঁচিয়ে উঠল, ও নো নো! ওকে তোমরা এক্ষুণি জেলে পাঠাও। নৈলে ও আমার শ্বাসনালী কেটে ফেলবে।
কর্নেল একটু হেসে ছবিটা অরিজিতের হাতে হাতে গুঁজে দিয়ে বললেন, তাহলে এবার আশা করি তুমি শ্রীমতী ঊর্মির খুনীকে গ্রেফতারের হুকুম দেবে, অরিজিৎ!
অরিজিৎ ছবিটা দেখেই চমকে উঠলেন। অন্য কাউকে দেখার আশাই করছিলেন এতক্ষণ। শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে বলে উঠলেন, ও মাই গড! এ যে দেখছি মৃগাঙ্ক ব্যানার্জি! আর সঙ্গে সঙ্গে কৃতান্ত হালদার মাটিছাড়া হয়ে প্রায় চাঁচালেন, আমি জিতে গেছি। আমি জিতে গেছি!
