এগারোর অঙ্ক (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
সাইকিয়াট্রিস্ট ডাঃ ভাদুড়ী
কিছুক্ষণ আগে সেতাপগঞ্জ থেকে সুনেত্রা ট্রাঙ্ককল করেছে। হিমাদ্রি ওখানে আছে শুনে একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেছেন কর্নেল। বলেছেন, ওকে বাড়ি থেকে বেরুতে বারণ কোরো। আমি আগামীকাল যে-কোনো সময় পৌঁছচ্ছি। হাতে কিছু জরুরি কাজ আছে। সুনেত্রার চিঠিটা পেঁছুল এর ঘণ্টাখানেক পরে। সমস্ত ব্যাপারটা বড়বেশি জট পাকিয়ে গেল। ঊর্মি নাকি সুনেত্রাকে লিখেছিল, ওর বাবার হত্যাকাণ্ডের পেছনে ইন্দুমাধব ভট্টাচার্যির হাত আছে। থাকা বিচিত্র নয়। কিন্তু হত্যার পদ্ধতি হুবহু এক। এটাই গণ্ডগোল করে ফেলছে সব। ঊর্মির হত্যাকারীর সঙ্গে তার বাবার হত্যাকারীর কোথায় একটা গরমিল।
রুদ্রেন্দুপ্রসাদ রায়চৌধুরির চিঠিটা বের করে তাকিয়ে রইলেন সেদিকে। ..কাউকে বিশ্বাস হয় না, তাই এই চিঠি।… ইন্দু ভটচাযকেও না? তাই তো মানে দাঁড়ায়।
তার চেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার, চিঠিটা এতদিন পরে কে ডাকে দিয়েছিল? ওঁর মেজমেয়ে ঊর্মিও কলকাতার ফ্ল্যাটে একইভাবে খুন হওয়ার ঠিক পরেই কেউ চিঠিটা ডাকে দিয়েছিল। এও একটা পয়েন্ট।
হুঁ, হিতাকাঙ্ক্ষী কেউ। যার কাছে মনে হয়ে থাকবে এর একটা আস্কারা করার দরকার আছে। সে কর্নেল নীলাদ্রি সরকার সম্পর্কে খবর না রাখুক, অন্তত এটুকু জানে রুদ্রেন্দুবাবু যাকে এভাবে চিঠি লিখতে চেয়েছিলেন, তার ওপর ভরসা রাখা যায়। তাই সে চিঠিটা ডাকে দিয়েছে। সে কি ভেবেছে হত্যাকারী একজনই?
ঊর্মির হত্যাকাণ্ড না ঘটলে রুদ্রেন্দুবাবুর চিঠিটা পেয়েই ছুটে যেতেন সেতাপগঞ্জে। ভেবেছিলেন, ঊর্মির হত্যাকাণ্ড থেকে এমন কোনো সূত্র পাবেন, যা রুদ্রেন্দুবাবুর হত্যাকাণ্ড রহস্যের মীমাংসা করে দেবে। কিন্তু কৃতান্ত হালদারের অবাঞ্ছিত টেলিগ্রামটা একটা বাড়তি গেরো পাকিয়ে দিয়েছে।
বারো জুলাই সকালে কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা দফতর ট্রাঙ্ককল করে বোম্বের ডিলাইট হোটেলে মৃগাঙ্ক ব্যানার্জিকে তার স্ত্রীর মৃত্যুসংবাদ দিয়েছিল। ফোনটা করেছিলেন ইন্সপেক্টর মোহনবাবু। মোহনবাবু কর্নেলকে বলেছেন, মৃগাঙ্কবাবুই ফোনে কথা বলেছেন, তাতে তার সন্দেহ নেই। কেন সন্দেহ নেই, তার স্পষ্ট জবাব মোহনবাবু দিতে পারেননি। শুধু বলেছেন, আই অ্যাম, কনভিড়।
কর্নেল সুনেত্রার চিঠিটা খুললেন আবার। ডানায় হলুদ-লাল ফুটকিওয়ালা প্রজাপতি আর উড-ডাকের লোভ দেখিয়েছে। মন চঞ্চল হয়ে উঠেছে। কিন্তু হাতে একটা জরুরি কাজ বাকি। সেটা চুকে গেলেই নিঃসংশয় হবেন ঊর্মির হত্যাকারী সম্পর্কে। বিকেলের মধ্যেই আশা করছেন সেই মূল্যবান তথ্যটা পেয়ে যাবেন।
সুনেত্রার চিঠির একটা অংশে আবার চোখ রাখলেন। ..ঊর্মির দিদির ভর ওঠার ব্যাপারটাও আপনার চিন্তার খোরাক যোগাবে। ভরের সময় ওর চেহারা কী ভীষণ বদলে যায়। একেবারে রাক্ষুসীর মুর্তি। আপনি যে অত সাহসী, আপনিও ভয় পেয়ে যাবেন। আমার মনে হয়, তখন যদি ওর হাতে ছুরি থাকে, খুন করে ফেলবে। তাই ভর উঠলে ও বাড়ির লোকেরা খুব সাবধান হয়ে যায়। কাউকে কাছে যেতে দেয় না। তখন ওকে একজনই সামলাতে পারে। সে দয়াল ঠাকুর। ওবাড়ির রাঁধুনী। দয়ালকে দেখলে শ্রাবন্তীর ভর থেমে যায় নাকি।…
চিঠি দুটো টেবিলের ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রেখে কর্নেল বেরুলেন।
পার্ক স্ট্রিটে একটা প্রকাণ্ড পুরনো বাড়ির দোতলায় ডাঃ অশোক ভাদুড়ীর চেম্বার সুস্থ মন। নামকরা সাইকিয়াট্রিস্ট ডাক্তার। ট্যাংরায় ওঁর মেন্টাল ক্লিনিক। এখানে একটা চেম্বার রেখেছেন। সকাল-সন্ধ্যা ঘণ্টাচারেক করে বসেন।
কর্নেলকে দেখে লাফিয়ে উঠলেন। হ্যালো ওল্ড বস! ঘিলু বিগড়ে গেল নাকি?
গেছে।
ডাঃ ভাদুড়ি হাসিখুশি মানুষ। হো হো করে হাসলেন। আবার কোন পাগল খুনখারাপি করেছে বুঝি? সাবধান কর্নেল! পাগলের পেছনে এ বয়সে আর ছোটাছুটি করবেন না।
কর্নেল বসে বললেন, একটা কথা জানতে এলাম ডাঃ ভাদুড়ি।
কর্নেলের গম্ভীর মুখ দেখে ডাঃ ভাদুড়ী সিরিয়াস হলেন। …বলুন, বলুন।
এই যে দেবদেবীর ভর-ওঠা ব্যাপারটা কী আসলে?
আপনি বিজ্ঞ মানুষ, কর্নেল! আপনি আমার মতামত জানতে চাইছেন? ডাঃ ভাদুড়ী হাত বাড়িয়ে বললেন, কৈ, আগে একটি বিখ্যাত চুরুট দিন। এতক্ষণ দুডজন মেন্টাল পেসেন্ট ঘাঁটাঘাঁটি করে ঘিলু জ্যাম হয়ে গেছে। অনেকসময় ধোঁয়া ঘিলুকে চাঙ্গা করে। গ্রামের ওঝারা হিস্টিরিয়ার পেসেন্টের নাকে ঝঝাল ধোঁয়া ঢুকিয়ে দেয়। ব্যস! পেসেন্ট তখন দিব্যি নর্মাল।
চুরুট দিয়ে লাইটারে আগুন ধরিয়ে দিলেন কর্নেল। পকেট থেকে একটা আধপোড়া চুরুট বের করে নিজেও ধরিয়ে নিলেন। তারপর বললেন, ভর ওঠার ব্যাপারটাও কি হিস্টিরিয়া ডাঃ ভাদুড়ী?
আলবাৎ হিস্টিরিয়া। তবে এসব কেস কমন হিস্টিরিয়া নয়। হিস্টেরো এপিলেন্সির ঠিক বিপরীত একটা অবস্থা। এপিলেন্সির ফিটে রোগীর সব লক্ষণই প্রায় শারীরিক প্রক্ষোভ। হিস্টিরিয়ায় শারীরিক প্রক্ষোভের সঙ্গে মানসিক প্রক্ষোভও থাকে। কিন্তু মানসিক প্রক্ষোভের মধ্যে অস্পষ্টভাবে সচেতন মনের নিয়ন্ত্রণও বজায় থাকে। হিস্টেরো-এপিলেন্সিতে
ভর ওঠার কথা বলুন প্লিজ!
সেই বলতে যাচ্ছি। হিস্টিরিয়া হয় কাদের? যাদের নার্ভ-সিস্টেম দুর্বল, আত্মসচেতন, অনুভূতিপ্রবণ, নিজের প্রাপ্য সম্পর্কে সতর্ক, কল্পনাপ্রবণ, বড় বেশি আশা করে থাকে, অথচ ভেতর-ভেতর ভিতু। এ জন্য মেয়েদের মধ্যেই এর প্রকোপ বেশি। এমন পুরুষ নিশ্চয় অসংখ্য আছে। কিন্তু সমাজ পুরুষশাসিত বলে তাদের ওইসব মানসিক বৃত্তি চরিতার্থ হবার সুযোগ পায়। মেয়েরা পায় না। আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে বলব, কামনা-বাসনার অবদমন ঘটাতে বাধ্য হয় মেয়েরা। দিনের পর দিন অবদমিত কামনা-বাসনা জমতে জমতে একসময় যেন বিস্ফোরণ ঘটে।
প্লিজ, ভর ওঠার ব্যাপারটা…
তাই তো বলছি। কোনো আকস্মিক সাংঘাতিক ঘটনার অভিজ্ঞতা অনেকক্ষেত্রে হিস্টিরিয়ার কারণ হতে পারে। আচমকা প্রচণ্ড ভয় পেয়েও এ অসুখ হতে পারে। আবার প্রচণ্ড শোক বা দুঃখ কোনো কারণে চেপে রাখলেও হতে পারে। তো ভর ওঠার ব্যাপারটা আরও জটিল একটা প্রক্রিয়া। প্রকৃতি মানুষের মনেই একটা ব্যবস্থা রেখেছে। স্বপ্ন দেখার মতোই। হিস্টিরিয়ার একটা পর্যায়ে অবদমনকে অসচেতন মনের একটা স্বতশ্চল প্রক্রিয়া বেরিয়ে যেতে দেয়। অনেকটা মুক্তি ঘটে। স্বপ্নেও একই ব্যাপার ঘটে থাকে। প্রক্ষোভের গ্যাস বেরিয়ে যাওয়া বলতে পারেন। কিন্তু হিস্টিরিয়ায় সেই স্বতশ্চল প্রক্রিয়া সাহায্য নেয় কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাসের। যেমন ধরুন, কেউ ভূতপ্রেতে বিশ্বাসী–কেউ দেবদেবীতে বিশ্বাসী। এদের ক্ষেত্রে ভূতপ্রেত বা দেবদেবীই যেন কথা বলে। তার মানে, দমিত প্রক্ষোভের গ্যাস ভূতপ্রেত বা দেবদেবীর কথা হয়ে বেরিয়ে যায়। বুঝলেন তো?
কর্নেল হাসলেন। ঘিলু আরও জ্যাম হয়ে গেল। ধরুন, কোনো মেয়ের মধ্যে দেবীর ভর উঠেছে। ভরের সময় সে কোনো বিপদ সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করল। তারপর তা ঠিক ঘটেও গেল। এমন কেন হয়?
ডাঃ ভাদুড়ী ভুরু কুঁচকে বললেন, শোনা কথা বলছেন তো? অমন হতে পারে না।
হয়েছে।
ডাঃ ভাদুড়ী একটু ভেবে নিয়ে বললেন, হলে জানবেন, মেয়েটি আগে কিছু টের পেয়েছিল। কিন্তু কোনো কারণে তা বলতে পারছিল না। চেপে রাখতে বাধ্য হয়েছিল। অর্থাৎ সেই অবদমন।
হিস্টিরিয়াগ্রস্ত পেসেন্ট যা করে, সে সম্পর্কে কি সে সচেতন?
মোটেও না। কী শুনলেন এতক্ষণ? ডাঃ ভাদুড়ী হাসতে লাগলেন। সে যা করে–মারধর, এমন কী খুনোখুনি পর্যন্ত–সবই অবচেতন মানসিক প্রক্রিয়ার ফলাফল। এমন কেস আছে, পেসেন্ট রাতে নিজের জিনিস নিজেই চুরি করে। অবসেসন আর কী! ওই যে কেউ কেউ ঘুমের মধ্যে হাঁটাচলা করে বা ঘর থেকে বেরিয়ে যায়, সেও ওই অবসেসনের একটা সাধারণ প্রক্রিয়া।
অবসেসন প্রক্রিয়ার মধ্যে খুন করাও কি সম্ভব?
মোটেও অসম্ভব নয়। তবে সত্যি যদি তাই করে, জানবেন যাকে খুন করেছে, তার বিরুদ্ধে প্রচণ্ড ঘৃণা আর রাগ লুকিয়ে ছিল অবচেতন মনে।
ওই অবস্থায় তাকে কেউ গাইড করতে পারে না?
শতকরা দুটি বা একটি কেসে দেখা গেছে, কেউ গাইড করেছে। যে গাইড করছে, তার প্রতি পেসেন্টের প্রচণ্ড আতঙ্ক থাকতে পারে, শ্রদ্ধাভক্তি বিশ্বাসও থাকতে পারে। তবে এটা খুব বিপজ্জনক ব্যাপার। ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের কাহিনী তো জানেন!
যে গাইড করছে, তারও ক্ষতি করতে পারে বলছেন?
একজ্যাক্টলি। তবে সেটা নির্ভর করছে একটা বিশেষ অবস্থার ওপর। ধরুন, কোনো পেসেন্ট কারও গাইডেন্সে পড়ে অবসেসন প্রক্রিয়ায় কাউকে খুন করল। জ্ঞান হবার পর যদি সে দৈবাৎ জানতে পারে যে সে খুন করেছে, তার মধ্যে। একটা স্বাভাবিক প্রক্ষোভ সৃষ্টি হবে। তখন আবার অবদমন ঘটলে যে তাকে গাইড করেছে, তার বিপদের সম্ভাবনা আছে। কিন্তু কথাটা হল, জানতে পারা– শুধু জানতে পারা নয়, বিশ্বাস হওয়া যে সে সত্যি সত্যি ওই খুনটা করেছে এবং ওই খুনটা করেছে এবং ওই লোকটার কথাতেই করেছে।
ধরুন, এ বির গাইডেন্সে সিকে খুন করল অবসেসন প্রক্রিয়ায়। এ যদি সির অত্যন্ত আপনজন–মনে করা যাক, বাবা হয়, তাহলে?
বির বিপদের সম্ভাবনা প্রচণ্ড।
বি খুব শক্তিমান আর ধূর্ত লোক হলে?
পেসেন্ট বদ্ধ পাগল হয়ে যাবার আশঙ্কা আছে। ব্যর্থতার অবদমনের ফলে তার নার্ভ সিস্টেম বাকি জীবনের জন্য ভেঙে পড়বে। ডাঃ ভাদুড়ী চোখে ঝিলিক তুললেন এবং চাপা গলায় বললেন, কেসটা কী?
হাসলেন কর্নেল। পরে জানতে পারবেন। বলে উঠে দাঁড়ালেন।
ডাঃ ভাদুড়ী বললেন, ও কী! বসুন। কফি আনতে বললুম না?
আপনার পেসেন্টরা হয়তো ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন!
মোটেও না। নটা অব্দি চেম্বারে থাকি। এখন দশটা বাজে প্রায়। টেবিলের স্লিপগুলোর দিকে তাকালেন ডাঃ ভাদুড়ী। দেখতে দেখতে চড়া গলায় হাঁক দিলেন, ব্যানার্জিবাবু! দেখুন তো, কফি আনতে দেরি হচ্ছে কেন?
পার্টিশানের ওদিক থেকে কেউ বলল, এসে গেছে স্যার।
ব্যানার্জিবাবু, একটু আসুন তো আপনি।
কম্পাউন্ডার ব্যানার্জিবাবু চেম্বারে ঢুকলেন। বেঁটে কালো মানুষ। কিন্তু চেহারায় সৌখিনতা রমরম করছে।
মেমসায়েব পেসেন্টের টাকা জমা দিয়ে গেছে?,
না স্যার। আসেই নি আজ।
দেখছেন কাণ্ড? আপনি ফেরার পথে একবার ফ্রি স্কুল স্ট্রিট হয়ে যান না! অ্যাড্রেস দেওয়া আছে তো?
আছে স্যার।
ঠিক আছে। ওঁকে বলে যান, পরশুর মধ্যে টাকা জমা দিলে পেসেন্ট রাখা যাবে না। দাঁতব্য প্রতিষ্ঠান তো নয়। তার ওপর অমন জটিল কেস।
কফির পট আর দুটো কাপ-প্লেট রেখে কর্নেলকে অবাক চোখে দেখতে দেখতে চলে গেল একটা কমবয়সী ছেলে। কর্নেল একটু হাসলেন আপনমনে। তাকে দেখে কমবয়সীরা কেন অবাক হয় কে জানে? অরিজিতের মতে, জীবন্ত সান্তাক্লজ মনে করে। কে জানে কী ব্যাপার।
কফি ঢেলে ডাঃ ভাদুড়ী বললেন, কর্নেল ভাবছেন কী কঞ্জুস ডাক্তার রে বাবা! তাই না?
না, না। ক্লিনিক চালাতে আপনার খরচের ব্যাপার আছে।
কেস খুব পিকিউলিয়ার বলেই হাফ খরচে ভর্তি করিয়েছি। তাছাড়া আমারও একটা নতুন কেস স্টাডি করা হবে। কিন্তু কী যেন নাম মেমসায়েবের?
ব্যানার্জিবাবু বললেন, মিসেস পেরিয়ার।
ঠিক আছে। আপনি আসুন ব্যানার্জিবাবু। দেখুন কী বলে মিসেস পেরিয়ার! ডাঃ ভাদুড়ী কফিতে চুমুক দিয়ে ঘুরলেন কর্নেলর দিকে। ব্যানার্জিবাবু চলে গেলে চাপা গলায় বললেন, ভেরি ইন্টারেস্টিং কেস। আমাদের প্রফেশনে কী সব অদ্ভুত-অদ্ভুত মানুষ দেখার অভিজ্ঞতা হয় দেখুন!
কী কেস?
প্যারানইয়াক পেসেন্ট। হাইপোকন্ড্রিয়া থেকে এই স্টেজে এসেছে। অদ্ভুত সিম্পটম। পেসেন্ট দুহাতে নিজের গলা চেপে ধরে হঠাৎ চেঁচিয়ে ওঠে, ও নো নো! তারপর অজ্ঞান হয়ে যায়। জ্ঞান অবস্থাতেও শূন্যদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। কথা বলে না।
গলা চেপে ধরে বললেন?
ডাঃ ভাদুড়ী দুহাতে নিজের গলার সামনের দিকে চেপে ধরে ভঙ্গিটা দেখিয়ে দিলেন। তারপর আগের মতো আস্তে বললেন, মিসস পেরিয়ার রেডলাইট এরিয়ায় থাকে। বুঝতেই পারছেন কী ব্যাপার। পেসেন্টের বয়স তিরিশ-বত্রিশ হবে। চেহারা মোটেও ভাল নয়। নেহাত সেক্সের দায়ে না ঠেকলে কেউ ওর কাছে যেত বলে মনে হয় না। তো ওইরকম অদ্ভুত সিম্পটম! দুটো সিটিং এই চেম্বারেই দিলাম প্রথমে। সাইকো-অ্যানালেসিস পদ্ধতি প্রয়োগ করে ব্যাপারটার খানিকটা আভাস পেয়ে গেলাম। মাসখানেক আগে একটা লোক ওর কাছে এসে অদ্ভুত একটা প্রস্তাব দেয়। সে সেক্সটেক্স চায় না। শুধু এই একটা কাজ সে করবে। রোজ আসবে আর করবে।
কী?
হাসলেন ডাঃ ভাদুড়ী। এও ধরে নিতে পারেন সেক্সপার্ভার্সান এক ধরনের। এতেও যৌনতৃপ্তি পায় কেউ কেউ। অর্থাৎ ফিজিক্যাল টর্চার! যাকে বলা হয় স্যাডিজম।
লোকটা তার গলা টিপে ধরত বুঝি?
না। শুনুন না! মেয়েটা টাকার লোভে পড়ে রাজি হয়েছিল। কাজটা হল : লোকটা এসে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে বলত, দরজা বন্ধ করো। আমি তিনবার নক করলেই খুলে দেবে। তো প্রথম দিন মেয়েটা তাই করল। আর লোকটা দরজা খোলামাত্র মেয়েটার মুখে একটা হাত চেপে নিজের বুকে টেনে নিয়ে কী একটা ঘষে দিল ওর গলায়। তারপর হাসতে হাসতে ছেড়ে দিল। মেয়েটা প্রথম। দিন ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিল। পরে আর তত ভয় পেত না। জানত তার খদ্দের কী করবে এবং তাকেও কী করতে হবে। এভাবে সপ্তাহখানেক চলার পর একদিন মেয়েটা আবিষ্কার করল, লোকটা এতদিন একটা কাঠের ছুরি ঘসেছে ওর গলায় একদিন একটা সত্যিকার ছুরি দিয়ে ঘসেছে তবে ছুরিটার উল্টো পিঠ দিয়ে। ব্যস, মেয়েটির মনে আতঙ্ক জন্মে গেল। কিন্তু টাকার লোভ বড় লোভ। প্রতিদিন ওই একটা সময় তার মনে একটা ঝড় বয়ে যায়। দরজা খুলে দেয় নক করলে। লোকটা তার মুখ চেপে ধরে। ঠিক একইভাবে ছুরির উল্টো দিকটা গলায় ঘসে দেয়। তারপর ছেড়ে দিয়ে প্রতিশ্রুতিমতো কুড়িটা টাকা দিয়ে চলে যায়। মেয়েটা টাকা মুঠোয় চেপে ক্লান্তভাবে বসে থাকে। শুধু ভাবে, ছুরিটা যদি আগামীদিন তার গলায় উল্টোদিকে না ঘসে ভুল করে সিধে দিকে ঘসে দেয়! বুঝতে পারছেন তো? হাইপোকন্ড্রিয়ার সূচনা এভাবেই হয়।
কর্নেল আস্তে বললেন, কতদিন আগের এ ঘটনা?
একমাস-দেড়মাস আগে। এভাবে তিন সপ্তাহ বা তার বেশি চলার পর মেয়েটার নার্ভ গেল। মুখের ওপর জবাব দিল। তারপর হল কী, লোকটা আর আসে না। কিন্তু যখনই কেউ দরজায় নক করে, ও দুহাতে নিজের গলা চেপে ধরে চেঁচিয়ে ওঠে, ঔ নো নো! তারপর অজ্ঞান হয়ে যায়। মিসেস পেরিয়ার এ সব কিছু জানে না। তার বিশ্বাস, স্বয়ং স্যাটার্ন ওকে ভর করেছে। হাসতে লাগলেন ডাঃ ভাদুড়ী।
নাম কি পেসেন্টের?
এক মিনিট বলছি। ড্রয়ার থেকে মোটা একটা নোটবই বের করলেন ডাঃ ভাদুড়ী। এতে অদ্ভুত কেস হিস্টরি নোট করে রাখি। .., মিস প্যাটি– প্যাট্রিসিয়া।
আপনার ট্যাংরা মেন্টাল ক্লিনিকে আছে?
হ্যাঁ। যাবেন একদিন। একটা অভিজ্ঞতা হবে।
লোকটার কেমন চেহারা বলেনি?
চোখে ঝিলিক দিয়ে হাসলেন ডাঃ ভাদুড়ী। কেন? কোনো রহস্যের গন্ধ পাচ্ছেন নাকি?
হয়তো।
চেহারার কথা বলেনি। আদায় করতে পারিনি। আপনাকে যা বললাম, ওর অসংলগ্ন কথাবার্তা থেকে আমিই ব্যাপারটা দাঁড় করিয়েছি। তবে ফেথ ফুল ডেসক্রিপশন অফ দা ইনসিডেন্টস।
আপনি কখন যাবেন ক্লিনিকে?
যাবার সময় হয়ে গেছে কখন।
কর্নেল ঘড়ি দেখে বললেন, আমি আজ একটু ব্যস্ত। নৈলে আপনার সঙ্গে যেতাম। তবে একটা অনুরোধ করব। প্লিজ, এলিয়ট রোড হয়ে আমার বাড়ির পাশ দিয়ে চলুন। এক মিনিট থামবেন। আমি আপনাকে একটা ছবি এনে দেব। আপনি ছবিটা মিস প্যাটিকে দেখাবেন। ওর রিঅ্যাকশনটা আমি জানতে চাই।
ডাঃ ভাদুড়ী অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন। দমআটকানো গলায় বললেন, রহস্য ঘনীভূত হলো।….
