ঋজুদার সঙ্গে ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জে – বুদ্ধদেব গুহ
ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জে গেছিস কখনও?
ঋজুদা জিজ্ঞেস করল আমাদের।
প্রতি সপ্তাহান্তে শনিবার রাতে ঋজুদার বিশপ লেফ্রয় রোডের ফ্ল্যাটে আমাদের যে জমায়েত হয়, সেই জমায়েত জমে উঠতেই।
তিতির বলল, যাইনি, তবে জায়গাটা সম্বন্ধে অনেক কিছুই জানি।
ভটকাই বলল, ‘ভ্রমণ’ পত্রিকাতে পড়েছি আমিও কৌশিক লাহিড়ীর লেখাতে।
তা পড়ে থাকতে পারিস, তবে আমিও জেনেছি অনেক কিছু ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জ সম্বন্ধে একটি বই পড়েই, যেটি পড়লে মনে হবে তুমি নিজেই যেন চলে গেছ ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জে।
কী বই?
ভটকাই প্রশ্ন করল।
‘একটু উষ্ণতার জন্যে’।
তিতির বলল।
ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জ জায়গাটার কথাই যদি বলিস তো সেখানেও আমি বহুবার গেছি। তোদের সঙ্গে এত ঘনিষ্ঠ হবার আগে, রুদ্র, ঋজুদার বই লিখে লিখে আমাকে বিখ্যাত করে দেবার অনেকই আগে, সেখানে আমারই একটা ছোট্ট কটেজ ছিল। গভীর জঙ্গলের মধ্যে। এক স্কটসম্যানের কাছ থেকে কিনেছিলাম। তোদের ওই বইটাই, মানে, একটু উষ্ণতার জন্যেই ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জ জায়গাটার সর্বনাশ করে দিয়েছে। তখন জায়গাটা যত নির্জন, যত সুন্দর, বাইরের জগতের কাছে যত অজানা ছিল, এখন সেটাই হয়ে উঠেছে একটা ট্যুরিস্ট স্পট।
তোমার যে ওখানে বাংলো ছিল, কই, আমাদের তো বলোনি কোনওদিন!
বলার অবকাশ বা প্রয়োজন হয়নি। কিছুদিন আগেও এক বাসন্তী পূর্ণিমাতে গেছিলাম।
বললে যে, বাড়ি বিক্রি করে দিয়েছ?
তা তো দিয়েছিই। আমার বাড়িতে তো যাইনি। সোমনাথ আর শর্মিলার সঙ্গে গেছিলাম। ওদের বাড়িতেই উঠেছিলাম।
আমার কটেজের নাম দিয়েছিলাম ‘THE TOPPING HOUSE। আর্নেস্ট হেমিংওয়ের স্টেটস-এর আইডাহোর কেচাম-এ গভীর জঙ্গলের মধ্যে Snake River-এর পাশে তাঁর যে কটেজ ছিল, যেখানে তিনি আত্মহত্যা করেন, সেই বাড়িরই নাম ছিল ‘THE TOPPING HOUSE’।
বাঃ। সেখানেই আমাদের একবার নিয়ে গেলে না!
কী করে নিয়ে যাব। তখন তো তোরা হামাগুড়ি দিচ্ছিস, নয়তো প্রাম-এ চড়ে বিকেলবেলা বেড়াতে যাচ্ছিস। সে কী আজকের কথা! তবে যাই হোক এবারে চল, দেখে আসবি। তিতিরও নিজের চোখে দেখে আসবে তার প্রিয় উপন্যাসের পটভূমি।
তা তো বুঝলাম, কিন্তু সেখানে তোমার এই হঠাৎ-যাওয়ার কারণটা কী? এখনও তো তা বোঝা গেল না কিন্তু।
ভটকাই বলল।
আমরা প্রত্যেকেই ঋজুদার দিকে নীরবে চেয়ে থাকলাম।
আমাদের শব্দহীন সম্মিলিত কেন-র উত্তরেই যেন ঋজুদা বলে উঠল, স্টিভ এডওয়ার্ডস এই নিয়ে গত রাত অবধি পাঁচবার ফোন করল মেলবোর্ন থেকে আমাকে।
স্টিভ এডওয়ার্ডস কে?
ওঃ।
একটু বিরক্তির সঙ্গেই বলল, ঋজুদা।
তারপর বলল, বন্ধুই বলতে পারিস। জঙ্গলের বন্ধু। জেঠুমণির খুব প্রিয়পাত্র ছিল। ওর বাবাকেও চিনতেন জেঠুমণি। নীলগিরি পাহাড়ের এক কফি প্ল্যান্টেশনের মালিক ছিলেন স্টিভ-এর বাবা টমাস এডওয়ার্ড। এক সময়ে অনেক শিকার করেছি মহীশূরের নীলগিরি পাহাড়ে একসঙ্গে। স্টিভ সত্তরের দশকে অস্ট্রেলিয়াতে গিয়ে সেটল করেছে। বিয়েও করেছে সেখানেই। ওর স্ত্রী জুলিকে নিয়ে একবার এসেওছিল এ দেশে। আমার কাছেও ছিল তিনদিন। জুলিদের পরিবার কানাডাতে থিতু ছিল। ওর মা, বাবা, এবং দাদা সব কানাডাতেই ছিলেন। অবিবাহিত দাদা, মা বাবার সঙ্গেই থাকতেন। জুলি, মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পি এইচ ডি করতে এসে স্টিভ-এর ‘প্রেম’-এ পড়ে। তারপরে বিয়ে। তারও পরে, থোড়-বড়ি-খাড়া খাড়া বড়ি-থোড়।
এবারে তোমাকে কেন ফোন করছে সেটা বলল। তুমি বড় OFF THE POINT কথা বলো আজকাল ঋজুদা। ঋজু বোসও কি বুড়ো হয়ে গেল?
ঋজুদার ওয়ান অ্যান্ড ওনলি লোকাল গার্ডেন মিস্টার ভটকাই বকে দিল ঋজুদাকে।
মনে মনে আমরা যে অখুশি হলাম তা নয়।
ঋজুদা বলল, জুলির অবিবাহিত এবং সমবয়সী মামাতো দাদা টেড গিলিগানকে গুলি করে মারে তারই বন্ধু ম্যাক টেইলর। ওরা নর্থ কানাডাতে ‘মুজ’ শিকারে গেছিল।
‘মুজ’টা কী জিনিস? মাউস-এর জাতভাই নাকি?
ভটকাই বলল।
আমি বললাম, একটু পড়াশুনো কর। পরীক্ষার নোটবই মুখস্থ করা ছাড়াও পড়ার যে অনেক কিছুই আছে তাতো জানিস না।
জিনিসটা কী? সোজা বাংলাতে বলল না, মাস্টারি না করে।
MOOSE হচ্ছে উত্তর আমেরিকা এবং কানাডারও একরকম বড় বড় শিংওয়ালা হরিণ, আমাদের সম্বরের মতো। বরফাবৃত এলাকাতে পাওয়া যায় তাদের। এক সময়ে, যখন শিকার বে-আইনি হয়ে যায়নি, MOOSE বহু কষ্ট সহ্য করেও শিকার করত শিকারিরা।
তিতির বলল, অ্যালগারনন ব্ল্যাকউড-এর লেখা মুজ শিকারের একটা রোমহর্ষক গল্প আছে। ঠিক বলেছিস।
ঋজুদা বলল। দারুণ গল্প। আধিভৌতিক।
খুনের উদ্দেশ্য কী ছিল?
আমি জিজ্ঞেস করলাম।
ওরা দুজনেই নাকি একই মেয়ের জন্যে পাগল ছিল। ডাকসাইটে সুন্দরী। কানাডার এক নম্বর মডেল ছিল সে। অথচ সেই মেয়ে, জেসমিন স্পিক’, তাদের দুজনের কারোকেই ভালবাসত না। বাসত অন্য আরেকটি ছেলেকে। সে ছেলেটি খুব ভাল পিয়ানো বাজাত। জাতে ফরাসি ছিল। এবং থাকতও কানাডার মনট্রিয়ালে। যাকে প্রায় সব দিক দিয়েই প্যারিসই বলা যায়। যেখানে রাতও দিন। প্যারিসের ছোট বোনটি যেন মনট্রিয়াল।
ঋজুদা আমাদের টেনশানে রেখে কিছুক্ষণ পাইপ খেয়ে বলল, ম্যাক টেইলর, জুলির দাদা টেডকে খুন করে ফেরারি হয়ে যায়। কানাডিয়ান পুলিশ হন্যে হয়ে খুঁজেও তাকে ধরতে পারেনি। তাদের দৃঢ় ধারণা ম্যাক টেইলর কানাডা ছেড়ে স্থলপথে বা জলপথে খুন করার পরে-পরেই অন্য কোনও দেশে চলে গেছিল।
সে কী? আটকাতে পারল না তাকে কানাডার মতো দেশের পুলিশও?
না। পারেনি।
তারপর বলল, জুলির এক কানাডিয়ান বান্ধবী ছিল। তার নাম জিন। টরন্টোরই। তারা জুলিদেরই মতো কানাডার টরন্টোতেই থাকত। মাত্র মাসখানেক আগে জিন ব্লুজনার ভারতে এসেছিল ছুটি কাটাতে। কুনুরে স্টিভ-এর বন্ধুর কাছে। সেই বন্ধুর কুমুরে কফি প্ল্যান্টেশন ছিল। যাকে জিন দেখেছিল, সে নাকি হুবহু ম্যাক টেইলর-এর মতো দেখতে।
কোথায় দেখেছিল?
তিতির জিজ্ঞেস করল।
দমদম এয়ারপোর্টে। জুলির বান্ধবী দিল্লি থেকে কলকাতাতে এসেছিল ইনল্যান্ড ফ্লাইট-এ কলকাতায় এক অ্যাংলো ইন্ডিয়ান বন্ধুর সঙ্গে তিন দিন কাটিয়ে তারপর বাঙ্গালোর-এর ডাইরেক্ট ফ্লাইট নিয়ে তার যাবার কথা ছিল কুহূরে।
ম্যাক টেইলর-এর মতো দেখতে লোকটি কোথা থেকে এসে কোথায় যাচ্ছিল?
ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনস-এর একটি হপিং ফ্লাইট আছে–রাঁচি, পাটনা হয়ে বেনারস যায়, তাতে করে। তাই তার রাঁচি যাবার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তুমি তো সব গুবলেট করে দিলে। আমাদেরই না রাঁচি যেতে হয় মাথার চিকিৎসার জন্যে। ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলো।
ভটকাই বলল, ঋজুদাকে।
লোকটি যে রাঁচিই যাচ্ছিল তার কোনও স্থিরতা ছিল না। ইট ওজ আ ওয়াইল্ড গেসস! পুরোটা শোনই আগে।
বলো।
আমরা সমস্বরে বললাম।
রাঁচি যাবার হয়তো কোনও স্থিরতা ছিল না, এমনকী লোকটি হয়তো ম্যাক টেইলরও নয়। হয়তো পুরোটাই জিন-এর ভুল। যাকে জিন-এর ম্যাক টেইলর বলে মনে হয়েছিল, তাকে একটি কালো ছিপছিপে ভারতীয় এয়ারহোস্টেস নাকি জিন-এর সামনেই বলেছিল, তুমি কি সোজা ‘THE GUNGE-এ যাচ্ছ রাঁচি হয়ে?
তাতে কী প্রমাণিত হয়? এখনও আমরা কিছুই বুঝতে পারলাম না।
এবারে তিতির বলল, ফৌজদারি আদালতের উকিলের জেরার মতো।
প্রমাণিত কিছুই হয় না। তবে তাতে এ কথা জিন-এর মনে হয়েছিল যে, ওই এয়ারহোস্টেস ‘THE GUNGE’-এরই বাসিন্দা। নইলে, সে জানবে কী করে যে, ডরোথি নামক এক মহিলার (ওই টেইলর সম্ভবত যার সঙ্গে থাকে অথবা বিয়ে করেছে) জ্বর হয়েছে এবং ডাক্তারেরা ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়া বলে সন্দেহ করছেন?
তিতির বলল, তাও না হয় বোঝা গেল কিন্তু ‘THE GUNGE’ মানেই একটু উষ্ণতার জন্যে’র ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জ সেটা জানা যাচ্ছে কী করে! রবার্টগঞ্জ, ফ্রেজারগঞ্জ, হ্যাঁমিলটনগঞ্জ, হান্টারগঞ্জ, আরও কত গঞ্জই তো আছে।
তা আছে। তবু রাঁচির কথাটা যখন জিন নিজ কানেই শুনেছে তখন রাঁচির কাছের ‘THE GUNGE’ ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জ হতেও-বা পারে। জিন নিজে ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জের নামও শোনেনি। জিন-এর কাছ থেকে হোস্টেস আর লোকটির কথোপকথন শুনেই জুলি আমাকে লেখে। আমিই তাকে বলি যে, রাঁচির কাছে যখন এবং সাহেব-সুবো যখন সেখানে থাকে, তখন ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জও হতে পারে। তা ছাড়া সেখানে আমার কটেজ ছিল এক সময়ে, তাই আমি জানি যে, স্থানীয় মানুষেরা ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জকে বোঝাতে ‘THE GUNGE’-ই বলেন। যেমন, পাহাড়ের বাসিন্দারা দার্জিলিংকে বোঝাতে বলেন: ‘ডার্জ।
তুমি নিজে কি কখনও ম্যাককে দেখেছ? তোমাদের সঙ্গেও শিকার করেছে সে কখনও?
মানে, ম্যাক টেইলর?
না। তবে জুলি একটি ফোটো পাঠাচ্ছে আমাকে কুরিয়ার-এ। আজকাল-এর মধ্যেই এসে যাবে। ম্যাক আর তার দাদা টেড-এর ছবিকে দু’টুকরো করে কেটে নেগেটিভ করে নিয়ে ম্যাক-এর ছবি এনলার্জ করে পাঠাচ্ছে।
মোটে এক কপি?
তাই তো পাঠাচ্ছে। জুলি তো আর জানে না যে আমার সৈন্যদল-এর প্রত্যেকের জন্যেও পাঠাতে হবে? ফোটোটা আসুক, এলে না হয় আমরাই কপি, করে নেব। আজকাল তো কালার জেরক্স করা যায়। অসুবিধার কী? তারপর স্বগতোক্তির মতো বলল, জুলি তোদের কথা জানবেই বা কী করে!
আমি বললাম, যদি মনে করো ম্যাকক্লাস্কিতে যাবার পরে ফোটোর সঙ্গে ওই লোকটির, মানে, ম্যাক টেইলর-এর মিল খুঁজে পেলে, তা হলেই বা কী করবে?
শুধু মিল খুঁজে পেলেই হবে না। আরও নানা ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়ে যদি আমরা নিশ্চিত হই তবেই কানাডিয়ান পুলিশকে, মানে টরন্টোতে ফ্যাক্স বা ফোন করে দিতে হবে। তারপর যা করবার টরন্টোর পুলিশই করবে। জুলি ও স্টিভকেও জানিয়ে দেব। ওরাই বিহার পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে নেবে। অত ভাবনা আমাদের এখন ভেবে কী হবে! আগে যাওয়াই তো যাক।
আমরা সমস্বরে বললাম, তা ঠিক।
ঋজুদা বলল, তোমাদের জানিয়ে রাখলাম। অ্যাডভান্স নোটিস। তবে তোমাদের সেখানে করার কিছুই নেই। তোমরা বেড়াবে, ট্রেকিং করবে, খাবে-দাবে, জায়গাটা ভাল করে ঘুরে দেখবে। আমিই যা করার করব। যদি তোমাদের সাহায্য লাগে, তবে যখন যেমন তখন তেমন জানাব। তবে রুদ্র, তোর পিস্তলটা সঙ্গে নিয়ে নিস।
তিতির বলল, ম্যাককে জিন কি ব্যক্তিগতভাবে জানত? নইলে তাকে দেখে চিনল কী করে!
না, চিনত না। মানে, পরিচিতি ছিল না, তবে চেহারাটা ভালভাবেই চিনত।
কী করে?
ম্যাককে জিন চিনত শুধু ফোটোরই মাধ্যমে। জুলিদের বাড়িতে ওর দাদা ও তার বন্ধুদের ফোটো ও অনেক ভিডিও দেখেছিল। ম্যাকও নিজে কিন্তু জুলিকে কখনও দেখেনি। তাই তাকে দমদম এয়ারপোর্টে হঠাৎ দেখে জুলির সন্দেহ হওয়াতেই জুলি ম্যাক-এর কাছে গিয়ে বলেছিল, এক্সকিউজ মি। মে আই হ্যাভ আ লাইটার? আই হ্যাভ লস্ট মাইন।
লোকটি, যাকে জিন ম্যাক টেইলর বলে ভাবছিল, বলেছিল, সরি, আই ডোন্ট স্মোক। উ্য শু্যডন্ট স্মোক ইদার।
তারপরই জুলির বন্ধু গায়ে পড়ে বলেছিল, আই অ্যাম জিন সুইভার ফ্রম টরন্টো, কানাডা। হোয়্যার আর উ্য ফ্রম?
সেই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে, ইট ওজ ভেরি নাইস টু হ্যাভ মেট ঊ্য, বলেই হ্যান্ডশেক করে ম্যাক বলেছিল, হোয়াট ব্রিংস উ্য হিয়ার।
আই হ্যাভ কাম অন আ হলিডে টু সি ইন্ডিয়া। হাউ বাউট উ্য?
আই অ্যাম অন আ হলিডে অ্যাজ ওয়েল। আই অ্যাম গোয়িং টু দার্জিলিং।
পরে আমিও ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনস এবং জেট এয়ারওয়েজ-এর টাইম-টেবল দেখেছি। দার্জিলিং মানে, বাগডোগরার ফ্লাইটের সময় এবং রাঁচির ফ্লাইটের ফ্লাইট সময় চেক করে, সময়ের অনেকই তফাত ছিল। তবে সেদিন কুয়াশার জন্যে জিন-এর ফ্লাইট দেরি করে আসে কলকাতাতে। যে সময়ে ম্যাক বাগডোগরার ফ্লাইট ধরার কথা বলেছিল, কুয়াশার কারণে হয়তো রাঁচি-বেনারস-পাটনার ফ্লাইটও সেদিন দেরিতে ছেড়েছিল। ম্যাক-এর কথাটা তাই মিথ্যে আবার নাও হতে পারে। হতেও পারে।
তারপর বলল, জুলির বন্ধু জিন প্রায় নিশ্চিত যে ওই লোকটিই ম্যাক টেইলর এবং সে তাকে মিথ্যে কথা বলেছে।
আমি বললাম, যদি ম্যাক টেইলর সত্যিই ভারতেই পালিয়ে এসে থাকে তা হলেও তার সঙ্গে ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জ-এর কী সম্পর্ক?
সম্পর্ক নেই। তবে পুরোটা শোনই না। তোরা অত অধৈর্য কেন? আমিও কমপক্ষে তাদের সমান বুদ্ধি ধরি। নয় কি? জিন-এর সঙ্গে যখন লোকটি, মানে, যাকে জিন, ম্যাক বলে সন্দেহ করছে, কথা বলছিল, সেই স্টুয়ার্ডেস যুবতী, যার গায়ের রং কালো, যে ছিপছিপে এবং যার পরনে স্টুয়ার্ডেস-এর পোশাক, সে ম্যাককে, থুড়ি, সেই লোকটিকে বলেছিল, আর ঊ্য গোয়িং স্ট্রেইট টু দ্যা গঞ্জ? ফ্লাইং টু রানচি বাই দিস ফ্লাইট?
লোকটি উত্তরে বলেছিল, নোপ! আই অ্যাম গোয়িং টু ডার্জ।
ডার্জ?
অবাক হয়ে বলেছিল সেই স্টুয়ার্ডেস মেয়েটি।
তারপরই বলেছিল, বাট উ্য ওয়্যার সাপোজড টু বি ব্যাক ফ্রম ডেলহি টুডে। আই মাস্ট টেল ট্য। ডরোথি ইজ এক্সপেক্টিং ঊ্য ভেরি মাচ। বিসাইডস, শি ইজ ডাউন উইথ ম্যালেরিয়া। ডক্টর ইজ সাসপেক্টিং ইট টু বি ম্যালিগন্যান্ট। ওন্ট উ্য গেট ব্যাক স্ট্রেইট টু দ্যা গঞ্জ?
এ কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই ম্যাক সেই এয়ার হোস্টেসটিকে হাত ধরে জিন-এর থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে গেছিল।
তাড়াতাড়িতে জিনকে হাত তুলে আবারও বলেছিল, বাঈই। নাইস মিটিং উ্য।
তারপরেই বলেছিল, মে বি, সামড়ে আই উইল বি ইন কানাডা ফর হলিডেইং।
উ্য আর ওয়েলকাম।
জিন বলেছিল।
তারপরেই ঋজুদা উঠে পড়ে বলল, চল এবারে। পরে আবার এ সব কথা হবে। THE WALDORF’-এ টেবল বুক করা আছে। চাইনিজই খাবি বলেছিলি তো তোরা। এখন ওখানে CRAB FESTIVAL হচ্ছে। চল গিয়ে কাঁকড়ার বংশ ধ্বংস করি আমরা।
গদাধরদা বাড়ি যাওয়াতে আমাদের লস তো কিছু নেই। কী বলিস রে রুদ্র?
ভটকাই বলল।
তারপর বলল, এমন বৃষ্টি হচ্ছে রোজ। গদাধরদাই নেই। ভুনি-খিচুড়ি খাওয়াই হচ্ছে না আমাদের। খুব মিস করছি। কী বল?
আমি বললাম, তাই তো। তা আর বলতে!
গদাধরদার ছুটিটা আরও দিন পনেরো বাড়ানো যায় না ঋজুদা?
কেন?
ঋজুদা জিজ্ঞেস করল।
তা হলে একদিন তাজ বেঙ্গল, একদিন ওবেরয় গ্রান্ড, তার পরদিন পার্ক বা হিন্দুস্থান ইন্টার কন্টিনেন্টাল…
তিতির বলল।
ভটকাই গেয়ে উঠল, আহা! যদি জোটে রোজ এমনি বিনি পয়সার ভোজ।
.
ভোরবেলা হাওড়া-হাটিয়া এক্সেপ্রেস করে রাঁচি স্টেশনে নেমে প্ল্যাটফর্ম থেকে বাইরে বেরিয়েই কারপার্ক-এ গাড়িটা খুঁজে পেলাম। একটা সাদা টাটা-সুমো। খাকি পোশাক পরা একজন স্মার্ট ড্রাইভার ঋজুদাকে দেখেই স্যালুট করে এগিয়ে এল।
ঋজুদা আমাদের সকলের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়ে বলল, এই হচ্ছে কিষুণ, মোহন বিশ্বাসের পার্সোনাল ড্রাইভার।
মোহন কেইসা হ্যায় কিষুণ?
মজেমে হ্যায়, হুজৌর। আপ ঠিক হ্যায় না?
চলতা হ্যায়।
ভটকাই আমার কানের কাছে মুখ এনে বলল, চলতি কা নাম গাড্ডি।
ছেলেটা বড় চ্যাংড়া। কোনও ক্লাস নেই। অথচ কী করি। আমিই তো খাল কেটে কুমির এনেছি। তাই, চুপ করেই রইলাম।
কিষুণ আমাদের প্রথমে স্টেশনের লাগোয়া সাউথ-ইস্টার্ন রেলওয়েজের হোটেলে নিয়ে গেল।
ঋজুদা বলল, এই দ্যাখ বিখ্যাত বি এন আর হোটেল।
লেখা আছে এস ই আর, আর তুমি বলছ বি এন আর। কেন?
আগে তো তাই নাম ছিল। বেঙ্গলনাগপুর রেলওয়ে লিমিটেড। ব্রিটিশ আমলে আলাদা কোম্পানি ছিল এই নামে। আজকের এই ঘিঞ্জি রাঁচি শহরই আগে হলিডে-রিসর্ট ছিল। শীতকালে এবং বর্ষাকালে কলকাতা থেকে কত মানুষে শুধু ছুটি কাটানোর জন্যেই এখানে এসে থাকতেন। মেমসাহেবরা পুশ-পুশে করে উঁচু-নিচু পথে বেড়িয়ে বেড়াতেন। বড় বড় টানা-রিকশও ছিল এখানে। নির্জন জায়গা তখন। বুড়ো-বুড়িরা, যুবক-যুবতীরা এই হোটেলের মধ্যের পথেই সকাল-সন্ধ্যা হেঁটে বেড়াতেন। খাওয়া-দাওয়াও তেমন ছিল। পুরীতেও ছিল এদের আরেকটা হোটেল। সেটারও খুব নাম ছিল। এখনও আছে হোটেলটা।
এস ই আর হোটেলের দুটি ঘরে আমরা প্রাতঃকৃত্য সেরে চান করে নিলাম। নিয়ে, ডাইনিং রুমে গিয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে মোহন বিশ্বাসের পাঠানো এয়ার কন্ডিশনড টাটা-সুমোতে গিয়ে উঠলাম।
ঋজুদা স্বগতোক্তি করল। আমাদের দেশে সরকার যাহাই স্পর্শ করে তাহারই এমনি নগ্ন আর ভগ্ন দশা হয়। সে রাজ্য-সরকারই হোক, কি কেন্দ্রীয় সরকার। কেউই কাজ করে না, কারণ কাজ না করলেও চাকরি যায় না কারোই, প্রমোশনও পাওয়া যায়। তার ওপরে সোনায়-সোহাগা চুরি!
‘প্রতিভা যাহাকে স্পর্শ করে তাহাই…’
ভটকাই বলল।
আমরা হেসে উঠলাম।
আজকাল ভটকাই সঙ্গে থাকলে কথাবার্তা যা হওয়ার তা ওর আর ঋজুদার মধ্যেই হয়। আমি আর তিতির শুধু শুনিই। আমরা, যাকে বলে ‘গুড লিসনারস, বাধ্য হয়ে তাই হয়ে গেছি। এই জন্যেই করুণাসাগর বিদ্যাসাগর মশাই সারাজীবন পরের উপকার করার পরেও শেষ জীবনে বলেছিলেন, ‘ভুলেও পরের ভাল কোরো না। শেষ জীবনে এই তথাকথিত সমাজ’-এর ওপরে বিরক্ত হয়েই না তিনি সাঁওতালদের এক গ্রামে গিয়েছিলেন! ভটকাইকে দেখেই ‘সমাজ’-এর চেহারা কীরকম হতে পারে তা যেন আমরাও একটু একটু বুঝতে শিখছি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ফাঁকা জায়গাতে এসে পড়লাম আমরা। ডানদিকে একটি প্রকাণ্ড আমবাগান। মানে আম্রকুঞ্জ। যাকে বলে, ছায়া-সুনিবিড়।
দেখে, তিতির বলল, কী সুন্দর!
হ্যাঁ। ওই দ্যাখ রাতুর রাজার লাল-রঙা বাড়ি তারই পেছনে।
আমি বললাম, শান্তিনিকেতনের আম্রকুঞ্জ এখন টেকো হয়ে গেছে, এবার থেকে ‘বসন্তোৎসব’ এখানে করলে মন্দ হয় না।
তিতির হেসে বলল, যা বলেছ রুদ্র।
রাতুর রাজার বাড়ি পেরিয়ে যেতেই আরও ফাঁকা হয়ে গেল পথ। নীল আকাশ লাল মাটি, সবুজ ধানক্ষেত, কালো কালো ল্যাটেরাইট পাথরের স্তূপ, গাঢ় সবুজ শালবন। আফ্রিকাতে যে কালো পাথরের স্তূপ দেখেছিলাম তানজানিয়ার সেরেঙ্গেটিতে, আমি আর ঋজুদা, সেগুলো সব ব্যাসাল্ট-এর। আফ্রিকাতে পাথরের এইরকম স্তূপকে বলে ‘কোপি’। ইংরেজি বানান ‘KOPJE’। সিংহরা সুর্যাস্তবেলায় তার ওপর উঠে আড়মোড়া ভাঙে। গদ্দাম-গদ্দাম করে ডাক ছাড়ে। সিংহদের কথা যতই ভাবি, ততই দৃঢ়মূল হয় আমার ধারণা যে, সিংহগুলো যাচ্ছেতাই, ভীরু, কাপুরুষ। দল বেঁধে পেছন পেছন দৌড়ে দৌড়ে গিয়ে একটি প্রাণীর ওপরে হামলে পড়ে তাকে মারে। তারপর কামড়াকামড়ি করে খায়। পুরুষগুলোও পুরুষনয়, স্ত্রী এবং একাধিক স্ত্রীর রোজগারে বসে বসে খায়। বাঘের মতো এমন মযার্দাজ্ঞানসম্পন্ন, একা, দার্শনিক, প্রকৃত-শিকারি প্রাণী পৃথিবীতে বিরল। আমাদের দেশের জঙ্গলের মধ্যে, দিনে কি রাতে, আলোছায়া যেমন রহস্য বোনে, আমাদের বাঘও সেই রহস্যের বাঘবন্দির কোর্টে সন্তর্পণে নিঃশব্দ থাবা ফেলে ফেলে কত দীর্ঘ সময়ের প্রতীক্ষা, তিতিক্ষা, চরম ধৈর্য দেখানোর পরে অনেকই বুদ্ধি খাঁটিয়ে একটি শিকার ধরে। একা বাঁচে, একা ভাবে। সম্পূর্ণ স্বয়ম্ভর প্রাণী। স্বাবলম্বন বাঘের কাছ থেকেই শিখতে হয়।
কতক্ষণ লাগবে?
তিতির বলল।
রাঁচি থেকে ঘণ্টা দেড়েক। সোজা লোহারডাগা-নেতারহাটের পথে বিজুপাড়া অবধি গিয়ে ডানদিকে ঘুরে যাব আমরা। তারপর চামাতে পৌঁছে বাঁদিকে ঘুরব ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জের দিকে।
সোজা রাস্তাটা বিজুপাড়া থেকে ডানদিকে ঘুরে কোথায় গেছে?
খিলাড়ি। এ সি সি-র সিমেন্ট ফ্যাক্টরি আছে। অনেক লাইমস্টোন কোয়ারি কোম্পানিও আছে। বড় হাট বসে খিলাড়িতে। তবে আমরা তো খিলাড়ি যাব না। চামা নামের একটি ছোট্ট গ্রাম থেকে বাঁয়ে ঘুরে যাব।
ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জে ট্রেনে করে আসা যায় না?
যাবে না কেন? গোমো থেকে যে লাইন পালাম্যুর মধ্যে দিয়ে উত্তরপ্রদেশের চৌপান অবধি চলে গেছে, সেই লাইনের ওপরই ছবির মতো ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জ স্টেশন। আসলে, এই লাইন দিয়েই বিহার কোলফিল্ডস-এর কয়লা উত্তরভারতে যায়। প্যাসেঞ্জার ট্রেনের বিশেষ কদর ছিল না এখানে। চৌপান এক্সপ্রেস, গোমো থেকে বারকাকানা হয়ে আসে। সেখানেই ট্রেন বদল হয়। ব্রেকফাস্টেরও সময় পাওয়া যায়। তবে ম্যাকক্লাস্কিতে কখন পৌঁছবে ট্রেন, তার কোনওই স্থিরতা নেই। পথে খাবার-দাবারও বারকাকানার পরে বিশেষ কিছু পাওয়া যায় না। এমনকী চা-ও নয়। তবে এখন হয়তো পত্রাতুতে পাওয়া যায়।
কেন? ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জেই তো মিসেস কার্নির চা-সিঙাড়ার স্টল আছে না?
তিতির বলল।
মিসেস কার্নি গত হয়েছেন অনেকদিন। ভারী ভাল মহিলা ছিলেন। সদাহাস্যময়ী। ওঁর তো একটা গেস্ট হাউসও ছিল। এখনকার মিঃ ক্যামেরনের গেস্ট হাউস তো সেই পুরনো গেস্ট হাউসেরই হাতাতে।
তারপরই ঋজুদা হেসে বলল, ওঃ সরি। আমি তো ভুলেই গেছিলাম। এখানে ‘একটু উষ্ণতার জন্যে পড়া ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জ–স্পেশালিস্ট আছেন একজন। তবে এ কথা ওই বইয়ে আছে কি না জানি না যে, চামা থেকে ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জের পথটি ছিল রাঙা মাটির তখন।
তিতির বলল, আছে।
এখন পিচের হয়ে গেছে সেই পথ। আর এখন দ্রুতগামী ট্রেনও হয়েছে এখানে আসার। শক্তিপুঞ্জ এক্সপ্রেস। তবে গভীর রাতে থামে। তাও এক মিনিটের জন্যে। তবে শুনতে পাই আজকাল নাকি আগে বলে রাখলে এখানে ট্যাক্সি বা কুলিও পাওয়া যায়। আমার বাংলো যখন ছিল, তখন সত্যিই গণ্ডগ্রাম ছিল জায়গাটা। ছিল বলেই, ভাল লাগত অত।
আমরা কোথায় উঠব?
সোমনাথ অনেক করে বলেছিল ওর বাড়িতে উঠতে। তবে এই সময়ে ওর মা-বাবারও আসার কথা। আমাদের আসা-যাওয়ার, খাওয়া-দাওয়ার তো ঠিক থাকবে না। তাই মিস্টার ক্যামেরনের গেস্ট হাউসেই উঠব। যদিও জায়গাটা স্টেশনের কাছে এবং একেবারে ফাঁকা নয়, তবে আমরা বাড়িতে আর কতটুকুই বা থাকব। তা ছাড়া, হোটেল বলে, খাওয়া-দাওয়ারও কোনও অসুবিধে হবে না। সঙ্গে কিষুণ তো থাকবেই। আমাদের শনিবার রাতে ট্রেনে তুলে দিয়ে ও ফিরে যাবে ডালটনগঞ্জ। নইলে ভাবছি, একটা কাজ করতে পারি। গাড়ি এখানে রেখে দিয়ে, ও ট্রেনে করে ডালটনগঞ্জে চলে যাবে। চারদিন ছুটি কাটিয়ে শনিবার দুপুরের গাড়িতে ফিরে আসবে। ট্রেন ধরতে আমাদের বেরতে বেরতে তো ছ’টা হবে বিকেলে। গাড়ি তো ভটকাই ছাড়া আমরা সকলেই চালাতে পারি।
এবার ভটকাইও শিখে নাও। ড্রাইভিং না জানলে খুবই অসুবিধে। আমি বললাম।
তোরা কেউ যা জানিস না আমি সেটাই শিখছি আগে।
কী সেটা?
রাইডিং।
কোথায়?
আমরা সমস্বরে জিজ্ঞেস করলাম।
উলুবেড়েতে।
উলুবেড়েতে রাইডিং কোথায় শেখায়? সেখানে এখন মাঠই বা কোথায়? এ কি সত্যযুগ না কি?
মামাবাড়ির পাশে গঙ্গার ধারে ফুটবল খেলার মাঠে জুগনু ধোপার গাধাকে ফিট করেছি। অন্ধকার হয়ে গেলেই মাঠ ফাঁকা। তখন আমি গাধার দুকান পাকড়ে বসে রাইডিং-প্র্যাকটিস করি। বড়মামিই দুটি করে টাকা দিয়ে দেন জুগনুকে।
আমরা হো হো করে হেসে উঠলাম।
আমি বললাম, তাই তোকে কোনও রবিবারেই পাই না আজকাল।
তিতির বলল দেখো, কোনওদিন না গাধার সওয়ার-হওয়া অবস্থাতেই গঙ্গাতে পড়ে যাও। সাবধানে যা করার কোরো।
আমি বললাম, জীবনানন্দ দাশের কবিতার সেই বিখ্যাত পঙক্তি আছে না?
কোন পঙক্তি?
অবহমানের ভাঁড় এসেছে গাধার পিঠে চড়ে।
তিতির আর ঋজুদা খুব জোরে হেসে উঠল।
ভটকাই গম্ভীর মুখে বলল, রাইডিং ইজ রাইডিং। ঘোড়া-গাধাতে তফাত কী? আসল হচ্ছে রিম। রিমটা আয়ত্ত করতে পারলেই হয়ে গেল।
ইস, তুই ক’দিন আগে যদি আসতিস এখানে।
ঋজুদা বলল।
কেন?
ভটকাই একটু উদ্বিগ্ন হয়ে বলল।
মিস্টার ক্যামেরনেরই তো ঘোড়ার স্টার্ড-ফার্ম ছিল ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জে। কত ঘোড়া ছিল! দিব্যি এখানেই শিখতে পারতিস।
এখন নেই?
না। এখন বন্ধ করে দিয়েছেন। অথবা ঘোড়াগুলো তুই আসবি জেনেই ভাগলবা হয়েছে হয়তো আগেভাগেই।
আমি বললাম, আচ্ছা ঋজুদা, শনিবারেই যে ফিরে যাবে, তা আগে থেকেই ঠিক করলে কী করে? কী করে জানলে যে, শনিবারের মধ্যেই কাজ হয়ে যাবে।
কাজটা তো কঠিন কিছুই নয়। বিপজ্জনকও নয়। হলে, চারদিনেই হবে। নইলে কোনওদিনও হবে না। তাই রিটার্ন-টিকিট কেটেই এসেছি। এইবার সওয়াল-জবাব বন্ধ করে ছিন-ছিনারি দ্যাখ। বর্ষাতে ম্যাকক্লাস্কির সৌন্দর্যই আলাদা। বিজুপাড়া থেকে গাড়ি ডানদিকে মোড় নিলেই দেখতে পাবি। জঙ্গল, নদী, সবুজ ক্ষেত, ঝাঁটি-জঙ্গল। তারপর চামার মোড় থেকে বাঁদিকে ঢুকে গেলে তো কথাই নেই। শুনেছি যে, ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জ নাকি এখনও সবুজ এবং আনস্পয়েন্ট আছে। বড় গাছ কাটা গেছে অনেক। তবে নতুন গাছ গজিয়েছেও। এখানে আসতে হয় দোলের আগে। তখন লালে লাল হয়ে থাকে দশদিক।
এখানে অনেক কমিউনিস্ট আছে বুঝি?
ভটকাই বলল।
আমরা হেসে উঠলাম।
পলাশ, শিমুল, অশোক। এই সব গাছেদের রাজনৈতিক বিশ্বাস-অবিশ্বাসের কথা তো বলতে পারব না।
ঋজুদা বলল।
ভটকাই এবার গাধার পিঠে রাইডিং-প্র্যাকটিস করার চেয়েও বেশি লজ্জা পেল।
চামার মোড়ে পৌঁছবার আগেই বাঁদিকে একটা পাহাড় দেখিয়ে ঋজুদা বলল, ওটা দেখে রাখ। দেখছিস, চুড়োতে একটা নাকের মতো আছে। এর নাম, ম্যাকক্লাস্কিজ নোজ, অর্থাৎ ম্যাকক্লাস্কির নাক।
জঙ্গল, বিজুপাড়ার পর থেকেই আছে। কিন্তু গাড়িটা চামার মোড় থেকে বাঁদিকে ঘুরতেই সত্যি আশ্চর্য সুন্দর জঙ্গল দু’দিকে। দু’দিকেই এত সুন্দর জঙ্গল আর উপত্যকা যে, চোখ ফেরানো যায় না।
এই হল ছোটানাগপুর প্ল্যাটো বা মালভূমি। রাঁচি, হাজারিবাগ, পালা–এই তিন জেলা ছিল আগে। এখন টুকরো টুকরো হয়ে জেলা বেড়ে গেছে। কোডারমা, যেমন আলাদা জেলা এখন। বর্ষাকালে সমুদ্রতীর অথবা এই ছোটনাগপুর মালভূমির তুলনা নেই। ভোর হতেই ট্রেন থেকেই দেখলি না দু’পাশের দৃশ্য?
সত্যি! দারুণ সুন্দর।
আমরা একই সঙ্গে বললাম। এখন আর কী দেখছিস। জঙ্গল তো শেষই করে ফেলা হল। যেমন রাজা তেমন প্রজা। বিরিসা মুণ্ডার দেশের মুণ্ডাদের একটা গান আছে:
ছোটানাগাপুরা হো ছোটানাগাপুরা।
সোনারূপান রূপালেকান ছোটানাগাপুরা হো ছোটানাগাপুরা।
তিতির বলল, এই গানটার এবং মুণ্ডাদের আরও অনেক গানের কথা পড়েছি ‘সাসানডিরি’ নামের একটা বইয়ে।
সাসানডিরি শব্দের মানে জানিস?
জানি বইকী। সাসানডিরি’ মানে, মুণ্ডা ভাষাতে, কবরস্থান। উপন্যাসটির শেষে একটি দারুণ দাবানলের বর্ণনা আছে। গায়ে কাঁটা দেয়। জঙ্গলের মধ্যে স্বপ্নে-পাওয়া সোনা আনতে গেছিল চাটান মুণ্ডা তার প্রেমিকা মুঙ্গরীর সঙ্গে। দু’জনেই ছাই হয়ে গেল। সেই সোনা পাহারা দিত এক সোনার সাপ।
মুণ্ডাদের মিথোলজিতে এই সব আছে বটে।
বিরিসা মুণ্ডা, উলগুলান, তাদের নানা প্রথা, তাদের গান, কত কী জেনেছি সাসানডিরি’ পড়ে।
তারপরেই তিতির বলল, রুদ্র, তুমিও তো ঋজুদার সঙ্গে কম জঙ্গলে ঘুরলে। তোমারও কিন্তু পড়াশুনো করে লেখা উচিত। শিক্ষিত আর অশিক্ষিতর মধ্যের বিভাজক হচ্ছে ঔৎসুক্য। যার ঔৎসুক্য নেই সে অশিক্ষিত। তোমার মতো এত জায়গা ঘোরার সুযোগ তো সকলের হয় না। এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করা উচিত তোমার।
ঠিকই বলেছ।
আমি বললাম।
সত্যিই ঠিক বলেছে তিতির। তা ছাড়া, তুই যদি তিতিরের প্রিয় সাসানডিরি’র লেখককে লিখে হারাতে পারিস, তা হলে আমার বিশেষ ভাল লাগবে।
সব বিষয়েই প্রতিযোগিতা কি ভাল? তুলনা?
ভটকাই বলল।
ঋজুদা বলল, গাধার সঙ্গে ঘোড়ার তুলনার কথা না তুলেই আমি বলব যে, প্রতিযোগিতা অবশ্যই ভাল। তুই জীবনে যা কিছুই করিস না কেন, সে জিনিস তোর চেয়ে ভাল করে আর কেউই করতে যেন না-পারে, এই জেদ-এর জন্ম দিতে হবে। শুধু তোরই নয়, তোদের প্রত্যেকেরই ভিতরে। এক নম্বর হয়েই যদি না বাঁচতে পারলি, তবে জীবনে বেঁচে থেকে কী লাভ? জীবনের যে ক্ষেত্রেই যাবি, সেইখানেই এক নম্বর হতে হবে। তোদের প্রত্যেককে মানুষ হতে হবে। মানুষের চেহারার ডামি হয়ে থাকলেই চলবে না।
এবার আমি সুযোগ পেয়ে ভটকাইকে বললাম, প্রতিভা যাহাকে স্পর্শ করে তাহাই…’
ঋজুদা হঠাৎ বাঁদিকে তাকিয়ে কিষুণকে গাড়ি থামাতে বলল।
কী হল?
তিতির বলল।
নাম, নেমে, এখান থেকে নীচের উপত্যকাটা দ্যাখ আর দ্যাখ ম্যাকক্লাস্কি’জ নোজ। কত উঁচু দেখেছিস পাহাড়টা! আর একেবারে মানুষের নাকেরই মতো চুড়োটা, তাই না?
ঠিক।
কেউ উঠেছে ওই উঁচু পাহাড়ের চুড়োয়?
ভটকাই জিজ্ঞেস করল।
জানি না। তবে পর্বতারোহী ছাড়া ওখানে ওঠা সম্ভব নয়। খালি হাতে যাওয়াটাও বিপজ্জনক। বাঘ, ভাল্লুক, সাপের আড্ডা ওই পাহাড়। এখন তো আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করলেই জেল।
যা বলেছ। পশু-পাখি মারলেই নির্ঘাত জেল। মানুষ মেরে বুক ফুলিয়ে ঘুরতে পার, অথবা লুকিয়ে, যেমন ম্যাক টেইলর লুকিয়ে বাঁচছে। কোথায় সুদূর কানাডা আর কোথায় রাঁচি-পালামুর জেলার বর্ডারের এই ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জ।
তিতির বলল।
ঋজুদা বলল, এই দ্যাখ, আমলকী বন। চৈত্রর শেষে থোকা-থোকা আমলকী ঝুলে থাকে এই সব গাছের ডাল থেকে। গাছ থেকে পেড়ে খাবি, খেয়ে, এক গ্লাস জল খাবি, মনে হবে শরবত খাচ্ছিস। এমন মিষ্টি।
তারপর বলল, মন ভরেছে তো! এবার চল। চলো কিষুণ।
চালিয়ে হুজৌর।
হুজৌর শব্দটা দারুণ উচ্চারণ করে কিষুণ। কথাটা হুজুর নয়, হুজৌরই। বাঙালিরা খেজুড়ের মতো উচ্চারণ করে হুজৌরকে হুজুর বলে।
ভাবছিলাম, আমি।
হাতঘড়ি দেখে ঋজুদা বলল, আর পনেরো মিনিট। এসে গেলাম ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জে।
‘দ্য গঞ্জ’ বলো। ভটকাই বলল।
আগেকার দিনে যখন নানা দেশি সাহেব আর অ্যাংলো ইন্ডিয়ানে ভর্তি ছিল জায়গাটা, তারা গর্ব করে নবাগন্তুকদের বলত, ‘উ নো, উই হ্যাভ দ্যা ওয়াটার অ্যান্ড দ্যা এয়ার ইন দ্যা গঞ্জ। উই ডোন্ট নিড এনিথিং এলস। উ্য ক্যান ওয়াক উইথ ইওর ব্যাক স্ট্রেইট, ইভিন হোয়েন ঊ্য আর নাইনটি এইট, ইফ উ্য লিভ হিয়ার। দিস ইজ দ্য ট্রেইট অফ দ্যা গঞ্জ।
আমরা চুপ করে থাকলাম।
.
মিস্টার ক্যামেরনের গেস্ট হাউসটা স্টেশনের কাছেই। ট্রেনে যাঁরা আসবেন ম্যাকক্লাস্কি স্টেশনে তাঁদের খুব বেশিদূর আসতে হবে না। সামনে দিয়ে একটি পাহাড়ি নদী বয়ে গেছে। নদীটা ছোট্টই। তার পাশে উঁচু ডাঙার ওপরে গেস্ট হাউস।
টাটা সুমোটা গেট দিয়ে বাঁদিকে ঢুকল। দুটো মস্ত কৃষ্ণচূড়া গাছ। এক সারি ঘর। ডানলোপিলো আছে, গিজার আছে। সামনে টানা বারান্দা রাস্তার দিকে। সেই বারান্দাতে বসে থাকলেও বেশ সময় কেটে যায়। পথের একপাশে গেস্ট হাউস আর অন্য পাশে জঙ্গল। তার পরেই রেল লাইন। বাঁদিকে একটু গেলেই ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জ স্টেশন।
