তিতলিপুরের জঙ্গলে (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

আট

কর্নেলের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। আন্দাজে ঢিল উনি ছোড়েন না। আমার অজ্ঞাতসারে নিশ্চয় ওঁর হাতে কোনও সূত্র এসে গিয়েছিল। কিন্তু এবার তাহলে দেখছি রহস্যটা জমজমাট হয়ে উঠল।

 

কথাটা বলে সুনয়নী দেবীও অবাক হয়েছেন লক্ষ্য করলাম। তিনি মৃদুস্বরে বললেন মেজদাকে আমি ছোটোবেলায় দেখেছিলাম, সে-কথা তো আপনাকে বলেছি। বড়দার কাছে অবশ্য তার অনেক কথা শুনেছি। মেজদার কথা আপনি জানতে চাইছেন। মেজদা কি

 

কর্নেল ওঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন–জাহাজে চাকরির কথা ছাড়া আর কী কথা শুনেছেন, আগে বলুন। তারপর আপনার প্রশ্নের উত্তর দেব।

 

সুনয়নী দেবী মুখ নামিয়ে আস্তে বললেন–বড়দা বলতেন, মেজদা আমেরিকা থেকে এক মেমসায়েবকে বিয়ে করে এনেছিল। মেমবউয়ের সঙ্গে বনিবনা হয়নি। সে মেজদাকে ছেড়ে পালিয়ে যায়।

 

-আর কিছু?

 

–আর একটা কথা শুনেছিলাম। সাংঘাতিক কথা। কথাটা বলা উচিত হবে কিনা জানি না।

 

সুনয়নী দেবী একটু কুণ্ঠার সঙ্গে কথাটা বললেন। তাই কর্নেল বললেন–আপনি আপনার বড়দার খুনিকে শাস্তি দিতে চান না?

 

-হ্যাঁ! নিশ্চয় চাই। তবে..

 

–তাহলে সব কথা খুলে বলুন। আপনার ভয়ের কোনও কারণ নেই। আমি আপনার পাশে আছি।

 

একটু চুপ করে থাকার পর সুনয়নী বললেন–জাহাজ ডুবে মেজদা মারা গেছে বলে বড়দার কাছে খবর এসেছিল। বড়দা তখন কলকাতায় ছিলেন। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, এক রাত্রে মেজদা গোপনে বড়দার কাছে এসেছিল। তার কিছু জিনিসপত্তর রেখে গিয়েছিল। বড়দা পরে আমাকে বলেছিলেন, পুলিশ তাকে খুঁজছে! বড়দা রাগি লোক ছিলেন। বলেছিলেন, অজু আমাদের রায়বংশের কলঙ্ক। আর

 

-হ্যাঁ। বলুন। আপনার ভয়ের কারণ নেই।

 

-আর জাহাজিৰাবু, মানে চন্দ্রপুরের শম্ভু চৌধুরি যখনই গ্রামে আসত, তখনই বড়দার সঙ্গে প্রায়ই আড্ডা দিত। গতবছর এমনই শীতের এক রাত্রে বড়দার সঙ্গে জাহাজিবাবু চুপিচুপি মেজদা সম্পর্কে কী সব কথা বলছিল। আমি স্পষ্ট কিছু বুঝতে পারিনি।

 

–আপনি আপনার বড়দার কাছে এ বিষয়ে কিছু জানতে চাননি?

 

–চেয়েছিলাম। কিন্তু বড়দা রেগে গিয়েছিলেন। আমাকে নাকগলাতে নিষেধ করেছিলেন।

 

–সেই কথাবার্তার মধ্যে এমন কি কিছু আপনি শুনেছিলেন, যা আপনার মনে পড়ে?

 

সুনয়নী দেবী আবার মুখ নামিয়ে আঙুল খুঁটতে থাকলেন। একটু পরে বললেন-জাহাজিবাবু বড়দাকে বলছিল, অজুর লুকিয়ে রাখা জিনিসটার বড়দা যেন তাকে দেয়। তার বদলে জাহাজবাবু বড়দাকে টাকা দেবে।

 

-হঁ। আর কিছু?

 

সুনয়নী মাথা নাড়লেন। –আর তেমন কিছু মনে পড়ছে না। ওই যে বললাম, বড়দা খুব রাগি মানুষ ছিলেন। কিছু জানতে চাইলে খাপ্পা হয়ে বেরিয়ে যেতেন।

 

কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট জ্বেলে বললেন-এবার আপনার প্রশ্নের উত্তর দিই। আপনি দীপনারায়ণবাবুর লেখা যে পোস্টকার্ডটা আমাকে দেখিয়েছেন, ওতে আপনার মেজদা সম্পর্কে একটা লাইন আছে। অজু তোমার কাছে যেতে পারে। তাকে পাত্তা দেবে না। এই অজু কে, সেই নিয়ে ধাঁধায় পড়েছিলাম। আপনার কথা শুনে ধাঁধার জট খুলে গেল। আপনাকে ধন্যবাদ। এবার চলি।

 

কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। সুনয়নী চাপা স্বরে বললেন-মেজদাকে কেন পুলিশ খুঁজছে, দয়া করে আমাকে বলে যান কর্নেলসায়েব!

 

উঠোনে হাঁটতে হাঁটতে কর্নেল বললেন–ঠিক সময়ে সব জানতে পারবেন। আর একটা কথা, আপনি একটু সাবধানে থাকবেন। আমি চন্দ্রপুর থানায় বলে দেব। সাদা পোশাকে অন্তত দুজন পুলিশ আপনার বাড়িতে আপনাদের দুরসম্পর্কের আত্মীয় হিসেবে থাকবে।

 

-কেন একথা বলছেন?

 

–জাহাজিবাবু আর তার লোকেরা আপনার বড়দার ঘরে হামলা করতে পারে। কিন্তু–আপনি একটুও ভয় পাবেন না।

 

এবার সুনয়নী শক্ত মুখে বললেন-কর্নেলসায়েব! আমি জীবনকে অনেক দুঃখকষ্ট পেয়েছি। অনেক ঝড়ঝাপটা সামলেছি। এখন আমি মরিয়া। তা ছাড়া তিতলিপুরের রায়বংশের রক্ত আমার শরীরে আছে। রায়বাঘিনি কথাটা জানেন তো?

 

কর্নেল হাসলেন। -জানি। তবু আপনি সাবধানে থাকবেন। …

 

কলকাতা ফেরার পথে কর্নেলকে জিজ্ঞেস করেছিলাম–তাহলে একটা পুরোনো পোস্টাকার্ড থেকে আপনি অজয়েন্দুবাবুর সূত্র খুঁজে পেয়েছিলেন?

 

কর্নেল বাইনোকুলার চোখে রেখে বললেন–হুঁ।

 

-কর্নেল?

 

–বলো?

 

–সেই লাল মারুতিটা আমাদের ফলো করে আসেনি কিন্তু। এলে টের পেতাম।

 

কর্নেল আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়ে বললেন–এসেছিল। কিন্তু খুব দুর থেকে ফলো করেছিল। এই বাইনোকুলারে যা দেখা যায়, তোমার চর্মচক্ষুতে তা দেখা যায় না।

 

–সর্বনাশ! এখনও কি গাড়িটা আমাদের ফলো করে আসছে?

 

-না। মন্দিরের কাছে হাইওয়েতে তোমার গাড়ি বাঁক নেওয়ার সময় গাড়িটা উলটোদিকে উধাও হয়ে গেছে। সম্ভবত চন্দ্রপুরে জাহাজিবাবুর কাছে গেছে।

 

গাড়িটা তাহলে চন্দ্রপুরের জাহাজবাবুর?

 

–এ বিষয়ে আমি এখনও শিয়োর নই, জয়ন্ত।

 

–তাহলে যে বলছেন চন্দ্রপুরে জাহাজবাবুর কাছে গেছে?

 

–আমি সম্ভবত বলেছি। শিয়োর নই। …

 

কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরতে পৌনে একটা বেজে গিয়েছিল। ষষ্ঠীচরণ মুচকি হেসে বলেছিল–একটু আগে টিকটিকিবাবু ফোন করেছিলেন। আবার ফোন করবেন বাবামশাইকে।

 

কর্নেল চোখ কটমটিয়ে বলেছিলেন–আমাদের খিদে পেয়েছে।

 

-সব রেডি বাবামশাই!

 

কর্নেল শীতকালে সপ্তাহে মাত্র একদিন স্নান করেন। আজ তার স্নানের দিন নয়। আমি গরমজলে স্নান করে শরীরটা ঝরঝরে তাজা করে নিলাম। দেড়টা নাগাদ খাওয়াদাওয়ার পর যথারীতি ডিভানে চিত হয়ে ভাতঘুমের জন্য প্রস্তুত হলাম। কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজে চরুট টানছিলেন।

 

কিন্তু টেলিফোনের বিরক্তিকর শব্দে আমার ঘুমের রেশ ছিঁড়ে গেল।

 

কর্নেল রিসিভার তুলে সাড়া দিয়ে বললেন-বলুন হালদারমশাই!..কিন্তু আপনি কোথা থেকে ফোন করেছেন?..বাড়ি থেকে তার মানে…আশ্চর্য! বলেন কী! সুশীলা..হা আপনার অনুমান তাহলে সত্যি? তারপর? ..হুঁ..হুঁ..হুঁ ঠিক আছে। আপনি আপনার ক্লায়েন্ট ক্যাপটেন সিংহকে এখনই কথাটা জানাবেন না। …হ্যাঁ। আপনি এখনই আমার কাছে চলে আসুন। …আহা! চর্মচক্ষে দিনের বেলায় হরির দর্শন পেয়েছেন। আপনি ভাগ্যবান। ..রাখছি। চলে আসুন।

 

কর্নেল রিসিভার রেখে আমার দিকে ঘুরলেন। বললাম–আমার ভাতঘুম আজ আর বরাতে নেই। কিন্তু গোয়েন্দাপ্রবর সাংঘাতিক কিছু খবর আপনাকে জানিয়ে দিলেন মনে হচ্ছে। ঘুমের জন্য তাই আমার দুঃখু নেই। কিন্তু সুশীলা-র ব্যাপারটা কী? ক্যাপটেন সিংহের পরিচারিকা

 

কর্নেল আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন-ঘুম না আসে, চোখ বুজে ভেড়ার পালের ভেড়াগুলো শুনতে থাকো। আমি ততক্ষণ চুরুটের সুখ উপভোগ করি। নো মোর টক। …

 

কতক্ষণ পরে ডোরবেল বাজল। কর্নেল হাঁক দিলেন-ষষ্ঠী!

 

তারপর সবেগে গোয়েন্দাপ্রবর কে কে হালদার ঘরে ঢুকলেন। দেখলাম, তার মুখে প্রসন্ন হাসি। পরনে প্যান্ট-শার্ট-সোয়েটার। ছদ্মবেশ ছেড়ে স্নান করেছেন, তা-ও বোঝা যাচ্ছিল। সোফায় বসে আগে একটিপ নস্যি নিলেন। তারপর বললেন-কর্নেল স্যার কইছিলেন হরির দর্শন পাইছি। হঃ! তা পাইছি।

 

কর্নেল বললেন এবং ক্যাপটেন সিংহের কাজের মেয়ে সুশীলারও?

 

-হঃ। ঠিক কইছেন!

 

–কার দর্শন কোথায় পেলেন?

 

–ফোনে কওন যায় না। এখন কইয়া ফেলি। আমি পাগলা সাজছিলাম। সেই গলির অন্যদিকে বটতলায় একখান মন্দির আছে। সেইখানে বইয়া ছিলাম। হঠাৎ দেখি, সুশীলা আইয়া হরিবাবুর বাড়িতে ঢুকল। তারপর সেই লোকটা–যে ক্যাপটেন সিংহরে ফলো করে, সে বারাইল। কিছুক্ষণ পরে সে একখান ট্যাক্সি আনল। এইবার বাড়ি থেইক্যা যিনি বারাইলেন, তিনিই যে হরিবাবু তা বুঝলাম। ক্যান কী, গলিতে এক ভদ্রলোকে তারে নমস্কার কইরা কইল–এই যে হরিবাবু! কেমন আছেন? হরিবাবু ট্যাক্সিতে চাপল। তার লগে সুশীলাও চাপল। ট্যাক্সিখান যাওয়ার পর সেই ভদ্রলোক হরিবাবুর লোকেরে জিগাইলেন, তোমার বাবু বাড়ি বেচবেন শুনলাম? নোকটা কী একটা কইল, বুঝলাম না। সে বাড়ি ঢুকল। আমিও উঠলাম। ট্যাক্সির নাম্বার দেখছিলাম। পরে নোটবইয়ে টুকছি। কে কইল দেখি নাই–পাগলা লেখাপড়া জানে! আর একজন হাসতাছিল সেয়ানা পাগল! এইসব শুইন্যা আমি কাট করলাম।

 

কর্নেল গম্ভীর মুখে শুনছিলেন। এতক্ষণে বললেন-হরিবাবুর চেহারা কেমন?

 

–দেইখ্যা বুড়া মনে হইব। কিন্তু বুড়া না। তাগড়া শরীর। মাথায় সাদা চুল। গোঁফ আছে। গোঁফ কাঁচাপাকা। পরনে ধুতি, সার্জের খয়েরি রঙের পাঞ্জাবি। কাঁধে শাল ছিল। হাতে ছড়ি ছিল। আর একখানা ব্রিফকেস।

 

আমি বলে উঠলাম–তাহলে এই হরিবাবু কখনই চন্দ্রপুরের জাজিবাবু নয়। হালদারমশাই আমার দিকে ঘুরে কী বলতে যাচ্ছিলেন। কর্নেল চোখ কটমটিয়ে আমাকে বললেন–উঠে পড়ো জয়ন্ত! শুয়ে কথা বলে রোগীরা। উঠে বোসো।

 

তারপর তিনি হালদারমশাইকে বললেন–আপনি কি সুশীলার বাড়ির ঠিকানা জানেন?

 

হালদারমশাই সোয়েটারের গলার ভিতর হাত ঢুকিয়ে শার্টের পকেট থেকে একটা ছোট্ট নোটবই বের করলেন। পাতা ওলটাতে ওলটাতে বললেন-ক্যাপটেন সিংহর লগে ঠিকানা লইছিলাম। উনি সুশীলারে বিশ্বাস করেন। কইছিলেন, মাইয়াটারে ওনার দেশের বাড়ি থেইক্যা আনছিলেন।

 

–ক্যাপটেন সিংহের তাহলে গ্রামে বাড়ি ছিল?

 

–হঃ।

 

–আপনি এ কথাটা আমাকে তো বলেননি।

 

গোয়েন্দাপ্রবর অবাক হয়ে বললেন–আপনি জিগান নাই। জিগাইলে কইতাম।

 

-ক্যাপটেন সিংহের দেশের বাড়ি কোথায়, তা কি জিজ্ঞেস করেছিলেন?

 

–না। আপনি যখন কইতাছেন, তখন এবার জিগাইমু।

 

–দেরি করা ঠিক হবে না হালদারমশাই। আপনি বরং এখান থেকে ফোনে ক্যাপটেন সিংহের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। ওঁর ফোনে আড়ি পেতেছে কেউ, সে-কথা উনি আমাকে জানিয়েছেন। তাই না?

 

-হঃ।

 

–তাহলে ফোনে ওঁকে শুধু বলুন, আপনি ওঁর সঙ্গে জরুরি কাজে দেখা করতে যাচ্ছেন।

 

গোয়েন্দাপ্রবর তখনই রিসিভার তুলে ডায়াল করলেন। তারপর বললেন–রিং হইতাছে। কেউ ধরতাছে না ক্যান? আমি যাইয়া দেখি বরং। মিসটিরিয়াস ব্যাপার।

 

বলে উনি যথারীতি সবেগে বেরিয়ে যাওযার পর কর্নেল জাপানি ওয়ালকুকে সময় দেখে নিলেন। তারপর বললেন–শিপ কর্পোরেশনের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর মি. অসীম সোম এখনও সম্ভবত অজয়েন্দ্র রায়ের ব্যাপারে কোনও রেকর্ড খুঁজে পাননি। অথচ খুব শিগগির আমার ওটা দরকার।

 

বললাম–সুনয়নী দেবী বলছিলেন, ওঁর মেজদা পুলিশের ভয়ে গা-ঢাকা দিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। এদিকে ক্যাপটেন সিংহ বলেছেন, জাহাজডুবির আগে উনি একটা গোপন জিনিস তার কাছে লুকিয়ে রাখতে দিয়েছিলেন।

 

–হ্যাঁ। ক্যাপটেন সিংহ রিটায়ার করার পর সেই গোপন জিনিসটা নাকি বিছানার তলায় রেখেছিলেন। তা ছাড়া সেই জিনিসটা যে কী, তা কি ক্যাপটেন সিংহের জানবার কৌতূহল হয়নি? জয়ন্ত! ক্যাপটেন সিংহের কথাটা বড্ড গোলমেলে।

 

একটু উত্তেজিত হয়ে বললাম-কর্নেল! জিনিসটা জাহাজিবাবু চুরি করেছিলেন–এটা আপনারই সিদ্ধান্ত। তাহলে জিনিসটা একটা নলে রাখা পার্চমেন্ট! আপনি সেটা তিতলিপুরের জঙ্গল থেকে উদ্ধার করেছেন।

 

কর্নেল হাসলেন। চোরের ওপর বাটপাড়ি করেছি। কিন্তু ক্যাপটেন সিংহ যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা হালদারমশাইকে জানাননি, এটাই আশ্চর্য!

 

–আমার মতে, যে-ভাবে হোক, ক্যাপটেন সিংহের সঙ্গে আপনার দেখা করা উচিত।

 

–দেখা যাক।

 

বলে কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে ধ্যানস্থ হলেন। আমার ভাতঘুম কেটে গেছে। আমি উঠে গিয়ে সোফায় বসলাম। শীতের দিনের আলো কমে এসেছে। একটু পরে ষষ্ঠীচরণ কফি রেখে। গেল। কর্নেল চোখ খুলে সোজা হয়ে বসলেন। তারপর কফিতে চুমুক দিলেন। মুখে অস্বাভাবিক গাম্ভীর্য। তাই আমিও গম্ভীর হয়ে কফি খেতে থাকলাম।

 

কফিপানের পর কর্নেল চুরুট ধরিয়ে আমার দিকে তাকালেন। দেখলাম, সেই বিকট গাম্ভীর্যটা আর নেই। মুখে একটু হাসি ফুটেছে। বললেন–ডার্লিং! ভাতঘুম নষ্ট করেছি এবং একটু বকে দিয়েছি বলে এই বৃদ্ধের প্রতি তোমার ক্ষোভ হওয়া স্বাভাবিক।

 

হেসে ফেললাম। –মোটও না। আপনি তুম্বো মুখ করে থাকলে অস্বস্তি হয়।

 

-আমি ক্যাপটেন সিংহের পরিচারিকা সুশীলার ব্যাপারটা ভাবছিলাম। মেয়েটি জাহাজিবাবু। শঙ্কু চৌধুরির চর বলে হালদারমশাইয়ের অনুমান। অনুমানটা সম্ভবত ঠিকই। কিন্তু সেই মেয়ে আজ হরিবাবুর বাড়ি এসে ট্যাক্সি চেপে হরিবাবুর সঙ্গে কোথাও বেরিয়েছে। তাহলে হরিবাবুর সঙ্গে জাহাজিবাবুর সম্পর্ক আছে বলে ধরে নেওয়া যায়। তাই না?

 

–অঙ্ক কষলে তা-ই দাঁড়াচ্ছে বটে! কিন্তু কে এই হরিবাবু?

 

–সঠিক প্রশ্ন।

 

–তার মানে, আমরা তিতলিপুরের জঙ্গলে পথ হারিয়ে হন্যে হচ্ছি।

 

কর্নেল তার বিখ্যাত অট্টহাসিটি হাসলেন। তারপর বললেন–ঠিক বলেছ। তিতলিপুরের জঙ্গলে দুর্লভ প্রজাতির নীল সারসের চেয়ে আরও দুর্লভ কিছু আছে।

 

অবাক হয়ে বললাম–তার মানে?

 

এইসময় টেলিফোন বেজে উঠল। কর্নেল রিসিভার তুলে সাড়া দিলেন। –বলছি! বলুন নরেশবাবু!..ধন্যবাদ! চন্দ্রপুরের ও সিমি. রাজেন্দ্র হাটি বুদ্ধিমান!…হ্যাঁ। দীপনারায়ণবাবুর ঘরে নিশ্চয় কিছু সূত্র পাওয়া যেতেই পারে। ..ঠিক আছে। রাখছি।

 

কর্নেল রিসিভার রেখে আবার আমার দিকে সহাস্যে তাকালেন। বললাম–সুনয়নী দেবীর বাড়িতে সাদা পুলিশের গার্ড রাখবার কথা বলেছিলেন। সেই ব্যাপারটা কি?

 

-ঠিক ধরেছ।

 

–কিন্তু কখন লালবাজারের ডিটেকটিভ সাব-ইনপেকটার নরেশবাবুকে ফোন করেছিলেন?

 

–তুমি যখন বাথরুমে স্নান করছিলে!

 

-একটু আগে আপনি বললেন, তিতলিপুরের জঙ্গলে নাকি আরও দুর্লভ কিছু আছে। ব্যাপারটা কী?

 

কর্নেলের কাছে এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার আগে আবার বাধা পড়ল। ডোরবেল বাজল এবং কর্নেল হাঁক দিলেন-ষষ্ঠী!

 

তারপর প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে কে হালদার আবার সবেগে প্রবেশ করে সোফায় সশব্দে বসলেন। বললেন-হেভি মিস্ট্রি কর্নেলস্যার!

 

কর্নেল বললেন-বলুন হালদারমশাই!

 

এবার হালদারমশাই উত্তেজিতভাবে যা বললেন, তার সারমর্ম এই : গোয়েন্দাপ্রবর ক্যাপটেন সিংহের বাড়ি গিয়ে দেখেন, তার দোতলার ঘরের দরজা এবং কোলাপসি গেটে তালা আঁটা। একতলার মুদির দোকানের মালিক মিছরিলালকে তিনি ক্যাপটেন সিংহের কথা জিজ্ঞেস করেন। মিছরিলাল তাকে বলেছে, ক্যাপটেনসায়েবের হঠাৎ স্ট্রোক হয়েছিল। সুশীলা ট্যাক্সিতে একজন ডাক্তারবাবুকে ডেকে এনেছিল। সেই ট্যাক্সিতে অজ্ঞান অবস্থায় ক্যাপটেনসায়েবকে কোনো নার্সিং হোম কিংবা হাসপাতালে নিয়ে গেছে। মিছরিলালকে সুশীলা ডেকেছিল। মিছরিলাল একা একশো। সে ক্যাপটেনসাহেবকে সিঁড়ি দিয়ে বয়ে এনে ট্যাক্সিতে ঢুকিয়েছিল। সুশীলা পিছনের সিটে ক্যাপটেনসায়েবকে ধরে বসে ছিল। সামনের সিটে বসেছিলেন ডাক্তারবাবু।

 

সবটা শোনার পর আমি বললাম–কিন্তু হেভি মিস্ট্রি বলছেন কেন হালদারমশাই?

 

প্রাইভেট ডিটেকটিভ শ্বাসপ্রশ্বাসের মধ্যে বললেন–বুঝলেন না? হরিবাবু তো ডাক্তার না। তারে ডাকতে অত দূর থেইক্যা সুশীলা আইবে ক্যান? ক্যাপটেন সিংহরে কিডন্যাপ করছে হরিবাবু।

 

দেখলাম, কর্নেল রিসিভার তুলে ডায়াল করে কাকে চাপাস্বরে কিছু বলছেন। হালদারমশাই একটিপ নস্যি নিয়ে বললেন–ট্যাক্সির নম্বর লইছি। পুলিশেরে কর্নেলস্যার নম্বরটা জানাবেন। তারে ধরলে মিস্ট্রি সম্ভ হওনের কথা। …

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *