তিতলিপুরের জঙ্গলে (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

সাত

হিটাইট বা হাত্তিদেশের প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে ড. মুখার্জির বক্তৃতা আমার ক্রমশ মাথা ধরিয়ে দিচ্ছিল। লক্ষ্য করছিলাম, কর্নেলও উশখুশ করছেন। পণ্ডিতদের পাল্লায় পড়লে এই দুরবস্থা থেকে রেহাই নেই। সন্ধ্যা সাতটা বাজতে চলেছে। কর্নেলের ইশারায় আমি কাচুমাচু মুখে বললাম স্যার! আমাকে কাগজের অফিসে ফিরতে হবে। আমি কর্নেলকে পৌঁছে দিয়ে চলে যাব। ভেবেছিলাম। তো জ্ঞানার্জনের লোভ সম্বরণ করতে পারলাম না।

 

ড. মুখার্জি বললেন–তা এতক্ষণ বলবেন তো? কর্নেলসায়েব আর একদিন আসুন। মিশরের বিধবা রাজবধূ নেকারতিতির সঙ্গে কোনও হিটাইট রাজপুত্রের সত্যি বিয়ে হয়েছিল কিনা, তার প্রমাণ মেলেনি। যাই হোক, কর্নেলসায়েব! এটা নকল কপি হলেও পার্চমেন্টটা কায়রো মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। সেই নকলের দামও কম নয়। মার্কিন ধনীরা লক্ষ ডলারে হাতাতে চাইবে। আপনি এটার মূল কপি কোথাও কি দেখেছেন?

 

কর্নেল কথা না বাড়িয়ে বললেন–না। একটা বিদেশি পত্রিকায় ছবি দেখে কৌতূহল হয়েছিল। …

 

গড়িয়াহাট রোডে বাঁক নিয়ে কিছুটা যাওয়ার পর কর্নেল চাপা স্বরে বললেন–জয়ন্ত! একটা লাল মারুতি আমাদের ফলো করছে। গাড়িটা ড. মুখার্জির গেটের একটু তফাতে দাঁড়িয়ে ছিল। লক্ষ্য রেখে চলল।

 

একটু পরে ব্যাকভিউ মিররে দেখলাম গাড়িটা দ্রুত এগিয়ে আসছে। কর্নেল বললেন ডানদিকের গলিরাস্তায় আচমকা মোড় নাও। তারপর আমি গোলকধাঁধায় ঘুরিয়ে মারব মারুতিটাকে।

 

কর্নেলের নির্দেশে অলিগলি ঘুরতে ঘুরতে একসময় চেনা রাস্তা ব্রড স্ট্রিটে পৌঁছুলাম। কর্নেল বললেন–এটা সুলক্ষণ। কেউ নিজে থেকেই জানিয়ে দিচ্ছে, সে আমাদের এই কেসে খুব জড়িয়ে আছে। কিন্তু এবার আমাদের সাবধানে এগোতে হবে। আমরা সত্যিই বিষধর সাপের ল্যাজে পা দিয়েছি।

 

বললাম–হ্যাঁ। লক্ষ ডলার দামের জিনিস হাতিয়েছেন। জাহাজিবাবুর মাথা খারাপ হয়ে গেছে।

 

কর্নেল বললেন–ব্রোঞ্জের চাকতিটা মিশরের বিধবা কিশোরী নেকারতিতির। আবার চিঠিটাও সেই রাজবধূ নেকারতিতির। দুটোই আসলের কপি। পোর্ট সইদ বন্দরও মিশরের। ক্যাপটেন সিংহের জাহাজ ওই বন্দর থেকে তুলো বোঝাই করেছিল। এ থেকে একটা স্পষ্ট ব্যাকগ্রাউন্ড দেখা যাচ্ছে। দুটো জিনিসই কায়রো জাদুঘর থেকে কেউ চুরি করেছিল। এবার প্রশ্ন হল, ক্যাপটেন সিংহ আর অজয়েন্দু রায় এই দুজনেরই কেউ চোর। অথবা তাদের কেউ অন্য কোনও চোরের কাছে দাম দিয়ে দুটো জিনিস কিনেছিলেন। বেশি দামে কারও কাছে বিক্রি করাই উদ্দেশ্য ছিল। তারপর জাহাজিবাবু ওটা ক্যাপটেন সিংহের ঘর থেকে চুরি করে দোমোহানির কাছে কেল্লাবাড়ির জঙ্গলে পুঁতে রেখেছিল।

 

–প্রায় একবছর ওটা পুঁতে রাখার কারণ কী হতে পারে?

 

কর্নেল একটু পরে বললেন–হয়তো জাহাজিবাবু উপযুক্ত খদ্দের খুঁজছিল। পাচ্ছিল না।

 

–ঠিক বলেছেন। এতদিনে খদ্দের পাওয়ায় সে পার্চমেন্টটা তুলে আনতে তার বিশ্বস্ত লোক পাঠিয়েছিল। তারা পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। কিন্তু কর্নেল, জাহাজিবাবু নিজে ওটা আনতে যায়নি কেন?

 

–চন্দ্রপুরে নিশ্চয় তার কোনও শত্রু আছে, যে ব্যাপারটা জানে এবং জাহাজিবাবুর ওপর নজর রেখেছিল। তাই সে ঝুঁকি নেয়নি। তবে সেটা জানতে হলে সাবধানে পা বাড়াতে হবে, জয়ন্ত! ধৈর্য ধরো।

 

অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে ষষ্ঠীচরণের তৈরি কফি খাওয়ার পর কর্নেল জানালা দিয়ে উঁকি মেরে বললেন–জয়ন্ত! লাল মারুতিটা আমার বাড়ির গেটের সামনে দিয়ে গলির ভিতর উধাও হয়ে গেল। গাড়িটা গেটের ওদিকে বড়ো রাস্তায় হয়তো দাঁড়িয়ে ছিল। তবে আমরা গাড়িটার অনেক আগে এসে গেছি।

 

একটু ভয় পেলাম!–গাড়ি থেকে কি কেউ আমাদের দিকে গুলি ছুঁড়ত?

 

কর্নেল হাসলেন। –হয়তো ছুঁড়ত। তবে আমাদের মেরে ফেলবার জন্য নয়। ভয় পাইয়ে দেবার জন্য। আর রাত্রেও তুমি আমার এখনে থেকে যাও। ই এম বাইপাসে গাড়িটা তোমাকে বিপদে ফেলতে পারে।

 

বললাম–ওই রাস্তায় আমি কাগজের অফিস থেকে প্রতি রাত্রে বাড়ি ফিরি। পুলিশ পেট্রলের লোকজন ছাড়াও পুলিশ সার্জেন্টরা আমার পরিচিত। তাদের বললে আমার গাড়ির সঙ্গে আমার ফ্ল্যাট পর্যন্ত যাবে। অপরাধ সংক্রান্ত স্পেশাল করেসপন্ডেন্টকে তারা খাতির করে।

 

এই সময় ডোরবেল বাজল। তারপর ষষ্ঠী গিয়ে দরজা খুলতেই প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে কে হালদার তেমনি সবেগে প্রবেশ করলেন এবং সোফায় বসে একটিপ নস্যি নিলেন।

 

কর্নেল বললেন–কিছু খবর এনেছেন আশা করি।

 

–আনছি। একটুখানি রেস্ট লই, তারপর কইতাছি। দেখে মনে হচ্ছিল গোয়েন্দাপ্রবর কারও সঙ্গে হাতহাতি করে এসেছেন। কারণ ডানহাতের তর্জনীতে একটুকরো ব্যান্ডেজ দেখতে পাচ্ছিলাম। একটু পরে তিনি যেন ধাতস্থ হলেন। তারপর বললেন- আপনার কথামতো সকালে আমার মক্কেলের বাড়ি গিছলাম। তারে কইছিলাম, বিকাল চারটায় তিনি য্যান বাড়ি থেইক্যা বারাইয়া দেশপ্রিয় পার্কের দিকে চলেন। আমি আপনার জইন্য ওয়েট করুম। আপনারে একখান ঠিকানা জিগাইমু। আপনি সেই সুযোগে লোকটার চেহারা আর পোশাকের ডেসক্রিপশান দেবেন। তো সেইমতো আমি লোকটার দেখলাম। পরনে প্যান্ট আর সোয়েটার ছিল। মাথায় একখান মাফলার জড়ানো ছিল। মুখে খোঁচা-খোঁচা গোঁফদাড়ি। কাঁধে কাপড়ের ব্যাগ ঝুলছে। কাজেই তারে চেনার অসুবিধা হয় নাই। সে খাড়াইয়া সিগারেট টানছিল। ক্যাপটেন সিংহ হাঁটলেন। সেও হাঁটল।

 

হালদারমশাই একটু চুপ করে থাকার পর আবার বললেন- দেশপ্রিয় পার্কে ক্যাপটেন সিংহ কিছুক্ষণ বইয়া ছিলেন। দেখলাম, লোকটাও একটু তফাতে খাড়াইয়া আছে। তারপর ক্যান্টেন সিংহ বাড়ি ফিরলেন। তখন পাঁচটা বাজে। সবখানে আলো জ্বলছে। লোকটা ক্যাপটেন সিংহের বাড়ি পর্যন্ত ফলো কইর‍্যা আবার দেশপ্রিয় পার্কের দিকে হাঁটা দিল। তখন অরে ফলো করলাম। সে একখান বাসে চাপল। আমিও চাপলাম। শরৎ বোস রোডে একখানে সে নামল। আমিও নামলাম। তারপর সে বাঁদিকে গলিতে ঢুকল। একটু পরে আরও ছোট্ট গলি। তারপর একটা বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ল। তত আলো ছিল না। যে তারে দরজা খুইল্যা দিল, সেই লোকটারে দেখি নাই। তবে বাড়িটা পুরানো। দোতলা। দরজা-জানালা বন্ধ।

 

তিনি আবার চুপ করলে বললাম–তা আপনার আঙুল কাটল কিসে?

 

প্রাইভেট ডিটেকটিভ করুণ হাসলেন। একটু তফাতে পানের দোকানে গিয়া জিগাইলাম, ওই বাড়িতে কে থাকে চেনো? পানওয়ালা কইল, ক্যান? কিনবেন নাকি? হরিবাবু বাড়ি বেচবেন শুনছি। হরিবাবুর পুরা নাম সে জানে না। তারপর আমি কয়েক পা আউগগাইয়া আবার বাড়িটার কাছে গেছি, অমনি আমার কে ঝাঁপ দিল। আমি চৌত্রিশ বৎসর পুলিশে চাকরি করছি। আচমকা এমন অ্যাটাকের জইন্য সবসময় রেডি থাকি। ছিলাম।

 

কর্নেল চোখ বুজে চুরুট টানতে টানতে কথা শুনছিলেন। আমি বললাম-তার হাতে ছোরা ছিল নাকি?

 

হালদারমশাই বললেন-হঃ। ঝাঁপ দেওনের সাথে সাথে অর পায়ে হেভি কিক মারছিলাম। ড্যাগারের ডগা আমার এই আঙুলে লাগল। সেকেন্ড কিক অর পেটে মারলাম। তারপর আমার ফায়ার আর্মস তাক করলাম। হাত উঠাও। আমি পুলিশ।

 

হালদারমশাই খি খি করে হেসে উঠলেন। বললাম–লোকের ভিড় হয়েছিল নিশ্চয়?

 

গোয়েন্দাপ্রবর বললেন–এটাই আশ্চর্য! কেউ বারায় নাই। লোকটা ড্রেনে পড়ছিল। আমি দেখলাম, আমারই ভ্যানিশ হওনের দরকার। অগো ফায়ার আর্মস থাকতেই পারে। বড়ো রাস্তায় ওষুধের দোকানে আঙুলে ব্যান্ডেজ বাঁধলাম। তারপর ট্যাক্সি লইয়া কর্নেলস্যারের বাড়ি আইলাম। রাস্তায় বড্ড জ্যাম। কই ষষ্ঠীচরণ? এবারে কফি লইয়া আহো।

 

ষষ্ঠী ভিতরের ঘরের পর্দার ফাঁকে দাঁড়িয়ে কথা শুনছিল। আমি লক্ষ্য করিনি। দেখলাম, সে হাসিমুখে অদৃশ্য হল। টিকটিকিবাবুর দিকে সে সবসময় কেমন চোখে তাকিয়ে থাকে। হালদারমশাই চলে গেলে সে হেসে অস্থির হয়। বলে, এমন মজার মানুষ দেখা যায় না। উনি

 

পুলিশের অফিসার ছিলেন, তা ভাবতে গেলেই অবাক লাগে।

 

ষষ্ঠীচরণ কফি দিয়ে যাওয়ার পর কর্নেল চোখ খুলে বললেন–একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। হালদারমশাই! বাড়িটা চিনেই আপনার চুপচাপ চলে আসা উচিত ছিল। ওরা এবার সতর্ক হয়ে উঠবে।

 

হালদারমশাই বললেন–কে জানে ক্যান এমন হইয়্যা গেল!

 

কর্নেল হাসলেন। –আসলে মাঝে মাঝে অ্যাকশনে নেমে ভুলে যান যে আপনি আর পুলিশ ইন্সপেকটার নন। একজন প্রাইভেট গোয়েন্দা।

 

-হঃ ঠিক কইছেন।

 

আমি বললাম- চৌত্রিশ বছরের পুলিশজীবনের জের আর কী!

 

-হঃ! ওই জেরেই মাঝে মাঝে জেরবার হই। বলে হালদারমশাই প্রাণ খুলে খি খি করে হাসলেন।

 

কফি খাওয়ার পর তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন-কর্নেলস্যার! এবার কন, আর কী করুম?

 

কর্নেল বললেন–এর পর আপনাকে ছদ্মবেশে ছাড়া ওখানে যাওয়ার উপায় দেখছি না। আপনি ছদ্মবেশ ধরতে পটু। সাধু-সন্ন্যাসী বা আধপাগলা ভবঘুরে–যেটা আপনার খুশি। শুধু এটুকু আপনার জানা দরকার, ওই বাড়িতে বসে কে ক্যাপটেন সিংহের পিছনে ওই গুন্ডা লোকটাকে লাগিয়ে রেখেছে। যদি তার নাম হরিবাবু হয়, তা হলে সেই হরিবাবুর চেহারাপোশাক ইত্যাদির বর্ণনা পেলে ভালো হয়। তাই বলে সঙ্গে আমার মতো ক্যামেরা নিয়ে যাবেন না যেন। আর একটা কথা। হরিবাবু গুভা পোষে। তাই আপনার আরও সতর্ক হওয়া উচিত। হ্যাঁ–আজকের ঘটনায় বোঝা যাচ্ছে, আপনি যে ওকে ফলো করেছিলেন, তা গুন্ডাটা যেভাবে হোক, টের পেয়েছিল। এবার সে আর তার মালিক হরিবাবু দুজনেই খুব সতর্ক থাকবে।

 

-ঠিক! ঠিক কইছেন। বলে হালদারমশাই চলে গেলেন। ….

 

পরদিন সকালে লালবাজার ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের সাব-ইন্সপেকটার নরেশ ধর সাদা পোশাকে এসে হাজির। নরেশবাবু আমাদের দুজনেরই সুপরিচিত এবং কর্নেলকে অনেক কেসে সাহায্য করেছেন। নমস্কার করে উনি সোফায় বসলেন। তারপর চাপা হেসে বললেন-রাজেনদা আমাকে ঠকিয়েছিলেন। শেষে ধরে ফেললাম আমি।

 

কর্নেল বললেন–তা আপনাকে দেখেই বুঝেছি। চন্দ্রপুরের ও সি রাজেন হাটি আমাকে বলেছিলেন, আপনার সঙ্গে তার আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে। তবে আমি ওঁর একটা কেসের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছি, আপনি কেমন করে ধরলেন?

 

-কর্নেলসায়েব! থিয়েটার রোডের যে এলাকায় আপনারা দুজনে গিয়েছিলেন, সেখানে আমাদের একজন সোর্স আছে। তার কাছে শুনেছি, একজন সায়েব আর একজন বাঙালি ভদ্রলোক কাজিসাহেবের ডেরায় গিয়েছিলেন। চেহারার বর্ণনা শুনেই বুঝে ফেলেছিলাম, কারা গেছেন। তারপর রাজেনদা আজ সকালে ফের ফোন করেছিলেন। তখন ওঁকে চেপে ধরলাম। ব্যাস!

 

কর্নেল হাঁক দিলেন। -ষষ্ঠী! তোর নালবাজারের বাবুমশাইকে কফি খাইয়ে দে। আজ শীতটা টের পাচ্ছি যেন।

 

বললাম–নরেশবাবু! কাজিসাহেবের খবর কী তা-ই বলুন।

 

নরেশবাবু একটু হেসে বললেন-ওখানকার সোর্স আমাদের অনেক আগে বলেছিল, তার সন্দেহ হচ্ছে, ভদ্রলোক মুসলমান নন। সোর্স নিজে মুসলমান। তার মতে, মুসলমানদের কতকগুলো আদব-কায়দা ভাবভঙ্গি আছে। ওই ভদ্রলোকের মধ্যে তেমন কিছু নেই। তাই লোকটা সম্পর্কে পুলিশের খোঁজ-খবর নেওয়া উচিত। কিন্তু সমস্যা হল, কোনও ঘটনা না ঘটলে নিছক একজন সোর্সের কথায় ভদ্রলোকের পিছনে লাগার ঝুঁকি আছে। সোর্স ভুল করতেই পারে। অনেকসময় ভুল করেও বটে। তাই আমি এটা নিয়ে মাথা ঘামাইনি। খামোখা কাকেও জেরা করার সময় পুলিশের নেই। একটা কেস চাই। সে ছিল না। এতদিনে কেস পেলাম।

 

ষষ্ঠীচরণ কফি দিয়ে গেল। কর্নেল বললেন-কফি খান নরেশবাবু। কফি খেতে খেতে বলুন কাজিসাহেব কি ডানা মেলেছেন?

 

নরেশবাবু কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন-কর্নেলসায়েব! আজ আপনি না গিয়ে যদি আগে আমাদের একটু সুযোগ দিতেন! সেই দুঃখটা জানাতেই এসেছি!

 

তার মানে, আমাকে দেখার পরই কাজিসাহেব ডেরা থেকে পালিয়েছে?

 

–তা-ই আমার ধারণা।

 

-কিন্তু সে আমার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমার জ্যাকেটের পিঠে একটা আঠামাখানো চিরকুট সেঁটে দিয়েছিল। তাতে লেখা ছিল, দ্বিতীয়বার এলেই মারা পড়ব। আমার মনে হয়েছিল, আমাকে সে ইচ্ছে করেই নিজের পরিচয় দিয়ে গেছে। এটা একটা চ্যালেঞ্জ।

 

স্যার! চন্দ্রপুরের শম্ভুনাথ চৌধুরি একসময় জাহাজে চাকরি করত। আমাদের রেকর্ডে দেখলাম, সে খিদিরপুর ডক এরিয়ার চোরাচালানি একটা দলের নেতা। তারপর রাজেনদা বললেন, চন্দ্রপুরে তার বাড়ি। সেখান থেকে সে বর্ডারে চোরাচালানি কারবার করে। কিন্তু তাকে এ পর্যন্ত প্রমাণাভাবে ধরা যায়নি। তাছাড়া সে বছরে গড়ে একবার মাত্র চন্দ্রপুরে যায়। নরেশবাবু ঘড়ি দেখে আবার বললেন–শম্ভু চৌধুরির আগেকার ডেরা ছিল খিদিরপুর এলাকায়। লোকটা ছদ্মবেশ ধরতে পারে। ওখান থেকে তাড়া খেয়ে গা-ঢাকা দিয়েছিল। পুলিশ তাকে খুঁজে বের করতে পারেনি। এদিকে সে কাজিসায়েব সেজে থিয়েটার রোডের একটা গলিতে নতুন ডেরায় বসে দিব্যি কারবার চালিয়ে যাচ্ছিল। আবার সে অন্য কোনও ডেরায় গিয়ে জুটেছে।

 

–ওর ঘর সার্চ করেছেন?

 

-হ্যাঁ। চন্দ্রপুরে একটা খুন করে এসেই সে সম্ভবত আপনার ভয়ে, রাতারাতি ঘরের জিনিসপত্র সরিয়ে ফেলেছিল। আমরা কিছু আসবাবপত্র দেখলাম। সবই ভাড়ার আসবাব। এক চিলতে চিহ্ন রেখে যায়নি লোকা।

 

কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন–আপনাদের ডি সি সায়েবকে এ বিষয়ে কিছু জানিয়েছেন?

 

নরেশবাবু হাসলেন–নাঃ স্যার! আপনার স্নেহধন্য লাহিড়িসায়েবকে জানাবার মতো কেস এটা নয়। তা ছাড়া আপনি যখন এই কেসে জড়িয়ে গেছেন, জানাতে হলে আপনিই জানাবেন।

 

-এখনও অরিজিৎকে জানাবার সময় হয়নি নরেশবাবু! আপনারা উড়োপাখির ডেরা খুঁজে বের করুন। পুলিশ যা পারে, তা কি আমি পারি?

 

-কর্নেলসায়েব! আপনি যা পারেন, তা কিন্তু পুলিশ পারে না। আপনি প্রকৃতিবিজ্ঞানী। পাখি প্রজাপতি অর্কিড ক্যাকটাসের খোঁজে আপনি কোথায়-কোথায় ঘোরেন। আপনার বাইনোকুলার আপনাকেই মানায়। পুলিশ কি বাইনোকুলারে আপনার পাখি খোঁজার মতো খুঁজলেই অপরাধীকে পেয়ে যাবে?

 

সরকারি গোয়েন্দা নরেশ ধর রসিক মানুষ। হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়ালেন। কর্নেল বললেন–স্বীকার করছি নরেশবাবু! লোকটা অত ধূর্ত, তা আমি বুঝতে পারিনি। আমি আজ সকালে না গেলে হয়তো জাহাজবাবু আপনাদের হাতে ধরা পড়ত।

 

-না স্যার! ওটা কথার কথা হিসেবে বলেছি। জিনিসপত্র সে সরাবে বলে রেডি করেই রেখেছিল। আপনারা চলে আসবার পরই ম্যাটাডোরে সব চাপিয়ে সে চলে গেছে। আমাদের সোর্স ওই সময় পাড়ায় ছিল না। আচ্ছা, চলি।

 

নরেশবাবু পা বাড়িয়ে হঠাৎ ঘুরে ফের বললেন–আপনার হালদারমশাইয়ের খবর কী?

 

কর্নেল হাসলেন। তিনি একখান জব্বর ক্যাস পাইছেন।

 

নরেশবাবু আরও এক চোট হেসে নমস্কার করে বেরিয়ে গেলেন।

 

কর্নেল হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন-সাড়ে নটা বাজে। আমরা সাড়ে দশটা-পৌনে এগারোটা নাগাদ পৌঁছে যাব। রাস্তায় পেট্রলপাম্প আছে। ফুয়েল ভরে নেব। জয়ন্ত! ঝটপট রেডি হয়ে নাও। আমিও রেডি হচ্ছি!

 

অবাক হয়ে বললাম–কোথায় যাবেন?

 

তিতলিপুর!

 

–সর্বনাশ! আবার সেই সাংঘাতিক জায়গায়? হঠাৎ এ খেয়াল কেন বলুন তো?

 

-খেয়াল নয়, ডার্লিং! আমার মাথায় একটা থিয়োরি এসে গেছে। আজই তা যাচাই করা দরকার।

 

কর্নেলের এই খেয়ালি স্বভাবের সঙ্গে আমি পরিচিত। তবে আমিও তীব্র কৌতূহলী হয়ে উঠেছিলাম। তাই দ্রুত পোশাক বদলে এবং জ্যাকেটের ভিতরে আমার পয়েন্ট বাইশ ক্যালিবারের রিভলভার রেখে কর্নেলকে অনুসরণ করলাম। কর্নেলের সেই একই বেশভূষা। পিঠে আঁটা কিটব্যাগ, গলায় ঝুলন্ত বাইনোকুলার এবং ক্যামেরা।

 

হাইওয়েতে জায়গায়-জায়গায় জ্যাম ছিল। তিতলিপুর পৌঁছুতে এগারোটা বেজে গিয়েছিল। দোমোহানির রাস্তায় বাঁদিকে জঙ্গল রেখে একটু পরে সেই মোরাম-বিছানো পথে এগিয়ে দীপনারায়ণবাবুর বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড় করালাম। গ্রামের কিছু লোকজন থমকে দাঁড়িয়ে আমাদের দেখছিল। সদর দরজায় বাঁশের বাতার বেড়া আটকানো আছে। দোতলার বারান্দা থেকে সুনয়নী আমাদের দেখে নেমে এসেছিলেন।

 

তিনি আমাদের নমস্কার করে ভিতরে নিয়ে গেলেন। বারান্দায় দুটো চেয়ার এনে দিল একটা লোক। সুনয়নী দেবী থামে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বললেন–আপনাকে দেখে সাহস পেলাম কর্নেলসায়েব।

 

কর্নেল বললেন–আমি শুধু একটা কথা জানতে এসেছি। জেনেই চলে যাব।

 

-বলুন!

 

–আচ্ছা, আপনাদের পূর্বপুরুষ জমিদার পরিবারের বড়ো তরফের বংশধর ছিলেন আপনার দাদা। আমি শুনেছি, ছোটো তরফের বংশধর নরেনবাবু। সেচ বাংলোতে সবাই বলে, নরুঠাকুর। তাহলে মেজো তরফের কোনও বংশধর নিশ্চয় আছে?

 

সুনয়নী শ্বাস ছেড়ে বললেন–হ্যাঁ। আছে। তবে তাকে খুব ছোটোবেলায় দেখেছি। সে কলকাতায় থাকত। জাহাজে বড়ো অফিসার ছিল, তা বড়দার কাছে শুনেছি। জাহাজিবাবু শম্ভুকে তো সে-ই জাহাজে চাকরি দিয়েছিল!

 

–তার নাম কি অজয়েন্দু রায়?

 

আমাকে অবাক করে সুনয়নী দেবী বললেন–হ্যাঁ। অজয়েন্দু নারায়ণ রায়। আমার মেজদা।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *