তিতলিপুরের জঙ্গলে (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
চার
মোরাম বিছানো রাস্তাটা সোজা চলে গেছে। পুলিশের একটা বেতার-ভ্যান থেকে মাঝে মাঝে অস্পষ্ট কথা শোনা যাচ্ছে। একদল সশস্ত্র কনস্টেবল এখানে-ওখানে দাঁড়িয়ে আছে। একটু দূরে বেটন হাতে কয়েকজন কনস্টেবল ভিড় হটাতে ব্যস্ত। অ্যামবুল্যান্স হর্ন দিচ্ছিল। মি. হাটি একজন পুলিশ অফিসারকে বললেন- চ্যাটার্জিবাবু! আপনি দুজন আর্মড সেপাইকে নিয়ে অ্যামবুল্যান্সের সঙ্গে যান। দেরি করা ঠিক নয়।
অ্যামবুল্যান্স তাঁদের নিয়ে এবার হুটার বাজাতে বাজাতে শীতের দিনের নিঝুম গ্রামকে সচকিত করে চলে গেল। কর্নেল বললেন–চন্দ্রপুরে কি মর্গ আছে?
মি. হাটি বললেন–না। কৃষ্ণনগরে আছে। সেখান থেকে অ্যামবুল্যান্স আসতে দেরি করছিল। তাই এখনও আছি।
-বডি কোথায় পড়েছিল?
–দেখাচ্ছি। আসুন।
বাঁদিকে একটা ভেঙেপড়া দেউড়ি। সেখানে গেটের বদলে বাঁশের বেড়া। তার ওধারে উঠোন এবং একটা পুরোনো জীর্ণ দোতলা বাড়ি দেখা যাচ্ছিল। মি. হাটি কর্নেলকে নিয়ে ভাঙা দেউড়ির পাশ দিয়ে এগিয়ে গেলেন। আমি ওঁদের অনুসরণ করলাম। বাউন্ডারি পাঁচিল কোনওরকমে দাঁড়িয়ে আছে। ওদিকে বসতি নেই। পোড়ো জমি। ঝোপঝাড়। আগাছার জঙ্গল। একটা আমবাগান। পাঁচিলের পাশ দিয়ে এগিয়ে মি. হাটি যেখানে দাঁড়ালেন, সেখানে বাড়িটার পিছনের দরজা। কপাট দুটোর অবস্থা করুণ। দরজাটা খোলা ছিল। মি. হাটি বললেন-দীপনারায়ণবাবু এই দরজা দিয়ে বাড়ি ঢুকতে যাচ্ছিলেন। সেই সময় প্রায় পয়েন্টব্লাংক রেঞ্জে খুনি তাঁর মাথার পিছনে গুলি করেছে। এই দেখুন, বডির পজিশন দাগ দিয়ে রেখেছি। বডি উপুড় হয়ে পড়েছিল।
ছোট্ট দরজাটার সামনে কিছু হলুদ রঙের ঘাস আর গাছপালার ঝরাপাতা। তার ওপর চাপচাপ রক্তের ছোপ দেখতে পেলাম। রক্তটা তত লাল নয়।
মি. হাটি বললেন–দীপনারায়ণবাবু রাত্রে কোথায় আড্ডা দিতে যেতেন, তার বোন জানেন না। তার ঘরে খাবার ঢাকা-দেওয়া থাকত। উনি কোনও গুলির শব্দ শোনেনি। এই দরজা দিয়ে রাত্রে বাড়ি ফেরেন দীপনারায়ণবাবু। তাই দরজাটা ভেজানো থাকে। ভোরে ভদ্রমহিলা তার দাদার ঘরের সামনে গিয়ে দেখেন, দরজা তেমনি বাইরে থেকে আটকানো আছে। দরজা খুলে দেখেন, খাবার তেমনি ঢাকা দেওয়া আছে। দাদা তাহলে কোনও বন্ধুর বাড়িতে থেকে গেছেন ভেবে উনি নিচে নামেন। তারপর দেখেন, পিছনের দরজাটা হাট করে খোলা। কাছে এসে দাদাকে উনি উপুড় হয়ে পড়ে থাকতে দেখেন। মাথার পিছনে রক্ত।
কর্নেল বললেন-তার মানে, দীপনারায়ণবাবু দরজা ঠেলে খুলেছেন, সেই সময় আততায়ী তার পিছন থেকে গুলি করেছে।
–আমার ধারণা খুনি তার চেনাজানা লোক। রাতবিরেতে এই দরজা দিয়ে বাড়ি ফেরেন, তা তার জানা ছিল।
–সামনের দরজা দিয়ে বাড়ি ফিরতেন না কেন, জিজ্ঞেস করেছেন ওঁর বোনকে?
-ওই দেখুন। উলটোদিকে সাহাবাবুদের বাড়ি। তিতলিপুরে এখন গণেশ সাহা সবচেয়ে ধনী। গ্রামে বিদ্যুৎ এসেছে। দীপনারায়ণবাবুর বাড়িতে বিদ্যুৎ নেই। কিন্তু সাহাবাবুর দোতলার কার্নিশে উজ্জ্বল আলোর বা ফিট করা আছে। সারা রাত জ্বলে। শীতকালে লোডশেডিং হয় না শুনলাম। গ্রীষ্মকালে হয়। মাতাল অবস্থায় ওখান দিয়ে বাড়ি ঢোকা তার পক্ষে লজ্জার ব্যাপার।
কর্নেল দরজার বাঁদিকে একটা ঝোপের কাছে গিয়ে হাঁটু মুড়ে বসলেন। মি. হাটি তার কাছে গিয়ে বললেন–কী ব্যাপার?
কর্নেল জ্যাকেটের পকেট থেকে আতশ কাচ বের করে মাটিটা পরীক্ষা করতে থাকলেন। মি. হাটি ভুরু কুঁচকে ব্যাপারটা দেখছিলেন। একটু হেসে বললেন- আপনি আতশ কাচ সঙ্গে নিয়ে ঘোরেন। আশ্চর্য তো!
কর্নেল বললেন–খুনি এখানে ওত পেতে বসে ছিল। তার জুতোর ছাপ পড়েছে। শক্ত শুকনো মাটি বলে ছাপ তত স্পষ্ট নয়। তা হলেও আমার ধারণা, তার পায়ে যে জুতো ছিল, তার সোল রবারের। আমি এইরকম জুতো পরি। এই যে দেখছেন। পাখি-প্রজাতির কাছে যেতে হলে এই সোল জুতোয় থাকা দরকার।
–আজকাল অবশ্য এই সোলের জুতো সবাই পরে।
মি. হাটি! দীপনারায়ণবাবুর মাথার পিছনে কোথায় গুলি লেগেছিল? আমার মাথায় জায়গাটা দেখিয়ে দিন। টুপি খুলছি।
ব্যাপারটা হাস্যকর। কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে ফের টুপি পরে বললেন–দীপনারায়ণবাবু সম্ভবত লম্বা মানুষ ছিলেন?
-হ্যাঁ। আমার চেয়ে লম্বা। তার মানে, প্রায় আপনার মতো লম্বা। তবে উনি ছিলেন রোগা।
–ওঁর পরনে কি লংকোট আর ধুতি ছিল?
মি. হাটি হাসিমুখে ভুরু কুঁচকে বললেন–আপনার সম্পর্কে যা সব শুনেছি, সত্যি মনে হচ্ছে।
কর্নেল তার কথায় কান না দিয়ে সেই দরজাটার কাছে গেলেন। তারপর বললেন দীপনারায়ণবাবুকে মাথা নিচু করে ঢুকতে হত। কাজেই মাথার পিছনে নিচের দিকে গুলি করেছিল আততায়ী। সে ছিল ভিকটিমের তুলনায় বেঁটে। আর একটা কথা। সে এই নির্জন জায়গায় দীপনারায়ণের বাড়ি থেকে একটু তফাতে সামনে থেকে গুলি করতে পারত। তা করেনি। কেন করেনি?
কর্নেল স্বগতোক্তির ভঙ্গিতে প্রশ্নটা করলেন। মি. হাটি বললেন–হয়তো আচমকা সামনে কাউকে দেখে দীপনারায়ণ চেঁচিয়ে উঠতে পারতেন। তাই খুনি ঝুঁকি নেয়নি।
অতর্কিতে পিছন থেকে গুলি করে মারতে পারত। পিঠের বাঁদিকে অতর্কিতে কাছ থেকে গুলি করলেও পারত সে। কিন্তু আপনার কথাতেই আসছি। সে কোনও ঝুঁকি নেয়নি।
বলে কর্নেল আঙুল তুললেন সাহাবাবুদের বাড়ির দিকে। মি. হাটি বলে উঠলেন–ঠিক! ঠিক! মোরামরাস্তা থেকে এই পিছনের দরজায় আসতে হলে সাহাবাবুদের বাড়ির আনোর ছটা এই জায়গা অবধি পৌঁছুবে। লক্ষ্য করে দেখুন।
কর্নেল বললেন–হ্যাঁ। এই দরজার কাছে আলো পৌঁছোয় না। প্রথমত এই পাঁচিল। দ্বিতীয় ওই ছাতিম গাছটা। তাই আততায়ী আগেই এসে ওখানে অপেক্ষা করছিল। সে জানত, এক গুলিতে কাউকে চিরকালের মতো চুপ করাতে হলে মাথার পিছনে গুলি করা দরকার। মি. হাটি! সামরিক জীবনে আমি শিখেছিলাম, পিছন থেকে চুপিচুপি এগিয়ে শত্রুকে গুলি করার চেয়ে রাইফেলের নল আর বাঁট দুদিক থেকে দুহাতে ধরে মাথার পিছনে আঘাত করলে সে নিঃশব্দে লুটিয়ে পড়বে। রাইফেল কেন? একটা বেঁটে শক্ত লাঠিই যথেষ্ট।
মি. হাটি বললেন–এবার চলুন! দীপনারায়ণবাবুর বোনের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই।
দরজা দিয়ে ঢুকে বাড়ির সামনে গেলাম। বারান্দায় এক বিধবা ফরসারঙের প্রৌঢ়া মহিলা থামে ঠেসে বসে ছিলেন। তাকে ঘিরে প্রতিবেশী মহিলাদের ভিড় ছিল। একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক মোড়ায় বসে কথা বলছিলেন। আমাদের দেখে তিনি উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার করলেন। বললেন–সুনয়নী! পুলিশ-সায়েবরা এসেছেন। তাদের সঙ্গে কথা বলো। যা-যা জানো, সব খুলে বলল।
মি. হাটি গম্ভীর মুখে বললেন–আপনারা বাইরে যান। আমরা ওঁর সঙ্গে কথা বলব।
বৃদ্ধ ভদ্রলোক এবং মহিলারা উঠোনে নেমে গেলেন। তারপর সদর দরজার বাঁশের বাতা দিয়ে তৈরি বেড়ার একটা দিক খুলে কয়েকজন মহিলা বেরিয়ে গেলেন। উঠোনের প্রান্তে একটা পেয়ারাগাছের তলায় সেই বৃদ্ধ এবং দুজন প্রৌঢ়া চাপা গলায় কথা বলতে থাকলেন।
নরুঠাকুরকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। তার সাইকেলটাও নেই।
মি. হাটি বললেন–মিসেস রায়! ইনি কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। ইনি আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান।
সুনয়নী বারান্দায় মেঝেয় তেমনিভাবে বসে ছিলেন। উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার করে বললেন–এই . ঘরে আসুন আপনারা।
সামনের ঘরের দরজা খুলে দিলেন তিনি। পিছনের জানালা দুটো খুলে দিলেন। অবাক হয়ে দেখলাম, ঘরে তিনটে পুরোনো আলমারিতে বই ভর্তি। দেওয়ালে পুরোনো আমলের কয়েকটা বড়-বড় পোর্ট্রেট। সম্ভবত পূর্বপুরুষ জমিদারদের ছবি। একটা নড়বড়ে টেবিলের ওপর মারবেলের আঁটা আছে। কয়েকটা চেয়ার আছে। আমরা বসলে সুনয়নী দরজার কপাটে হেলান দিয়ে দাঁড়ালেন। কর্নেল বললেন–দীপনারায়ণবাবু কাল কখন বেরিয়েছিলেন?
সুনয়নী বললেন–পুলিশসায়েবকে সব বলেছি। কাল বিকেলে বেরিয়েছিল বড়দা। কিছু বলে যায়নি। কখন ফিরবে, তা জিজ্ঞেস করলে রাগ করত।
-উনি কোথায় যেতেন আপনি জানেন?
–চন্দ্রপুরে জাহাজিদার বাড়ি। নয়তো গ্রামেরই ক্লাবে দাবা খেলতে যেত। একটা কথা বলতে ভুলেছি। পরশুদিন সকালে বড়দা হাঁপাতে হাঁপাতে বাড়ি ঢুকেছিল। জিজ্ঞেস করলাম। শুধু বলল, শম্ভুকে আমি গুলি করে মারব। নেমকহারাম। বিশ্বাসঘাতক।
–ওঁর কি বন্দুক আছে?
–ছিল। কবে বেচে দিয়েছে সাহাবাবুকে। ওই আলমারিতে বই দেখছেন। তিনপুরুষ আগের দামি দামি সব বই। টাকার দরকার হলে কলকাতায় গিয়ে বেচে আসত। এই ঘরে পূর্বপুরুষের রাখা কতরকম জিনিস ছিল। একটা করে কখন কোথায় কাকে বেচে দিত বড়দা।
-পরশু অপনার দাদা আর কী বলেছিলেন মনে আছে?
সুনয়নী একটু ভেবে নিয়ে বললেন- শীতের গরম পোশাক-আশাক যা ছিল, কবে তা-ও বেচে দিয়েছিল। সম্বল ছিল একটা ছেঁড়া সোয়েটার আর পুরোনো আমলের লম্বা কোট। বড়দা পরশু কোটের পকেট, পাঞ্জাবির পকেট–সব পকেটে হাত ভরে কী খুঁজছিল। জিজ্ঞেস করলাম, জবাব দিল না। কোটের ভেতর-পকেটে ঘেঁদা ছিল। শুধু সেই কথাটা বলে দৌড়ে ওই খিড়কির দোর দিয়ে বেরিয়ে গেল।
কর্নেল বললেন–কখন ফিরেছিলেন উনি?
–দুপুরবেলা। জিজ্ঞেস করলাম, কত টাকা হারিয়েছে? বড়দা শুধু বলল, তোর শুনে কাজ নেই। আমার শেষ সম্বল কোথায় ফুটো পকেট দিয়ে পড়ে গেছে। তন্নতন্ন খুঁজে কোথাও পেলাম না।
-এবার বলুন, আপনার দাদাকে কে খুন করেছে বলে আপনার সন্দেহ হয়?
–কার কথা বলব স্যার? বড়দা কত লোককে খামোখা চটিয়ে রেখেছে। মাতাল হলে মানুষের তো জ্ঞানগম্যি থাকে না।
কর্নেল তার দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টে তাকিয়ে বললেন–জাহাজবাবুকে সন্দেহ হয় না?
সুনয়নী আস্তে বললেন–হয়। শম্ভুদা আমাদের দূরসম্পর্কের আত্মীয়। কিন্তু লোকের কাছে শুনেছি, খুব বজ্জাত লোক। বর্ডারে চোরাচালানিদের দল পুষেছে।
-কিন্তু শম্ভুবাবু তো চন্দ্রপুরে স্থায়ীভাবে বাস করেন না শুনেছি। বছরে নাকি একবার আসেন।
-হ্যাঁ বড়দার কাছে শুনেছি, সে কলকাতায় থাকে। বড়দা যে বাসায় থাকত, সেই বাসা সে ভাড়া নিয়েছে। দুজনের মধ্যে ছোটোবেলা থেকে বন্ধুতা। বিদেশ থেকে ফিরলেই জাহাজিদা আমার জন্যও কতকিছু আনত। আমি ওগুলো কী করব? পাড়াপড়শিদের বিলিয়ে দিতাম।
-আপনার বড়দা কলকাতায় কী করতেন?
—সে দশ-বারো বছর আগের কথা। এখানকার অনেকটা জমি বিক্রি করে কীসের ব্যবসা করত। আমি তা জানি না। জিজ্ঞেসও করিনি। বিধবা হওয়ার পর এ বাড়িতে বছর সাতেক আগে বড়দা আমাকে নিয়ে এসেছিল। হাত পুড়িয়ে তাকে রান্না করে খেতে হয়। বাড়িতে একা একা থাকে। লোক রাখতে হলে মাইনে দিতে হবে। এদিকে আমারও সন্তানাদি নেই।
-আপনার বড়দা বিয়ে করেননি?
-না। সংসারে তত মন ছিল না। বিয়ে করলে আমি জানতে পারতাম। ছোটবেলা থেকে উড়নচণ্ডী স্বভাব। আর ওই নেশাভাং!
কর্নেল বললেন-শম্ভুবাবুকে আপনার সন্দেহ হয় বললেন। এর নিশ্চয় কোনও কারণ আছে?
সুনয়নী একটু চুপ করে থাকার পর চাপা স্বরে বললেন-গত সপ্তাহে একদিন শম্ভুদা সকালবেলা এল। বড়দা দোতলার ঘরে তাকে নিয়ে গেল। আমাকে চা পাঠাতে বলল। চা দিয়ে আসার কিছুক্ষণ পরে কানে এল, দুজনের কী নিয়ে ঝগড়া হচ্ছে। শম্ভুদা বলছে, অ্যাডভান্স খেয়ে হজম করবে তুমি? বড়দা বলছে, আমি দরদামে ঠকেছি। একজন আমাকে ডবল দাম দিতে চেয়েছে। এইসব কথা বুঝতে পারিনি প্রথমে। পরে মনে হল, আমাদের পূর্বপুরুষের কোনও দামি জিনিস বড়দা ওকে বিক্রির জন্য অ্যাডভান্স টাকাকড়ি নিয়েছে। তারপর শম্ভুদা চলে গেল। বড়দা তার পিছনে কথা বলতে বলতে বেরিয়ে গেল।
-কিন্তু আপনার সন্দেহের কারণ কী?
-ওই যে বললাম পরশু বড়দা হাঁপাতে হাঁপাতে বাড়ি এসে পকেট হাতড়াচ্ছিল। কোটের ভিতর-পকেটে ফুটো আছে। জিনিসটা পড়ে গেছে বলে পাগলের মতো বেরিয়ে গেল।
-বুঝেছি। অ্যাডভান্স টাকা দিয়ে শম্ভুবাবু জিনিসটা পাননি। সেটা হারিয়ে গেছে, এ কথায় বিশ্বাস করেননি। তাই রাগের বশে আপনার বড়দাকে খুন করেছেন। এই তো?
–আজ্ঞে হ্যাঁ। আমি মেয়েমানুষ। আমার সামান্য বুদ্ধিতে যা মনে হয়েছে, বললাম। পুলিশ সায়েবকেও বলেছি।
-কলকাতায় আপনার বড়দা যেখানে থাকতেন, সেখান থেকে আপনার শ্বশুরবাড়ির ঠিকানায় নিশ্চয় চিঠি লিখতেন। তেমন চিঠি কি আপনার কাছে আছে?
সুনয়নী চোখ মুছে বললেন–আছে হয়তো। একটু খুঁজতে হবে।
কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন–আমরা বারান্দায় যাচ্ছি, আপনি খুঁজে আনুন।
সুনয়নী বললেন-না, না। আপনারা বসুন।
উনি বেরিয়ে গেলে কর্নেল আলমারির বইগুলো খুঁটিয়ে দেখতে থাকলেন। তারপর বললেন–আমার ধারণা, এই প্রাক্তন জমিদার পরিবারের কেউ প্রাচীন ইতিহাসের অধ্যাপক ছিলেন।
মি. হাটি বললেন–ওগুলো ইতিহাসের বই নাকি?
-হ্যাঁ। তবে প্রত্ন-ইতিহাস আর প্রাচীন ইতিহাসের দুর্লভ সব বই।
–সুনয়নী দেবীর কাছে জানা যাবে সে-কথা।
মিনিট পাঁচেক পরে সুনয়নী একটা পোস্টকার্ড নিয়ে এলেন। বললেন–একটা চিঠি পেলাম।
কর্নেল আতশ কাছে চিঠিটা দেখে বললেন-ঠিকানা দিয়ে দীপনারায়ণবাবু আপনাকে শিগগির জবাব দিতে বলেছিলেন।
সুনয়নী বললেন–আজ্ঞে হ্যাঁ। আমবাগানে আমার একটা অংশ আছে। তাই বড়দা আমাকে চিঠি দিতে বলেছিল। ব্যবসাতে লোকসান হয়েছে। তাই আমবাগানটা তাকে বেচতে হবে।
কর্নেল খুদে নোটবই বের করে ঠিকানাটা লিখে নিলে। ও সি মি. হাটি বললেন–দেখি! দেখি পোস্টকার্ডটা।
কর্নেল তাকে বিবর্ণ পোস্টকার্ডটা দিয়ে সুনয়নীকে বললেন–শম্ভু চৌধুরি আপনার বড়দাকে টাকা দিয়ে থাকলে আপনি কি বড়দার কাছে এবিষয়ে কিছু শুনেছিলেন?
সুনয়নী বললেন–কত টাকা দিয়েছিল শম্ভুদা, তা জানি না। তবে হাতে যে-ভাবে হোক, টাকা এলে বড়দা আমাকে কিছু টাকা দিত। শেষবারে দিয়েছিল দু হাজার টাকা।
-ঠিক আছে। এবার চলি। আপনি পিছনের দরজাটা ভিতর থেকে এবার বন্ধ করে দিন। ….
সদর দরজা অর্থাৎ বাঁশের বাতা দিয়ে তৈরি আগড় খোলা ছিল। আমরা সেখানে দিয়ে বেরিয়ে গেলাম। মি. হাটি আমাদের গাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি চাপা স্বরে বললেন জাহাজবাবু ভোরের বাসে নাকি কলকাতা গেছে। এই খুনের খবর পাওয়ার আগে আপনার কথামতো তার বাড়িতে আমাদের লোকজন পাঠিয়েছিলাম। তার বাড়ির কেয়ারটেকার বলেছে, সায়েব-হা, সায়েব…অট্টহাসি হেসে মি. হাটি ফের বললেন-ব্যাটাচ্ছেলেকে একবার টাই-স্যুট পরতে দেখেছিলাম। বর্ডারে দুজন চোরাচালানিকে ব-মাল ধরেছিলাম। জাহাজিবাবু সায়েব সেজে তাদের হয়ে কথা বলতে এসেছিল। ধমক দিয়ে বের করে দিয়েছিলাম।
কর্নেল বললেন–পোস্টকার্ডের ঠিকানা আপনি টুকে নিয়েছেন কি?
-হ্যাঁ। আপনি যে জন্য ঠিকানাটা নিলেন, আমি সেজন্য টুকিনি। ওই ঠিকানায় আশেপাশে লোকজন রেখে তাকে পাকড়াও করতে হবে। গিয়েই কলকাতা পুলিশকে খবর দেব।
গাড়িতে উঠে কর্নেল বললেন–চলি মি. হাটি!
-আপনারা আর কদিন আছেন সেচবাংলোতে?
-নীল সারসের কয়েকটা ছবি তুলে ফেলেছি। কাজেই আজ লাঞ্চের পরই কলকাতা ফিরব। আমার নেমকার্ড তো আপনাকে দিয়েছি। দরকার হলে স্মরণ করবেন। আমিও আপনার ফোনের জন্য অপেক্ষা করব।
বাংলোয় ফিরে নরুঠাকুরকে দেখতে পেয়েছিলাম। সে বলেছিল–বড়দির কাছে গিয়ে চ্যাটাং চ্যাটাং কথা শুনে রাগ হল। নিজের বাড়িতে গিয়ে খোঁজখবর নিয়ে শর্টকাটে ফিরে এসেছি।
দুপুর একটা-পনেরোতে পাবদার ঝোলসহ লাঞ্চ সেরে আমরা কলকাতা ফিরে এসেছিলাম। ইলিয়ট রোড এলাকায় কর্নেলের তিনতলার অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছুতে চারটে বেজে গিয়েছিল। দেরির কারণ হাইওয়েতে একটা ট্রাক উলটে গিয়ে প্রচণ্ড জ্যাম ছিল।
দরজা খুলেই কর্নেলের পরিচারক ষষ্ঠীচরণ একগাল হেসে বলল- টিকটিকিবাবু দুপুরে ফোন করেছিলেন। বলেছি, বাবামশাই আর কাগজের দাদাবাবু কোথায় পাখি দেখতে গেছেন। কবে ফিরবেন জানি না।
কর্নেল চোখ কটমটিয়ে বললেন–কফি!
ষষ্ঠী হাসিমুখে চলে গেল। কর্নেলের জাদুঘরসদৃশ ড্রয়িংরুমে সোফায় বসে বললাম-ষষ্ঠী হালদারমশাইকে আড়ালে টিকটিকিবাবু বলে। ওঁর কানে গেলে দুঃখ পাবেন।
প্রাক্তন পুলিশ অফিসার এবং বর্তমানে প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে কে হালদারকে কর্নেলের দেখাদেখি আমিও হালদারমশাই বলি। ঢ্যাঙা শ্যামবর্ণ এই প্রাক্তন পুলিশ অফিসারের চুল খুঁটিয়ে ছাঁটা। সূচালো গোঁফ আছে। উত্তেজিত হলে উনি দাঁতে দাঁত ঘষেন বলে গোঁফের দুই ডগা তিরতির করে কাঁপে। তার চেয়ে বড়ো কথা, উনি পূর্ববাংলার ভাষায় কথা বলা ছাড়েননি। প্রশ্ন তুললে বলেন-মাই মাদার টাং! ছাড়ুম ক্যান?
কর্নেলের নির্দেশে গণেশ অ্যাভিনিউয়ে তার প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সির অফিসে ফোন করতেই সাড়া এল–ইয়েস?
বললাম–হালদারমশাই! আমরা এইমাত্র ফিরেছি। ষষ্ঠী বলল, আপনি কর্নেলকে ফোন করেছিলেন।
-জয়ন্তবাবু নাকি? কর্নেল স্যার ফিরছেন? এখনই যাইতাছি। একখান জব্বর ক্যাস পাইছি। কর্নেল স্যারের লগে কনসাল্ট করনের দরকার আছে। …
