তিতলিপুরের জঙ্গলে (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
তিন
সকালে ভৈরবের ডাকে ঘুম ভেঙেছিল। ঘড়ি দেখলাম, সাড়ে সাতটা বাজে। দরজা খোলা এবং ভৈরব চা এনেছে, এতেই বোঝা গেল কর্নেল যথারীতি প্রাতভ্রমণে বেরিয়েছেন। বিছানায় বসে চায়ে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম-কাল রাত্রে বাংলোয় চোর ঢুকেছিল নাকি?
ভৈরব হাসল। ভিতরে ঢোকেনি স্যার। উঁকি দিচ্ছিল। ও দিকে ঝিলের মাথায় বাঁধ আছে। সেই পথে সে এসেছিল। মাধু দারোয়ানের চোখে পড়েছিল।
-তুমি বলছিলে এলাকায় চোরডাকাত নেই!
-ছিঁচকে চোর স্যার। মুখটা এক পলক দেখেছি। কেন যেন চেনাচেনা লাগল। তবে আশ্চর্য ব্যাপার স্যার, এই বাংলোয় কোনওদিন চোরের উপদ্রব হয়নি।
-কর্নেলসায়েব কোনদিকে গেছেন দেখেছ?
–না স্যার। এবেলা হাটু দারোয়ানের ডিউটি। সে জানে।
–আচ্ছা। ঠিক আছে।
ভৈরব সেলাম দিয়ে চলে গেল। বেডটি খেয়ে বাথরুমে গেলাম। দাড়ি কামিয়ে ফিটফাট হয়ে বারান্দায় বসলাম। আজ ঘন কুয়াশা। বিস্তীর্ণ জলাধার কুয়াশার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেছে। বারান্দায় বসে কুয়াশা দেখার মানে হয় না। বাংলোর সামনে পার্কিং জোনে আমার গাড়িটা দেখার ইচ্ছে হল। কিন্তু সেখানে গিয়ে আমি চমকে উঠলাম। গাড়িটা নেই। হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। সেই সময় দারোয়ান গেটের পাশে তার ঘর থেকে কম্বলমুড়ি দিয়ে বেরিয়ে বলল–স্যার কি ওখানে কিছু খুঁজছেন?
বললাম–আমার গাড়িটা নেই।
–আপনার গাড়ি কর্নেলসায়েব নিয়ে গেছেন। আমাকে বলে গেছেন, আপনি খোঁজ করলে আমি যেন বলি।
স্বস্তির নিশ্বাস পড়ল। ঘরে ফিরে গিয়ে ওয়ার্ডরোবের ভিতরে ঝোলানো প্যান্টটা দেখলাম। ওই প্যান্টের পকেটে চাবি ছিল। অতএব বৃদ্ধ ঘুঘুমশাই আমার পকেট মেরেছেন।
কিন্তু হঠাৎ ওঁর গাড়ি দরকার হল কেন? উনি না ফিরলে এ প্রশ্নের উত্তর পাব না…।
কর্নেল ফিরলেন সাড়ে নটায়। গাড়ির শব্দ শুনে বারান্দায় বেরিয়েছিলাম। একটু পরে তাকে দেখতে পেলাম। তার মুখে হাসি ঝলমল করছে। ততক্ষণে কুয়াশা খানিকটা পরিষ্কার হয়েছে। কাছে এসে কর্নেল যথারীতি সম্ভাষণ করলেন-মর্নিং জয়ন্ত! আশা করি সুনিদ্রা হয়েছে।
-মর্নিং বস। হাসতে হাসতে বললাম। –আপনি দুটো অপরাধ করেছেন। প্রথমটা পকেটমারি। দ্বিতীয়টা আমার গাড়ি চুরি। গাড়ি নেই দেখে আমি তো ভড়কে গিয়েছিলাম। রাত্রে আমাকে জানাননি আপনার গাড়ির দরকার আছে।
কর্নেল বারান্দায় বসে টুপি খুললেন। তারপর বাঁ হাতে প্রশস্ত টাকে হাত বুলিয়ে ডান হাতে আমার গাড়ির চাবির গোছা আমাকে দিলেন। মৃদু হেসে তিনি বললেন–তোমার গাড়ি চুরি করতে হয়েছিল, তার কারণ আছে। রাত্রে মনে মনে ঠিক করেছিলাম, কেল্লাবাড়ির জঙ্গলে সত্যি নীল সারসের একটা দল এসে জুটেছে কিনা দেখতে যাব। কিন্তু রাত্রে চোর এসেছিল বাংলায়। ভোরে বেরুতে গিয়ে উত্তরে পাঁচিলটা একবার দেখার ইচ্ছে হল। কাঁটাতারের বেড়ায় কোনও ফাঁক আছে। কিনা। নেই। অথচ চোর এসেছিল! পাঁচিলের ধারে ঝাউ আর ক্যাকটাসের টব আছে। একটা করবী আছে। হঠাৎ চোখে পড়ল, একটা ভাঁজকরা কাগজ করবী গাছটার পিছনে কাঁটাতারে গোঁজা আছে। সেই কাগজটা শিশিরে ভিজে গেছে। বারান্দায় এসে সাবধানে খুলে দেখলাম, একটা হুমকি। এতে আমি ভয় পাইনি। কিন্তু এখান থেকে নির্বিঘ্নে কলকাতা ফিরতে হবে। কাজেই তোমার গাড়ি নিয়ে চন্দ্রপুর থানায় গিয়েছিলাম। ও.সি. মি. রাজেন হাটির সাহায্য দরকার হবে।
নরুঠাকুর কফি আর ম্যাক্সের ট্রে রেখে গেল টেবিলে। তারপর বললাম–চিঠিটা দেখতে পারি?
কর্নেল জ্যাকেটের ভিতর থেকে একটা ভাজকরা কাগজ বের করলেন। কাগজটা ভিজে ছিল, তা স্পষ্ট। সাবধানে খুলে দেখলাম, লাল ডটপেনের লেখাগুলো ভিজে কিছুটা অস্পষ্ট হয়ে গেছে। তবু বোঝা যাচ্ছিল।
পেতলের নলটা যেখানে ছিল, সেখানে আজ সকালে রেখে না এলে খুলি হেঁদা হয়ে যাবে। তুই কি ভেবেছিস তোর পরিচয় আমি পাইনি? কলকাতায় আমার লোক আছে। বুড়ো টিকটিকিকে লেজসুদ্ধ হাপিস করে দেব।
কর্নেলকে চিঠিটা আবার তেমনই ভাঁজ করে ফেরত দিয়ে বললাম-ল্যাজ সম্ভবত আমি।
কর্নেল তুম্বো মুখে বললেন–তুমি তো জানো জয়ন্ত! কেউ আমাকে টিকটিকি বললে আমার টাক থেকে গরম বাষ্প বেরিয়ে যায়। ওটা অশ্লীল শব্দ। কারণ ডিটেকটিভ থেকে বাংলায় টিকটিকি শব্দটা এসেছে। টিকটিকি আমি? প্রকৃতিবিজ্ঞানী কর্নেল নীলাদ্রি সরকার টিকটিকি?
কর্নেলের গাম্ভীর্য আর ক্ষোভ দেখে তাকে নিয়ে রসিকতার সাহস পেলাম না। কফি দ্রুত শেষ করে উনি চুরুট ধরালেন। তারপর হেসে উঠলেন। বললাম- হাসছেন যে! হঠাৎ গরম বাষ্পে বরফ পড়া শুরু হল নাকি?
কর্নেল কিটব্যাগ ঘরে রেখে এসে বারান্দায় বসলেন। তারপর জ্যাকেটের ভিতর থেকে একটা ফোটো বের করে বললেন–কাল সন্ধ্যায় আমার ক্যামেরা আমাকে বঞ্চিত করেনি। ছবিটার দুটো প্রিন্ট করেছিলাম। অত কিছু ভেবে করিনি। মনে হয়েছিল, ভৈরবকে দিয়ে তোক দুটোকে শনাক্ত করাব। ভৈরব চন্দ্রপুরের লোক। আর দরকার হলে পুলিশকে দিয়ে যাব।
ওঁর হাত থেকে ছবিটা নিয়ে দেখলাম, পাথরের স্ল্যাবটা দেখা না গেলেও আঁতকে ওঠা দুটো লোকের ছবি স্পষ্ট উঠেছে। একজন সবে ঘুরতে যাচ্ছে। অন্যজন ফুটবল খেলোয়াড়ের মতো শূন্যে লাফ দিয়েছে। ছবিটা দেখে হাসি এল। বললাম-চন্দ্রপুর থানার বড়োবাবুকে ছবির অন্য কপিটা দিয়ে এসেছেন মনে হচ্ছে।
-তুমি বুদ্ধিমান। যে শূন্যে লাফ দিয়েছে, তার নাম পঞ্চানন দাশ। ডাকনাম পাঁচু। অন্যজন কালোবরণ খটিক। ডাকনাম গলাকাটা কেলো। দাগি ডাকাত। পুলিশ ওদের খুঁজে পাচ্ছে না। এবার খুঁজে পাওয়ার চান্স আছে।
-কী ভাবে?
-জাহাজিবাবু ওদের কেল্লাবাড়ির জঙ্গলে ওত পাততে পাঠাবে। আমি পেতলের নলটা যথাস্থানে রেখে আসব।
–কী আশ্চর্য! কর্নেল নীলাদ্রি সরকার কোনো এক জাহাজিবাবুর হুমকিতে ভয় পেয়ে ওটা ফেরত দিতে যাবেন-এটা কল্পনা করা যায় না।
কর্নেল চুরুটের একরাশ ধোঁয়ার মধ্যে বললেন–হ্যাঁ। রেখে আসব, তবে ভয় পেয়ে নয়। লোক দুটোকে ফাঁদে ফেলার জন্য। পুলিশ উলটোদিক থেকে জঙ্গলে ঢুকে কাছাকাছি লুকিয়ে থাকবে। না–থাকবে না। এখনই তারা লুকিয়ে আছে। তোমার গাড়িতে একজন সাবইন্সপেকটার আর দুজন ভোজপুরি কনস্টেবলকে এনে কেল্লাবাড়ি জঙ্গলের কাছে নামিয়ে দিয়ে এলাম। কাজেই ব্রেকফাস্ট করে নিয়ে শিগগির বেরুতে হবে।
দশটা বাজে প্রায়। নরুঠাকুর ব্রেকফাস্ট দিয়ে গেল। তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে দরজায় তালা এঁটে আমরা বেরিয়ে পড়েছিলাম। কর্নেলের পিঠে কিটব্যাগটা আঁটা ছিল। গলা থেকে বাইনোকুলার আর ক্যামেরা ঝুলছিল। প্রজাপতিধরা জালের স্টিকটা পিঠের কিটব্যাগের কোনা দিয়ে বেরিয়ে ছিল।
রমেনবাবু সাইকেলে চেপে সবে ফিরছিলেন। নমস্কার করে তিনি বললেন –জেলেদের কাছে টাটকা পাবদা মাছ পেয়েছি কর্নেলসায়েব। যেন শিগগির ফিরে আসবেন।
কর্নেল বললেন–সুখবর পেলাম যাত্রার সময়। তা হলে আজ নীল সারসের দেখা পাবই। …
ডাইনে কেল্লাবাড়ির জঙ্গল আর বাঁদিকে তিতলিপুর আবছা কুয়াশায় তখনও ঢাকা। ঝিলের ধারে ঘাসে শিশির তখনও শুকোয়নি। আমরা কালকের মতো সাবধানে পা ফেলে জঙ্গলে ঢুকলাম। ধ্বংসস্তূপ আর ঘন ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে কিছুটা এগিয়ে কর্নেল হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন। তার চোখে বাইনোকুলার। নব ঘুরিয়ে দূরত্ব অ্যাডজাস্ট করে নিয়ে চাপা স্বরে বললেন–জয়ন্ত! তুমি ওই লাইমকংক্রিটের ওপর বসে থাকো। আমি শিগগির ফিরে আসছি।
বলে তিনি আমাকে অবাক করে ডানদিকে অদৃশ্য হলেন। অস্বস্তি হচ্ছিল। লাইমকংক্রিটের একটা চাঙড়ে বসে আমি রিভলভারটা জ্যাকেটের পকেট থেকে বের করলাম। কর্নেলের পাগলামি মাঝে মাঝে অসহ্য লাগে। বহুবার দেখেছি, এইভাবে আমাকে প্রতীক্ষায় রেখে উনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা কোথায় কোনও বিরল প্রজাতির পাখির পেছনে ছোটাছুটি করে বেড়ান। কিন্তু এখন তো তেমন সময় নয়। বদমাশ দুটোকে ফাঁদে ফেলার উদ্দেশ্যেই আমরা বেরিয়েছি।
আমার বিরক্তি পনেরো মিনিটের মধ্যে কেটে গেল। একটা ঝোপের ফাঁকে কর্নেলের টুপি দেখতে পেলাম। অমনি অস্ত্রটা লুকিয়ে রাখলাম। তিনি কাছে এসে আমার একটা হাত চেপে ধরে চাপা উল্লাসে বললেন–পাবদা মাছের খবরটা সত্যি সুখবর ডার্লিং। ওদিকে একটা উঁচু দেওয়াল দাঁড়িয়ে আছে। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম শকুন। তারপর দেখলাম, তিনজোড়া নীল সারস দেওয়ালের ওপর বসে রোদ পোহাচ্ছে। ক্যামেরার টেলিলেন্স ফিট করে চারটে ছবি তুলেছি। ওঃ! আজকের মতো শুভদিন জীবনে কখনও আসেনি। চিয়ার আপ জয়ন্ত! কুইক মার্চ, তবে নিঃশব্দে।
আমাকে ভাঙা দেউড়ির ওপাশে অপেক্ষা করতে বলে কর্নেল গুঁড়ি মেরে এগিয়ে গেলেন। কাল শেষ বেলায় ঘন ছায়া এবং তারপর দ্রুত আঁধার এসে পড়ায় কেল্লাবাড়ির জঙ্গল পরিষ্কার দেখতে পাইনি। এখন পাচ্ছিলাম। মিনিট দশেক পরে তিনি একটা ঝোপের আড়াল থেকে ইশারায় আমাকে ডাকলেন। কাছে গেলে চাপা স্বরে বললেন–ফায়ার আর্মস হাতে নাও। কিন্তু সাবধান! গুলি ছুঁড়ো না। এখন গুলি ছোঁড়ার দরকার হবে না।
তারপর ঝোপের পাশ দিয়ে উঁকি মেরে দেখলাম, সেই লোক দুটো এদিক-ওদিকে তাকাতে তাকাতে এগিয়ে আসছে। তারপর দুজন এককোণে দাঁড়িয়ে গেল। একজন বলল–তুমি গিয়ে মালটা নিয়ে এসো। আমি মেশিন হাতে পাহারা দিচ্ছি। বুড়ো মাইরি এমন ভয় পেয়েছে যে
তারপরই দেখলাম, বাঁদিক, ডানদিক এবং সামনের দিক থেকে একজন পুলিশ অফিসার আর দুজন দৈত্যাকৃতি কনস্টেবল বেরিয়ে এল। পুলিশ অফিসার রিভলভার তাক করে গর্জালেন–হাত ওঠাও। পিস্তলসুদ্ধ একজোড়া হাত ওপরে উঠল। দ্বিতীয় জন পালাতে যাচ্ছিল। ভোজপুরী কনস্টেবলের ছোট্ট লাঠি তার এক হাঁটুর পেছনে গিয়ে ঘা মরাতেই সে বাপ রে বলে পড়ে গেল। পুলিশ ইন্সপেকটারের হুকুমে অন্য ভোজপুরী দৈত্যটি পিস্তল কেড়ে নিয়ে তার গলার কাছে সোয়েটারের একটা অংশ খামচে ধরে পিঠে লাঠির গুঁতো মারল। সে-ও বাপ রে বলে ককিয়ে উঠল। তার সঙ্গী ততক্ষণে অন্য ভোজপুরী দৈত্যের কবলে বেড়ালছানার মতো মিউ মিউ করছে।
কর্নেল আমাকে ইশারা করে নিঃশব্দে কেটে পড়লেন। কেল্লার জঙ্গল পেরিয়ে ঝিলের ধারে এসে বললাম–একেই বলে ঘুঘু দেখেছ, ফদ দ্যাখোনি।
কর্নেল হাসলেন। -দোমোহানির বিখ্যাত পাবদা মাছের ঝোল খাব এবেলা। কী সৌভাগ্য!
-কিন্তু পেতলের নলটা যে পড়ে রইল।
–নলটা এস আই রথীশ চক্রবর্তী নিয়ে যাবেন। ওটা শুধু নল। ভিতরের জিনিস আমার কাছে আছে। শুধু নল নিয়ে পুলিশ মাথা ঘামাক। চলো! আমরা এবেলা ড্যামের জলে রোয়িং করি।
–কী সর্বনাশ! এখন সবে বাতাস উঠেছে। একটু পরে জলাধার সমুদ্র হয়ে উঠবে যে!
–ওঃ জয়ন্ত! তুমি কলকাতার রোয়িং ক্লাবের মেম্বার না? তা ছাড়া তুমি সেবার প্রশান্ত মহাসাগরে একজনের সঙ্গে বোটে চেপে কিয়োতো দ্বীপে গিয়ে উঠেছিলে। আমি আর্মি হেলিকপ্টারে গিয়ে তোমাকে উদ্ধার করেছিলাম। সেই তুমি একরত্তি দোমোহানিকে ভয় পাচ্ছ?
–সেটা ছিল প্রাণের দায়ে। এটা তো নেহাত শখে।
–নেহাত শখ নয় জয়ন্ত! ড্যামের পূর্ব দিকটায় কয়েকটা জলটুঙ্গি আছে। সেখানে সেক্রেটারি বার্ড অর্থাৎ কেরানি পাখির থাকার সম্ভাবনা আছে। তুমি ছবিতে এই পাখি দেখেছ। কিন্তু কানে কলমগোঁজা কেরানিবাবুদের মতো লম্বাঠেঙো এই পাখি জ্যান্ত দ্যাখোনি।
আমরা পিচরাস্তায় উঠেছি, এমন সময় দেখলাম বাংলোর কুক নরুঠাকুর বাংলো থেকে একটা সাইকেলে চেপে আসছে। আমাদের কাছাকাছি হলে কর্নেল বললেন–ঠাকুরমশাই কি পাবদা মাছের জন্য মশলা কিনতে যাচ্ছ?
নরুঠাকুর সাইকেল থামিয়ে এক পা মাটিতে রেখে বলল–সাংঘাতিক খবর স্যার!
তার মুখচোখে আতঙ্কের ছাপ লক্ষ্য করলাম। কর্নেল বললেন–কী হয়েছে নরেন?
-দীপনারায়ণদাকে গতরাতে কে খুন করেছে। ওঁর বোন সুনয়নী সম্পর্কে আমার দিদি হয়। বড়দি বলে তাকে ডাকি। বড়দি একটা লোক পাঠিয়ে এইমাত্র খবর দিল। শুনে আমার হাত-পা কাঁপছে স্যার। হাজার হলেও রক্তের সম্পর্ক। কিছু পারি না-পারি, একবার গিয়ে বড়দির পাশে দাঁড়ানো উচিত।
বলেই সে সাইকেল চালিয়ে চলে গেল। কর্নেল নিস্পলক চোখে তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তিনি জোরে শ্বাস ছেড়ে বললেন-জয়ন্ত! এই আমার বরাত। আর কী বলব? চলল! আগে বাংলোয় ফেরা যাক।
যেতে যেতে বললাম-ভৈরব আমাকে বলছিল যখন জাহাজিবাবু শম্ভু চৌধুরি বিদেশ থেকে বাড়ি ফিরে আসে, তখনই নাকি একটা করে লাশ পড়ে। সব লাশের মাথার পিছনে নাকি গুলির চিহ্ন খুঁজে পায় পুলিশ। ভৈরব ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছে বলল। পুলিশের মাথায় ব্যাপারটা কেন আসে না বলে সে দুঃখ করছিল।
কর্নেল হনহন করে হাঁটছিলেন। ওঁর নাগাল পেতে আমাকে প্রায় জগিং করতে হচ্ছিল। সামরিক জীবনের অনেক অভ্যাস আমার বৃদ্ধ বন্ধুর জীবনে এখনও থেকে গেছে। বহুবার এটা লক্ষ্য, করেছি। তাই আর অবাক হই না।
গেটের একটা অংশ খুলে দিয়ে দারোয়ান সেলাম দিল। ভৈরব রমেনবাবুর সঙ্গে লনে দাঁড়িয়ে উত্তেজিত ভাবে কথা বলছিল। আমরা ভিতরে গেলে ভৈরব আমাকে বলল–যা বলছিলাম, তা-ই ঘটে গেল স্যার!
রমেনবাবু বললেন–তিতলিপুরের বড়োবাবুর ভাগ্যে এমন একটা কিছু ঘটবে, গ্রামের লোকেরা সবাই জানে। হাড়বজ্জাত লোক। জমিজমা সম্পত্তি প্রায় সবই কবে বেচে দিয়েছিল। তার বোন বিধবা হয়ে বাবার বাড়ি আশ্রয় নিয়েছিল। বাকি যেটুকু সম্পত্তি ছিল ওই মহিলাই দুহাতে আগলে রেখেছিল। বড়োবাবু বোনকে সমীহ করে চলত।
ভৈরব বলল–ম্যানেজারবাবুকে বলছিলাম, এ কাজ জাহাজিবাবুর।
–ছাড়ো। আমরা ওসব সাতে-পাঁচে নেই। বড়োবাবুর বোন সত্যিকার রায়বাঘিনি। সে যা করার করবে। বলে রমেনবাবু কর্নেলকে অনুসরণ করলেন। -নরেনকে যেতে দিতে হল। জ্ঞাতি বলে কথা। কর্নেলসায়েবদের পাবদামাছ খাওয়ানোর জন্য আমি আছি। একবেলা আমার হাতের রান্না খেয়ে দেখুন।
আমাদের রুমের সামনে গিয়ে কর্নেল বললেন–আপনি যখন রাঁধতে পারেন, তখন কফিও তৈরি করতে পারেন। তাই না?
রমেনবাবু সহাস্যে বললেন–এখনই কফি করে আনছি স্যার। …
তিনি দ্রুত চলে গেলেন। আমার মনে হল, কোনও কারণে রমেনবাবু দীপনারায়ণবাবুকে পছন্দ করতেন না। গ্রাম্য দলাদলির ব্যাপারও থাকতে পারে।
কর্নেল দরজার তালা খুলে ঘরে ঢুকলেন। আমি দক্ষিণের বারান্দায় দরজার পাশে বেতের চেয়ারে বসলাম। জলাধারের কুয়াশা দিগন্তে সরে গেছে। আকাশ আর জল একাকার হয়ে আছে। একটা জেলেডিঙি কালো হয়ে ভেসে আছে।
কর্নেল বাইরে এসে বসলেন। বললেন–নীল সারসের ছবি তুলতে এসেছিলাম। ছবি তুলেছি। ভেবেছিলাম লাঞ্চ খেয়েই কলকাতা ফিরব। কিন্তু
উনি চুপ করলে বললাম–কিন্তু কী?
–আমার সামনে একটা লাশ।
–কেউ তো আপনার কাছে এসে অনুরোধ করেনি, এই হত্যারহস্যের সমাধান করুন!!
–জয়ন্ত! আমার ক্যামেরা বলছে, শম্ভু চৌধুরি আর দীপনারায়ণ রায় নিজেদের ছবিকে অত ভয় পেয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন কেন? ওঁরা দুজনেই চাননি ওঁরা ছবিতে থাকুন। কথাটা শুনতে তোমার হেঁয়ালি মনে হবে। কিন্তু একটু ভাবলেই দেখবে, ওঁরা চাননি কেউ ওঁদের ছবি তুলুক।
–ও.সি রাজেন্দ্র হাটি জাহাজিবাবু সম্পর্কে কী বললেন?
–এই এলাকার সীমান্তে চোরাচালানের সঙ্গে জাহাজিবাবুর যোগাযোগ আছে বলে তারা জানেন। কিন্তু প্রমাণ পাননি। তাছাড়া জাহাজিবাবু সারা বছর এখানে থাকেনও না। কলকাতা পুলিশের সঙ্গে চন্দ্রপুর থানা এবার যোগাযোগ করবে। শম্ভু চৌধুরি কোথায় থাকে, কী করে ইত্যাদি খবর জানতে চাইবে। জাহাজে আর চাকরি করে না সে, তা তার বয়স থেকে বলা যায়।
কিন্তু প্রাক্তন জাহাজি হিসেবে খিদিরপুর ডকের চোরাকারবারি দলের সঙ্গে তার যোগাযোগ থাকতে পারে।
–তা পারে। কিন্তু ব্রোঞ্জের ফলক আর কিউনিফর্ম লিপিভর্তি পার্চমেন্ট-নাঃ জয়ন্ত! আমার সামনে একটা গভীর রহস্য এসে দাঁড়িয়েছে। দীপনারায়ণ রায়ের হত্যাকাণ্ডের চেয়ে এই রহস্য জটিল।
ভৈরব কফির ট্রে নিয়ে এল। সে কিছু বলার জন্য ইতস্তত করছিল। কিন্তু কর্নেল তাকে বললেন–ঠিক আছে ভৈরব। দরকার হলে তোমাকে ডাকব।
ভৈরব চলে গেল। বললাম–আপনার রোয়িং প্রোগ্রামের কী হল?
কর্নেল আস্তে বললেন-থাক। সারাজীবন নরহত্যা দেখে আসছি। আমার সামরিক জীবনের কথাও চিন্তা করো। কিন্তু আশ্চর্য জয়ন্ত! এখনও নরহত্যা আমাকে বিব্রত করে।
-তা হলে চলুন। তিতলিপুরের জমিদারবাড়ি গিয়ে ব্যাপারটা দেখে আসা যাক। আমিও একটা হাতে-গরম খবর পেয়ে যাব। দৈনিক সত্যসবেক পত্রিকার জন্য অন্তত একটা কিছু নিয়ে যাই।
কর্নেল একটু হেসে বললেন-হ্যাঁ। খালি হাতে তোমার কলকাতা ফেরার চেয়ে এটা মন্দ কী! তা ছাড়া প্রাচীন মিশরের ফলক আর কোনো দেশের পার্চমেন্টে লেখা কিউনিফর্ম লিপির সঙ্গে তিতলিপুরের এই হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্র তো স্পষ্ট।
রমেনবাবু কিচেনে ছিলেন। ভৈরব তাকে সাহায্য করছিল। কর্নেল শুধু বলে এলেন –একটু বেরুচ্ছি।
গাড়ি স্টার্ট দিয়ে পিচরাস্তায় পৌঁছুলাম। তারপর তিতলিপুর গ্রামে ঢোকার জন্য যে মোরাম বিছানো রাস্তা দেখেছিলাম, বাঁ দিকে ঘুরে সেই রাস্তায় কিছুটা এগোতেই পুলিশের ভ্যান, একটা জিপ আর অ্যামবুল্যান্স দেখা গেল। সেখানে গাড়ি থামিয়ে দুজনে নামলাম। কর্নেলকে দেখে ও.সি মি. হাটি এগিয়ে এলেন। সহাস্যে বললেন–এখানে তো নীল সারস নেই কর্নেলসায়েব। এখানে লাল সারসের কারবার। লাল সারসটা দীপনারায়ণবাবুর মাথার পিছনে ঠোঁট দিয়ে একটা ফুটো করে ফেলেছে।
শুনেই চমকে উঠলাম। তাহলে ভৈরব একটা খাঁটি ক্লু দিয়েছে। ..
