তিতলিপুরের জঙ্গলে (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

দুই 

 খাওয়ার পর দক্ষিণের বারান্দায় কর্নেল ও আমি রোদে বসে আছি। এমন সময় পশ্চিমের বারান্দা ঘুরে দানবের মতো অতিকায় একজন পুলিশ অফিসার এগিয়ে এলেন। তার গায়ের রং কালো। কিন্তু পাকানো গোঁফের নিচে সাদা দাঁতের হাসি ঝকমক করছিল। কর্নেলের কাছে এসে তিনি করজোড়ে নমস্কার করে বললেন-আমার সৌভাগ্য! এখানে কর্নেলসায়েবের মতো বিখ্যাত মানুষের দর্শন পাব কল্পনাও করিনি। আপনার কত নাম শুনেছি আমাদের পুলিশ মহলে। রমেন, বলছিল, একজন কর্নেলসায়েব এসেছেন। জিজ্ঞেস করতে বলল, কর্নেল নীলাদ্রি সরকার।

 

কর্নেল বললেন–আপনার কথাও শুনেছি। আপনি চন্দ্রপুর থানার ও সি মি. রাজেন্দ্র কুমার হাটি।

 

বড়োবাবু খাকি পোশাকে ঢাকা তাঁর প্রকাণ্ড ভুঁড়ি কাঁপিয়ে অট্টহাসি হাসলেন। কর্নেলসাহেব! আপনার নাকি পিছনেও একটা চোখ আছে। যাই হোক, আমাকে এখনই থানায়। ফিরতে হবে। কিংবদন্তির নায়ককে একবার চোখের দেখা দেখতে এলাম। এই অধম যদি আপনার কোনও উপকারে লাগে, প্লিজ স্মরণ করবেন। কদিন থাকছেন স্যার?

 

–কিছু ঠিক নেই। আমি এসেছি দুর্লভ প্রজাতির নীল সারসের খোঁজে।

 

দারোগবাবু আবার হাসলেন। –আপনার এসব হবির কথাও শুনেছি। কলকাতার লালবাজারে ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টে সাব-ইন্সপেকটর নরেশ ধর আমার মাসতুতো ভাই স্যার।

 

বাঃ! নরেশবাবুকে বলব আপনার কথা। …

 

আরও কিছু কথাবার্তার পর পুলিশ অফিসার রাজেন হাটি চলে গেলেন। একটু পরে গেটের ভিতর দিয়ে সেই পুলিশ জিপটা বেরিয়ে গেল। পিছনে বন্দুক হাতে কনস্টেবলদের দেখা যাচ্ছিল।

 

বললাম–তখন বলছিলেন না জেনে বিষধর সাপের ল্যাজে পা দিয়েছি। এবার রাজেন হাটির মতো জাঁদরেল পুলিশ অফিসার বেদে হয়ে সাপটার বিষদাঁত ভেঙে

 

কর্নেল আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন-ও কথা নয়। চলো। বেরুনোনা যাক।

 

-কোথায় যাবেন?

 

–প্রশ্ন নয়। শিগগির রেডি হয়ে বেরিয়ে এসো। সঙ্গে তোমার ফায়ার আর্মস নিয়ো।

 

কথাটা শুনে একটা অস্বস্তিতে শরীরে যেন শিহরন ঘটে গিয়েছিল। একটু পরে কর্নেলের সঙ্গে বেরিয়েছিলাম। সদর গেট পেরিয়ে কর্নেল পিচের রাস্তায় যেদিক থেকে এসেছি, সেইদিকে হাঁটছিলেন। ডাইনে ঝিল পেরিয়ে গিয়ে কলে সোজা ঝোপঝাড়ের ভিতর দিয়ে জঙ্গলে ঢুকলেন। ঝরাপাতার স্তূপে জুতোর চাপ অদ্ভুত শব্দ করছিল। কিছুক্ষণ পরে আমরা জাহান খাঁর কেল্লাবাড়ি এলাকায় ঢুকেছিলাম। শীতের বিকেলে সেখানে এখনই গাঢ় ছায়া। ধ্বংসস্তূপে জঙ্গল গজিয়ে আছে। মাঝে মাঝে একটা ভাঙা পাঁচিল, গম্বুজ ঘর এবং গম্বুজে ফাটল, একটা দেউড়ি, তারপর মুখ থুবড়ে পড়া মসজিদ চোখে পড়েছিল। কর্নেল কখনও একটু থেমে বাইনোকুলারে চারদিক দেখে নিচ্ছিলেন। একবার আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম–নীল সারসের দলটা খুঁজছেন নাকি? কর্নেল শুধু বলেছিলেন–হুঁ।

 

দ্রুত দিনের আলো কমে যাচ্ছিল। ফাঁকা জায়গা থেকে অদুরে কুয়াশার পর্দা দেখতে পাচ্ছিলাম। কিছুক্ষণ পরে কর্নেল আমার কাঁধে হাত চেপে আমাকে বসিয়ে দিলেন এবং নিজেও গুঁড়ি মেরে বসলেন। তারপর কানে এল, সামনের দিকে ঝরাপাতার ওপর পা ফেলে কে যেন হেঁটে আসছে।

 

একসময় শব্দটা থেমে গেল। আমরা একটা ভাঙা গম্বুজের আড়ালে ছিলাম। মাটিতে বসে-যাওয়া গম্বুজের চারপাশে ঝোপঝাড়। সিগারেটের ধোঁয়ার গন্ধ ভেসে এল। এখন শীতের হাওয়াটা বন্ধ। মাঝে মাঝে পাখির ডাক শোনা যাচ্ছিল। কে সিগারেট টানছে, দেখার জন্য একটু সরে যাচ্ছিলাম। কর্নেল আমাকে টেনে ধরে বাধা দিলেন। সময় কাটছিল না। কতক্ষণ পরে আবার শুকনো পাতার ওপর শব্দ শোনা গেল। লোকটা চলে যাচ্ছে ভেবেছিলাম। কিন্তু তখনই কেউ চাপা স্বরে বলে উঠল–এত দেরি করলে কেন? অন্ধকার হয়ে যাবে শিগগির। খামোখা তার কথার ওপর অন্যজন বলল–টর্চ আনননি?

 

–এনেছি।

 

–আমিও এনেছি।

 

–তাহলে অসুবিধে কীসের? তুমি খুঁড়বে। আমি আলো দেখাব। আমি খুঁড়ব। তুমি আলো দেখাবে।

 

-বাবু দাগ দিয়ে রেখে গেছেন। কই সেই দাগ?

 

–এই যে। কিন্তু আমি একটা কথা ভাবছি।

 

ভাবছটা কী? সামান্য কাজ।

 

–সামান্য নয় হে! পাথরের স্ল্যাব। তলায় কতটা পোঁতা আছে কে জানে। তাছাড়া স্ল্যাবের তলায় যদি পেতলের নলটা না থাকে?

 

–থাকবেই। বাবু গতবছর স্ল্যাবের তলায় ওটা পুঁতে রেখে গিয়েছিলেন। তখন আমিই। স্ল্যাবটার এখানে সুড়ঙ্গ মত করেছিলাম।

 

–তাহলে তো তুমি সেই জায়গাটা চেনো। আমি আলো জ্বালি। তুমি সেখানটা খোঁড়ো।

 

এবার টর্চের আলোর একটু ঝলকানি দেখতে পেলাম। তারপর খোঁড়ার শব্দ। একটু পরে একজন বলল–আচ্ছা, ফরেস্ট গার্ডটা যদি হঠাৎ এসে পড়ে?

 

–তোমার মাথাখারাপ? এই শীতের সন্ধ্যায় ব্যাটারা ফরেস্টবাংলোর কাছাকাছি কোথাও থাকবে। আমরা তো গাছ কাটছি না যে সেই শব্দ শুনে দৌড়ে আসবে।

 

আবার মাটি খোঁড়ার শব্দ হতে থাকল। এবার কর্নেল আমাকে টেনে নিয়ে একটু পিছনে একটা ঝোপের আড়ালে। তারপর গুঁড়ি মেরে বসে শুকনো পাতার ওপর জুতোর চাপা শব্দ করতে থাকলেন।

 

অমনই লোকদুটো একসঙ্গে বলে উঠল–কীসের শব্দ?

 

–এই! কেল্লাবাড়ির জঙ্গলে সেবার বাঘ এসেছিল। বাঘ নয় তো?

 

–কিছু বলা যায় না। সঙ্গে মেশিন আছে। আন্দাজে গুলি ছুঁড়ব? যদি ভয় পেয়ে পালায়!

 

–ঠিক বলেছ। কিন্তু তোমার দিশি পিস্তলের শব্দ শুনে বাঘ যদি উলটে খেপে ওঠে?

 

তখনই কর্নেল আমাকে উঠে দাঁড়াতে ইশারা করলেন। আবছা আঁধার এখন ঘন হয়েছে। কর্নেল টর্চের আলো ফেলে তার রিভলভারের নল সেই আলোতে দেখিয়ে গর্জন করে উঠলেন–কোন ব্যাটা রে?

 

তাঁর দেখাদেখি আমিও টর্চ জ্বেলে উৎসাহের আতিশয্যে রিভলভার থেকে তাদের মাথার উপর দিয়ে এক রাউন্ড ফায়ার করে ফেললাম।

 

দুটো লোক একলাফে একটা ধ্বংসস্তূপের আড়ালে চলে গেল। কর্নেল সেদিকে টর্চ জ্বেলে আবার বিকট গর্জন করে এগিয়ে গেলেন। আমি পায়ের কাছে আলো ফেলে দেখলাম, একটা পাথরের স্ল্যাব কোনাকুনি মাটির তলায় ডুবে আছে। একটা ছোট্ট শাবল পড়ে আছে। পাথরের পাশে গর্ত খুঁড়ে একগাদা মাটি তোলা হয়েছে।

 

কিন্তু কর্নেলের পাত্তা নেই। শুধু একবার করে টর্চের আলোর ঝলকানি দেখতে পাচ্ছি। কর্নেল ওদের তাড়া করে যাচ্ছেন সম্ভবত। এটা কি ঠিক হচ্ছে? আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি। কী করা উচিত ভেবে পাচ্ছি না। প্রায় মিনিট পাঁচেক পরেই কর্নেলের সাড়া পেলাম। চাপা স্বরে ডাকলেন–জয়ন্ত!

 

সাড়া দিলাম। –এখানে আছি।

 

কাছে এসে কর্নেল হাসিমুখে বললেন –ওরা আর এখানে আসছে না। তুমি টর্চ জ্বেলে রাখো জয়ন্ত! আমি দেখি, পেতলের নলটা পাই নাকি!

 

এখানকার মাটি নরম। একটু খুঁড়তেই শাবলের ঘা কোনও ধাতব জিনিসে লেগে ঠং করে শব্দ হল। তারপর কর্নেল পাথরটার তলা থেকে ফুটখানেক লম্বা একটা নল বের করলেন। নলটার ব্যাসার্ধ প্রায় দু ইঞ্চি। নলটা থেকে মাটি পরিষ্কার করে কর্নেল তার পিঠের কিটব্যাগে চালান করে বললেন-কুইক। কেটে পড়া যাক। সোজা একেবারে বাংলোতে। …

 

বাংলোর বারান্দায় বড্ড হিম। ঘরে বসে কফি পান করতে করতে কর্নেলকে জিজ্ঞেস করলাম–সকালে মল্লযুদ্ধ দর্শনের মতো এই ঘটনাও কি আকস্মিক?

 

কর্নেল হাসলেন। নাঃ! দুপুরে ড্যামের রাস্তা দিয়ে প্রায় এক কিলোমিটার হেঁটেছিলাম। প্রচুর হাঁস, সারস, একজোড়া গগনভেড় পাখিরও ছবি তুলেছিলাম। ফিমের রোলটা শেষ করে ফেলার ইচ্ছে ছিল। কেন ছিল তা আশা করি বুঝতে পারছ।

 

-মল্লযুদ্ধের যোদ্ধাদের ছবি প্রিন্ট করা।

 

–ঠিক। অবশ্য তুমি তার আগেই কুকীর্তি করে বসে আছ।

 

–কুকীর্তি কী বলছেন? আপনার কোনও উদ্দেশ্য থাকলে কাজটা একধাপ এগিয়ে দিয়েছি।

 

-নাঃ। আমি এখানে নীল সারসের ছবি তুলতেই এসেছি। কিন্তু আমার বরাত জয়ন্ত! যেখানে যাই, এই রকম গোলমেলে ঘটনায় জড়িয়ে পড়ি।

 

-আপনি যা বলছিলেন, তাই বলুন। মানে, জাহান খাঁর কেল্লাবাড়িতে অভিযানের ব্যাপারটা।

 

কর্নেল উঠে গিয়ে পর্দা তুলে বারান্দার দু-দিক দেখে এলেন। তারপর ইজিচেয়ারে বসে চুরুট ধরিয়ে বললেন –ফেরার পথে ড্যামের রাস্তার ধারে একটা গাছের তলায় বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। কয়েকটা জেলে-নৌকো সেখানে বাঁধা ছিল। ওরা রান্না চাপিয়ে গল্প করছিল। এমন সময় দুটো লোক এসে জেলেদের কাছে মাছ কিনতে চাইল। ওরা, বলল, সব মাছ ভোরবেলা চালান গেছে। মাছ কিনতে হলে ভোরবেলা এসো। কথায় কথায় লোকদুটো যে চন্দ্রপুরের বাসিন্দা, তা জানতে পারলাম। তারা জেলেদের বলল–জাহাজিবাবু পাঠিয়েছেন। জেলেরা গ্রাহ্য করল না। যে-বাবুই পাঠান, এখন মাছ কোথায়? লোকদুটো হুমকি দিল-জাহাজিবাবুকে চেনো না? ইচ্ছে করলে উনি সব নৌকো ডুবিয়ে দেবেন। জেলেদের সঙ্গে এইসব তর্কাতর্কি চলছে, আমি তখনও তো জাহাজিবাবুকে চিনি না। বাইনোকুলারে আকাশ থেকে ধনুকের মতো বেঁকে নেমে আসা হিমালয়ের হাঁস দেখছি। প্যান্ট-সোয়টার পরা লোকদুটো সিগারেট ধরিয়ে কথা বলতে বলতে চলে গেল। আমাকে তারা গ্রাহ্য করেনি। কারণ আমার মতো অনেক টুরিস্ট এ সময় ড্যামের জলে পাখি দেখতে বা বোটে রোয়িং করতে আসে।

 

কর্নেল একদমে কথাগুলো বলে চুপ করলেন। বললাম-তারপর?

 

– আমার পিছন দিয়ে যাবার সময় কানে এল ওদের টুকরো-টুকরো কথা। এখন নয় … কেল্লাবাড়ির জঙ্গলে সাঁওতালরা আসে। … রমজান পাখাড়ু? হ্যাঁ, ও ব্যাটা বড্ড বেশি সেয়ানা। …দেউড়ির কাছাকাছি…হ্যাঁ, হ্যাঁ, বাবু ঢ্যারা দেগে রেখেছে। আমি চিনি চিনি। … শাবল চাই বইকি। …পাঁচটার মধ্যেই আসবে কিন্তু। আমি থাকব। …ওদের এইসব কথা আমার কানে ঢুকিয়ে দিচ্ছিল উত্তরের বাতাস। আমি দক্ষিণে। ওরা চলেছে উত্তরে। এই বাংলোর দিকে।

 

বলে কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজলেন। দাঁতের ফাঁকে চুরুট। আমি সেই পিতলের নলটা দেখার জন্য উশখুশ করছিলাম। বললাম–কিন্তু পেতলের নলে কী আছে দেখছেন কেন?

 

কর্নেল চোখ বুজেই বললেন–বাংলোয় ফিরে তোমার কাছে জাহাজিবাবুর নামধাম পরিচয় পেলাম। কাজেই কেল্লাবাড়ির জঙ্গলে না গিয়ে পারিনি। এবং আমার অভিযান সফলও হয়েছে!

 

-আহা, নলটা!

 

–এখন নয়। ডিনারের পর।

 

–ঠিক আছে। কিন্তু সেই লোকদুটোই কি পাথরের স্ল্যাব খুঁড়ছিল?

 

–বোকার মতো প্রশ্ন হল, ডার্লিং।

 

–মানে, আপনি শিয়োর কি না জানতে চাইছিলাম।

 

–আজ রাতে ক্যামেরা থেকে ফিল্ম রোলটা বের করে প্রিন্ট করে ফেলব। তুমি লক্ষ্য করোনি, টর্চের আলো জ্বালবার সঙ্গে-সঙ্গে ক্যামেরার শাটার অটোমেটিক করে রেখেছিলাম। তিন মিনিট সময় দেওয়া ছিল। কাজেই ওরা খুঁড়ে নলটা বের করার আগেই আমাকে উঠে দাঁড়িয়ে ওদের চার্জ করতে হয়েছিল।

 

-বলেন কী! ওদের ফোটোও তাহলে উঠেছে!

 

–ওঠার কথা। দেখা যাক।

 

-কিন্তু কর্নেল, আপনার গলা থেকে পেটের কাছে যে ক্যামেরা ঝুলছে, উঠে দাঁড়ানোর সময় তার লেন্স অন্যদিকে ঘুরে যেতে পারে।

 

কর্নেল ভুরু কুঁচকে এবার তাকালেন। –তুমি সংবাদিক হলে কী করে জানি না। এতকাল ধরে তুমি আমার সঙ্গী। ক্যামেরাটা লক্ষ্য করোনি। এই দ্যাখো ক্যামেরার পিছনে একটা ক্লিপ। ওটা। আমার প্যান্টের বেলটের সঙ্গে আটকে দিলেই ক্যামেরার লেন্স সোজা থাকবে।

 

হাসতে হাসতে বললাম-এও কি আপনার সামরিক জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া?

 

কর্নেলও হাসলেন। –নাঃ! যে প্রজাপতি জাল দিয়ে ধরতে যাচ্ছি, এক হাতে তার দিকে ক্যামেরা তাকে করে শাটার টেপার অসুবিধে আছে। তার চেয়ে কোমরে ক্যামেরা আঁটা থাকলে প্রজাপতিটা জালে না ধরা পড়ুক, তার ছবিটা পেয়ে যাব। …

 

ঠান্ডা ক্রমশ বাড়ছিল। তাই নিয়মভঙ্গ করে কর্নেল রাত্রি সাড়ে নটায় এই ঘরেই ডিনার পাঠাতে বলেছিলেন। নরুঠাকুর আর ভৈরব দুটো ট্রেতে গরম লুচি, আলুর দম আর মুরগির মাংস রেখে গেল। কর্নেল জিজ্ঞেস করলেন–রমেনবাবু কী করছেন?

 

ভৈরব বলল-ম্যানেজারবাবুর স্যার ঠান্ডার ধাত। তাই এত রাতে বাইরে বেরোন না।

 

নরুঠাকুর বলল–ওতেই হবে তো স্যার? নাকি আরও একডজন লুচি ভেজে আনব?

 

কর্নেল হাসলেন। -আমার চেহারা দেখে ঠাকুরমশাই ভাবছেন, আমি লুচির পাহাড় গিলতে পারি? এই যথেষ্ট। আপনারা খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়ুন। এঁটো থালাবাটি সকালে নিয়ে গেলেই চলবে।

 

নরু ঠাকুর চলে গেল। ভৈরবকে ডেকে কর্নেল বললেন–তোমাদের বাংলোয় গার্ড নেই?

 

ভৈরব বলল–দুজন দারোয়ান আছে। পালা করে ডিউটি দেয়। গার্ডের দরকার হয় না স্যার। এ তল্লাটে চোর-ডাকাতের ভয় নেই। যারা ড্যামে বোট চালাতে বা পাখি দেখতে আসে, তারা দিনে এসে সন্ধ্যার আগে চলে যায়।

 

-দুপুরে যে মাছ খেয়েছি, তা কি এই ওয়াটারড্যামের?

 

আজ্ঞে হ্যাঁ। বাংলোয় গেস্ট এলে জেলেদের বলে আসি।

 

–আচ্ছা ভৈরব, তোমার বাড়ি কোথায়?

 

–চন্দ্রপুর স্যার।

 

রমেনবাবু চন্দ্রপুরের এক জাহাজিবাবুর কথা বলছিলেন। চেনো তাকে?

 

ভৈরব বাঁকা মুখে বলল-শম্ভু চৌধুরি সাংঘাতিক লোক স্যার। বছরে একবার বাড়ি আসে। কখন আসবে, তার ঠিক নেই। শুনলাম সে এ মাসে এসেছে। যখনই আসে, একটা করে মানুষ খুন হয়।

 

চমকে উঠেছিলাম। বললাম–সে কী! পুলিশ তাকে ধরে না?

 

ভৈরব বাঁকা মুখেই হাসবার চেষ্টা করল। পুলিশ জানতে পারলে তবে তো তাকে ধরবে!

 

কর্নেল হাসলেন। পুলিশ জানে না! তুমি কী করে জানতে পারো?

 

–আমার সন্দেহ হত আগে। পরে দেখে আসছি, যতবার জাহাজিবাবু বাড়ি আসে ততবার এলাকার কেউ না কেউ খুন হয়। গত বছর জাহাজিবাবু এসেছিল খরার মাসে। তারপর তিতলিপুরের সন্টুবাবুর লাশ পাওয়া গিয়েছিল ড্যামের জলে। জেলেরা লাশের খবর দিয়েছিল থানায়। পুলিশ এসে লাশ তুলল। মাথার পিছনে গুলির দাগ ছিল। সন্টুবাবুও অবশ্যি ভালো লোক ছিল না। বর্ডারে চোরাচালানির কারবার করত। জোরে শ্বাস ছেড়ে ভৈরব চাপা স্বরে ফের বলল–পুলিশ স্যার দেখেও দেখে না। এ পর্যন্ত আমার হিসেবে পাঁচটা খুন হয়েছে। প্রত্যেকটা লাশের মাথার পিছনে গুলির দাগ। আমার স্যার সামান্য মাথা। ক্লাস ফোর পর্যন্ত বিদ্যা। কিন্তু কারও মাথায় কেন এই সোজা ব্যাপারটা ঢোকে না জানি না।

 

-তুমি কি এ কথা আর কাকেও বলেছ?

 

–না স্যার! আমার ঘাড়ে কটা মাথা?

 

তবে আমাদের কাছে বলে ফেললে যে?

 

ভৈরব আড়ষ্ট মুখে হাসবার চেষ্টা করল। -ম্যানেজারবাবু বলছিল, আপনি স্যার মিলিটারি অফিসার। এতদিন পেটের ভিতরে কথাটা ঢুকে ছিল। আপনাকে বলে শান্তি পেলাম। মিলিটারি আমি কম বয়সে এই তল্লাটে কতবার দেখেছি স্যার! এখান থেকে পাকিস্তানের বর্ডার বেশি দূরে নয়। দুদেশে যুদ্ধ বাধার উপক্রম হলেই এই এলাকা মিলিটারিতে ভরে যেত। মিলিটারির পাওয়ার কত! স্যার এবার যদি আবার লাশ পড়ে, আপনি দয়া করে মিলিটারি ডেকে আনবেন। জাহাজিবাবুকে জব্দ করতে আপনারাই পারবেন।

 

কথাগুলো শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে বলেই ভৈরব চলে গেল। কর্নেলের মুখের দিকে তাকালাম। তিনি নির্বিকার মুখে মুরগির ঠ্যাংয়ে কামড় দিচ্ছেন। …

 

রাত দশটায় চুরুট ধরিয়ে কর্নেল দরজা বন্ধ করলেন। তারপর কিটব্যাগ থেকে প্রথমে ব্রোঞ্জের ডিমালো ফলকটা বের করলেন। ওটা কখন কী লোশনের সাহায্যে ব্রাশ দিয়ে ঘষে চকচকে করে ফেলেছেন। ওঁর কিটব্যাগে কি নেই? ফলকটার একপিঠে সারস এবং কয়েকরকম পাখি, তার ফাঁকে কতরকম রেখা দেখতে পেলাম। উলটো পিঠে অন্যরকম চিহ্ন। কর্নেলের ড্রয়িং রুমে একটা বইয়ে পেরেকের মতো লিপি দেখেছিলাম। কর্নেল বলেছিলেন, এর নাম কিউনিফর্ম লিপি। কীলকাকার লিপি বলতে পারো। তবে ও লিপি তিনহাজার বছর আগে চালু ছিল। ফলকটার মাথার দিকে একটা ফুটো আছে। এটা কি গলায় ঝুলিয়ে রাখার জন্য?

 

কর্নেল ততক্ষণে পিতলের নলের একটা মুখ ছুরির ডগা দিয়ে পরিষ্কার করে ফেলেছেন। একটু পরে তিনি নলের ভিতরটা আতশ কাচ দিয়ে দেখে নিলেন। তারপর একটা চিমটে দিয়ে টেনে বিবর্ণ এবং গুটিয়ে রাখা লম্বা একটা জিনিস বের করলেন। বললাম–কী ওটা?

 

–এটাকে বলে স্ক্রোল। প্রাচীন যুগে ভেড়া বা ছাগল জাতীয় প্রাণীর হুঁড়ির চামড়া শুকিয়ে একরকম কাগজ তৈরি করা হত। এতে কালো কালিতে কিছু লেখার পর গুটিয়ে রাখা হত। তাই ইংরেজিতে একে বলা হয় স্ক্রোল।

 

তিনি স্ক্রোলটা সাবধানে মেলে ধরে বললেন–কিউনিফর্ম লিপিতে কিছু লেখা আছে। কলকাতা না গেলে এর পাঠোদ্ধার সম্ভব নয়।

 

এই সময় বাইরে নাইটগার্ডের চিৎকার শোনা গেল। –চোর! চোর! ভৈরবদা! ভৈরবদা! চোর! চোর!

 

কর্নেল বেরিয়ে গেলেন। আমিও দরজার কাছে পর্দা সরিয়ে দাঁড়ালাম। চিৎকারটা উত্তরে বাউন্ডারি পাঁচিলের দিকে শোনা যাচ্ছিল। পাঁচিলে কাঁটাতারের বেড়া বসানো আছে। ভৈরবের হাসি শুনতে পেলাম। সে বলছে–ছিঁচকে চোর। টর্চের আলোয় মুখটা চেনাচেনা লাগল। ব্যাটা ড্যামের ঠান্ডা জলে ঝাঁপ দিলে মজাটা টের পেত। ..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *