তিতলিপুরের জঙ্গলে (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
বারো
কখনও গুঁড়ি মেরে কখনও ঘন গাছের আড়ালে একটুখানি দাঁড়িয়ে কর্নেল গাড়িটাকে খুঁজছিলেন। প্রায় আধঘণ্টা পরে তিনি চাপাস্বরে বললেন–এখানে গাড়িটা রাস্তা থেকে নেমে জঙ্গলে ঢুকেছে। চাকার দাগ দেখা যাচ্ছে। ফাঁকা ঘাসে ঢাকা জায়গা দিয়ে গেছে গাড়িটা। কিন্তু আমরা ফাঁকা জায়গায়। যাচ্ছি না।
বলে তিনি আমাদের থামতে ইশারা করলেন। তারপর বাঁ দিকে এগিয়ে ঝোপঝাড়ে থাকা একটু ধ্বংসস্তূপে উঠে গেলেন। বুঝলাম, কর্নেল বাইনোকুলারে গাড়িটা খুজবেন। কিন্তু ক্রমে ছায়া ঘন হয়ে এসেছে। নিবিড় জঙ্গলের মধ্যে কি গাড়িটা ওই যন্ত্র দিয়ে খুঁজে পাওয়া সম্ভব?
কিন্তু অসম্ভব হয়তো কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের পক্ষেই সম্ভব হয়ে ওঠে। তিনি সাবধানে স্তূপ থেকে নেমে এলেন। হালদারমশাই ফিশফিশ করে জিজ্ঞেস করলেন-কিছু দ্যাখলেন?
কর্নেল বললেন–একটা ভাঙা দেউড়ি এখনও খাড়া হয়ে আছে। তার নিচের দিকে লাল মারুতির একটুখানি অংশ দেখা যাচ্ছে। সাবধানে আসুন আপনারা। জয়ন্ত তোমার ফায়ার আর্মস এনেছ তো?
বললাম-এনেছি।
–হালদারমশাই?
–হঃ! জঙ্গলে নিরস্ত্র হইয়া ঢুকব ক্যান?
-কিন্তু বিন্দুমাত্র শব্দ নয়। দেখছেন তো? সবখানে ঝরাপাতা পড়ে আছে। যত সময় লাগুক, নিঃশব্দে এগোতে হবে। আর্মস রেডি রাখুন।
শীতের জঙ্গলে ঝরা পাতার ওপর দিয়ে নিঃশব্দে হাঁটা খুব সহজ কাজ নয়। তবে আমরা ঝোপঝাড় এবং কেল্লার ধ্বংসস্তূপের আড়ালে গুঁড়ি সময় লাগল। তারপর একটা স্তূপের আড়ালে লাল মারুতিটা দেখতে পেলাম। একটা উঁচু টুটাফাটা এবং আগাছাটাকা দেউড়ি কাছাকাছি দেখা গেল। গাড়িটার গায়ে হেলান দিয়ে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। ধ্বংসস্তূপের পাশ কাটিয়ে প্রথমে কর্নেল তার সামরিক জীবনের গেরিলাযুদ্ধের একটা কৌশল যেন দেখিয়ে দিলেন।
পিছন থেকে লোকটার ঘাড়ের ওপর ডান হাত দিয়ে আঘাত করলেন। এখন তার বাঁ হাতে রিভলভার। আর লোকটা তখনই নিঃশব্দে নেতিয়ে পড়ে গেল। কর্নেল চাপাস্বরে বললেন জয়ন্ত! আমার কিটব্যাগের চেন টেনে দড়ি বের করো।
হালদারমশাই অস্ত্রহাতে চিতাবাঘের মতো চারদিকে লক্ষ্য রেখেছেন। দড়ি বের করে চেন এঁটে দিলাম। কর্নেল লোকটার দুই হাত টেনে পিঠমোড়া করে বাঁধলেন। দুটো পা বেঁধে ফেললেন। লোকটা গাড়ির ড্রাইভার, তা বোঝা গেল। তার হাত থেকে চাবির গোছা ছিটকে পড়েছিল। চাবি কর্নেল কুড়িয়ে নিলেন।
এবার দেখলাম, দেউড়ির অন্য পাশে বৌদ্ধস্তূপের মতো দেখতে একটা গম্বুজঘর। এ ধরনের গম্বুজঘর দিল্লি, আগ্রা এবং অন্যত্র দেখেছি। এগুলো মোগল আমলে প্রহরীদের জন্য তৈরি করা হত। এই গম্বুজঘরটা ঘন লতাগুল্মে ঢাকা। মুখের দিকটায় লতার ঝালর ঝুলে আছে। তার ফাঁকে আলোর ছটা দেখা যাচ্ছে।
কর্নেলের নির্দেশে হালদারমশাই আর আমি লোকটাকে ধরাধরি করে একটু তফাতে আরেকটা ধ্বংসস্তূপের আড়ালে রেখে এলাম।
কর্নেল বললেন–আর্মস রেডি করে আমার পিছনে আসুন হালদারমশাই! জয়ন্ত! তুমিও এসো।
ঝুলন্ত লতাপাতার ঝালর একটু ছেঁড়া দেখে বোঝা গেল, কেউ বা কারা গম্বুজঘরে ঢুকেছে। গুঁড়ি মেরে সাঁতসেতে শ্যাওলাঢাকা হাত চার-পাঁচ মেঝের পর সিঁড়ির ধাপ দেখা গেল। নিচে থেকে আলোর ছটা ধাপে পড়েছে। শেষ ধাপে কর্নেল থমকে দাঁড়ালেন। সামনে বন্ধ দরজা। দরজার ফাটল দিয়ে আলো বেরিয়ে গম্বুজঘরের মেঝে পর্যন্ত ছটা ফেলেছে।
ভিতর থেকে চাপা গলায় কেউ কাকে ধমক দিচ্ছে–এই শেষবারের জন্য বলছি, সঠিক জবাব দাও।
জড়ানো গলায় এবং কাতর স্বরে কেউ বলল–আমাকে আর কষ্ট দিয়ো না। মেরে ফ্যালো।
–তবু কথাটা বলবে না? তাহলে থাকো তুমি এই পাতালঘরে। আলোর লাইন কেটে দিয়ে দরজায় তালা এঁটে চলে যাই। কেমন?
–অজু! অজু! দয়া করো ভাই। একটু দয়া করো।
–কোনও দয়া নয়। বিশ্বাসঘাতকের জন্য এই শাস্তিাটাই মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলাম।
আচমকা ঘরের আলো নিভে গেল। তারপর কপাটের ফাটল দিয়ে টর্চের আলো দেখা গেল। আর হ্যাঁচকা টানে কেউ ভিতর থেকে দরজা খুলতেই কর্নেল তার বিশাল শরীরের ধাক্কায়। লোকটাকে ধরাশায়ী করলেন। আমি টর্চ জ্বালোম। হালদারমশাই একলাফে পাতালঘরে ঢুকে ধরাশায়ী লোকটাকে দেখে বলে উঠলেন-অ্যাঁ! এই হালা তো দেখি সেই হরিবাবু।
হরিবাবুর হাতের টর্চ ছিটকে পড়ে মেঝেয় আলো ছড়াচ্ছিল। কর্নেল বললেন–হালদারমশাই! আপনার হরিবাবুর জ্যাকেটের ভিতর-পকেটে শক্ত কী একটা ভরা আছে। ওটা নিশ্চয় ফায়ার আর্মস! বের করে নিন।
গোয়েন্দাপ্রবর এ-কাজে পটু। একটা ফায়ার আর্মস জ্যাকেটের পকেট থেকে বের করে তিনি গর্জন করলেন–ইচ্ছা করে দিই হালার খুলি উড়াইয়া।
কর্নেল হরিবাবুর বুক থেকে উঠে তার জামার কলার ধরে তাকে দাঁড় করালেন। হরিবাবু লাল চোখে তাকিয়ে ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস ছাড়ছিলেন। কর্নেল তার ডান কানের পিছনে রিভলভারের নল ঠেকিয়ে বললেন-একটুও নড়বে না হরিবাবু। নড়লেই মুণ্ডু উড়ে যাবে। এবার লক্ষ্মী ছেলের মতো আমার সঙ্গে চলো। হালদারমশাই! আপনি আমার পাশে এসে হরিবাবুকে নিয়ে যেতে সাহায্য করুন। জয়ন্ত! তুমি ক্যাপটেন সিনহাকে নিয়ে এসো।
টর্চের আলোয় ঘরের কোণে এক বৃদ্ধ ভদ্রলোককে জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকতে দেখলাম। উনিই সেই ক্যাপটেন এস কে সিনহা। তাঁর কাছে গেলে তিনি কান্নাজড়ানো গলায় বললেন–ও হরিবাবু নয়। ওর নাম অজয়েন্দু রায়।
হালদারমশাই শুধু বললেন-অ্যাঁ! তারপর কর্নেলের সঙ্গে অজয়েন্দু নারায়ণ রায়ের কাঁধের কাছে অন্যদিকের কলার ধরে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকলেন।
আমি বুদ্ধি করে সুইচ খুঁজে আবার আলোটা জ্বেলে দিলাম। এবার চোখে পড়ল, ঘরের মেঝেয়। কয়েকটা প্রকাণ্ড প্যাকেট। একটা বস্তায় কী সব আছে। বস্তার মুখ বাঁধা। কিন্তু সিঁড়ি থেকে কর্নেলের তাড়ায় ক্যাপটেন সিনহাকে ধরে ওঠালাম। পা ফেলতে ওঁর কষ্ট হচ্ছিল।
গম্বুজঘর থেকে বেরিয়ে কর্নেল আমাকে তার প্যান্টের বাঁ পকেট থেকে লাল মারুতির চাবি বের করে নিতে বললেন। –জয়ন্ত! ক্যাপটেনসাহেবকে সামনের সিটে বসাও। অজয়েন্দু ওরফে হরিবাবুকে পেছনে ঢোকাচ্ছি।
হালদারমশাইয়ের সাহায্যে কর্নেল পিছনের দুটো সিটের মাঝখানে যেন গুঁজে দিলেন মোটাসোটা নাদুসনুদুস অজয়েন্দু নারায়ণ রায়কে। এখন তার পরনে প্যান্ট-শার্ট-জ্যাকেট।
কর্নেল বললেন–আমি হরিবাবুকে সামলাচ্ছি। আপনি ড্রাইভারকে কাঁধে বয়ে নিয়ে আসুন।
প্রাইভেট ডিটেকটিভ লম্বা ধ্বংসস্তূপটার কাছে গিয়ে খি খি করে হাসলেন–ভগত মরে নাই কর্নেলস্যার। বাঁধন খুলবার চেষ্টা করতাছে। এই ব্যাটা! মিলিটারি বাঁধন তুই খুলবি ক্যামনে? আয়! তরে মড়া কইর্যা কান্ধে চাপাই।
যে কথা, সেই কাজ। আমি বললাম-ওকে এটুকু গাড়িতে কোথায় ঢোকাবেন?
কর্নেল একটু হেসে বললেন-এ গাড়ির ডিকিতে ঢোকাতে হলে ওকে কেটে টুকরো টুকরো করতে হবে।
হাত-পা বাঁধা ভগত হালদারমশাইয়ের কাধ থেকে ঝুলছিল। এ-কথা শুনে ভেউ ভেউ করে কাঁদতে লাগল।
কর্নেল বললেন-বরং এক কাজ করুন হালদারমশাই। ওকে হরিবাবুর কোলের ওপর দিয়ে লম্বালম্বি শুইয়ে দিন। আপনি আমার পাশের সিটে বসে ওর মুণ্ডুটা ধরে থাকুন।
সে এক অদ্ভুত অবস্থা। পিছনের দুটো সংকীর্ণ সিটে ডানদিকে কর্নেল, বাঁদিকে হালদারমশাই এবং মাঝখানে অজয়েন্দ্র রায়, তার দুই পা দুমড়ে তলায় ঢুকে আছে। বেচারা যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। এদিকে তার বুকের ওপর বোঝা তার বিশ্বস্ত অনুচর ভগত। হালদারমশাই বললেন-হালা এই হাত দিয়া আমারে মারতে ড্যাগার তুলছিল!
কর্নেলের নির্দেশে গাড়িতে স্টার্ট দিলাম। আমার গাড়িটা পুরোনো ফিয়াট। কিন্তু কালেভদ্রে দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার মারুতি জিপসি আমাকে চালাতে হয়েছে। এক্ষেত্রে একটাই অসুবিধে। জায়গাটা জঙ্গল হেডলাইটে ফাঁকা জায়গা খুঁজে এগোতে হচ্ছিল। মারুতির মতো খুদে গাড়িতে আটজন লোক। যেকোনও মুহূর্তে উলটে যাওয়ার ভয়ও ছিল।
মোরামরাস্তায় সবেগে উঠে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম-কর্নেল! চন্দ্রপুরের পথ আমি চিনি না। থানা কোথায় তা-ও জানি না।
আমার পাশ থেকে ক্যাপটেন সিংহ জড়ানো গলায় বললেন–চলুন। আমি চিনিয়ে দেব।
চন্দ্রপুরগামী পিচরাস্তায় পৌঁছোনোর পর সামনে দূরে একটা গাড়ির জোরালো হেডলাইট দেখা যাচ্ছিল। পিছন থেকে হালদারমশাই বললেন–জয়ন্তবাবু! সাবধান! এইটুখান রাস্তা।
আমি হর্ন বাজাতে বাজাতে এবং হেডলাইট কখনও নিভিয়ে কখনও জ্বালিয়ে এবার গতি কমিয়ে এগোচ্ছিলাম। একটু পরেই আমাদের গাড়ির পথ আটকে সেই গাড়িটা দাঁড়িয়ে গেল এবং টর্চের আলো পড়ল আমাদের ওপর। তারপরই সামনের গাড়ি থেকে ও সি রাজেন্দ্র হাটিকে রিভলভার উঁচিয়ে নামতে দেখলাম। কর্নেল গাড়ি থেকে নেমে সহাস্যে বললেন–আসুন মি. হাটি! আপনার হাতে অমূল্য সম্পদ দুটো তুলে দিই।
রাজেন্দ্র হাটি এসে আমাদের গাড়ির ভিতর টর্চের আলো ফেললেন, যদিও কর্নেল দরজা খুলে নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মারুতির ভিতরে আলো জ্বলে উঠেছিল। মি. হাটি মুচকি হেসে বললেন–কোনটা কে মি. হালদার?
প্রাইভেট ডিটেকটিভ বললেন–মি. হাটি! আগে এই মালটারে হ্যান্ডকাপ পরানো দরকার। এটা হইল গিয়া হরিবাবু–মানে, অজয়েন্দু নারায়ণ রায়। আর যারে বাইন্ধা মড়ার মতো লম্বা করছি, এটা হইল গিয়া অর চ্যালা ভগত।
কর্নেল চুরুট ধরিয়ে টানছিলেন। পুলিশের জিপ থেকে ততক্ষণে একদঙ্গল কনস্টেবল নেমে লাল মারুতিটাকে ঘিরে ধরেছে। মি. হাটির নির্দেশে অজয়েন্দু এবং ভগতকে টেনে তারা বের করল। হাতকড়ি পরিয়ে অজয়েন্দু রায়কে টেনে নিয়ে গেল। ভগতের পায়ের বাঁধন খোলা যাচ্ছিল না। অগত্যা কর্নেল তার মিলিটারি বাঁধন খুলে দিলেন। তাকেও কনস্টেবলরা পুলিশ জিপের পিছনে ঢোকাল।
মি. হাটি বললেন–সামনের সিটে ইনি কে?
কর্নেল বললেন–ইনিই ক্যাপটেন এস কে সিনহা। অজয়েন্দু রায় এঁকে কলকাতা থেকে কিডন্যাপ করে এনেছিল। বাকি কথা যথাসময়ে শুনবেন। চলুন। আপনার ডেরায় গিয়ে কফি খাব। তারপর অন্য কথা।
পুলিশের গাড়িকে অনুসরণ করে এগোচ্ছিলাম। পিছনের সিটে এবার আরাম করে কর্নেল ও হালদারমশাই বসেছেন। হালদারমশাই বললেন-কর্নেল স্যার! ওই পাতালঘরে চোরাই জিনিস আছে মনে হয়। মি. হাটিরে জানান দেওয়া উচিত ছিল। ক্যান কী, এই সুযোগে অগো চ্যালারা যদি জিনিসগুলি লইয়া যায়?
কর্নেল বললেন–পাতালঘরটার দিকে আপাতত কেউ পা বাড়াবে না।
-কর্নেলস্যার! আমার ধারণা, পাতালঘরটার কথা জাহাজিবাবু জানে। অজয়েন্দু রায়ের লগে অর বন্ধুতা ছিল। বর্ডার এলাকায় দুইজনেই চোরাকারবার করত। আপনি কী কন?
–ঠিক বলেছেন।
–কিন্তু অগো বন্ধুতা নষ্ট হইল ক্যান?
-পরে সব খুলে বলব। ক্যাপটেন সিনহার কাছে গচ্ছিত জিনিসটা জাহাজবাবু চুরি করার পর জাহাজিবাবু সম্ভব অজয়েন্দ্র রায়ের সঙ্গে আর দেখা করত না। এদিকে অজয়ের সন্দেহ হয়েছিল, ক্যাপটেন সিনহাই সেই জিনিস গোপনে বেচবার চেষ্টা করছেন। তাই সুশীলার সাহায্যে ক্যাপটেন সিনহাকে সে কিডন্যাপ করল।
ক্যাপটেন সিনহা বললেন-আমার এই দুরবস্থার জন্য সুশীলাই দায়ী। মেয়েটার জন্য কষ্ট হয়। কিন্তু শয়তানের ফাঁদে পড়লে মানুষকে মরতে হয়। হতভাগিনী বেঘোরে মারা পড়ল।
কর্নেল বললেন–ট্যাক্সি খারাপ হওয়ার পর সুশীলা বেরিয়েছিল। তাই না?
-হ্যাঁ। তারপর গুলির শব্দ শুনলাম। সুশীলা ঝোপের ওপর পড়ে গেল। তারপর আবার গুলির শব্দ হল। কিন্তু তখন কে কাকে গুলি করছে বুঝতে পারিনি। আমাকেও গুলি করে মারবে ভেবে ঈশ্বরকে ডাকছিলাম।
-এই মারুতি গাড়িটা কোন দিক থেকে এসেছিল, আপনি দেখেছিলেন?
-না। তবে অজয়ের হাতে সেলফোন দেখেছিলাম। আমার ধারণা, ওই ফোনে সে গাড়িটাকে আনতে বলেছিল।
-তারপর আপনাকে এই গাড়িতে চাপিয়ে অজয়েন্দু চন্দ্রপুর নিয়ে গিয়েছিল?
-তাই হবে। মাথা তখন ঝিমঝিম করছিল। শুধু মনে আছে, একটা বাড়ির দোতলায় আমাকে খেতে দিয়েছিল।
-তারপর আজ বিকেলে আপনাকে এই গাড়িতে চাপিয়ে তিতলিপুরের জঙ্গলে নিয়ে এসেছিল।
-হ্যাঁ। অজয়ের দৃঢ় বিশ্বাস, শম্ভু আর আমি ওর চোরাই মাল বেচে অনেক টাকা পেয়েছি। শম্ভুকে খুঁজে না পেয়ে অজয়েন্দু আমার ওপর লক্ষ্য রেখেছিল। নিশ্চয় সুশীলাকে টাকা খাইয়ে বশ করেছিল সে।
–আপনার কাছে গচ্ছিত রাখা জিনিসটা কী, তা আপনি কি জানেন?
–জানতাম। কায়রো মিউজিয়াম থেকে চুরি করে আনা একটা পার্চমেন্ট। পেতলের নলে সেটা ভরা ছিল। তখন অজয়ে ফেরারি আসামি। গোপনে একরাত্রে আমার কাছে ওটা রাখতে এসেছিল।
-ওটার সঙ্গে কোনও ফলক ছিল না?
-না। …ও হ্যাঁ। অজয়ে বলেছিল, একটা ব্রোঞ্জের ফলকও ছিল। সেটা শম্ভু হাতিয়ে নিয়েছিল।
কর্নেল একটু চুপ করে থাকার পর বললেন–অজয়েন্দ্র রায় ঠিক কথা বলেনি। সে নিজেই ওটা তার দাদা দীপনারায়ণকে রাখতে দিয়েছিল। দীপনারায়ণ তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু শম্ভুকে ওটা বেচবেন বলে টাকাকড়ি অগ্রিম নিয়েছিলেন। ঘটনাচক্রে সেটা হারিয়ে যায়। সেই আক্রোশে শম্ভু সম্প্রতি এক রাত্রে দীপনারায়ণবাবুকে খুন করেছে।
আমি কিছু জানি না। বলে ক্যাপটেন সিনহা আমার দিকে তাকালেন–বাবা! একটু জল খাওয়াতে পারো? গলা শুকিয়ে গেছে।
পিছনে থেকে কর্নেল তার জলের বোতল এগিয়ে দিলেন। ক্যাপটেন সিনহা অতিকষ্টে কিছুটা জল খেলেন। কিছুটা তার প্যান্ট ভিজিয়ে দিল। …
চন্দ্রপুর থানা থেকে পুলিশের দুটো গাড়ি এসেছিল। একটা গাড়ি আমায় ও হালদারমশাইকে ফরেস্ট বাংলোয় পৌঁছে দিয়েছিল। কর্নেল অন্য গাড়িতে ও. সি. মি. হাটিকে তিতলিপুর জঙ্গলে সেই পাতালঘর দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। ক্যাপটেন সিংহকে চন্দ্রপুরে একটা নার্সিংহোমে রাখা হয়েছিল।
গোয়েন্দাবরের খুব ইচ্ছা ছিল, তিনিও কর্নেলের সঙ্গে যাবেন। কিন্তু কর্নেল বলেছিলেন আপনি আর জয়ন্ত একত্র থাকা দরকার। এখনও আমরা বিপদের মধ্যে আছি। জাহাজিবাবুর গ্যাংয়ের লোকেরা সবাই ধরা পড়েনি।
কর্নেল ফিরে এসেছিলেন রাত এগারোটায়। পাতালঘরে দেশবিদেশের কিছু দেবমূর্তি, সোনাদানার অলংকার আর কয়েক প্যাকেট বিস্ফোরক ছিল। আর একটা কথা–সেই ট্যাক্সিচালকের খোঁজ পাওয়া গেছে। লালবাজার থেকে নরেশ ধর চন্দ্রপুর থানায় জানিয়েছেন কাল সকালে তাকে নিয়ে চন্দ্রপুরে আসছেন।
জিজ্ঞেস করেছিলাম–কালকের দিনটাও এখানে আমরা থাকব নাকি?
-না জয়ন্ত! আমরা কাল সকালেই কলকাতা ফিরব। হালদারমশাই তাঁর মক্কেল ক্যাপটেন সিনহার জন্য থেকে যেতে পারেন অবশ্য!
গোয়েন্দাপ্রবর মাথা নেড়ে বলেছিলেন–না কর্নেলস্যার! আমার মক্কেল নার্সিংহোমে আছেন। পুলিশ ওনার দেখভাল করতাছে। আমার কাজ শেষ।
আমি বললাম–আচ্ছা কর্নেল! মিশরের রানি নেকারতিতির চিঠি আর সেই ফলকটার কী ব্যবস্থা করবেন?
কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন–বেচলে কোটিপতি হতাম। কিন্তু অত টাকা নিয়ে করবটা কী? তার চেয়ে ভারত সরকারের বিদেশমন্ত্রকের মধ্যস্থতায় মিশরের রাষ্ট্রদূতের হাতে সমর্পণ করব। দেখব, কী হইচই পড়ে যায়। পৃথিবী সব দেশের টিভিতে সেই দৃশ্য দেখা যাবে।
প্রাইভেট ডিটেকটিভ খি খি করে হেসে বললেন–আমাগো য্যান বাদ দিবেন না কর্নেলস্যার! কী কন জয়ন্তবাবু?
সায় দিয়ে বললাম–ঠিক বলেছেন হালদারমশাই। …
