কর্নেল বললেন–কোনো ভূমিকার দরকার নেই। আমরা এই বৈঠক ডেকেছিলুম মিঃ শৈলেশ সিংয়ের মর্মান্তিক পরিণামের ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে। কথামতো সবাই এসে পড়েছেন। এখন আমি একে একে কয়েকজনকে। কিছু প্রশ্ন করব। আশা করি, তারা সত্যিকার জবাবটিই দেবেন। মিঃ সাক্সেনা। আপনার স্টেনো ভদ্রলোক তৈরি?
সাক্সেনা মাথা দোলালেন। দেখলুম পিছনে এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক নোটবুক ও পেন্সিল হাতে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। একেবারে তৈরি। কথা শুরু। হলেই পেন্সিল চালাতে ইতস্তত করবেন না–এমনি ভঙ্গি।
কর্নেল বললেন–আমি প্রথমে ডক্টর মহেন্দর শর্মাকে প্রশ্ন করতে চাই।
ডাক্তার শর্মা গম্ভীর হয়ে বললেন করুন। জানলে বলব, নয় তো না।
–ডঃ শর্মা, শৈলেশ সিং গতকাল দুপুরে ঠিক ক’টায় আপনার কাছে গিয়েছিলেন?
–দুটো পাঁচ-টাচ হবে। সঠিক কাটায় কাটায় বলতে পারব না। তবে দুটো বেজেছিল সবে, গিয়েই তো শুয়ে পড়লেন। বললেন–খুব অসুস্থ বোধ করছেন…
–হুম! মারা যান ক’টায়?
যাবার ঠিক তিন মিনিটের মধ্যেই।
–কোত্থেকে আসছেন বলেছিলেন?
–ডঃ শর্মা বিরক্ত হয়ে বললেন-কতবার বলব? এসব কথা তো পুলিশকে ইতিমধ্যে বলেছি।
কর্নেল সবিনয়ে বললেন–প্লিজ ডঃ শর্মা! জবাব দিন।
–কোত্থেকে আসছেন, সে সব কিছু বলেননি। বেশি কথা বলারই ফুরসৎ পাননি। কোনরকমে গাড়ি চালিয়ে এসে ঘরে ঢুকে পড়ে যান।
মিঃ সাক্সেনা চণ্ডীপাহাড়ের বাংলো থেকে ডঃ শর্মার বাড়ি মোটরে ম্যাক্সিমাম স্পিডে পৌঁছতে কতক্ষণ লাগতে পারে?
মিঃ সাক্সেনা, একটু ভেবে জবাব দিলেন–পনের মিনিট।
–ডঃ শর্মা, নিকোটিন খাওয়ার পর কি কেউ পনের মিনিট গাড়ি চালিয়ে এসে আপনার ঘরে ঢুকবার ফুরসৎ পায়? ভেবে বলবেন কিন্তু!
ডঃ শর্মা খাপ্পা হয়ে বললেনবার বার বলছি যে আমি এসব ব্যাপারে কিছু জানিনে! আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ। আমার কর্তব্য ছিল, তাঁকে বাংলোয় তার স্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেওয়া। দিয়েছিলুম।
–ডঃ শর্মা! এটা অস্বাভাবিক। কারণ, আপনি জেনেশুনে একটা ডেডবডি পৌঁছে দিয়েছেন বলছেন! আপনি সরকারের একজন আস্থাভাজন ডাক্তার। বরং তখনই পুলিশকে জানানোই আপনার পক্ষে স্বাভাবিক ছিল না কি?
–ছিল। কিন্তু….
বলুন!
ডঃ শর্মাকে একটু বিব্রত দেখাল। তারপর হঠাৎ যেন মরিয়া হয়ে গেলেন। বললেন–মিসেস সিং ফোনে আমাকে একটা অনুরোধ করায়…
আরাধনা তীব্র প্রতিবাদ জানালনা, আমি ফোন করিনি। তখন এ বাড়িতে সবে পৌঁছেছি জাস্ট দুটো দশে। দিদিকে জিগ্যেস করুন।
–আশ্চর্য! অথচ মিঃ সিংয়ের মৃত্যুর পরই আমি যখন পুলিশকে জানাবার জন্য ফোনের কাছে গেলুম, ফোন বাজল। এক মহিলা নিজের পরিচয় দিলেন মিসেস সিং বলে। উনি…
কর্নেল বললেন–আপনাকে টাকার লোভ দেখালেন?
ডঃ শর্মা খেপে গিয়ে বললেন না!
তবে?
–বললেন যে মিঃ সিং সুইসাইড করার জন্য বিষ খেয়েছেন। আপনি চলে আসুন চণ্ডীপাহাড়ের বাংলোয়। আমি বললুম, সে কী! মিঃ সিং তো আমার এখানে –নাও হি ইজ ডেড। তখন মহিলাটি কান্নাকাটি করে বললেন, আমাকে ঘরে লক করে রেখে এই কাণ্ড করেছেন। প্লিজ ডঃ শৰ্মা, এ জানাজানি হলে স্ক্যান্ডাল ছড়াবে। আপনি আমার অনুরোধটা রাখুন। ওকে এই অবস্থায় এখানে পৌঁছে দিন।
–হুম, তারপর?
–আমি পৌঁছে দিলুম। কিন্তু গিয়ে দেখি, বাংলোয় জনপ্রাণীটি নেই। আমার বুদ্ধিসুদ্ধি গুলিয়ে গেল। এভাবে ডেডবডি নিয়ে গাড়িতে আবার ফেরার রিস্ক নিতে পারলুম না। তখন বডিটা বাংলোয় বারান্দায় নামিয়ে রেখে পালিয়ে এলুম। যাক শত্রু পরে পরে।
তারপর, ফিরে গিয়ে কী করলেন?
–ফিরে গিয়ে দেখি (আরাধনাকে দেখিয়ে) ওই মহিলা আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। কিন্তু উনি নিজের পরিচয় লুকিয়ে ছিলেন। বলেননি যে উনি মিসেস সিং। বললেন–হজম হয় না, পেটের গোলমাল, ওষুধ চাই।
–ওষুধ বা প্রেসক্রিপশান দিলেন?
–হ্যাঁ।
–তারপর পুলিশকে জানাবার কথা ভাবলেন না?
না। আমি ও ব্যাপারে জড়িয়ে পড়াটা ভাল মনে করলুম না।
–ঠিক আছে। এবার আমি প্রশ্ন করব মিসেস আরাধনা সিংকে।
আরাধনা সপ্রতিভ ভঙ্গিতে বলল–অবশ্যই।
–আপনি শিলিগুড়ি থেকে হীরাকুণ্ডা এলেন কেন?–
–মিঃ সিং হঠাৎ অসময়ে চলে এলেন। আমার সন্দেহ হল–কোনো বিপদে ঝুঁকি নিচ্ছেন। আমি সব সময় ওঁকে চোখের সামনে রাখতুম। তাই…
–যাক গে। পৌঁছলেন দুটো দশে। কেমন? মিসেস সুচেতা, কী বলেন?
সুচেতা সিং মাথা দোলালেন–হ্যাঁ, আরাধনা এসেই শৈলেশের কথা জিগ্যেস করল। ও এসেছে কি না আমিও জানতুম না। এলে তো আমার সঙ্গে দেখা না করে যায় না!
কর্নেল বললেন–আপনি এ বাড়ি থেকে হঠাৎ ডঃ শর্মার কাছে হজমের ওষুধ নিতে গেলেন কেন মিসেস আরাধনা?
–এ বাড়ি থেকে ডিরেক্ট যাইনি। প্রথমে হাঁটাপথে বাংলোয় গেলুম। বাংলোয় কেউ নেই। তখন ওই পথেই ফিরে এলুম। তারপর পথে আসতে আসতে হঠাৎ ডঃ শর্মার বাড়ির সামনে দেখি, আমাদের ল্যান্ডমাস্টার গাড়িটা রয়েছে। তখন দৌড়ে ওখানে চলে গেলুম। ডাক্তারের পরিচারিকা বলল যে একজন অসুস্থ লোক ওই গাড়িতে এসেছিল। তাকে কোথায় নিজের গাড়িতে পৌঁছে দিতে গেছেন ডাক্তার। আমি খুব গোলমালে পড়ে গেলুম। নিশ্চয় কিছু একটা ঘটেছে। ডাক্তার ফিরলে তাই ওঁকে কিছু খুলে বলা সঙ্গত মনে করলুম না।
নাকি আপনি তখন যা জানার জেনে ফেলেছেন কোনো সূত্রে এবং তাই আরো স্পষ্টভাবে জানতে এসেছিলেন? তাছাড়া…
-মোটেও না।
–একটা কিছু গোপন করছেন, মিসেস আরাধনা।
না!
–আপনি এসেছিলেন মিঃ সিংয়ের গাড়ি থেকে একটা জিনিস সরাতে।
–মিথ্যা! বলে উত্তেজিতা আরাধনা উঠে দাঁড়াল।
তাকে ইশারায় বসতে বললেন কর্নেল। তারপর বললেন–হুম, আপনি ডাক্তারের বাড়ি থেকে কোথায় গেলেন?
বাংলোয়।
–কোন পথে?
–ওই হাঁটা রাস্তায়।
–তারপর?
–গিয়ে দেখলুম, বারান্দায় মিঃ সিংয়ের বডি রয়েছে। আমি অনেকক্ষণ কান্নাকাটির পর বডিটা বেডরুমে টেনে ঢোকালুম।
দরজা খোলা ছিল?
–হ্যাঁ।
-তারপর?
–ভয় পেয়ে ভাবলুম, আমাকেই স্বামী হত্যার দায়ে পড়তে হবে। তাই বডিটা খাটের নিচে লুকিয়ে রাখলুম। ঠিক করলুম রাতে ওটা উত্তরের খাদে গড়িয়ে ফেলে দেব। আশা করি, বাংলোর উত্তরের খাদটা দেখেছেন। নিচে একটা নদী রয়েছে।
–হুম। রাতে কারা গিয়ে আপনাকে ডাকছিল বলুন। কেন ডাকছিল?
–ওরা মিঃ সিংয়ের লোক। নিশ্চয় কিছু আঁচ করে খোঁজ নিতে গিয়েছিল।
–আপনার নাম ধরে ডাকছিল। এর কারণ?
–ডাকছিল আমার দাদা।
–কী নাম? কোথায় থাকেন তিনি?
নাম মিঃ রাজময় রানা। থাকেন নেপালে। হীরাকুণ্ডায় ওঁর একটা ফার্ম আছে।
মিঃ সাক্সেনা এসময় বলে উঠলেন–ওঁকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে কর্নেল। তবে ওঁর সঙ্গী দুজন বেপাত্তা। মিঃ রানাই রঘুবীর আর লতাকে বেঁধে ঝুলিয়ে রেখে এসেছিলেন খাদে। রঘুবীর বলেছে, রানাসায়েবই মিঃ সিংয়ের পয়লা নম্বর দুশমন। উনি দলবল নিয়ে মিঃ সিংকে খুন করতে যান বাংলোয়। ওঁকে না পেয়ে ওদের নিয়ে যান। মিঃ সিং রানাসায়েবকে পুলিশের হাতে তুলে দিতেই এখানে আসেন গতকাল। বেচারার দুর্ভাগ্য! নিজেই খতম হয়ে গেলেন!
আমি বললুম–তাহলে রঘুবীর-লতা মিঃ সিংকে নয়, রানা-সায়েবকেই ব্ল্যাকমেইল করত? কী বলেন কর্নেল?
কর্নেল বললেন–না জয়ন্ত! আমার থিওরিটা শোন! ওরা নিজেদের মনিবকেই ব্ল্যাকমেইল করত। তাই রানাসায়েবের বোন অর্থাৎ আরাধনা দাদাকে অনুরোধ করেছিল, ওদের খতম করতে। রানাসায়েব কিংবা আরাধনাকেও ওদের ব্ল্যাকমেইল করার সম্ভাবনা ছিল। অন্তত রানাসায়েব তাই ভেবেছিলেন বলে বোনের প্রস্তাব মেনে নেন।
মিঃ সাক্সেনা বললেন সম্পূর্ণ সত্য, কর্নেল। আপনার থিওরি অভ্রান্ত। রঘুবীর আর লতা যে স্টেটমেন্ট দিয়েছে, তা থেকে এই সিদ্ধান্তই দাঁড়ায়।
কর্নেল বললেন–এবার এক জটিল রহস্যে ভরা কেসের ভাইটাল অংশে আলোকপাত হয়েছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, আরাধনা দেবীর মানসিক অবস্থাটা কোথায় দাঁড়িয়েছিল। একদিকে স্বামী, অন্যদিকে দাদা। দুজনেই একটা দুষ্টচক্রের দুই নেতা। পরস্পর ঘোর শত্রু, অথচ কেউ কাকেও ঢিট করতে পারছে না। ঢিট না করলেও শান্তি নেই। পরস্পর পরস্পরকে এড়িয়ে থাকতেও পারছে না, তাহলে চোরা ব্যবসায়ে লোকসান হয়। এদিকে মাঝখানে বিব্রত রানাসায়েবের বোন।
আরাধনার দিকে তাকালাম। সে এবার নতমুখে নিঃশব্দে কাঁদছে।
কর্নেল বললেন–কিন্তু আরাধনা চাননি স্বামীর ক্ষতি হোক। তিনি গতিক বুঝে স্বামীকে বাঁচাতেই ছুটে এসেছিলেন। কিন্তু তখন বড্ড দেরি হয়ে গেছে। এবার আমি প্রশ্ন করব, ডঃ পট্টনায়ককে।
ডঃ পট্টনায়ক তাকালেন।
–আচ্ছা ডঃ পট্টনায়ক, নিকোটিন খওয়ার কতক্ষণ পরে মৃত্যু হয়?
–সেটা মাত্রার ওপর নির্ভরশীল। সেইসঙ্গে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য বা পার্সোনাল কন্সটিটিউশনের ওপরও নির্ভর করে কিছুটা। আমি অনেক কেসে দেখেছি, সবচেয়ে মারাত্মক বিষ দিলেও কেউ কেউ একঘণ্টা মোটামুটি চলৎশক্তিসক্ষম থাকে। ইতিহাসে রাশিয়ার প্রখ্যাত রাসপুটিনের কথা আমরা জানি। বিষে তার কিছুমাত্র ক্ষতি হত না। তবে মিঃ সিংয়ের স্টমাকে যা দেখেছি, মনে হচ্ছে– ডোজ খুব ভাইটাল ধরনের ছিল না। নিশ্চয় কোনো আনাড়ির কাজ। ভয়ে ভয়ে একটুখানি মিশিয়ে কেটে পড়েছিল যেন। হয়তো তক্ষুনি চিকিৎসা হলে ওঁকে বাঁচানোও যেত। কিন্তু উনিও কী ভাবে ব্যাপারটা আঁচ করে গাড়ি চালিয়ে ডাক্তারের কাছে যান। ওটাই ওঁর মৃত্যুর কারণ। এর ফলে রক্ত চলাচল বেড়ে গিয়েছিল এবং হার্ট আক্রান্ত হয়েছিল।
–ডঃ পট্টনায়ক, মিঃ সিংয়ের ক্ষেত্রে খুব ভেবে বলুন–বিষপানের পর কতক্ষণ তার সক্রিয় থাকা অর্থাৎ গাড়ি চালিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল?
একটু ভেবে নিয়ে ডঃ পট্টনায়ক বললেন বড় জোর পাঁচ মিনিট।
কিন্তু বাংলো থেকে আসতে সবচেয়ে কম সময় লাগে পনের মিনিট।
হা। আমার ধারণা, উনি এখানে কাছাকাছি কোথাও বিষে আক্রান্ত হয়েছিলেন। ডঃ শর্মার বাড়ি থেকে ধরুন আড়াই মিনিট মোটরের পথ। বাকি আড়াই মিনিট গাড়িতে ওঠা, স্টার্ট দেওয়া এবং গাড়ি থেকে নেমে ডাক্তারখানায় ঢাকায় খরচ হয়েছে।
এসময় হঠাৎ আরাধনা একটা পিস্তল তুলে চেঁচিয়ে উঠল রাক্ষসী! ডাইনী! শয়তানী!
মিঃ সাক্সেনা আমাদের পাশেই ছিলেন। তক্ষুণি ওর হাতের পিস্তলটা ধরে ফেললেন। দেয়ালে গুলি লাগল। তারপর আরাধনা মূৰ্ছিতা হল।
ওদিকে আরেক দৃশ্য। কর্নেল মিসেস সুচেতার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। আবার গুলির শব্দ হল। তারপর কর্নেলকে দেখলুম ওঁর হাত মুচড়ে একটা পিস্তল কেড়ে নিচ্ছেন।
পুলিশ অফিসার পিছন থেকে মিসেস সুচেতাকে ধরে ফেললেন। কর্নেল বজ্রগম্ভীর স্বরে বললেন মিঃ সাক্সেনা, মিঃ শৈলেশ সিংয়ের মার্ডারারকে প্রেফতার করুন।
আমার চোখের সামনে মিসেস সুচেতাকে ধরে নিয়ে পুলিশ অফিসারারা বেরিয়ে গেলেন। আমি হতভম্ব।
ডঃ শর্মা ততক্ষণে আরাধনার শুশ্রূষায় ব্যস্ত হয়েছেন। কর্নেল বললেন–মিঃ সাক্সেনা, রঘুবীর আর লতাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যার চেষ্টার অভিযোগে রানাসায়েবের বোনকেও আপনার প্রেফতার করা উচিত।
মিঃ সাক্সেনা হাসলেন!–দ্যাটস ওকে, কর্নেল। মিঃ প্রসাদ, বি রেডি!
আরাধনার জ্ঞান ফিরল একটু পরেই।
কর্নেল আমার হাত ধরে বাইরে নিয়ে গেলেন। এতক্ষণ মাথা ভোঁ-ভো করছিল। লনের খোলামেলায় দাঁড়িয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলুম।
কর্নেল বললেন–প্রশ্ন করো, জয়ন্ত।
কী প্রশ্ন? আর কোনো প্রশ্ন নেই।
কর্নেল একটু হেসে বললেন–আরাধনার জন্যে কষ্ট হচ্ছে? কী করব। বলো? আইনের চোখে সৌন্দর্যের কোনো নিষ্কৃতি নেই।
এ সময় ডঃ পট্টনায়ক এসে গেলেন। হ্যালো কর্নেল! আমি বোকা বনে গেছি।
কর্নেল বললেন–মোটেও না। আপনিই তো ধরিয়ে দিলেন খুনীকে।
কী ভাবে?
–পাঁচ মিনিটের জমাখরচ হিসেব করে।
–মাই গুডনেস!
–হ্যাঁ। এই বাড়ি থেকে ডঃ শর্মার বাড়ির দূরত্ব যা-তাতে ওই হিসেবটা মিলে যায়।
–ঠিকই বলেছেন।
এবার কর্নেল তার পকেট থেকে একটুকরো দামি শাড়ির পাড়ের অংশ বের করে বললেন–এটা অবশ্য একটা ক্ল। বাংলোর বেড়ায় আটকে ছিল। মিসেস সুচেতার এক পরিচারিকাকে তখন দেখাতেই বলল–হ্যাঁ, ও রকম পাড়ের শাড়ি একটা মাইজি পরেন বটে!
আমি আর চুপ করে থাকতে পারলুম না।কর্নেল, কেন বৌদি দেওরকে বিষ খাইয়ে খুন করলেন?
কর্নেল, বললেন–শৈলেশ সিং প্রথমে এসে বৌদির কাছে ওঠেননি। আমরা রঘুবীরদের বিবরণমতো জানতে পেরেছি যে তিনি চণ্ডীপাহাড়ের বাংলোয়। ওঠেন। তারপর স্ত্রীর দেরি দেখে বেরিয়ে পড়েন। শ্যালকের সঙ্গে বোঝাঁপড়া। করতে এসেছেন, তাই প্রথমে ওখানে গিয়ে স্ত্রীর খোঁজ না করে বউদির কাছে যান। বউদি তখন যে উদ্দেশ্যেই হোক, দেব্রটিকে বিষ খাইয়ে দেন। একটা কিছু টের পেয়ে শৈলেশ ছিটকে বেরিয়ে যান ডাক্তার শর্মার কাছে। ওদিকে তখন আরাধনা দাদার বাড়ি অপেক্ষা করছে। দাদা ফেরার পর আরাধনা তার কাছে জানতে পারে, শৈলেশ বাংলোয় নেই। তখন সে তার বউদির বাড়ি খোঁজ নিতে যায় এবং শোনে যে হঠাৎ অসুস্থতার জন্য তিনি কোনো ডাক্তারের কাছে। গেছেন।
বাধা দিয়ে বললুম কিন্তু খুনের উদ্দেশ্য কী?
কর্নেল দাড়িতে হাত বুলিয়ে এবং বুকে ক্রস এঁকে বিড়বিড় করে কী বললেন। আমি ফের কী বলতেই উনি হাসলেন।–সেটা এখনও বুঝতে পারিনি জয়ন্ত। আশা করি, কালকের মধ্যেই জেনে ফেলব। চলো, এখন আমার এক বন্ধুর শরণাপন্ন হওয়া যাক। তার গাড়িতে আমাদের ফরেস্ট বাংলোয় ফিরতে হবে। সকাল সকাল শুয়ে পড়তে হবে।…
.
সকালে সবে চা খাচ্ছি, কর্নেল পাখির ফটোগুলো বাছাই করছেন, এমন সময় মিঃ সাক্সেনা এলেন। কর্নেলের প্রথম প্রশ্ন শোনা গেল–শৈলেশ সিংয়ের গাড়িটা নিশ্চয় খুঁজে পাওয়া গেছে মিঃ সাক্সেনা?
মিঃ সাক্সেনা হতভম্ব হয়ে বললেন–হ্যাঁ। কিন্তু…
নিশ্চয় ডঃ শর্মার বাড়ির পিছনের খাদে এবং ভাঙাচোরা অবস্থায়?
–হ্যাঁ, হ্যাঁ। কিন্তু…
–এটাই স্বাভাবিক, মিঃ সাক্সেনা। এমন মজার কেস কখনও দেখিনি। ডঃ শর্মা প্রণয়িনী সুচেতাকে বাঁচাতে সম্ভব-অসম্ভব অনেক কিছুই করবেন, এতে অস্বাভাবিক কিছু নেই। তবু বলব, এ বড় অদ্ভুত কেস। ডঃ শর্মা ভালবাসেন বিধবা সুচেতাকে, সুচেতা নিজের দেওরকে। দেওরটি ভালবাসেন মক্ষিরানী আরাধনাকে। সুতরাং শেষ অবধি সুচেতা প্রণয়ী ডাক্তারের শরণাপন্ন হলেন। কেন? না–ঈর্ষায় ততদিনে অন্ধ প্রতিহিংসা জেগেছে সুচেতার মনে। এই ডাক্তারটি আসলে হাঁদারাম গবেট।
তাছাড়া আরেকটি বড় মোটিভ পাওয়া গেছে, কর্নেল। শৈলেশ সিং আয়কর ফাঁকি দিতে এক বিরাট সম্পত্তি বউদির অ্যাকাউন্টে রেখেছিলেন। স্ত্রী যেহেতু তার শত্রু রানাসাহেবের বোন, তাকে কখনও মনে মনে বিশ্বাস করতে পারেননি।
কর্নেল বললেন–তাহলে মোটিভ হিসেবে এটাই মুখ্য, বলব। এই কেসে আপাতত বিভিন্ন অপরাধের মূল আসামী সংখ্যা হল সর্বসাকুল্যে চারজন। তাই না? আরাধনা ও রানাসায়েবের বিরুদ্ধে অভিযোগ খুনের মোডাস অপারেন্ডি তৈরি, সাক্ষ্যপ্রমাণ লোপ, প্ররোচনা ও আনুষঙ্গিক ব্যাপারে মূল খুনীকে সহায়তা। আর মিসেস সুচেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ–ডেলিবারেট মার্ডার। একেবারে ঠাণ্ডা মাথায় ইচ্ছাকৃত এবং পরিকল্পিত পদ্ধতিতে হত্যা। তাই না?
–হ্যাঁ, কর্নেল।
–একেই বলে পাপচক্র।…বলে কর্নেল একটু হাসলেন। বাই দা বাই, সুচেতাদেবীর সাহসের জন্য কিন্তু আমি প্রশংসাই করব। গতরাত্রে বারোটার পর ডঃ শর্মাকে নিয়ে পাহাড়ী বাংলোয় হাজির হওয়াটা অবশ্য সহজ। কিন্তু তারপর যা করেছেন, ভাবা যায় না। আরাধনাকে ডেকেছেন কান্নাজড়ানো গলায়। আরাধনার মাথার ঠিক ছিল না। দরজা খুলেছে। বাইরে শর্মা তখন চুপচাপ দাঁড়িয়ে। সুচেতা ঘরে ঢুকেছেন। কথায় কথায় ওকে অন্যমনস্ক রাখার চেষ্টা। করছেন। হঠাৎ শর্মা ঢুকে ক্লোরোফর্মে ভেজা রুমাল বেচারা আরাধনার মুখে চেপে ধরলেন। তারপর তাকে অজ্ঞান করে বাথরুমে ঢুকিয়ে দিলেন। তখন সুচেতা মানবী ছিলেন না। প্রতিহিংসা ও স্বার্থ মিলে স্রেফ দানবী হয়ে গেছেন। লাশের গলা কেটে প্রতিপন্ন করতে চাইলেন যে এটা বিষ প্রয়োগ খুন নয় গলাকাটার ব্যাপার এবং এজন্যে দায়ী আরাধনা। সে তার দুর্ধর্ষ দাদার সাহায্যে এটা করেছে।
–কিন্তু ওকে বাথরুমে ঢোকালেন কেন? আর বিছানায় ঘুমন্ত জয়ন্তবাবুকেই বা রেহাই দিল কেন, বোঝা যাচ্ছে না।
–ডবল খুনের মনোবল ছিল না! তাই জয়ন্ত বেঁচে গেল।
আমি আঁতকে উঠলুম–ওরে বাবা!
কর্নেল হেসে বললেন–ডঃ শর্মা নিশ্চয় আলো ফেলে জয়ন্তের অবস্থা আঁচ করেছিলেন–তাছাড়া আর কোনো ব্যাখ্যা হয় না। মরফিয়ার ঘুমে কতকগুলো স্পষ্ট লক্ষণ ফুটে থাকে মুখে। অভিজ্ঞ ডাক্তার একবার দেখলেই তা টের পান। ঘরে অত কাণ্ড হল, অথচ জয়ন্ত জাগছে না–এতেই তো ডাক্তারের সন্দেহ হওয়া স্বাভাবিক। আর আরাধনাকে বাথরুমে ঢোকানোর কারণ আরাধনাকে সরাসরি খুনী না করে খুনের হুকুমদাত্রী প্রতিপন্ন করা। ওঁরা ভেবেছিলেন যদি আদালত অবিশ্বাস করে বসে যে আরাধনার মতো বাইশ-তেইশ বছরের অমন মেয়ের পক্ষে শক্তিমান এক পুরুষের মুণ্ডুটা স্রেফ এপার ওপার করা অসম্ভব! তাই নয় কি? কাজেই সে লোক দিয়ে খুন করিয়েছে এবং যেন নিজেকে বাঁচানোর জন্যে বাথরুমে ঢুকে ওই লোকের সাহায্যে দরজা লক করিয়েছে। বেডরুমে স্বামী খুনের ক্ষেত্রে স্ত্রীদের তো এমনি অবস্থাই হয়–হয় বেঁধে রাখে খুনীরা, নয়তো পাশের ঘরে আটকে রাখে। ডাক্তার ও সুচেতা এই চিরাচরিত প্রথা প্রয়োগ করে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে ওইসব কেসে যেমন হয়ে থাকে, এখানেও তাই ঘটেছে অর্থাৎ স্ত্রীই খুন করিয়ে আত্মরক্ষার জন্যে এই কৌশল নিয়েছে।
মিঃ সাক্সেনা বললেন–আপনি দেখছি, চুলচেরা বিশ্লেষণ করে ফেলেছেন। চমৎকার যুক্তি সন্দেহ নেই। কিন্তু সকালে আবার সুচেতা বাংলোয় গেলেন কেন?
–হত্যাকারীর মনস্তত্ত্ব। হত্যার জায়গায় আবার যাওয়ার এক প্রচণ্ড টান থাকে। অবশ্য উনি জানালায় টোকা দিয়ে টের পেতে চেয়েছিলেন যে ঘরের ঘুমন্ত লোকটি জেগেছে নাকি। ভাগ্যিস জয়ন্ত আমার পরামর্শে সাবধান ছিল। জানলা খোলেনি। তাহলে পিস্তলের গুলিতে বেচারা…
আবার আঁতকে উঠে বলুম–যথেষ্ট হয়েছে কর্নেল! বাপস্।
কর্নেল নির্দ্বিধায় বলে উঠলেন–হ্যাঁ। সুচেতা জয়ন্তকে সাবাড় করতেই গিয়েছিল। পেল না, তাই।
আর ঘরে থাকতে পারলুম না। বেরিয়ে এসে রোদে উজ্জ্বল সুদৃশ্য লনে দাঁড়ালুম। হাল্কা হাওয়ায় শরীর জুড়িয়ে গেল। বিশাল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সামনে মনে মনে নতজানু হয়ে বললুম-প্রকৃতি আমাদের ক্ষমা কোরো।
