সুন্দর বিভীষিকা (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
ডঃ পট্টনায়ক বললেন–তিন : ওখানে যতগুলো জুতোর ছাপ পাওয়া গেছে–তা মোট দু ভাগ করেছি। ঝড়বৃষ্টির সময়কার ছাপ আর ঝড়বৃষ্টির পরের ছাপ। ঘরে ও বাইরে সব ছাপই নেওয়া হয়েছে, দেখলুম, ঝড়বৃষ্টির সময় অন্তত জনা তিনচার লোক লন থেকে বারান্দায় হেঁটেছে। কিছু ছাপ ডাইনিং রুমে, কিছু বেডরুমে পাওয়া গেছে। ঝড়বৃষ্টির পরের ছাপ শুধু একজনের। সে ডাইনিং রুমে ঢোকেনি। বেড়রুমে গেছে এবং বেরিয়ে এসেছে। চার : বাথরুমের দরজার হাতলে আরাধনা দেবী ছাড়াও অন্তত একজনের আঙুলের ছাপ পাওয়া গেছে।
ডঃ পট্টনায়ককে থামতে দেখে কর্নেল বললেন–শৈলেশ সিংকে কোথায় খুন করা হয়েছে বলে মনে করেন?
–কিচেন বা ডাইনিং খুঁজেছি। কোথাও বিষাক্ত জিনিস পাইনি। ডাইনিং রুমের মেঝে টেবিল সব পরীক্ষা করেছি। সন্দেহজনক কিছু নেই। তাই আমার ধারণা, ওঁকে বাইরে কোথাও খুন করে বাংলোয় আনা হয়েছিল। তারপর সম্ভবত খাটের তলায় ঢুকিয়েই ছোরা চালানো হয়। তখন তো রক্ত জমাট। রাইগর মরটিস শুরু হয়েছে। অর্থাৎ দেহ শক্ত হতে লেগেছে।
ছোরা চালানোর সময়টা আন্দাজ করেছেন কি?
হা। আমার ধারণা, রাত এগারোটা থেকে বারোটার মধ্যে।
আমি শিউরে উঠলুম। তখন আমি মরফিয়ার নেশায় কাঠ। আর নিশ্চয় ওই শয়তানীটা স্বামীর লাশে দিব্যি ভোজালি চালিয়েছে! কী সর্বনেশে মেয়ের সঙ্গে না ঢলাঢলি করেছি!
কর্নেল বললেন–ঝড়বৃষ্টির পরে অন্তত দুজন বেডরুমে ঢুকেছিল! তাই না। ডঃ পট্টনায়ক?
–হ্যাঁ।
ততক্ষণে আমার মাথা ঝিমঝিম করতে লেগেছে। যতবার রাতের দৃশ্যটা ভাবছি, মগজের ভিতর ঠাণ্ডা আঙুল পড়ছে কার। আমাকে মরফিয়া খাইয়েছিল! সর্বনাশ! তাই আমার অত ঘুম পাচ্ছিল! ওই লাবণ্যময় মুখের আড়ালে কী নিষ্ঠুরতা!
বাইরে খোলা হাওয়ায় দাঁড়ালুম। একটা পাহাড়ের গায়ে এই ফরেস্ট বাংলো। চারদিকে ছড়ানো থরে বিথরে প্রকৃতির ঐশ্বর্য! এখন আমার চোখে শুধু মায়াবিনী আরাধনার চেহারা ভেসে উঠছে। অত সুন্দর মেয়ে আমি কোথাও দেখিনি! দেখিনি অমন আশ্চর্য যৌবন আর মধুময় শরীর। সেই শরীরের স্পর্শ ভোলা যায় না। অথচ ঘৃণায় মনটা তেতোও। অন্যমনস্কভাবে দাঁড়িয়ে রইলুম।
চমক ভাঙল জিপের শব্দে। দেখি, মিঃ সাক্সেনা আর ডঃ পট্টনায়ক চলে গেলেন। কর্নেল লনের একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছিলেন। এবার ডাকলেন– ডার্লিং! শিগগির তৈরি হয়ে নাও, আমরা বেরোব।
বললুম-রক্ষে করুন গোয়েন্দামশাই! আর উড্ডাকের পিছনে দৌড়বার সাধ্যি আমার নেই। আপনি যান, আমি ক্লান্ত।
কর্নেল এসে আমার হাত ধরে সবিনয়ে বললেন–আহা হা, তুমি তো অমন বেরসিক ছিলেন না জয়ন্ত! হল কী তোমার? প্লিজ, কথা শোন। আজ তোমাকে সত্যি এক আশ্চর্য জিনিস দেখাব!
কাল তো অত্যাশ্চর্য দেখিয়ে ছেড়েছেন। আর দেখতে চাইনে।
কর্নেল আমাকে ছাড়লেন না। বিস্তর সাধাসাধির পর নরম হলুম। দুজনে পোশাক বদলে নিয়ে বেরোলুম। রাইফেলটা নিতে দিলেন না। বললেন–এবেলা আমরা হীরাকুণ্ডা টাউনশিপে যাব। দেখবে, পৃথিবীতে এখনও অসংখ্য বিস্ময় আমাদের জন্যে অপেক্ষা করে আছে।
সারাপথ ছেলেভুলানো ধরনের কথায় আমাকে তুষ্ট করতে করতে বৃদ্ধ সঙ্গীটি টাউনশিপে পৌঁছলেন। তখন বিকেল হয়ে গেছে। কথা বলতে বলতে হঠাৎ কর্নেল হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলেন। একবারে ধূলিসাৎ যাকে বলে। আমি তাকিয়ে ওঁর দুর্দশা দেখছি, উনি হাত বাড়িয়ে করুণ মুখে বললেন–ওঃ জেসাস! আমি…এবার সত্যি গেছি! প্রিয় জয়ন্ত, আমাকে ওঠাও। ও হো হো হো! একেবারে কম্পাউন্ড ফ্র্যাকচার নির্ঘাত।
আমি অবাক। এমন ঝকঝকে পিচের রাস্তা, সারাদিনের উজ্জ্বল রোদে একেবারে শুকনো খটখটে। পা ফস্কাবার কোন কারণই থাকতে পারে না। অথচ বুড়ো হোঁচট খেলেন কী ভাবে?
হাসতে হাসতে টেনে দাঁড় করালুম। কিন্তু উনি সমানে কাতরাচ্ছেন। তাহলে নিশ্চয় সত্যি সত্যি জোর চোট লেগেছে। উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লুম। এ যাবৎকাল এই ষাট বছরের মানুষটিকে কোথাও আছাড় খেতে দেখিনিকতবার কত বিদঘুটে পাহাড় ভেঙে বাচ্চাদের মতো ওঠানামা করেছেন। তাঁর এ দুর্বিপাক ঘটল কেন?
ওঁকে সাবধানে ধরে চেঁচিয়ে দূরের এক টাঙাওয়ালাকে ডাকলুম। সে এলে দুজনে ধরাধরি করে ওঁকে ওঠানো হল। তারপর টাঙাওলাকে বললুম-শিগগির কোনো ডাক্তারের কাছে নিয়ে চলো। সবচেয়ে বড় ডাক্তার যিনি তার কাছে।
একটু পরে ঘোড়ার গাড়িটা একটা বাড়ির সামনে থামল। আমি লাফ দিয়ে নেমে দরজায় কড়া নাড়লুম। একটি মেয়ে বেরিয়ে বলল–ডক্টরসাব হাসপাতালসে আভিতক নেহি ঘুমায়া।
ক লোটেগা বাতাইয়ে?
—আধাঘণ্টা পরে মিনাট বাদ!
–তো ডিস্পেনসারি খুল দিজিয়ে। পেসেন্ট হ্যায়। হামলোক ওয়েট করে গা।
মেয়েটি প্রৌঢ়া। মনে হল পরিচারিকা হতে পারে। সে আমাকে এবং গাড়ির যন্ত্রণাকাতর রোগীকে দেখে নিয়ে, অদৃশ্য হল। তারপর পাশের ডাক্তারখানার দরজা খুলে দিল। টাঙাওলার সাহায্যে কর্নেলকে নিয়ে ঘরে ঢুকলুম। তারপর অপেক্ষা করতে থাকলুম।
সেই সময় কর্নেল অস্ফুট স্বরে বললেন–জল খাব, জয়ন্ত।
উঠে গিয়ে ভেতরের দরজায় ডাকলুম–জেরা শুনিয়ে না!
সেই প্রৌঢ়া এল। মুখে স্পষ্ট বিরক্তির চিহ্ন। বললুম–এক গেলাস জল দিজিয়ে না মাইজী। পেসেন্ট পিনা মাংতা।
সে জল এনে দিল। চলে যাচ্ছিল, এমন সময় কর্নেল তাকে ডাকলেন– শুনিয়ে মাইজি!
এরপর দুজনের মধ্যে যে কথা হল, তা এই :
…এই ডাক্তারবাবুর তো ভারি নামডাক। তাই না? জরুর। এঁর চেয়ে বড় ডাগদার আর এ তল্লাটে নেই। বিলাইতি পাস ডাগদার বলেই তো সরকারি মহলে, অত খাতির। হাসপাতালে ভি ডাগদারবাবু আছেন। কিন্তু খুব কঠিন বেমার হলে তখন আমাদের ওনাকে তলব করা চাই।..হুম, তা শুনেছি বটে! সেইজন্যেই তো ওঁর জন্যে অপেক্ষা করা হচ্ছে। তা মাইজি, খুব বড় বড় পেসেন্ট হরবখত নিশ্চয় ওঁর কাছে আসেন?…তা আর আসবেন না! অনেক আসেন। নিশ্চয় গাড়িওয়ালা পেসেন্ট তারা!..জরুর! এই কালই তো এক বড়া আদমী গাড়ি নিয়ে এসেছিলেন! ডাগদারসাব ওনার চিকিৎসা করলেন। কিন্তু বেচারা!…কেন, কেন?…বেচারা বেঁহুশ হয়ে গেল আচমকা। তখন আমাদের দিলওয়ালা ডাগদারসাব ওনাকে নিজের গাড়ি করে হাসপাতালে, নাকি ওনার বাড়ি, কোথায় যেন রেখে এলেন।…বাঃ, খুব উপকারী মানুষ তো?..জরুর। উনি নিজে ভি তাই বলেন–মানবকা সেবা ভগওয়ানকা…আচ্ছা মাইজি, তাহলে উনি স্ত্রীলোকেরও চিকিৎসা করেন? মানে আমার এক বহিন অনেকদিন থেকে ভুগছে।…তাকে জরুর নিয়ে আসবেন।…মাইজি, তাহলে প্রতিদিন মেয়ে রোগীও অনেক আসে?…আলবাৎ আসে।…কাল আমার এক ভাইঝি শুনলুম এখানকার কোন ডাক্তার-কে দেখিয়ে গেছে। কেমন চেহারা, বলুন তো?..খুব খুপ-সুরত! বয়স বেশি নয়। টকটকে ফরসা রঙ।
প্রৌঢ়া পরিচারিকা একটু কেমন-কেমন হাসল–উ বুঝেছি। আপনার ভাইঝিই বটে। কাল কখন এসেছিল সে?
–তা আন্দাজ বেলা আড়াই-তিন হবে।
–গেল কখন?
–তিন-সাড়ে তিন বাজে তখন।…
–হেঁটে নাকি গাড়ি চেপে এসেছিল?
না না, হেঁটে এসেছিল। টাঙা চেপে চলে গেল।
–তখন বুঝি ডক্টরবাবু সেই বেঁহুশ রোগী নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন?
প্রৌঢ়া এতক্ষণে সন্দিগ্ধদৃষ্টে তাকাল। তারপর বলল–আমার কাজ আছে। আপ লোক বৈঠিয়ে।
–শুনিয়ে মাইজি, শুনিয়ে! উও বড়া পেসেন্ট আদমি ভি মেরা আপনা আদমি হ্যায়, আপ নেহি জানতি!
কুছ দরকার নেহি। জাননেকা ক্যা ফায়দা?
–পুছতা হ্যায়, উসকো কোন টাইমমে ডক্টরসাব পঁহুচা দিয়া, আপকী মালুম হ্যায়?
–ম্যায় নেহি জানতি!
বলে প্রৌঢ়া চলে গেল। কর্নেল আমার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বললেন–এই পাহাড়ী মেয়েগুলো বড্ড সরল থাকে আজীবন। উত্তর ভারতের ওই রাজাধিরাজ হিমালয়ের শাসনের নমুনা এটা! জয়ন্ত, আশা করি তুমিও এইসব পাহাড়ী সারল্যের সঙ্গে সুপরিচিত? আর এই সারল্যই ওদের গোঁয়ার করে।
-আপনার ব্যথাটা কোথায় গেল?
কর্নেল পা দুটো ঝেড়ে সোজা রেখে বললেন–মাই গুডনেস! কী ম্যাজিসিয়া ডাক্তার দেখছ জয়ন্ত? চেম্বারে ঢোকার পরই সব সেরে গেল যে! একি, একি!
বলে উনি হঠাৎ উঠে মেঝেয় পায়চারি কিংবা মার্চ শুরু করলেন। আমি হতভম্ব। উনি এবার আমার হাতটা ধরে এক টান দিলেন।
কুইক জয়ন্ত! পা যখন সেরে গেছে ডাক্তার আসার আগেই, মিছিমিছি ফিয়ের টাকা খরচ করার মানে হয় না। এসো, চুপিচুপি কেটে পড়া, যাক্।
বলেই উনি আমাকে প্রায় লুফে নিয়ে পৃথ্বীরার্জের সংযুক্তা হরণের মতো মুহূর্তে রাস্তায় পৌঁছলেন। তারপর এক টাঙাওয়ালাকে থামিয়ে বললেন–লাফ দিয়ে ওঠ জয়ন্ত। এক মুহূর্ত দেরি নয়।
টাঙাওয়ালা বলল কঁহা যাইয়েগা সাব?
কর্নেল গম্ভীর মুখে জবাব দিলেন-চণ্ডীপাহাড়।
শৈলেশ সিংয়ের সেই সৌন্দর্য ও বিভীষিকায় ভরা বাংলোয় ফের যেতে। আমার কৌতূহল ছিল নিশ্চয়। কিন্তু গরজ দেখালুম না। টাঙাটা রাস্তায় বিদায় দিয়ে আমরা উত্রাই-চড়াই ভেঙে শালবনে পৌঁছলুম। তখন কর্নেল একটু হেসে বললেন-জয়ন্ত কি অবাক হচ্ছ?
–পাগল? পাগলদের কাজে অবাক হয় কে?
–আমাকে তুমি পাগল বলছ, জয়ন্ত? কর্নেল করুণ মুখে তাকালেন।
তাছাড়া কী?
উনি সস্নেহে আমার একটা হাত ধরে হাঁটতে থাকলেন। শালবনটা পেরোনো অব্দি মুখ খুললেন না। ফাঁকা জায়গায় পৌঁছে মুখ তুলে টিলার গায়ে বাংলোটা লক্ষ্য করলুম। অস্বাভাবিক নির্জন হয়ে আছে। পুলিশ কাজ শেষ করে চলে গেছে বোঝা গেল। এখন আর পাহারার দরকার মনে করেনি। কর্নেল বললেন তুমি আমাকে অনায়াসে এখন প্রশ্ন করতে পারো, ডার্লিং। আমার চমৎকার মুড এসে গেছে। আহা, পশ্য পশ্য বৎস, বাংলোর গায়ে বিকেলের গোলাপি রোদ পড়ে কী স্বর্গীয় বস্তু না প্রকট হচ্ছে! এই বাড়িটি যদি আমার হত! হুম্ জয়ন্ত প্রশ্ন করতে পারো!
–মাথায় কিছু আসছে না এখন।
–জানতে ইচ্ছে করছে না যে আজ সকালে অত দেরি করে তোমাতে। উদ্ধার করতে গেলুম কেন?
উঁহু।
কর্নেল হাসতে হাসতে এগোলেন। বাংলোর গেট খুলে আমরা ভেতরে ঢুকলুম। কর্নেল আমাকে নিয়ে বাড়িটার পিছন দিকে গেলেন। ওদিকে বুকসমান উঁচু বেড়া আর তার ওপাশে ঢালু হয়ে জঙ্গল নেমে গেছে। মনে হল, ওদিকটা গেটের দিকের মতো খাড়া নয় তাই সোজা গাড়ি চালিয়েও নামা যায়। অবশ্য পাড়ির রাস্তা ওদিকে নেই। একজায়গায় কর্নেল থমকে দাঁড়ালেন। তারপর হাঁটু দুমড়ে বসে কী সব পরীক্ষার পর অস্ফুট স্বরে বললেন–ও. কে.! জয়ন্ত, তোমার মনে হচ্ছে না, এই বেড়া গলে কেউ ঢুকেছিল এপাশে?
ভালো করে দেখে বললুম–হ্যাঁ। তাই মনে হচ্ছে।
কর্নেল কাঠের বেড়ার পাশেই একজায়গা থেকে হঠাৎ কী একটা জিনিস কুড়িয়ে নিলেন। তারপর দ্রুত সেটা পকেটে পুরলেন।
বললুম–কী ওটা? কর্নেলকে অন্যমনস্ক দেখাচ্ছিল। বেড়াটা সেই সন্দেহজনক জায়গায় উনি গলিয়ে যাবার চেষ্টা করছিলেন। জবাব দিলেন না। অবশেষে হাঁটু দুমড়ে ওপারে গলেও গেলেন। আমি ওভাবে না গিয়ে বেড়াটার ধরে ডিঙিয়ে ওপারে গেলুম। তারপর ফের বললুম কী ওটা,বলছেন না যে?
কর্নেল ভীষণ গম্ভীর। মাটিতে ঝোঁপঝাড়ে কী যেন খুঁজছেন। আমার কথা যেন শুনতেই পেলেন না।
এতে নিশ্চয় রাগ হল আমার। বললুম-অত গোয়েন্দাগিরির কী আছে? যা বোঝবার, তা তো এখন বোঝাই গেছে।
কর্নেল শুধু তাকালেন আমার দিকে।
বললুম–আজ সকালে যে ডাক্তারবাবুটিকে পুলিশ এনেছিল এবং আপনার আজব পা মচকানি সারাতে যার চেম্বারে ঢুকেছিলেন, তিনিই যে খুনী, তাতে আর গোলমালটা কোথায়? প্রৌঢ়া পরিচারিকার যা জবানী তাতে স্পষ্ট এটা বোঝা যায়।
কর্নেল বললেন–হুম! বলে যাও।
উৎসাহে বলতে থাকলুম-রঘুবীর আর লতার জবানবন্দী স্মরণ করুন। গতকাল দুটোর পর শৈলেশ গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যান। এবার প্রৌঢ়ার কথা মনে করুন। ওই সময় শৈলেশ ওই ডাক্তারের ওখানে যান।
-কেন?
–এটা অবশ্য আমার থিওরি। আরাধনার সঙ্গে ডাক্তারের অবৈধ সম্পর্ক আছে। শৈলেশ স্ত্রীর দেরি দেখে একটা কিছু নিশ্চয় অনুমান করেছিলেন এবং ডাক্তারের বাড়ি হানা দেন। ওই সময় আরাধনা সেখানে ছিল। তারপর যেভাবে : হোক, বিষ খাইয়ে শৈলেশকে ওরা মারে। তারপর ডাক্তার শৈলেশের লাশটা ফেলতে যান। কিন্তু হঠাৎ সম্ভবত তার মনে হয় যে এটা রিস্কের ব্যাপার হবে। তাই সে নোক পাঠিয়ে রঘুবীর-লতাকে সরায় ওখান থেকে। তারপর বডিটা বেডরুমে খাটের নিচে রেখে আসে। এবং পরে আরাধনা যায়। অবশ্য আরাধনা। জানত না বডিটা কোথায় আছে। সে ডাক্তারের অপেক্ষা করছিল। ইতিমধ্যে আমি গিয়ে পড়ি। আমাকে সে কফিতে মরফিয়া খাইয়ে এবং ভুলিয়ে শুইয়ে রাখে। তারপর আসুন ডাঃ পট্টনায়কের যুক্তিতে! ঝড়জলের পর অন্য কেউ বেডরুমে ঢুকেছিল। সে ওই ডাক্তার ছাড়া আর কে? তারপর আরাধনার সঙ্গে নিশ্চয় হঠাৎ কোনো কারণে ঝগড়া হয়। সম্ভবত বডিটা নিয়ে তর্কাতর্কি থেকে ঝগড়া। হয়তো ওভাবে বডিতে ছুরি চালানো পছন্দ করেনি আরাধনা। যাই হোক, তখন ডাক্তার ওকে বাথরুমে আটকে দেয়। ও সেখানে মানসিক যন্ত্রণায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে। ডাক্তার কাজ সেরে চলে আসে। আমি বাজি রেখে বলতে পারি, এইমাত্র যে জিনিসটা পকেটে পরলেন, তা ডাক্তারের পোশাকের টুকরো। বেড়া গলাতে গিয়ে ছিঁড়ে গিয়েছিল।
কর্নেল হো-হো করে বেদম হাসলেন। তারপর বললেন ব্রাভো! চমৎকার! কিন্তু ডার্লিং, তোমার এই অনবদ্য তত্ত্ব-শৃঙ্খলটির তিনটে জায়গা এত দুর্বল কহতব্য নয়।
বলুন, কোথায়?
–প্রথম রঘুবীর লতাকে যারা বেঁধে ঝুলিয়ে রেখে আসছিল, তারা কিন্তু যা বলেছিল–আমি স্বকর্ণে শুনেছি, তা প্রতিহিংসার ব্যাপার ছাড়া আর কিছু নয়। দগ্ধে দগ্ধে মারতে চেয়েছিল ওদের। কেন?
–হয়তো ওরা ডাক্তার ও আরাধনার ষড়যন্ত্র টের পেয়েছিল, তাই।
–তার জন্যে দগ্ধে মারার মোটিফটা মেলে না। আশা করি, শৈলেশ সিংয়ের সে স্মাগলিং চক্র ফাঁস করার কথা তুমি ভোলনি!
বেশ। দ্বিতীয় দুর্বল জায়গার কথা বলুন।
–দ্বিতীয় ও একজন ডাক্তার যদি খুনী হয়, সে নালি অ্যান্ড সাইকলজিক্যালি এমন একটা পদ্ধতি বেছে নেবে–যা কারো মনে সন্দেহ উদ্রেক করবে না। নিকোটিন প্রয়োগ একটা আকস্মিক পদ্ধতি। কেন সে ওই রিস্ক নেবে? সে ধীর পদ্ধতিতে এগোবে। কারণ, কাকেও রোগে ভুগিয়ে মেরে ফেলা তার পক্ষে খুবই সহজ। ধরা যাক্, তোমার তত্ত্ব অনুসারে হঠাৎ শৈলেশ সিং গিয়ে পড়ে স্ত্রীর ব্যাপারে ঝামেলা বা ঝগড়া বাধিয়েছিলেন। তাহলে তাকে বিষ প্রয়োগ করবে কী ভাবে? সেখানে অবস্থা ও পরিবেশ আত্মীয়তামূলক হওয়া দরকার নয় কি? স্বেচ্ছায় কিছু না খেলে বিষ দেবার সুযোগ কোথায়?
–কিন্তু শৈলেশ সিং গিয়েছিলেন তা তো ঠিক?
সম্ভবত ঠিক।
–তাহলে বলব, ঝগড়া করেননি। অভিনয় করেছিলেন–মানে, চেপে গিয়েছিলেন এবং…
–তাহলেও শৈলেশের সাইকলজিক্যাল প্রসঙ্গ এসে পড়ে। স্ত্রীকে ওখানে আবিষ্কার করার পর তার পক্ষে কি হাসিমুখে বাক্যালাপ করা সম্ভব? ভেবে দেখ জয়ন্ত, এটা কি স্বাভাবিক কারো পক্ষে? যার জন্য বেচারা অধীর হয়ে প্রতীক্ষা করছিলেন, তাকে এক প্রণয়ীর বাড়ি দেখে মানুষ কী করবে?
চুপ করে থাকলুম। গোলমালে ফেলে দিলেন বুড়ো ঘুঘু!
–এবার তৃতীয় দুর্বলতা : শৈলেশ সিংয়ের ব্যাকগ্রাউন্ড–যা পুলিশের নথিতে রয়েছে। ইদানীং শৈলেশ সবসময় শত্রুর ভয়ে কাটাতেন। কয়েকবার তাঁর প্রাণ সংশয় পর্যন্ত হয়েছিল শিলিগুড়িতে। দৈবাৎ বেঁচে যান। যাদের নামে উনি ডায়রি করে রেখেছেন, তাদের নাম শুনলে চমকাবে, জয়ন্ত।
–চমকাব না, বলুন।
রঘুবীর ও লতার নামে।
–অথচ ওঁদের ঘরে পুষছিলেন। বৎস জয়ন্ত, শৈলেশ সিং খুব মহৎ লোক ছিলেন না। রঘুবীর ও লতাও খুব সহজ মানুষ নয়। আমার ধারণা, ওদের উনি বাধ্য হয়ে সব জেনেও পুষছিলেন। ওরা তাকে ব্ল্যাকমেইল করে আসছিল। ওরা শৈলেশের সব গুপ্ত তথ্য জানত। শৈলেশ কেন স্মাগলিং চক্র ভাঙলেন, তাও ওরা জানত।
তাহলে কি ওদের মারতেই এই বাজে মরসুমে চণ্ডীপাহাড়ের বাংলোয় এসেছিলেন?
–তাই মনে হচ্ছে।
–সেই লোকগুলো তাহলে কারা?
–ভাড়াটে গুণ্ডা হতে পারে। পুলিশ শিগগির তাদের খুঁজে বের করবে। আবার স্রেফ ওর দলের লোকও হতে পারে। বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীকে নিপাত করে উনি চুটিয়ে কারবার চালাচ্ছিলেন–সে খবর পুলিশ জানে। ধরার জন্য ওঁত পেতেও ছিল।
–আমি বাংলোয় থাকার সময় ঝড়বৃষ্টির মধ্যে কারা তাহলে হামলা করেছিল? কারা আরাধনার নাম ধরে ডেকেছিল?
–হয়তো একই বাহিনী। তাছাড়া আবার কারা হতে পারে? এবং আরাধনাও সম্ভবত একই চক্রের মেয়ে। তাই নেতার হুকুম তামিল করে এসে দলের মক্ষিরানীর সঙ্গে আড্ডা দিতে চেয়েছিল। চমৎকার জমত নিশ্চয়। মাঝখানে তুমি গিয়ে পড়ে বাগড়া দিলে। আরাধনা বেচারাও তোমাকেই কাজে লাগাল– তোমারই দিক থেকে কোনো বিপদ আসার আশঙ্কায়। তুমি যে খবরের কাগজের লোক!
–আমাকে মরফিয়াটা বেশি দিলেই পারত!
–সে সাহস তখন আর কোথায়? প্রথমত তোমার কাছে রাইফেল। দ্বিতীয়ত, সদ্য একটা খুন হয়েছে। আবার দ্বিতীয় খুনের ঝামেলা পোহানো কি সহজ নার্ভের ব্যাপার?
কর্নেল কয়েকমুহূর্ত থেমে কী ভাবার পর ফের বললেন–আমার ধারণা জয়ন্ত, অবশ্য নিছক ধারণাই আপাতত–শৈলেশের ওই লোকগুলো কোনোভাবে টের পেয়েছিল যে একটা গোলমাল ঘটেছে কোথাও। কিংবা এমনও হতে পারে যে আরাধনাই ওদের জন্যে ভয় পেয়েছিল।
-তাহলে পালাল কেন? জানলা খুলে আলো জ্বেলে অপেক্ষা করছিল কার?
–হুম! বেড়ে বলেছ। নিশ্চয় সে কারো অপেক্ষা করছিল।
কারো নয়, ডাক্তারের। লাশটা সামলাতে হবে তো!
–হ্যাঁ, বিলক্ষণ।
–আপনি যাই বলুন, এবার কিন্তু আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে–ডাক্তার খুনী না হয়ে যায় না।
–কিন্তু….বলে কর্নেল পকেটে হাত পুরলেন।
আমি হঠাৎ লাফিয়ে উঠলুম। কর্নেল! আজ যখন আপনারা বাংলায় পৌঁছান, আমি বেডরুমের ওই জানলায় কয়েকবার কাকে টোকা দিতে শুনেছিলুম। বলতে ভুলেছি।
শুনেই কর্নেল দৌড়ে এবার আমার কায়দায় বেড়া ডিঙিয়ে সেই জানলাটার কাছে গেলেন। আমি দাঁড়িয়ে থাকলুম। ওখানে হাঁটু দুমড়ে বসে কী সব পরীক্ষার পর ফিরে এলেন। তারপর বললেন–চলো! বেলা পড়ে আসছে। এক্ষুনি অন্ধকার হয়ে যাবে। ফেরা যাক্।
বলে উনি জঙ্গলের দিকে পা বাড়ালেন। বললুম–ওদিকে রাস্তা কোথায়? রাস্তা তো উল্টো দিকে!
–আহা, চলে এস না। এই যে পায়ে চলা পথটাও কি দেখতে পাচ্ছ না জয়ন্ত! নাঃ, তুমি বড় গোলমাল করে দাও সব!
কর্নেলের কণ্ঠস্বরে বিরক্ত প্রকাশ পেল। তাই ওঁকে চুপচাপ অনুসরণ করলুম। উনি ভীষণ জোরে হাঁটছে এবার। সঙ্গ ধরতে হাঁপ ধরে যাচ্ছিল। ঘন ঝোঁপঝাড়, কোথাও উঁচু উঁচু গাছপালা আর ছোটবড় পাথর–তার ফাঁকে একফালি পায়েচলা রাস্তা এতক্ষণে নজরে পড়ল। মিনিট পনের চলার পর নিচের উপত্যকাটা নজরে এল। সেখানে তখন আলো জ্বলজ্বল করছে। প্রশ্ন না করে পারলুম না-ওটা আবার কোন জায়গা?
কর্নেল জবাব দিলেন–হীরাকুণ্ডা টাউনশিপ।
অবাক হলুম।–সে কী! হারীকুণ্ডা এত কাছে হবে কেন?
–জয়ন্ত, তোমার দিকভুল হয়েছে। হীরাকুণ্ডা চণ্ডীপাহাড়ের ঠিক নিচের উপত্যকায় দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত। কিন্তু ভাল রাস্তা দিয়ে পৌঁছতে হলে পশ্চিমে দুমাইল তারপর উত্তরে একমাইল ঘুরে যেতে হয়। আর পায়ে হেঁটে কেউ যেতে চাইলে সটান এ পথে নাকের ডগাতেই চণ্ডীপাহাড়! চলে এস। এবার একদমে নামলেই বাজারে পৌঁছে যাব।
.
আমরা রাস্তায় নেমে ফের টাঙা করলুম। তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। কোথায় গন্তব্য জিগ্যেস করলুম না। দশমিনিট পরে এক জায়গায় কর্নেল টাঙা রুখতে আদেশ দিলেন। আমরা নামলুম। এ এলাকাটা ধনীদের বলেই মনে হচ্ছিল। অসমতল মাটির ওপর এখানে-ওখানে সুন্দর সব বাংলোবাড়ি–একেবারে ইংল্যান্ডের পাড়াগাঁর ছবি যেমন দেখেছি। কর্নেল অভ্যাসমতো আমার একটা হাত নিয়ে এগোলেন। বাঁদিকে উঁচুতে একটা বাড়ির গেটে পৌঁছলুম। মনে হল, এটা তাহলে কর্নেলের সেই বন্ধুর বাড়ি, যেখান থেকে গতরাতে চণ্ডীপাহাড়ের বাংলোয় ফোন করেছিলেন।
গেটের ওপর ঘন লতাপাতার ঝাপি। গেট খুলে ভিতরে ঢুকে দেখি, লনে জনা পাঁচছয় পুলিশ বসে ও দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছে। সবাই সশস্ত্র। কর্নেল এগিয়ে যেতেই একজন দৌড়ে এল। চিনতে পারলুম তক্ষুনি। সেই মিঃ প্রসাদ। করমর্দন করে প্রসাদ বললেন–আপনার অপেক্ষা করছি স্যার! মিঃ সাক্সেনা এক্ষুনি ফোনে জানতে চাইছিলেন, আপনি এসেছেন কি না।
কর্নেল বললেন–মিঃ প্রসাদ, আগে আমাকে ফোনের কাছে নিয়ে চলুন। বাই দা বাইকত্রীঠাকুরানীর কুশল তো?
আজ্ঞে হ্যাঁ। উনিও আপনার অপেক্ষা করছেন।
কর্নেল আমার দিকে ঘুরে বললেন-জয়ন্ত, তুমি তাহলে ড্রইংরুমে একটু বসো। তারপর রহস্যময় হেসে ফের বললেন–তেমন কম্পানিয়ন পেয়ে গেলে আলাপও কোরো। আমার সামান্য দেরি হতে পারে। কেমন? তোমার জন্য গরম কফি পাঠাতে বলছি।
কৌতূহল চেপে রাখা আমার অভ্যেস নয়। কোনো রিপোর্টার কৌতূহল চেপে রাখে না। কিন্তু যেন ক্রমশ আক্কেল গুড়ুম হয়ে যাচ্ছিল। এটা যে থানা বা কোনো অফিস নয়, তা স্পষ্ট! এ একটা প্রাইভেট বসতবাড়ি এবং অবশ্যই কোনো ধনী মানুষের। তাছাড়া এক কর্জীঠাকুরানীর উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যাপারটা কী?
মিঃ প্রসাদ ড্রয়িংরুমটা আমাকে দেখিয়ে দিয়ে কর্নেলকে নিয়ে অন্য ঘরে ঢুকলেন। ড্রয়িংরুমে ঢুকে দেখি, মেঝেয় সুদৃশ্য কার্পেট পাতা। সাজানো গোছানো আধুনিকতম পরিবেশ। একজন পরিচারক দাঁড়িয়ে যেন আমারই অপেক্ষা করছিল। সে সেলাম দিয়ে ওপাশের দরজার পর্দা তুলে কাকে কী বলল। তারপর বাইরের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। কোনার উৎকৃষ্ট সোফায় আরাম করে বসলুম।
হাল্কা আলো জ্বলছিল ঘরে। সিগারেট ধরিয়ে নানান ছাইপাঁশ ভাবছি, চোখ ছাইদানির দিকে হঠাৎ মিঠে সুপরিচিত কণ্ঠস্বর শুনলুম। চাপা এবং হাসিতে ভিজে সেই স্বর।–হ্যালো চৌধুরী!
তাকিয়েই আমার বুকে খিল ধরে গেল। স্বপ্ন–আবার সেই অত্যদ্ভুত স্বপ্নের মধ্যে ঢুকে গেছি! আরাধনা আমার সামনে দাঁড়িয়ে হাসছে। জাদুকর বুড়োর এই আজব ভেলকি দেখে আমি হাঁ করে তাকিয়ে রইলুম।
আরাধনা একেবারে পাশে গা ঘেঁষে বসে পড়ল। তারপর কাঁধে হাত রেখে বলল–তুমি নিশ্চয় আমার ওপর খুব রাগ করেছ, চৌধুরী! প্লিজ প্লিজ, অমন করে তাকিও না! আমার বড্ড ভয় করছে।
মুহূর্তে ওর অলৌকিক সুন্দর শরীরের স্পর্শ আমাকে সব ভুলিয়ে আবার প্রেম ও কামনার আবেগে ভাসিয়ে দিল। বললুম–তোমার ওপর রাগ করে থাকা যায় নাকি? কিন্তু এ হেঁয়ালির মানে কী?
–হেঁয়ালি! কিসের হেঁয়ালি?
–তোমাকে পুলিশ প্রেফতার করেনি?
–না তো! কেন প্রেফতার করবে?
কোন জুতসই কথা খুঁজে না পেয়ে বললুম–গতরাতে তুমি আমাকে মরফিয়া খাইয়েছিলে কেন?
হাসল আরাধনা।–উপায় ছিল না। তবে তোমার কোনো ক্ষতি আমি চাইনি। ওই সামান্য ডোজে কেমন চমৎকার ঘুমটা হল, সেজন্যে আমাকে তুমি বকশিশ দাও বরং!
-কেন আমাকে ঘুম পাড়ানোর দরকার হল?
–জেগে থাকলে বা হঠাৎ জেগে গেলে তুমি নিশ্চয় হইচই বাধিয়ে বসতে। কারণ, তোমার বিছানার তলা থেকে একটা ডেডবডি বের করা হত এবং…
এবং তার গলাকাটা হত! বিদ্রূপ করে বললাম কথাটা।
আরাধনা তার সুন্দর সোনালি হাতে আমার হাত নিয়ে বলল–চৌধুরী, সবটা না জেনে আমার ওপর অবিচার করো না। আমি সত্যি এত অসহায়!
–বেশ, বলো।
সব কথা তোমাকে কর্নেলসায়েব বলবেন। ও-প্রসঙ্গ আর আমার তুলতে ইচ্ছে করছে না চৌধুরী। উঃ! কাল যা গেছে, তা একটা বীভৎস দুঃস্বপ্ন!
ও চুপ করে থাকল। একটু পরে বললুম-ফোনের তার কাটা বলেছিলে কেন?
–এই কারণে। তুমি ফোনে বাইরে যোগাযোগ করতে, সেইজন্যে। তখন বাইরের কেউ এসে পড়ুক, তা আমি চাইনি।
মিঃ সিংকে কে খুন করেছে?
আমার এই সোজা ও বেমক্কা প্রশ্ন শুনে সে চোখ নামাল। তার ঠোঁট কাঁপতে থাকল। তারপর হঠাৎ আমার কাঁধে মুখ গুঁজে দিল, চাপা কান্না শুরু হল।
এর মধ্যে ছলনা ও ছেনালি থাকা সম্ভব–আবার এটা সত্যিকার আবেগও হতে পারে-ধাঁধায় পড়ে আমি বিব্রত হলুম। তবু অমন সৌন্দর্যময়ী যুবতী মেয়ের ঘনিষ্ঠ স্পর্শ আমার মতো যুবককে শেষ অব্দি দ্রবীভূতই করল। এবং একটা হঠকারিতাও এল আমার মধ্যে। দুহাতে ওর ভিজে মুখটা তুলে গোটাকয় চুমু খেয়ে নিতে দেরি করলুম না। বিবেককে বললুম, এই সৌন্দর্যের সাতখুন মাফ। এ যদি প্রহরে-প্রহরে কাটা মুণ্ডু নিয়ে গেণ্ডুয়া খেলে, তাও সওয়া যায়। সৌন্দর্যের খাতিরে জঘন্যতম পাপকেও আমি বিলকুল ক্ষমা করে দিতে পারি।
আরাধনা ফিসফিস করে বলল–আমাকে তুমি বাঁচাও চৌধুরী। এখুনি এখান থেকে নিয়ে পালাও। এরা আমাকে এবার টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে খেয়ে ফেলবে।
রুদ্ধশ্বাসে বললুমকারা আরাধনা, কারা?
ও জবাব দেবার মুহূর্তে ভেতরের দরজার দিকে একটা শব্দ হল। তারপর ট্রে হাতে একজন পরিচারিকা এল। সে ট্রেটা রেখে চলে গেল। তখন নিঃশব্দে কিছুক্ষণ কফি তৈরি করতে থাকল আরাধনা।
সে ইতিমধ্যে একটু সরে বসেছিল। এবার কফির পেয়ালা হাতে সামনের সোফায় চলে গেল। মুখোমুখি আমরা কফি খেতে থাকলুম। অন্তত তিনটে মিনিট কোনো কথা বললুম না কেউ।
ফের যখন কথা বলতে যাচ্ছি, বাইরের দরজা দিয়ে প্রথমে ঢুকলেন কর্নেল, তার সঙ্গে এক ভদ্রমহিলা বয়স আন্দাজ চল্লিশ বিয়াল্লিশের কম বা বেশি নয়, স্নিগ্ধ কিন্তু ম্রিয়মাণ চেহারা, ভিজে চোখ, খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছিল ওঁকে। তারপর ঢুকলেন ডঃ পট্টনায়ক, মিঃ সাক্সেনা, মিঃ প্রসাদ এবং আরো কিছু পুলিশ অফিসার। সবার শেষে ঢুকলেন সেই ডাক্তার, যাঁকে সকালে চণ্ডীপাহাড়ের বাংলোয় দেখেছি এবং যার কাছে কর্নেল পা মচকানি সারাতে গিয়েছিলেন।
ডাক্তারটির বয়স পঞ্চাশের মধ্যে, বেশ হাসিখুশি গোলগাল চেহারা। ঢুকেই সবাইকে নমস্তে করলেন।
দুজন পরিচারককে দেখলুম চেয়ার সাজিয়ে দিতে। তারপর তারা তফাতে দাঁড়িয়ে রইল। কর্নেল এবার আমার ও আরাধনার দিকে চেয়ে একটু হাসলেন। তারপর আমার উদ্দেশে বললেন–জয়ন্ত, আলাপ করিয়ে দিই। ইনি পরলোকগত হভাগ্য মিঃ শৈলেশ সিংয়ের বউদি মিসেস সিং, এ হচ্ছে জয়ন্ত চৌধুরী কলকাতার নিউজডেলি সত্যসেবকের প্রখ্যাত রিপোর্টার। সাংবাদিকমহলে অশেষ খ্যাতি এ বয়সেই অর্জন করেছে।
আমরা পরস্পর নমস্কার করলুম। তারপর আর সবাই বসে পড়লে আমিও বসলুম। আরাধনা গম্ভীর হয়ে নখ খুঁটতে থাকল।
গাম্ভীর্যময় ও স্তব্ধ পরিবেশ সৃষ্টি হল। তারপর দেখলুম, মিঃ প্রসাদ একজন পরিচারককে ইশারা করলেন, সে ঘরে উজ্জ্বল আলোগুলো সুইচ টিপে জ্বেলে দিল।
