সুন্দর বিভীষিকা (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

দরজায় দমাদ্দম কয়েক জোড়া পায়ের লাথি পড়তে শুরু করেছে ততক্ষণে। দরজাটা ভেঙে যাবে মনে হল। ওরা যেই হোক, ঘরে এলে সকলে আমাকে নিয়েই পড়বে তাতে কোনো ভুল নেই। অতএব আমি একলাফে জানালা ফাঁক করেই রাইফেলের তিনটে গুলি পর পর ছুঁড়ে বসলুম। আওয়াজ হল প্রচণ্ড এবং তক্ষুনি লাথি-মারা বন্ধ হল। বাইরে চাপা স্বরে ওরা কথা বলছে। আমি বাকি দুটো গুলিও ঝোঁকের বশে জানালা দিয়ে ছুড়লুম। তারপর পকেট থেকে আবার পাঁচটা কার্তুজ বের করে রাইফেলটা তৈরি রাখলুম।

 

আর কোনো আওয়াজ নেই এবার। সাবধানে জানলা ফাঁক করে পর্দার একটুখানি তুলে দেখি, সম্ভবত জনা তিন লোক দৌড়ে গেটের ওপাশে চলে, গেল। তারপর গাড়ির আলো জ্বলে উঠল। গাড়িটা তক্ষুনি বৃষ্টির মধ্যে জঙ্গলের দিকে নেমে যেতে দেখলুম। ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। ঘুরে দেখি, আরাধনার ভুরু দুটো কুঁচকে রয়েছে। আমার চোখে চোখ পড়ামাত্রা সে হেসে উঠল–চমৎকার শিক্ষা হয়েছে। আর ওরা হামলা করতে আসবে না। এসো, শুয়ে পড়া যাক।

 

এই রহস্যময়ী যুবতীর পাশে রাত কাটানো এবং বিপদের সম্ভাবনা–দুইয়ে মিলে আমাকে নিশ্চয় উদ্বিগ্ন দেখাল। কিন্তু শেষ অব্দি ঘুমে চোখের পাতা জড়িয়ে এল। আর বাগ মানাতে পারলুম না। শোয়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে হল, আমি কোন পাতালে তলিয়ে যাচ্ছি। পাশের সঙ্গিনীকে আঁকড়ে ধরতে চাইলুম কিন্তু তাকে যেন খুঁজেই পেলুম না।

 

.

 

চোখ খুলে দেখি ঘরভরা আলো। অভ্যাসমতো ঘড়ি দেখলুম–সাড়ে আটটা! কী প্রচণ্ড না ঘুমিয়েছি। তারপর সব মনে পড়ল। হুড়মুড় করে উঠে বসলুম। ঘরে কী একটা তীব্র গন্ধ। পাশে আরাধনা নেই। ডাকলুম তাকে। কিন্তু কোনো সাড়া পেলুম না। উঠে গিয়ে দেখি দরজাটা বাইরে থেকে আটকানো। অমনি অজ্ঞাত ভয়ে শিউরে উঠলুম আবার ডাকাডাকি করলুম। কিন্তু সাড়া নেই।

 

ব্যাপার কী? আমাকে আটকে রেখে কোথায় গেল সে? হতাশ হয়ে সিগারেট জ্বাললুম। দেশলাই কাঠিটা মেঝের কার্পেটে অন্যমনস্কভাবে ফেলেছি। তাই সেটা কুড়িয়ে নিয়ে ছাইদানিতে ফেলার জন্যে হেঁট হলুম। অমনি খাটের তলায় চোখ গেল। খাটের তলায় কে উবুড় হয়ে পড়ে রয়েছে। তার মুখটা একেবারে ধড়ছাড়া। রক্ত জমাট বেঁধে রয়েছে।

 

কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভয়ে-উৎকণ্ঠায় প্রায় পাগল হয়ে গেলুম। দরজায় লাথি মেরে মেরে পায়ে ব্যথা ধরিয়ে ফেললুম। বাজখাঁই চিৎকার করে ডাকাডাকি করলুমবাঁচাও, বাঁচাও, কে কোথায় আছ, বাঁচাও! সেই বিকট আর্তনাদ কয়েকমাইল দূর থেকে লোকের শোনা উচিত ছিল। কিন্তু শোনার মতো কেউ ছিল না হয়তো। এরপর জানলাগুলোও ভাঙার চেষ্টা করলুম। রাইফেলের নল রডে টোল খেয়ে গেল দেখে ক্ষান্ত হলুম। বোঝা গেল, এই বাড়িটা মজবুত করেই বানানো হয়েছে।

 

এতসব তুমুল হুলুস্থূলের পর স্বভাব ক্লান্তি ও হতাশা আসে। তখন একটা জানলায় মুখ রেখে তাকিয়ে রইলুম গেটের দিকে। সকালের উজ্জ্বল আলোয় পৃথিবী ঝকমক করছে। আকাশে কোথায়ও মেঘের চিহ্ন নেই। এমন একটা চমৎকার দিনে মুণ্ডুকাটা লাশের সঙ্গে বন্দী থাকতে হল আমাকে–এর চেয়ে সাংঘাতিক ঘটনা কল্পনা করা যায় না। এক ধুরন্ধর মায়াবিনীর ফাঁদে পড়ে আমি অবশেষে কী বোকামি করেছি ভেবে আফসোস হতে থাকল। কিন্তু এখন তো আর মাথা খুঁড়েও কোনো লাভ হবে না।

 

হঠাৎ মাথায় একটা যুক্তি খেলল। আমার পকেটে তো এখনও অনেকগুলো কার্তুজ রয়েছে। অন্তত গোটা পাঁচ পর পর খরচ করা যাক্ না, যদি কাঠের দেওয়ালের কোনো অংশে একটা ফাটল ধরাতে পারি। তারপর অবশ্য এক টুকরো ধারালো কিছু দরকার। তাই ব্যস্ত একোনা ওকোনা হাতড়ালুম। লোহার কোনো জিনিস, কিংবা তেমন জুতসই কিছু পাওয়া গেল না। খাটের তলায় উঁকি মারবার সাহস নেই। ওই মুণ্ডুকাটা বীভৎস লাশ আবার চোখ মেলে দেখা আমার পক্ষে অসম্ভব।

 

সেই সময় মাথায় একটা কথা এল। আচ্ছা, খুন যা দিয়ে করা হয়েছে, অর্থাৎ মার্ডার উইপনটা কি লাশের কাছে রেখে যায়নি খুনী? ওটা দিয়ে নিশ্চয় কাজ হবে।

 

যেমন ভাবা, তেমনি কাজ। অনেক সাহসে ফের খাটের তলায় উঁকি দিলুম। এবার লাশটা ভালো করে দেখা হয়ে গেল। গায়ের রঙ ফর্সা, বেঁটে মোটাসোটা একটা লোক, পরনে খুব দামি স্যুট, টাই রয়েছে। সম্ভবত বাটন হোলে আস্ত একটা গোলাপ গোঁজা ছিল, সেটা বগলের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে। দেখতে দেখতে নার্ভ শক্ত হয়ে গেল। লাশটা টেনে বের করলুম। মুণ্ডুটা একটু তফাতে নাক খুঁজে পড়েছিল। সেটাকেও বাঁহাতে চুল ধরে টেনে আনলুম। তারপর লাশটা চিত করে মুখটা ঠিক জায়গায় লাগিয়ে দিলুম। এসময় আমাকে নিশ্চয় একটা ভয়ঙ্কর পিশাচ দেখাচ্ছিল।

 

লোকটার খোলা চোখে আতঙ্ক ঠিকরে বেরোচ্ছে যেন। আঙুলের চাপে চোখের পাতা বুজিয়ে দিলুম। কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে থাকার পর এবার অস্ত্রটার খোঁজে খাটের তলায় উঁকি দিতেই সেটা চোখে পড়ল। একটা বড় ভোজালি দেখা গেল। খুনী ওটা আমার হিসেবমতোই রেখে গেছে দেখছি। হাত বাড়িয়ে সেটা নিতেই কেমন যেন উষ্ণতা ভর করল আমার রক্তে। এসময়ে যাকে খুশি আমি খুন করতে পারতুম!

 

যাক, তাহলে এবার দেয়াল কেটে বেরিয়ে পড়ার অসুবিধে নেই। ভোজালি বোর করে এনে দেখি, সেটার গায়ে চাপ চাপ জমাট কালো রক্ত শুকিয়ে গেছে। লাশেরও অবস্থা একই রকম। উত্তেজনার ঘোরেও বুঝতে পারলুম যে খুনটা এখানে হয়নি। অন্য কোথাও খুন করার পর লাশটা এভাবে এনে রাখা হয়েছিল। নিশ্চয় কোনো মতলব ছিল খুনীর কিংবা খুনীদের।

 

রাইফেলের গুলি খরচ করার আগে ভোজালিটা কাজ দেয় কি না দেখতে ইচ্ছে হল। কিন্তু কয়েক জায়গায় কোপ বসিয়ে দেখলুম, অসম্ভব। সামান্য চোটের দাগ ছাড়া আর কিছু ঘটছে না। রাইফেলের একটা মাত্র বুলেট সহজেই কাঠে ফাটল ধরাতে পারে। কয়েকটা ফাটল একই জায়গায় পাশাপাশি সৃষ্টি হলে তখন ভোজালি ব্যবহার করলে কাজ হতে পারে।

 

তাই রাইফেলটা নিয়ে কোণের একজায়গায় তাক করলুম। কোণটা যেহেতু জোড়ের জায়গা, ফাটল সহজেই হবে। রাইফেলের সেফটি ক্যাচ তুলে ট্রিগারে আঙুলের চাপ দিতে যাচ্ছি, অমনি এক অবিশ্বাস্য কাণ্ড ঘটল। সোফাসেটের ওদিকে ফোনটা মিঠে স্বরে ক্রিং ক্রিং বেজে উঠল।

 

সে কী! শয়তানীটা যে বলেছিল ফোনের লাইন কাটা!

 

নিশ্চয় মিথ্যে বলেছিল তাহলে। ফোনটা সমানে বাজতে থাকল। কয়েক মুহূর্ত ইতস্তত করার পর রাইফেলটা রেখে ফোনটা ধরলুম। আমার কণ্ঠস্বর নিশ্চয় কেঁপে গেল।হ্যালো! হ্যালো!

 

এবার দ্বিতীয় চমক এল। আমি কি এখনও স্বপ্ন দেখছি? হতবুদ্ধি হয়ে গেলুম। এ যে প্রত্যক্ষ মিরাকল! অন্যপ্রান্ত থেকে পরিষ্কার ভেসে আসছে চেনা একটা কণ্ঠস্বর। –হ্যালো, জয়ন্ত নাকি! গুড মর্নিং ডার্লিং, জয়ন্ত! আশা করি সুনিদ্রার কোনো ব্যাঘাত ঘটেনি!

 

আমি থ বনে শুনে যাচ্ছি। কর্নেল নীলাদ্রি সরকার–নাকি তার ভূত কথা বলছে? না–না, এ অবিশ্বাস্য! আমি এখানে আছি, তাই বা কেমন করে জানলেন উনি?

 

ডার্লিং, বুঝেছি! তুমি এ বুড়োর ওপর রীতিমতো খাপ্পা হয়েছ। সেটা খুবই স্বাভাবিক। ইয়ে–শোন, আমি–মানে আমরা শিগগির গিয়ে পড়ছি। ভেবো না। আর দেখ, আমরা না পৌঁছনো পর্যন্ত-ধরো জাস্ট পনের মিনিট সময় খুব সাবধানে থাকবে। আমার গলা না শুনলে কিংবা আমাকে না দেখলে কক্ষনো দরজা খুলবে না। কেমন? ছাড়ছি?

 

এবার অনায়াসে খাপ্পা হওয়া যায় গোয়েন্দাপ্রবরের প্রতি। রেগে ওঠাও স্বাভাবিক আমার পক্ষে। এতসব যে জানে, সে কেন এখনও বেলা নটা অব্দি এখানে আমাকে উদ্ধার করতে এল না? অদ্ভুত কারবার তো বুড়োর! অথচ আসার সময় কত ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে এসছিল।

 

উঁট দেখিয়ে গম্ভীর অন্যরকম গলায় বললুম-হ্যালো, হ্যালো! শুনুন– আপনি কাকে চান। এখানে জয়ন্ত বলে কেউ নেই। হ্যালো…হ্যালো!

 

কখন ফোন রেখে দিয়েছেন গোয়েন্দামশাই, আর আমি সমানে অতগুলো কথা বলে গেলুম! রেগে সশব্দে ফোনটা আমিও রাখলুম। কিন্তু লোকটা কি সত্যি কোনো মন্ত্রতন্ত্র জানেন? আমি তো মাত্র ‘হ্যালো’ বলেছি দুবার তাতে উনি কীভাবে টের পেলেন যে আমিই ফোন ধরেছি?

 

তাহলে কি যে রহস্যময় ফাঁদে আমি বোকার মতো পা দিয়েছিলুম তারই কোন আভাস হঠাৎ কাল বিকেলে উনি পেয়ে গিয়েছিলেন এবং তাই আমাকে দাঁড় করিয়ে রেখে উধাও হয়েছিলেন?

 

খুব সম্ভব, তাই বহস্যের ইশারা পেলে বরাবর ওঁর ওই বাতিকগ্রস্ত আচরণ আমি লক্ষ্য করেছি। মনে হল, কাল রাস্তার পশ্চিমের জঙ্গলে বা খালের ওদিকে হঠাৎ কীভাবে একটা রহস্যময় পরিস্থিতিতে পড়ে গিয়েছিলেন কর্নেল। এ ছাড়া, এই অদ্ভুত ঘটনার কোনো ব্যাখ্যা হয় না।

 

এতক্ষণে আশ্বস্ত হতে পেরেছি। সিগারেট ধরিয়ে লাশটিকে খুঁটিয়ে দেখতে থাকলুম। কে এই ভদ্রলোক? আরাধনাই বা আসলে কে? কেন একে খুন করা হল? আরাধনাই কি খুন করেছে? সেটা অসম্ভব। ওর এত সাহস বা জোর নেই, বুদ্ধিতে যত খল সে হোক না কেন। আর রাতের ঝড়বৃষ্টিতে সেই মোটর গাড়িতে আসা আগন্তুকেরাই বা কারা? তাদের দরজা খুলল না কেন আরাধনা? তারা কি তার শত্রু?

 

প্রশ্নের পর প্রশ্নে উত্ত্যক্ত হলুম। নিহত ভদ্রলোকের বয়স পঞ্চাশের বেশি, ষাটের কম। মাথায় টাক আছে অল্প। চুলে পাক ধরেছে। খুব শৌখিন মানুষ, তার পরিচয় স্পষ্ট। সেই গোলাপটা কুড়িয়ে নিলুম। শুঁকে দেখলুম। গন্ধটা বাসি। হলেও চমৎকার। লোকটার পকেট হাতড়াতে গিয়ে হঠাৎ সংযত হলুম।

 

সর্বনাশ! অমন একজন ঘুঘু গোয়েন্দার সাহচর্যে এতকাল কাটিয়েও আমার এতটুকু শিক্ষা হয়নি দেখছি! আমি একের পর এক সাংঘাতিক কাজ করে বসে আছি এতক্ষণ, এতটুকু ফলাফল ভাবিনি! এ একটা রীতিমতো খুন-হত্যাকাণ্ড! আর আমি লাশের গায়ে হাত দিয়েছি, টেনে বের করেছি, মুণ্ডটা এনে জোড়া লাগিয়েছি, ভোজালিটা বের করেছি, শেষ অব্দি গোলাপটাও স্থানচ্যুত করেছি বা ছুঁয়েছি! এতগুলো বুদ্ধিহীন কাজের ফলে প্রকৃপক্ষে অনেক মারাত্মক সূত্র হয়তো নষ্ট হয়ে গেছে। যেগুলোর একটামাত্র পেলেও সেই বৃদ্ধ ঘুঘুটি এবং পুলিশের কাজে লাগত। এবার নিজের প্রতি রাগে-দুঃখে অস্থির হলুম। আমি এমন ভ্যাবাকান্ত হয়ে পড়লুম কেন? নিজের প্রশ্নের একটা জবাব নিজে অবশ্য দেওয়া যায়, দরজা বাইরে থেকে আটকানো দেখেই লাশ আবিষ্কার করার পর আমার মাথা গোলমাল হয়ে গিয়েছিল। নির্ঘাত এটাই সবকিছুর কারণ। লাশের সঙ্গে নিজেকে বন্দী দেখেই বুদ্ধি ঠিক রাখতে পারিনি।

 

এখন আর পস্তে লাভ নেই। আড়ষ্টভাবে জানালার কাছে গেলুম। কর্নেল সতর্ক থাকতে বলেছেন। তাহলে কি হত্যাকারীরা আবার ফিরে আসবে?

 

জানলায় উঁকি মেরে তীক্ষ্ণদৃষ্টে তাকিয়ে রইলুম। উজ্জ্বল রোদে গাছপালা বা ঝোঁপঝাড়ের তলায়, পরিষ্কার নজর চলছে। কেউ বন্দুক তাক করলেও এখন দৃষ্টি এড়িয়ে যাবে না! গেটের ওপাশে পাহাড়টা আস্তে আস্তে নেমে গেছে। তারপর কিছু সমতল কিছু ঢালু জমিতে ওকবনটা রয়েছে। বাড়িটা উঁচুতে থাকায় অতদূর অব্দি এবড়ো-খেবড়ো প্রাইভেট রোডটার অনেকখানি নজর চলে। ওপথে কাকেও দেখলুম না।

 

মিনিট যে এত লম্বা হতে পারে, কল্পনাও করিনি। পনের মিনিট নয়–যেন পনেরটা ঘণ্টা চলে গেল। তারপর দূরে পশ্চিমে গাড়ির হর্নের শব্দ শোনা গেল। উত্তেজনায় চোয়াল শক্ত হয়ে এল। তারপর ওকবনের রাস্তায় একটা জিপ দেখতে পেলুম। জিপটা যখন ফাঁকা জায়গায় এল, কর্নেলের টুপি ও সাদা দাড়ি চোখে পড়ল। এত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বুড়োর! ওখান থেকেই সে আমার অস্তিত্ব টের পেয়ে হাত নাড়ছেন।

 

গাড়িটা গেটে উঠে এল। সেই মুহূর্তে আমার পিছনের দিকের কোনো একটা জানলায় তিনবার ঠুকঠুক করে আওয়াজ উঠে থেমে গেল। ততক্ষণে কর্নেলের ভারী গলার আওয়াজ শোনা গেছে বাইরের বারান্দায়–হ্যাল্লো জয়ন্ত ডালিং! গুড মর্নিং! তারপর দরজার তালা ভাঙল কেউ। ম্যাজিকের মতো এক আঘাতেই তালাটা পড়ে যেতে শুনলুম।

 

পর্দা সরিয়ে প্রথমে ঢুকলেন কর্নেল, তারপর দুজন পুলিশ অফিসার। ঢুকেই কর্নেল অস্ফুট চেঁচিয়ে উঠলেন–মাই গড! এ কী ব্যাপার জয়ন্ত! তাহলে…..

 

কথাটা অসমাপ্ত রেখে উনি পুলিশ অফিসারের দিকে ঘুরলেন। একজন অফিসার এগিয়ে সাবধানে লাশের পাশে হাঁটু দুমড়ে বসে পড়লেন। অন্যজন গম্ভীর মুখে বললেন–তাহলে বেচারা শৈলেশ সিং সত্যি খুন হয়ে গেলেন!

 

কর্নেল লাশটা দেখার পর আমার দিকে তাকালেন।লাশটা নিয়ে নিশ্চয় তুমি টানাটানি করেছ, জয়ন্ত?

 

করেছি। আমার মাথার ঠিক ছিল না।

 

–হুম! সাক্সেনা, আসুন, আমরা আগে অন্যান্য ঘরগুলো একবার দেখে নিই। ততক্ষণ মিঃ প্রসাদ, তার কাজ সেরে ফেলুন। ওই আপনাদের লোকজন বোধহয় এস পড়ল।

 

বাইরে একটা গাড়ির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। বারান্দায় গেলুম কর্নেলের সঙ্গে। কর্নেল আমার একটা হাত নিয়ে একটু স্নেহ প্রকাশ করেই ছেড়ে দিলেন। : একদল পুলিশ কনস্টেবল আর অফিসার দৌড়ে এলেন।

 

বাড়িটা ঘিরে ফেলার পর কর্নেল আর মিঃ সাক্সেনা ডাইনিং ঘরটায় ঢুকলেন–তাদের পিছনে আমি। দরজাটা খোলা ছিল। কর্নেল আমার দিকে ঘুরে বললেন-দরজাটা খেলা কেন, বলতে পারো জয়ন্ত?

 

মাথা দোলালুম। এখনও তো কিছু জিগ্যেস করছেন না গোয়েন্দাবর। করলে তখন সব বলা যাবে। কিন্তু এ দরজাটা তো আরাধনা বন্ধ করে দিয়ে গিয়েছিল। এটা খুলে রাখল কে?

 

ডাইনিং টেবিলে রাতের যা সব অভুক্ত খাবার ছিল, এখনও তেমনি রয়েছে। কিন্তু কোণের একটা সোফা কেউ টেনে একটু সরিয়ে রেখেছে মনে হল। সাক্সেনা খুঁটিয়ে সব জায়গা পরীক্ষা করছেন। কর্নেল কিচেনে গিয়ে ঢুকলেন। তারপর ফিরে এসে আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে বললেন–ইয়ে জয়ন্ত, বাথরুমটা কি বেডরুমের সংলগ্ন?

 

জবাব দিলুম-জানি না। মানে কাল আমি আদৌ বাথরুমে যাইনি!

 

বুড়ো ঘুঘু চতুর হাসলেন। হুম!

 

–হুম কী! সত্যি বলছি! আমি ওসব ব্যাপার ভুলেই বসেছিলুম!

 

স্বাভাবিক মনে হয় না।

 

–আপনি তো এখনও কিছু শোনেননি আমার কাছে।

 

–পরে শুনব, ডার্লিং! এখন–এস, আমরা বেডরুমে ফিরে যাই। মিঃ সাক্সেনা কী মনে হচ্ছে বলুন তো?

 

সাক্সেনা বিশৃঙ্খল সোফার কাছে কী দেখছিলেন। বললেন–খুব রহস্যময় কেস, কর্নেল! আমার মাথায় যেন কিছুই ঢুকছে না।

 

কর্নেল হাসতে হাসতে আমার হাত ধরে ফের বেডরুমে নিয়ে গেলেন। সেখানে মিঃ প্রসাদ আর জনা তিন অফিসার ব্যস্তভাবে আলোচনা করছিলেন। কর্নেলকে দেখে প্রসাদ বললেন–আপনার ইয়ং ফ্রেন্ড লাশটাকে মনে হচ্ছে খাটের তলা থেকে টেনে বের করেছেন। আর–খুনটা এখানে–মানে এ ঘরে হয়নি।

 

–দ্যাটস রাইট। বলে কর্নেল ওদিকে বাথরুমের দিকে এগোলেন। বাথরুমটা আমি অন্যমনস্কভাবে রাতে বা আজ সকালেও দেখেছি কিন্তু ওদিকে এগোবার ইচ্ছে হয়নি কিংবা ভয় হয়েছিল। মনে হচ্ছিল, পর্দা তুলতেই না জানি কী বিপদে পড়ে যাব।

 

কর্নেল এক ঝটকায় পর্দাটা তুললেন। তারপর আচমকা পকেট থেকে রিভলবার বের করে গর্জে উঠলেন–কে আছ? হাত তুলে বেরিয়ে এস।

 

ঘরের সবাই অবাক। প্রসাদ ও দুজন পুলিশও রিভলবার তাক করে কর্নেলের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন।

 

কিন্তু ভিতর থেকে কোনো সাড়া এল না। কর্নেল বললেন-দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ আছে। তার মানে কেউ ঢুকেছে, বেরোয়নি।

 

প্রসাদ ব্যস্ত হয়ে একজন পুলিশকে বললেন–দেখুন তো, বাইরের দিকে পালাবার কোনো ব্যবস্থা আছে নাকি।

 

পুলিশটি দৌড়ে বেরিয়ে গেল। একটু পরেই ওদিকের জানালা থেকে তার সাড়া পাওয়া গেল না স্যার! জানলা ভাঙা নেই। তাছাড়া বাথরুমের জানলাটা খুব ছোট্ট।

 

কর্নেল বললেন–তাহলে দরজাটা ভাঙতে হয় মিঃ প্রসাদ! এসব ব্যাপারে মনে হল মিঃ সাক্সেনা খুব সুদক্ষ। ওঁকেই ডাকুন!

 

মিঃ সাক্সেনা হাসিমুখে এগিয়ে এসে একটা অদ্ভুত হাতুড়ির মতো জিনিস দিয়ে বারকতক বিশেষ একটা জায়গায় ঘা দিলেন। তারপর বললেন–একটু সময় লাগবে, কর্নেল। ইন্টারলকিং সিস্টেমের ঝামেলা এই।

 

কিছুক্ষণের মধ্যেই অবশ্য দরজাটা খুলে ফেললেন সাক্সেনা। তারপর কর্নেল চেঁচিয়ে উঠলেন–মাই গুডনেস! আরাধনা এখানে পড়ে আছেন।

 

অমনি আমি আর পিছনে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলুম না। সবাইকে ঠেলে মুখ বাড়িয়ে দেখি, বাথরুমের মেঝেয় কাত হয়ে শুয়ে রয়েছে সেই রহস্যময়ী যুবতীটি! মুহূর্তে আমার সব অবিশ্বাস ঘুচে গেল। ওর প্রতি আবার মমতায় ও প্রেমে ব্যাকুল হয়ে পড়লুম। তাহলে আরাধনা আমাকে সত্যি আটকে রেখে পালায়নি। রাতে বাথরুমে ঢুকেছিল, তারপর নিশ্চয় একটা কিছু ঘটেছিল। বেচারাকে মিথ্যে সন্দেহ করছিলুম! এমন কি ওর স্বামীর লাশও যে এই খাটের তলায় আছে, নিশ্চয় তা সে জানত না!

 

ওকে ধরাধরি করে তুলে এনে বিছানায় শোয়ানো হল। কর্নেল নাড়ি দেখে বললেন–অজ্ঞান হয়ে আছে! মিঃ সাক্সেনা, আপনাদের ডাক্তারকে কি ফোন করা হয়েছে?

 

প্রসাদ বললেন–হ্যাঁ। এ ঘর থেকেই একটু আগে আমি ফোন করেছি। উনি এক্ষুনি এসে পড়বেন!

 

ততক্ষণে ওর চোখে-মুখে জল ছিটিয়ে দেওয়া হল। ছাদ নিচু, তাই। শিলিং ফ্যান ছিল না ঘরে। কোনায় একটা টেবিল ফ্যান ছিল। আবহাওয়া বেশ ঠাণ্ডা। তাই আমরা রাতে ফ্যান চালাইনি। এখন ফ্যানটা চালানো হল। এসব সেবাশুশ্রূষা চলতে চলতে ডাক্তার এসে পড়লেন। তিনি প্রথমে ভীষণ .. ঘাবড়ে গেলেন। তারপর সামলে নিয়ে আরাধনার দিকে এগোলেন। বললেন– সুইসাইড কেস নাকি? ওরে বাবা! হীরাকুণ্ডে আবার জোড়া লাশ পড়ল? মিঃ সাক্সেনা, মনে হচ্ছে স্বামীকে খুন করে এই মহিলা পটাসিয়াম সায়ানাইড খেয়েছেন।

 

কর্নেল একটু হেসে বললেন–কিসে বুঝলেন বলুন তো?

 

তাছাড়া আর কী হবে! বলে ডাক্তার বিছানায় বসে আরাধনার নাড়ি নিলেন, প্রথমে। ওঁর মুখে বিস্ময় ফুটে উঠল। চোখের পাতা ফাঁক করে দেখলেন। তারপর স্টেথিসকোপে শ্বাস-প্রশ্বাস ও হার্টের অবস্থা পরীক্ষা করে বললেন–স্ট্রেঞ্জ! এবং ঠোঁট ফাঁক করে দাঁত বন্ধ দেখে ফের বললেন–স্ট্রেঞ্জ।

 

কর্নেল সকৌতুকে বললেন পটাসিয়াম সায়ানাইড নাকি?

 

ডাক্তার বিরক্ত হয়ে ভুরু কুঁচকে বললেননাঃ! যা হবার তাই হয়েছে। স্বামী খুন–স্ত্রী আতঙ্কে মূৰ্ছা গেছে!

 

কর্নেল হাসতে হাসতে আমার হাত ধরে বেরিয়ে এলেন। তারপর আমাকে নিয়ে ডাইনিং ঘরে ঢুকলেন। ঘরে পুলিশ রয়েছে জনা দুই। তারা গল্প করছে। নির্বিকারভাবে। আমরা কোনার দিকে দুটো চেয়ার টেনে নিয়ে বসলুম। পাশে জানলাটা খোলা। কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন কাল বিকেলে তোমাকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রেখে…

 

বাধা দিয়ে বললুম–থাক্। আর শুনে কাজ নেই। আপনার সঙ্গে জীবনে আর কোথাও যাব ভেবেছেন?

 

কর্নেল চাপা গলায় সকৌতুকে বললেন–আশা করি, কাল রাতটা তোমার ভালই কেটেছিল। এ জন্যে তুমি এ বুড়োকে ধন্যবাদ দেওয়া দূরের কথা, শাসাচ্ছা! এমন সৌন্দর্য তোমার বরাতে কখনও কি জুটত ভেবেছ?

 

কপট ক্রোধে বললুমছাই! সৌন্দর্য না বিভীষিকা!

 

কর্নেল হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলেন।-হুম! বিভীষিকাই বটে। ঠিকই বলেছ জয়ন্ত। তা, আমার ব্যাপারটা শোন।

 

–আপনি আমার ব্যাপারটা শুনবেন কি না!

 

–আরে, তোমার তো সবই জানি।

 

–জানেন! কে বললে আপনাকে?

 

–আরাধনা রাত্রে ফোনে…না, ভুল বলা হচ্ছে। আমি হীরাকুণ্ডা টাউনশিপের এক জায়গা থেকে ওকে ফোন করেছিলুম–তখন রাত জাস্ট বারোটা। তখন ও সব বলল আমাকে।

 

–আমার কথার জবাব দিন এবার। প্রথম প্রশ্ন : আপনি ওকে চিনতেন তাহলে?

 

-না।

 

তাহলে ওকে ফোন করলেন মানে?

 

আমাকে তো বলতেই দিচ্ছ না।

 

–দেব। এবার দ্বিতীয় প্রশ্ন : আরাধনা আমাকে ফোন লাইন কাটা বলেছিল। কেন?

 

–সে জবাব ওর কাছে নিও।

 

গম্ভীর হয়ে বললুম–বেশ, তাই নেব। কিন্তু আবার বলে দিচ্ছি, আর কক্ষনো আপনার সঙ্গে…

 

বাধা দিয়ে কর্নেল বললেন–সবুর বৎস, সবুর। কাল বিকেলে রাস্তার পশ্চিম দিকের জঙ্গলে আমাকে কিছুক্ষণ বাক্শক্তিরহিত হতে হয়েছিল। তা না হলে কি তোমার ডাকে সাড়া দিতুম না ভাবছ? আমার যে সে কী অবস্থা, বোঝাতে পারব না। বুঝতে পারছি, তুমি ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছ–এমন কি তোমার গলায় পাগলামির প্রত্যক্ষ লক্ষণ ফুটে উঠছে। অথচ তখন আমার টু শব্দটি করার উপায় নেই। তারপর মনে হল, তুমি আমার খোঁজে নেমে আসছ। ভাবলুম, এই রে! এখন জয়ন্ত এসে পড়লেই বিপদ। নির্ঘাত সে ডাকতে ডাকতে আমার কাছে এসে পড়বে এবং….

 

–পাখিটা পালিয়ে যাবে! অদ্ভুত!

 

–আরে না না! পাখি কোনো ব্যাপারই নয়। এবার মুখ বুজে শুনে যাও। লক্ষ্মীটি, প্রশ্ন করে লক্ষ্যভ্রষ্ট করো না।

 

মুখ বুজে রইলুম। তখন কর্নেল তার নিরুদ্দেশের ঘটনাটি স্বভাবমতো বিস্তৃত করে শোনালেন। এবং তা হল মোটামুটি এরকম?

 

রাস্তার পশ্চিমের ঢালু জঙ্গলে নেমে যাওয়ার পর কর্নেল আচমকা একটা দড়িতে হোঁচট খেয়ে পড়েন। ভাগ্যিস তক্ষুনি দড়িটা ধরে ফেলেছিলেন। তা না হলে নিচের অতল খাদে পড়ে মারা যেতেন। দড়িটা টানটান অবস্থায় একটা গাছের সঙ্গে বাঁধা ছিল। খুব সাধারণ দড়িই বটে, মজবুত লতা পাকিয়ে তৈরি। স্থানীয় লোকেরা এই এক ইঞ্চি ব্যাসের শক্ত দড়ি দিয়ে খাদ থেকে বন্যায় আটকে পড়া গাছের গুঁড়ি টেনে তোলে। প্রতি বর্ষায় খাদে বন্যায় জল ঢেকে এবং বড় বড় গাছ ভেসে খাদে আটকে যায়। তখন ওই দড়ি বেয়েই তারা নেমে যায় খাদে। তারপর গাছের ডালপালা কেটে গুঁড়িটা মজবুত করে বেঁধে দেয়। অবশেষে অনেকে মিলে টেনে ওপরে তোলে।

 

…কর্নেল তাই ভেবেছিলেন। সম্ভবত পাহাড়ীরা কেনো গাছের গুঁড়ি এভাবে। আটকে রেখেছে। বেলা পড়ে আসায় তারা চলে গেছে। পরদিন সকালে এসে টেনে তুলবে। কিন্তু অবাক হয়ে উনি লক্ষ্য করলেন, দড়িটা কাঁপছে। জঙ্গলের প্রবাদ–কিছু নড়াচড়া করতে দেখলেই হুঁশিয়ার হও। কর্নেল সাবধানে এগিয়ে দেখলেন, দড়িটা খাদে সটান নেমে গেছে। কিন্তু অসংখ্য খাজ, চাতাল আর ধাপ থাকায় তলাটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। তাছাড়া তখনই ঘন অন্ধকার জমে গেছে খাদে। অথচ দড়িটা মাঝে মাঝে ভীষণ কাঁপছে।

 

রহস্যভেদী ঘুঘু বৃদ্ধটি তখন অকুতোভয়ে নিচের একটা চাতালে গিয়ে দাঁড়ালেন। অমনি নিচে কাদের আবছা কথাবার্তার শব্দ কানে এল। তারপর মনে হল, শব্দটা ক্রমশ উঠে আসছে ওপরদিকে। এর একটিই ব্যাখ্যা হয়। তা হল, কারা উঠে আসছে খাদ থেকে। এবং নিশ্চয় এই চাতালের ওপাশের ধাপ দিয়ে খাদে ওঠানামা করা যায়। কর্নেল কী করবেন ভাবছেন। সেই সময় আমি তাকে ডাকতে শুরু করেছি। সাড়া দিয়ে বলতে যাচ্ছিলেন–জয়ন্ত, শিগগির এসে মজা দেখে যাও! কিন্তু তখনই নিচে কাদের আর্তনাদ শোনা গেল। অমনি বুদ্ধিমান গোয়েন্দামহোদয় রহস্য আঁচ করে ফেললেন। ঘাপটি পেতে সেই লোকগুলোর অপেক্ষায় রইলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে তিনজন লোকের মাথা দেখা গেল চাতালের একপাশে। কর্নেল লুকিয়ে পড়লেন একটা পাথরের আড়ালে। দেখলেন ওরা মোটেও সাধারণ পাহাড়ী লোক নয়। তিনজনই প্যান্ট শার্ট পরা এবং সশস্ত্র। একজনের কাছে বন্দুকও আছে। তারা যে শিকারী নয়, তা এক নজরেই বুঝেছিলেন কর্নেল। আরো বুঝলেন, যখন ওদের একজন বলল কাজটা ঠিক হল না। শেষ করে দিয়ে আসাই উচিত ছিল। ফিরে যাব নাকি? অন্য একজন বলল-রাতেই মারা পড়বে। চলে এস। খুব জ্বালিয়েছে–এবার একটুখানি রয়েসয়ে মরতে দাও না বাবা! একথায় তিনজনে হো-হো করে হেসে উঠল।

 

…কর্নেল তো হতভম্ব। ওরা কথা বলতে বলতে চলে গেল ওপরে রাস্তার দিকে। ভয় হল, বেচারা জয়ন্তটা ওরকম খুনে লোকের মুখোমুখি পড়তে যাচ্ছে। নির্ঘাত কোনো বিপদ ঘটে যাবে। একবার ভাবলেন, জয়ন্তের কাছে যাবেন– আবার ভাবলেন, নিচের কারা মৃত্যুযন্ত্রণায় আর্তনাদ করছে–আগে তাদেরই বাঁচাবেন। ইতিমধ্যে নিচের জঙ্গলে সন্ধ্যার আবছায়া দ্রুত এসে সব কিছু অস্পষ্ট করে দিচ্ছিল। সিদ্ধান্ত ত্বরিতে নেওয়া দরকার। উনি জয়ন্তের উদ্দেশেই ওপরে উঠলেন। ওর সাহায্য দরকার মনে হয়েছিল। কিন্তু হা হতোস্মি! রাস্তায় জয়ন্তের টিকিটি দেখা যাচ্ছে না। একটু পরে উত্তরে পাহাড়টার গায়ে রাস্তায় টর্চের আলো দেখতে পেলেন। বুঝলেন, জয়ন্ত কোথাও চলেছে। তখন অগত্যা নিজের টর্চের সাহায্যে নিচে নামতে থাকলেন।

 

..খাদে নেমে কর্নেল শিউরে উঠলেন। সেই দড়িতে একজন পুরুষ আর একজন স্ত্রীলোকের যথাক্রমে ডান ও বাঁ পা বেঁধে উল্টোদিকে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের একটা পা ভীষণ জোরে নড়াচড়া করছে। দুজোড়া হাতও প্রচণ্ড নড়ছে। তাদের চেঁচাবার ক্ষমতাও তখন ফুরিয়ে গেছে। মুখ কেবল অস্পষ্ট গোঙানির শব্দ হচ্ছে।

 

…অনেক কষ্টে কর্নেল আবার ওপরে উঠলেন। তারপর দড়িটা কোথায় বাঁধা আছে, খুঁজে বের করলেন। তারপর দড়িটা ধরে এক টুকরো পাথরের পিছনে উবুড় হয়ে শুলেন। এবং ছুরি দিয়ে সাবধানে ওটা কেটে দিলেন। আচমকা আঁকুনি লাগল। হাতে দড়িটা কেটে বসে গেল। বুকে একটু চোটও লাগল। কিন্তু তবু ছাড়লেন না দড়ি। আস্তে আস্তে ঢিলে দিতে শুরু করলেন। যখন দেখলেন, দড়িটা একেবারে ঢিলে হয়ে গেছে, তখন ছেড়ে দিলেন।

 

..নিচে নেমে গিয়ে কর্নেল দেখলেন, খাদভর্তি নরম বালির ওপর দুটিতে পড়ে রয়েছে। অজ্ঞান হয়ে গেছে ভেবেছিলেন। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখলেন, অজ্ঞান হয়নি। তবে, কথা বলার ক্ষমতা নেই। নড়াচড়াও করতে পারছে না।

 

…সাবধানী গোয়েন্দাবর ওদের এক একে বয়ে অনেকটা দূরে একটা আড়ালমতো জায়গায় শুইয়ে জল খাওয়ালেন নিজের বোতল থেকে তারপর ওদের ওই অবস্থায় রেখে চলে এলেন। তিন মাইল পথ প্রায় দৌড়ে যেতে বুড়োর একটুও নাকি কষ্ট হয়নি। মিলিটারির পুরনো ঘুঘু। ওসব অভ্যেস বিলক্ষণ আছে। হীরাকুণ্ড টাউনশিপে পৌঁছে থানায় খবর দিলেন। পুলিশকে সেই লোক তিনটের কথা বললেন না কিন্তু। ওটা তো ওঁর তুরুপের তাস। নিজে বেসরকারি ঝানু গোয়েন্দা, তাই সব রহস্যভেদ নিজের বুদ্ধিতে করাই ওঁর স্বভাব। যাই হোক, পুলিশ কথামতো অ্যামবুলেন্স ও দমকল পাঠিয়ে সে রাতে বিস্তর তোলপাড় করল। পাহাড়ী খাদটা আলোয় উত্তেজনায় হল্লায় জমাট হল। তখন বৃষ্টি আর তুলকালাম পাহাড়ী দুর্যোগ চলেছে। ততক্ষণে বেচারারা অজ্ঞান হয়ে গেছে আবার। ওদের ঝড়জলের মধ্যে হীরাকুণ্ডায় আনা হল এবং হাসপাতালে দেওয়া হল।

 

..এদিকে কর্নেল জয়ন্তের কথা ভেবে তখন উদ্বিগ্ন। হঠাৎ মনে পড়ল, যে পাহাড়ে সম্ভবত জয়ন্তের টর্চের আলো দেখেছেন, তার ওদিকেই একটা নির্জন বাড়ি আছে। বাড়িটার সম্পর্কে তাঁর কিছু জানা ছিল। কোন এক কাঠের ব্যবসায়ীর নাকি শৈলাবাস। খোঁজ-খবর নিয়ে বাকিটা জেনে নিলেন। ইতিমধ্যে হাসপাতালে পুরুষ ও স্ত্রীলোকটির জ্ঞান ফিরেছে। তারা বলেছে, শৈলেশ সিংয়ের তারা পরিচারক ও পরিচারিকা। হীরাকুণ্ডায় শৈলেশ সিংয়ের একটা বাড়ি আছে। আজ সকালে সাহেবের সঙ্গে তারা গাড়িতে সেখানে যায়। মাইজি আরাধনা দেবীর শিলিগুড়ি থেকে সোজা ওখানে পৌঁছাবার কথা ছিল দুপুর নাগাদ। সেই মতো লাঞ্চ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু মাইজি দুটো অব্দি পৌঁছলেন না দেখে সায়েব ওদের থাকতে বলে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যান। তারপর আচমকা তিনজন বন্দুকবাজ লোক হানা দেয়। ওরা তাদের ধরে নিয়ে যায় খাদে এবং ওইভাবে ঝুলিয়ে রাখে। কেন? তা জানে না রঘুবীর বা লতা।

 

..তখনও ঝড়বৃষ্টি সমানে চলেছে। এসব সময় আচমকা ধস ছাড়ে। তাই সকাল অব্দি অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় ছিল না। পুলিশ অত ঝামেলা পোহাতে। যাবে কেন? সকাল হোক, তখন দেখা যায়েগা সবকুছ! এই হল থানা অফিসারের বক্তব্য।

 

…কিন্তু কর্নেল জয়ন্তের জন্য উদ্বিগ্ন। হঠাৎ তার মনে হল, চণ্ডীপাহাড়ের শৈলাবাসে ফোন থাকা কি অসম্ভব? কারণ, বিজলি তার যে গেছে, তা লক্ষ্য করেছেন আগে। তখন কর্নেল স্থানীয় এক্সচেঞ্জে রিং করলেন। নাম্বার পাওয়া গেল। কিন্তু অপারেটার জানাল, লাইন গড়বড় হয়েছে। একেবারে ডেউ। তখন রাত্রি নটা। হীরাকুণ্ডায় ঝড়জলের মধ্যে এক বন্ধুর বাড়ি গিয়ে উঠলেন কর্নেল। কিন্তু ঘুম এল না। রাত দশটার পর আবার মরিয়া হয়ে এক্সচেঞ্জে যোগাযোগ করলেন। এবার অপারেটার অবাক হয়ে বলল–লাইন ইজ অল রাইট। বাত্ কিজিয়ে! ফোনের ওপার থেকে স্ত্রীলোকের মিঠে স্বর ভেসে এল।-হ্যালো! শৈলেশ বলছ? কোথায় তুমি? এখানে এসে দেখি, সব হাট করে খোলা। কেউ নেই ব্যাপার কী?

 

..আরাধনা নিশ্চয় অবাক হল, যখন শুনল শৈলেশ সিং নয়–অন্য কেউ গম্ভীর গলায় কথা বলছে! যাই হোক, জয়ন্তের হদিস মিলল। আরাধনা জানাল, হা–আশ্রয়প্রার্থী ও অতিথি বাবুজী নাক ডাকিয়ে আরামে ঘুমোচ্ছেন। কর্নেল ওকে ডেকে দিতে নিষেধ করলেন। ঘুমোক বেচারা। এখন জাগালে বেমক্কা কর্নেলের শ্রাদ্ধ করে ছাড়বে!

 

–হ্যাঁ, আরাধনাকে তাদের পরিচারক-পরিচারিকার কথা কর্নেল কিছু জানাননি। উনি যে রহস্যভেদী ঘুঘু! তুরুপের তাসটি সারাক্ষণ হাতের চেটোয় লুকিয়ে রাখা অভ্যাস। সময়মতো ঝেড়ে সবার আক্কেল গুড়ুম করে দেবেন কিনা!

 

.

 

এই হল কর্নেলের বিবরণ। তবে এর ফাঁকে কতখানি তথ্য ঊহ্য কিংবা গুহ্য রেখেছেন, আমার পক্ষে জানা সম্ভব নয়। কিন্তু ওঁর মুখ দেখে, তার আঁচ পাওয়াও দুঃসাধ্য। অমন নিরীহ সরল মুখ যার, সে যে কী ধুরন্ধর, আমি ছাড়া খুব কম লোকই জানে।

 

কথা শেষ করে কর্নেল বললেন–হুম! জয়ন্ত ডার্লিং! এবার তোমার কাহিনীটি আগাগোড়া শোনা যাক। অবশ্য, তোমার রোমান্সের মিঠে এপিসোডটুকু বাদ দিলে এ বুড়োর মনে খুব কষ্ট হবে। নানা, অত মুখ রাঙা করা লজ্জার কোনো কারণ নেই বৎস। আমি মনে মনে তোমার চেয়েও যথেষ্ট যুবক সম্ভবত। নাও, স্টার্ট!

 

আমি আগাগোড়া খুঁটিয়ে আমার পর্বটি শোনালুম। শোনার পর কর্নেল বললেন–তুমি খুনীকে ধরার মারাত্মক কিছু সূত্র হয়তো নষ্ট করেছ, জয়ন্ত। আই এগ্রি হাতের ছাপপুলো নষ্ট হয়েছে। এমন কি…

 

ওঁকে থামতে দেখে বললুম–আর কী?

 

কর্নেল হঠাৎ সোজা হয়ে বললেন–আচ্ছা জয়ন্ত, তুমি যখন শুতে যাও, তখন কি ঘড়ি দেখেছিলে?

 

–নিশ্চয়। ঠিক নটা দশে আমি শুয়ে পড়ি। ভীষণ ঘুম পাচ্ছিল। অবশ্য একটু ইতস্তত করে হেসে বললুম–আপনাকে লুকোব না। মহিলাটির সঙ্গে একই শয্যায় ছিলুম। কিন্তু গোড়ার দিকটা মনে পড়ছে কী কী করেছি, বাকিটা মনে নেই।

 

-হুম! এখন সবটা ফোরেন্সিক টেস্টের উপর নির্ভর করছে। জয়ন্ত, শুধু জেনে রাখো, এ একটা অদ্ভুত মার্ডার কেস!..বলে কর্নেল হাই তুলে অভ্যাসমতো বুকে ক্রস আঁকলেন।…

 

আরাধনার কথায় যে গোলমাল আছে, তা আমি বুঝতে পারছিলুম। আমাকে ও বলছিল, ২৩ সেপ্টেম্বর অর্থাৎ পরশু সকালে এসেছে স্বামীর সঙ্গে। অথচ রঘুবীর লতার কথামতো এটা মিথ্যে হয়ে যায়। গতকাল দুপুর দুটো অব্দি ও পৌঁছায়নি দেখেই নাকি শৈলেশ সিং ব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে যান। তারপর ওঁর মুণ্ডুকাটা লাশ পাওয়া গেলো ওঁর খাটের নিচেই। কিমিম?

 

আরাধনা কর্নেলকেও কিছু খুলে বলেনি। শুধু আমার কথাটা বলেছিল আমি নাকি ঝড়বৃষ্টিতে ওখানে আশ্রয় নিয়েছি। অস্যার্থ?

 

আরাধনা পতিনিন্দা করছিল আমার কাছে। তবে সবচেয়ে অবাক কাণ্ড, আমার মতো অচেনা বা সদ্যচেনা যুবকের সঙ্গে তার আচমকা প্রেমাবেশ এবং নির্দ্বিধায় এক শয্যায় শুয়ে পড়া! সে কি এতে অভ্যস্ত? তার মানে সে কি তথাকথিত সোসাইটি গার্ল অথবা নিছক বারবনিতা? অবশ্য অধুনা বিদেশে ও স্বদেশে উচ্চবিত্ত উচ্ছংখল পরিবারে মেয়েদের এই অনাচারই কালচার। সেক্স ছাড়া কথা নেই তাদের অনেকের। কিন্তু আরাধনার ক্ষেত্রে প্রকৃত সত্য কী?

 

সেদিনই হীরাকুণ্ডা ফরেস্ট বাংলোয় লাঞ্চ খেয়ে ঝিমোচ্ছি। এমন সময় পুলিশ ইন্সপেক্টর মিঃ সাক্সেনা এলেন নিজে। সঙ্গে এক সিভিলিয়ন পোশাকধারী ভদ্রলোক। তাকে দেখেই কর্নেল বেড়ালের মতো বিছানা থেকে লাফ দিয়ে চেঁচালেনবাই জোভ! কী মারাত্মক যোগাযোগ! যেখানে গোয়েন্দা, সেখানেই খুন এবং সেখানেই ফোরেনসিক এক্সপার্ট? হ্যালো ডঃ পট্টনায়ক! এ যে অবিশ্বাস্য!

 

দীর্ঘদেহী প্রৌঢ় হাসতে হাসতে কর্নেলের হাতে হাত মেলালেন। মিহি গলায় শুধু বললেন–হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো!

 

ইনিই তাহলে সেই দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোরেন্সিক বিভাগের প্রধান ডঃ সীতানাথ পট্টনায়ক! ব্যস, এবার তাহলে তুলকালাম শুরু হবে দুই বন্ধুতে। ওই অধ্যাপক ভদ্রলোকের খ্যাতি নাকি আন্তর্জাতিক। আমার এবার আর মাথা ঘামিয়ে কাজ নেই। শুধু চুপচাপ দেখে যাই।

 

কিছু সময় পরস্পর এটা ওটা কথা বলার পর এসে পড়ল শৈলেশ সিংয়ের হত্যাকাণ্ড। ডঃ পট্টনায়ক বললেন–ইনিই তাহলে জয়ন্তবাবু? আরে! আপনি তো দেখছি নেহাত বাচ্চা! জার্নালিস্টমহলে আপনার এত সুনাম শুনে ভেবেছিলুম হয়তো আমাদের বয়সী বুড়ো-টুড়ো কেউ হবেন! এ যে অবিশ্বাস্য!

 

কর্নেল গম্ভীর হয়ে বললেন–না, জয়ন্তকে শিশু বললেনও আমার আপত্তি হবে না। তবে ভীষণ রোমান্টিক চ্যাপ। আর রোমান্সের আঁচ পেলো তো কথা নেই। ওর দ্রবীভূত হয়ে যেতে দেরি সয় না!

 

কথাটা নিঃশব্দে হজম করতে হল। কারণ সামনে দুজন বাইরের লোক। ডঃ পট্টনায়ক বললেন–আজকালকার ইয়ং ম্যানরা অন্য রকম হবে না? যুগ বদলাচ্ছে যে! যাক্ গে, শুনুন কর্নেল। আমি গত রাত্রে বৃষ্টির আগে এখানে দৈবাৎ এসে পড়েছি কাঠমাণ্ডু থেকে। হীরাকুণ্ডায় আমার এক ভাগ্নী থাকে। আজ সকালে বেরিয়েছিলুম নেহালকোটা প্রপাত দেখতে। দুপুরে শুনলাম, কে একজন খুন হয়েছেন। অভ্যাস যাবে কোথায়? তক্ষুনি গিয়ে মিঃ সাক্সেনার কাছে হাজির হলুম।

 

কর্নেল সকৌতুকে বললেন–ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানবে, তাতে অবাক হব না। নিশ্চয় সেই পোর্টেবল ল্যাবরেটরিটিও সঙ্গে রয়েছে যথারীতি?

 

–তা আর বলতে! এখন রেজাল্টগুলো শুনে যান, এক ও শৈলেশ সিংয়ের মৃত্যুর কারণ নিকোটিন-ঘটিত বিষ। মৃত্যুর পর পুলিশকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে তার মুণ্ডুটা কাটা হয়েছে। দুই ও বেডরুমে কারা কফি খেয়েছিল। একটা কাপের তলায় সামান্য মর্ফিয়ার গুড়ো পাওয়া গেছে।

 

বাধা দিয়ে কর্নেল বলে উঠলেন–সর্বনাশ! দ্যাটস রাইট। জয়ন্তকে কেউ ঘুম পাড়িয়ে রাখতে চেয়েছিল।

 

বললুম-আরাধনা ছাড়া আবার কে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *