(৪)
সদানন্দবাবুর মুখে যে আবার হাসি ফিরেছে, এইটে দেখে সত্যি আমি বড় নিশ্চিন্ত হয়েছিলুম। কিন্তু খুব বেশিদিন যে নিশ্চিন্ত থাকা যায়নি, আগের পরিচ্ছেদেই তা বলা হয়েছে। ভদ্রলোকের মুখটা আজ থেকে বছর তিনেক আগেই আবার মেঘলা হতে শুরু করে। তার মানে এ হল গিয়ে নকুলচন্দ্ৰ তাঁর বাড়িতে ভাড়াটে হয়ে আসবার তা ধরুন বছর খানেক পরের কথা। রাস্তায় একদিন দেখা হয়ে যেতে সদানন্দবাবুকে তখন জিজ্ঞেস করেছিলুম যে, কী হল, আবার কোনও ঝামেলা বাধল নাকি।
সদানন্দবাবু তাতে বললেন, “আরে মশাই, ঝামেলা কার নেই বলুন তো। বেঁচে থাকাটাই একটা ঝামেলা। বয়েস তো নেহাত কম হল না, এখন গেলে বাঁচি!”
কথাটা আর-কেউ বললে অবাক হতুম না। সদানন্দবাবু বলছেন বলেই অবাক হতে হল। শরীরের কলকব্জাগুলোকে ঠিক রাখবার জন্যে যাঁর চেষ্টার অন্ত নেই, আর সেই চেষ্টার কথাটা যিনি সগর্বে ঘোষণা করে থাকেন, বলেন যে, তাঁর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করলে আয়ুবৃদ্ধি একেবারে অবধারিত, সেই লোক বলছেন কিনা গেলে বাঁচি। এ-সব কথা আর-যাঁরই মুখে মানিয়ে যাক, সদানন্দবাবুর মুখে একেবারেই মানায় না।
কিন্তু তবু সে তাঁকে সেদিন আর এ নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করিনি, তার কারণ আর কিছুই নয়, তাঁর উত্তর দেবার ধরন দেখেই আমি বুঝে গিয়েছিলুম যে, প্রসঙ্গটা তিনি এড়িয়ে যেতে চাইছেন।
দু’চার দিনের মধ্যেই অবশ্য ব্যাপারটা বোঝা গেল। এক রবিবার সকালে আমাদের বাড়িতে এলেন সদানন্দবাবু। যথারীতি হাল্কা এক কাপ লিকার খেলেন। তারপর অন্যান্য প্রসঙ্গে দু’চার কথা হবার পরে বললেন, “না মশাই, ভাড়াটে বাছতে ভুল করেছি, নকুলচন্দ্র লোকটা বিশেষ সুবিধের নয়।”
আমি বললুম, “বাছাবাছি আর করলেন কোথায়। পাড়ার ছেলেদের কথায় ঘাবড়ে গিয়ে হঠাৎ ঠিক করলেন যে, একতলাটা ভাড়া দেবেন, আর তার দুচার দিনের মধ্যেই তো নকুলচন্দ্র এসে গেল। সেই যে এক রাজার গল্প শুনেছি, রাত্তিরে ঠিক করলেন যে, সকালে ঘুম থেকে উঠে রাজবাড়ির বাইরে বেড়াতে বেরিয়ে প্রথম যার মুখে দেখবেন, তার সঙ্গেই মেয়ের বিয়ে দেবেন, আপনারও তো দেখলুম সেই ব্যাপার।”
সদানন্দবাবু বিমর্ষ মুখে বললেন, “সেইটেই বড্ড ভুল করে ফেললুম। নকুলটা মশাই অতি নচ্ছার লোক। যাদের কথার ঠিক নেই তাদের আমি মানুষ বলেই মনে করি না। নকুলটা মানুষ নয়।”
বললুম, “কথার ঠিক নেই বললেই তো আর হল না, বেঠিকটা কী দেখলেন?”
“তা হলে শুনুন মশাই, বাড়িতে যখন ভাড়াটে হয়ে ঢোকে, নকুল তখন আমাকে বলেছিল যে, স্রেফ ওরা স্বামী-স্ত্রী থাকবে, আর কাউকে এনে ঢোকাবে না। তা এক বছর পার হতে-না-হতেই দেখছি শ্বশুরবাড়ি থেকে একটি শালাকে এনে ঢুকিয়েছে। বলেছিল, হপ্তাখানেক থেকেই চলে যাবে, কিন্তু কই, শালাবাবুটির তো নড়বার কোনও লক্ষণই দেখছি না।”
পাঁচ নম্বরের একতলায় যে নতুন একজন লোক কিছুদিন ধরে রয়েছে, এ৩। ‘মামিও লক্ষ করেছি। বাসন্তীকে জিজ্ঞেসও করেছিলুম যে, লোকটা কে? তা বাসন্তী বলল, ও হচ্ছে নকুলের বউ যমুনার দাদা। মানে আপন দাদা নয়, মামাতো দাদা। গ্রামে থাকত, সেখান থেকে বোনের বাড়িতে এসে উঠেছে। এখন কিছুদিন কলকাতায় থেকে যা-হোক কিছু একটা কাজকর্ম জুটিয়ে নেবে।
তা সদানন্দবাবুর তাতে এত আপত্তি কেন, বোঝা গেল না। বললুম, “কাজকর্মের সন্ধানে এসেছে একটা কিছু জুটে গেলেই চলে যাবে নিশ্চয়। সব বাড়িতেই আত্মীয়স্বজনেরা এমন এসেই থাকে, চিরকালের জন্যে তো আর কেউ আসে না। ও নিয়ে আপনি এত ভাবছেন কেন?”
সদানন্দবাবু বললেন, “ভাবনার কারণ আছে বলেই ভাবছি। আপনি বলছেন, একটা কাজকর্ম জুটে গেলেই চলে যাবে। আরে মশাই কাজকর্ম কি মামার বাড়ির ক্ষীরের নাড়ু নাকি যে দিনরাত্তির আমি বিছানায় পড়ে রইলুম, আর আদর করে দিদিমা আমার মুখের মধ্যে গুঁজে দিয়ে গেল। কাজকর্ম জোটাতে হলে হাঁটাহাঁটি করাই যথেষ্ট নয়, রীতিমত দৌড়ঝাঁপ করা দরকার। তা বিষ্টু হতচ্ছাড়া সে-সব করছে কোথায়?”
“ওর নাম বুঝি বিষ্টু?”
“হ্যাঁ। বিষ্টুচরণ দাস।”
“সারাদিন বিছানায় পড়ে-পড়ে ঘুমোয় বুঝি?”
“যখন ঘুমোয় না, তখন হেঁড়ে গলায় যাত্রার গান গায়। আমার মশাই একটুও পছন্দ হয় না।” সদানন্দবাবু আর বসলেন না, বেরিয়ে গেলেন।
.
বাড়িওয়ালার সঙ্গে ভাড়াটের সম্পর্ক অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভাল হয় না। তার উপরে আবার বাড়িওয়ালা আর ভাড়াটে যখন একই বাড়িতে থাকে, সম্পর্কটা তখন প্রায়ই অতি তেতো হয়ে ওঠে। আমার বাড়িওয়ালার সঙ্গেও আমার সম্পর্ক বিশেষ মধুর নয়। মোটামুটি দশ বছর এখানে আছি, তার মধ্যে দুবার আমার ভাড়া বেড়েছে, তা নিয়ে আমি কোনও আপত্তিও তুলিনি, রেন্ট কন্ট্রোলে যাবার ভয় দেখানো তো দূরের কথা, মুখেও কখনও বলিনি যে, এইভাবে ভাড়া বাড়ানোটা মোটেই উচিত-কাজ হচ্ছে না, তবু দেখছি আমার বাড়িওয়ালাটি প্রায়ই ঠারেঠোরে এমন সব উক্তি করছেন, যাতে মনে হয়, আমি উঠে গেলেই তিনি বাঁচেন।
ভাড়াটে উঠে গেলেই যে বাড়িওয়ালার সুবিধে সেটা অবশ্য আমি অস্বীকার করি না। আর কিছু না হোক, নতুন ভাড়াটের কাছ থেকে ফের নতুন করে পাঁচ-দশ হাজার টাকা সেলামি আদায় করা যায়। সেটাই তো মস্ত লাভ। সম্ভবত সেই জন্যেই আমার বাড়িওয়ালা কিছুদিন যাবৎ গাইতে শুরু করেছেন যে, তিনতলায় আর তাঁর কুলোচ্ছে না, দোতলাটা যদি এবারে ছেড়ে দিই তো তাঁর বড্ড উপকার হয়।
কথাটা তিনি যেমন আমাকে বলেন, তেমনি বাসন্তীকেও বলেন। আমি বলি, “খোঁজাখুঁজি তো করছি, নতুন একটা ফ্ল্যাটের সন্ধান পেলেই এটা ছেড়ে দেব।” বাসন্তীও মোটামুটি সেই কথাই বলছিল। কিন্তু দিন কয়েক আগে বাড়িওয়ালা ফের যখন কাঁদুনি গাইতে শুরু করেন, বাসন্তী তখন দুম করে রেগে গিয়ে তাঁকে বলে বসে, “আপনার কুলোচ্ছে না তো আমরা কী করব? মেয়ে দুটোর বিয়ে দিয়ে শ্বশুরবাড়িতে পাঠিয়ে দিন, তা হলেই দেখবেন দিব্যি কুলিয়ে যাবে।”
বাস সেই যে বাড়িওয়ালা আমাদের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করেছেন, এখনও তিনি স্পিকটি নট্। দেখা হলেই মুখ ঘুরিয়ে নেন। বাক্যালাপ বন্ধ হওয়ায় অবশ্য আমাদের বিশেষ অসুবিধে হচ্ছে না, তবে ভয় হচ্ছে যে, এবারে হয়তো জল বন্ধ হবে। তা হলে মুশকিলে পড়ব।
জল বন্ধ হওয়ার এই ভয়টা শুরু হয়েছিল বছর তিনেক আগেই। বাড়িওয়ালার সঙ্গে আমার সম্পর্ক মোটামুটি তখন থেকেই খারাপ চলছে। ব্যাপারটা সেইসময়ে সদানন্দবাবুকে আমি জানিয়েওছিলুম। বলেছিলুম, আপনার সমস্যা ভাড়াটেকে নিয়ে, আর আমার সমস্যা বাড়িওয়ালাকে নিয়ে। কী যে করব, বুঝতে পারছি না। জল বন্ধ হলে তো বিপদে পড়ব, মশাই।”
শুনে জিভ কেটে সদানন্দবাবু বলেছিলেন, “ছি ছি, জল আবার কেউ বন্ধ করে নাকি। ও তো একটা ক্রিমিন্যাল অফেন্স।”
তা বছর তিনেক আগে যা-ই বলে থাকুন মাস ছয়েক আগে নিজের বাড়িতে কিন্তু সদানন্দবাবু সেই ক্রিমিন্যাল অফেন্সটাই করে বসলেন। প্রথমে তিনি নকুলচন্দ্রের জলের সাপ্লা২ + ন্ধ করলেন, তার পরে কাটলেন ইলেকট্রিক।
অর্থাৎ সদানন্দবাবু একেবারে তিতিবিরক্ত। তাঁর একতলার ভাড়াটেদের তিনি তাড়াতে চাইছেন। . তাড়াতে চাইবার কারণ মাত্র একটি নয়, অনেক। তাঁর কথাবার্তা শুনে বুঝতে পারছি যে, নকুল- পরিবারের বলতে গেলে প্রায় কোনও কিছুই তিনি পছন্দ করতে পারছেন না।
নকুলচন্দ্রের শালাবাবু বিষ্টুচরণের চেহারা যে খুব বদখত তা নয়, তা ছাড়া সদানন্দ নিজেও স্বীকার করেন যে, কথাবার্তায় লোকটা খুব বিনয়ীও বটে। কিন্তু ওই যে সে কাজকর্মের জন্যে দৌড়ঝাঁপ না করে গোটা দুপুরটা স্রেফ ঘুমিয়ে কাটায়, আর যখন জেগে থাকে, তখন মাঝে-মাঝেই হেঁড়ে গলায় যাত্রার গান গায়, এটা তাঁর পছন্দ নয়। নকুলচন্দ্রের বউ যমুনাকে কেউ কচিখুকিটি বলবে না, তার বয়েস নিশ্চয় তিরিশ পার হয়ে গেছে, অথচ এখনও সে যে চোখে পুরু করে কাজল দেয়, ঠোঁটে লিপস্টিক ঘষে, হাতকাটা ব্লাউজ পরে, আর কথাও বলে ‘ন্যাকা ন্যাকা’, এটা তাঁর পছন্দ নয়। এই বাড়িতে ভাড়াটে হয়ে আসবার বছর দুয়েক বাদে যে যমুনার একটি মেয়ে হয়েছে, ফলে বিষ্টুচরণকে হিসেবের মধ্যে ধরলে—ভাড়াটেদের লোকসংখ্যা যে মাত্র দুবছরের মধ্যেই সেন্ট পার্সেন্ট বেড়ে গিয়ে এখন দুয়ের জায়গায় চার হয়েছে, এটাও তাঁর পছন্দ নয়।
কিন্তু তাঁর সবচেয়ে অপছন্দের ব্যাপার হল নকুলচন্দ্রের ব্যাবসা।
নকুলচন্দ্র যখন ভাড়াটে হয়ে আসে, তখন সে অর্ডার সাপ্লাইয়ের কাজ করত। তাতে সুবিধে না হওয়ায় সে জমি কেনাবেচার লাইন ধরে। কিন্তু তাতেও সে চোট খেয়ে যায়। ফলে বছর খানেক হল সে মাছের ব্যাবসা ধরেছে। আর এই মাছের ব্যাবসা নিয়েই সদানন্দের ঘোর আপত্তি।
আপত্তি হত না, নকুল যদি না বাড়ির মধ্যে তার পাইকারি ব্যাবসার আড়ত বসিয়ে দিত। দুটো ঘরের একটায় তারা স্বামী-স্ত্রী আর বাচ্চাটি থাকে। অন্য ঘরটায় বিষ্টু থাকত। এখনও থাকে, তবে কিনা ঘরের বেশির ভাগটাই ভর্তি হয়ে থাকে মাছের ঝুড়িতে।
সদানন্দবাবু যে প্রথম-প্রথম এই নিয়ে খুব আপত্তি করেছিলেন, তা নয়। শুধু একদিন হাসতে-হাসতে আমাকে বলেছিলেন, “বিষ্টুকে এবারে পালাতে হবে মশাই।”
আমি বলেছিলুম, “কেন?”
“যতই হোক, মানুষ তো। গন্ধের দাপটেই পালাতে হবে।”
বললুম, “তা বটে। বিষ্টুকে যে মাছের ঘরে থাকতে হয়, সেটা আমার মনেই ছিল না।”
বিষ্টু কিন্তু পালাল না। নকুলচন্দ্রের মাছের ব্যাবসাও সমানে চলতে লাগল। সকাল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ নাকি বাজারের খুচরো ব্যবসায়ীরা পাঁচ নম্বর বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়, মাছ দেখে, পছন্দ হলে দামদস্তুর করে, দামে পোষালে মাছ ওজন হয়, তারপর পাওনাগন্ডা মিটিয়ে দিয়ে মাছের ঝুড়ি রিকশায় তুলে তারা ছ’টার মধ্যেই বাজারে চলে যায়। আমি তো অত সকাল-সকাল ঘুম থেকে উঠি না। তাই স্বচক্ষে এই কেনাবেচার ব্যাপারটা কখনও দেখিনি। তবে যেমন বাসন্তী আর পারুলের কাছে, তেমনি পাড়ার অন্য দুচারজন লোকের মুখে শুনেছি যে, গলিটা তখন আঁশটে গন্ধে ভরে ওঠে।
যে ঘরে মাছের আড়ত তারই একপাশে বিষ্টুর শোবার জায়গা। মাঝে-মধ্যে সদানন্দবাবুর বাড়িতে যাই। দোতলায় উঠবার সময় সিঁড়ি থেকে উঁকি মেরে দেখতে পাই, ঘরের মধ্যে পরপর মাছের ঝুড়ি আর সেই ঝুড়ির পাশে নোংরা একটা বিছানা। বিষ্টুচরণকেও দেখতে পাই। দিব্যি সে তার বিছানায় শুয়ে ঘুম লাগাচ্ছে। সদানন্দবাবু আশা করেছিলেন, বিষ্টু এবারে পালাবে, ওই আঁশটে গন্ধের মধ্যে সে টিকতে পারবে না। কিন্তু যেভাবে তাকে নাক ডাকিয়ে ঘুমোতে দেখি, তাতে আমার মনে হয় না যে, মাছের গন্ধে বিষ্টুর কোনও অসুবিধে হচ্ছে।
আসলে অসুবিধেটা যে সদানন্দবাবুরই হচ্ছে, সেটা বুঝতে পারলুম, যখন এর মাস ছয়েক বাদে তিনি আবার এক রবিবারে আমার বৈঠকখানায় এসে ঢুকলেন। সাধারণত একটা ভূমিকা করে নিয়ে তারপরে তিনি আসল প্রসঙ্গে আসেন। সেদিন কিন্তু কোনও ভূমিকার মধ্যে তিনি গেলেন না। ঘরে ঢুকেই হতাশ গলায় বললেন, “আর তো পারছি না মশাই।”
একটা বই বেরুবে, তার প্রুফ দেখছিলুম। সেটাকে সরিয়ে রেখে বললুম, “কেন, আবার কী হল?”
“হবে আবার কী, গন্ধে একেবারে পাগল হয়ে গেলুম!”
“রোজই কি গন্ধ ছড়ায় নাকি?”
“রোজ। তার উপরে আবার এক-একদিন এমন উৎকট গন্ধ ছড়ায় যে, সে আর কী বলব, গোটা শরীরটা যেন গুলিয়ে ওঠে। কী করি বলুন তো?”
জীবনে আমি মাছের ব্যাবসা কেন, কোনও ব্যাবসাই করিনি। তবে কিনা যেখানে মাছের আড়ত খোলা হয়েছে, সেখানে যে আঁশটে গন্ধে বাতাস সারাক্ষণ ভরাট হয়ে থাকবে, এটা বুঝবার জন্যে আলাদা কোনও ব্যাবসাবুদ্ধি থাকার দরকার হয় না, অল্পবিস্তর কান্ডজ্ঞান থাকাটাই যথেষ্ট। নকুলচন্দ্ৰ মাছের ব্যাবসা করে, বাড়িতেই তার মাছের আড়ত, খুচরো ব্যবসায়ীরা তার কাছ থেকে মাছ কেনে, কিন্তু তার আড়তের সব মাছই কি আর সঙ্গে-সঙ্গে বিক্রি হয়ে যায়? তা নিশ্চয় হয় না। স্টকের কিছুটা মাছ নিশ্চয় পড়ে থাকে। ঠিকমতো যদি না বরফ-চাপা দিয়ে রাখা হয়, তা হলে সেগুলো পচতে শুরু করে। তার গন্ধ তো তখন উৎকট হয়ে উঠবেই। আর তা যে উঠবে, সদানন্দবাবুর সে-কথা আগেই বোঝা উচিত ছিল।
বললুম, “কী আর করবেন। ভাড়াটে নেবার আগে একটা কনট্রাক্ট করে নিয়েছিলেন?”
“তা তো করিনি।”
“করা উচিত ছিল। তাতে এইরকম একটা শর্তও আপনার রাখা উচিত ছিল যে, একতলাটাকে শুধু রেসিডেন্সিয়াল পার্পাসেই ব্যবহার করা চলবে, ওখানে গোডাউন করা চলবে না। তা তেমন কোনও কনট্রাক্ট যখন নেই, তখন আর আপনি কী করবেন?”
“সে কী মশাই”, সদানন্দবাবু বললেন, “বাড়ি তো আর নকুলের নয়, বাড়ি আমার। নাকি তাও আপনি স্বীকার করবেন না?”
“তা কেন করব না?” হেসে বললুম, “বাড়ি আপনারই।”
“আর সেই বাড়িটাকে যদি কেউ নরককুন্ড বানিয়ে তোলে, তাও আমি কিছু করতে পারব না? বাড়ি ভাড়া দিয়ে কি আমি চোর-দায়ে ধরা পড়েছি নাকি?”
বললুম, “নিয়মিত ভাড়া দেয়?”
“তা দেয়।”
“তা হলে মামলা-টামলার মধ্যে যাবেন না, গিয়ে কোনও লাভ হবে না। বরং এক কাজ করুন। ওকে বুঝিয়ে বলুন যে, বসতবাড়ির মধ্যে এই যে ও মাছের আড়ত করেছে এটা ঠিক হচ্ছে না। তাতে যদি কাজ না হয় তো তার পরের কথাটা তখন ভাবা যাবে।”
সদানন্দবাবু বুঝিয়ে বলতে গিয়েছিলেন। তাতে কাজ হয়নি। মাছের আড়ত অন্য কোথাও সরিয়ে নিতে হবে, এই প্রস্তাব শুনে নকুলচন্দ্র নাকি হাত কচলে বলেছিল, “কোথায় সরাব মেসোমশাই? আমি রইলুম এখানে আর আড়ত রইল আর-এক জায়গায়, এই করে কি ব্যাবসা চলে?”
সদানন্দবাবু বলেছিলেন, “অন্যেরা চালায় কী করে?”
তাতে নকুল বলেছিল, “তারা পারে। তাদের পয়সা আছে। তারা মাছ পাহারা দেবার জন্যে দরোয়ান রাখে, মাছ বিক্রি করবার জন্যে আলাদা কর্মচারী রাখে। আমি ও-সব কী করে পারব?”
সদানন্দবাবুর কাছে সব শুনে আমি বললুম, “তা হলে ওকে উঠে যেতে বলুন। পাড়ার দু’চারজন ভদ্রলোককে সঙ্গে নিয়ে ওর কাছে যান। গিয়ে বলুন যে, এখানে ওর থাকা চলবে না।”
তা-ই বলা হল। নকুলচন্দ্র তাতে কাতর গলায় বলল, “কোথায় যাব মেসোমশাই? এত কম ভাড়ায় আর কোথায় দু’খানা ঘর পাব আমি?”
অগত্যা কী আর করেন, যে কাজকে নিজেই একদিন ক্রিমিন্যাল অফেন্স বলেছিলেন, উপায়ান্তর না-থাকায় হঠাৎ একদিন সেটাই করতে হল সদানন্দবাবুকে। ভাড়াটের জলের সাপ্লাই তিনি বন্ধ করে দিলেন।
কিন্তু তাতে কোনও লাভ হল না। এমন নয় যে, জল বন্ধ হবার ব্যাপারটা নিয়ে নকুল একটা হইচই বাধিয়ে দিল। তা সে করল না। এমনকি সদানন্দবাবুর কাছে এই নিয়ে কোনও প্রতিবাদও জানাল না সে। স্রেফ একজন ভারী লাগিয়ে রাস্তার কল থেকে সে জল আনিয়ে নিতে লাগল।
সদানন্দবাবু বুঝে গেলেন যে, শুধুই জল বন্ধ করে নকুলচন্দ্রকে জব্দ করা যাবে না। তখন তিনি লাইটের কানেকশনও কেটে দিলেন।
তার পরের দিনই আবার আমার ফ্ল্যাটে এসে কড়া নাড়লেন সদানন্দবাবু। থমথমে গম্ভীর মুখ; হাসির লেশমাত্র নেই।
বললুম, “ব্যাপার কী মশাই, আবার কী হল?”
“হপ্তাখানেক ধরে যে ওকে জল দিচ্ছি না সেটা জানেন তো?”
“জানতুম না। কাল রাত্তিরে বাসন্তীর কাছে শুনলুম।”
“তিনি কী করে জানলেন?”
“কাল বিকেলে কী একটা কাজে যেন আপনার মিসেসের কাছে গিয়েছিল, তাঁরই কাছে শুনেছে। কাজটা ভাল করেননি।”
“তা হয়তো করিনি,” সদানন্দবাবু বললেন, “কিন্তু এ ছাড়া উপায়টাই বা কী ছিল?”
“তা এতে কোনও কাজ হল?”
হতাশ গলায় সদানন্দবাবু বললেন, “কিসসু না। ভেবেছিলুম বাছাধন এবারে পথে আসবে। কিন্তু কোথায় কী, ভারী দিয়ে জল আনিয়ে নিচ্ছে। কাল রাত্তিরে তাই লাইটের কানেকশনও কেটে দিলুম।”
বললুম, “এটা আরও খারাপ করলেন। মামলা-টামলা যদি হয়ই, তা হলে এই দুটো ব্যাপারই কিন্তু ওর ফেভারে যাবে। আর মামলা তো পরের কথা, এক্ষুনি গিয়ে ও যদি থানার ডায়েরি লিখিয়ে আসে তো আপনি বিপদে পড়ে যাবেন মশাই।
সদানন্দবাবু বললেন, “বিপদে আমি অলরেডি পড়েছি।”
“তার মানে? নকুল কি এরই মধ্যে থানায় গিয়ে ডায়েরি করেছে নাকি?”
“না মশাই, বিপদ একেবারে উল্টো দিক থেকে এসেছে।”
