(৩)
এই কাহিনীর শুরু হয়েছে একেবারেই দিন কয়েক আগের একটা ঘটনা দিয়ে। কিন্তু তার পরেই আবার পিছিয়ে গিয়েছি। কখনও বলেছি বছর দশেক আগের কথা, কখনও বলেছি বছর চারেক আগের। এমনটা কিন্তু মাঝে মাঝেই ঘটতে পারে। অর্থাৎ কখনও পিছিয়ে যাব, আবার কখনও এগিয়ে আসব। ঘটনাগুলিকে পর-পর সাজিয়ে দিতে পারতুম। কিন্তু এই কাহিনীর রস তা হলে জমত না।
আমার মনে হয় আমাদের এই গলিটার একটা বর্ণনা এখানে দেওয়া দরকার। পীতাম্বর চৌধুরি লেন যে মধ্য-কলকাতার শেয়ালদা অঞ্চলে, সেটা অবশ্য আগেই বলেছি। এর একটা মুখ আপার সার্কুলার রোডে অর্থাৎ আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় রোডে পড়েছে, আর অন্য মুখ পড়েছে হ্যারিসন রোডে অর্থাৎ মহাত্মা গান্ধী রোডে। এখান থেকে শেয়ালদা ইস্টিশানে হাঁটাপথে মাত্র তিন-চার মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যায়, আর বাসে উঠে-রাস্তায় যদি না জ্যাম থাকে তো—হাওড়া ইস্টিশানে পৌঁছতে মিনিট পনেরোর বেশি সময় লাগে না। ইস্কুল-কলেজের সুবিধেও বিস্তর! রাস্তা পার হলেই রিপন কলেজ অর্থাৎ সুরেন্দ্রনাথ কলেজ। মিনিট পাঁচেক হাঁটলেই বঙ্গবাসী। হিন্দু স্কুল, হেয়ার স্কুল, মিত্র মেইন, প্রেসিডেন্সি কলেজ, সংস্কৃত কলেজ, সবই হাঁটা পথের চৌহদ্দির মধ্যে। তা ছাড়া আপার সার্কুলার রোড ধরে রাজাবাজারের দিকে খানিকটা হাঁটলেই ভিক্টোরিয়া কলেজে পৌঁছে যাচ্ছেন। যেমন ছেলেদের তেমনি মেয়েদেরও লেখাপড়ার এত সুবিধে এই শহরের আর কোথাও আছে বলে জানি না। সেন্ট পলস কলেজও এখান থেকে মাত্র দশ মিনিটের হাঁটা পথ।
হাট-বাজারেরও বিস্তর সুবিধে। যেমন এদিকে রয়েছে বৈঠকখানা বাজার আর কোলে মার্কেট, তেমনি ওদিকে রয়েছে কলেজ স্ট্রিটের বনেদি বাজার। বাস ট্রাম ইত্যাদিও একেবারে দোরগোড়ায়। সত্যি বলতে কী, এত সব সুবিধে পাচ্ছি বলেই পীতাম্বর চৌধুরি লেনের দোতলার এই ফ্ল্যাটটা আমার পছন্দ হয়ে গিয়েছিল।
বাসন্তীর পছন্দ হয়নি। ঠোট উল্টে বলেছিল, “কী যে তোমার পছন্দ, বুঝি না বাপু। এইরকমের ঘিঞ্জি জায়গায় মানুষ থাকতে পারে! আমার তো দম বন্ধ হয়ে আসছে।”
তা পাড়াটা যে ঘিঞ্জি, তাতে সন্দেহ নেই। গলিটাও একে এঁদো, তায় সিধে-সরল নয়। এদিককার বড়রাস্তা থেকে শুরু হয়ে তিন-চারটে পাক খেয়ে তারপর ওদিকবার বড়রাস্তায় গিয়ে পড়েছে। লাঠির বাড়ি লাগলে সাপ যেভাবে মোচড় খায়, এও প্রায় সেই রকমের ব্যাপার।
পীতাম্বর চৌধুরি লেনের যাঁরা বাসিন্দা, তাঁদের কেউই যে খুব অবস্থাপন্ন ব্যক্তি, এমন মনে হয় না। তাদের মধ্যে ছোটখাটো ব্যবসায়ী; দোকানদার ও দালাল-শ্রেণীর লোক জনাকয় আছেন বটে, তবে অধিকাংশই চাকুরে। পুরুষানুক্রমে তাঁরা সরকারি ও বেসরকারি অফিসে চাকরি করে যাচ্ছেন। সকাল ন’টা সাড়ে ন’টার মধ্যে তাঁরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন, তারপর সারাটা দিন অফিসে কাটিয়ে বিকেল ছটা সাড়ে-ছটা নাগাদ বাড়িতে ফিরে স্নান সেরে, কিঞ্চিৎ জলযোগ করে নিয়ে বাড়ির সামনের রোয়াকে বসে গল্প-গুজব করেন, আর কোঁচার খুট কি রুমাল ঘুরিয়ে হাওয়া খান।
বাড়িগুলো যে তাঁদের বাপ-ঠাকুদার আমলে কি তারও আগে তৈরি হয়েছিল তা বুঝতে কারও অসুবিধে হবার কথা নয়। চুন-সুরকি দিয়ে গেঁথে তোলা মোটা-দেওয়ালের পেটাছাতের বাড়ি। সে কালের কর্তারা হয়তো মিস্ত্রি ডেকে মাঝে-মধ্যেই ছোটখাটো মেরামতি কি দাগরেজির কাজ করিয়ে নিতেন। এ-কালের কর্তাদের না আছে তেমন ট্যাকের জোর, না আছে ভাগের বাড়িতে পয়সা ঢালার উৎসাহ। ফলে মেরামতি যেমন হয় না, তেমনি জানলা দরজাতেও আর নতুন করে রঙের প্রলেপ পড়ে না। কোনও কোনও বাড়িতে বোধহর গত কুড়ি-পঁচিশ বছরের মধ্যে চুনকামের কাজও হয়নি। অধিকাংশ বাড়ির অবস্থাই অতি লঝড়। চৌত্রিশ সালে সেই যে একটা ভয়ঙ্কর ভূমিকম্প হয়েছিল, তার ধাক্কাটা যে এ-সব বাড়ি কী করে সামলে নিল তা কে জানে, তবে কিনা আবার যদি তেমন কোনও ভূমিকম্প হয় তো এ গলির প্রত্যেকটা বাড়িই নির্ঘাত হুড়মুড় করে ধসে পড়বে। আলসের বটগাছের চারা, বর্ষাকালে ফাটা রেনপাইপ দিয়ে ছড়ছড় করে চতুর্দিকে জল পড়তে থাকে। রাস্তা দিয়ে তখন খুব সন্তর্পণে চলাফেরা করতে হয়। একটু অসতর্ক হলেই পাইপের নোংরা জল পড়ে জামাকাপড় ভিজে যাবার আশঙ্কা। বাইরের দেওয়ালের পল তারা খসে পড়েছে, ফলে ভিতরকার গাঁথনির ইে এমনভাবে দাঁত বার করে রয়েছে যে, তার উপরে চোখ পড়বামাত্র অতিশয় অশ্লীল একটা উপমা অনেকের মাথায় আসবে। মনে হবে বাড়িগুলো যেন তাদের পরনের কাপড় তুলে উদোম হয়ে সর্বজনকে নিজেদের খোস-পাঁচড়া দেখাতে পারার একটা উৎকট উল্লাসে সারাক্ষণ নিঃশব্দে হেসে চলেছে।
যে বাড়িতে আমরা আছি, সেটাও কিছু ব্যতিক্রম নয়, মোটামুটি এই একই রকমের। তিনতলা বাড়ি। মালিকের অবস্থা ভাল নয়। তিনি রিটায়ার করেছেন, কিন্তু তিনটে ছেলের একটাও মানুষ হয়নি, তা ছাড়া দুই মেয়ের বিয়ে এখনও বাকি। এদিকে ছেলে তিনটে যদিও কোনও কাজকর্ম করে না, তাদের মধ্যে বড় আর মেজো ইতিমধ্যে বিয়ে করে ফেলেছে। বাড়িওয়ালার পরিবারটি অতএব নেহাত ছোট নয়। তিনতলার তিনটে ঘর নিয়ে তিনি থাকেন। খুব যে হাত-পা ছড়িয়ে থাকেন না, সেটা সহজেই বুঝতে পারি। একতলার ভাড়াটেরা সম্ভবত গত পঞ্চাশ বছর ধরে এখানে রয়েছে। ভাড়া দেয় যৎসামান্য, তাও ঠিকমতো দেয় না শুনেছি, কিন্তু কিছু করারও নেই, মামলা করেও বাড়িওয়ালা তাদের তুলে দিতে পারছেন না। বাকি রইল দোতলা। সেখানে আমরা থাকি। আমরা মানে আমি বাসন্তী আর আমাদের ছোট মেয়ে। ছেলেকে কর্মসূত্রে বাইরে থাকতে হয়, বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, ছোট মেয়ে ব্রেবোর্ন কলেজে পড়ে, এখান থেকে বাসে উঠে চটপট কলেজে পৌঁছে যায়, কোনও অসুবিধে হয় না।
যা কিছু অসুবিধে ছিল তা এই পুরনো ভাঙাচোরা বাড়ির ফ্ল্যাটটা নিয়েই। তবে সেটাও আমি নিজের উদ্যোগে যতটা সম্ভব মিটিয়ে নিয়েছি। ফ্ল্যাটটা যখন দেখতে আসি, তখনই বুঝেছিলুম যে, দেওয়ালের পলস্তারা থেকে জানালা-দরজা অনেক কিছুই সারিয়ে সুরিয়ে নিতে হবে। বাড়িওয়ালাকে সেলামি-বাবদ পাঁচ হাজার টাকা দিতে হয়েছিল, কিন্তু মেরামতির বাবদে তা থেকে তিনি একটি পয়সাও খরচ করতে রাজি হলেন না। বললেন যে, অ্যাডভান্স বাবদ যদি আরও হাজার কয়েক টাকা দিই, তো তাই দিয়ে তিনি মেরামতি করিয়ে দেবেন। তা টাকাটা তাঁকে দিয়েওছিলুম, কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি কিছুই করলেন না। বারকয় তাগাদা দিতে লজ্জিত গলায় বললেন যে, তিনি অভাবী মানুষ, টাকাটা খরচ করে ফেলেছেন। ফলে যা-কিছু মেরামতির কাজ ছিল, আবার কিছু গাঁটগচ্চা দিয়ে সেগুলি করিয়ে নিয়ে তারপর আমাকে এই নতুন আস্তানায় এসে উঠতে হয়।
পাঁচ নম্বর বাড়িটার চেহারা কিন্তু এতসব পুরনো লজঝড় বাড়ির মধ্যেও একটু অন্যরকম। বয়স অবশ্য সেটারও কিছু কম হয়নি। সদর দরজার পাশে দেওয়ালের গায়ে বর্ডার-দিয়ে-বসানো শ্বেতপাথরের ট্যাবলেট পড়ে যেমন বোঝা যায় যে, বাড়িটার নাম শ্যামনিবাস, তেমনি সেই নামের নীচে ১৮৭০ দেখে মালুম হয় যে, আজ থেকে একশো বছরেরও বেশি আগে এ বাড়ি তৈরি হয়েছিল। তৈরি করিয়েছিলেন সদানন্দের প্রপিতামহ শ্যামানন্দ বসু। পাথরের ট্যাবলেটটা অবশ্য তাঁর লাগানো নয়। সদানন্দের পিতামহ দয়ানন্দ বসু ওটা এই শতাব্দীর গোড়ার দিকে লাগিয়ে দিয়ে তাঁর পিতৃভক্তির প্রমাণ রেখেছিলেন।
পীতাম্বর চৌধুরি লেনের বেশির ভাগ বাড়িই পার্টিশান হয়েছে। সেটাই স্বাভাবিক। কালক্রমে শরিকের সংখ্যা তো বেড়েই যায়, ছোটখাটো নানা ব্যাপার নিয়েও তখন ঝগড়াঝাঁটি লাগতে থাকে, যৌথ একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে চৌচির হয়, ফলে বাড়িটাও আর পার্টিশান না করে উপায় থাকে না। এখানেও সেই একই ব্যাপার হয়েছে। কিছু-কিছু বাড়িতে তো যত ঘর তত শরিক। পাঁচ নম্বর বাড়িটাও শরিকে-শরিকে ভাগ হয়ে যেতে পারত। তা যে হয়নি, তার কারণ আর কিছুই নয়, শ্যামানন্দের সময় থেকেই এ-বাড়ির মালিকদের কারও একাধিক পুত্র-সন্তান হয়নি। ব্যাপারটা পরিকল্পিত নয় নিশ্চয়ই, পরিবার পরিকল্পনা নেহাতই এ-কালের ব্যাপার, সদানন্দের পূর্বপুরুষেরা এতসব প্ল্যানিংয়ের ধার ধারতেন না। তবু যে তাঁদের প্রত্যেকেরই মাত্র একটি করে পুত্র, এটাকে একটা আকস্মিক ব্যাপারই বলতে হবে। শ্যামানন্দের একমাত্র পুত্রসন্তান দয়ানন্দ; দয়ানন্দের একমাত্র পুত্রসন্তান মহানন্দ; এবং মহানন্দেরও একমাত্র পুত্রসন্তান আমাদের এই সদানন্দ বসু। লাইনটা অবশ্য এখানেই শেষ। সদানন্দ যে নিঃসন্তান মানুষ, সে-কথা আগেই বলেছি।
যা-ই হোক, যে-কথা বলছিলুম সেটা এই যে, পূর্বপুরুষদের কারও একাধিক পুত্রসন্তান না-হওয়ায় এই পরিবারের স্থাবর অস্থাবর কোনও সম্পত্তিই কখনও ভাগ-বাঁটোয়ারা হয়নি। তা ছাড়া, সদানন্দবাবুর কাছেই শুনেছি, তাঁর পূর্বপুরুষদের কারও এমন কোনও বদ-খেয়ালও ছিল না যে, বাড়ি বন্ধক দিয়ে কি ঘটিবাটি বিক্রি করে টাকা জোগাড় করবার দরকার পড়বে। নেশা বলতে যা বোঝায়, তা ছিল একমাত্র দয়ানন্দের। তা সে-নেশাও ঘোড়া কিংবা মদ-মেয়েমানুষের নয়, ঘুড়ি আর পায়রা ওড়ানোর, যাকে কিনা বৃহৎ কোনও বদ-খেয়ালের পর্যায়ে ফেলা যাচ্ছে না।
জন্মসূত্রেই সদানন্দ তাই মোটামুটি সচ্ছল মানুষ। চাকরিটা খুব উঁচু দরের করেননি বটে, তবে মাঝে-মধ্যেই দু’চার টাকা উপরির ব্যবস্থা থাকায় তাঁর রোজগার নেহাত খারাপও ছিল না। ফলে বাড়িটা যতই পুরনো হোক বছরে অন্তত একবার মিস্ত্রি-মজুর লাগিয়ে তিনি তাতেই একটু চেকনাই ফুটিয়ে রাখতে পেরেছেন।
বাড়িটা বিশেষ বড়ও নয়। দোতলা-একতলা মিলিয়ে ঘর মাত্রই চারটে। উপরের তলায় দুটো আর নীচের তলায় দুটো। তবে দুটো তলাই এমনভাবে তৈরি হয়েছিল, উপর-নীচে ভাগাভাগির দরকার হলেও যাতে কোনও তলার শরিকের কোনও অসুবিধে না হয়। উপরতলায় যেমন রান্নাঘর, একফালি ভাঁড়ার আর বাথরুমে আছে, তেমনি আছে নীচের তলাতেও। সদানন্দবাবুর অবশ্য চারটে ঘরের দরকারও হয় না। মানুষ তো এ-সংসারে দুটি মাত্র, দোতলার দুখানা ঘরেই তাই তাঁর দিব্যি চলে যায়। একতলাটা তবু যে তিনি ফাঁকা ফেলে রেখেছিলেন, তার কারণ তো আগেই বলেছি, ভদ্রলোক ঝুট-ঝামেলা পছন্দ করেন না। শেষ পর্যন্ত অবশ্য পাড়ার ছেলেরা বেদখল করে নিতে পারে, এই ভয়েই তিনি তাড়াহুড়ো করে ভাড়াটে বসিয়ে দিলেন। তবে সেটা বসাবার আগে, ভাড়ার ব্যাপারে মাথা না ঘামালেও, এই একটা ব্যাপারে তিনি একেবারে ষোলো-আনা নিশ্চিত হয়ে নিয়েছিলেন যে, ভাড়াটে হয়ে যারা আসছে, তাদের লোকসংখ্যা খুবই কম।
পাড়ার ছেলেদের ভয়ে সদাহাস্যময় সদানন্দবাবুর মুখে তো মেঘ জমতে শুরু করেছিল। ভাড়াটে বসাবার পরে দেখলুম মেঘ কেটে গিয়েছে, সদানন্দবাবু আবার সেই আগের মতো হাসছেন। কথাবার্তাও বলছেন সেই আগের মতোই প্রাণ খুলে। দেখে আমি নিশ্চিন্ত হয়েছিলুম।
কিন্তু খুব বেশিদিন নিশ্চিন্ত থাকা গেল না। সে-কথায় একটু বাদে আসছি। তার আগে তাঁর দৈনন্দিন রুটিন আর ওই মর্নিং ওয়াকের কথাটা একটু বলে নেওয়া ভাল।
মর্নিং ওয়াকটাও অবশ্য তাঁর দৈনন্দিন রুটিনের মধ্যেই পড়ে। সবটা তো স্বচক্ষে দেখবার উপায় নেই, প্রায় বারো-আনাই শোনা-কথা। তা যে-সব কথা শুনি, তা যদি মিথ্যে না হয় তো বুঝতে হবে, সদানন্দবাবু প্রতিটি কাজ করেন একেবারে ঘড়ি ধরে, নির্দিষ্ট একটা রুটিন অনুয়ায়ী। কী শীত, কী গ্ৰীষ্ম, ভদ্রলোক ঘুম থেকে ওঠেন কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে চারটের সময়, চোখে-মুখে জল দিয়ে নিজের হাতে স্টোভ ধরিয়ে জল ফুটিয়ে এককাপ চা খান। চা মানে ওই হালকা লিকার। তাতে সব মিলিয়ে মিনিট পঁচিশেক সময় যায়। স্টোভে যখন জল গরম হচ্ছে, তার মধ্যেই পালটে নেন তাঁর জামাকাপড় তারপর চা খেয়ে যখন সদর-দরজা খুলে মর্নিং ওয়াক করতে বেরিয়ে পড়েন, ঘড়িতে তখনও পাঁচটা বাজেনি, মিনিট কয়েক বাকি। সদর দরজায় গোদরেজের টানাতালা বসিয়ে নিয়েছেন। তার একটা চাবি সদানন্দবাবুর কাছে থাকে, আর অন্যটা থাকে ভাড়াটেদের কাছে। দরজা বন্ধ করবার জন্যে কাউকে ডেকে তুলবার দরকার হয় না, স্রেফ পাল্লাটা টেনে দিয়ে বেরিয়ে পড়লেই হল। যখন বেরিয়ে পড়েন, তখন তাঁর হাতে থাকে একটা লাঠি আর এখটা টর্চ। লাঠিটা আমি দেখেছি। এই রকমের লাঠি বড় একটা দেখা যায় না। মোটা বেতের লাঠি, তার মাথায় একটা লোহার বল বসানো।
কখনও আধা ঘন্টা হাঁটলেন, কখনও চল্লিশ মিনিট, সদানন্দবাবুর জীবনে এমনটা হবার উপায় নেই রোজ একেবারে নিয়ম করে তিনি ঠিক এক ঘন্টা হাঁটেন। শ্রদ্ধানন্দ পার্ক দূরে নয়, সে শনে গিয়ে গোটাকয় চক্কর মেরে একেবারে কাঁটায় কাঁটায় ছ’টায় তিনি বাড়িতে ফেরেন। ফিরে, দোলায় উঠে আবার স্টোভ ধরিয়ে চা বানাতে লেগে যান। এবারে বানান দুকাপ চা। গিন্নির ঘুম ভাঙিয়ে এককাপ তাঁর হাতে তুলে দেন, অন্য কাপ তাঁর নিজের জন্য। চা খেতে-খেতে গিন্নির সঙ্গে দুটো-একটা কথা হয়, তারপর বেরিয়ে পড়েন দুধ আনতে। দুধ এনে সাতটার সময় বেরিয়ে পড়েন বাজারে। বৈঠকখানা বাজারে রোজ যান না। বাজার আজকাল তার গন্ডি ছাড়িয়ে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে, হ্যারিসন রোডের দুধারেই সারে সারে আলু-পটোল-ঝিঙে-বেগুন আর মাছের ব্যাপারীরা বসে যায়, কিন্তু সদানন্দবাবুর কেনাকাটা তবু যে এক ঘন্টার আগে শেষ হয় না, তার কারণ তিনি ‘রেদস্তুর করতে ভালবাসেন, প্রতিটি জিনিস কেনেনও খুব বাছাই করে। বাড়ি ফেরেন আটটায়। তখন লেখাবার খান, কিন্তু তার সঙ্গে আর চা খান না। তৃতীয় কাপ চা খান বিকেল চারটেয়।
তা এ হল সকালবেলার হিসেব। বাকি দিনটাও এইরকমের রুটিনে বাঁধা। কোথাও কোনও নড়চড় হবার উপায় নেই। এইভাবে চললে নাকি শরীর সজুত থাকে, আয়ুবৃদ্ধি হয়। হবেও বা
সদানন্দবাবুকে আমি কখনও মর্নিং ওয়াকে বেরোতে দেখিনি, ফিরে আসতেও না। ওই স্বর্গীয় দৃশ্য কি আর আমার মতো অলস লোকের পক্ষে দেখা সম্ভব? রোজই যে আমি দেরি করে ঘুমোই তাই ঘুম ভাঙতে বেলা হয়ে যায়,তা অবশ্য নয়। অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরতে পারলে, আর রাত জেগে যা শেষ করতে হবে এমন কোনও জরুরি কাজ হাতে না থাকলে, এক-একদিন তো দশটার মধ্যেই শুয়ে পড়ি। কিন্তু তাতেও দেখেছি সাতটার আগে ঘুম ভাঙে না। তা হলে আর সদানন্দবাবুর ভোর-পাঁচটার মর্নিং ওয়াক কী করে দেখব।
আমার ছোট মেয়ে পারুল অবশ্য দেখেছে। সেও দেখত না, যদি না সামনের এপ্রিলেই বি. এ ফাইনাল পরীক্ষায় বসবার জন্যে তাকে আদাজল খেয়ে তৈরি হতে হত। পার্ট ওয়ানের ফল বিশেষ ভাল হয়নি, এখন ফাইনালটা ভাল করে দেওয়া দরকার, গত মাস তিনেক ধরেই সে তাই নাকি শেষ-রাত্তিরে ঘুম থেকে উঠে পড়তে বসে যাচ্ছে।
সেদিন সকালবেলার জলখাবার খাবার সময় কথায়-কথায় সদানন্দবাবুর প্রসঙ্গ উঠেছিল। দিন কয়েক যাবৎ আমার গেঁটেবাতের যন্ত্রণা বড় বেড়েছে। বাসন্তীকে সে-কথা বলতে সে বলল, “দোষ তোমারও কম নয় বাপু, সদানন্দবাবুর পরামর্শ মতো এই যে দুধ-চিনি বাদ দিয়ে চা ধরেছ, এতে তোমার অ্যাসিডিটি যে অনেক কমে গেছে, সেটা তো স্বীকার করবে?”
বললুম, “বা রে, তা আমি অস্বীকার করব কেন?”
বাসন্তী বলল, “এবারে ওঁর মতো মর্নিং ওয়াকটাও ধরে ফ্যালো। ভদ্রলোক তো কতদিন ধরেই বলছেন, অথচ তুমিই গা করছ না। রোজ সকাল পাঁচটায় যদি ওঁর সঙ্গে বেরিয়ে পড়ে একটু ঘুরে আসতে, তো তোমার এই গেঁটেবাতের ব্যথাও নিশ্চয় খানিকটা অন্তত কমে যেত।”
হেসে বললুম, “ওরেব্বাবা, ও-সব আমার দ্বারা হবে না।”
পারুল বলল, “না-হবার কিছু নেই বাবা। বোস-জেঠু তো দেখি রোজ সকালে একেবারে কাঁটায়-কাঁটায় পাঁচটার সময় বেরিয়ে পড়েন। তা তিনি যদি অত সকাল-সকাল ঘুম থেকে উঠতে পারেন তো তুমিই বা পারবে না কেন?”
বললুম, “তুই কি সেই সময়ে ওঁকে দেখতে পাস নাকি? তুইও তো তখন ঘুমিয়ে থাকিস।
পারুল তাতে রেগে গিয়ে বলল, “এই হচ্ছে তোমার মস্ত দোষ। বাড়ির কোনও খবরই তুমি রাখো না, এমন কী, তোমার মেয়ে কখন ঘুম থেকে ওঠে, তাও তোমার জানা নেই। তা হলে শুনে রাখো, গত ডিসেম্বর মাস থেকেই রাত চারটেয় ঘুম থেকে উঠে আমি পড়তে বসে যাচ্ছি।”
“হঠাৎ এত সুমতি যে?”
জলখাবার খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। কাপ-প্লেট গোছাতে-গোছতেই বাসন্তী আমার দিকে অবাক চোখে তাকাল, তারপর মেয়ের দিকে তাকিয়ে তেতো-গলায় বলল, “তা হলেই বোঝ যে, তোর বাবা কত দায়িত্বশীল মানুষ। সামনের মাসেই যে মেয়ের ফাইনাল পরীক্ষা, তা পর্যন্ত জানে না!”
পারুল যেমন হঠাৎ-হঠাৎ রেগে যায়, তেমনি তার রাগটা আবার পড়েও যায় খুব তাড়াতাড়ি। বাসন্তীর কথায় আমি যে খুব অস্বস্তির মধ্যে পড়ে গিয়েছি এইটে বুঝে হেসে ফেলে বলল, “থাক, থাক, বাবাকে আর কিছু বোলো না মা। এমনিই তো বাতের ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছে, বেশি যদি বকাঝকা করো তো ব্লাড প্রেশারও চড়ে যাবে।”
বাসনপত্র গুছিয়ে নিয়ে বাসন্তী ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তখন পারুল বলল, “আমার পড়ার টেবিলটা তো জানলার ধারেই, রোজ পাঁচটায় সত্যি আমি বোস-জেঠুকে বেরিয়ে পড়তে দেখি। ডিসেম্বর মাস থেকেই দেখছি।”
“সত্যি?”
“তবে আর বলছি কী! এখন তো গরম পড়ে গেছে, শীতের সময়েও একেবারে কাঁটায় কাঁটায় পাঁচটায় উনি মর্নিং-ওয়াকে বেরিয়ে পড়তেন। উঃ তখন যে ওঁকে কী অদ্ভুত দেখাত, সে আর কী বলব!”
“অদ্ভুত দেখাত মানে?”
“যদি না বকো তো বলি। বলো, বকবে না তো?”
“না, না, বকব কেন? আমি কি কখনও কাউকে বকি নাকি? ওটা তো তোর মায়ের ডিপার্টমেন্ট।”
পারুল হেসে বলল, “ওর বাড়ির সামনেই স্ট্রিট-লাইট তো, তাই দেখতে কোনও অসুবিধে হত না। পায়ে বুটজুতো, গায়ে বিশাল অলেস্টার, তার উপরে আবার মাথায় মাঙ্কি-ক্যাপ… ওই যা পরলে শুধু চোখ দুটো আর নাকের ফুটোটা বেরিয়ে থাকে, বাদবাকি সব ঢাকা পড়ে যায়। তখন না….. তখন না…..বলি বাবা?”
বললুম, “অত কিন্তু-কিন্তু করছিস কেন, বলেই ফ্যাল না!”
“তখন ওঁকে টিভিতে যে রামায়ণ চলছিল না, তার জাম্বুবানের মতন দেখাত বাবা!”
কথাটা বলেই ঘর থেকে পারুল ছুটে বেরিয়ে গেল।
