শ্যামনিবাস-রহস্য (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(১৯)

গোটা ঘর একেবারে নির্বাক। গঙ্গাধর সামন্তের নোটবইটা তাঁর হাত থেকে খসে মেঝের উপরে পড়ে গিয়েছিল। তবু যে তার শব্দ আমরা শুনতে পাইনি, তার কারণ আর কিছুই নয়, ডাক্তার অরুণপ্রকাশ স্যান্যালের এই ড্রয়িংরুমের গোটা মেঝেটাই পুরু কার্পেট দিয়ে মোড়া। নইলে নিশ্চয় একটা পিন পড়লেও তার শব্দ তখন শোনা যেত।

ডাক্তার চাকলাদারের কথায় যে ধাক্কা লেগেছিল, সেটাকে সামলে নিয়ে ভাদুড়িমশাই-ই প্রথম তাঁর মুখ খুললেন। বললেন, “নকুল নয়? তা হলে কে ওর বাপ?”

“সম্ভবত বিষ্টুচরণ।”

সামন্ত বললেন, “প্রমাণ কী?”

“প্রমাণ তো কম্‌লির মুখের উপরেই লেখা রয়েছে।” ডাক্তার চাকলাদার বললেন, “মেয়ের মুখের সঙ্গে বাপের মুখের এমন আশ্চর্য মিল বড়-একটা চোখে পড়ে না। শনিবার সকালে যখন পাঁচ-নম্বর বাড়িতে যাই, মিলটা তখনই আমার চোখে পড়ে। মানে যমুনা যখন তার মেয়েকে কোলে করে আপনার পায়ের সামনে এসে আছাড় খেয়ে পড়েছিল। বিষ্টুচরণও তো সেই সময়ে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানে। বিষ্টুর মুখের সঙ্গে কমূলির মুখের মিলটা তবু আপনাদের চোখে পড়ল না? আশ্চর্য!”

সামন্ত বললেন, “ব্যভিচার যে একটা মোটিভ তাতে সন্দেহ নেই, কিন্তু মুখের মিলকে তো আর ব্যভিচারের প্রমাণ হিসেবে আদালতে দাখিল করা যাবে না। আসামি পক্ষের উকিল বলবে, অমন একটু-আধটু মিল অনেকের সঙ্গেই অনেকের থাকতে পারে। ও সব মিল-টিলের কথা ছাড়ুন। নকুল যে কম্‌লির বাপ নয়, তার এমন কোনও প্রমাণ কোথায়, আদালতে যা পেশ করলে আমাদের বোকা বনতে হবে না?”

ডাক্তার চাকলাদারকে দেখে মনে হল, তিনি বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি। বললেন, “ঠিক আছে, দরকার যদি হয় তো তেমন প্রমাণই আমি দেব। তাও আমার কাছে রয়েছে।”

সামন্তর ভুরু কুঁচকে গেল। বললেন, “তা হলে সেটা প্রথম দিনই আমাদের দেননি কেন?”

প্রশ্নটার জবাব দিলেন না চাকলাদার। সামন্তর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে তিনি ডাক্তার সুরেশ গুপ্তের দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, “কেন যে কিছু-কিছু কথা আমরা গোপন রাখি, একজন পুলিশ অফিসারের পক্ষে তা বোঝা সম্ভব নয়। কিন্তু মিস্টার গুপ্ত, পুলিশের ডাক্তার হলেও আপনি ডাক্তার তো বটেন, আপনি নিশ্চয় বুঝবেন যে, অনেক কথা জেনেও আমরা মুখ খুলতে পারি না, অন্য-কাউকে তার সামান্যতম আভাস দিতেও আমাদের এথিকসে বাধে। তা ছাড়া, এটা বিশ্বাসরক্ষার ব্যাপার। …রোগী তার ডাক্তারকে বিশ্বাস করে… তাঁকে সে এমন অনেক কথা জানায়, যা হয়তো তার অতি আপনজনকেও সে জানায় না …মানে জানাতে তার সংকোচ হয় …কী, হয় না?”

ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “হয় বই কী।”

“অথচ ডাক্তারের কাছে তার কোনও সংকোচ নেই। কেন নেই? না সে ধরেই নিয়েছে যে, ডাক্তারকে সে যা বলছে, আর-কেউ তা ঘূণাক্ষরেও কখনও জানবে না। আমরাও জানি যে, রোগী যা বলছে, তা আমাদের বিশ্বাস করে বলেই বলছে। অন্য-কাউকে সেটা জানাবার কোনও প্রশ্নই নেই। জানালে সেটা ব্রিচ অভ্ ট্রাস্ট হয়ে দাঁড়ায়। কী, আমি ভুল বলছি?”

ডাক্তার গুপ্ত চুপ করে রইলেন, কোনও উত্তর দিলেন না।

চাকলাদার বললেন, “কী হল, কিছু বলছেন না কেন? যা হোক কিছু বলুন।”

“কী আর বলব, বলবার তো কিছুই নেই।” ডাক্তার গুপ্ত মাথা নাড়লেন, “ইউ আর অ্যাবসলিউটলি রাইট। রোগী আপনাকে বিশ্বাস করে যা বলছে, তা কারও কাছে ফাঁস করবার কোনও প্রশ্নই উঠতে পারে না। ইট উইল বি হাইলি আনএথিক্যাল। … না না, ও-সব কথা কাউকে জানাতে আপনি বাধ্য নন।”

চাকলাদার বিষণ্ণ হাসলেন। বললেন, “থ্যাঙ্ক ইউ ডক্টর গুপ্ত। কিন্তু আমার সমস্যা তাতেই মিটছে না। আমি পড়েছি উভয়-সংকটে। আমি যা জানি…মানে আমার পেশেন্ট আমাকে যা বলেছে, আর তাকে পরীক্ষা করে যা আমি জানতে পেরেছি, তা বলাও অন্যায়, আবার না-বলাও অন্যায়। হয়তো না-বলার অন্যায়টাই আরও মারাত্মক।”

সামন্ত বললেন, “বড্ড হেঁয়ালি হয়ে যাচ্ছে, ডাক্তার চাকলাদার। একটু ঝেড়ে কাসুন দেখি।”

সামন্তর কথাটাকে গ্রাহ্যও করলেন না চাকলাদার। তাঁর দিকে একবার ফিরেও তাকালেন না। ভাব দেখে মনে হল যেন তাঁর কথাটা তিনি শুনতেও পাননি। ডাক্তার গুপ্তের দিকেই তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে বললেন, “আর সেই জন্যেই এখন আমার মনে হচ্ছে যে, কমলিকে কোলে নিয়ে যমুনা যখন তার ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে এল, আর তারপর যখন আমি শুনলুম যে, ও নকুলের মেয়ে, তখনই সব কথা আমার জানিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। তা যদি জানাতুম, মিস্টার সামন্তর সন্দেহটা তা হলে নিশ্চয় তখনই অন্য দিকে ঘুরে যেত; আর-কিছু না হোক, তিনি বুঝতে পারতেন যে, নকুলকে খুন করবার মোটিভ একমাত্র সদানন্দবাবুরই নয়, অন্যদেরও থাকা সম্ভব। আর তা যদি তিনি বুঝতেন, তা হলে নিশ্চয় তড়িঘড়ি একজন বুড়োমানুষকে থানায় ধরে নিয়ে গিয়ে তাঁর কাছ থেকে কনফেশান আদায় করবার জন্যে তাঁকে চড়াচাপড় লাগাবার ব্যবস্থা করতেন না।”

একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন চাকলাদার। তারপর বললেন, “কথাটা আমার তখনই বলা উচিত ছিল। কিন্তু আমি বলিনি। কেন বলিনি? না পেশেন্টের রোগের ব্যাপারে যাবতীয় গোপনীয়তা আমাদের রক্ষা করতে হয়, ডাক্তারি পেশার সেটা মস্ত শর্ত। সেই শর্তটাকেই আমি মান্য করে চলছিলুম। কিন্তু ডাক্তার গুপ্ত, আমাকে মার্জনা করুন, কোনও শর্তই এখন আর আমি মান্য করতে পারছি না। আর তা ছাড়া, রোগটা যার, সে তো মারাই গেছে, এখন যদি তার একটা শারীরিক ত্রুটির কথা আমি প্রকাশ করি, তবে অন্তত তার তাতে কোনও ক্ষতি হবারও আশঙ্কা নেই।”

কৌশিক বলল, “কিসের ক্ষতি?”

চাকলাদার বললেন, “লোকের কাছে উপহাসের, ঠাট্টা-বিদ্রুপের পাত্র হওয়াটাই কি একটা মস্ত বড় ক্ষতির ব্যাপার নয় : সত্যি বলতে কী, অনেকটা সেই কারণেও এ-সব ত্রুটির কথা অনেকে গোপন করে রাখে, রাখতে বাধ্য হয়।”

সামন্ত আবার বললেন, “বড্ড হেঁয়ালি হয়ে যাচ্ছে, বড্ড হেঁয়ালি হয়ে যাচ্ছে। ও-সব আগড়ম-বাগড়ম বাদ দিয়ে এবারে কাজের কথায় আসুন তো। নকুল যে কমলির বাপ নয়, তার প্রমাণ কী?”

এক নিশ্বাসে বিস্তর কথা বলে ফেলে বোধহয় চাকলাদার একটু ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। আকস্মিক উত্তেজনাও বোধহয় তাঁর ক্লান্ত বোধ করবার একটা মস্ত কারণ। এতক্ষণে তিনি সামন্তর দিকে চোখ ফেরালেন। স্থির চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর প্রতিটি শব্দকে পৃথকভাবে উচ্চারণ করে খুব শান্ত গলায় বললেন, “শুধু কমলি কেন, কারও বাপ হওয়াই নকুল বিশ্বাসের পক্ষে সম্ভব ছিল না।”

সামন্ত বললেন, “আমি প্রমাণের কথা বলছিলুম। আপনি প্রমাণ দিতে পারেন?”

ভাদুড়িমশাই এতক্ষণ কোনও কথা বলেননি। চুপচাপ সব শুনে যাচ্ছিলেন : এবারে বললেন, “তা যে উনি দিতে পারেন, সে তো আগেই বলেছেন।”

কৌশিক বলল, “আপনার দেখছি অনেক কথাই শুনে থাকে না, মিস্টার সামন্ত। রোজ ব্রাহ্মীশাক খেতে শুরু করুন; শুনেছি ওতে মেমারি খুব বেড়ে যায়।”

ভাদুড়িমশাই তাঁর ভাগ্নেকে একটা মৃদু ধমক দিয়ে বললেন, “আঃ, এ-সব কী হচ্ছে কৌশিক? ছেলেমানুষি কোরো না।”

গঙ্গাধর সামন্তও পাল্টা কিছু-একটা বলবেন বলে কৌশিকের দিকে একবার জ্বলন্ত চোখে তাকিয়েছিলেন। কিন্তু ভাদুড়িমশাই নিজেই যেহেতু ভাগ্নেকে ধমকে দিয়েছেন, তাই তিনি আর কৌশিককে কিছু বললেন না, চাকলাদারের দিকে চোখ ফিরিয়ে বললেন, “মুখের কথায় তো চিঁড়ে ভিজবে না ডাক্তান চাকলাদার, আমাকে কেস সাজিয়ে পাবলিক প্রসিকিউটরের হাতে তুলে দিতে হবে; আমি প্রমাণ চাই।”

চাকলাদার বললেন, “ প্রমাণ দিতে না-পারলে কি আর এ-সব কথা কেউ বলে? তা হলে শুনুন মিস্টার সামন্ত, নকুল তার শরীরের ব্যাপারে যা-কিছু পরীক্ষা করাবার, তা আমাকে দিয়েই করিয়েছি। তার যে বাপ হবার ক্ষমতা নেই, সেই রিপোর্ট তাকে আমি দিয়েওছিলুম। রিপোর্টের ওরিজিন্যাল তার কাছে ছিল, আর কপিটা আমার ফাইলে। ওরিজিন্যালটা আপনারা নকুলের বাড়িতে খুঁজে দেখতে পারেন। তবে আমার ধারণা, সেখানে সেটা পাবেন না। আপনাদের কথাবার্তা যা শুনলুম, তাতে তো মনে হয়, বিষ্টুচরণ অতি ধুরন্ধর ব্যক্তি, রিপোর্টটা সে নিশ্চয় গায়েব করেছে।”

সামন্ত বললেন, “ তল্লাশি চালিয়ে দু’চারটে প্রেসক্রিপশন, নাসিংহোমের বিল আর টুকটাক কিছু ওষুধপত্রের ক্যাশমেমো পাওয়া গেছে, তবে অমন কোনও রিপোর্ট আমরা পাইনি।”

চাকলাদার বললেন, “কী করে পাবেন, ওরা সেটা সরিয়ে ফেলেছে। আমার আরও একটা ধারণার কথা আপনাদের বলব?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “নিশ্চয় বলবেন। এ-ব্যাপারে যা কিছু আপনার মনে হয়, সবই খুলে বলবেন। যে লোকটি খুন হয়েছে, আপনি তার ডাক্তার–আপনার প্রতিটি কথাই আমাদের শোনা দরকার।”

চাকলাদার একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন আবার। মনে হল, কথাটা বলতে তিনি একটু দ্বিধা বোধ করছেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য দ্বিধাটা কাটিয়ে উঠলেন তিনি। বললেন, “দেখুন, আমার ভুল হতে পারে, তবু ভেবে দেখলুম যে, বলাই ভাল। আপনারা হয়তো জানেন না যে, কাল রাত্তিরে আমার চেম্বারে চোর ঢুকেছিল।”

সামন্ত বললেন, “এঁরা না জানতে পারেন, কিন্তু আমি জানি। ভোরবেলায় আপনার ফোন পেয়ে তো আমি লোকও পাঠিয়ে দিয়েছিলুম আপনার চেম্বারে। …ওই যাঃ, নকুলকে আপনি যে রিপোর্ট দিয়েছিলেন, সেটা তো পাঁচ-নম্বর বাড়িতে আমরা পাইনি, কিন্তু তার একটা কপি তো আপনার কাছে আছে বলছিলেন, সেটাও কাল রাত্তিরে আপনার চেম্বার থেকে চুরি হয়ে যায়নি তো?”

চাকলাদার বললেন, “চেম্বারে কোনও দামি জিনিস থাকে না। থাকবার মধ্যে ছিল কিছু কাগজপত্র, নোটবই আর ডায়েরি। চোর সেগুলো নেয়নি, তবে ড্রয়ার, আলমারি আর যাবতীয় কাগজপত্র যেভাবে হাঁটকে দেখেছে, তাতে মনে হয়, কিছু একটা খুঁজে বার করতেই সে এসেছিল। মিস্টার সামন্ত, ওইসব কাগজপত্র তো চেম্বারের মেঝেয় ছত্রখান হয়ে পড়ে আছে। ওর উপরে, কি টেবিলের উপরকার কাচের ঢাকনায় কি আলমারির পাল্লায় কি অন্য কোথাও তার আঙুলের ছাপ থেকে যাওয়া কিছু বিচিত্ৰ নয়। আপনারা কি সে-কথা ভেবে দেখেছেন?”

সামন্ত হেসে বললেন, “আপনারা আমাদের কী ভাবেন বলুন তো? ফিঙ্গার প্রিন্ট নিয়ে চিন্তা করবেন না, ও-ব্যাপারে যা ইনস্ট্রাকশন দেবার, তা আমি দিয়ে এসেছি। দেখা যাক কোনও দাগি চোরের আঙুলের ছাপের সঙ্গে মিলে যায় কি না।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ডাক্তার চাকলাদার কোনও দাগি চোরের কথা ভাবছেন না। উনি ভাবছেন বিষ্টুচরণের কথা। ওঁর ধারণা, চেম্বারের কোথাও যদি আঙুলের ছাপ পেয়ে যান আপনারা, তো বিষ্টুর ফিঙ্গার প্রিন্টের সঙ্গে সেটা মিলেও যেতে পারে। কী ডাক্তার চাকলাদার, আমি কি ভুল বলছি?”

চাকলাদার বললেন, “মোটেই না। সব রিপোর্টেরই একটা কপি যে আমি ফাইল করে রাখি, বিষ্টু সেটা ভাল জানত।”

সামন্ত বললেন, “বটে?”

“কী করে জানত, বলি। বিষ্টুর একটু হাঁ, ‘নি-মতো আছে। অন্য সময়ে কষ্ট দেয় না বটে, তবে শীতকালে সেটা ওকে মাঝেমধ্যে ভোগার। ওর ডাক্তার ওকে তাই ব্লাড টেষ্ট করতে বলেছিলেন। তাঁর অ্যাডভাইস অনুযায়ী বিষ্টু আমার ল্যাবরেটরিতে টেস্টটা করিয়েছিল। তার রিপোর্ট আমি ওকে দিয়েওছিলুম। কিন্তু সেটা ও হারিয়ে ফেলে। আমাকে সে-কথা বলতে আমি বলি, ঠিক আছে, সব রিপোর্টেরই তো একটা কপি আমি ফাইল করে রাখি, এটাও আছে, কপি দেখে নতুন করে একটা রিপোর্ট লিখে দিচ্ছি। তো আমার ধারণা, নকুলকে যে রিপোর্ট আমি দিয়েছিলুম, বিষ্টু জানত যে, সেটার কপিও আমার কাছে রয়েছে, আর সেই কপিটা গায়েব করবার জন্যেই কাল রাত্তিরে সে আমার চেম্বারে এসে ঢুকেছিল। অবশ্য আমার ধারণাটা ভুলও হতে পারে।”

“ঢুকল কী করে?”

“জানলার কাচ খুলে। চেম্বারে তো আর দামি কিছু থাকে না। তাই জানালায় আর গ্রিলও বসাইনি।”

সামন্ত বললেন, “কপিটা গায়েব হয়ে যায়নি তো?”

চাকলাদার বললেন, “নিশ্চিন্ত থাকুন, সেটা দোতলায় থাকে। শুধু ওই একটা কপি নয়, যাবতীয় রিপোর্টের কপি আমার দোতলার ঘরে রাখি। ফলে সেটা খোয়া যায়নি। দরকার হলে জানাবেন, তার একটা জেরক্স কাল সকালেই আপনাকে পাঠিয়ে দেব।”

সামন্ত বললেন, “বাঃ, কাজ তো তবে চোদ্দো-আনাই মিটে গেল। বাকি রইল শুধু মার্ডার-ওয়েপনটা খুঁজে বরা করা। তা সেটারও একটা হদিস নিশ্চয় শিগগিরই করে ফেলতে পারব।”

কথাটা তিনি এমনভাবে বললেন যেন যাবতীয় হদিস এ-পর্যন্ত তিনিই করেছেন।

ডাক্তার গুপ্ত উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, “নটা বাজতে চলল, এবারে তা হলে যাওয়া যাক।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কাল আপনারা একটু সময় দিতে পারবেন?”

সামন্ত বললেন, “কেন বলুন তো?”

“ব্যাপারটা নিয়ে আর-একবার বসবার দরকার ছিল।”

“এইখানে?” গঙ্গাধর সামন্ত যেন আঁতকে উঠলেন। “না মশাই, আমরা সেন্ট্রাল ক্যালকাটার মানুষ, রোজ-রোজ অ্যাদ্দুর ঠেঙিয়ে আসতে পারব না।”

“এখানে আসতে হবে কে বলল?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “খুন যেখানে হয়েছে, সেই জায়গাটা তো আমি এখনও দেখিইনি। তাই ভাবছিলুম যে, কাল বিকেল ছ’টায় আমরা কিরণবাবুর বাড়িতে বসব। আপনি যে-সব খাতা আর কাগজপত্র সিজ করেছেন, সেগুলোও না হয় তখনই ফেরত দেওয়া যাবে। আজ সেগুলো আমার কাছেই থাক। কোনও আপত্তি নেই তো?”

গঙ্গাধর সামন্ত হেসে বললেন, “কিচ্ছু না। তবে হ্যাঁ, একটা কথা। জলখাবারের ব্যবস্থাটা যেন এইরকম হয়।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “নিশ্চিন্ত থাকুন, ওটা এর চেয়ে ঢের ভাল হবে। কিরণবাবুর স্ত্রী বাসন্তীকে আমি অনেক কাল ধরে দেখছি তো, অমৃত যে কাকে বলে, কালই আপনারা বুঝতে পারবেন।”

এবারে আমার আঁতকে ওঠার পালা। একে তো বাড়িতে গ্যাস নেই, কালকের মধ্যে সিলিন্ডারটা পাব কি না, তাও জানি না, তার উপরে আবার দিন কয়েক বাদেই মেয়ের পরীক্ষা শুরু হবে, এই সময়ে বাড়িতে বৈঠক বসছে শুনলে বাসন্তী না খেপে যায়।

অরুণ সান্যাল আর মালতী এসে দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের কাছে বিদায় নিয়ে আমরা নীচে নেমে এলুম। ডাক্তার গুপ্তকে নিয়ে সামন্ত তাঁর জিপে উঠলেন, আমি উঠলুম চাকলাদারের মরিস মাইনরে।

সেলফের চাপি ঘোরাতেই ইঞ্জিন গোঁ-গোঁ করে উঠল। চাকলাদার বললেন, “ব্যাটা একেবারে বাঘের বাচ্চা! চলুন, মনটা হালকা হয়ে গেছে, একটু ঘুরপথে আজ বাড়ি ফিরব।”

“ঘুরপথে মানে?”

“পার্ক সার্কাস থেকে আর লোয়ার পার্কুলার রোড ধরব না, ডাইনে ঘুরে চার-নম্বর ব্রিজ পেরিয়ে বাইপাস ধরব। তারপর স্টেডিয়ামের কাছে বাঁয়ে টার্ন নিয়ে বেলেঘাটা মেন রোড ধরে শেয়ালদা ফ্লাই-ওভারে উঠলেই তো আমাদের পাড়ায় পৌঁছে যাচ্ছি?”

“ওরে বাবা, সে তো বিস্তর পথ।”

“পথ অবশ্যই বেশ কয়েক কিলোমিটার বেশি, তবে সময় লাগবে কম। একেবারে উড়ে চলে যাব। তা ছাড়া গাড়ির মেরামতিটা কেমন হল, তারও একটা পরীক্ষা হয়ে যাবে।”

বাইপাসে পড়েই অ্যাকসিলেটারে চাপ বাড়ালেন চাকলাদার। পুরনো আমলের গাড়ি, কিন্তু মনে হল যেন সতিই তার দু’পাশে দুটো ডানা গজিয়ে গেছে। পাস দেবার জন্যে পিছন থেকে একটা লরি ক্রমাগত হর্ন বাজিয়ে যাচ্ছিল, খানিক বাদে পিছনে তাকিয়ে সেটাকে আর দেখতে পেলুম না।

আধ ঘন্টার মধ্যেই পীতাম্বর চৌধুরি লেনে পৌঁছে গেলুম। সারাটা পথ চাকলাদার আর কোনও কথা বলেননি। এতক্ষণে তিনি মুখ খুললেন। রাস্তার একধারে গাড়িটাকে দাঁড় করিয়ে বললেন, “নকুল বিশ্বাস যে একটা ভুল বিশ্বাস নিয়ে তারা গেল, সেটা ভেবে দেখেছেন?”

“অর্থাৎ?”

“বুঝতে পারছেন না?” তিক্ত হেসে চাকলাদার বললেন, “বিষ্টুকে সে যমুনার মামাতো ভাই বলেই জানত। এদিকে সে নিজেকে পরীক্ষা করিয়ে জেনে গিয়েছিল যে, যমুনা বাঁজা নয়, আসলে তার নিজেরই নেই বাপ হবার ক্ষমতা। ফলে, যমুনা যখন প্রেগন্যান্ট হল, আর তারও কিছুকাল বাদে যমুনার মেয়ের মুখে যখন স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠল বিষ্টুচরণের মুখের আদল, নকুল তখন ধরেই নিল যে, মামাতো-পিসতুতো ভাইবোনের মধ্যে একটা ইনসেসচুয়াস সম্পর্কের জন্যেই এটা হয়েছে। আরে মশাই, বিষ্টু যে যমুনার মামাতো ভাই নয়, এটাই সে জানত না।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *