শ্যামনিবাস-রহস্য (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(১৮)

সবাই একেবারে চুপ। কেউ কোনও কথা বলছি না। প্রথম কিস্তির চা আর জলখাবার অনেকক্ষণ আগেই শেষ হয়েছে। এবারে দ্বিতীয় কিস্তির চা নিয়ে মালতীদের কাজের লোকটি এসে ঘরে ঢুকল। হাত বাড়িয়ে ট্রে থেকে তাঁর চায়ের পেয়ালা তুলে নিলেন গঙ্গাধর সামন্ত। পেয়ালায় চুমুক দিয়ে বললেন, “গোটা ব্যাপারটাই দেখছি অন্যদিকে ঘুরে যাচ্ছে।”

কৌশিক বলল, “মজাটা কী জানেন? বিষ্টুচরণের বাবার সঙ্গে আমি দেখা করেছিলুম। নিজের পরিচয় অবশ্য দিইনি। বলেছিলুম যে, ‘ কলকাতায় তাঁর ছেলের সঙ্গে আমার খুব চেনাশোনা, মাঝে-মঝেই আমাদের দেখা সাক্ষাৎ হয়। তাতে বিষ্টুচরণের বাবা যা বললেন, তাতে তো আমি অবাক। ভদ্রলোক আমাকে জিজ্ঞেস করলেন যে, বিষ্টু যেখানে থাকে, সেই হোটেলে তো খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা খুব ভাল নয়, সে কি এর মধ্যে নতুন কোনও হোটেলের সন্ধান পেয়েছে?”

সামন্ত বললেন, “তার মানে? বিষ্টু যে গত তিন বছর ধরে নকুলের বাড়িতে রয়েছে, তার বাবা তা জানেই না?”

কৌশিক বলল, “জানেন না বলেই তো মনে হল। ভদ্রলোকের ধারণা, বিষ্টু হোটেলে থাকে। কথায়-কথায় হোটেলটার নামও বললেন তিনি। মির্জাপুর এলাকার হোটেল। নাম ‘শান্তিধাম’। বিষ্টুর নামে ফি মাসে তিনি ওই হোটেলের ঠিকানাতেই টাকা পাঠান। চিঠিও লেখেন ওই ঠিকানাতেই।”

সামন্ত বললেন, “এখান থেকে একটা ফোন করতে পারি?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বিলক্ষণ। কিন্তু তার দরকার হবে না। থানায় ফোন করে হোটেলে খোঁজ নিতে বলবেন তো?”

“হ্যাঁ।”

“কিচ্ছু দরকার নেই। আজ সকালেই কৌশিক ওখানে গিয়েছিল। হোটেলের ম্যানেজার বললেন, বিষ্ণু ওখানে থাকে না, তবে হোটেলের ঘরটাও সে ছাড়েনি। প্রতি সোমবারে একবার করে সে হোটেলটায় যায়। চিঠিপত্র থাকলে নিয়ে আসে।”

“কিন্তু টাকা?” সামন্ত বললেন, “বাবার কাছ থেকে তো নিয়মিত তার নামে টাকা আসে, হোটেলে তার হয়ে সে-টাকা রিসিভ করে কে?”

“সে-খবরও কি আর নেওয়া হয়নি ভাবছেন? টাকা রিসিভ করে হোটেলের ম্যানেজার। তাকে ‘লেটার্ অভ্ অথরিটি’ দেওয়াই আছে। না, সামন্তমশাই, হোটেলে লোক পাঠাবার দরকার নেই। তবে হ্যাঁ, থানায় একটা ফোন বোধহয় করাই ভাল। জানিয়ে দিন যে, পীতাম্বর চৌধুরি লেনে যে-লোকটাকে আপনি পাহারায় রেখেছেন, এক্ষুনি লোক পাঠিয়ে তাকে একটা কথা বলে দেওয়া দরকার।”

“কী বলে দিতে হবে?”

“বলতে হবে যে, বিষ্টুকে সে যেন বাড়ি থেকে আপাতত বেরুতে না দেয়। কথাটা বলছি কেন জানেন? সাধারণত সোমবার-সোমবার বিষ্ণু ওই হোটেলটায় যায় বটে, কিন্তু বলা তো যায় না, হঠাৎ যদি সে আজ একবার যায় ওখানে, আর গিয়ে শোনে যে, তার সম্পর্কে ওখানে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে, তা হলে সে যে ভয় পেয়ে গা-ঢাকা দেবে না, তার তো কোনও নিশ্চয়তা নেই। নাঃ, কথাটা আমার আগেই ভাবা উচিত ছিল।”

সামন্তমশাই উঠে গিয়ে ফোন করে ফের ফিরে এলেন। তারপর ধপাস করে তাঁর সোফাটায় বসে পড়ে বললেন, “ওরেব্বাবা, এ তো দেখছি ভয়ঙ্কর ব্যাপার! কেস তো একেবারেই ঘুরে গেল! আর আমি কিনা ভাবছি সদানন্দ বসুই কালপ্রিট, আর-একটু চাপ দিলেই তাঁর কাছ থেকে কনফেশনটা আদায় করে নেওয়া যেত।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আর-একটু চাপ মানে? খানিকটা চাপ কি অলরেডি দিয়েছেন নাকি? পুরো পাঁচদিন তো ভদ্রলোককে একেবারে মুঠোর মধ্যে আপনি পেয়েছিলেন। কনফেশন আদায় করবার জন্যে থার্ড ডিগ্রির ব্যবস্থা করেননি তো?”

গঙ্গাধর সামন্ত বললেন, “আরে না না, আপনারা কি আমাদের অমানুষ ভাবেন নাকি? মারধরের কথা ভাবছেন নিশ্চয়? ও-সব কিছু হয়নি। ওই আমাদের কস্টেবল রামশরণ পান্ডেকে দিয়ে দু-চারটে চড়-থাপ্পড় মারাবার ব্যবস্থা করেছিলুম মাত্র, তাকে নিশ্চয়ই মারধর বলবেন না আপনারা? ওটুকু তো করতেই হয়।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ছি ছি, মানী লোক, বয়সও হয়েছে সত্তর বছর, তাঁকে চড়-থাপ্পড় লাগাবার ব্যবস্থা করলেন? ছিছি, মিস্টার সামন্ত, কাজটা মোটেই ভাল করেননি।”

সামন্ত কুণ্ঠিতভাবে বললেন, “তা নিশ্চয় করিনি। কিন্তু কী করব বলুন, আমি তো ধরেই নিয়েছিলুম যে, এটা একেবারে ‘ওপ্‌ন অ্যান্ড শাট’ কেস।”

কৌশিকের সবই ভাল, কিন্তু একটু মুখফোঁড়। গঙ্গাধর সামন্তের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে সে বলল, “আজকাল খুব অ্যামেরিকান ক্রাইম-স্টোরি পড়ছেন বুঝি?”

গঙ্গাধর সামন্ত বললেন, “কেন, কেন, এ-কথা বলছেন কেন?”

কৌশিক বলল, “না… মানে মার্কিন গোয়েন্দা-গল্পে ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নিরা প্রায়ই ও-রকম ধরে নেয় কিনা, তাই বলছি। তবে শেষ পর্যন্ত অবশ্য দেখা যায় যে, তারা সাপ ধরতে গিয়ে ব্যাং ধরেছিল।”

সামন্ত বললেন, “ঠাট্টা করছেন? করুন। ভুল যখন একটা হয়েই গেছে, তখন এই ধরনের কথা তো কিছু শুনতেই হবে। কিন্তু একটা কথা আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ভুল সকলেরই হতে পারে। আমিও বিস্তর ব্যাপারে বিস্তর ভুল করেছি। ভুল এক্ষেত্রে কৌশিকেরও হতে পারত। বিষ্ণুহাটিতে গেলেই যে নির্ভুল নিশানা মিলবে, ও-ই কি সেটা জানত নাকি? সত্যটা যে কী সেটা তো আর ও হিসেব কষে বার করেনি, ভাগ্য ওকে সাহায্য করেছে, হি জাস্ট্ স্টাম্বলড অন ইট।”

বুঝতে পারলুম যে, সামন্তকে একটা মারাত্মক লজ্জার হাত থেকে বাঁচাবার জন্যেই ভাদুড়িমশাই এ-কথা বলছেন। নয়তো আমি ভালই জানি যে, ভাদুড়ি মশাইয়ের প্রতিটি পদক্ষেপ একবারে হিসেব কষে করা। তিনি ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন যে, সদানন্দবাবু খুনি নন। তা হলে বাকি থাকে যমুনা আর বিষ্টুচরণ। খুন করবার সুযোগ ছিল তাদেরও। শুধু খুনের কোনও মোটিভ তাদের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছিল না। সেই মোটিভের সন্ধানেই কৌশিককে তিনি রহমতপুরে আর বিষ্টুহাটিতে পাঠিয়েছিলেন।

ভাদুড়িমশাই একটা সিগারেট ধরালেন। তারপর সামন্তকে বললেন, “কোন্ কথাটা আপনি বুঝতে পারছেন না বলুন তো। দেখি বুঝিয়ে দিতে পারি কি না। পারব যে, এমন কথা বলছি না কিন্তু, তবে চেষ্টা করতে পারি।”

সামন্ত বললেন, “বিষ্টুচরণের সঙ্গে যমুনার বিয়ের কথা হয়েছিল তা অন্তত দশ বছর আগে। অর্থাৎ এটা অনেক দিনের পুরনো ব্যাপার। অথচ কার্যত দেখছি, সেই পুরনো ব্যাপারের জের দশ বছর বাদেও মেটেনি। সত্যি কি এমন হতে পারে নাকি? হওয়া সম্ভব?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কথাটা আপনি মন্দ বলেননি। এমন প্রশ্ন উঠতেই পারে। তবে কী জানে, ব্যাপারটা পুরনো হলেও প্রেমটা পুরনো নয়। আগুনটা ধিকিধিকি জ্বলছিলই। জ্বলত না, যদি যমুনা মাঝে-মাঝেই বাপের বাড়িতে না যেত। কিন্তু সে যেত, আর গাঁয়ের লোকেরা যদি না মিথ্যে ক বলে থাকে, তবে বিষ্টুচরণের সঙ্গে তখন দেখাসাক্ষাৎও হত তার। অর্থাৎ প্রেমের আগুনটা একেবারে নিবে যাবার সুযোগই ইতিমধ্যে পায়নি। আর তারপরে তো বিষ্টুচরণ কলকাতাতেই চলে এল। কিছুদিন একটা হোটেলে কাটিয়ে তারপর উঠলও গিয়ে নকুলের বাড়িতে। ফলে এতদিন যা ধিকিধিকি করে জ্বলছিল, সেই আগুন একবারে দাউদাউ করে জ্বলে উঠল!”

সামন্তমশাই বললেন, “তা তো বুঝলুম, কিন্তু নিজের শালাটিকে তো দূর-দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছিল নকুল। তা হলে যমুনা যাকে মামাতো ভাই বলছে, সেই মামাতো শালাটিকে সে তার ঘাড়ে চেপে বসতে দিল কেন? তাকেও তো নকুল ঘাড়ধাক্কা দিয়ে তাড়াতে পারত। বলুন, পারত না?”

“তা পারত বই কী।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু তাড়ায়নি কেন, তাও তো আপনার না-বুঝবার কথা নয়। নকুলের জমাখরচের যাবতীয় খাতা তো আপনি সিজ করেছেন; আমি দেখতে চেয়েছিলুম বলে কৌশিকের হাত দিয়ে সেগুলো পাঠিয়েও দিয়েছেন আমার কাছে। তা আপনি নিজে কি সেগুলি একবারও পড়ে দেখেননি?”

সামন্ত বললেন, “নিশ্চয় পড়েছি। কেন, ওর মধ্যে কিছু আছে নাকি?”

“আছেই তো। গত তিন বছর ধরে প্রত্যেক মাসের একেবারে পয়লা তারিখেই দেখবেন জমার ঘরে লেখা রয়েছে বি—৫০০.০০ টাকা। ওটার অর্থ বোধহয় আপনি বুঝতে পারেননি। বি মানে বিষ্টুচরণ। প্রতিমাসে সে তার খাইখরচা বাবদ নকুলের হাতে পাঁচশো টাকা তুলে দিত। থাকত মাছের আড়তের এক কোণে, খেতও এমন-কিছু হাতি-ঘোড়া নয়, অথচ তারই জন্যে মাসে-মাসে লোকটা পাঁচশো টাকা দিয়ে যাচ্ছে। এমন হাতের লক্ষ্মীকে কেউ পায়ে ঠেলতে পারে? নকুলও পারেনি। তবে আমার ধারণা, টাকার লোভে বিষ্টুচরণকে সে তার বাড়িতে থাকতে দিয়েছিল বটে, তবে শেষের দিকে হয়তো একটু-একটু সন্দেহ করতে শুরু করেছিল। চেঁচামেচির সেটাই সম্ভবত মস্ত কারণ।”

ভাদুড়িমশাই একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। সিগারেটটা নিবে গিয়েছিল। অ্যাশট্রেতে পিষে দিলেন সেটাকে। তারপর বললেন, “আমার ধারণা, মাঝরাত্তিরে মত্তাবস্থায় বাড়িতে ফিরে চেঁচামেচি করবার সময়ে যমুনা আর বিষ্টুচরণের সম্পর্ক নিয়ে ইদানীং এমন দু-একটা কথাও সে হয়তো বলতে শুরু করেছিল, যাতে ওরা ভয় পেয়ে যায়। হয়তো তখন থেকেই ওরা নকুলকে সরিয়ে দেবার প্ল্যান আঁটতে থাকে। সদানন্দ যে নকুলকে তাড়াতে চাইছিলেন, জল আর লাইট কেটে দিয়েছিলেন, তাতে আরও সুবিধে হয়ে যায় ওদের। ওরা বুঝতে পারে, নকুল যদি খুন হয়, তা হলে সন্দেহটা সরাসরি সদানন্দবাবুর উপরে গিয়ে পড়বে। সামন্তমশাই, ওরা যে ভুল বুঝেছিল, অন্তত আপনি তো সে-কথা বলতে পারেন না। আপনি যে সদানন্দ বসুকেই খুনি বলে ধরে নিয়েছিলেন, তাতে তো আর সন্দেহ নেই।… না না, আমি আবার বলছি যে, আপনি অত লজ্জিত হবেন না। এ-ভুল আমারও হতে পারত। কেন হয়নি জানেন?

ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “কেন?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমার যে ভুল হয়নি, তার মস্ত কারণ, সদানন্দ বসুর পক্ষে লাঠি দিয়ে যে একটা লোকের মাথা ফাটানো সম্ভব নয়, সেটা আমি বুঝতে পেরেছিলুম।”

“লোহার-বল-বসানো লাঠি দিয়েও না?”

“না, তাও নয়। জানি, আপনারা কী বলবেন। আপনারা বলবেন যে, বয়স সত্তর হলেও সদানন্দ বসুর স্বাস্থ্য টসকায়নি। কিন্তু তাঁর চোখের কথাটা আপনারা ভুলে যাচ্ছেন কেন? কিরণবাবুর কাছেই শুনেছি যে, মাত্রই কিছুকাল আগে ছানি কাটিয়েছেন সদানন্দবাবু, কিন্তু আগের মতো দৃষ্টিশক্তি এখনও ফিরে পাননি। এখন আপনারাই বলুন, যাঁর দৃষ্টিশক্তি বিশেষ ভাল নয়, আর স্বাস্থ্য মোটামুটি পোক্ত হলেও বয়েস অন্তত সত্তর, সেই মানুষের পক্ষে কি মাত্রই এক-হাতে লাঠি চালিয়ে কারও মাথা ফাটানো সম্ভব?”

সামন্ত বললেন, “দু-হাতে চালাতে বাধা কোথায়?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বাধা থাকত না, যদি কিনা তাঁর দুটোর বদলে তিনটে হাত থাকে। কিন্তু মুশকিল এই যে, যেমন আমাদের তেমনি সদানন্দবাবুরও হাত মাত্র দুটি। তার মধ্যে একটা হাতে যদি টর্চ ধরে থাকতে হয় তো লাঠি চালাবার জন্যে দুটো হাতের সাহায্য তিনি পাবেন কী করে?”

“সিঁড়ির আলো জ্বেলে রাখলে কিন্তু টর্চ জ্বালবার দরকার হয় না।”

“কিন্তু যাকে খুন করা হবে, তাকে সাবধান করে দেওয়া হয়। বাথরুমের দরজা খুলে বেরিয়ে আসবার আগেই নকুল যদি দেখে যে, সিঁড়ির উপরকার ইলেকট্রিক আলোয় সব একেবারে ঝলমল করছে, তা হলে দরজা থেকেই সে সিঁড়ির দিকে তাকাবে নিশ্চয়, আর তখনই সদানন্দবাবুকে দেখতেও পেয়ে যাবে। তখন আর তার মাথা ফাটানো অত সহজ হবে না।”

ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “কিন্তু এমন যদি হয় যে, সদানন্দের স্ত্রীও এর সঙ্গে জড়িত?”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “অর্থাৎ কিনা অন্ধকারে যেই নকুলচন্দ্র বাথরুম থেকে বেরিয়েছে, কুসুমবালাও অমনি দোতলা থেকে সুইচ টিপে সিঁড়ির আলো জ্বেলে দিয়েছেন, আর সদানন্দও অমনি দু’হাতে চালিয়েছেন লাঠি? না মশাই, ইউ আর স্ট্রেচিং ইয়োর ইমাজিনেশান টু মাচ্! একে তো কুসুমবালা বাতের রুগি, ভাল করে নড়াচড়াই নাকি করতে পারেন না, তার উপরে আবার তাঁরও বয়স অন্তত পঁয়ষট্টি। দুই অ্যামেচার বুড়োবুড়ি মিলে এইভাবে গোটা ব্যাপারটাকে একেবারে কাঁটায়-কাঁটায় সিনক্রোনাইজ করে একজনকে খুন করেছে, এ-কথা ভাবা-ই চলে না।”

সামন্ত বললেন, “অর্থাৎ আপনি বলতে চান যে, বিষ্টুচরণই খুনি?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তার পক্ষেও এ-কাজ করা সম্ভব হয় না, যদি না সে যমুনার সাহায্য পায়। তা, খবর যা মোটামুটি জোগাড় হয়েছে তাতে তো মনে হয় যমুনা তাকে সাহায্য করতেই পারে।”

সামন্ত বললেন, “ঠিক আছে, আজই ওদের দুজনকে অ্যারেস্ট করে হাজতে ঢোকাবার ব্যবস্থা করছি।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ও-কাজ এখুনি করবেন না। আগে মার্ডার-ওয়েপনটা খুঁজে বার করা চাই। আপাতত ওদের কড়া পাহারায় রাখুন, গ্রেফতার করবার দরকার নেই। তা ছাড়া নকুলের যে একটা দু’বছরের মেয়ে রয়েছে, তার কথাটাও ভাবুন। বিষ্টু আর যমুনাকে যদি হাজতে ঢোকান, তো ওই দুধের বাচ্চাটাকেও যে মায়ের কাছছাড়া করা যাবে না, সেটা কি ভেবে দেখেছেন?”

একজন এতক্ষণ একটিও কথা বলেননি, এককোণে বসে চুপচাপ অন্যদের কথা শুনে যাচ্ছিলেন। তিনি ডাক্তার চাকলাদার। এইবারে তিনি মুখ খুললেন। বললেন, “মিস্টার ভাদুড়িকে একটা কথা বলব বলেই আজ আমি এখানে এসেছি। ভেবেছিলুম, কথাটা একমাত্র উনিই জানবেন। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, আপনারা জানলেও ক্ষতি নেই। শুধু দয়া করে বলুন, কথাটা আপনারা আর কাউকে জানাবেন না।”

ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “যদি বুঝি যে, কথাটা আর-কাউকে জানাবার দরকার নেই, তা হলে নাহক কেন জানাতে যাব? কী বলবেন বলে ফেলুন মশাই।”

ডাক্তার চাকলাদার বললেন, “একটু আগে কমলির কথা হচ্ছিল। আপনাদের ধারণা, ও নকুলের মেয়ে। সেটা ভুল ধারণা।”

গঙ্গাধর সামন্ত বললেন, “কী বলছেন আপনি?”

“ঠিকই বলছি। যমুনা ও-মেয়ের মা হতে পারে, কিন্তু নকুল বিশ্বাস ওর বাপ নয়।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *