শ্যামনিবাস-রহস্য (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(১৭)

কৌশিক বলল, “সোমবারে দুপুর ঠিক দেড়টার সময় আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ি। যা গরম, তাতে গাড়ি না-নিয়ে ট্রেনে গেলেই ভাল হত। কিন্তু আমি বুঝে গিয়েছিলুম যে, বিস্তর ঘোরাঘুরি করতে হবে, তাই গাড়িতেই যাই। একটু ঘুরপথে গিয়েছিলুম। পাছে হাওড়ায় ঢুকে ট্র্যাফিক-জ্যামে আটকে যাই, তাই বি.টি. রোড ধরে, দক্ষিণেশ্বরে গঙ্গা পেরিয়ে, খানিকটা এগিয়ে বাঁদিকে টার্ন নিয়ে লিঙ্ক রোড দিয়ে এন. এই সিক্স ধরে এগোই। তাতে বেশ কয়েক মাইল বেশি কভার করতে হল বটে, কিন্তু ট্র্যাফিক জ্যামে পড়তে হল না বলে বিকেল পাঁচটার মধ্যেই রহমতপুরে পৌঁছে গেলুম।”

ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “ওইখানেই তো নকুলদের বাড়ি, তাই না?”

কৌশিক বলল, “হ্যাঁ। কুড়ি-পঁচিশ ঘর লোক নিয়ে ছোট্ট গ্রাম। মেচেদা ছাড়িয়ে এন. এইচ. সিক্স ধরে আরও খানিকটা এগিয়ে ডাইনে একটা কাঁচা রাস্তায় নেমে একটু ভিতরে ঢুকে যেতে হয়। বিশ্বাসদের বাড়িতে যাব বলতে একটা লোক আমাকে বাড়িটা দেখিয়ে দিল। তো সেখানে নকুলের এক ভাই থাকে। বড় ভাই। বয়েস মনে হল পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন। অবস্থা যে মোটেই সুবিধের নয়, সে তার জামাকাপড় আর চেহারা দেখলেই বোঝা যায়। নিজের থেকেই লোকটা সে-কথা বললও। নাম শুনলুম যুধিষ্ঠির।”

“সুতরাং যা বলল, তা যে মিথ্যে, এম কথা ভাবা-ই চলে না!” ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “কিন্তু যুধিষ্ঠিরের অন্য সব ভাই, মানে ভীম অর্জুন আর সহদেব, তারা কোথায় থাকে?”

কৌশিক হেসে বলল, “কথাটা নেহাত মন্দ বলেননি। নকুলের বাবার সম্ভবত পাঁচ ছেলেরই প্ল্যান ছিল, তবে নকুল অব্দি এগিয়ে তিনি মারা যান, ফলে সহদেব আর জন্মাতেই পারল না। চার ছেলের নাম অবশ্য মহাভারতের সঙ্গে মিলিয়ে রাখা। যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন আর নকুল। ভীম আর অর্জুন কোথায় থাকে, যুধিষ্ঠিরের তা জানা নেই। নকুলের খবরও বছর দশেক রাখেন না। আগে-আগে মাঝে-মধ্যে দাদাকে পাঁচ-দশ টাকা পাঠাত; বিয়ে করবার পর থেকে সেটা বন্ধ হয়ে যায়।”

গঙ্গাধর সামন্ত বললেন, “নকুল যে মারা গেছে, এই খবর শুনে কী বলল?”

কৌশিক বলল, “সেটাই তো তাজ্জব ব্যাপার! বলল, ‘তাই বুঝি? তা হবে।’ মানে রি-অ্যাক্টই করল না। অথচ, নকুল তার ছোট ভাই! ভাবা যায়? কী হয়েছিল, তাও পর্যন্ত জিজ্ঞেস করল না।”

ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “তারপর?”

“তারপর আর কী, সেখান থেকে চলে এলুম। সন্ধে হয়ে গিয়েছিল, তাই সেদিন আর উজিয়ে আসিনি। উজিয়ে এলে লাভ হত না। রাত করে যদি বিষ্ণুহাটিতে পৌঁছতুম, তো যমুনার বাপের বাড়িটা নিশ্চয় খুঁজে পাওয়া যেত, তবে অসুবিধেয় পড়তুম রাত কাটাবার জায়গা নিয়ে। সে-দিন তাই নদীর ও-পারে দাইনানেই রয়ে গেলুম আমি।”

“জায়গা পাওয়া গেল?”

“ও-সব নিয়ে কোনও সমস্যা হয়নি।” কৌশিক বলল, “হাওড়া আর মেদিনীপুর, দুটো জেলার দুই এস.পি.-কেই মামাবাবু ফোন করে দিয়েছিলেন তো; কোথায় কোথায় যাব, তাও তাঁদের জানিয়ে দিয়েছিলেন। তা রহমতপুরেই দেখলুম পুলিশের একজন লোক আমার জন্যে অপেক্ষা করছে। দাইনান তো রূপনারানের ধারে। সে-ই সেখানে একটা বাংলোয় পৌঁছে দিয়ে গেল আমাকে।”

ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “তা রাতটা সেখানে কাটিয়ে তারপর মঙ্গলবার ভোরবেলাতেই নদীর এ-পারে বাগনানে চলে এলে?”

কৌশিক বলল, “একেবারে ভোরবেলাতেই যে দাইনান থেকে বেরিয়ে পড়েছিলুম, তা নয়। দেখলুম, দুপুরের খাওয়াটা দাইনান থেকে চুকিয়ে যাওয়া ভাল। বাগনানে পৌঁছলুম দেড়টা-দুটো নাগাদ। সেখানে প্রথমেই গেলুম থানায়। থানা অফিসার বললেন, হাওড়ার এস.পি. তাঁকে সোমবারেই জানিয়ে রেখেছেন যে, আমি বাগনানে গিয়ে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করব। চমৎকার লোক, বললেন যে, দরকার হলে তিনি আমার সঙ্গে একজন লোক দিতে পারেন। বিষ্ণুহাটির পথের ডিরেকশান তো তাঁর কাছেই পেলুম। জিপও দিতে চাইলেন। আমি বললুম, বৃষ্টি তো আর হয়নি, রাস্তা জায়গায়-জায়গায় কাঁচা বটে, তবে কাদা-টাদা যখন নেই, একেবারে শুকনো খটখটে, তখন আর জিপ নেব না। আর তা ছাড়া পুলিশের জিপ নিয়ে গেলে অসুবিধে হতে পারে, ভয় পেয়ে লোকে হয়তো কথাই বলতে চাইবে না। আর, কেউ যদি না কথাই বলে তো খবর পাব কী করে?”

গঙ্গাধর সামন্ত বললেন, “খবর পাওয়া গেল?”

কৌশিক বলল, “তা গেল বই কী। মারাত্মক সব খবর। আসলে রহমতপুরে যে এক্সপিরিয়েন্স হয়েছিল, তাতে আমি একটু দমেই গিয়েছিলুম। ভেবেছিলুম যে, এখানেও ওই একই ব্যাপার হবে। তা কিন্তু হল না। বিষ্ণুহাটিতে গিয়ে পৌঁছবার পর ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই একটার পর একটা খবর পেতে লাগলুম! খবর তো নয়, তাজা এক-একটা বোমা!”

সামন্তমশাই নড়ে-চড়ে বসলেন। বললেন, “তার মানে?”

“বলছি, সব বলছি।” কৌশিক তার পকেট থেকে একতাড়া কাগজ বার করে বলল, “বুধবার অর্থাৎ গতকাল সারাটা সকাল নৌপালার বাংলোয় বসে এই রিপোর্ট তৈরি করেছি। যাবতীয় খবর রয়েছে এখানে। সব ডিটেল্‌সে বলব?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “রিপোর্টটা আমি কালই পড়েছি। আপনারা আপাতত সংক্ষেপে সব শুনুন। রিপোর্টটা না হয় পরে সময় করে দেখে নেবেন।”

কাগজের তাড়া পকেটে পুরে কৌশিক বলল, “সেই ভাল। খবরগুলো আপাতত সংক্ষেপে বলছি। আমার প্রথম খবর বিষ্টুচরণ আর যমুনার সম্পর্ক মোটেই মামাতো-পিসতুতো ভাইবোনের নয়।”

সামন্ত বললেন, “সে কী!”

“ওদের বাড়ি একই গ্রামে। যমুনার চেয়ে বিষ্টু বছর চার-পাঁচের বড়, তাই ‘দাদা’ বলত। ও-সব মামাতো-ভাইটাই স্রেফ বাজে কথা। যমুনার সঙ্গে বিষ্টুর বিয়ের কথাও হয়েছিল, কিন্তু সেটা ভেস্তে যায়।”

ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “কেন?”

কৌশিক বলল, “সেটাই হচ্ছে দ্বিতীয় খবর। আপনাদের ধারণা বিষ্টুর অবস্থা খুব খারাপ, চাকরি-বাকরির চেষ্টায় কলকাতায় এসে সে তাই তার ভগ্নিপতির কাছে আশ্রয় নিয়েছিল।”

গঙ্গাধর সামন্ত বললেন, “কথাটা ঠিক নয়?”

“মোটেই ঠিক নয়।” কৌশিক বলল, “বিষ্টু খুবই ধনী পরিবারের ছেলে। গাঁয়ের লোকেদের কাছে শুনলুম, স্বনামে-বেনামে বিষ্টুর বাবার বিস্তর জমিজমা তো আছেই, তার সঙ্গে আছে তেজারতি ব্যাবসা। গয়নাগাঁটি বন্ধক রেখে তিনি গাঁয়ের মানুষকে টাকা ধার দেন। সুদের হার অসম্ভব রকমের চড়া, ফলে সুদে-আসলে মিলিয়ে অঙ্কটা যা দাঁড়ায়, তাতে বারো-আনা লোকের পক্ষেই আর পাওনাগন্ডা মিটিয়ে তাদের গয়নাগাঁটি ফেরত নেওয়া সম্ভব হয় না; বিষ্টুর বাবা কেষ্টচরণের লোহার সিন্দুকে জমতে-জমতে সেগুলো পাহাড় হয়ে যায়।”

সামন্ত বললেন, “বিষ্ণু যে বড়লোকের ছেলে, নকুল তা জানত না? এ তো বড় তাজ্জব কথা আরে মশাই, নকুল তো ওই গ্রামেরই জামাই। মাঝেমধ্যে শ্বশুরবাড়িতে যেতও নিশ্চয়। তা হলে সে এটা জানবে না কেন?”

“সেইটেই তো মজার ব্যাপার।” কৌশিক বলল, “আপনি বলছেন, শ্বশুরবাড়িতে মাঝে-মধ্যে যেত নকুল। মানে এটাই আপনার বিশ্বাস। তা বিশ্বাসটা যে একেবারে অবাস্তব, তাও নয়। কিন্তু গ্রামের লোকরা বলছে, সেই যে বিয়ের রাত্তিরে নকুল বিষ্ণুহাটিতে গিয়েছিল, তারপর আর একবারও সে ও-মুখো হয়নি।”

ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “বলো কী হে?”

কৌশিক বলল, “আমি কিছুই বলছি না। গাঁয়ের লোকেদের কাছে যে খবর পেয়েছি, সেটাই আপনাদের শোনাচ্ছি মাত্র।”

ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “নকুল কেন শ্বশুরবাড়ি যেত না, সে-সব কথা কিছু জানতে পারলে?”

“জানবার চেষ্টা করেছিলুম। তবে যাকেই জিজ্ঞেস করেছি, সে-ই বলেছে যে, কেন যেত না তা সে জানে না।”

“যমুনার বাপের বাড়ির অবস্থা কেমন”“

“খুব খারাপ। নুন আনতে পান্তা ফুরোয় বলে একটা কথা আছে না? প্রায় সেইরকম।”

“বাপ-মা বেঁচে আছে?”

“বিয়ের সময় বেঁচে ছিল, তার কিছুদিন পরেই তারা মারা যায়। থাকবার মধ্যে ভিটের উপরে একটি ঘর আছে। আর আছে একটা ভাই। তার সঙ্গে দেখা করেছিলুম। কাছেই একটা ইটখোলায় সে মজুর খাটে।”

“সে কিছু বলল?”

“ভগ্নিপতির নাম করতেই খেপে গেল সে। খেপবারই কথা। নকুল যখন শ্রীমানী মার্কেটের কাছে থাকত, বাপ মরবার পর যমুনার এই ভাই তখন নাকি সেখানে একবার গিয়েছিল। গিয়েছিল বাপের শ্রাদ্ধের জন্য কিছু টাকা চাইতে। তা ভগ্নিপতি তাকে দূর-দূর করে তাড়িয়ে দেয়।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “নকুল যে শ্বশুরবাড়িতে যেত না কেন, সেটা আন্দাজ করা তা হলে শক্ত হবে কেন? বিয়ের রাত্তিরেই সে বুঝতে পেরেছিল নিশ্চয় যে, এদের অবস্থা খুবই খারাপ, সুতরাং বেশি মাখামাখি করাটা ঠিক হবে না, ও-সব করতে গেলে এরা তার ঘাড়ে চেপে বসতে পারে। সম্ভবত সেইজন্যেই সে আর ও-মুখো হয়নি।”

ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “তা তো হতেই পারে।”

কৌশিক বলল, “কারণ যা-ই হোক, নকুল তার শ্বশুরবাড়িতে সেই বিয়ের দিনের পরে আর একদিনও যায়নি। তবে গাঁয়ের লোকেদের কাছে শুনলুম, নকুল না-গেলেও যমুনা যেত। দু-মাস তিন মাস অন্তর-অন্তরই যেত। যাওয়া তো খুব শক্ত নয়, হাওড়া থেকে রেলগাড়িতে উঠে বাগনানে নেমে পড়লেই হল। ওখান থেকে বিষ্টুহাটিতে বাসেও যাওয়া যায়, আবার সাইকেল-রিকশাও তো সব-সময়েই চলছে। বাপের বাড়িতে যেতে যমুনার তাই কোনও অসুবিধে ছিল না। যেত, বিষ্টুর সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎও হত। গাঁয়ে এই নিয়ে কানাঘুষো হত না, এমনও নয়। যাই হোক, যমুনাও নাকি ইদানীং আর বাপের বাড়ি যেত না। অন্তত গত তিন বছরের মধ্যে যায়নি।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বিষ্টুচরণও তো গত তিন বছর ধরেই নকুলদের সঙ্গে রয়েছে, তাই না?” সামন্ত তাঁর নোটবইয়ের পাতা চটপট উলটে বললেন, “হ্যাঁ, ঠিক তিন বছর।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “দ্যাট এক্সপ্লেনস?”

ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “একটা কথার উত্তর কিন্তু এখনও পাইনি, বাবা। বিষ্টুচরণের সঙ্গে যমুনার তো বিয়ে হবার কথা হয়েছিল, সেটা ভেস্তে গেল কেন?”

“ভেস্তে গেল বিষ্টুর বাবার আপত্তিতে।”

“কী যেন নাম বললে লোকটার? কেষ্টচরণ, তাই না?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ,” কৌশিক বলল, “এ হল কেষ্টবিষ্টুর ব্যাপার। বিষ্টুর সঙ্গে মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যমুনার বাবা গিয়েছিলেন কেষ্টচরণের কাছে। কেষ্ট তো শুনেই বোমার মতো ফেটে পড়লেন। একে তো যমুনার বাপ বংশে ছোট, তার উপরে আবার তাঁর আর্থিক অবস্থাও যাচ্ছেতাই, ডাইনে আনতে বাঁয়ে কুলোয় না, কেষ্টচরণ নাকি তাঁকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেন, ওই শুধু ঘাড়ধাক্কাটা দিতেই যা বাকি রেখেছিলেন। তিনি বিশাল বড়লোক, অমন হাঘরের ময়েকে ঘরে ঠাঁই দেবেন কেন? কাছাকাছি আর-এক গ্রামের এক ব্যবসায়ীর গলায় গামছা দিয়ে পঞ্চাশ হাজার টাকা বরপণ আর পঁচাশি ভরি গয়না নিয়ে তাঁর মেয়েকে তিনি পুত্রবধূ করে এনে ঘরে তুললেন।”

“তারপর?”

“তারপরে ঘটল এক ভয়ঙ্কর ঘটনা। বিয়ের মাস ছয়েক বাদে এক সকালবেলায় দেখা গেল, বিষ্টুদের বাড়ির ঠাকুরদালানের উঠোনে সেই নতুন বউয়ের রক্তাক্ত লাশ পড়ে রয়েছে, ওদিকে ঠাকুরঘরের ভিতর থেকে…”

“বিগ্রহটি উধাও নিশ্চয়?” ডাক্তার গুপ্ত প্রশ্ন করলেন।

কৌশিক হাসল। বলল, “বিগ্রহ তো এক্ষেত্রে একটি শালগ্রাম শিলা। কিছুকাল ধরেই মন্দিরে-মন্দিরে চোরের উৎপাত খুব চলছে, বটে, যেমন বিগ্রহ তেমনি আনুষঙ্গিক অন্য নানা জিনিসও নেহাত কম উধাও হচ্ছে না, তবে কিনা এ-সব জিনিস চুরি হচ্ছে মূলত তার আর্ট-ভ্যালুর জন্যে, বিদেশে যার প্রচন্ড বাজার-দর। কিন্তু শালগ্রাম-শিলার তো কোনও আর্ট-ভ্যালু নেই, অথচ আপনি ঠিকই ধরেছেন, সেই শিলাটিই এক্ষেত্রে হাপিস হয়ে গেল। তাজ্জব ব্যাপার, তাতে আর সন্দেহ কী! চোর যে কেন শালগ্রাম শিলা চুরি করতে গেল, সেটাই বুঝতে পারছি না।”

গঙ্গাধর সামন্ত বললেন, “পুলিশ-কেস হয়েছিল?”

কৌশিক বলল, “তা হয়েছিল বই কী। তবে, তখন যিনি থানা-অফিসার ছিলেন, তিনি বললেন, এও আসলে চুরির ব্যাপার। বিগ্রহ চুরি করবার জন্য চোর এসে মন্দিরে ঢুকেছিল, আর শেষ-রাত্তিরে ঘুম থেকে উঠে নতুন বউ গিয়েছিল পুজোর ফুল তুলতে। বাস্, হঠাৎ সে চোরের সামনে পড়ে যাওয়াতেই এই বিপত্তি। তার মাথা না-ফাটিয়ে চোরের কোনও উপায় ছিল না।”

“চুরি করবার মতো আর-কিছু ছিল সেখানে?”

“ছিল বই কী!” কৌশিক বলল, “পঞ্চপ্রদীপটাই তো ছিল। তার প্রদীপের অংশটা পিতলের বটে, কিন্তু পিলসুজের অংশটা সোনার পাতে বাঁধানো। ছিল রুপোর বিস্তর বাসনও। চোর সে-সব ছুঁয়েও দেখেনি, বউটাকে মেরে স্রেফ শালগ্রাম-শিলা নিয়ে পালিয়েছে।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “গ্রামের লোকেরা এই ব্যাপারে তোকে কী জানিয়েছে, সেটাও তা হলে এঁদের বল।”

কৌশিক বলল, “গ্রামের লোকেরা বলে বউকে মেরেছে বিষ্টুচরণই। বউটা বড়লোকের মেয়ে বটে, কিন্তু যেমন মোটা, তেমনি কালো, তাই মাথা ফাটিয়ে বিষ্টুই তাকে মেরেছে। ব্যাপারটা অবশ্য বেশিদূর গড়ায়নি। তার কারণ কেষ্টচরণ একে বড়লোক, তায় পঞ্চায়েতের কর্তাব্যক্তি। তা ছাড়া কাকে কীভাবে তুষ্ট করতে হয়, তাও তিনি বেশ ভালই জানেন। ফলে গোটা ব্যাপারটাই ধামাচাপা পড়ে গেল।”

সামন্ত বললেন, “বউয়ের মাথা কী দিয়ে ফাটানো হয়েছিল?”

“তা কেউ জানে না। পুলিশও না।” কৌশিক বলল, “যেমন পীতাম্বর চৌধুরি লেনের ঘটনায়, তেমনি হাওড়ায় গ্রামের এই ঘটনাতেও মার্ডার-ওয়েপনের কোনও হদিস নাকি মেলেনি।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কেষ্টচরণের মন্দিরে নিশ্চয় নতুন শালগ্রাম-শিলা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে?”

“তা তো হয়েছেই।”

“বাড়িতে ইঁদারা আছে?”

“নেই।”

“পুকুর আছে?”

“তা আছে।” কৌশিক বলল, “পুকুর বললে কমই বলা হয়। বিরাট দিঘি।”

ভাদুড়িমশাই আমার দিকে তাকালেন। হাসলেন একটু। তারপর বললেন, “মুকুন্দপুরের মনসামূর্তির কথা মনে পড়ছে?”

“তা পড়ছে বই কী।” আমি বললুম “সেখানে তো মূর্তি দিয়েই মাথা ফাটানো হয়েছিল।”

“এখানে সম্ভবত শালগ্রাম শিলা দিয়েই মাথা ফাটানো হয়েছে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “দিঘিতে জাল ফেলে ভালভাবে তল্লাশ চালালেই মনে হয় মার্ডার-ওয়েপনটা খুঁজে পাওয়া যেত।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *