শ্যামনিবাস-রহস্য (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(১৫)

কুসুমবালার সঙ্গে কথা বলে আমাদের চেনা একজন উকিলকে আমি আগেই সব জানিয়ে রেখেছিলুম। সদানন্দবাবুর জামিনের ব্যাপার নিয়ে সোমবার সকালে তাঁর সঙ্গে কথা বলছি, এমন সময় কৌশিক এল। অবাক হয়ে বললুম, “কী ব্যাপার?”

কৌশিক বলল, “একবার থানায় যাব। কয়েকটি বিষয়ে মিস্টার সামন্তর সঙ্গে একটু আলোচনা করা দরকার। হাতে সময় ছিল, তাই ভাবলুম যে, আপনার সঙ্গে দেখা করে যাই। মামিমা, পারুল—ওরা সব ভাল আছে তো?”

“তা আছে। তবে এলেই যখন, ওদের সঙ্গে একটু কথা বলে যাবে না?”

“আজ আর বসব না। পরে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করে নেব।”

কৌশিক উঠে পড়ল।

জামিনের ব্যবস্থা করা গেল না। সরকারি উকিল বললেন, একে তো এটা খুনের ব্যাপার, তার উপরে আবার কী দিয়ে খুন করা হয়েছে, এখনও সেটা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি, পুলিশ তাই আশঙ্কা করছে যে, আসামিকে যদি এখনই জামিন দেওয়া হয়, তা হলে তদন্তের অসুবিধে হবে। এখনও যা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি, তেমন কিছু-কিছু সাক্ষ্যপ্রমাণ এর ফলে লোপাট হয়ে যাওয়াও বিচিত্র নয়।

আমাদের উকিল বললেন, সদানন্দবাবু একজন মানী ব্যক্তি, তদন্তের অছিলায় এইভাবে তাঁকে হাজতে আটকে রাখা উচিত হচ্ছে না। তা ছাড়া এটাও আদালতকে বিবেচনা করে দেখতে হবে যে, ঘটনাস্থলে চব্বিশ ঘন্টার জন্যে পুলিশ-পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে, সুতরাং সেখান থেকে সাক্ষ্য- প্রমাণ লোপাট হবার কোনও আশঙ্কাই নেই।

হাকিম দু’পক্ষের কথা শুনলেন; তারপর রায় দিলেন, আসামিকে আপাতত আরও তিন দিন থানা-হাজতে রাখা যেতে পারে; তবে আদালত আশা করছে যে, পুলিশের তরফে বুধবারের মধ্যেই তদন্তের কাজ শেষ করা হবে, তারপরে আর তাঁরা জামিন দেবার ব্যাপারে কোনও আপত্তি তুলবেন না। সদানন্দবাবুর বয়সের উল্লেখও করলেন তিনি; বললেন যে, এই বয়সের একজন বৃদ্ধকে যে দীর্ঘকালের জন্য হাজতে আটকে রাখা চলে না, তাতে যে তাঁর স্বাস্থ্যভঙ্গ হতে পারে, পুলিশের সে-কথা উপলব্ধি করা উচিত।

দেবনারায়ণ ঘোষ মশাই আমাদের উকিল। দুপুর দুটো নাগাদ আমার অফিসে ফোন করে তিনি এই খবর দিলেন। সব শুনে বললুম, “বেস্পতিবার জামিনের ব্যবস্থা হবে তো?”

“তা হবে।” ঘোষমশাই বললেন, “আজ হল না ঠিকই, তবে রায় শুনে মনে হয়, সেদিন আর কোনও অসুবিধে হবে না। আসামির বয়েস যে সত্তর, সেটা একটা মস্ত ফ্যাক্টর।”

‘আসামি’ শব্দটা খট্ করে কানে বাজল। বললুম, “শনির থেকে বুধ। শুনলে মনে হয় মোটে তো পাঁচটা দিন। তা এই বয়সে পাঁচ-পাঁচটা দিনও তো কম নয়। তার উপরে আবার যা গরম পড়েছে।”

“কী আর করা যাবে বলুন! সবই কপালের ভোগ।”“

ফোন নামিয়ে রাখলুম। তারপরেই মনে হল, কৌশিকের সঙ্গে গঙ্গাধর সামন্তর কী সব কথা হল, সেটা জানা দরকার। টেলিফোন অপারেটরকে মালতীদের বাড়ির ফোন নম্বরটা দিয়ে বললুম, “নম্বরটা একটু ডেকে দাও তো।”

ফোন মালতীই ধরেছিল। বললুম, “আমি কিয়দা। দাদা বাড়িতে আছেন?”

“তা আছে।”

“তাঁর সঙ্গে একটু কথা বলব। ঘুমুচ্ছেন না তো?”

“রাত্তিরেই দাদা ঘুমোয় না, তা দুপুরবেলায়। ধরুন, ডেকে দিচ্ছি।”

সেকেন্ড পাঁচেক বাদেই ভাদুড়িমশাইয়ের গলা ভেসে এলে। “কী খবর?”

“খবর তো কৌশিকের কাছে। গঙ্গাধর সামন্ত ওকে কী বললেন?”

“পরে বলব। আপাতত জেনে রাখুন, সামন্ত মোটেই খারাপ লোক নয়। একটু একবগ্‌গা ঠিকই, নাক-বরাবর যা চোখে পড়ে, তা ছাড়া আর অন্য-কিছু দেখতে পায় না। বাট সার্টেনলি নট ওয়ান অভ্ দোজ কনসিটেড অফিসারস। কোথায় ভুল হচ্ছে সেটা ধরিয়ে দিলে মেনেও নেয়। কৌশিকের সঙ্গে তো এখন পুরোপুরি কো-অপারেট করছে।”

“কৌশিক বাড়িতে আছে?”

“তাই থাকে কখনও? থানা থেকে একটা নাগাদ ফিরেছিল, তার আধঘন্টার মধ্যেই আবার গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেছে। মারুতি নিয়েই বেরুচ্ছিল, তা আমি বললুম, গরমে একেবারে সেদ্ধ হয়ে যাবি, বরং তোর বাবার অ্যাম্বাসাডরটা নিয়ে যা।”

“কোথায় গেল?”

“বাগনান আর কোলাঘাট, দু’জায়গাতেই যাবে।”

“ওখানে আবার কী?”

“বাগনানের কাছেই যমুনার বাপের বাড়ি, আর নকুলদের বাড়ি হল কোলাঘাট থেকে মাইল কয়েক পশ্চিমে একটা গ্রামে। ব্যাপারটা বুঝলেন তো?”

“কিছুই বুঝলুম না।”

“যমুনা আর নকুলের আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে কৌশিক একটু কথা বলতে চায়।”

“ফিরবে কবে?”

“ফিরবে তো বলল কাল বিকেল নাগাদ। কিংবা তা যদি না পারে তো পরশু দুপুরে। চিন্তা করবেন না, ও ঠিক-পথ ধরেই এগোচ্ছে।”

বললুম, “আমি কি আপনার ওখানে একবার যাব?”

ভাদুড়িমশাই সেকেন্ড তিন-চার চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “আজ তো সোমবার। মঙ্গল আর বুধ, দুটো দিন আমাকে একটু ভাবতে দিন। আপনি একেবারে বেস্পতিবার বিকেলে আসুন। মনে তো হয় তখন কিছু খবর দিতে পারব।”

ফোন নামিয়ে রাখলুম।

মঙ্গল আর বুধ, দুটো দিন যেন কাটতেই চাইছিল না। অফিস করলুম যথারীতি, কিন্তু কাজকর্ম যে বিশেষ করতে পারা গেল, তা নয়। শুধু অফিসের কাজ বলে কথা কী, কোনও কাজেই যেন ঠিক মন বসাতে পারছিলুম না। বাসন্তী সেটা বুঝতে পেরেছিল, দু একবার প্রশ্নও করে ইল তা নিয়ে, কিন্তু স্পষ্ট কোনও জবাব না-পেয়ে আর-কিছু বলেনি। আমার শরীরটাও দু-একদিন ধরে একটু অবসন্ন লাগছিল! বুধবার সকালে টেলিফোন করে ডাক্তার চাকলাদারকে সে-কথা জানাতে তিনি বললেন, “আজ বিকেলে একটু তাড়াতাড়ি অফিস থেকে ফিরতে পারবেন?”

“তা কেন পারব না?”

“ঠিক আছে, তা হলে ছ’টা নাগাদ আমার চেম্বারে চলে আসুন। ব্লাড শুগার বেড়ে যায়নি তো?”

“না মশাই, ও-সব ঝঞ্ঝাট আমার নেই।”

“তা হলে হয়তো প্রেশার বেড়েছে। চলে আসুন, দেখে দেব অখন। তা ছাড়া আমারও দু-একটা কথা বলবার আছে আপনাকে।”

“কী কথা?”

“আসুন, তখন বলব।”

চাকলাদার ফোন নামিয়ে রাখলেন।

অফিস থেকে ফিরতে-ফিরতেই পাঁচটা চল্লিশ। জামা-কাপড় আর পালটানো হল না। মুখ-হাত ধুয়ে, কোনওক্রমে এক কাপ চা খেয়ে, পাশের গলিতে চাকলাদারের চেম্বারে যখন পৌঁছলুম, তখন ছ’টা পাঁচ।

প্রেশার দেখে চাকলাদার বললেন, “ঠিকই আছে। মনে হচ্ছে এগ্‌জারশানের ব্যাপার। দু’দিন একটু বিশ্রাম নিন, সব ঠিক হয়ে যাবে।”

বললুম, “বিশ্রাম তো নিতেই পারতুম, কিন্তু এখন কী করে নিই বলুন তো। সদানন্দবাবুর ব্যাপারটার ফয়সলা হোক, তারপর নেওয়া যাবে।”

চাকলাদার বললেন, “আমি যা বলতে চাই, তাও কিন্তু ওই পাঁচ-নম্বর বাড়ির ব্যাপারেই।”

ভদ্রলোককে বড় গম্ভীর দেখাচ্ছিল। হাসিখুশি, বন্ধুবৎসল মানুষ; শুনেছি ছ’টা সাড়ে ছ’টা নাগাদ তাঁর চেম্বারে রোজই কিছু-না-কিছু বন্ধুবান্ধব আসেন, আড্ডা চলে আটটা-ন’টা পর্যন্ত। আজ কাউকে দেখা গেল না। বললুম, “ কী ব্যাপার বলুন তো? কাউকে দেখছি না কেন?”

“আমিই ফোন করে সবাইকে আসতে বারণ করে দিয়েছি। বলেছি, শরীরটা ভাল যাচ্ছে না, চেম্বারে না-বসে আজ একটু বিশ্রাম নেব।”

“শরীর সত্যি খারাপ নাকি?”

“না না, ও-সব কিছু নয়। আসলে আপনাকে এমন দু-একটা কথা বলতে চাই, অন্যদের যা না-শোনাই ভাল।”

“কী কথা?”

ডাক্তার চাকলাদার একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। মুখ নিচু করে কী যেন ভাবলেন। তারপর মুখ তুলে বললেন, “এখুনি আমি বিস্তারিতভাবে কিছু বলব না, বলা উচিতও নয়। আমি ডাক্তার–মানুষ, এমন কিছু করা বা বলা আমার ঠিক হবে না, যা কিনা আমাদের পেশায় আন্-এথিক্যাল বলে গণ্য হয়ে থাকে। শুধু একটা কথা বলি। আপনি তো সদানন্দবাবুর বাড়ির একেবারে সামনেই থাকেন, আপনি একটু মিসেস বসুর উপরে নজর রাখুন।”

“সদানন্দবাবুর স্ত্রীর উপরে? কেন?”

“আর-কিছু জিজ্ঞেস করবেন না, প্লিজ। শুধু যা বললুম, দয়া করে সেটা মনে রাখবেন।… মানে, আপনারা একটু সতর্ক থাকুন। হ্যাঁ, আপনারা সবাই। আমার ধারণা, কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।”

চাকলাদারের কথাবার্তা আমার কানে কেমন যেন অসংলগ্ন ঠেকছিল। মনে হল, ভদ্রলোকের শরীর সত্যি ভাল যাচ্ছে না। বিশ্রাম সম্ভবত ওঁরই সবচেয়ে বেশি দরকার।

চলে আসবার আগে একবার জিজ্ঞেস করেছিলুম, “কী হয়েছে, একটু খুলে বলুন তো মশাই।”

কিন্তু চাকলাদার আর একটি কথাও বললেন না।

.

চাকলাদার বলেছিলেন, কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। তা কিছু-একটা যে সেই রাত্রেই ঘটবে, তখন তা আমি কল্পনাও করিনি। খবর পাওয়া গেল ভোরবেলায়। না, আমাদের জন্যে তো ভদ্রলাক বড় উদ্বিগ্ন ছিলেন, আমাদের গলিতে কিন্তু কারও কিছু হয়নি, ক্ষতি যা হবার তা চাকলাদারেরই হয়ছে। তাঁর চেম্বারের জানলা ভেঙে মাঝরাত্তিরে চোর ঢুকেছিল। চেম্বারে তো বিশেষ-কিছু থাকবার কথা নয়, ছিলও না, তাই চোরও বিশেষ কিছু হাতিয়ে নিতে পারেনি। আমরা গিয়ে দেখলুম, চেম্বারের ঘরের মেঝের উপরে একরাশ কাগজপত্র ছত্রাকার হয়ে পড়ে আছে। পুলিশ এসেছে। ডাক্তার চাকলাদার তাদের সঙ্গে কথা বলছেন। আমাকে দেখে বললেন, “চলে যাবেন না, একটু বসুন, কথা আছে।”

পুলিশ চলে যেতে-যেতে আটটা বাজল। চাকলাদার আমাকে ভিতরের দিকের একটা ঘরে নিয়ে গেলেন। কাজের লোকটি এসে দু’কাপ চা দিয়ে গেল সেখানে। চাকলাদার বললেন, “খান।”

আমি বললুম, “আজকাল আর আমি এই রকমের চা নাই না, সদানন্দবাবুর পরামর্শমতো স্রেফ হাল্কা লিকার খাই।”

চাকলাদার বললেন, “তা হলে ওটা খাবেন না, পালটে দিতে বলছি।”

বললুম, “আরে দূর মশাই, আমি কি সদানন্দবাবুর মতো অত নিয়ম মানি? এটাই খেয়ে নিচ্ছি, পালটাতে হবে না। …কথাটা কী সেইটে এবারে বলুন তো?”

“ও, হ্যাঁ।” চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে ডাক্তার চাকলাদার বললেন, “আপনার কাছে মিঃ ভাদুড়ির কথা অনেক শুনেছি। তা সেদিন তো আপনারা বলছিলেন যে, তিনি এখন কলকাতায়। তাই না?”

বললুম, “হ্যাঁ। কেন বলুন তো?”

“শিগগিরই কি তাঁর কাছে আপনি যাবেন?”

“রবিবারে গিয়েছিলুম। আজ তো বেস্পতিবার, আজ বিকেলেও একবার যাব।”

“আজ অফিসে যাবেন না?”

“না। সদানন্দবাবুর জামিনের ব্যাপারটা আজ আবার উঠবে। মনে হচ্ছে আজ ওটা পেয়েও যাবেন উনি।”

“আপনি কি আদালতে যাবেন?”

“না না,” আমি বললুম, “আমার যাবার কিছু দরকার নেই। ভাল ল-ইয়ার দিয়েছি, যা করবার তিনিই করবেন। আমি বাড়িতেই থাকব। কেন থাকব, জানেন?”

“কেন?”

“হাজত থেকে উনি ফেরবার সঙ্গে-সঙ্গেই ওঁর সঙ্গে গিয়ে দেখা করব। যাতে না ওঁর মনে হয় যে, পুলিশে ধরেছিল বলে আমরা ওঁকে অদ্ভুত ভাবছি, ওঁকে এড়িয়ে যাচ্ছি।”

“সে তো ভালই।” চাকলাদার বললেন, “তা হলে মিঃ ভাদুড়ির ওখানে কখন যাচ্ছেন?”

“পাঁচটা নাগাদ বেরিয়ে পড়ব, তার আগে তো রোদ্দুরে সব তেতে থাকে।”

“আমিও আপনার সঙ্গে যাব তখন। ওঁর সঙ্গে আমার একবার দেখা করা দরকার।”

বললুম, “আপনি ওঁকে কিছু বলতে চান?”

“হ্যাঁ, একটা কথা ওঁকে জানাতে চাই আমি। না-জানানো পর্যন্ত আমি শান্তি পাচ্ছি না।”

“বেশ তো, যাবেন। পাঁচটা নাগাদ আপনার এখানে চলে আসব আমি, তারপরে দু’জনে মিলে বেরিয়ে পড়ব।”

চাকলাদারের বাড়ি থেকে বেরিয়েই বড়রাস্তা। দু’পা এগিয়ে বাঁদিকে মোড় নিয়ে পীতাম্বর চৌধুরি লেনে ঢুকলুম। দেখলুম, একটা থলে হাতে বিষ্টুচরণ বাজার করতে যাচ্ছে। কাপড়টা নোংরা, হাফ-হাতা শার্টটাও কাঁধের কাছে ছিঁড়ে গেছে। দেখে মায়া হল। ভগ্নিপতির আশ্রয়ে দু’বেলা দু’মুঠো খেতে পাচ্ছিল, এবারে মুশকিলে পড়বে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *