শ্যামনিবাস-রহস্য (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(১৩)

গঙ্গাধর সামন্ত একা আসেননি, ডাক্তার গুপ্তকেও নিয়ে এসেছেন। সুরেশ গুপ্ত যে ভাদুড়িমশাইকে ভালই চেনেন, কালই তিনি সে-কথা বলেছিলেন। তবে তাঁকে দেখবামাত্রই ‘আরে সুরেশবাবু আপনি?’ বলে ছুটে এসে ভাদুড়িমশাই যে ভাবে তাঁকে অভ্যর্থনা জানালেন, তাতেই বুঝতে পারলুম যে, এটা নেহাত চেনা-জানার ব্যাপার নয়, এককালে দুজনের সম্পর্ক রীতিমতো ঘনিষ্ঠই ছিল।

যে-ঘরে ভাদুড়িমশাই থাকেন এতক্ষণ আমরা সেই ঘরে বসে কথাবার্তা বলছিলুম। এবারে সবাই বাইরের ঘরে এসে বসা গেল। চৈত্রমাস, সারা দিন বেশ গরম গিয়েছে, ভেবেছিলুম যে, বিকেলের দিকে ঝড় উঠতে পারে, কিন্তু ওঠেনি; একটু একটু মেঘ জমছিল বটে, কিন্তু এলোমেলো হাওয়ার দাপটে সে-মেঘ স্রোতের মধ্যে নোঙর-ছেঁড়া নৌকোর মতো কোথায় যে ভেসে গেল তার ঠিক-ঠিকানা নেই, বিকেলবেলার আকাশ এখন আবার আয়নার মতো ঝকঝক করছে।

কাজের লোকটির হাত দিয়ে মালতী পাঁচ গ্লাস ঘোলের শরবত পাঠিয়ে দিয়েছিল। গঙ্গাধর সামন্ত তাঁর শরবতের গ্লাসে চুমুক দেবার আগে দু’গ্লাস জলও খেয়ে নিলেন। তারপর রুমাল বার করে ঘাড় আর কপালের ঘাম মুছে বললেন, “উঃ, গরমে একেবারে মরে গেলুম!”

খানিক বাদেই জলখাবার এসে গেল। খেতে-খেতে যেমন কুশল-জিজ্ঞাসা আর পারস্পরিক বার্তা-বিনিময় চলতে লাগল, তেমনি অন্য রকমের টুকটাক কথাও হল কিছু-কিছু। তারপর ভাদুড়িমশাই-ই একসময়ে বললেন, “এবারে তা হলে পীতাম্বর চৌধুরি লেনের ওই ব্যাপারটার কথায় আসা যাক, কেমন? মিস্টার সামন্ত, আপনাকে যদি এই প্রসঙ্গে গোটা কয়েক প্রশ্ন করি, তা হলে তার উত্তর দিতে আপনার আপত্তি হবেনা তো? তা যদি হয়, তো এখনই বলুন, সে-ক্ষেত্রে আর আপনাকে আমি বিব্রত করব না।”

সামন্ত বললেন, “দেখুন মিস্টার ভাদুড়ি, এ-ব্যাপারে আমার তরফে যেটা বলবার কথা, সেটা খোলাখুলি বলা-ই ভাল। সরকারি নিয়মকানুন তো আপনার জানাই আছে। আপনি খুব ভালই জানেন যে, এ-সব ব্যাপার নিয়ে বাইরের কারও সঙ্গে কথা বলতে আমি বাধ্য নই, সাধারণত তা আমি বলিও না। তবে কিনা আপনার কথা আলাদা।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কেন কেন, আমিই বা আর-পাঁচজনের থেকে আলাদা হলুম কীভাবে?”

গঙ্গাধর সামন্ত কিন্তু হাসলেন না। বললেন, “কথাটা আমার নয়, আমার উপরওয়ালার। আপনি যে এই পীতাম্বর চৌধুরি লেনের ব্যাপারটা নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলতে চান, আপনার ভাগ্নের ফোন পাবার পরে এটা আমার উপরওয়ালাকে আমি সঙ্গে-সঙ্গেই জানিয়েছিলুম। জিজ্ঞেস করেছিলুম যে, এ-ব্যাপারে যে-সব তথ্য ইতিমধ্যে আমাদের হাতে এসেছে, আপনাকে তা আমি জানাতে পারি কি না।”

“তিনি তাতে কী বললেন?”

“বললেন যে, নর্মালি উই ডোন্ট ডু দিস, তবে কিনা মিস্টার ভাদুড়ির কথা আলাদা, হি হ্যাজ অলওয়েজ কোঅপারেটেড উইথ আস। সো গো অ্যাহেড অ্যান্ড টক টু হিম অ্যান্ড সি ইফ হি ক্যান হেলপ আস ইন এনি ওয়ে।”

“সব কথাই আমাকে খুলে বলতে বলেছেন তিনি?”

“তা-ই তো বললেন। আপনার কাছে নাকি কোনও-কিছুই গোপন রাখবার দরকার নেই। বললেন যে, গিভ হিম অল দি ইনফর্মেশন অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স দ্যাট উই হ্যাভ উইথ আস্। দেয়ার’স অ্যাবসলিউটলি নো নিড টু হোল্ড এনিথিং ব্যাক।”

“বাঃ,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা হলে তো কোনও কথাই নেই। তা হলে শুরু করি, কেমন?” সামন্ত বললেন, “তার আগে এখানে আর যাঁরা উপস্থিত আছেন তাঁদের একটা কথা জানিয়ে রাখি। ব্যাপারটা এখন যে-স্টেজে রয়েছে, তাতে কোনও কিছুই ফাঁস হওয়াটা উচিত হবে না। হলে আমি তো বিপদে পড়বই। অন্য কিছু সমস্যাও দেখা দিতে পারে। সুতরাং আপনারা আমাকে কথা দিন যে, যা-যা আমি বলব তা শুধু আপনারাই জানবেন, আর কেউ নয়।

সামন্ত যদিও ‘আর যাঁরা, আপনারা’ ইত্যাদি সব শব্দ ব্যবহার করছিলেন, তবু বুঝতে আমার অসুবিধে হল না যে, তাঁর কথাগুলি আসলে একান্তভাবে আমাকেই বলা। আমি খবরের কাগজে কাজ করি, তাই ভদ্রলোক সম্ভবত ভয়।চ্ছেন যে, এই নিয়ে আমাদের কাগজে কিছু বেরিয়ে যেতে পারে।

বললুম, “আপনারা কথাবার্তা বলুন, আমি বরং ঘন্টাখানেকের জন্য একটু বাইরে যাই।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আরে বসুন বসুন।” তারপর সামন্তর দিকে তাকিয়ে বললেন “নিশ্চিত থাকুন, কিরণবাবু তো দীর্ঘদিন ধরে আমার সঙ্গে রয়েছেন, ফাঁস করতে হলে ঢের-ঢের এক্সপ্লোসিভ ব্যাপার উনি ফাঁস করে দিতে পারতেন। তা যখন করেননি, তখন এটাও করবেন না।”

সামন্ত একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললেন, “বাঁচালেন মশাই। ঠিক আছে, এবারে তা হলে বলুন যে, আপনি কী জানতে ঢান।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “লাশ পরীক্ষা করা হয়েছে?”

“সে তো কালই হয়েছে।”

“রিপোর্টটা পাওয়া গেছে নিশ্চয়?”

“হ্যাঁ, তাও পেয়েছি।” সামন্ত বললেন, “তবে গুপ্তসাহেব নিজেই যখন উপস্থিত রয়েছেন এখানে, তখন আমি আর এ-ব্যাপারে কিছু বলব না; যা বলবার উনিই বলুন।”

ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “শরীরটা চিত হয়ে পড়ে ছিল। ওইভাবে পড়ে যাবার ফলে যদি মাথা ফেটে থাকে, তা হলে মাথার পিছন দিকটা ফাটত।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এমন যদি হয় যে, লোকটা উপুড় হয়ে পড়ে মাথা ফাটিয়েছিল, কিন্তু পরে তার শরীরটাকে চিত করে দেওয়া হয়েছে।”

“সেক্ষেত্রে ফাটত মাথার সামনের দিক, অর্থাৎ কপালের দিক। কিন্তু এখানে দেখছি, মাথাটা সামনের দিকেও ফাটেনি, পিছনের দিকেও না। ফেটেছে একেবারে খুলির উপরের দিকটা। ওই যাঁকে আমরা চাঁদি বলি।”

এ-সব কথা কালই আমরা শুনছি। কৌশিকের কাছে ভাদুড়িমশাইও নিশ্চিত শুনে থাকবেন। তবু তিনি এমন ভাব দেখাচ্ছেন যেন কিছুই জানেন না। বললেন, “বটে? তা এ থেকে আপনার কী মনে হয়?”

একটাই মাত্র কথা মনে হয়। সেটা এই যে, উপর থেকে ভারী-কিছু মাথার উপরে পড়লে কিংবা উপর থেকে ভারী কিছু দিয়ে কেউ মাথার ওখানে আঘাত করলে তবেই মাথার ওই জায়গাটা ও-ভাবে ফাটতে পারে। তা ওখানে তো মাথার উপরে ফ্যান কিংবা ঝাড়লণ্ঠন ছিল না, তাই উপর থেকে অমন কিছু খসে পড়বারও প্রশ্ন এ-ক্ষেত্রে উঠছে না। তা হলে আর এটাকে দুর্ঘটনা বলে কি হঠাৎ পড়ে গিয়ে মাথা ফাটবার ব্যাপার বলে মেনে নিই কী করে? একটাই মাত্র সিদ্ধান্ত এ-ক্ষেত্রে করতে পারি, সেটা হল ইটস এ ক্লিয়ার কেস অভ্ মার্ডার।”

“সেটা কীভাবে করা হল বলে আপনার মনে হয়?”

“ভারী কিছু দিয়ে খুব জোরে ওর মাথায় আঘাত করা হয়েছিল। আঘাতটা কিন্তু একই লেভেলে সামনে কিংবা পিছনে দাঁড়িয়ে করা হয়নি, করা হয়েছিল একটু উপর থেকে। একই লেভেলে দাঁড়িয়ে যে সেটা করা যায় না, তা অবশ্য নয়। যাকে আঘাতটা করা হচ্ছে, তার চেয়ে যদি যে আঘাত করছে তার হাইট আরও অন্তত ফুটখানেক বেশি হয়, তো একই লেভেলে দাঁড়িয়েও সেটা করা যেতে পারে। কিন্তু তেমন কোনও সম্ভাবনাকেও এ-ক্ষেত্রে আমল দিতে পারছি না।”

“এ-কথা কেন বলছেন?”

ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “এইজন্যে বলছি যে, যাকে খুন করা হয়েছে, তার হাইট পাক্কা ছ’ফুট। একই লেভেলে দাঁড়িয়ে তার মাথার ওই জায়গায় যদি আঘাত করতে হয় তো খুনির অন্তত সাত ফুট লম্বা হওয়া দরকার। তা ও-রকম লম্বা লোক আমেরিকান বাস্কেট-বল টিমে অনেক থাকতে পারে, আমাদের দেশে খুব বেশি খুঁজে পাওয়া যাবে না।”

কৌশিক বলল, “আমি একটা কথা বলতে পারি?”

ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “নিশ্চয়, নিশ্চয়।”

কৌশিক বলল, “ওই যে আপনি এক ফুট ব্যবধানের কথা বলছেন, ওটা তো কৃত্রিমভাবেও তৈরি করে নেওয়া হতে পারে?”

ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “একটু বুঝিয়ে বলো তো বাবা।”

কৌশিক বলল, “ধরুন একই লেভেলে দাঁড়িয়ে মাথার ওইখানটায় আঘাত করে আমি যদি কাউকে মারতে চাই, তো তার জন্যে আমাকে সত্যি-সত্যি তার চেয়ে আরও এক ফুট বেশি লম্বা হতে হবে কেন? সে যদি একটা চেয়ারে বসে থাকে, আর আমি থাকি দাঁড়িয়ে, তা হলেই তো আমাদের দুজনের দৈর্ঘ্য এক হওয়া সত্ত্বেও কি তার চেয়ে আমি ইঞ্চি কয়েক খাটো হওয়া সত্ত্বেও, কার্যত আমি তার চেয়ে অন্তত তখনকার মতো এক ফুট বেশি লম্বা হয়ে যাচ্ছি। কিংবা তাকে চেয়ারেই বা বসতে হবে কেন? সে নাহয় দাঁড়িয়েই থাক। কিন্তু সে-ক্ষেত্রে ওই এক ফুট আমি গেইন করতে পারব, যদি কিনা একটা টুলের উপরে দাঁড়িয়ে আমি তার মাথা ফাটাই।”

ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “ওয়েল ইউ হ্যাভ এ পয়েন্ট দেয়ার। এ ভেরি গুড পয়েন্ট, ইনডিড। এদিক থেকে ব্যাপারটা আমাদের ভেবে দেখা উচিত ছিল।”

গঙ্গাধার স’মন্তকে একটু গম্ভীর দেখাচ্ছিল। তিনি বললেন, “আমি যে এটা একেবারেই ভেবে দেখিনি, তা কিন্তু নয়। কিন্তু চেয়ারে বসে থাকার কথাটা এখানে খাটছে না। অত রাত্তিরে একটা লোক ওখানে চেয়ারে বসে থাকবে কেন? আর টুলের উপরে দাঁড়িয়েই বা খুন করবার দরকার কী? সিঁড়ির দু’ধাপ উপরে দাঁড়িয়েই তো সেটা করা যায়। কী গুপ্তসাহেব, যায় না?”

ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “যায় বই কী, নিশ্চয়ই যায়।”

সামন্ত বললেন, “খুনি আর তা হলে অনর্থক টুল নিয়ে টানাটানি করতে যাবে কেন?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঠিক আছে, আপাতত এটাকে আমি খুন বলেই ধরে নিচ্ছি। তা সেটা কখন হয়েছে বলে আপনাদের ধারণা?”

ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “একেবারে একজ্যাক্ট সময় তো বলা সম্ভব নয়। লাশ পরীক্ষা করে মনে হচ্ছে, ঘটনাটা ঘটেছে মোটামুটি তিনটে নাগাদ। কিন্তু এ-সব ক্ষেত্রে একটু মার্জিন তো রাখতেই হয় আমাদের, তাই একেবারে নিশ্চিত হয়ে যা বলা সম্ভব, সেটা এই যে, ব্যাপারটা ঘটেছে রাত দুটো থেকে চারটের মধ্যে।

আমি বললুম, “আড়াইটের আগে ঘটেনি।”

সামন্ত বললেন, “এ-কথা আপনি বলছেন কেন?”

“এইজন্যে বলছি যে, নকুল সেদিন রাত একটা নাগাদ বাড়ি ফিরেছিল বটে, কিন্তু চেঁচামেচি করেছিল দুটো পর্যন্ত।”

“কী করে জানলেন? আপনি কি তখন জেগে ছিলেন নাকি?”

“আমি জেগে ছিলুম না, কিন্তু আমার মেয়ে জেগে ছিল। …না না, তার ইনসমনিয়া নেই, আসলে সামনেই তার বি.এ. ফাইনাল, তাই অন্তত রাত দুটো পর্যন্ত সে এখন লেখাপড়া করে। কখনও-কখনও আড়াইটেও বেজে যায়। তার ঘর একেবারে রাস্তার ধারেই। সেদিন সে ভেবেছিল যে, তিনটের আগে ঘুমোবে না। কিন্তু বাড়ি ফিরে নকুল সেদিন এমন হৈচৈ লাগিয়ে দিয়েছিল যে, আমার মেয়ের পড়াশুনো একেবারে মাথায় উঠে যায়। আলো নিবিয়ে সে শুয়ে পড়ে। তার আগে টেবিল-ক্লকে অ্যালার্মের কাঁটা ঘোরাতে গিয়ে দেখতে পেয়েছিল যে, রাত তখন দুটো পঁচিশ।”

সামন্ত বললেন, “এই ব্যাপারে দেখছি সদানন্দবাবুর কথার সঙ্গে আপনার মেয়ের কথাটা মোটামুটি ট্যালি করে যাচ্ছে।”

বললুম, “জানি। কাল সকালে আপনি এসে পৌঁছবার আগে সদানন্দবাবুও কথাটা আমাকে বলেছিলেন। পরে দেখলুম আপনার জেরার উত্তরেও উনি একই কথা বললেন। তা ছাড়া, আর-একটা কথাও বলেছেন উনি। সেটা এই যে, রাত তিনটে নাগাদ উনি একতলায় কোনও ভারী কিছু পড়ে যাবার শব্দ পান। কথাটা, যদ্দুর মনে করতে পারছি, আপনাকেও উনি বলেছেন। তাই না?”

সামন্ত তাঁর অ্যাটাচি-কেস খুলে একটা নোটবই বার করলেন। ওই যাতে স্টেনোবা ডিক্টেশান নিয়ে থাকেন, সেই রকমের ছোট-সাইজের খাতা আর কি। খুব দ্রুত তার কয়েকটা গাতা উল্টে গিয়ে এক-জায়গায় হঠাৎ থেমে গেলেন তিনি। সেখানে যা লেখা ছিল, তার উপরে চোখ বুলিয়ে নিলেন। তারপর বললেন, “হ্যাঁ,কথাটা তিনি আমাকেও বলছেন।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “একতলায় নকুল ছাড়া আর কে-কে থাকে যেন?”

বললুম, “নকুলের বউ যমুনা, মেয়ে কমলি আর যমুনার দাদা বিষ্টুচরণ থাকে।”

ভাদুড়িমশাই সামন্তের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই যে রাত তিনটে নাগাদ একতলায় কিছু একটা পড়ে যাবার শব্দ হয়েছিল…অন্তত হয়েছিল বলেই সদানন্দবাবু জানাচ্ছেন, এটা নিয়ে কি যমুনা আর তার দাদাকে কোনও প্রশ্ন করেছেন আপনি?”

সামন্ত বললেন, “স্পেসিফিক্যালি যে এইটে নিয়ে কোনও প্রশ্ন করেছি, তা নয়। তবে অন্য অনেক প্রশ্ন তো করেছি, যমুনা আর বিষ্টুচরণ তার উত্তরও দিয়েছে। সে-রাতে যা হয়েছিল, উত্তরগুলো থেকে মোটামুটি তা আন্দাজও করা যায়। মানে একটা ছবি তার থেকে বেরিয়ে আসে ঠিকই।”

“যমুনা কী বলছে? সব কথা বলবার দরকার নেই, জরুরি পয়েন্টগুলোই শুধু জানতে চাইছি।”

“যমুনা বলছে নকুলচন্দ্র রোজই দেরি করে ফিরত, সেদিনও দেরি করেই ফিরেছিল, তবে সেদিন তার ফিরতে-ফিরতে একটা বেজে গিয়েছিল কি না, তা সে বলতে পারবে না। ফিরে যে অনেকক্ষণ চেঁচামেচি করেছিল, তাও ঠিক। তার ভাত ঢাকা দেওয়া থাকে, কিন্তু সেদিন আর “ ভাত-টাত খায়নি। বেশ কিছুক্ষণ চেঁচামেচি করে ঘরে ঢুকে ঘুমিয়ে পড়েছিল।”

“ভাল কথা। তারপর?”

“এই পর্যন্ত যা বলা হল, তার মধ্যে কোনও গোলমাল নেই। গোলমাল ঘটছে তার স্টেটমেন্টের শেষ-দিককার অংশটা নিয়ে।”

“সেটা কী?”

সামন্ত একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “যমুনা বলছে, রোজই রাত তিনটে থেকে সাড়ে-তিনটের মধ্যে তার স্বামী একবার বাথরুমে যেত। তারপর বাথরুম থেকে ফিরে এসে আবার ঘুমিয়ে পড়ত। তবে কিনা বেশিক্ষণের জন্যে নয়। খানিকক্ষণ ঘুমিয়েই ফের উঠে পড়তে হত তাকে। খুচরো দোকানিয়া সাত-সকালে পাইকিরি দরে মাছ কিনতে আসত, সেইজন্যেই বেশিক্ষণ ঘুমিয়ে থাকা চলত না।”

কৌশিক বলল, “লোকটা রাত করে ফিরত আবার উঠেও পড়ত সকাল-সকাল। তা হলে ঘুমোত কখন?”

“যমুনা বলছে, রাত্তিরে তো সাধারণত ঘন্টা তিনেকের বেশি ঘুমোত না, তাই দুপুরবেলায় টানা আবার ঘন্টা কয়েক ঘুমিয়ে নিত।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা এর মধ্যে গোলমালটা ঘটছে কোথায়?”

সামন্ত বললেন, “সেদিনও রাত তিনটে নাগাদ লোকটা বাথরুমে গিয়েছিল কি না, যমুনা সেটা বলতে পারছে না।”

ডাক্তার গুপ্ত বললেন, “গিয়েছিল নিশ্চয়। খুনের সময় তো দুটো থেকে চারটের মধ্যে। তা সেইসময় ঘর থেকে ওকে টেনে বাইরে নিয়ে এসে তো আর কেউ খুন করেনি। আর খুনটা যে ঘরের মধ্যে করে তারপর শরীরটাকে বাইরে টেনে নিয়ে এসে সিঁড়ির তলায় ফেলে রাখা হয়নি, তাও তো ও-ঘরের বিছানাপত্র পরীক্ষা করেই বোঝা গিয়েছে। তা ছাড়া এটাও ভেবে দেখুন যে, ঘর থেকে ওকে টেনে নিয়ে গেলে কি ঘরের মধ্যেই খুন করে লাশটাকে টেনে বাইরে নিয়ে গেলে তো ওর বউই সেটা টের পেয়ে যেত। তা কিন্তু যমুনা টের পায়নি। ….না মশাই, নির্ঘাত ও তখন বাথরুমে গিয়েছিল। তারপর বেরিয়ে এসে খুন হয়।”

কৌশিক বলল, “বাথরুমে হয়তো ঢোকেইনি, সেখানে যাবার পথেই হয়তো খুন হয়েছে। তাও কিছু বিচিত্র নয়।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “যমুনা কী বলছে?”

সামন্ত বললেন, “যমুনা বলছে, রোজই তো বাথরুমে যেত। তবে সেদিনও গিয়েছিল কি না, তা সে জানে না। তার কারণ, রাত-দুপুরে নকুলের চিৎকার-চেঁচামেচিতে তার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু নকুল এসে ঘরে ঢুকে ঘুমিয়ে পড়বার পর সে নিজেও আবার ঘুমিয়ে পড়েছিল। ভোর-পাঁচটায় সদানন্দবাবুর চিৎকার শুনে সে জেগে ওঠে, তার আগে আর তার ঘুম ভাঙেনি।”

ডাক্তার গুপ্ত ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকালেন। বললেন, “আপনার কী মনে হয়? যমুনা যা বলছে সেটা সত্যি?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সত্যি তো হতেই পারে, তবে মিথ্যে হওয়াও বিচিত্র নয়।”

“যমুনা কেন মিথ্যে কথা বলবে?”

“জেগে থাকলেও সে-কথা কবুল করা সম্ভব নয় বলেই বলবে। ধরুন নকুল সেদিনও তার অভ্যাসমতো রাত-তিনটে নাগাদ একবার বাথরুমে গিয়েছিল। ধরুন, যমুনা সেটা টেরও পেয়েছিল। তা আমরা এখন জেনে গেছি যে, নকুলের মৃত্যু ঘটেছিল মোটামুটি ওই সময়েই। তো যমুনা যদি স্বীকার করে যে, সে তখন জেগে ছিল, তা হলে প্রশ্ন উঠবে ওই সময়ে তার স্বামীর মাথা ফাটল, লোকটা মেঝের উপরে পড়ে যাবার ফলে শব্দও হল একটা, তা হলে জেগে থাকা সত্ত্বেও যমুনা কিছু টের পেল না কেন?

সামন্ত বললেন, “আমার ধারণা যমুনা মিথ্যে কথা বলেনি, সত্যি সে ঘুমিয়েই ছিল তখন, নইলে শব্দটা শুনে সে ছুটে আসত নিশ্চয়।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনার ধারণা সত্যি হলে কি তদন্তের কোনও সুবিধে হয়?”

“হয় বই কী,” সামন্ত বললেন, “ব্যাপারটাকে যে-ভাবে আমি রিকনস্ট্রাক্ট করেছি সেটা তা হলে জোর পায়।”

কৌশিক বলল, “কীভাবে রিকনস্ট্রাক্ট করেছেন, একটু বুঝিয়ে বলুন।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *