রুআহা (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

সাত

এই গুহার ক্যাম্পে দু’দিন হল। দু রাতও। আজ তৃতীয় রাত।

আমরা তিনজনেই রোজ সকালে উঠে তিন দিকে চলে যাই, আগ্নেয়াস্ত্রে পুরোপুরি সজ্জিত হয়ে। জলের বোতল এবং কিছু খাবার সঙ্গে নিয়ে। গলায় বাইনাকুলার ঝুলিয়ে। সারা দিন স্কাউটিং করে বিকেলের আগেই ফিরে আসি। তিনজনের নোটস মিলিয়ে দেখি সন্ধেবেলায়। ঋজুদা বলেছে যে, কাল সকালে একটা জিপ নিয়ে একা চলে যাবে। আমি আর তিতির থাকব এই গুহার ক্যাম্পে। তিতির এবং ঋজুদা দুজনেই এ দু’দিনে লক্ষ করেছে যে, সার-সার কুলিরা মাথায় এবং কাঁধে বোঝা নিয়ে কিমিবোয়াটিঙ্গে পাহাড়-শ্রেণীর দিকে চলেছে। তিতির আগুনের ধোঁয়াও দেখেছে আরও উত্তরে। ওখানে নিশ্চয়ই পোচারদের ক্যাম্প আছে।

এই দু’দিনেও যখন কেউই আমাদের গুহার দিকে আসেনি, ওদের দলের তিনজন লোকের গুলিতে মৃত্যুর পরও, তখন ঋজুদার অনুমান এইই যে, চোরাশিকারিরা আমরা যে এখানে আছি, সে-খবর পায়নি। এবং খুব সম্ভব পাবেও না।

ঋজুদা চলে গেলে, আমাকে আর তিতিরকে সবসময়ই একসঙ্গে ঘোরাফেরা করতে হবে। ঋজুদার অর্ডার।

কালকে বিকেলে একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটেছিল। আমরা যখন তিনজনে তিন দিক থেকে ফিরে আসছি তখন আমরা তিনজনই আমাদের ফেরার পথে নানারকম জিনিস কুড়িয়ে পাই। জংলী জিনিস নয় কিন্তু। সবগুলি জিনিসই বোধহয় একজন শহুরে লোকেরই ব্যবহারের জিনিস। ব্যাপারটা রহস্যময়। দামি রুপোর কাস্ক পায় তিতির। তার উপরে এনগ্রেভ করা ছিল মালিকের নামের ইনিশিয়ালস্। ইংরেজিতে লেখা ছিল, এস. ডি.।

আমি পাই একটি ছুরি। আমেরিকান। রেমিংটন কোম্পানির। ফার্স্টক্লাস ছুরি। পাওয়ামাত্রই কোমরের বেল্টে ঝুলিয়েছি। তার হাতির দাঁতের বাঁটেও লেখা ছিল এস, ডি.।

আর ঋজুদা পেয়েছে প্যারিসের ক্রিশ্চিয়ান ডায়রের দুর্মূল্য সুগন্ধি-মাখা একটি সাদা কিন্তু ভীষণ নোংরা রুমাল। তারও এক কোনায় হালকা নীল সুতোয় লেখা ছিল এস. ডি.।

রুপোর কাস্ক-এ কী একটা তরল পদার্থ ছিল। ঋজুদা গন্ধ শুঁকে তারপর একটু ঢেলে ফেলে অবাক হয়ে তাকিয়েছিল আমাদের দিকে। আমরাও সেই লাল পানীয়র দিকে বোকার মতো তাকালে ঋজুদা নিজের মনেই বলেছিল, আশ্চর্য!

কেন? আশ্চর্য কেন? আমরা জিজ্ঞেস করেছিলাম।

ঋজুদা বলেছিল, লণ্ডনের বেইজওয়াটার স্ট্রিটে একটি ছোট্ট অস্ট্রিয়ান রেস্তোরাঁতে খেতে গেছিলাম আমরা এক নৃতত্ত্ববিদ বন্ধুর সঙ্গে। সেখানে আলাপ হয়েছিল অন্য একজন নৃতত্ত্ববিদের সঙ্গে। তাঁর নাম আজ আর মনে নেই। তবে এটুকু মনে আছে যে, তিনি পুব-আফ্রিকার রিফ-ভ্যালিতে ডঃ লিকি এবং মিসেস লিকির নেতৃত্বে কিছু কাজ করেছিলেন। কত লোকের সঙ্গেই তো আলাপ হয়! কিন্তু মনে থাকার মতো তো সকলে নন। ভদ্রলোকের তরুণ বয়স, সুন্দর চেহারা এবং একটা অস্বাভাবিক অভ্যেসের কারণে ওঁকে মনে আছে এখনও। উনি কখনও জল খেতেন না। সেটা আশ্চর্যের কিছু নয়। অনেক ইউরোপিয়ানই জল খান না। কিন্তু উনি স্প্যানিশ ওয়াইন এবং তাও একটিমাত্র বিশেষ ব্র্যাণ্ডের ওয়াইন খেতেন সব সময়। আমার বন্ধুই বলেছিলেন, অন্য কোনোরকম পানীয় তিনি ছুঁতেনই না। সেই পানীয়র নাম বুলস্ ব্লাড। সে রাতে ওঁর অনুরোধে আমিও খেয়েছিলাম। ভাল, তবে দারুণ কিছু একটা নয়।

কী বললে? ষাঁড়ের রক্ত? বুলস্ ব্লাড! তিতির বলেছিল।

হ্যাঁ। এই অদ্ভুত নামের জন্যই পানীয়র কথাটা মনে আছে এতদিনের ব্যবধানেও। আমার বন্ধু ওঁকে ঠাট্টা করে বলেছিলেন, তুমি তো একাই একটা ওয়াইন কোম্পানিকে বড়লোক করে দিলে হে।

তোমার সঙ্গে কি তাঁর পুব-আফ্রিকার চোরাশিকারি বা অন্য কোনো ব্যাপার আলোচনা হয়েছিল?

আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম ঋজুদাকে।

মনে করতে পারছি না। বোধহয় হয়েছিল। হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়েছে। আমি ওঁকে বলেছিলাম যে, লেক লাগাজার কাছে আমি সিলিকার মতো কিছু দেখেছিলাম এবং গোরোংগোরো ক্র্যাটারের একটি জায়গার মাটি দেখে আমার মনে হয়েছিল যে, ওখানে হেমাটাইট বা ডোলোমাইট থাকলেও থাকতে পারে। হ্যাঁ, হ্যাঁ। পরিষ্কার মনে পড়ছে বলেছিলাম।

বললে কেন? উনি তো ভূতত্ত্ববিদ নন। নৃতত্ত্ববিদ।

বলেছিলাম এমনিই গল্পে গল্পে। এও বলেছিলাম যে, কৃষ্ণ মহাদেশ আফ্রিকার জায়েরেই খনিজ পদার্থ বেশি পাওয়া যায় বলে জানে লোক। আসলে আফ্রিকা এত বড় দেশ এবং এত কিছু লুকিয়ে আছে এর অনাবিষ্কৃত বিস্মৃত বুকের ভিতরে যে, একদিন আফ্রিকা পৃথিবীর সব চাইতে বেশি শক্তিশালী দেশ হয়ে উঠবে। যদি তার আগেই পারমাণবিক বোমাতে পৃথিবী ধ্বংস না হয়ে যায়।

বলেছিলাম বটে। কিন্তু এসব ব্যাপারে মানুষটির কোনো ইন্টারেস্ট ছিল বলে মনে হয়নি।

আমাদের খাওয়া-দাওয়া হয়ে গেছে। কাল আমি ছোট্ট একটি বুশবাক্ মেরেছিলাম। ঋজুদার সাইলেন্সর লাগানো পিস্তল দিয়ে। যতদিন সম্ভব আওয়াজ না করে পারা যায়। সেটাকে স্মোক্ করে নিয়েছি শুকনো খড়-কুটো আর ক্যাক্টাই পুড়িয়ে। এখন প্রচণ্ড শীতও। পলিথিনের ব্যাগে মুড়ে রেখে দিয়েছি। আমাদের কুক তিতির সুন্দর করে কেটে রোস্ট করে দেয়। স্যাণ্ডউইচও করে। কিন্তু নিজে খায় না। বলে, বোঁটকা গন্ধ।

গুহার মুখে, পাথরের আড়ালে বসে ছিলাম। যাতে আমার শিল্যুট দেখা না যায়। টুপি ও জার্কিন চাপিয়ে। পাশে লোডেড রাইফেল রেখে। প্রথম রাতটা আমার পাহারার। পালা। শেষ রাতে ঋজুদা। তিতিরকে আপাতত রেহাই দেওয়া হচ্ছে।

অন্ধকারের মধ্যে আদিগন্ত আকাশে তারারা চাঁদোয়া ধরেছে মাথার উপর। হাতির দল চলা শুরু করেছে। খুব আওয়াজ করে হাতিরা। যখন দলে থাকে। শুঁড় দিয়ে ডালপালা ভেঙে যাওয়ার আওয়াজ তো আছেই। পেটের ভিতরেও নানারকম আওয়াজ হয়। অত বড় বড় পেট তো! যজ্ঞিবাড়ির উনুনের মতোই, তাতে সবসময়ই হজমের প্রক্রিয়া চলছে। অত বড় ব্যাপার, আওয়াজ তো একটু-আধটু হবেই। খলবল, ছলছল পকাত্-নানারকম মজার মজার আওয়াজ হয় ওদের পেটের মধ্যে।

আমাদের দেশের আকাশের তারাদের কিছু কিছু চিনি। আফ্রিকা তো অনেকই পশ্চিমে। তাই আমাদের দেশের আকাশে বছরের এই সময় যা দৃশ্য, আফ্রিকার আকাশের দৃশ্য তার চেয়ে একটু আলাদা। ঝকঝক করছে সপ্তর্ষিমণ্ডল। কত নাবিক, কত বিজ্ঞানী, কত পর্যটক এই তারামণ্ডলী দেখে পথ চিনে নিয়েছেন সৃষ্টির প্রথম থেকে। দেখতে পাচ্ছি, পুবে মরীচি। পশ্চিমে ক্রতু। মধ্যে পুলহ, পুলস্ত্য, অত্রি, অঙ্গিরা, বশিষ্ঠ। এই সপ্তর্ষিমণ্ডলের সাত ঋষির সাতজন স্ত্রী। তিতির জানত না। ওকে কাল বলেছিলাম সে-কথা। স্ত্রীদের নাম সম্ভূতি, অনসূয়া, ক্ষমা, প্রীতি, সন্নতি, অরুন্ধতী এবং লজ্জা। সাত ঋষির স্ত্রীদের দেখা যায় কৃত্তিকাতে। কিন্তু খালি চোখে এবং সহজে অরুন্ধতীকে দেখা যায় না। কৃত্তিকাতে। কিন্তু খালি চোখে এবং সহজে অরুন্ধতীকে দেখা যায় না। কৃত্তিকার মধ্যে অরুন্ধতীই সবচেয়ে বিদুষী এবং খুব বড় তাপসী। অরুন্ধতী কৃত্তিকার মধ্যে না-থেকে রয়েছেন সপ্তর্ষিমণ্ডলেই। তাঁর মহাপণ্ডিত তাপসশ্রেষ্ঠ স্বামী বশিষ্ঠের পাশে। একটি ছোট্ট তারা হয়ে।

আকাশের তারাদের নিয়ে কত সব সুন্দর সুন্দর গল্প আছে আমাদের দেশে। কী সুন্দর সুন্দর সব নাম তাদের। আমার ইংরেজি নামগুলো ভাল লাগে না। বাংলা নামগুলো সত্যিই ভারী সুন্দর। তন্ময় হয়ে তারা দেখতে দেখতে পটভূমির ভয়াবহতার কথা পুরোপুরি ভুলেই গেছিলাম। এই-ই আমাদের দোষ। এইজন্যেই মা ঠাট্টা করে বলেন কপি-রুদ্র। ভিড়ের মধ্যে থেকেও মনে মনে কোথায় যে উধাও হয়ে যাই মাঝে মাঝে। নিজেই জানি না।

হঠাৎ নীচ থেকে কে যেন হেঁড়ে গলায় বলল, হেই কিড। ডোনট শুট। হোল্ড ইওর গান্।

ব্রহ্মতালু জ্বলে গেল। ভয়ও পেলাম কম না।

কার এত দুঃসাহস যে, আমাকে কিড বলে? আর আমার চোখ এড়িয়ে গুহার নীচে মানুষটা এলই বা কী করে? ওর কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই আমি রাইফেল তুলেছিলাম আওয়াজটার দিকে। ব্যারেলের সঙ্গে লাগানো টর্চের বোতাম টিপতে গিয়েও কী ভেবে টিপলাম না। বললাম, হ্যান্ডস্ আপ।

লোক তেমনিই হেঁড়ে ডোন্ট-কেয়ার গলায় হেসে উঠল। অন্ধকারে পাহাড়ের গুহায় গুহায় তার হাসি খাঃ খাঃ খাঃ করে আমাকে অপমান করতে লাগল।

আবার বললাম, হ্যাণ্ডস্ আপ। উ্য লাউজি ফুল্।

লোকটা তবুও হাসি থামাল না। বলল, মাই হ্যাণ্ডস্ ফুল। উ্য রিয়্যাল ফুল।

বলেই বলল, টাঁড়বারো।

দেখেছ! কী ইডিয়ট, কোড ওয়ার্ডটা আগে তো বলবে! যদি ইতিমধ্যে গুলি করে দিতাম!

টাঁড়বারো কথাটা অদ্ভুত শোনাল ওর মুখে–অনেকটা ঠাঁশবাডো গোছের।

আমিও বললাম, টাঁড়বারো।

বলেই, রাইফেল নামিয়ে নিলাম।

ততক্ষণে ঋজুদা ও তিতিরও বাইরে এসে পড়েছে। ওরা বোধহয় এতক্ষণ আড়ালে থেকে কথাবার্তা শুনছিল।

তিতির লাফাতে লাফাতে নীচে নামতে লাগল আমার পেছন পেছন, সোয়াহিলিতে কী যেন বলতে বলতে, ডামুর প্রতি।

ডামু হেঁড়ে গলায় হেসে আমাদের দুজনের পিঠে দুই বিরাশি সিক্কার থাপ্পড় কষিয়ে বলল, ওয়াটোটো ওআংগু ওআভাগো! অর্থাৎ, ওরে আমার ছেলেমেয়েরা!

খুঞ্চুমুনু, পুঞ্চুমুনুটা আর বলল না।

ঋজুদা গুহার মুখেই বসে পাইপ খাচ্ছিল। ওখান থেকে বলল, ডামু, তোমার সঙ্গের বন্ধু এতক্ষণ কী খাচ্ছিল? জল?

হি ড্রিঙ্কস নো ওয়াটার। হি ড্রিঙ্কস সামথিং রাঙ্গি ইয়াকে নিয়েকুণ্ডু কামা ডামু। মানে, যার রঙ রক্তের মতো লাল।

ঋজুদা সঙ্গে সঙ্গে রুপোর কাস্কটা হাতে নিয়ে দৌড়ে নেমে এল। ডামুর পাহাড়প্রমাণ শরীরের পিছনে যে অন্য একজন লোক হাত-পা পিছমোড়া অবস্থায় মাটিতে পড়ে আছে তা আমরা কেউই এতক্ষণ লক্ষ করিনি। ঋজুদার সঙ্গে আমরাও তার কাছে গিয়ে পৌঁছলাম। লোকটার নাক কেটে রক্ত পড়ে শুকিয়ে কশ বেয়ে জমে ছিল। ডামু বোধহয় ঘুষিটুসি মেরেছে। আমাদের দেখেই লোকটা ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। ঋজুদার দিকে বোকা-বোকা চোখে তাকিয়ে থাকল।

ঋজুদা জিজ্ঞেস করল, কী নাম আপনার?

সার্গেসন ডবসন।

হুঁ।

লোকটি এবার হাসল ঋজুদার দিকে চেয়ে। ইংরেজিতে বলল, আমাকে চিনতে পারলে না মিস্টার বোস? সেই লণ্ডনের টিলার হট রেস্তোরাঁতে দেখা হয়েছিল তোমার সঙ্গে, টম ম্যাকআইভর-এর সঙ্গে। মনে পড়ে? চার-পাঁচ বছর আগের কথা।

মনে পড়ে। কিন্তু আপনি এখানে কী করছিলেন?

সেইই ত। সেই কথাই ত বলতে চাইছি। কিন্তু শুনছে কে? আপনিই তো বলেছিলেন লেক লাগাজাতে সিলিকা, রিফট ভ্যালিতে হেমাটাইট ডলোমাইট; সেই অবধি প্রফেসর লিকির সঙ্গে সব সংস্রব ছেড়ে দিয়ে এইই করে বেড়াচ্ছি। হি-হি।

লোকটা লাজেগোবরে অবস্থাতেও স্মার্ট হবার চেষ্টা করল। নাকে ঘুষি খাওয়াতে সব শব্দের আগে একটি করে চন্দ্রবিন্দু অনিচ্ছাকৃতভাবে যোগ হয়ে যাচ্ছিল।

ডামু হঠাৎ ওর পিছনে অসভ্যর মত এক লাথি মেরে লোকটাকে উল্টে ফেলে দিল। পড় তো পড় একেবারে নাক নীচে করেই। হাঁউমাউ করে বিশুদ্ধ ইংরেজিতে কেঁদে উঠল লোকটা।

ঋজুদা বাংলায় বলল, রুদ্র, ওকে খেতে দে। তবে ও এখানেই থাকবে। একটা ত্রিপল বের করে দে গাড়ি থেকে। বাঁধনও খুলবি না। ডামুকে বলছি, যেন আর মারধোর না করে।

এই বলে ডামুকে নিয়ে গুহার দিকে উঠে গেল ঋজুদা।

.

আমি লোকটাকে সোজা করে বসালাম। তিতির গেল ওর জন্যে খাবার আনতে। আমি যখন জিপ থেকে ত্রিপল নামাচ্ছি তখন লক্ষ করলাম, লোকটা এক দৃষ্টিতে আমার মুখে তাকিয়ে আছে। রোগা-পটকা একজন জ্ঞানী-গুণী সাহেব। দেখে মনে হয়, প্রফেসর বা কবি। ঋজুদা এর উপর বিশেষ প্রসন্ন নয় বলে মনে হল। আমার কিন্তু মায়া হল ভদ্রলোককে দেখে। কোথাও কোনো ভুল হচ্ছে ঋজুদার।

তিতির খাবার নিয়ে এসে বলল, এইভাবে একটা মানুষ এই ঠাণ্ডায় বাইরে পড়ে থাকতে পারে? তাছাড়া, সিংহ বা চিতা খেয়ে নেবে যে।

পাহারায় তো থাকবই কেউ না কেউ। তাছাড়া আমি কী করব! ঋজুদার অর্ডার!

তিতির জল দিয়ে ওর নাক মুছে দিল। তারপর খেতে দিল। গাণ্ডেপিণ্ডেই খেলেন মিস্টার ডন। ধন্যবাদ দিলেন আমাদের। তারপর হাঁউমাউ করে মেয়েদের মতো কাঁদতে লাগলেন।

তিতির বলল, ঋজুকাকা নিশ্চয়ই ভুল করছে। এ লোকটা খারাপ হতেই পারে না।

আমারও ত’ তাইই মনে হচ্ছে। কিন্তু ঋজুদাকে কে বলবে বল যে, সে ভুল করছে? এদেশে মানুষ বড় হয়ে গেলে, তার নামডাক হয়ে গেলে, গর্বে বেঁকে গিয়ে তারা ভাবে যে, দে আর ওলওয়েজ রাইট, ইভন হোয়েন দে আর রং।

ঋজুদা কিছুক্ষণ পর নেমে এল। ডামু বোধহয় জমিয়ে খাচ্ছে। ওর গল্প শুনতে হবে। কী কী হল পথে? কেমন করে ও এল? এই ডবসনকেও বা জোটাল কেমন করে?

তিতির বলল, ঋজুকাকা, তুমি বোধহয় লোকটার প্রতি অন্যায় করছ!

ঋজুদা বলল, হয়তো করছি।

আমার দিকে ফিরে বলল, রুদ্রবাবুরও কি তাই-ই মত?

আমি চুপ করে রইলাম।

ঋজুদা একটু চুপ করে থেকে বলল, বুঝেছি। লোকটা যে সাহেব! সাহেবি পোশাক পরনে। অক্সোনিয়ান অ্যাসেন্টে ইংরেজি বলে, সুতরাং সে কি আর চোর হতে পারে, না মিথ্যেবাদী? এই সায়েব-ভীতি এবং প্রীতিতেই বাঙালি জাতটা গেল। যে-কেউ যদি চোস্ত ইংরেজি বলে বা কারো পিঠ চাপড়ায় অমনি তোরা তাকে পুজো করতে লেগে যাবি। আমি যা বলছি, তাই-ই হবে। আমার কথার উপর কথা নয় কোনো। ডন এই বাইরেই পড়ে থাকবে।

তিতির বলল, সিংহে হায়নায় খেয়ে নেবে যে!

নিলে নেবে।

এ কী রে বাবা! তিতির স্বগতোক্তি করল।

ঋজুদা উত্তর না দিয়ে ডবসনকে সায়েবদেরই মতো ইংরেজিতে বলল, আপনার কাগজপত্র আমি দেখলাম। আপনার জীবনের ভয় নেই কোনো। খেতে-টেতেও পাবেন। সকালে আধ ঘণ্টার জন্য আপনার দড়ি খুলে দেওয়া হবে। বিকেলেও তাই। পালাবার চেষ্টা করবেন না। পালাবার চেষ্টা করলেই মেরুদণ্ডে গুলি খাবেন।

মিস্টার বোস! আপনি আমাকে চিনতে পারলেন না! আপনার বন্ধু মিঃ ম্যাকআইভরের আমি এত বন্ধু! আপনি এমন একজন চমৎকার লোক।

ঋজুদা বলল, আমি জানি যে, আমি চমৎকার লোক। আপনার সার্টিফিকেটের দরকার নেই আমার।

তারপর বলল, আমি ছেড়ে দিলে, ফিরে গিয়ে ফিল্মের সিনারিও লিখবেন। খুব নাটকীয়ভাবে কথা বলতে পারেন আপনি। কিন্তু জীবনে এসবের কোনোই দাম নেই।

ঋজুদা গুহায় চলে গেল ডামুকে নিয়ে। আমি আর তিতির সার্গেসন ডবসনকে মরা শুয়োরের মত ত্রিপল চাপা দিয়ে মুখের কাছে একটা বোতল রেখে দিয়ে চলে এলাম!

গুহায় গিয়ে দেখি, ওয়্যারলেস্ সেট সামনে নিয়ে ঋজুদা ও ডামু খুব চিন্তিত মুখে বসে আছে। ন্যাশনাল পার্কের হেডকোয়ার্টার্সে বোধহয় মেসেজ পাঠিয়েছে কোনো। জবাব পাচ্ছে না। ন্যাশনাল পার্ক হেডকোয়ার্টার্স তো আর লালবাজার নয়, স্কটল্যাণ্ড ইয়ার্ডও নয় যে, সারারাত তারা চোর-ডাকাতি-খুনির মোকাবিলা করবার জন্যে হাঁ করে ওয়্যারলেস সেটের সামনে বসে থাকবে!

আমি আর তিতির নীরব দর্শকের মতো ঋজুদা আর ডামুর দিকে চেয়ে বসে রইলাম। হঠাৎ ব্লিপ ব্লিপ আওয়াজ আসতে লাগল। ঋজুদা বলল, টাঁড়বাড়ো, টাঁড়বাড়ো।

ওপাশ থেকে কেউ কথা বলল। হেডফোনে কান লাগিয়ে ঋজুদা উদগ্রীব হয়ে কী সব শুনল অনেকক্ষণ ধরে। তারপর বলল, থ্যাঙ্কস্ আ লট। রজার!

তারপর বলল, তিতির, ডামুকে ভাল করে খাওয়া। রুদ্রকেও। কারণ এর পর কদিন খেতে পাবে না ওরা তার ঠিক নেই।

আমার খিদে নেই। আমি বললাম, একটু আগেই তো খেলাম। খামোকা খাব কেন?

খেতে বলছি। খাবি।

যাঃ বাবা। বমি হয়ে যাবে যে।

ঠিক আছে। তবে তোর হ্যাভারস্যাক ঠিক করে নে। খাবার, জল, গুলি, কম্পাস, দূরবিন, যা যা নেবার নিয়ে নে। এবার তোর সঙ্গে আমাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবে। ডামু, চিয়ার আপ।

ঋজুদার চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। মনে হল, আমি আর তিতির যখন নীচে ছিলাম তখন ডামু আর ঋজুদার মধ্যে কোনো গোপন পরামর্শ হয়েছে।

ঋজুদা বলল, তোর পিস্তল এবং রাইফেলটাও নিতে ভুলিস না। ডামু তোমারটা কোথায়?

ডামু বলল, কোমর ব্যথা হয়ে গেছে। হ্যাভারস্যাকে রেখে একটু বিশ্রাম দিচ্ছি কোমরকে।

বেশ করছ।

ডামু খাওয়া-দাওয়ার পর ঋজুদার কাছ থেকে চেয়ে একটা নেপোলিয়ন ব্রাণ্ডির বড় বোতল নিয়ে, ঢুকঢুক করে কিছুটা খেয়ে বোতলটাকে ট্যাঁকস্থ, থুড়ি, হ্যাভারস্যাকস্থ করল। বলল, বড়ই ধকল গেছে। শরীরটাকে একটু মেরামত করে নিলাম।

আমাদের গোছগাছ হয়ে গেলে আমরা সকলে নীচে নেমে এলাম। নীচে এসে, ঋজুদা ডবসন-এর কাছে ইনিয়ে-বিনিয়ে ক্ষমা চাইল। তারপর তার হাতের বাঁধন খুলে দিয়ে বলল, আপনি মুক্ত। এখন আপনি যেখানে যাবেন সেখানেই এরা আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসবে।

আমি আর যাব কোথায়? আমি তো ঘুরে ঘুরেই বেড়াচ্ছি। হেমাটাইটের সন্ধানও পেয়েছি। ডোলোমাইটেরও। তাছাড়াও এমন কিছু পেয়েছি যে, শুনলে আপনি অজ্ঞান হয়ে যাবেন।

কী?

ইউরেনিয়াম।

আমি আর তিতির একসঙ্গে অবাক হয়ে বললাম, ই-উ-রে-নিয়াম!

হ্যাঁ।

ঋজুদা বলল, তোরা কথা বলিস না, ওঁকে বলতে দে।

আপনি জানেন যে, তানজানিয়া কমুনিস্ট দেশ। এখানে ইউরেনিয়ামের এত বড় ডিপোজিট আছে তা জানাজানি হয়ে গেলে সারা বিশ্বে হৈহৈ পড়ে যাবে। ভারত মহাসাগরের মধ্যে যে সেশেল্স দ্বীপপুঞ্জ আছে তাও কমুনিস্ট দেশ।

আমার মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, জানি। চমৎকার জায়গা। একেবারে স্বর্গ। আমিও গেছি।

ঋজুদা ধমকে বলল, চুপ কর। ডবসনকে বলল, বলুন, কী বলছিলেন।

সেই সেশেল্স-এর রাজধানী মাহেতে শিগগিরই ক্যু হবে। ক্যাপিটালিস্ট দেশরা চাইছে, যেন-তেন-প্রকারেণ সেশেল্সকে কব্জা করতে, কারণ আমেরিকার যেমন ডিয়েগো-গার্সিয়া, রাশিয়ারও তেমন সেশেলস। সাবমেরিন আর জাহাজের আড্ডা সেটা। তানজানিয়াতে ইউরেনিয়ামের এত বড় ডিপোজিট আছে জানতে পারলে তানজানিয়ার ওয়াইল্ডলাইফ-এর চেয়েও তার দাম অনেক বেশি বলে তানজানিয়ানরাও বুঝবে। যেমন বুঝবে রাশিয়া ও আমেরিকা। আমার দুঃখ এই-ই যে, ব্যাপারটা জানাজানি হলেই তানজানিয়ার এই বন্যপ্রাণীদের সর্বনাশ হবে।

বাঃ। আপনি দেখছি বন্যপ্রাণীদের মস্ত বন্ধু।

ডামু বলল উৎকট-গন্ধ সিগারের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে।

বন্ধু নয়? কোন্ সহৃদয় মানুষ এদের এই নিধন চোখ বুজে সহ্য করতে পারে?

তাহলে আপনি রওয়ানা হন। জিপে করে ছেড়ে দিয়ে আসবে এরা আপনাকে। যেখানে যেতে চান। ঋজুদা ডবসন-এর কথা থামিয়ে বলল।

রাতটা আপনাদের সঙ্গেই থেকে যাই না কেন?

না, তা হয় না, মিস্টার ডবসন। আপনি ম্যাকআইভরের বন্ধু। তাই আপনাকে ছেড়ে দিচ্ছি। নইলে, আমরা যা খুঁজতে বেরিয়েছি, তা আমাদের আগেই আপনি খুঁজে পেয়েছেন; এ কথা জানবার পরও আপনাকে আমাদের বন্দী করে রাখাই উচিত ছিল। তবে আপনার সমস্ত কাগজপত্র ও ম্যাপ যখন আমরা পেয়ে গেছি তখন আপনাকে বন্দী করে রেখে বা প্রাণে মেরে আমাদের লাভ নেই কোনো।

ডামু বলল, আপনার কাছে ঐ ম্যাপের কোনো কপি-টপি নেই তো?

কপি করার সময় আর পেলাম কোথায়? তার আগেই তো—

না পেয়ে থাকলেই ভাল। এখন বলুন, কোথায় আপনাকে ছাড়ব। আমরা আপনার ভাল চাই। যাতে ইয়ালো বেবুনে আপনার কান ছিঁড়ে না নেয়, অথবা হায়নার দল আপনার নাক চোখ খুবলে না নেয়, অথবা সিংহের দল আপনাকে কিমা না করে দেয়, সেইজন্যেই আপনাকে নিরাপদে পৌঁছনোর ব্যবস্থা।

ডবসন একটুক্ষণ কী ভাবলেন। তারপর বললেন, আমার পাসপোর্ট ইত্যাদি তো আমাকে ফেরত দেবেন?

নিশ্চয়ই। এই নিন। বলে ডামু একটা প্যাকেট ধরিয়ে দিল ওঁর হাতে।

এখানে আপনাদের সঙ্গে থাকলেই কিন্তু আমি নিরাপদে থাকতাম। আমার অনেক শত্রু।

ডামু বলল, কিন্তু আমাদের তাতে বিপদ। তাছাড়া আপনিও আমাদের মিত্র নন।

ও।

ডবসন একটু চুপ করে থেকে বললেন, তাহলে আমাকে পার্ক-হেডকোয়াটার্সের কাছেই পৌঁছে দিন। সেখানে আধ মাইলের মধ্যে ছেড়ে দিলেই হবে। আপনারা ফিরে আসতে পারেন। আমার সঙ্গে আপনাদের কেউ দেখলে বিপদ হবে আপনাদেরই।

আপনি খুব বিবেচক।

ঋজুদা বলল।

তারপর বলল, তাই-ই হবে।

ইতিমধ্যে ঋজুদার কথামতো তিতির গুহাতে গিয়ে একটা তলায় স্পাইক বা কাঁটা লাগানো জুতো নিয়ে এল। জুতোটা আমারই তা দেখে মেজাজ গরম হয়ে গেল।

ঋজুদা বলল, আপনার জুতোটা একেবারে ছিঁড়ে গেছে। ওটাকে ছেড়ে এটা পরে ফেলুন। আপনার পায়ের মাপ নিশ্চয়ই সাত।

ডবসন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। বললেন, আশ্চর্য! আপনি…

পরক্ষণেই বললেন, ছিঃ ছিঃ, তা কেন, কী দরকার? বেশ তো আছে জুতো জোড়া। আপনাদের জুতো দিয়ে দিলে আপনাদের কষ্ট হবে না! এখনও চলবে কিছুদিন এ জুতোজোড়া। আমাকে দিলে আপনাদের জুতো কমে যাবে না?

ডামু বলল, আমরা সবসময়ই যথেষ্ট জুতো নিয়ে চলাফেরা করি। কিছু পরার জন্যে, আর কিছু মারার জন্যে।

বলেই ডবসনসাহেবকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে বসিয়ে প্রায় জোর করেই তাঁর সরব আপত্তি না শুনে জুতো-জোড়া তাঁর পা থেকে খুলিয়ে আমার নীরব আপত্তি না-শুনে আমার জুতো-জোড়া তার পায়ে গলিয়ে, ভাল করে ফিতে বেঁধে দিল।

মিস্টার ডসনের জুতো-জোড়া অদ্ভুত। বেঁটে লোকেরা তাঁদের লম্বা দেখাবার জন্যে উঁচু হিলের জুতো পরেন বটে, কিন্তু ওঁর জুতো-জোড়া আশ্চর্য। নীচে রাবার। তার উপরে কাঠের খড়মের মতো একটা ব্যাপার–তারও উপরে আবার রাবার।

জুতো-জোড়া খোলার পর ঋজুদা বাংলায় অতি নরম এবং স্বাভাবিক গলায় টেনে টেনে বলল, রুদ্র তৈরি হয়ে নে। যন্ত্র বার কর। এই দুটোই আমাদের যম। এক্ষুনি এদের বেঁধে ফেলতে হবে। ঋজুদার এই হঠাৎ-কথাতে মিঃ ডকসন যেন চমকে উঠলেন। ডামুর কোনোই ভাবান্তর হলো না। বাংলায় বলেছিল ঋজুদা।

এমন ভাবে হাসি-হাসি মুখে বাঁ হাতটা ডামুর কাঁধের উপর রেখে কথাগুলো বলল ঋজুদা যে, ডামু দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারল না যে, ওয়ানাবেরিরও বাবা আছে।

ঋজুদা কী যে বলছে, তা যেন আমার মাথায়ই ঢুকল না। ডামু! ওয়ানাবেরি! যম?  তবে, তাকে দলে আনা…

তিতির কিন্তু এমনভাবে ব্যাপারটাকে নিল যেন, কিছুই হয়নি। অবাক হলাম আমি। ডামু কিছু বোঝবার আগেই তিতির তার পিস্তল বের করে ডামুর পিঠে ঠেকিয়ে দিল। ঠেকাতে ঠেকাতেই কক্ করে নিল। আমি টিঙটিঙে ডবসনের দু-পায়ের গোড়ালির কাছে একটা জব্বর জুডোর লাথি কষালাম। ওঃ মাই গড! বলে ডবসন চিত হয়ে পড়লেন। ওঁর বুকে চেপে বসে আমি পিস্তল ঠেকিয়ে রাখলাম ওঁর গলাতে। ঋজুদা তড়িৎগতিতে নাইলনের দড়ি দিয়ে ডামুর দু-হাত পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলল।

কয়েক সেকেণ্ড ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চুপ করে রইলেও প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ডামু ঋজুদাকে এমন এক লাথি মারল যে, ঋজুদা ছিটকে পড়ল দূরে। এবং একই সঙ্গে তার পাহাড়প্রমাণ পিছন দিয়ে এক ধাক্কা তিতিরকে। হালকা-পা তিতির চিতপটাং হয়ে ছিটকে গেল কিছুটা। পরক্ষণেই ডামু আমার দিকে দৌড়ে এল হাত-বাঁধা অবস্থাতেই। পাছে, ডন উঠে পড়ে, তাই আমি তাড়াতাড়ি ওর বুকের উপর বুট-পরা পায়ে দাঁড়িয়ে উঠে এক পা বুকে আর এক পা মুখে রেখে চেপে থাকলাম। পিস্তলটা ডামুর দিকে ঘুরিয়ে চিৎকার করে বললাম, হ্যাণ্ডস আপ ডামু।

কিন্তু ঐ পাহাড়প্রমাণ সাংঘাতিক লোকটা সত্যিই যমদূত। যমের ভয় ওর নেই। ও যখন আমার চিৎকারে মোটেই ভ্রূক্ষেপ করল না তখন ওর বুকের বাঁ দিকে নিশানা নিয়ে পিস্তলটা সোজা করে ধরলাম আমি। কোনো জীবন্ত জিনিসকে মারতে আমার কখনই ভাল লাগে না। যদিও শিকার করেছি অনেক, কিন্তু মারবার মুহূর্তে বড়ই খারাপ লাগে। তেলাপোকাকেও মারতে ভাল লাগে না। আর আমারই মতো একজন মানুষকে মারা নিয়ে কথা। যাকে চিনি, জানি…। কিন্তু আমার নিজের জীবন ছাড়াও তিতির আর ঋজুদার জীবনেরও প্রশ্ন। একবার যদি ও পিস্তলটা আমার হাত থেকে ফেলে দিতে পারে তাহলেই

ডামুর পিছন থেকে ঋজুদা একটা চিতাবাঘের মতো দৌড়ে আসছিল। দৌড়ে আসছিল না বলে, উড়ে আসছিল বললেই ভাল হয়। তিতিরও তাই। তিতির আর ঋজুদা যেন একসঙ্গেই ওর ঘাড়ে মাথায় এসে পড়ল এবং সঙ্গে সঙ্গে ফটাস করে একটা আওয়াজ হল।

তিতির পিস্তলের নল দিয়ে প্রচণ্ড জোরে বাড়ি মেরেছে। কিন্তু ঐ সাংঘাতিক সময়েই সেমসাইড হয়ে গেল। তিতিরের পিস্তলের নল গিয়ে পড়ল ঋজুদার মাথার পিছনে।

আঃ! বলে একটা অস্ফুট শব্দ করে ঋজুদা ডামুর পিঠের কাছ থেকে গড়িয়ে পড়ে গেল মাটিতে। ঘটনাটার অভাবনীয়তায় তিতির, এ মাঃ, কী করলাম আমি! কী করলাম! বলে হাতের পিস্তলটা ডামুর পায়ের কাছে ফেলে দিয়ে দৌড়ে ঋজুদার কাছে। গিয়ে ঋজুদার মাথাটা কোলে নিয়ে বসল।

আমি আতঙ্কিত হয়ে দেখলাম ডামু হাঁটু গেড়ে বসে দুহাত পিছমোড়া করে বাঁধা অবস্থাতেই পিছন ফিরে পিস্তলটা তুলে নিল। নিয়েই, ক্রিকেটের পেস্-বোলাররা বল করবার সময় যেমন জোরে হাত ঘোরান তেমন করে এক ঝট্‌কাতে জোড়া-হাতকে মাথার উপর দিয়ে সামনে নিয়ে এসে হাতটা আমার দিকে তুলতে লাগল।

অনেক সুন্দর গল্প শুনিয়েছিলে তুমি ডামু। ওয়ানাবেরি-ওয়ানাকিরির গল্প। ভেবেছিলাম, আরও অনেক গল্প শুনব তোমার মুখ থেকে এই উদাম, উন্মুক্ত, কৃষ্ণ মহাদেশের নক্ষত্রখচিত শীতার্ত রাতে। আগুনের পাশে বসে; কিন্তু…

আমার হাতটা খোলাই ছিল, কব্জিটা আর একটু শক্ত করলাম। তারপর তর্জনী দিয়ে ট্রিগারে চাপ দিলাম। আমার শর্ট-ব্যারেল্ড পিস্তলের আওয়াজ টেডি মহম্মদ পাহাড়ে আর অন্যান্য পাহাড়ে, রুআহা ন্যাশনাল পার্কের বুকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দাঁড়িয়ে-থাকা মৌন সাক্ষীর মতো বাওবাব গাছেদের নিশ্চল নির্বাক বাকলে পিছলে গিয়ে আবার বুমেরাং-এর মতো গমগমিয়ে ফিরে এল। ডামু মাটিতে পড়ে যেতে যেতেও জোড়া-হাতে ধরা তিতিরের পিস্তলটা আরেকবার উঁচু করে গুলি করল আমার দিকে। আমার দ্বিতীয় গুলির শব্দের সঙ্গে ওর গুলির শব্দ মিশে গিয়ে অন্ধকার রাতের নীলাভ তারাদের কাঁপিয়ে দিয়ে গেল যেন।

ডামু শেষ কথা বলল জড়িয়ে জড়িয়ে, হে কিড, ডোন্ট শুট।

ঋজুদা অজ্ঞান হয়ে গেছিল। মরেই গেল কি না, তাইই বা কে জানে! মাথার পিছনে পিস্তলের নলের এমন প্রচণ্ড বাড়ি খেলে মরে যাওয়া অসম্ভব নয়।

ডামু পড়ে যেতেই ডনকে ছেড়ে দিয়ে তিতিরের পিস্তলটা তুলে নিলাম আমি। ডবসন বোধ হয় আমাকে আর তিতিরকে আণ্ডার-এস্টিমেট করেছিলেন। মনে হল, এখন হুঁশ হয়েছে। ওঁকে বললাম, উঠে চুপ করে বসে থাকুন। নইলে গুলিতে আপনার মাথার খুলি উড়িয়ে দেব।

মনে হল, কথাটা উনি বুঝলেন।

ডামুর কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে হিপ-পকেট থেকে টর্চ বের করে ওর মুখে ফেললাম। ভেবেছিলাম, ওকে একটু জল খাওয়াব মরার আগে। আমার সারা শরীর কাঁপছিল। ভয়ে নয় আনন্দে নয়; দুঃখে। ভাবছিলাম, আমি কী খারাপ! একটি ছোট মৌটুসকি পাখি, কি একটা প্রজাপতিও তৈরি করতে শিখিনি আমরা, অথচ কত সহজে ডামুর মতো এমন দৈত্যাকার প্রাণোচ্ছল হাঃ হাঃ হাসির একটা মানুষকে মেরে ফেললাম।

তিতির আমাকে জড়িয়ে ধরল। এখন তিতিরের চোখে জল নেই, তিতির এখন আমাদেরই একজন, ও আর শুধু উৎসাহী ছোট্ট, মিষ্টি মেয়েমাত্রই নয়, একজন বুদ্ধিমতী, সাহসী, অ্যাডভেঞ্চারার হয়ে উঠেছে।

রুদ্র! তুমি এত ঘামছ কেন, এই শীতে? গরম লাগছে তোমার?

গরম? না তো! উত্তেজনায় শরীর গরম হয় বটে কিন্তু ঘামবার মতো তা নয়।

তোমার হাতটাও চ্যাটচ্যাট করছে ঘামে।

বাঁ হাতে একটু যেন ব্যথা-ব্যথা করছে। কী ব্যাপার বুঝছি না।

তিতির টর্চ জ্বেলে আমার হাতে ফেলেই চেঁচিয়ে উঠল। রক্ত! রক্ত! তোমার গুলি লেগেছে।

আমি ভাল করে দেখলাম। ব্যাপারটা ঠাণ্ডা মাথায় বোঝবার চেষ্টা করলাম। গুলিটা লেগেছে বটে কিন্তু কনুই আর বগলের মাঝামাঝি বাঁ হাতের বাইরের দিকে ছুঁয়ে গেছে শুধু। হাতের মধ্যে লাগলে তিতিরের বলার অপেক্ষায় থাকতে হত না। ভগবানকে মনে মনে ধন্যবাদ দিলাম। ঋজুদা অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। আমার আঘাতটা যদি গুরুতর হত, তবে ডবসনের হাতে পড়ত তিতির একা।

আমার ব্যাথাটা আস্তে আস্তে বাড়ছিল। সুন্দরবনের মাঝিদের কাছে শুনেছিলাম, হাঙরে যখন পা কেটে নিয়ে যায়, তখন নাকি বোঝাই যায় না। বাবার বন্ধু মিলিটারির ব্রিগেডিয়ার মুখার্জিকাকুর কাছে শুনেছি, যুদ্ধে যখন গুলি লাগে, কিন্তু যদি ভাইটাল জায়গায় না লাগে, তখন উত্তেজনার সময় নাকি বোঝাই যায় না। বোঝা যায় পরে।

তিতিরকে বললাম, বেশি কিছু হয়নি আমার। পরে দেখো। এখন ঋজুদার কাছে যাও। ডবসনকে আমি পাহারা দিতে লাগলাম আর তিতির লাগল ঋজুদার পরিচর্যায়। মাথার পিছনে ওয়াটার বটল খুলে থাবড়ে-থাবড়ে জল দিচ্ছিল ও। ভাবছিলাম, ঠাকুমা এখানে থাকলে শ্বেতপাথরের খল-নোড়াতে মধু দিয়ে মকরধ্বজ মেড়ে খাইয়ে দিত একটু। আর ঋজুদা সঙ্গে সঙ্গে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে পড়ত।

ডবসন, মনে হল, ঘুমিয়েই পড়েছে। কোনো সাড়া-শব্দ নেই। জানি না, হয়তো চোখ বন্ধ করে মটকা মেরে মড়ার মতো পড়ে কোনো মতলব ভাঁজছে। মিনিট-পনেরো পরে, তিতির বলল, জ্ঞান আসছে ঋজুকাকার।

ভাল।

অনেকক্ষণ আমরা ডামু আর ডবসনকে নিয়ে ব্যস্ত আছি। ভুলেই গেছি যে, আফ্রিকার এক নামী ন্যাশনাল পার্কের ভেতরে রাতের বেশ অন্ধকারে খোলা জায়গায় রয়েছি। কথাটা মনে হতেই আমি বেল্টে ঝোলানো টর্চটা ক্ল্যাম্প থেকে এক টানে খুলে, সুইচ টিপে চারদিকে তাড়াতাড়ি করে ঘুরিয়ে ফেলতেই এক সার লাল-লাল ভুতুড়ে চোখ জ্বলে উঠল। হায়না। হায়নাদের হাত থেকে গুগুনোগুম্বরের দেশ থেকে ঋজুদাকে যে কী ভাবে বাঁচিয়ে এনেছিলাম তা ভগবানই জানেন। চোখে আলো পড়তেই অদ্ভুত একটা আওয়াজ করল একটা হায়না এবং পরক্ষণেই পুরো দলটা গা-হিম করা হাসি হাসতে হাসতে হুড়োহুড়ি করে এ-ওর গায়ে পড়ে একটু সরে দাঁড়াল মাত্র। রক্তর গন্ধ পেয়েছে ওরা। ডামুর তো বটেই, নাক-ফাটা ডবসন ও হাতে-গুলি-লাগা আমারও। সারা রাত এখন বাকি। কী যে করব, তা ভেবেই পেলাম না। হায়নার হাত থেকে ডামুর মৃতদেহ বাঁচাব, না নিজেদের? এখানে তো গুলি করা বারণ। যদিও ইতিমধ্যে রাতের অন্ধকার খান-খান হয়ে গেছে গুলির শব্দে।

কিছুক্ষণ পরে ঋজুদা উঠে বসল। উঠে বসেই, যেন কিছুই হয়নি এমনি ভাবে তিতিরকে বলল, কনগ্রাচুলেশনস্। মোক্ষম মার মেরেছিলি তুই। শুধু মারখানেওয়ালা ভুল করে ফেলেছিলি। মারটাই আসল, কাকে মারবি সেটা বাহ্য।

তিতির এবার দৌড়ে গেল গুহাতে। ওষুধপত্র, ব্যাণ্ডেজ ইত্যাদি নিয়ে আসতে। তারপর ঋজুদা আর তিতির দুজনে মিলে টর্চ জ্বালিয়ে দেখে, ভাল করে মারকিওক্রম লাগিয়ে, ব্যথা কমার ওষুধ লাগিয়ে, অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ খাইয়ে দিল পটাপট আমাকে। যন্ত্রণাটা আস্তে আস্তে বাড়ছিল। এবার কমতে লাগল। ঠিক যন্ত্রণা নয়, একটা গরম-গরম, জ্বালা-জ্বালা ভাব।

উঠে দাঁড়িয়ে ঋজুদা ডামুর কাছে এসে দাঁড়াল। বলল, বেচ্চারা!

ডবসনের চোখে মুখে মৃত্যুভয়। অন্তত আমার তাই-ই মনে হল। সে কথা বললামও ঋজুদাকে।

তুইও যেমন! এর জান সেৎসি মাছিদের চেয়েও, আমাদের দেশের কচ্ছপের জানের চেয়েও শক্ত। এর কথা বলব তোদের। একে নিয়ে চল গুহাতে।

ডামু এখানেই পড়ে থাকবে?

হ্যাঁ। ভাল করে ত্রিপল চাপা দিয়ে বেঁধে রাখ। কাল নদীর বালিতে ওকে আমরা কবর দিয়ে যাব। আর রুদ্র যখন পাহারাতে বসবি, পয়েন্ট টু-টু পিস্তল দিয়ে হায়না তাড়াবি। যখনই তারা আসবে।

হায়নারা তো আসবেই, শেয়ালরাও আসবে। পশুরাজও আসতে পারেন স্ত্রী-পুত্র-কন্যা-আণ্ডা-বাচ্চা নিয়ে। আমার মনে হয় আমাদের সুখের দিন এবং প্রতীক্ষার দিনও শেষ হয়ে গেছে। কাল থেকে এখানে আর থাকা চলবে না। রাতেও হয়তো টর্নাডোর দল এসে পড়তে পারে। ওদের পক্ষে কিছুই অসম্ভব নয়। হয়তো হেলিকপ্টারে করে লোক পাঠিয়ে এই গুহাসুদ্ধ বোমা মেরে উড়িয়ে দিয়ে যাবে।

আমরা ডামুকে ভাল করে ঢেকেঢুকে বেঁধে-ছেদে গুহাতে এলাম। ডবসন গুহার মধ্যে ছোট্ট আগুনের সামনে পা জড়ো করে আমাদের মতো করেই বসল।

ঋজুদা ডবসনের বুটের গোড়ালির মধ্যে থেকে পাওয়া ম্যাপ এবং অন্যান্য কাগজপত্র বের করে মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগল। দেখা হয়ে গেলে মুখ তুলে বলল, ডামুকে কত টাকা দেবেন বলে লোভ দেখিয়েছিলেন? আর এমন নাটকীয়ভাবে দুজনের একসঙ্গে আসাটার প্ল্যানটা কার?

ডবসন গলা-খাঁকারি দিল একবার।

আমাদের সময় নেই, সময় নষ্ট করবার। সোজা কথা, সোজা করে, তাড়াতাড়ি বলুন। ঋজুদা বলল।

ফিফটি-থাউজ্যাণ্ড তানজানিয়ান শিলিং! দুজনের একসঙ্গে আসার প্ল্যানটা আমারই।

একটা লোক সৎপথে ফিরে এসেছিল প্রায়, তাকে আবারও ফিরিয়ে নিয়ে গেলেন আপনারা! টর্নাডো, ভুষুণ্ডাদের কথা বুঝি। কিন্তু আপনার মতো মানুষও! ভাবা যায় না। অবশ্য আমাকে সাহায্য করার অপরাধে আপনারা কাজ ফুরোলে ওকে টাকাও দিতেন না, প্রাণেও মারতেন। ওর কপালে ছিল আমাদের গুলি খেয়ে মরার, তাই-ই বোধহয় মরতে এখানে এসেছিল এ বছরে। গ্রাম, ঘর, মা-মরা মেয়ে ছেড়ে।

ডবসন হঠাৎ বলল, তিতিরের দিকে চেয়ে, আমার কাস্কটা একটু দেবে। গলা শুকিয়ে গেছে।

তিতির ঋজুদার দিকে চেয়ে ওটা এগিয়ে দিল। বলল, খেয়ে, কাস্কটা ফেরত দেবেন।

ডবসন ভয়, বিস্ময় এবং আতঙ্কের চোখে তিতিরের দিকে চেয়ে রইল। তিতির আমার দিকে চোখের কোণ দিয়ে একটু গর্ব-গর্ব ভাব করে তাকাল।

ঋজুদা হঠাৎ বাংলায় বলল ডবসনকে, আপনাকে এখানে পাঠিয়েছে কে? টর্নাডো? না আপনার নিজেরই ব্রেইনওয়েভ এটা?

আমি আর তিতির দুজনেই ঋজুদার দিকে তাকালাম। তিতিরের মুখে আতঙ্ক। মাথার পিছনে পিস্তলের নলের মোক্ষম মার খেয়ে বোধহয় ঋজুদার মাথার গোলমাল হয়ে গেছে।

ডবসন ইংরেজিতে বোকা-বোকা মুখে বলল, বেগ ইওর পাৰ্ডন, মিস্টার বোস?

ঋজুদা বলল, আবারও বাংলায় বলুন, বলুন সার্গেসন, মিস্টার ডবসন।

ডবসন কথা ঘুরিয়ে ইংরিজিতে বললেন, বাঃ আপনার পাইপের তামাকের গন্ধটা খুবই সুন্দর। আমার সিগার সব ফুরিয়ে গেছে।

ডামুর পকেটে নিশ্চয়ই অনেক আছে এখনও। পকেটে কেন, ব্যাগেও আছে। ব্যাগ তো এখানেই। বলে, আমি যেই ডামুর ব্যাগ খুলতে যাব, অমনি ঋজুদা বারণ করল। বারণ করে, ব্যাগটা চাইল। ব্যাগটা ঋজুদাকে এগিয়ে দিতেই, ঋজুদা তাতে হাত ঢুকিয়ে এক বাক্স সিগার বের করল। হাভানা সিগারের বাক্স। তারপর বাক্সটার ঢাকনি খুলে ধরল। আমরা দেখলাম অনেকগুলো সিগার, মানে চুরুট, সার সার সাজানো আছে।

ঋজুদা আমার আর তিতিরের দিকে তাকিয়ে ঐ বাক্স থেকে একটি সিগার তুলে আমাদের দেখিয়ে বলল, এই একটি ডিনামাইটই আমাদের সকলকে এই গুহার মধ্যেই জীবন্ত কবর দিতে পারে। অন্য দুটি আমাদের সমস্ত মালপত্র এবং আমাদের সমেত দুটি জিপকে টুকরো টুকরো করে উড়িয়ে দিতে পারে। বলেই, ডবসনের দিকে তাকিয়ে বলল, এতগুলোর কী দরকার ছিল? আপনারা আমাদের ক্ষমতা সম্বন্ধে যে এত উঁচু ধারণা করেছেন তা জেনে পুলকিত হলাম।

এগুলো ডিনামাইট!

তিতির চোখ বড় বড় করে বলল। সত্যিই তো সিগারের মতোই দেখতে।

আমি তিতিরকে বললাম, থামো তুমি। ঋজুদার নিশ্চয়ই মাথার গোলমাল হয়েছে। মিস্টার ডবসনের সঙ্গে বাংলায় কথা বলছে, ডামুর সিগারকে ডিনামাইট বলছে।

ঋজুদা আমার দিকে ফিরে বলল, না। মাথা খারাপ হয়নি। এগুলো ডিনামাইটই। আর মিঃ ডবসন খুব ভাল বাংলা জানেন। এবং জানেন বলেই, টর্নাডো বাংলা-জানা লোককে খুঁজে বের করে আমাদের পিছনে লাগিয়েছে। ভুষুণ্ডা নিশ্চয়ই আমাদের বাংলায় কথা বলাতে ওর অসুবিধার কথা জানিয়েছিল টর্নাডোর দলকে।

আমাকে আর তিতিরকে একেবারে চমকে দিয়ে মিস্টার ডবসন বাংলায় বললেন, হ্যাঁ। তাই। তবে, আমার প্রাণ ভিক্ষা চাই।

আমরা এবারে আরও বেশি চমকালাম। বাংলা বলার ধরনটা দাদুর বন্ধু কলকাতার সেই সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের অধ্যাপক ফাদার ফাঁলোর মতন। আমাদের ছেলেবেলায় ফাদার ফাঁলো ফণীদাদুর বাড়িতে খুব আসতেন।

ঋজুদা বলল, আমরা কেউই খুনী নই যে, কাউকে মারতে হলে আমাদের খুব আনন্দ হয়। আপনার প্রাণ আপনারই থাকবে। কিন্তু বদলে যদি ভুষুণ্ডার প্রাণটি আমরা পাই। সে আমাদের বিশ্বাসী বন্ধু টেডি মহম্মদকে মেরেছে নিষ্ঠুরভাবে, সে আমাদের সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এবং আমাকেও গুলি করে আহত করেছে। আমি আর রুদ্র যে গতবারে প্রাণে বেঁচে ফিরেছি এটাই আশ্চর্য। তার প্রাণটি আমাদের ভীষণই দরকার। এবং তার সঙ্গে টর্নাডোর খবর।

কিন্তু…।

কোনোই কিন্তু নেই এর মধ্যে। একেবারে নিস্কিন্তু হয়ে ভাবুন। এছাড়া কোনো শর্ততেই আপনাকে বাঁচাতে পারব না। কাল আমরা এই জায়গা ছেড়ে যাবার সময় আপনাদেরই আনা ডিনামাইট ডিটোনেট করেই আপনার প্রাণের সঙ্গে এই গুহাতেই আপনার বাংলা, ইংরিজি, নৃতত্ত্ববিদ্যা ইত্যাদির সব কিছুর জ্ঞান সমেত কবর দিয়ে চলে যাব। বাজে কথা বলার সময় আমাদের নেই। বলুন।

সার্গেসন ডবসন অনেকক্ষণ একদৃষ্টিতে ঋজুদার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তাঁর অধ্যাপক-সুলভ ভালমানুষ কমলা-রঙা মুখটা আগুনের আভাতে আরও সুন্দর দেখাচ্ছিল। নাকের নীচে এবং থুতনিতে জমাট-বাঁধা কালো রক্ত লেগে থাকা সত্ত্বেও। হঠাৎ তাঁর দুচোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল ঝরতে লাগল।

অবাক কাণ্ড! সাহেবরাও কাঁদে!।

আমি আর তিতির মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম।

মিঃ ডবসন বললেন, মিস্টার বোস, আপনি বরং আমাকে এখানে কবরই দিয়ে যান। যে জীবন মাথা উঁচু করে স্বাধীন মানুষের মতো, নিজের ইচ্ছা ও খুশিমতো, নিজের সম্মান বাঁচিয়ে কাটানো যায় না, সে জীবনের চেয়ে মরণ অনেক ভাল। টর্নাডো যদি জানতে পারে যে, আমিই তার খবর এবং ভুষুণ্ডার খবর আপনাদের জানিয়েছি তবে তার শাস্তি হবে ভয়ংকর। মৃত্যু তার চেয়ে অনেক বেশি কাম্য। জীবনের যেমন অনেক রকম আছে, মৃত্যুরও আছে। স্বাধীনতাহীন, অন্যর কথায় ওঠা-বসার জীবন আমি চাই না। আর যেই চাক।

তাহলে আপনি আমাদের কিছুই বলবেন না?

না। মিস্টার বোস। আপনি ভদ্রলোক। ভদ্রলোকের কথা এবং ব্যথা আপনি অন্তত বুঝবেন। ভদ্রলোক হয়ে কথার খেলাপ বা বিশ্বাসঘাতকতা করি কী করে? খারাপ লোকদের মধ্যেও ভাল লোক থাকে। আমি খারাপের মধ্যে ভাল। প্রাণ যায় যাক, আমার দ্বারা বিশ্বাসঘাতকতা হবে না।

খুবই মহৎ আপনি। অতি উত্তম। তাই-ই হবে। এখানেই কাল সকালে কবর দিয়ে যাব আমরা আপনাকে। ঋজুদা বলল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *