রুআহা (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ
পাঁচ
সকালে চান-টান করে আমরা যে যার ঘরে একা একা ব্রেকফাস্ট খেলাম। তারপর ঋজুদার নির্দেশে প্রত্যেকেই আলাদা আলাদা ভাবে বেরিয়ে গেলাম হোটেল থেকে।
তিতির তানজানিয়ান এয়ার লাইনস-এর সামনে আর আমি তানজানিয়া মিরশ্যাম কোম্পানির সামনে পায়চারি করব, এমন নির্দেশ ছিল।
যথাসময়ে একটা গাঢ় চকোলেট-রঙা ভোকসওয়াগন-কম্বি গাড়ি এসে তিতিরকে এবং আমাকে তুলে নিল। তারপর গাড়িটা জোরে ছুটে চলল। দেখতে দেখতে আকাশমণি গাছে ছাওয়া উঁচু-নিচু পথ বেয়ে আমরা ফাঁকা জায়গাতে এসে পড়লাম।
হু-হু করে ঠাণ্ডা হাওয়া আসছিল। যদিও এখানে সেৎসি মাছির ভয় নেই, কিন্তু বেশ ঠাণ্ডা আছে ঝকঝকে রোদের উত্তাপেও। কাচ তুলে দিলাম গাড়ির।
ঋজুদা কথা বলছিল না। খুব মনোযোগ সহকারে গাড়ি চালাচ্ছিল। আধঘণ্টাটাক যাওয়ার পর আমরা যখন খুব চওড়া পথ বেয়ে একেবারে ফাঁকায় পৌঁছেছি, তখন গাড়িটা বাঁ দিকে থামিয়ে ঋজুদা নামল। পথের দু দিকে ভাল করে দেখে নিয়ে আমাকে বলল, রুদ্র, তুই-ই চালা, বুদ্ধির গোড়ায় একটু ধুঁয়ো দিতে হবে।
তিতির বলল, আমি চালাব ঋজুকাকা। তাহলে তোমরা দুজনে আলোচনা করতে পারবে।
আমি লজ্জিত হয়ে বললাম, আমার সঙ্গে ঋজুদার আবার কিসের আলোচনা! তুমি তোমাকে আর আমাকে একটু বেশি ইম্পর্ট্যান্ট ভাবছ তিতির।
ঋজুদা বলল, নাউ, স্টপ দ্যাট রুদ্র। তিতিরই চালাক গাড়ি।
যথারীতি পাইপ ঠেসেটুসে তাতে দেশলাই ঠুকে শ্মশানের সাধুবাবাজির কল্কের ধোঁয়ার মতো ধোঁয়াতে গাড়ি ভরে দিয়ে তারপর ব্যোম হয়ে বসে রইল। বুঝলাম, এমার্জেন্সি-থিংকিং গোয়িং অন। এখন কথা বললেই গাঁট্টা-টাট্টা খেতে হতে পারে।
পথে, উল্টোদিক থেকে আসা একটি মার্সিডিস গাড়ি আর একটি সাদা ল্যাণ্ডরোভার চোখে পড়েছিল শুধু। যান এবং জনশূন্য পথ পেরিয়ে চলেছি। দুদিকে ধুধু মাঠ, ঝোপঝাড়, নানারকম প্যাট্রিজ ও আফ্রিকান পাখি পথ পেরুচ্ছে দ্রুতগতিতে।
আরও আধ ঘণ্টা গাড়ি চালানোর পর তিতিরই প্রথম কথা বলল। ঋজুকাকা, আমরা ঠিক যাচ্ছি তো?
ঠিকই যাচ্ছি। তবে, সামনে গিয়ে ডান দিকে একটা কাঁচা রাস্তা পাবি। তাতে ঢুকে পড়তে হবে। সেই কাঁচা পথটাই চলে গেছে লেক মানিয়ারা, গোরোংগোরো ক্র্যাটার, ওলডুভাই গর্জ এবং সেরেঙ্গেটি প্লেইনস-এর দিকে।
আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, এ কী! এ তো মাকুউনির মোড়!
— আজ্ঞে! ঋজুদা বলল। তারপর বলল, আপনার মনে তো থাকারই কথা রুদ্রবাবু।
মনে আছে, মনে আছে।
মাকুউনিতে এসে ডান দিকে ঘুরেই রাস্তাটা কাঁচা তো বটেই, বেশ খারাপ হয়ে উঠল।
ঋজুদা এবার তিতিরকে উদ্দেশ করে বলল, মা গো! এবার রুদ্রকে দাও। জঙ্গলে গাড়ি চালানোটা কিন্তু তোমার রুদ্রর কাছেই শিখতে হবে।
তিতির ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে গিয়ে পেছনে উঠলে, আমি ড্রাইভিং সিটে বসতে বসতে নিচু গলায় বললাম, শুধুই গাড়ি চালানো?
ঋজুদা বলল, কথা কম। কিছুটা আগে গিয়ে একটা ছোট্ট বাজার পাবি। সেখানে শুধু কাঙ্গা-কিটেঙ্গা আর ইয়া-ইয়া কাঁদি কলা বিক্রি হয়। সেই হাটটাকে বাঁয়ে রেখে সরু কাঁচা পথে ঢুকে কুড়ি কিলোমিটার যাবি। মিটার দেখে। তারপর একটা খুব বড় তেঁতুলগাছতলায় গাড়িটা এমনভাবে রাখবি যাতে আকাশ থেকে কোনো প্লেন আমাদের দেখতে না পায়। তেঁতুলগাছটা তোর জন্যেই পুঁতে রেখেছি।
তিতির বলল, তারপর কী হবে ঋজুকাকা, বলো না?
অধৈর্য হয়ো না মাদাম। দেখতেই তো পাবে। নিজে দেখবে শুনবে বলেই তো এসেছ!
তা তো এসেছি। এদিকে খিদে পেয়ে গেছে যে! কটা বেজেছে জানো? কখন ফিরব হোটেলে? রাত হয়ে যাবে না ফিরতে ফিরতে?
হলে, হবে! আমি বললাম।
এ যেন সাদার্ন অ্যাভিনতে ভেলপুরি খেতে বা ফুচকা খেতে বেরিয়েছে! সাধে বলে, পথি নারী বিবর্জিতা! ঋজুদার যত্ত সব!
কুড়ি কিলোমিটার গাড়ি চালিয়ে ধুলোয় ধুলোক্কার হয়ে যখন সেই ষড়যন্ত্রর তিন্তিড়ী বৃক্ষের নীচে পৌঁছলাম, তখন ঘড়িতে একটা বাজে। খিদে আমারও পেয়েছে। ঋজুদার হাজারিবাগি নাজিমসাহেবের ভাষায় বলতে ইচ্ছে করছে, না-দানা, না-পানি, ক্যা বদকিসমতি ঔর হয়রানি!
ঋজুদা দরজাটা খুলে পাইপের ছাই ঝেড়ে ফেলে বলল, রুদ্র, নাইরোবি-সর্দারের সেই গোল পাথরটা কোথায়?
এই তো! আমার পকেটে।
ওটা হারাস না, নাইরোবি-সর্দার চাইতে পারে। তারপরই বলল, তিতির তুমি কখনও বাছুরের রক্ত খেয়েছ?
কিসের রক্ত?
অবাক হয়ে তিতির শুধোলো।
সুন্দর পুরুষ্ট নধর বাছুরের রক্ত। ঋজুদা বলল।
হাউ স্যাভেজ! বলেই তিতির মুখে ‘আমি কিন্তু খেলব না’ গোছের ভাব ফুটিয়ে ঋজুদার দিকে তাকাল। বলল, না। নেভার।
তাইই! কিন্তু একটু পরেই খেতে হতে পারে। লাঞ্চে কী খাবি রুদ্র? চিকেন মেয়োনিজ, না কোল্ড-মিট?
তোমাকে সেৎসি মাছি কামড়ায়নি তো? বিস্ময়-মেশানো হাসির চোখে ঋজুদার চোখে তাকিয়ে বললাম।
ঋজুদা অন্যমনস্ক চোখে হাতঘড়ির দিকে চকিতে চাইল একবার। স্বগতোক্তি করল, নাঃ! উই আর রাইট অন টাইম। তারপরই আমাদের দিকে ফিরে বলল, একটা এক-এঞ্জিনের ছোট্ট আইল্যাণ্ডার প্লেনের শব্দ পাবি। পেলেই আমাকে বলিস। ততক্ষণে একটু ঘুমিয়ে নিই। কাল সারা রাত অনেক হুজ্জোতি গেছে। ঘুম হয়ইনি একেবারে।
তিতির অবাক চোখে বলল, কাল রাতে? কী হয়েছিল ঋজুকাকা?
বলব, সব বলব। সময়মতো। এখন ঘুমোতে দে। বলেই ঘুমিয়ে পড়ল।
তিতির অবাক গলায় ফিসফিস করে শুধোলো, সত্যিই ঘুমিয়ে পড়ল যে!
মাথা নেড়ে উত্তর দিয়ে কান খাড়া করে রইলাম।
মিনিট-দশেক পর ফুলের বনে ভ্রমরের পাটার মতো আওয়াজ শোনা গেল একটা। আস্তে আস্তে জোর হচ্ছে শব্দটা। ঋজুদা চোখ-বন্ধ হেলান-দেওয়া অবস্থাতেই বসেই বলল, তিতির, তুই গাড়ি থেকে নেমে তেঁতুলতলায় গিয়ে দাঁড়া। তার আগে, রুদ্র, বাইরে গিয়ে দ্যাখ প্লেনের রঙটা হলুদ কি না। হলুদ হলে, তিতির ফাঁকায় গিয়ে দাঁড়িয়ে হাত নাড়বে, আর তুই ছায়ায় দাঁড়িয়ে তিতিরকে কাভার করবি। যদি ওরা না হয়?
কী বলছ, কিছুই বুঝছি না ঋজুদা। অধৈর্য গলায় বললাম আমি।
বুঝবি রে সব বুঝবি। এখন চুপ কর।
আমরা দুজন গাড়ি থেকে নেমে গেলাম। ঋজুদা ঘুমোতে লাগল।
অদ্ভুত লোক।
নাইন-সিটার একটা হল প্লেনই। আইল্যাণ্ডার। প্লেনটা তিতিরকে দেখতে পেয়েই দুবার ঘুরে ঘাসের মাঝের ফাঁকা মাঠে ল্যাণ্ড করে একটা হলুদ ধেড়ে খরগোশের মতো প্রায় লাফাতে লাফাতে এসে স্থির হল। এক সাহেব নামল প্লেন থেকে। আর একজন সাত ফিট লম্বা মাসাই সর্দার। নাইরোবি-সর্দার! গুগুনোম্বারের দেশের নাইরোবি-সর্দার!
আমি পড়ি-কি-মরি করে দৌড়ে গেলাম তার দিকে। সর্দারকে বললাম সর্দার! এই যে তিতির! আমাদের নতুন শাগরেদ।
নাইরোবি-সর্দার বিন্দুমাত্র সময় ও কথা খরচ না করে পিচিক্ করে থুতু ফেলল নিজের কুচকুচে কালো কলার কাঁদির মতো দশ আঙুলে আর তেলোতে। আর ফেলেই দু হাতের তেলোতে ঘষে, কষে তিতিরের দু গালে আর মুখে লাগিয়ে দিল সেই থুতু।
তিতির উ-উ-ব্যাওও গোছের একটা শব্দ করতেই আমি বললাম, কথাটি কয়েছ কি প্রাণটি গেছে। এটাই ওদের আদর। এবং এই মানুষটির জন্যেই আমি আর ঋজুদা আজকে প্রাণে বেঁচে আছি। যা ঘটেছিল সেরেঙ্গেটিতে সেসব তো ‘গুগুনোগুম্বারের দেশে’তেই লেখা হয়েছে সবিস্তারে।
এমন সময় সাহেবটি ঋজুদাকে দেখে চেঁচিয়ে বলল,হাই ঋজু!
হাই! বলে, ঋজুদা গাড়ি থেকে নেমে এসে প্রথমে নাইরোবি-সর্দারকে বুকে জড়িয়ে ধরল। আমাকে বলল, গাড়ির পেছনে একটা বাক্স আছে, নিয়ে আয় তো।
গিয়ে নিয়ে এলাম। ঋজুদা বাক্সটা খুলে ধরল। দেখলাম, বিভিন্ন রঙের গোটা-পঞ্চাশ মার্বেল। মানে গুলি। বন্দুকের নয়, মাটিতে গাব্বু করে খেলার গুলি।
সর্দারের মুখ-চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বাক্সটা দু হাতে ধরে তিড়িং করে বল্লম হাতেই এক খুশির হুংকার ছেড়ে সোজা এক লাফ দিয়ে জমি থেকে ফিটচারেক অবলীলায় উঠেই আবার নেমে পড়ল।
ঋজুদা সাহেবটির সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল আমাদের। বলল, ইনি হচ্ছেন মাইলস টার্নার। সেরেঙ্গেটির গেম ওয়ার্ডেন।
মিঃ টানার তিতিরকে, সরি, পরমাসুন্দরী মিস ক্রিস্ ভ্যালেরিকে দেখে কোনো ভাই-ভাতিজার সঙ্গে বিয়ের সম্বন্ধই করতে যাচ্ছিলেন বোধহয়।
ঋজুদা বলল, শি ইজ আ কিড মাইলস্। জাস্ট আ কিড।
তিতিরের মুখ লাল হয়ে গেল। বলল, সার্টেনলি, আই অ্যাম নট।
মাইলস টার্নার ওর মুখে এক বালতি অদৃশ্য ঠাণ্ডা জল ঢেলে দিয়ে বলল, ওক্কে বেবি! উ্য আর নট।
.
একে নাইরোবি-সর্দারের দুর্গন্ধ থুতুতে মুখ ভর্তি। তারপর এই সব অপমান, তিতির এতদিন যা করেনি, এবার তাই করবে মনে হল। একেবারে ভ্যাঁ করবে বলে মনে হল। বাঙালির মেয়ে বলে কতা!
ইতিমধ্যে প্লেনের ককপিট থেকে আরেকজন সাহেব নেমে এল।
সেই সাহেবটি নেমেই, হুলোবেড়ালের মতো হুঁয়াও হুঁয়াও করে দুবার ত্রিভঙ্গমুরারি হয়ে আড়মোড়া ভেঙেই ঋজুদাকে বলল, হাই! ঋজু সিং! আই অ্যাম হাংরি! কাম, লেটস্ হ্যাভ লাঞ্চ।
ঋজুদা হেসে বলল, হোয়াটস্ দিস কনককশন? সে-এ-এ আইদার ঋজু, অর গুরিন্দার।
কিন্তু মাইলস টার্নার উত্তরে হেসে বলল, নাথিং ডুইং। ঋজু সিং সাউণ্ডস্ মাচ বেটার।
তেঁতুলতলার ছায়ার দিকে এগিয়ে চললাম। খিদে কারোই কম পায়নি। তারপর ছায়ায় হাত-পা ছড়িয়ে আমরা সকলে বসে পড়লাম। বিরাট লাঞ্চ-বক্স থেকে চিকেন-স্যাণ্ডউইচ, ওয়াইল্ডবিস্ট-এর কোল্ড মিট, সরি, ভেনিস বেরুল। কী শক্ত রে বাবা! দাঁতে ছেঁড়া যায় না।
তিতিরের দিকে তাকিয়ে বললাম, কী খাচ্ছ? জানো?
জানি।
কী?
ওয়াইল্ডবিস্ট!
ওয়াইল্ডবিস্ট মানে কী? জংলি জানোয়ার?
তিতির লেমোনেডের বোতলটা মুখে উপুড় করে এক ঢোক খেয়ে নিয়ে হাসল। বলল, তুমি আমাকে কী ভাব বলো তো? আফ্রিকাতে সশরীরে আগে আসিনি বলে বুঝি আমার কিছুই জানতে নেই? বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় তো একবারও না এসেই চাঁদের পাহাড়’ লিখেছিলেন। তুমি কি পঞ্চাশবার এখানে এসেও একটি ঐ রকম বই লিখতে পারবে?
বোকা-বোকা কথা বোলো না। ওয়াইল্ডবিস্ট বানান করে বলো তো। তাহলেই বুঝব, ঠিক বলছ কি না।
তিতির তেমনি হাসি-হাসি মুখেই কেটে কেটে বানান করল, WILD BEEST, BEAST নয়। ঠিক আছে? তাছাড়া, এদের অন্য একটি নামও আছে। তা হচ্ছে ন্যু।
ঋজুদা উড়ো-সাহেবদের সঙ্গে বড় বড় কালো বোতলে হলুদ বুড়বুড়ি-ওঠা কী যেন খাচ্ছিল। মুখ দেখে মনে হল ঐ লেমোনেড তেতো খেতে। ঋজুদাকে শুধোলাম তেতো বুঝি? আমার দিকে ফিরে বলল, খাদ্য-খাদক খাবার সময় ঝামেলি করিস না তো! শুধু কচকচি।
এই খাদ্য-খাদক কথাটার একটা ভূমিকা ছিল। ‘বনবিবির বনে’তে যখন আমরা গদাধরদার সঙ্গে পার্সোনাল রিভেঞ্জ নিতে গেছিলাম সোঁদরবনের বাঘের বিরুদ্ধে, তখন সুন্দরবনের মাঝিমাল্লাদের ওরকমভাবে কথা বলতে শুনেছিলাম। ‘খাদ্য-খাদক’ বলতে তারা খাবার-দাবার বোঝাচ্ছিল।
তিতির আমার দিকে হাঁ করে তাকাল।
স্যাণ্ডউইচ মুখে পুরতে পুরতে বললাম, বলব বলব, সবই বলব। এত অধৈর্য হলে হবে না।
নাইরোবি-সর্দার বাঁশের চোঙে করে বাছুরের ফেনা-ওঠা টাটকা রক্ত এনেছিল। আমরা যেসব খাচ্ছি সে-সব কুখাদ্য-অখাদ্য মুখে একেবারেই না দিয়ে নিষ্ঠাভরে এঁটোকাঁটা বাঁচিয়ে ঢকঢক করে গ্যালনখানেক গরমাগরম রক্ত গিলে ফেলে একটা আরামের ঢেকুর তুলল।
নাইরোবি-সর্দারকে কাছে পেয়ে বড় ভাল লাগছিল। এই মানুষটি এবং তার সাঙ্গোপাঙ্গরা না থাকলে আমি এবং বিশেষ করে ঋজুদা কি আর গুগুনোগুম্বারের দেশ থেকে প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারতাম গতবারে?
যে সাহেবটি প্লেন থেকে পরে নেমেছিলেন, তাঁর নাম, জানা গেল মারে ওয়াটসন। ভদ্রলোক একজন অনারারি গেম-ওয়ার্ডেন। চোরাশিকারিদের উপর ভীষণ রাগ ওয়াটসনসাহেবের।
খেতে-খেতে, কথা হতে হতে বেলা প্রায় তিনটে বাজল। আশেপাশের ঝোপঝাড় থেকে ফেজেন্টস্-এর ডাক ভেসে আসছিল। হাজারিবাগের কালি-তিতিরের ডাকের মতো। গাছ-গাছালির ছায়াগুলো নড়ে-চড়ে বসতে শুরু করেছে। পুব-আফ্রিকার মাটির গন্ধ উঠছে চারধার থেকে। আমাদের দেশের মাটির গন্ধের মতো নয়। দেশের মাটির গন্ধ বড়ই মিষ্টি।
ঋজুদা হঠাৎ বলল, নাইরোবি-সর্দারের পায়ের ধুলো নে একবার রুদ্র।
তিতির খাওয়া-দাওয়া করল বটে, কিন্তু সর্দার থুতু-মাখানোর পর থেকেই সে গুম হয়ে বসে ছিল। আমি নিচু হয়ে নাইরোবি-সর্দারের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে যেতেই সর্দার চমকে উঠে তিড়িং করে সরে গেল এক লাফে। হয়তো পায়ে সুড়সুড়ি লেগে থাকবে। যাদের যা অনভ্যেস!
প্রণাম করা হল না আমার। উল্টে আমার মুখে আর-এক প্রস্থ বাছুরের বোঁটকা রক্তের গন্ধ-মাখা থুতু লাগিয়ে আবার আদর করে দিল সর্দার। তার পর তিতিরকে কলার কাঁদির মতো বাঁ হাতের আঙুলে সাঁড়াশির মতো ভালবাসায় ধরে তাকেও আবার ডবল জম্পেস করে লাগিয়ে দিল। ফেয়ারওয়েল গিফট বলে কতা!
মাইলস টার্নার আর ওয়াটসন যখন প্লেনের দিকে এগোতে লাগলেন তখন ঋজুদা নাইরোবিসর্দারের কাছে এগিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে যেন কী বলল।
সর্দার ঋজুদার মাথার উপরে দুহাত তুলে, থুতু-মাখা দুহাতের তালু প্রথমে ঋজুদার দুগালে ক্রিম লাগাবার মতো লাগিয়ে আবার মাথার উপরে তুলে অনেকক্ষণ ধরে গমগম করে কী সব মন্ত্রোচ্চারণ করতে লাগল। সেই মেঘগর্জনের মতো স্বরে, ন্যাবা-ধরা বিকেলের হলুদ আলোয় একটি বাজে-পোড়া প্রকাণ্ড বাওবাব গাছের মতো সটান দাঁড়িয়ে কী যে বলে চলল নাইরোবি-সর্দার, তার কিছুই বোধগম্য হল না। শুধু শিরদাঁড়া বেয়ে এক ভয়মিশ্রিত ঔৎসুক্যের অনুভূতি গাব্বুন-ভাইপার সাপের মত হিসসস শব্দ করে দৌড়ে গেল মনে হল। নাইরোবি-সর্দারের সেই দীর্ঘ স্বগতোক্তি শুনতে শুনতে ঋজুদার চোখও যেন ছলছল করে উঠল।
প্লেনের এঞ্জিন স্টার্ট করলেন টার্নার। বুড়ো আঙুল দেখালেন বাঁ হাতের। ঋজুদা ডান হাতের বুড়ো আঙুল তুলে ধরল উপরে। প্লেন মুখ ঘুরল। প্রপেলারের শব্দ জোর হল। ওয়াটসন মুখ বাড়িয়ে বললেন ঋজুদাকে, সেম টাইম, সেম প্লেস, ডে-আফটার। ওক্কে?
ঋজুদা ডান হাতের বুড়ো আঙুল তোলা অবস্থাতেই বলল, রজার। হ্যাপি ল্যাণ্ডিং।
তারপর প্রপেলারের আওয়াজে আর কিছুই শোনা গেল না। প্লেনটা তামা-রঙা মাঠের মধ্যে কিছুটা ট্যাক্সিইং করে একটা মস্ত হলুদ পাখির মতো নীলচে আকাশে পাক খেয়ে ক্রমশ ছোট হয়ে যেতে লাগল। তারপর দিগন্তে মিলিয়ে গেল। হঠাৎ আমাদের চোখে পড়ল, প্লেনটা ঠিক যেখানে ছিল, সেই জায়গাটিতেই ওয়াইল্ডবিস্টের একটি ছোট্ট দল দাঁড়িয়ে আছে। আমরা যখন ওদের জ্ঞাতি-গোষ্ঠির ঠাণ্ডা মাংস খাচ্ছিলাম তখন ওরা আমাদের দেখছিল।
ঋজুদা বলল, বদহজম হবে। নির্ঘাত।
বললাম, নিজেরা সব গেম-ওয়ার্ডেন! আর এদিকে তো দিব্যি ওয়াইল্ডবিস্ট-এর কোল্ড মিট খাচ্ছে। তার বেলা?
বোকা! গেম-ওয়ার্ডেনরা নিয়মিতই শিকার করে। কোনো বিশেষ প্রাণীর সংখ্যা বেড়ে গেলেই। পুরো ব্যাপারটা হচ্ছে…
তিতির সেনটেন্সটা কমপ্লিট করে বলল, ব্যালান্সের।
রাইট।
এবার ফেরার পালা। ঋজুদা কেমন গম্ভীর হয়ে ছিল। গাড়িতে উঠতে উঠতে বলল, বুঝলি রুদ্র, সকলের ঋণ বোধহয় শোধা যায় না। পুরোপুরি তো নয়ই। কিছু কিছু ঋণ থাকে, যা শুধু স্বীকার করা যায় মাত্র। যেমন ধর, মা-বাবার ঋণ। দ্যাখ, যে-মানুষটা জীবন দিল আমাকে, তাকে বদলে দিলাম এক বাক্স মার্বেল। তিরিশ টাকা দাম।
একটু চুপ করে থেকে আবার বলল, আসলে বোকারাই টাকাকে দামি মনে করে। টাকা দিয়ে সত্যিকারের দামি কিছুই বোধহয় পাওয়া যায় না। ভুষুণ্ডা তো টেডিকে খুন করল টাকার লোভে, আমাদের ও মারতে চেয়েছিল নিজে, এমনকী নাইরোবি-সর্দারকেও মারতে চেয়েছিল তোকে দিয়ে জোর করেই গুলি করিয়ে; কিন্তু ও কি কখনও, সর্দারকে আমরা যে-রকম ভালবাসি তেমন কোনো দামি ভালবাসা পাবে পৃথিবীর সব টাকার বদলেও? ভালত্ব, ভালবাসা, এ-সবের দাম টাকা দিয়ে কখনও দেওয়া যায় না।
তিতির রুমাল দিয়ে ভাল করে ঘষে ঘষে মুখ মুছছিল প্লেনটা চলে যাবার পর থেকেই। তারপর ব্যাগ থেকে টিশু পেপার বের করে ভেসলিনের শিশিতে ডুবিয়ে আবার ও মুখ মুছতে লাগল।
ঋজুদা বলল, দেখিস, মুখের চামড়া উঠে না যায়। উঠে গেলে, এখানে কিছু পাওয়া যাবে না। স্বাস্থ্যবান লোকের ওয়েল-মেল্ট থুতু তো স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালই শুনেছি। কী বলিস রে রুদ্র? এত ঘষাঘষির কী আছে?
তিতির চুপ করে রইল। বুঝলাম, কলকাতা থেকে বেরুনোর পর এই প্রথমবার জব্দ হয়েছে প্রমত্ত প্রমীলা।
শর্ট-ব্যারেলড পিস্তলের গুলির আওয়াজের মতো হঠাৎ ফেটে পড়েই, ফাঁসা ভিস্তির মতো ফেঁসে গিয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল তিতির। কাঁদতে কাঁদতে বলল, আনসিভিলাইজড, ক্রুড, বিস্ট, থু থু। থু-থু-থু-হুঁ হুঁ হুঁ-উ-উ-উ
আহা! মেয়েদের কান্নার শব্দ যে এত মিষ্টি আমি তা কখনও খেয়াল করিনি। ছোটবেলা থেকে বড়-ছোট, কচি-বুড়ি কত মেয়েকেই তো কাঁদতে শুনেছি।
তিতিরের দিকে আড়চোখে একবার চেয়ে, ইংরিজিতে যাকে বলে রাইজিং টু দ্যা অকেশান’–আমি ওর পনিটেইলে এক টান লাগিয়ে বললাম, ইটস্ ওল ইন দ্যা গেম, বেইবি!
মনে মনে বললাম, সাদার্ন অ্যাভিন্যুতে ফুচকা অথবা পার্ক স্ট্রিটে কোয়ালিটির আইসক্রিম, নয়তো পিজজা-হাটে পিজজা খেলেই তো পারতে খুকি! আফ্রিকার জঙ্গলে অ্যাডভেঞ্চারে আসা কেন?
মুখে যাই-ই বলি আর মনে মনে যাই-ই ভাবি, তিতিরকে কাঁদতে দেখে এই প্রথম বুঝলাম যে, মেয়েটা মানুষ ভাল। যেসব মানুষ দুঃখ হলে কাঁদে না, অথবা অভিভূত হলে তা প্রকাশ করে না, আমি তাদের সহ্য করতে পারি না। মনে মনে বললাম, ভয় কী তিতির? আমি তো আছি! মিস্টার রুদ্র রায়চৌধুরী, রাইট হ্যাণ্ড অব গ্রেট ঋজু বোস–
কী ভাবছিস রে রুদ্র? ঋজুদা বলল, ঠিক সেই মুহূর্তে।
চমকে উঠে বললাম, কে? আমি? এই-ই, কী ভাবব, তাই-ই ভাবছি?
ফাইন। এখন কী ভাববে তা না-ভেবে, গাড়িটা স্টার্ট করো।
এই সেরেছে। হঠাৎ গাড়ির উইন্ডস্ক্রিনে একটা মাছির ডানার বুঁ-বুঁ-বুঁ-ই-ই আওয়াজ শুনে আমার পিলে একেবারে চমকে গেল।
ঋজুদা বলল, কী হল? এত কামড় খেয়েও তাদের চিনলি না? এ তোর সেৎসি নয়। এ একটি বিক্ষুব্ধ নীল মাছি।
কাঁটালে মাছি। তিতির বলল।
কথা ফুটেছে!
রাইট। ঋজুদা বলল। মাইনাস কাঁটাল।
গাড়িটা স্টার্ট করে ব্যাক করে নিয়ে ফেরার পথ ধরলাম।
তিতির বলল, আচ্ছা ঋজুকাকা, গুন্ গুন্ গুন্ করে অতক্ষণ ধরে তোমার মুখে দুহাত দিয়ে থুতু মাখিয়ে তোমাকে কী বলল নাইরোবি-সর্দার? কিসের মন্ত্র ওসব? তুকতাক করল না তো?
ঋজুদা অন্যমনস্ক ছিল তখনও। পাইপটা ধরাতে ধরাতে বলল, ওঃ। ও একটা মাসাই প্রবচন। মাসাই যোদ্ধারা যখন যুদ্ধে যায় তখন ওরা এই মন্ত্র উচ্চারণ করে।
কী মন্ত্র? বলো না ঋজুকাকা? তিতির পীড়াপীড়ি করতে লাগল।
কিন্তু ঋজুদা চুপ করেই রইল। মাঝে মাঝে এমন শক্ত-খোলার কচ্ছপের মুখের মতো নিজেকে গুটিয়ে নেয় এক দুর্ভেদ্য বর্মের আড়ালে। তখন এ-মানুষটাকে যে এত ভাল করে আর এত বছর ধরে চিনি এ-কথা বিশ্বাস করতেও কষ্ট হয়।
তিতির আহত হল। ঋজুদার নীরবতায়।
অনেকখানি পথ চলে এসেছি ততক্ষণে আমরা। টিকিয়া-উড়ান চালাচ্ছি একেবারে।
যেমন চালাচ্ছিস, তাতে প্রাণে যদি বেঁচে থাকি তবে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই মাকুউনির পিচরাস্তাতে এসে পড়ব মনে হচ্ছে। ঋজুদা বলল।
তিতির বলল, যদি বাঁচি প্রাণে। বলেই বলল, নাইরোবি-সর্দারের মন্ত্রর মানেটা বলবে না তাহলে ঋজুকাকা?
ঋজুদা একগাল ধোঁয়া ছেড়ে বলল, দ্যাখ দ্যাখ, পশ্চিমের আকাশের রঙটা কেমন হয়েছে। আঃ।
আমরা তিনজনেই মুগ্ধ চোখে সেদিকে চেয়ে রইলাম।
তিতির বলল, বলবে না তুমি? বল্লো-না!
ঋজুদা হঠাৎ তিতিরের দিকে ঘুরে বলল, মাসাইরা যে-ভাষায় কথা বলে, তার নাম হচ্ছে মাআ। ভাষার নাম থেকেই তাদের উপজাতির নাম হয়েছে মাসাই। যুদ্ধে যাবার সময় ওরা যা বলে, সেই কথাই বলছিল নাইরোবি-সর্দার আমাকে।
ওরা কী বলে?
ওরা বলে :
মোটোনীই আই মোটোনীই আই এ এগাই।
মারিয়ামারি ইস্টাটুয়া লেকেরি ওলোঙ্গোনি
এনেমানানু এটারাকি নাআরিশো।
নেমিতা কাটা আকেই এ মোটেনীই আই এপ্পাই
নিমেরা এনেকিরি।
তিতির বলল, মারিয়ামারি কথাটা অবশ্য বাংলাতে মেরে মরব’ গোছের কোনো একটা কথার কাছাকাছি যায়। কিন্তু পুরো প্রবচনটার মানে কী?
মাআ ভাষার মমোৰ্দ্ধার করতে তো বাবা-বাবা ডাক ছাড়তে হবে ঋজুদা। একটা গর্ত বাঁচাতে, স্টিয়ারিং কাটাতে আমি বললাম।
ঋজুদা বলল, দারুণ মানে রে, দারুণ মানে। একটা মস্ত জাত, অতি-বড় যোদ্ধার জাত, পুরুষের জাত, থুড়ি তিতির, সাহসীর জাতই কেবল এমন মন্ত্র বলে তাদের ছেলেদের যুদ্ধে পাঠাতে পারে। যুদ্ধে বেরুবার আগে যোদ্ধারা নিজেরাও যে এমন কথা আবৃত্তি করতে পারে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, ভাবলেও অবাক লাগে।
আঃ, মানেটা কী?
মানে হচ্ছে, ভগবান, আমার শিকারি-পাখি তুমি! তুমি আমার সঙ্গে সঙ্গে থেকো এই যুদ্ধে। থেকো, এই কারণে যে, আমি জানি না এই যুদ্ধে মরব না মারব। আমি নিজেও মরতে পারি, মরতে পারে শত্রুও। তবু, তুমি সঙ্গে থেকো সবসময়। আমি মরলে, তুমি আমাকে ঠুকরে খেও। আর শত্রু মরলে, শত্রুকে। তোমার খাদ্যের অভাব হবে না কখনও। যুদ্ধ যখন হবে, তখন এপার-ওপার তো হবেই। যুদ্ধ মানেই এক পক্ষের জিত আর অন্য পক্ষের হার। যুদ্ধের মর্যাদা তো যুদ্ধেরই মধ্যে। কে জেতে আর কে হারে তাতে কী-ই বা আসে যায়? এসো পাখি, আমার মাংসভুক্ পাখি, আমার মাথার উপর উড়তে উড়তে এসো। আমার পথের উপর কম্পমান ছায়া ফেলতে ফেলতে।
খাইছে! কও কী ঋজুদা? এ তো দেহি সাংঘাতিক পরবচন। এমন পক্ষীর প্রেয়োজন নাই আমাগো। আমরা ভুষুণ্ডার লাশ ফেলাইব। আমাগো–
উঃ! বাবা রে। তিতির চেঁচিয়ে উঠল।
আঃ! কী হচ্ছে কী, রুদ্র! ঋজুদা ধমকে বলল। কিন্তু ততক্ষণে গাড়িটার লাশকে একটা কিং-সাইজ গাড্ডা থেকে তুলে ফেলেছি আমি। যা রাস্তা, তার আমি কী করব। সামনেই মাকুউনির পিচের পথ। কটা দোকান। খালি কলার কাঁদি আর অন্যান্য ফল। দেখে মনে হয় কাছাকাছি চিড়িয়াখানা আছে। এত এত বিচিওয়ালা সিঁদুরে-কলা মানুষে খায় কী করে ভগবানই জানেন।
পিচরাস্তায় পৌঁছে গাড়ির এঞ্জিন বন্ধ করে তিতিরকে বললাম, নাও এবার তুমি চালাও। মাখমের মতো পথ, একেবারে আরুশা অবধি। ড্রাইভিং সিটে বসলে ঝাঁকুনিও লাগবে সবচেয়ে কম।
তিতির এসে বসল। গাড়ি স্টার্ট করে তিতির বলল, পরশু আমরা এখান থেকে কোথায় যাব ঋজুকাকা? আমার এই সব পাঁয়তাড়া আর ভাল লাগছে না। এই বিটিং’ বাউট দ্য বুশ। আসল জায়গায় কখন গিয়ে পৌঁছব?
এটা কি নকল জায়গা?
ঘাড় ঘুরিয়ে বললাম আমি।
জানবে মাদাম। সময় হলে সবই জানবে। পেশেন্স, প্রেটি গার্ল, উ্য মাস্ট হ্যাভ অব পেশেন্স ইফ উ্য ডু নট ওয়ান্ট টু বি বেরিড ইন দ্য উইল্ডারনেস্ অব আফ্রিকা।
ভুষুণ্ডা এবং ওয়ানাবেরি এখনও কি আরুশাতেই আছে? ওরা দুজনে কি একই দলের? তিতির একটুও না-দমে আবার জিজ্ঞেস করল।
বলো লেফটেন্যান্ট। ঋজুদা আমাকে উদ্দেশ করে বলল।
আমার মনে হয় ভুষুণ্ডা তোমার ভুজুংটা খেয়েছে। সে এতক্ষণ জাঞ্জিবারে মসলা খুঁজে বেড়াচ্ছে, আমাদের মসলা-বাটার সুযোগ দিয়ে। ভুষুণ্ডাকে রান্নার ভার কিন্তু আমার। আমারই একার। প্রথমে আমারও মনে হয়েছিল যে, ওয়ানাবেরি আর ভুষুণ্ডা একই দলের লোক। কিন্তু–।
একই দলের লোক হলে মাউন্ট-মেরু হোটেলের রিসেপশানে তারা একে অন্যকে দেখেও চিনল না কেন?
সেটা তো স্টান্টও হতে পারে। লোক দেখাবার জন্যে। ঋজুদা বলল।
হ্যাঁ। তা-ও হতে পারে। তিতির আর আমি একই সঙ্গে বললাম।
কিন্তু যে লোকটা মরল, সে লোকটা কে?
সেই তো হচ্ছে কতা! ঋজুদা বলল, মুখ নিচু করে।
বললাম, এই তো সবে মরামরির শুরু। এরপর তো কড়াকপিঙ আর ঢিক-চুঁই, জুইক-জুইক।
ওয়ানাবেরি! ওয়ানাবেরি আমাদের যে গল্পটা বলতে গিয়েও শেষ করেনি সেদিন, তুমি তার বাকিটা জানো? জানলে বলো না ঋজুকাকা। তিতির বায়না ধরে বলল।
মৃত্যুর গল্প মৃত্যু নিজে এসেই বলবে আবার। মৃত্যু একবার পিছু নিলে কি সহজে ছাড়ে? প্রথমটা যার কাছ থেকে শুনেছিস, তার কাছ থেকে শেষটাও শুনে নিস। তোরা না চাইলেও সে তোদের অত সহজে ছাড়বে না। সবসময় মাসাইদের শিকারি পাখিরই মতো তোদের পথে পথে তার কালো ছায়া ফেলে ফেলে অনুসরণ করবে সে। ওয়ানাবেরি! ওয়ানাকিরি!
গাড়ির হেডলাইট জ্বালিয়ে দিল তিতির। সোজা রাস্তা দেখা যাচ্ছে মাইলের পর মাইল। হেডলাইটের আলো আর কতটুকু পথ আলোকিত করে? দুপাশে বড় জঙ্গল নেই। ঝোপঝাড়, ঝটি-জঙ্গল, ঘাসবন, উঁচু-নিচু চড়াইয়ে-উরাইয়ে পথ। গাড়ির মধ্যে শুধু ড্যাসবোর্ডের নীল আলোর আভা ও ডিপারের সবুজ ইণ্ডিকেটরের আলোটুকু। হু-হু করে পিচ কামড়ে গাড়ি চলেছে। সকলেই চুপ।
মাঝে-মাঝে এমনই হয়। যখন প্রত্যেককেই ভাবনাতে পায়। অথচ, ভাবনার চাদরগুলোর মাপ, রঙ সবই আলাদা-আলাদা। রকম সব বিভিন্ন।
আধঘণ্টাখানেক পর হঠাৎ ঋজুদা তিতিরের স্টিয়ারিং-ধরা হাতে হাত ছুঁইয়ে গাড়ি থামাতে বলল।
খুব জোর ব্রেক করে দাঁড় করাল গাড়িটাকে তিতির। আমি ঝাঁকুনি খেয়ে চমকে উঠে চারধারে চেয়ে দেখলাম কেউ নেই, কিছুই নেই।
কী হল?
ঋজুদা নিরুত্তাপ গলায় বলল, হয়নি কিছুই। আয়। একটু চুপ করে বসে থাকি অন্ধকারে। আফ্রিকার রাতের গায়ের গন্ধ তিতিরকে দিবি না একটু? আফ্রিকা যে সবে চান করে, নতুন শাড়ি পরে, গন্ধ মেখে অসীম আকাশের নীচে অন্ধকারের কালো আঁচল মেলে দাঁড়িয়ে আছে তারাদের আকাশ-পিদিম জ্বেলে, আমাদেরই জন্যে। তার কী বলার আছে তিতিরকে শোনাবি না একটু? কী করে জঙ্গলের সঙ্গে কথা-না-বলে কথা বলতে হয়, তিতিরকে শিখিয়ে দে। তোর কাছে অনেক শিখবে তিতির।
তিতির চুপ করে তাকাল আমার দিকে। তারপর জানালা দিয়ে বাইরে। আমি আমার নিজের ঠোঁটে আঙুল ছুঁইয়ে ওকে চুপ করে থাকতে বললাম।
যেমন জঙ্গলে গেলেই হয়, সে পৃথিবীর যে-জঙ্গলই হোক না কেন, আস্তে আস্তে জলের মতো, ফুলের গন্ধের মতো, ভোরের হাওয়ার মতো এক নিটোল, গভীর সুখের মিশ্র-শব্দ-মেশা ঘ্রাণে আমাদের প্রাণের প্রাণ ধীরে ধীরে সঞ্জীবিত হয়ে উঠতে লাগল। হঠাৎই মনে হল, আমাদের গাড়িতে শুধু আমরা তিনজনই নেই। এই আদিগন্ত বাদামি আফ্রিকার এক কৃষ্ণপক্ষের নিভৃত রাত তার অস্তিত্বকে আমাদেরই মাপের মতো ছোট্ট করে নিয়ে আমাদেরই মাঝের সিট উঠে এসেছে। আমি স্পষ্ট তাকে দেখতে পাচ্ছি, তার নড়াচড়ার শব্দ শুনতে পাচ্ছি, তার গন্ধ পাচ্ছি। আমি জানি, ঋজুদাও জানে যে, আমরা মিথ্যা ভাবছি না, বা মিথ্যা বলছি না। তিতির যেদিন আমাদের এই অনুভূতির শরিক হতে পারবে, সেদিন তাকে আর শেখাবার কিছুই থাকবে না এই বুনো-জীবন সম্বন্ধে। তিতির শুধু সেদিনই জানবে যে, অনেক বই পড়ে, অনেক রাইফেল ছুঁড়ে, অনেক বুদ্ধিমত্তার অধিকারী হয়েও সমস্ত জানা যায় না। বাকি থাকে কিছু। যা বাকি থাকে, তা কেউই শেখাতে পারে না কাউকে; তা কোনো বইয়ে লেখা থাকে না, সব য়ুনিভার্সিটির হেড-অব-দ্য-ডিপার্টমেন্টদের পাণ্ডিত্যরও বাইরে সেই সহজ অথচ দেবদুলর্ভ বিদ্যা। সে-বিদ্যা, সে-জানা অনুভবের, হৃদয়ের। যদি তিতিরের হৃদয় বলে কিছু থেকে থাকে, তাহলে সেও আমাদের একজন নিশ্চয়ই হয়ে উঠবে। যে-কোনো দিন, যে-কোনো মুহূর্তে।
যেখানে আজ নাইরোবি-সর্দার, ওয়াটসন আর জেনকিনসের সঙ্গে দেখা হল, পরশু আমরা আরুশা থেকে মাকুউনি গিয়ে লেক মানিয়ারার পথে, সেখান থেকেই প্লেনে চলে যাব। কোথায় যাব, তা এখনও অজানা। আন্দাজ করতে পারছি, হয় ডোডোমা, নয় তো সোজা ইরিঙ্গা। দেখা যাক, তরী গিয়ে কোন্ কূলে ঠেকে!
আজও ঋজুদা জিজ্ঞেস করেছিল আমাদের, ঐ নোটগুলো পড়ে ফেলেছি কি না? আমার এখনও বাকি আছে। তিতিরেরও সামান্য বাকি।
ঋজুদা বলেছিল, ম্যাপ একেবারে মুখস্থ করে ফেলবি। যেন রাতের অন্ধকারেও কম্পাস দেখে পথ চিনতে অসুবিধে না হয়।
চান-টান করে নিজের খাটে শুয়ে আবার কাগজগুলো বের করলাম। ম্যাপটাও। জেনে খুব দুঃখ হল যে, পুব আফ্রিকার পোচিং, এবং পোচিং-করা জানোয়ারদের চামড়া, খড়্গের গুঁড়ো, দাঁত, শিং সব পাচার করার মূলে আছে এশিয়ানরা। পুব আফ্রিকাতে এশিয়ান বলতে ভারতীয়, পাকিস্তানি, সিলোনিজ, বাংলাদেশী সকলকেই বোঝায়। কিন্তু ঋজুদা বলেছিল, এদের বেশির ভাগই ভারতীয় পাসপোর্ট-হোল্ডার নয়। প্রায় সকলেরই ব্রিটিশ পাসপোর্ট। এবং অধিকাংশই পশ্চিম ভারতীয়, গুজরাটি। এদের মধ্যে অনেকে আছেন, যাঁরা কখনও ভারতবর্ষ দেখেননি পর্যন্ত। পড়াশুনা করেছেন ইংল্যাণ্ডে, ছুটি কাটাতে যান সুইজারল্যাণ্ডে, এমনি সব এশিয়ানস্।
পোচিং-এর সিংহভাগই হয় সোমালি এবং নানা জাতের যূথবদ্ধ গুণ্ডাদের দ্বারা। যাদের মায়া-দয়া বলতে কিছুই নেই। সব রকম অস্ত্রশস্ত্রই যাদের কাছে আছে। এরা গভীর জঙ্গল অথবা দূর গাঁয়ের এশিয়ানস ও আফ্রিকান দোকানদারদের চোরা শিকারের জিনিস দিয়ে তাদের সঙ্গে গুলি, খাবার এবং টাকা বিনিময় করে। এই সব দোকানদারের কাছে বেশ ভালরকম চোরা শিকারের সামগ্রী জমে উঠলে, ধরা যাক কয়েকশো কিলোগ্রাম হাতির দাঁত, ট্রাক ভাড়া করে সেই সব জিনিস পাচার করে ভারত মহাসাগরের তীরে। না, অবশ্যই কোনো বন্দরে নয়। ম্যাংগ্রোভ ফরেস্টের মধ্যে, সুন্দরবনে যেমন ম্যাংগ্রোভ ফরেস্টস আছে, স্টিমার লুকিয়ে নোঙর করে থাকে। সেই স্টিমারে ওঠে সেই সব শিকার করা জিনিস। সেখান থেকে হাতির দাঁত আর নানা জাতীয় হরিণ ও অ্যান্টিলোপের শিং স্টিমারে করে চালান যায় আবুধাবি এবং দুবাইয়ে শেখেদের প্রাসাদ অলংকৃত করতে। আবার সেখান থেকে একাংশ প্লেনে করে চালান যায় পুবে এবং ইয়োরোপে।
আফ্রিকার হাতির দাঁতের বড় একটা অংশ যায় চোরাশিকারের বড় বড় বিত্তবান কারবারিদের কাছে, ইয়োরোপে, উত্তর আমেরিকাতে এবং ফার-ইস্টে। সেই সব ব্যবসায়ী এই হাতির দাঁত মজুত করে, সোনা অথবা স্টক মার্কেটের লগ্নির বিকল্প হিসেবে। সোনা অথবা শেয়ার-টেয়ারের দাম হঠাৎ-হঠাৎ পড়ে যায়, তাদের মূল্য উবে যায়; কিন্তু যত দিন। যাবে হাতির দাঁতের দাম ততই বাড়বে। সেই অর্থে মজুতদাররা হাতির দাঁতকে সোনা, শেয়ার, ডিবেঞ্চারের চেয়েও অনেক বেশি মূল্যবান বলে মনে করে। সমস্ত পৃথিবীতে বড়। বড় কোটিপতি মজুতদাররা হাতির দাঁত এমন পরিমাণে মজুত করছে যে, যা তাদের গুদামে আছে তার মাত্র শতকরা পনেরো ভাগ কারুকার্য বা শৌখিন গয়না বা ফার্নিচার বানাবার জন্যে বাজার ছাড়ে তারা প্রতি বছর। এসব তথ্য ঋজুদার বানানো নয়। অনেক পড়াশুনো করে এই সমস্ত তথ্যের প্রমাণ-সাবুদ হাতে নিয়েই নোটটা বানিয়েছে।
কেনিয়ার একজন ভূতত্ত্ববিদ, এসমণ্ড ব্রাডলি মার্টিন, আফ্রিকান গণ্ডারদের সম্বন্ধে অনেক গবেষণা ও পড়াশুনা করেছেন। যেমন করেছেন ডগলাস-হ্যামিল্টন হাতিদের নিয়ে। তিনি বলেন যে, এখনও ফার-ইস্টের বিভিন্ন জায়গায় নানারকম রোগের ওষুধ হিসেবে গণ্ডারের খড়্গের বিশেষ চাহিদা। হকিমি দাওয়াই তৈরি হয় এ থেকে নানারকম। মাথা-ধরা, জ্বর, হৃদরোগ, পিলে-রোগ সব নাকি ভাল হয়ে যায়। ‘হাড্ডি-পিলপিলা’ রোগও নিশ্চয়ই সারে। যে সব রোগ হয়, কিন্তু রোগীরা “জানতিও পারে না” সে সব রোগও নির্ঘাত সারে! কে জানে? গণ্ডারই হয়তো একমাত্র জানে তার খড়্গর গুণের কথা। এক চামচ খড়্গ চেঁচে নিয়ে গুঁড়ো করলেই ছাই-ছাই ঘুঘুরঙের একরকম গুঁড়ো হয়। ফুটন্ত জলের সঙ্গে সেই ডো মিশিয়ে একরকমের ক্বাথ তৈরি করে বড় বড় হাকিমরা রোগীকে খাইয়ে দেয়। এক্কেবারে দাওয়া অন্দর; রোগ বাহার। শরীরে ওষুধ ঢোকে, আর রোগও সঙ্গে-সঙ্গে বাবা মাম্মা ডাক ছাড়তে ছাড়তে পালায়। যে-রোগই হোক না কেন!
কিন্তু আশ্চর্য হলাম পড়ে যে, গণ্ডারের খড়্গের সবচেয়ে বেশি চাহিদা উত্তর ইয়েমেন-এ। ইয়েমেনিরা একরকম লম্বা তরোয়াল ব্যবহার করে। তাদের বলে জাম্বিয়া। সেই জাম্বিয়ার হাতল তৈরি করে তারা গণ্ডারের খড়্গ দিয়ে। ইদানীং ইয়েমেনি শ্রমিকরা অ্যারাবিয়ান গালফ-এ চাকরি করে এখন এক-একজন বিরাট বড়লোক। তাই পয়সার অভাব নেই। ঋজুদার নোটটা পড়েশুনে মনে হচ্ছে, একটা গণ্ডার হয়ে জন্মালেও মন্দ হত না। নিজের নাক কেটে পরের যাত্রাভঙ্গ করে থাকি বলে আমাদের বদনাম আছে। কিন্তু নিজের নাকটি কেটে পরের হাতে তুলে দিয়ে বাকি জী যদি অতি সচ্ছল অবস্থায় কাটানো যেত, তবে নাক-কাটার মতো সুখকর ব্যাপার বোধহয় আর কিছুই হত না।
আজকের মুদ্রাস্ফীতির বাজারে গণ্ডারের খড়্গের এক কিলোর যা দাম, তা একজন জঙ্গলের ও গ্রামের পুব আফ্রিকান অধিবাসীর দু’ বছরের রোজগারের সমান। দশ কিলো হাতির দাঁতের যা দাম, তা তাদের তিন বছরের রোজগারের সমান। তাই গরিব লোকগুলোকে এই পথে ভুলিয়ে নিয়ে আসতে বড় বড় রুই-কাতলা ব্যবসাদারদের বিশেষ বেগ পেতে হয় না। বন-সংরক্ষণ, ইকোলজি, পরিবেশতত্ত্ব ইত্যাদি সম্বন্ধে একজন গড়পড়তা ভারতীয় যতখানি জ্ঞানহীন, আফ্রিকানরাও তাই। তাই ভারতেও যা ঘটছে, ও দেশেও তাই। তবে আফ্রিকা ভারতের চেয়ে অনেক বড় ও অনেক ছড়ানো দেশ বলে এবং জনসংখ্যার চাপ সেখানে কম বলে ও-দেশের ব্যাপার ঘটছে অনেক বড় মাপে।
Convention on Interational Trade in Endangered Species (CITES) হয়েছে উনিশশো তিয়াত্তর সনে। ওয়াশিংটনে। বিভিন্ন দেশের মধ্যে। চোরাশিকারের সামগ্রীর আমদানি-রপ্তানি বন্ধ করার জন্যে। আমদানি যারা করে সেই সব দেশ এই চুক্তি মেনে নিয়েছে, কিন্তু সাব-সাহারা কন্টিনেন্টাল আফ্রিকান দেশগুলোর পঁয়তাল্লিশটির মধ্যে মাত্র পনেরোটি দেশ এই চুক্তি মেনেছে, বাকিরা মানেনি। ফলে, জায়ের এবং তানজানিয়াতে চোরাশিকার করা হাতির দাঁত বুরুণ্ডি থেকে বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে যাচ্ছে। ব্রাসেলস থেকে আবার রপ্তানি করার পারমিট নিয়ে যেখানে খুশি তা চালান করা হচ্ছে। রপ্তানির কাগজপত্র জালও করা হয় ঘুষঘাষ দিয়ে। অতএব ঋজুদা সব জেনেশুনেও জ্ঞানপাপীর মতো নিজের দেশ ছেড়ে এখানে এই এত বড় জোটবাঁধা পৃথিবীব্যাপী চক্রের সঙ্গে লড়ে নিজে মরতে আর আমাদেরও মারতে কেন নিয়ে এল, তা একমাত্র সে-ই জানে।
আমি ভেবেছিলাম, ভুষুণ্ডা ভার্সাস রুদ্রর এক রাউণ্ড ঢিসুমঢিসুম্ টিক্-চুঁই হয়ে যাবে। অ্যামেরিকান ওয়েস্টার্ন ছবির মতো। পরীক্ষা হবে, হু ক্যান্ ড্র ফার্স্ট? ভুষুণ্ডার হাত তার কোমরে পৌঁছবার আগেই আমার পিস্তলের গুলি ঢিক-চুঁই করে তার কদমছাঁট চুলের তেলতেলে পোড়া-কপাল ভেদ করে থাড শব্দ করে পেছনের গাছে গিয়ে গেঁথে যাবে। না। এক্কেবারে অকারণে ঋজুদা একটা সহজ-সরল ব্যাপারকে এরকম ভয়ঙ্কর ও জটিল অপারেশান করে তুলল।
ফোনটা বাজল।
রিসিভার তুলতেই, ঋজুদার গলা।
কী করেন বাহে?
এবার আবার পুব বাংলার ভাষা ছেড়ে উত্তর বাংলায় চলে গেছে। আমাকে বোকা পেয়েছে, ভেবেছে জবাব পাবে না?
বললাম, না করি কোনো।
ঋজুদা হাসল। চমৎকৃত হয়ে। বাঃ। অ্যাই তো চাই! কিপ ইট আপ। তোমার কমরেডের অবস্থা তো খারাপ। খুবই খারাপ। সে খোঁজ রাখো?
কেন?
থুতুতে নাকি ইনফেকশান ছিল। ওর মুখ নাকি জ্বলতে জ্বলতে লাল হয়ে গেছে। মুখখানা এক্কেবারে সাঁতরাগাছির ওলের মতো করে আয়নার সামনে বসে আছে সে।
শুকনো লঙ্কার গুঁড়ো নুনের সঙ্গে বেটে লাগাতে বলল। ভাল হয়ে যাবে। আমার কথা তো শুনলে না তুমি। আমার ঠাকুমা বলতেন, পথি নারী বিবর্জিতা।
এই এক টপিক আর নয়। আর্মিতে বলে যে, ভাল সৈন্য খারাপ সৈন্যের উপর যুদ্ধ-জেতা নির্ভর করে না। ইটস্ দ্য জেনারেল। জেনারেল যেমন, তেমনই হয় তার সৈন্যরা।
কে জেনারেল?
বাঃ। জেনারেল জন এলেন, ভিকটোরিয়া ক্রস, ও-বি-ই, অর্ডার অব মেরিট–এটসেটরা, এটসেটরা। জেনারেল, গুড নাইট স্যার। শাট ইওরসেল্ফ ইন ইওর রুম। ডোন্ট মুভ আউট। দরওয়াজা বন্ধ না করো, কোই আউন্দা হোয়েগা। তুসসি ইনে অখে কিউ হো?
হাসলাম। বললাম, সর্দার গুরিন্দর সিং, ডরিয়া কি বান্দা?
ঋজুদা হো হো করে হাসতে হাসতে রিসিভার নামিয়ে রেখে দিল।
যত হাসি, তত কান্না, বলে গেছে রামশর্মা। আবার ঠাকুমার কথা মনে পড়ল আমার। সত্যি! এত হাসি ঋজুদার আসে কোত্থেকে?
