রুআহা (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

চার

আমাদের ফ্লাইটটা ঘণ্টাখানেক ডিলেড ছিল। বোয়িং। ভিতরে অ্যাকাসিয়া গাছ আর লম্বা-গলা জিরাফের ছবি আঁকা। প্লেনটা ট্যাক্সিইং করে টেক-অফ করার পরই সীট-বেল্ট খুলে ফেলে গা এলিয়ে দিলাম। পরশু, সেই রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে হোটেলে গিয়ে খাওয়া-দাওয়া করে দুপুরে জোর ঘুম লাগিয়েছিলাম। বিকেলে ঋজুদা একাই বেরিয়েছিল কোথায় যেন। রাতে আমরা ঘরের চাবি পকেটে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম ট্যাক্সি করে। পথে তিনবার ট্যাক্সি বদল করে এবং সমুদ্রের পারের বড় বড় পাম গাছের ছায়ার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে মেক-আপ নিয়ে সমুদ্রপারেরই ছোট্ট একটি হোটেলের কটেজে রাত এবং কালকের সমস্তটি দিন শুয়ে বসে গল্প করে কাটিয়ে ছদ্মবেশেই আজ সকালে এয়ারপোর্টে পৌঁছে এই ফ্লাইট ধরেছি। আমাদের বেশির ভাগ মালপত্রই রেখে এসেছি মাউন্ট কিলিমানজারো হোটেলে। জাঞ্জিবারের টিকিটগুলো এবং আসল পাসপোর্টও। নেহাত যা না-আনলেই নয়, তা ছাড়া কিছুই সঙ্গে আনতে পারিনি। তিতিরের ক্যামেরা, বাইনোকুলার সবকিছুই রয়ে গেল। ঋজুদা অবশ্য বলেছে, সবই পাওয়া যাবে পরে, খোয়া যাবে না কিছুই। তবে কাজের জায়গায় কাজে লাগবে না, এই-ই যা।

আমরা তিনজন পোর্ট-সাইডে পাশাপাশি তিনটে সীটে বসেছি। ইংরেজিতেই কথা বলছি। তাই খোলসা করে কিছুই বলা যাচ্ছে না। এয়ারহোস্টেস খবরের কাগজ দিয়ে গেল। কাগজ হাতে নিয়েই চোখ একেবারে ছানাবড়া। ঋজু বোস তাঁর নববিবাহিতা স্ত্রী এবং একমাত্র শ্যালকের সঙ্গে বসে আছে। সেই ছবি, কাগজের প্রথম পাতায়।

আমার মনে হল, এর পরে মরে গেলেও আর আমার দুঃখ নেই। খবরের কাগজে ছবিই যখন ছাপা হয়ে গেল। আর কী?

ছবির নীচে বড় বড় হরফে খবর। হোটেল গেস্টস মিসিং। ডিসঅ্যাপীয়ারেন্স অব থ্রী ইণ্ডিয়ানস্ ফ্রম হোটেল কিলিমাঞ্জারো, শ্রাউডেড ইন মিস্ট্রি!

নীচে সবিস্তারে ধানাই-পানাই।

আমি, সরি, জন অ্যালেন, ভরু কুঁচকে বলল, হোয়াট ডু উ্য থিংক?

ক্রিস্ ভ্যালেরি আমার দিকে চেয়ে গম্ভীরভাবে মাথা নেড়ে বলল, ভেরি স্ট্রেঞ্জ ইনডিড। আই ওন্ট বী সারপ্রাইজড ইফ দে আর ফাউণ্ড ডেড।

পাশের সীটে বসা একজন তানজানিয়ান পুলিশ-অফিসার তিতিরের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।

আমি কাঁধ ঝাঁকিয়ে, কায়দা করে বাবার মতো বললাম, মাই! মাই! ওয়েল ইট কুড বী।

ঋজুদা খবরের কাগজের এক কোনায় বলপেন বের করে খস্ খস্ করে কী যেন লিখে আমাদের দিকে কাগজটা এগিয়ে দিল। দেখি, বিশুদ্ধ বাংলায় লেখা–অত পুটুর-পুটুর কথা কিসের? চুপচাপ ঘুমো।

ঋজুদার লিখন দেখে মিস ভ্যালেরির পিংক-প্রেস্টিজ একেবারে পাংচার হয়ে গেল। আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, ভারী অসভ্য ঋজুকাকা!

তিতিরের কানের মধ্যে আমিও প্রায় ঠোঁট ঢুকিয়ে বললাম, উই! উই! মাদমোয়াজেল!

ফ্রেঞ্চের উই মানে যে ইংরিজি ইয়েস’, মাত্র এইটুকু ফ্রেঞ্চ কৃপণ তিতির একদিনে শিখিয়েছিল আমাকে। একটি শব্দ দিয়েই গুরুবধ করে দিলাম। একেই বলে, গুরু গুড়, চেলা চিনি!

ঘুম লাগাবার আগে তাকিয়ে দেখলাম ঘুমন্ত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন সর্দার গুরিন্দার সিং-এর সাদা গোঁফ, সাহেব-তেলাপোকার শুঁড়ের মতো ফুরফুর করে উঠছে প্রতিবার নিশ্বাস ফেলার সঙ্গে সঙ্গে। আর ক্রিস ভ্যালেরি যে এতটা সুন্দরী তাও এর আগে কখনও খেয়াল করে দেখিনি। এদের দুজনের মধ্যে বিচ্ছিরি, ফল-দাঁতের দেঁতো- জন অ্যালেন্ একেবারেই বেমানান। হংস মধ্যে বক যথা!

ঘুম তিনজনেরই বোধহয় বেশ ভালই এসেছিল। এয়ার হোস্টেস সোয়াহিলি অ্যাকসেন্ট-মেশা খ্যানখ্যানে ইংরিজিতে যখন প্লেনের যাত্রীদের জানাল যে, প্লেন এক্ষুনি কিলিমানজারো ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে নামবে, তখনই সকলের ঘুম ভেঙে গেল।

এয়ারপোর্টের কাছেই মোশি। পুব-উত্তরে গেলে, কিবো হয়ে, মাউন্ট কিলিমানজারো। পশ্চিম-দক্ষিণে আরুশা। যেখানে আমরা যাব।

প্লেনটা নামতেই, চোখ জুড়িয়ে গেল। একেবারে টারম্যাকের পিছনেই পলুমামার টাক-মাথার মতো গোলগোল বরফ-ঢাকা কিলিমাঞ্জারো। মনে হচ্ছে, হাত বাড়ালেই ধরা যাবে। তিতির, সরি, মিস ভ্যালেরি, উত্তেজনায় আমার কোমরের কাছে কুটুস করে চিমটি কেটে দিল একটা। কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে : স্নোজ অব কিলিমানজারো।

ঋজুদা বলে দিয়েছিল, নেমে আমরা কেউই কাউকে চিনব না। প্রত্যেকে আলাদা আলাদা ট্যাক্সি নিয়ে মাউন্ট মেরু হোটেলে গিয়ে পৌঁছোব আরুশাতে। হোটেলে চেক-ইন করে কোনো কায়দায় জেনে নেব, কে কত নাম্বার ঘরে আছি। তারপর, ডাইনিংরুমে আলাদা আলাদা ডিনার খেয়ে ঋজুদার ঘরে রাত দশটার সময় মিটিং।

এয়ারপোর্টের ভিতরটা দারুণ। ঝকঝকে পালিশ-করা কাঠের মেঝে, ঝাঁক ঝাঁক ফুটফুটে, অল্পবয়সী ইয়োরোপিয়ান ছেলেমেয়ের ‘হাই’-’হাই’ চিৎকারে ব্লাডপ্রেসার হাই হয়ে যাওয়ার উপক্রম সকলেরই।

সকলেই দেখি, আমার সামনে এসেই কেমন ভড়কে-যাওয়া মুখ করে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে, রাস্তায় পচা-ইঁদুর পড়ে থাকলে আমরা যেমন করি, কলকাতায়। ব্যাপার বুঝলাম, জেন্টস-রুমে গিয়ে। আমার ফল্স দাঁতটা আধখানা ঝুলে গেছে। বড়ই ব্যথা পেলাম নিজের মূর্তি দেখে। একসট্রিমলি গুডলুকিং মিস ক্রিস্ ভ্যালেরি এবং সর্দার গুরিন্দার সিং-এর দিকে একবারও না-তাকিয়ে মনের দুঃখে বেরিয়ে পড়লাম ট্যাক্সি নিয়ে।

আমাদের দেশেরই মতো কুঁড়েঘর, ন্যাংটা ছেলেমেয়ে, ন্যুব্জ, গরিব বুড়োমানুষ, টায়ার-সোলের জুতো-পরা। মকাইয়ের খেত, তেঁতুলগাছ। একই রকম দারিদ্র, হতাশা। তারই মধ্যে জুইক-জুইক শব্দ করে দুধসাদা এয়ারকণ্ডিশাণ্ড মার্সিডিস্ গাড়ি করে কফি প্লানটেশনের এশিয়ান, আফ্রিকান বা ইয়োরোপিয়ান মালিকরা অন্য গ্রহের বাসিন্দাদের মতোই চলে যাচ্ছেন।

গতবার ডার-এস-সালাম থেকে সোজা সেরেঙ্গেটিতে ছোট্ট প্লেনে করে পৌঁছে যাওয়ায়, আফ্রিকার জনপদ দেখার সুযোগ ঘটেনি। এবারে সেই সুযোগ ঘটল।

এয়ারপোর্ট থেকে আরুশা অনেক মাইল পথ। পৌঁছোলাম যখন, তখন শেষ-বিকেল। ভাল ঠাণ্ডা। গাছপালা, শহরের মধ্যে খুব একটা বেশি নেই। বেশ উঁচু পাহাড়ি শহর। এখানে-ওখানে আকাশমণি গাছ আছে। সুন্দর কমলা-রাঙা ফুল এসেছে। এই ফুলগুলিকেই বলে আফ্রিকান টিউলিপ। শান্তিনিকেতনে এই গাছ অনেক আছে। আমাদের বর্ষাকালে আফ্রিকাতে শীতকাল। এ অঞ্চলে তো বেশ ভালই শীত। প্রায় দার্জিলিঙেরই মতো। শহরের দিকে উঁচু মাথা ঝুঁকিয়ে চেয়ে দেখছে মাউন্ট মেরু। ঐ উঁচু পাহাড়ে মাসাইদের বাস। আমাদের বন্ধু নাইরোবি-সর্দারের কাজিনরাই থাকে হয়তো।

ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে চেক-ইন করছি হোটেলে, হঠাৎ এক্কেবারে ভুষুণ্ডার সঙ্গেই মুখোমুখি দেখা। ভূত দেখলেও এত চমকাতাম না। একটা ছাইরঙা উরস্টেড ফ্ল্যানেলের বিজনেস্ স্যুট পরেছে। মুখে মীরশ্যাম্ পাইপ। আমি তো দেখে থ! হালচালই পালটে গেছে।

ওকে দেখেই আমার হাত নিশপিশ করতে লাগল।

আমার দিকে তাকিয়েই ও মুখ ঘুরিয়ে নিল। হৃৎপিণ্ড ধক্ করে উঠল। পরক্ষণে বুঝতে পারলাম, রুদ্রকে চিনতে পারেনি ভুষুণ্ডা! জন অ্যালেনের এমন সুন্দর চেহারা দেখে ভিরমি লেগেছে কুৎসিত ভুষুণ্ডারও।

মাউন্ট মেরু আরুশার সবচেয়ে ভাল হোটেল। সেই হোটেলেও দেখলাম ভুষুণ্ডাকে সকলে বেশ খাতির-টাতির করছে। মোটা বকশিস দেয় সকলকে নিশ্চয়ই।

আড়চোখে তাকালে সন্দেহ হতে পারে, তাই আমি সোজাসুজিই ওর দিকে তাকাচ্ছিলাম রিসেপশান্ কাউন্টারে দাঁড়িয়েই। ভুষুণ্ডার এত কাছে কার্পেট-মোড়া হোটেলে দাঁড়িয়ে আছি, বিশ্বাসই হচ্ছিল না।

হঠাৎ একটি পরিচিত স্বর কানে এল আমার। অথচ, খুব চেনা কারো স্বর নয়। লোকটা ভাঙা-ভাঙা ইংরিজিতে কথা বলতে বলতে কিউরিও-শপের সামনে দিয়ে আসছিল। এখুনি আমার সামনে বেরোবে এবং বেরুলেই তাকে দেখতে পাব। কোথায় যে তার কথা শুনেছি, মনে করতে পারছিলাম না।

লোকটি দেখতে দেখতে বেরিয়ে এল লবিতে, অন্য দুজন লোকের সঙ্গে কথা বলতে বলতে; আর ঠিক সেই সময়ই তিতির নামল ট্যাক্সি থেকে।

আরে, ওয়ানাবেরি! ওয়ানাবেরি! আমি দেখলাম, তিতিরও ওয়ানাবেরিকে দেখেই চিনেছে, কিন্তু না-চেনার ভান করে গটগট করে স্মার্টলি ওর সামনে দিয়েই হেঁটে এল রিসেপশানের দিকে। তিতিরকে দেখে আমার মনে হল, মেয়ে মাত্রই খুব ভাল অ্যাকট্রেস্ হয়।

ওয়ানাবেরি তিতিরের হাঁটার ভঙ্গির দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে সঙ্গের দুজন লোককে কী যেন বলল সোয়াহিলিতে, চাপা গলায়।

ভুষুণ্ডাকে কিন্তু ওয়ানাবেরি আদৌ চেনে বলে মনে হল না। ভুষুণ্ডাও বোধহয় চেনে না।

সেখানে আর দাঁড়িয়ে থাকা আমার পক্ষে একটুও শোভন হচ্ছিল না। কাউন্টারে স্লিপ-প্যাড পড়ে ছিল। তাতে খসখস করে লিখলাম, বাংলায়, চেক-ইন করেই নিজের ঘরে চলে যাও তাড়াতাড়ি। আমার ঘরের নাম্বার একশো তিন। একটুও বাহাদুরি করো না। এই সব জ্যান্ত মানুষরা কোনচৌকির ছোট-ছোট টিনের বাক্স নয়।

তারপরই আর একটি কাগজে লিখলাম ঋজুদার জন্যে, বন্ধুরা হাজির। নতুন-পুরনো সব। তাড়াতাড়ি ঘরে যাও।

লিখেই প্যাড-সুদ্ধ ঐখানেই রেখে তিতির কাউন্টারে পৌঁছতেই কাউন্টার ছেড়ে পেজ-এর সঙ্গে এলিভেটারের দিকে এগোলাম। কিন্তু সেখানে গিয়ে পৌঁছুবার আগেই গুড়ুম করে একটি শব্দ হল। ফাঁকা জায়গায় শব্দ অন্যরকম শোনায়। শব্দটা প্রচণ্ড জোর মনে হল। ওয়ানাবেরির একজন সঙ্গী অন্যজনকে গুলি করেই কেউ কিছু করবার আগেই বাইরের দরজার দিকে জোরে দৌড়ে গেল। ঋজুদা ট্যাক্সি ছেড়ে দিয়ে সবে দরজা দিয়ে ঢুকছিল। আড়চোখে দেখলাম। লোকটার সঙ্গে ঋজুদার মুখোমুখি ধাক্কা লাগল আচমকাই। ধাক্কা লাগতেই, লোকটা সঙ্গেসঙ্গে ঋজুদার বুকে পিস্তল ঠেকাল। ভেবেছিল বোধ হয় ঋজুদা ওকে আটকাতে চাইছে। আমার ঘড়িটা থেমে গেল। ঘাড়ের কাছে ঠাণ্ডা লাগতে লাগল। দেখলাম, তিতিরের হাত কোমরের কাছে, আমার অজানিতে আমার হাতও কোমরে উঠে গেছিল।

কিন্তু, কিছুই হল না।

ওয়ানাবেরি সংক্ষিপ্ত স্বরে বলে উঠল, বুই বুই! নেণ্ডা জাকো। মারা মাজা।

বলতেই, লোকটা এক ধাক্কায় সর্দার গুরিন্দারের সাদা দাড়িটা প্রায় উপড়ে দিয়েই ঝড়ের বেগে উধাও হয়ে গেল। দাড়ি উপড়ে গেলে যে কী ক্যালামিটি হত সে আর বলার নয়!

ভুষুণ্ডা তখন বুকে-গুলি-লাগা মাটিতে-পড়ে-যাওয়া মানুষটির দিকে চেয়ে প্যান্টের দু পকেটে দু হাত ঢুকিয়ে, কাঁধ শ্রাগ করে স্বগতোক্তি করল, কুনা নিনি হাপা?

ওয়ানাবেরি জিরাফের মতো দুখানি লম্বা পা ফাঁক করে রক্তে ভেসে যাওয়া পুরু কার্পেটের মধ্যে দাঁড়িয়ে হোটেলের কর্মচারীদের চিৎকার-চেঁচামেচির মধ্যেই মাথা নেড়ে যেন কিছুই ঘটেনি এমনভাবে স্বগতোক্তি করল, সিজুই, সিফাহামু।

ঘরে ঢুকেই চায়ের অর্ডার দিলাম। এমন সময় ফোনটা বাজল।

তিতির ইংরিজিতে বলল, হাই! মিস্টার অ্যালেন। হোয়াট আর ইওর প্ল্যান ফর দ্যা ইভিনিং? আই প্রেফার টু স্টে ব্যাক ইন মাই রুম। হাউ বাউট উ্য?

আমি বুঝলাম যে, ঋজুদা নিশ্চয়ই ওকে ঘরেই থাকতে বলেছে।

বললাম, আই অ্যাম ওলসো টায়ার্ড। ডোন্ট ফিল লাইক গোয়িং আউট।

ওক্কে দেন। গুড নাইট!

গুড নাইট।

আবার ফোন বাজল। এবার ঋজুদা।

চাপা হাসির সঙ্গে বলল, বোঝতাছেন কি কর্তা? লাটক দেহি জইম্যা গেল, আইতে না আইতেই? একতারাটারে এট্টু ঠিকঠাক রাইখ্যেন। কহন গান গাইতে অইব কওন যায় না। বোষ্টমীরেও এট্টু কইয়া দিয়েন, সময় বুইঝ্যা! বোজলেন?

তারপরই বলল, প্রেয়োজন অইলে আপনাগো ফোন করুম। দরজায় খিল লাগাইয়া ক্যাবিনেই বইস্যা থাহেন। বদর! বদর! আজ আর ছিন-ছিনারি দেইখ্যা কাম লাই, লদীর গতিক ঠিক মনে অইতেছে না।

আমি কী বললাম, তা বোঝার আগেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, হ! হ! বেশি কওন লাগব না। বুঝছি!

আসলে আমি তো বাঙালই। কিন্তু মা বিহারে মানুষ বলে বাঙাল ভাষা বলতে পারেন না। বাবা যদিও বলেন। এর জন্যেই বলে মাদার-টাং। থাকলে টাঙ্গি; না-থাকলে নেই।

ফোনটা ছেড়ে দিতেই দরজার বেল বাজল। কোমরে হাত দিয়ে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে দরজাটা একটু ফাঁক করলাম।

দেখলাম, বেয়ারা।

চা-টা ভিতরে নিয়ে আবার দরজা বন্ধ করে দিলাম। চা খেতে খেতে রেডিওটাও খুলে দিলাম। সন্ধের খবর বলছে : রহস্যময়ভাবে নিখোঁজ তিনজন ভারতীয় ট্যুরিস্টদের এখনও কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। পুলিশ সন্দেহ করছে যে, ওদের হয়তো খুন করে ফেলেছে কেউ বা কারা। সুন্দরী অল্পবয়সী মেয়েটিরও কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। রহস্য ঘনীভূত হয়েছে। কারণ তাঁদের হোটেলের ঘর থেকে এমন এমন জিনিস পাওয়া। গেছে, যা সাধারণ টুরিস্টদের কাছে থাকে না। কাল সকাল দশটায় ডার-এস্-সালামের পুলিশের বড়সাহেব ইন্টারন্যাশনাল প্রেসের রিপোর্টারদের সামনে এক বিবৃতি দেবেন।

জলজ্যান্ত মানুষটা কী করে চোখের সামনে পড়ে গেল গুলি খেয়ে, সেই কথাই ভাবছিলাম। খুন তো আমিও করেছি, কিন্তু সে তো নিতান্তই প্রাণের দায়ে। এই খুনটা কোল্ড-ব্লাডেড। মরে গেছে নির্ঘাত। অত ক্লোজ-রেঞ্জ থেকে পাকা হাতের গুলি খেয়ে। কোনো নিয়মিত গুলিখোরের পক্ষেও বাঁচা সম্ভব নয়।

তিতির কিন্তু অত রক্ত দেখেও ঘাবড়াল না একটুও। আশ্চর্য! ও আসলে মেয়ে কি না, আমার সন্দেহ হচ্ছে। ও-ও বোধহয় শেষকালে আরেকজন ভুষুণ্ডার মতো আমাদের দুজনকে এবার খতম করবে! এত সুন্দর মানুষ মেয়ে হয় না। এত গুণেরও হয় না।

ওয়ানাবেরি আর ভুষুণ্ডা যে একে অন্যকে চেনে না এটাও এক নতুন রহস্য। ওরা দুজনে একই দলের লোক হলে, তাও হত। এখন দেখা যাচ্ছে, এরা ভিন্ন-ভিন্ন দলের লোক। গোদের উপর বিষফোঁড়া। শত্রু তাহলে দলে-দলে। চিজ-স্ট্র দিয়ে চা খেয়ে ঘরের আলো নিভিয়ে দিয়ে, জানলার কাছে এসে দাঁড়ালাম।

হ্যালোজেন ভেপার-এর কমলা আলোয় ভারী সুন্দর দেখাচ্ছে রাতের আরুশা শহরটিকে। স্কানীয়া ট্রাক যাচ্ছে। বড় বড় স্কাণ্ডিনেভিয়ান ট্রাক। জিপ, নানারকম গোঁয়ার এঞ্জিনে গাঁক-গাঁক আওয়াজ তোলা ঝাঁক ঝাঁক বিদেশী গাড়ি। রাতের শহরটাকে কেমন ভুতুড়ে-ভুতুড়ে, রহস্যময় বলেও মনে হচ্ছে। কে জানে? লোকটা বাঁচল না মরল। মরেই গেছে নিশ্চয়ই এতক্ষণ। লোকটা কে? আর যে ওকে মারল, সেই বা কে? ওয়ানাবেরির সঙ্গে এদের কী সম্পর্ক? ভুষুণ্ডা, ওয়ানাবেরি–সব এখানে কী করতে এসেছে? ওরা কি জেনে গেছে আমাদের আসার কথা? ওয়ানাবেরি কি তিতিরের হাঁটার ভঙ্গি দেখে তিতিরকে চিনতে পেরেছে? না বোধহয়! না হলেই ভাল।

এয়ারপোর্টে ঋজুদা আমাকে এবং তিতিরকে একটা করে খাম দিয়ে বলেছিল, আরুশাতে পৌঁছেই ভাল করে পড়ে নিস।

খামটা বের করে, বিছানার একপাশে শুয়ে বেড-সাইড ল্যাম্প জ্বেলে কাগজগুলো বের করলাম। বের করতেই, একটা ম্যাপ বেরুল। এবং কিছু ফোটোস্ট্যাট করা কাগজ।

ম্যাপটা, তানজানিয়ার। খুলে, মেলে ধরলাম খাটের উপর।

আমরা যেখানে এখন আছি আরুশাতে, তার উত্তর-পুবে মাউন্ট কিলিমানজারো। উত্তর-পশ্চিমে সেরেঙ্গেটি ন্যাশনাল পার্ক– গোরোংগোরো ক্র্যাটার হয়ে। দক্ষিণ-পশ্চিমে টারাঙ্গিরে ন্যাশনাল পার্ক। সেরেঙ্গেটি ছাড়িয়ে আরুশার সমান্তরাল রেখাতেই প্রায় মোয়াঞ্জা। লেক ভিক্টোরিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে। তানজানিয়ার পশ্চিমে রয়াণ্ডা এবং বুরুণ্ডি। তার সামান্য দক্ষিণ-পশ্চিমে লেক ট্যাঙ্গানিকা। তারও পরে জায়ের। কঙ্গো নদী বয়ে গেছে যেখানে।

দেখলাম, ম্যাপের মধ্যে লাল কালি দিয়ে ইরিঙ্গা বলে একটি জায়গাতে দাগ দিয়ে রেখেছে ঋজুদা। ইরিঙ্গা, আরুশার অনেকটা দক্ষিণে। যেখান থেকে এলাম আমরা, সেই ডার-এস-সালাম থেকে বরং অনেক কাছে। ডার-এ-সালামের সমান্তরালে, সামান্য দূরে ডোডোমা। সেই ডোডোমার দক্ষিণে ইরিঙ্গা। ইরিঙ্গা থেকে লেক নীয়াসা সবচেয়ে কাছে। রুকোয়া বলেও একটি ছোট্ট লেক আছে আরও কাছে। কিলিমানজারোর মতো ইরিঙ্গাতেও বড় এয়ারপোর্ট আছে। তবে, কিলিমানজারো ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। এখান থেকে লণ্ডন, প্যারিস, টোরোন্টো, নু-ইয়র্ক, টোকিও, হংকং, ব্যাংকক, ইস্তাম্বুল, বেইরুট, দুবাই, বাগদাদ, মস্কো, লেনিনগ্রাড, বেলগ্রেড, বুখারেস্ট, বুড়াপেস্ট, স্টকহোম, কোপেনহাগেন, অসলো, হেলসিঙ্কি, ফ্রাঙ্কফুর্ট, বার্লিন, জুরিখ, ভিয়েনা, ব্রাসেলস্, আমস্টারডাম এবং রোমের ডাইরেক্ট ফ্লাইট আছে।

এত লম্বা ফিরিস্তি এই জন্য দিলাম যে, সমস্ত পৃথিবীর চোরা শিকারের সামগ্রী এখান থেকে যে-কোনো জায়গাতেই যেতে বাধা নেই। তবে, হাতির দাঁত, সিংহ, জিরাফ, জেব্রা এবং নানারকম গ্যাজেলস, ওকাপি, কুডু এসবের চামড়া প্লেনে করে চালান বেশি যায় না। হিপোপটেমাসের দাঁতও ভারী হয় বলে প্লেনে করে নিয়ে যাওয়া মুশকিল। প্লেনে বেশি যায় হাতির লেজের চুল, যা দিয়ে সুন্দর বালা তৈরি হয়, গণ্ডারের খড়্গর গুঁড়ো ইত্যাদি।

ঋজুদার দেওয়া নোট পড়ে মনে হল, আমাদের এখান থেকে যেতে হবে ইরিঙ্গা। ইরিঙ্গা থেকে হয় ছোট প্লেনে উড়ে গাজরা যেতে হবে, নয়তো পথ দিয়ে, ল্যাণ্ডরোভারে। ঐ অঞ্চলেই গ্রেট রুআহা নদী বয়ে গেছে। রাঙ্গেয়া গেম রিসার্ভ এবং রুআহা ন্যাশনাল পার্ককে লাল কালি দিয়ে গোল করে দাগ দিয়ে রেখেছে দেখলাম।

বুঝতে পারলাম না, ইরিঙ্গাই যদি যাব, তো এখানে এলাম কেন, এমন নাক ঘুরিয়ে কান ধরার কি মানে হয়? তবে মানে নিশ্চয়ই হয়! নইলে ঋজুদা আসবেই বা কেন?

এক শতাব্দী আগে বহু মিলিয়ন হাতি ছিল এই আফ্রিকাতেই। আয়ান ডগলাস হ্যামিল্টন্ প্রাণিতত্ত্ববিদ এবং আফ্রিকান হাতির উপরে একজন অথরিটি; যিনি পুব আফ্রিকার ইডালা নদীর পাশে বছরের পর বছর হাতিদের উপর গবেষণা চালিয়েছিলেন একেবারে একা জঙ্গলে থেকে। পরে, উনি অবশ্য বিয়ে করেন আরেকজন প্রাণিতত্ত্ববিদকেই। এবং ঐ জঙ্গলেই তাঁদের একটি সন্তানও হয়। ডগলাস হ্যামিলটনের রিপোর্টে উনি বলেছেন, পুরো আফ্রিকাতে আজকে বোধহয় তেরো লক্ষের বেশি হাতিও নেই। আফ্রিকা তো আর ছোট জায়গা নয়! কতগুলো ভারতবর্ষকে যে তার মধ্যে হারিয়ে দেওয়া যায় হেসে-খেলে, তা পৃথিবীর ম্যাপ দেখলেই বোঝা যায়। ঋজুদা আণ্ডারলাইন করে দিয়েছে অনেকগুলো জায়গা। মার্জিনে লিখে দিয়েছে যে, আমাদের ঝগড়া ভুষুণ্ডা আর ওয়ানাবেরির সঙ্গে নয়। ওরা যাদের চাকর-মাত্র, তাদেরই বিরুদ্ধে। যাদের সঙ্গে টক্কর দিতে এসেছি এবারে, তাদের চর সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছে। কোটি কোটি টাকার মালিক তারা। তাদের স্বার্থহানি যারা করতে চায়, তাদের তারা ক্ষমা করে না। অতএব, সাবধানতা থেকে কোন সময় একটুও সরে আসা মানেই নির্ঘাত মৃত্যু। আরও লিখেছে, পিস্তলে তিতিরের হাতই ভাল, না তোর হাত, এই ছেলেমানুষি ঝগড়াতে যাবার সময় এখন নেই। এখানে প্রতিমুহূর্ত মৃত্যুর ছায়ায়, ওয়ানাবেরির, মানে মৃত্যুরই, মুঠোর মধ্যে দিন কাটাতে হবে।

বুঝলাম যে, রুই কাতলা ধরবে বলেই, ঋজুদা ভুষুণ্ডা আর ওয়ানাবেরিকে দেখার পরও একটুও উত্তেজিত হয়নি।

কেনিয়ার প্রাণিতত্ত্ববিদ কেস হিলম্যান (আফ্রিকান রাইনোগ্রুপ অব ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর দ্যা কনসার্ভেশন অব নেচার অ্যান্ড ন্যাচারেল রিসোর্সেস-এর চেয়ারম্যান), আয়ান পাকার, বন্যপ্রাণী-বিশারদ, কানাডিয়ান ইকোলজিস্ট রবার্ট হাডসন, বিখ্যাত ন্যাচারালিস্ট, এবং ওয়ার্ড ওয়াইল্ড লাইফ ফাণ্ডের চেয়ারম্যান স্যার পিটার স্কট ইত্যাদির রিপোর্টের কাটিংও ফোটোস্ট্যাট করে দিয়েছে ঋজুদা নিজের নোটের সঙ্গে। বাংলায় হাতে লিখেছে, তোরা এগুলো না পড়লে, আমাদের উদ্দেশ্যর মহত্ত্ব ও বিপদ সম্বন্ধে ধারণা হবে না। একরকমের যুদ্ধই করতে এসেছি আমরা। যাদের নৈতিক চরিত্র নেই, যারা ন্যায়ের জন্যে লড়ে না, তারা কখনই কোনো যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত জেতে না। অন্যায় চিরদিনই হেরে যায় ন্যায়ের কাছে। হয়তো সময় লেগেছে, হয়তো দাম দিতে হয়েছে অনেক; কিন্তু ন্যায়ই জিতেছে চিরদিন। তোদের যদি আমাকে এখানেই দাহ করে ফিরে যেতে হয়, তাহলেও দুঃখ নেই। দুঃখ করিস না তোরা। তুই আর তিতির, আমি যা করতে পারিনি, তা যদি করতে পারিস তো শুধু আফ্রিকাতেই নয়, সারা পৃথিবীতেই তোরা দুজনে নায়ক-নায়িকা হয়ে যাবি। তোরা ছেলেমানুষ যদিও, কিন্তু তোদের উপর আমার ভরসা অনেক। নিজেদের উপর বিশ্বাস রাখবি। পিস্তলের নিশানার চেয়েও বিশ্বাসের জোর অনেক বড়। আত্মবিশ্বাসে বিশ্বাস রাখলে, বিশ্বাস তোদের কখনও অমর্যাদা করবে না।

এর পরে, কীভাবে চোরাশিকারিরা বিভিন্ন জানোয়ার মারে, কী ভাবে ট্রাকে, স্টিমারে, মানুষের মাথায়, সি-১৩০ কাগো প্লেনে করে এই সব মাল চালান দেয় পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে তার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছে ঋজুদা।

আজ আর সব পড়তে ইচ্ছে করছে না। তবে, পড়ে ফেলতেই হবে। কারণ গতবারে ভুষুণ্ডার গুলিতে ঋজুদা আহত হওয়ার পর একা পড়ে যাওয়াতে যে কি অসহায় হয়েই পড়েছিলাম তা আমার মতো আর কেউই জানে না। ঋজুদা অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল, জিজ্ঞেস করবই বা কাকে? জানার যা-কিছু, তা সবই ভাল ভাবে জেনে নিতে হবে। পথ-ঘাট, নদী-নালা, এয়ারপোর্ট। আমরা তিন কম্যাণ্ডো এসেছি বিরাট, সুগঠিত শক্তিশালী এক চক্র ধ্বংস করতে। যুদ্ধের যাবতীয় জ্ঞাতব্য বিষয়ই আমার আর তিতিরের জেনে নিতে হবে বইকি!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *