রুআহা (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

তিন

সকাল আটটার মধ্যে তৈরি হয়ে ঋজুদার ঘরে এলাম আমি আর তিতির। ছদ্মবেশের জিনিসপত্র ঠিকঠাক করে রেখেছি। বাথরুমের আয়নাতে দাঁতটা লাগিয়ে দেখেও নিয়েছি একবার। দারুণ দেখাচ্ছিল। প্রায় দানুয়া-ভুলুয়ার জঙ্গলের দাঁতাল শুয়োরের মতো। মা তাঁর সাধের ছেলেকে তখন দেখলে নির্ঘাত অজ্ঞান হয়ে যেতেন।

রুম-সার্ভিসকে বলে, ঘরেই ঋজুদার জন্যে কফি আর আমাদের জন্যে দুধ আনিয়ে নেওয়া হল। কফির পেয়ালায় সুগার-কিউব ফেলে চামচ নেড়ে মেশাতে মেশাতে হাসতে হাসতে ঋজুদা বলল, ব্রেকফাস্ট আর খায় না! যা ঝামেলা বাধালি তোরা আফ্রিকার মাটিতে পা দিতে না-দিতেই। কী দরকার ছিল ওয়ানাবেরির সঙ্গে টক্কর মারতে যাওয়ার?

বললাম, আমরা কি টক্কর মারতে গেছি নাকি? সে-ই তো টরে-টক্কা করে টক্কর বাধাল।

আমাদের কাছ থেকে কালকের অভিজ্ঞতা এবং মিঃ শাহর বসবার ঘরের দেওয়ালের ফোটোর কথাও ঋজুদা শুনেছিল। ফোটোর কথা শুনেই ঋজুদা হেসেছিল। মাঝে-মাঝে বেশি-বেশি বিজ্ঞের মতো ভাব দেখায় ঋজুদা। ভুষুণ্ডার গুলি খাওয়ার পর থেকে একটু বোকা-বোকাও হয়ে গেছে যেন। নয়তো, আমি আগের থেকে চালাক হয়েছি।

কফিটা খেয়েই ঋজুদা এয়ার তানজানিয়ার অফিসে ফোন করতে বলল আমাকে। করলাম। আরুশার তিনটে টিকিট পাওয়া যাবে কিনা জিজ্ঞেস করতে তাঁরা বললেন পাওয়া যাবে। কিন্তু কালকে ফ্লাইটের কোনো টিকিট নেই। পরশুর আছে।

ঋজুদা বলল, বলে দে, আমরা এক ঘণ্টার মধ্যে টিকিট নিয়ে নেব।

তাই-ই বলে দিলাম।

পনেরো মিনিট সময় দিলাম। যার যার ভেক ধরে নিজেরা। তারপরই বলল, নাঃ! সঙ্গেই নিয়ে চল ব্যাগে। অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা। ঘরের চাবি সঙ্গে নিয়ে বেরুবি–রিসেপশানে জমা দেওয়ার দরকার নেই।

নীচে নেমে, হোটেলের লবি থেকে চিরুনি কিনল ঋজুদা একটা। দাম কুড়ি টাকা মাত্র। আমি ভেবেছিলাম হাতির দাঁতের হবে বুঝি। হাত দিয়ে দেখি, কেলে প্লাস্টিক।

ঋজুদা বলল, এমনিতে কি আর এশিয়ানদের উপর এত রাগ আফ্রিকানদের? ভারত থেকে দু টাকার চিরুনি এনে এখানে কুড়ি টাকায় বিক্রি করলে ওরা যদি এশিয়ানদের অদূর-ভবিষ্যতে কিলিয়ে কাঁটাল পাকায় তাতে আর দোষ কী? বল?

ট্যাক্সি নিয়ে ডাউনটাউনে এসে বেশ বড় একটা জমজমাট রেস্তোরাঁর সামনে ট্যাক্সি ছেড়ে দিয়ে আমরা ভিতরে ঢুকলাম। এয়ার-কণ্ডিশান্ড, স্বপ্নালোকিত রেস্তোরাঁ। কিন্তু ভিড় গিশগিশ। তারই মধ্যে একটি অন্ধকার কোনায় আমরা গিয়ে বসলাম। কফি, তার সঙ্গে সসেজ উইথ বেকন অর্ডার করল ঋজুদা নিজের জন্যে। তিতির চিকেন ওমলেট আর ড্রিঙ্কিং চকোলেট। আমি মাটন হ্যামবার্গার আর চা। সাতসকালে বড় এক গ্লাস দুধ খেয়ে গা গোলাচ্ছিল। দুধ আবার বড়রা খায় নাকি? সমস্ত প্রাণিজগতে দুধ খায় শুধু দুগ্ধপোষ্যরাই। যেহেতু দুধের-শিশু তিতির সকালে দুধ খায় সুতরাং আমাকেও দুধ গেলাল ঋজুদা। এ-যাত্রা যদি বেঁচে ফিরি কলকাতায়, তাহলে ভটকাই নিশ্চয়ই আওয়াজ দেবে আমাকে। তিতিরের বদলে ভটকাইটা এলে কত মজা হত! কিন্তু কে বোঝে এসব কথা!

কাতলা মাছের হাঁ-করা মুখের মতো একটা হোঁতকা পাইপে জম্পেস করে তামাক ঠেসে, কালো লেদার-ফোমের চেয়ারে গা এলিয়ে বসল ঋজুদা। তার পর ধোঁয়া ছাড়তে লাগল চাঁদপাল ঘাটের লজঝড়ে মোটর-লঞ্চের মতো। বুঝলাম, এখন বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া দেওয়া চলবে। কতক্ষণ চলবে, তা ঋজুদাই জানে।

খাবার এসে গেলেই সোজা হয়ে বসে বলল, রুদ্র, তুই যেমন পোশাকে আছিস এই পোশাকেই চলে যাবি এয়ার তানজানিয়ার অফিসে। একটা ট্যাক্সি নিয়ে নিস। জাঞ্জিবারের টিকিট কাটবি তিনটে। পরশুদিনের।

জাঞ্জিবার? সে তো অন্য দেশ। আমি বললাম।

তিতির বলল, তা কেন হবে? জাঞ্জিবার তো তানজানিয়ারই অংশ। মরিশাস দ্বীপপুঞ্জ আলাদা দেশ। দু জায়গাতেই মসলা হয় বলেই কি মসলা মেশাবে নাকি?

বড় ট্যাক্-ট্যাক্ করে মেয়েটা। ভারী তো একটা সাবজেক্ট। ভূগোল। পড়াশুনায় ভাল বলে যেন ধরাকে সরা জ্ঞান করছে সবসময়। ভুষুণ্ডা আর ওয়ানাবেরির পাল্লায় পড়লে ভূগোল-জ্ঞান বেরিয়ে যাবে। ট্যাকট্যাকানি বন্ধ হবে তখন।

ঋজুদা বলল, তিতির, তুমি খেয়ে নিয়েই রেস্তোরাঁর লেডিজ-রুমে গিয়ে মেক-আপ নিয়ে ট্যাক্সি করে চলে যাবে এয়ার তানজানিয়ার অফিসে। পরশুর টিকিট কাটবে তুমিও। তিনটে। তবে জাঞ্জিবারের নয়, আরুশার। একটাই ফ্লাইট আছে, সকালের দিকে। বোধহয় দশটা কি এগারোটা নাগাদ। রিপোর্টিং টাইমটাও জেনে আসবে। বলেই বলল, কী কী নামে কাটবে?

ততক্ষণে খাবার এসে গেছিল। বেয়ারাকে অগ্রিম মোটা টিপস দিয়ে দিল ঋজুদা। সে বুঝল আমরা অনেকক্ষণ জ্বালাব এখানে। সে চলে যেতেই তিতির বলল, সর্দার গুরিন্দর সিং, জন অ্যালেন এবং ক্রিস ভ্যালেরি!

রাইট! ঋজুদা বলল, একটা গালা-গোব্দা সসেজকে কাঁটা দিয়ে ধরে, ছুরি দিয়ে কেটে, মাস্টার্ড মাখাতে মাখাতে। তারপর সসেজের টুকরোটি মুখে পুরে দিয়েই বলল, দুজনেই, টিকিট কেটে আলাদা-আলাদা ট্যাক্সি নিয়ে ফিরে আসবি। রেস্তোরাঁ থেকে বেশ খানিকটা দূরেই ছেড়ে দিবি ট্যাক্সি। তিতির ট্যাক্সি থেকে নেমে নিউজ-স্ট্যান্ড থেকে খবরের কাগজ কিনে রেস্তোরাঁতে ঢোকার সময় খবরের কাগজটা মুখের কাছে যথাসম্ভব তুলে ধরে, মুখ আড়াল করে লেডিজ-রুমে গিয়েই মেক-আপ ছেড়ে টেবিলে ফিরে আসবে। ওক্কে?

আমরা দুজনেই একসঙ্গে বললাম, ওক্কে।

ট্রাভেলার্স চেকের বইটা পকেটে আছে কি নেই ভাল করে দেখে নিয়ে আমি বেরিয়ে পড়লাম। তিতির জানে না, কিন্তু আমি জানি যে, এখন একা-একা ভাবনায় বুঁদ হয়ে থাকবে ঋজুদা। একেবারে অন্য জগতে পৌঁছে যাবে। এই ঋজুদাকে আমারই ভয় করে, আর তিতির তো নতুন চিড়িয়া। বেচারি তিতির! কেন যে এখানে এল! কাল রাতের তীর-গাঁথা চিঠিটির কথা মনে পড়ে গেল আমার : গো হোম, ঊ্য প্রেটি গার্ল, অর বী বেরি ইন দি উইলডারনেস্ অব আফ্রিকা।

মিনিট-কুড়ির মধ্যে ফিরে এলাম টিকিট নিয়ে। আমি ফেরার মিনিট-পনেরোর মধ্যেই তিতিরও ফিরল, লেডিজ-রুম হয়ে। ঠিক সেই সময়ই একটি ঘটনা ঘটল। কে যেন হঠাৎই ছবি তুললেন আমাদের। ফ্ল্যাশলাইটে।

ঋজুদার চোয়াল মুহূর্তের জন্যে শক্ত হয়ে এল। কিন্তু পরমুহূর্তেই একটি দারুণ নিঃশব্দ হাসি ছড়িয়ে গেল ঋজুদার মুখে। পোলারয়েড ক্যামেরা। ছবি তোলার সঙ্গে সঙ্গেই প্রিন্টটি বেরিয়ে এসেছিল ক্যামেরা থেকে। বেঁটেখাটো মিশকালো ফোটোগ্রাফার পাখার বাতাস করার মতো দু-তিনবার সেটাকে নাড়তে-চাড়তেই ছবিটা ফুটে উঠল। ফোটোগ্রাফার ছবিটি আমাদের টেবিলে রেখেই আর-একটি ছবি তুললেন।

ঋজুদা এবার শব্দ করে হাসল। বলল, আশান্টে!

বলেই তানজানিয়ার শিলিং-এর একটি বড় নোট বের করল তাঁর জন্যে, মোটা পার্স থেকে।

ফোটোগ্রাফার টাকা নিলেন না। বললেন, আমি পয়সা নিই না। বিদেশী ট্যুরিস্টদের ছবি তুলি এমনিই। এক কপি তাঁদের দিয়ে দিই আর অন্য কপি ট্যুরিজম্ ডিপার্টমেন্টে ও পিকচার পোস্টকার্ড কোম্পানিদের কাছে বিক্রি করি।

তবু, ঋজুদা বলল, আমার নববিবাহিতা স্ত্রী এবং একমাত্র শ্যালকের ছবি তুলে দিলেন। বকশিশ আপনাকে নিতেই হবে।

ঋজুদার কথা শুনে তিতিরের মুখ এবং আমার দুই কান লাল হয়ে উঠল।

ভদ্রলোক টাকা যখন কিছুতেই নিলেন না, তখন ফোটোর কপিটা চেয়ে নিল দেখবার জন্যে। নিয়েই ফোটোটির পিছনে বল পয়েন্ট পেন দিয়ে বড় বড় করে লিখল টু ভুষুণ্ডা, উইথ লাভ। ফ্রম ঋজু, রুদ্র অ্যাণ্ড তিতির।

লেখাটি পড়তে পড়তে ফোটোগ্রাফার ভদ্রলোকের গ্রামোফোনের রেকর্ডের মতো কালো মুখটি কালোতর হয়ে গেল। অবাক হয়ে, আমতা-আমতা করে তিনি বললেন ভুষুণ্ডা? সে কে? আমি তো চিনি না–।

ঋজুদা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাঁর মুখের দিকে চেয়ে বললেন, চেনেন না? আপনি তাকে না চিনলেও, সে হয়তো আপনাকে চেনে। অথবা, চিনে নেবে। যাই হোক, তার সঙ্গে যদি দেখা হয়ে যায়, বাই-চান্স, তবে বলবেন যে, শুধুমাত্র তার সঙ্গে দেখা করতেই আমাদের এতদূর আসা।

ফোটোগ্রাফারের ভ্যাবাচ্যাকা-খাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে হাসি পেল আমার।

উনি আমাদের সামনে ভক্তিভরে মাথা ঝুঁকিয়ে, বাও করে, চলে গেলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *