ঋজুদার সঙ্গে স্যেশেলসে – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

ভটকাই বিস্ময়ে প্রায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে বলল, এ কী! এমন সব রং কেন?

একেই বলে প্রবাল দ্বীপ! বুঝেছিস। জলের নীচে যে রঙের প্রবাল, সেই রঙেরই আভা ফুটেছে জলে।

ঋজুদা বলল।

প্লেনটা আরও এক চক্কর মারল দ্বীপপুঞ্জের ওপরে, যেন এই স্বপ্নের দেশকে ভাল করে দেখাবারই জন্যে। তারপরই নেমে পড়ল রানওয়েতে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল যে, পাইলট বুঝি সামলাতে পারবে না আর, প্লেনসুন্ধু আমাদের অবধারিত সলিল সমাধি কেউই আর ঠেকাতে পারবে না। কিন্তু যাই হোক, দৈববলে একেবারে জলের কিনারে গিয়ে ঝাঁকুনি দিয়ে ব্রেক কষে, পাইলট প্লেনের মুখটা ঘোরাল।

ঋজুদা স্বগতোক্তি করল। আরে! এয়ারপোর্টটা তো এখন অনেক লম্বা হয়েছে মনে হচ্ছে। নাকি, চোখেরই ভুল? প্রথমবার যখন এসেছিলাম উনিশশো ঊনআশিতে, তখন সত্যিই মনে হয়েছিল যে, জলেই পড়ে যাবে প্লেনটা। তা করবেটাই বা কী? জায়গা কোথায়? এই হচ্ছে স্যেশেলসের রাজধানী ভিক্টোরিয়া। মাহে দ্বীপে। এই দ্বীপটারই নাম ‘মাহে’। বলেছি তো! এই দ্বীপ লম্বাতে সতেরো মাইল আর চওড়াতে তিন মাইল। তাও আবার শুধুই সমতল জমি নয়, পাহাড়-টাহাড় নিয়ে। আর পাহাড়ও তো এখানে কম নেই। প্রহরীর মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় প্রত্যেকটি দ্বীপের আধো-চাঁদা তটরেখার পেছনে পেছনে। স্যেশেলস দ্বীপপুঞ্জের সবচেয়ে বড় দ্বীপ ওই স্বাধীন দেশের যদি রাজধানী হয় তবে অন্য দ্বীপগুলি যে কত ছোট তা তো অনুমানই করতে পারছিস।

প্লেন থেকে নেমে, টারম্যাকে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে দেখি, সামনেই কাছে-দূরে তিনটি দ্বীপ দেখা যাচ্ছে। দ্বীপপুঞ্জ যখন, তখন দ্বীপ তো থাকবেই অনেক।

ভটকাই বলল, ঋজুদা স্যেশেলসের মানুষদের কী বলে?

আমি বললাম, কী আর বলবে, মানুষই বলে।

বোকার মতো কথা বলিস না। ইন্ডিয়ার মানুষদের যেমন বলে ইন্ডিয়ান, অ্যামেরিকার মানুষদের অ্যামেরিকান তেমনই আর কী?

নারে! স্যেশেলসের মানুষদের বলে স্যোশেলোয়া। ঋজুদা বলল।

স্যেশেলোয়া!

ভটকাই পুলকিত হয়ে পুনরাবৃত্তি করল।

ঋজুদা বলল, এখানে আমি ছাড়া আর কেউই অন্যদের সঙ্গে কথা বলবে না। বুঝেছ। মানে, যখন আমার সঙ্গে থাকবে। যখন আমি সঙ্গে থাকব না, তখন তো অন্যদের সঙ্গে তোমাদের কথা বলতেই হবে। এবং ইংরেজিই বলতে হবে।

অত ইংরেজি! উরি বাবা!

ভটকাই বলল।

আমরা নিজেদের মধ্যে অবশ্য সবসময়েই বাংলাতেই কথা বলব।

তারপর বলল, ‘ক্রেওল’ ভাষাটা এত স্বল্প দিনে আয়ত্ত করা গেল না। তোরা তো আবার ফরাসি জানিস না কেউই। তিতিরটা থাকলে খুবই ভাল হত। সে মেয়েটা তো রীতিমতো একজন ভাষাবিদ। লিঙ্গুইস্ট।

প্রতিভা যাহাকেই স্পর্শ করে, তাহাই…

ভটকাইকে বকাবকি অবশ্যই করি বটে, কিন্তু ও না থাকলে আমাদের এই অভিযানগুলো একটু বেশিই সিরিয়াস হয়ে যেত। ভটকাই সঙ্গে থাকে বলেই কখনওই আমাদের ‘টেন্স’ হয়ে ওঠা হয় না। ও একটা ওরিজিনাল মানুষ।

কাস্টমস আর ইমিগ্রেশন-এর কাউন্টার সহজেই পেরনো গেল। ঋজুদা বলল, এটা ট্যুরিস্ট স্পট। সারা পৃথিবী থেকে পর্যটকরা আসছেন প্রবাল দ্বীপের সৌন্দর্য দেখতে, স্কুবা-ডাইভিং করতে, স্নরকেলিং করতে, সাঁতার কাটতে, সাদা বালুবেলাতে সাঁতরাগাছির ওল-এর মতন সারে সারে শুয়ে থেকে গায়ের সাদা বা লাল রং পুড়িয়ে পোড়ামাটির মতো রাঙা হয়ে উঠতে। যত বেশি বিখ্যাত-স্পট, তত বাতিকগ্রস্ত আর হাফ-পাগল আর পাগল এসে জোটে সেখানে।

স্কুবা-ডাইভিং আর স্নরকেলিং মানে কী? ভটকাই বলল।

অভিধানে দেখে নিবি। পশ্চিমি জগতে কেউ আমাদের মতন সবকিছুই অন্যের কাছ থেকে জেনে নিতে চায় না। নিজেরাই কষ্ট করে জানে। তাই, মনে থাকে। লক্ষ করে দেখিস, ওরা পারতপক্ষে পথঘাটের হদিসও জিজ্ঞেস করে না। নিজেরাই ম্যাপ দেখে বের করে।

ঋজুদা হঠাৎই বলল, শোন, তোরা দুজনে একটু পাগল-পাগল ভাব করবি। আর ভাব করবি, যেন তোরা দুজনেই আমার ছেলে। দুই ন্যালাখ্যাপা। ভুলে যাস না।

ছেলে!

ভটকাই ভীষণ উত্তেজিত হয়ে বলল, বাবা জানলে কিন্তু ভীষণ রাগ করবে। বাবার একমাত্র বংশধরকে তুমি মেরে দেবে?

ঋজুদা বলল, সেটা কোনও কথা নয়। মা জানলে আরও বেশি রাগ করবেন হয়তো। কিন্তু কী করা যাবে। কার্যসিদ্ধি করে এবং প্রত্যেকেরই পৈতৃক প্রাণ বাঁচিয়ে কলকাতায় ফেরার চেষ্টা তো করতে হবে।

আমি বললাম, কাস্টমস আর ইমিগ্রেশনে তো আমাদের দুজনের বাবার নাম পাসপোর্টেই দেখতে পাবেন ওঁরা।

আঃ। ওদের জন্যে তো বলছি না। তুইও আজকাল বড় এঁড়ে-তর্ক করিস।

ভটকাই মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে, আমার হেনস্থাটা পুরোপুরি উপভোগ করল।

কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন খুবই ভাল ব্যবহার করল। ছোট এয়ারপোর্ট। সকলেই যেন পর্যটকদের অভ্যর্থনা করতেই উৎসুক হয়ে আছেন। তা ছাড়া, আমরা এসেছিও তত ট্যুরিস্ট-ভিসা নিয়েই।

লাগেজ এসে গেলে, আইডেন্টিফিকেশন ট্যাগ দেখিয়ে আমরা ট্রলিতে লাগেজ চাপিয়ে এয়ারপোর্টের বাইরে এলাম। গ্রিন-চ্যানেল রেড-চ্যানেল ও সবের বালাই-ই নেই এখানে।

এখানে ট্যাক্সি ও গাড়িগুলো দেখলাম ছোট ছোট। আমি অবাক হয়ে দেখছিলাম। তুতেনীল আকাশ। ঝকঝক করছে রোদ্দুর। সামনেই একটা গাঢ় সবুজ পাহাড়। হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়।

ঋজুদা বলল, প্রথমবার জাপানে গিয়েও আমার এরকমই মনে হয়েছিল। ছোটখাটো মানুষ, সরু-সরু রাস্তা, ছোট-ছোট গাড়ি, পাঁচ কাঠার ধানখেত, সবই কিম্ভুত। কিন্তু অতটুকু দেশের বাঁটকুলে মানুষগুলো সারা পৃথিবীকে প্রায় কবজাই তো করে ফেলেছিল আর একটু হলে। তাই না? দৈর্ঘ্য-প্রস্থ দিয়ে দেশের মাপও যেমন হয় না, মানুষের মাপও হয় না। আমার মতন লম্বা-চওড়া মানুষেরা বোকাই হয় সচরাচর।

একটা ট্যাক্সিকে দাঁড় করিয়ে ঋজুদা সামনে বসল। আর ঋজুদার দুই ন্যালাখ্যাপা ছেলে, পেছনে। মালপত্র পেছনেই রাখা হয়েছিল। তিনজনেরই একটি করে মাঝারিমাপের স্যুটকেস আর একটি করে হ্যান্ডব্যাগ।

অনেকগুলো ছাদহীন ছোট-ছোট নানা-রঙা গাড়ি দেখলাম। শর্টস-পরা, মাথায়–হ্যাট চড়ানো সাহেব ট্যুরিস্টরা চালিয়ে বেড়াচ্ছে। ঋজুদা বলল, দ্যাখ, দ্যাখ, ওই গাড়িগুলোর নাম ‘মিনিমক। ভাড়া পাওয়া যায় এখানে।

দেশটা ছোট হতে পারে, গাড়িটাও ছোট হতে পারে, কিন্তু গন্তব্যও যে এত সামান্য দূরত্বে হতে পারে, তা জানা ছিল না। বলতে গেলে, ট্যাক্সিতে উঠলাম আর সঙ্গে সঙ্গেই নামলাম। ঋজুদা কি রসিকতা করছে না কি আমাদের সঙ্গে? করছে কি না, তা বোঝার আগেই ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে দিল ঋজুদা। আমরা স্যুটকেসগুলো নামিয়ে নিলাম। ট্যাক্সিওয়ালা ক্রেওল ভাষাতে বিড়বিড় করে কী সব গালাগালি দিল আমাদের। তারপর বেশ বিরক্ত হয়ে দড়াম করে প্রায়ই ভটকাই-এর কড়ে-আঙুলটা চাপা দিয়েই দরজাটা বন্ধ করে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক জোরে ট্যাক্সি চালিয়ে ভিক্টোরিয়া শহরের দিকে চলে গেল। ওর দোষ কী? ট্যাক্সি নিয়ে এয়ারপোর্টে তো কোনও ট্যাক্সিওয়ালাই পাঁচশো গজ যাওয়ার জন্যে অপেক্ষা করে না। বেচারি ভেবেছিল দূরে যাব আমরা। বড় হোটেলে উঠব। মোটা ভাড়াও বকশিস পাবে ও।

বকশিস অবশ্য দিল ঋজুদা। তারপর সামনে একটু ঝুঁকে, বাও’ করে বলল, মেরসি।

ড্রাইভার বলল, ইউ আর ওয়েলকাম স্যার।

এমনভাবে বলল যে, শুনে মনে হল বলল, জাহান্নামে যাও।

রাস্তার যেখানে নামলাম, তার সামনেই একটি গেট। একটি একতলা বাংলো বাড়ি। যেন সমুদ্রর মধ্যে থেকেই গেঁথে তোলা হয়েছে। একটা চওড়া প্যাসেজ দিয়ে গিয়ে ঢুকতে হয় সে বাড়িতে। বাড়ির সামনেই একটা চওড়া সমুদ্রমুখী বারান্দা।

ভটকাই বলল, আঃ সারা দিন-রাত সমুদ্র দেখেই দিন কেটে যাবে। কী বল রুদ্র?

তারপর বলল, তাইলে? ‘ইরেই’ কয় ইন্ডিয়ান ওশান?

স্যুটকেসগুলো তুলে নিয়ে গেট খুলে ভিতরে ঢুকতে যাব, এমন সময়ে ভরদুপুরের টুকরো-টাকরা রোদের অগণ্য হলুদ-রঙা প্রজাপতি উড়িয়ে হাওয়াটা বাংলোটার পাশের নারকোল বনের মাথা আঁচড়ে, নানা অদৃশ্য অলিগলি দিয়ে ঝাঁপিয়ে জলে ইলিবিলি কেটে পরক্ষণেই আমাদের চুল এলোমেলো করে দিল।

বাংলোটার ভেতরে কিন্তু আর ঢাকা হল না। ঠিক তখনই এয়ারপোর্টের দিক থেকে একটা কালো কাঁচ-তোলা কালো-রঙা এয়ারকন্ডিশন্ড টোয়োটা গাড়ি জোরে এসে আমাদের সামনে ব্রেক করে থেমে গেল।

তখনই মনে পড়ল মঁসিয়ে পাঁপাদু সেইরকমই বলেছিলেন বটে।

একজন বয়স্ক কিন্তু অত্যন্ত সপ্রতিভ ড্রাইভার গাড়ি থেকে নেমেই স্যুটকেস তিনটে ফটাফট গাড়ির বুটে তুলে নিয়েই আবার স্টিয়ারিং-এ বসল গিয়ে।

ঋজুদার দেখাদেখি ঋজুদার দুই কলকাতার মাখনবাবু ছেলেও সঙ্গে সঙ্গে গাড়িতে উঠে পড়ল।

তারপর গাড়ি চলতে লাগল তো লাগলই।

সতেরো মাইল বাই তিন মাইল ইজ ইকুয়ালটু একান্ন বর্গমাইল দ্বীপ এই মাহে। তার মাঝামাঝি ফুড়লেও হয় পঁচিশ মাইল। কিন্তু বেশ জোরে গাড়ি যাওয়া সত্ত্বেও প্রায় আধঘণ্টা এঁকেবেঁকে একবার সমুদ্রতীরে, একবার পাহাড়ের গা, একবার সমতল হয়ে গাড়িটা চলতেই লাগল। কোনও কোনও জায়গাতে পথ চলে গেছে সমুদ্রের কোনা ঘেঁষে ‘কজওয়ের ওপর দিয়ে। ভারী সুন্দর দেখায়। অন্যদিকে ব্যাকওয়াটারের সৃষ্টি হয়েছে। জোয়ারের সময় সমুদ্রের জল কজওয়ের কংক্রিটের ঢালাইয়ের ইঞ্চি ছয়েক তলা দিয়ে বয়ে যায়। বর্ষা যখন প্রবল হয়, তখন কখনও কখনও পথের ওপর দিয়েই নিশ্চয়ই বয়ে যায় সমুদ্র। নইলে আর CAUSEWAY বানানো কেন?

গাড়ি চলছে তো চলেইছে। বেশ জোরেই চলছে। আরও মিনিট দশেক কেটে গেল, এমন সময়ে ড্রাইভার গাড়ির রিয়ার-ভিউ-মিররে তাকিয়ে ইংরেজিতে স্বগতোক্তি করল, এতক্ষণে পোকাটাকে ঝেড়ে ফেলা গেল। আর ও ফলো করতে পারবে না আমাদের।

পোকা? পোকা কীরে?

ভটকাই বলল।

আমি বললাম, ‘পুকা। মানে টিকটিকি। বোঝলা কিছু?

হ৷ হ।

বলল, ভটকাই। বুঝছি। বুঝছি! পিছু নিয়েছিল।

তখনও গন্তব্যেই পৌঁছনো গেল না। খিদে অবশ্য ছিল না। কারণ, এয়ার ইন্ডিয়ার প্লেনে চমৎকার লাঞ্চ দিয়েছিল। কিন্তু প্রবাসে এসে যেখানে থাকব সেখানে একটু গুছিয়ে বসতে না পারলে কি ভাল লাগে। নামতে না নামতেই এ কী পোকার উপদ্রব!

ড্রাইভারের নাম কার্লোস। সে মুহূর্তের মধ্যে গাড়িটা ব্যাক করে নিয়ে যে পথে আমরা প্রথমেই এগিয়েছিলাম সে পথেই মিনিট পনেরো গিয়ে একটি ছোট পাহাড়ের প্রায় মাথাতে ঘুরে ঘুরে উঠে ছোট্ট কিন্তু ছবির মতন একটি সাদা রং করা ভিলার গেটের সামনে পৌঁছে, গাড়ি দাঁড় করাল। ভিলাটার প্রবেশ পথের এক পাশের পিলারের ওপর কালো পাথরের ওপরে সাদাতে লেখা আছে: ‘দি ঈগলস রুস্ট। আমি বললাম, ঈগলের বাসা!

বাড়ির নাম? অসাধারণ নাম।

ঋজুদা বলল।

তারপরে কার্লোস নিজেই পকেট থেকে চাবি বের করে গেট খুলে প্রধান প্রবেশদ্বারে গাড়ি দাঁড় না-করিয়ে নানারকম গাছের সারির মধ্যে ড্রাইভ দিয়ে চালিয়ে গিয়ে পেছনের প্রবেশদ্বারের সামনে এনে গাড়ি দাঁড় করাল। শুধুই সমুদ্র ভিলাটার পেছন দিকে। ভারত মহাসাগর। সুনীল। আদিগন্ত। কোনও দ্বীপও চোখে পড়ে না এখান থেকে। সম্ভবত এদিকে কোনও দ্বীপ নেইও।

আমরা মালপত্র নামিয়ে নিলে, ঋজুদাকে একগোছা চাবি দিয়ে ঋজুদার সঙ্গে এবারে ফরাসিতে কী সব কথা বলে স্যালুট করে চলে গেল কার্লোস। মাঝেমাঝেই কার্লোস বলছে, পাঁর্দো মঁসিয়ে, পাঁর্দো মঁসিয়ে।

ফরাসিতে পাঁর্দো, ইংরেজিতে পাৰ্ডন। ওইটুকু ফরাসি জানতাম।

এরা সব অতীব ভদ্রলোকের জাত তো। কারও কথা না বুঝতে পারলে, ধমকে কখনওই বলে না, কী বললেন, বোঝা গেল না। ওরা বলে, ক্ষমা করবেন। পার্ডন। পাঁর্দো। আরও একটা কারণ আমার মনে এল। ঋজুদার ফরাসিটা অনভ্যাসের ফোঁটার মতন চড়চড় করছিল বলেই ঋজুদার সব কথা হয়তো কার্লোস বুঝতে পারছিল না। তাই কার্লোস-এর অত পাঁর্দোর তুবড়ি।

এখানে এই বিজাতীয়দের দেশে পৌঁছে দুর্বোধ্য ভাষাভাষী মানুষজনের মধ্যে পড়ে তিতিরের অনুপস্থিতি খুবই অনুভব করছিলাম। ও মেয়ে তো নয়, সাক্ষাৎ দুর্গা, রূপে গুণে। দশপ্রহরণধারিণী।

ভটকাই গলা নামিয়ে আমাকে বলল, আরে ও রোদদুরবাবু! বেয়ারা-বাবুর্চিরা সব গেল কোথায়? একটা ডাবল-ডিমের ওমলেট, মধ্যে একটু চিজ আর চিকেন দিয়ে করে দিলে, সঙ্গে এক গ্লাস ড্রিংকিং-চকোলেট, ইক্কেরে জমে যেত।

বলেই বলল, কী ব্যাপার ঋজুদা? তোমার কি কোনও ইজ্জত নেই? তোমার ছেলে দুটোর এমন হেনস্থা। ন্যালাখ্যাপা বলে কি তারা মানুষ নয়? নো খাতির! অথচ জান-লড়াতে এলাম।

ঋজুদা বলল, এখানে বেয়ারাও নেই, বাবুর্চিও নেই। ঝাড়ুদারও নেই, এমনকী জমাদারও নেই। আজ রাতের রান্না তুমিই করবে ভটকাই। ফ্রিজ খুলে দেখ, মঁসিয়ে পঁপাদুর লোকজন দয়া করে কিছু রেখে গেছে কিনা, হ্যাম, সসেজ, ডিম, মাছ, দুধ ইত্যাদি কিছু নিশ্চয়ই থাকবে।

ভটকাই বিরাট ফ্রিজটা খুলেই চেঁচিয়ে বলল, ফক্কা! এ কী! খাবারদাবার নট কিচ্ছু। গোটা ত্রিশেক ইলেকট্রিক বালব আছে শুধু।

বলিস কীরে! ফ্রিজের মধ্যে ইলেকট্রিক বালব।

ভটকাই বলল, হাঃ। জোক অফ দ্য ইয়ার।

অবাক হলাম আমি। ভটকাইটাও পুরোপুরি সাহেব হয়ে উঠেছে। কোথায় বলবে ‘হায় কপাল’! তা না, বলছে ‘জোক অফ দ্য ইয়ার।

ঋজুদা স্বগতোক্তির মতন বলল, এই ভিলাতে রাতে কোনও আলো জ্বললে তা সমুদ্র থেকে তো বটেই, ভিক্টোরিয়া শহরের অনেক জায়গা থেকেই দেখা যাবে। সে জন্যেই বালবগুলো খুলে রেখেছে। তবে এখন শুক্লপক্ষ। খুব একটা অসুবিধা হবে না। ঘরের মধ্যে ছোট আলো জ্বালিয়ে পরদা ভাল করে টেনে ভেতরে থাকতে হবে।

গরমে সেদ্ধ হয়ে যাব যে! জানালা বন্ধ করে, পরদাও বন্ধ করে?

ভটকাই বলল।

ইডিয়ট। ভিলাটা সেন্ট্রালি-এয়ারকন্ডিশনড। এতক্ষণেও বুঝলি না?

আমি বললাম।

তাই? আরে তাই তো দেখি! বিজবিজ করে ঠাণ্ডা বেরুচ্ছে। বলিস কী রে। এটা কার ভিলা?

ঋজুদা এতক্ষণে পাইপের পোড়া-ছাই খুঁচিয়ে বের করে অ্যাশট্রেতে ফেলে বলল, ভিলাটা আমার বেয়াই-এর।

মানে? বেয়াই কাকে বলে?

মেয়ের শ্বশুরকে।

ভটকাই বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে হেসে বলল খালি ঠাট্টা। এখন পর্যন্ত কেসটা কী তাই জানালে না। তোমার ন্যালাক্ষ্যাপা ছেলে দুটোকে কি আজীবন এমনি হাবাগোবাই করে রাখবে?

না। এবারে সব বলব। শনৈঃ শনৈঃ বৎস। চলো। এবারে বসবার ঘরে গিয়ে স্থির হয়ে বোসো।

তারপরেই আমার দিকে ফিরে পকেট থেকে একটা চাবি বের করে বলল, এই চাবিটা নিয়ে গিয়ে বাইরের গেটে তালা মেরে দিয়ে আয় রুদ্র। ভেতর দিয়ে মারবি না কিন্তু। বাইরের দিকে লাগাতে হবে, যাতে বাইরে থেকে মনে হয় যে, ভিলার মালিক থাকেন না এখানে। অথবা এখন নেই। মানে, ভিলাটা আন-অকুপায়েড।

ওক্কে। কিন্তু বাইরে বাইরে দিয়ে তালা লাগিয়ে যদি ভেতরে ঢুকতে না পারি?

হাত বাড়িয়ে থেকেই যদি বাইরে তালা না লাগাতে পারিস, তা হলে বাইরে বেরিয়েই লাগাতে হবে। তারপর সে-গেট ডিঙিয়ে অথবা অন্য যেভাবেই হোক, ভেতরে ঢুকতেও হবে। রুআহা’, ‘গুগুনগুম্বারের দেশে’, ‘অ্যালবিনো’, ‘নিনিকুমারীর বাঘ’, ‘কাঙ্গপোকপি’র-পার্টনার যদি এইটুকুও করতে না পারে, তবে তোকে আমি ত্যাজ্যপুত্ত্বর করব। ভটকাইকেই রাজসিংহাসনে বসাব।

ভটকাই আমাকে কিছু না বলে একবার অপাঙ্গে আমার দিকে তাকাল শুধু।

আর কথা না বাড়িয়ে চাবিটা নিয়ে বেরিয়ে গেলাম পেছনের দরজা দিয়ে।

.

বাইরে থেকে গেট-এ তালা দিয়ে গেট টপকে পেছন দিয়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকে দেখি ঋজুদা সেন্টার টেবিলের ওপরে একটি ম্যাপ ছড়িয়ে বসেছে। আর মিস্টার ভটকাই, বড় জাহাজের বুড়ো ক্যাপ্টেনরা যেমন হাফ-আই রিডিং গ্লাস চোখে লাগিয়ে সরু সরু লাল-নীল শিরা-উপশিরায় ভরা শীর্ণ অগণ্য হাতের মতন দেখতে ন্যাভিগেশন ম্যাপের ওপরে হুমড়ি খেয়ে পড়েন, তেমন ভাবেই হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। তার মুখের ভাব দেখে মনে হচ্ছে, যেন শত্রুপক্ষের ডুবোজাহাজ টর্পেডো ছুঁড়ে এখনই তার নিজের জাহাজের পেট-ফাঁসাবার কু-মতলবে আছে।

ঋজুদা ম্যাপ থেকে মুখ তুলে বলল, এবারে তোদের ব্রিফ করে দেওয়া দরকার। এতক্ষণ তো অনেক ইয়ার্কি-ফাজলামি হল। ভটকাই, এবারে আজেবাজে ইয়ার্কি করলে ভাল হবে না। মঁসিয়ে পঁপাদু আমাদের এত খরচপত্র করে এত দূরে ইয়ার্কি মারার জন্যে নিয়ে আসেননি।

সে তো জানা কথাই। তা আমরাও তো জানতেই চাচ্ছি। তুমিই তো বলছ না।

ভটকাই ঋজুদার কথা কেটে বলল।

আমাদের কাজটা খুবই বিপজ্জনক। তার ওপরে বিদেশ-বিভুই জায়গা। ইয়ার্কি মারাটা একেবারে বন্ধ কর। আরও একটা কথা, তোরা যখনই বাইরে বেরুবি, সঙ্গে নিজের নিজের পাসপোর্টটা নিয়ে বেরুবি।

কেন?

আমি প্রশ্ন করলাম।

যদি খুন হয়ে যাস, তা হলে স্যেশেলস-এর কর্তৃপক্ষের পক্ষে বডি আইডেন্টিফিকেশনে সুবিধা হবে। কারণ আমাদের মধ্যে কেউ খুন হয়ে গেলে অন্য দুজনের কেউই কারও বডি আইডেন্টিফাই করতে যাব না।

মরলেই বে-ওয়ারিশ হয়ে যাব? এ আবার কেমন ব্যাপার?

হ্যাঁ। কারণ, কেউ যদি খুনই হই তো অন্যে, যে, সেই লাশ আইডেন্টিফাই করবে সেও পরে অবশ্যই খুন হয়ে যাবে। লাশ আইডেন্টিফাই করতে এসে নিজেই আইডেন্টিফায়েড হয়ে যাবে।

কেন?

ভটকাই জিজ্ঞেস করল।

কমোন সেন্স। সব গাধার সব ‘কেন’র উত্তর দেওয়ার সময় বা ইচ্ছা আমার নেই।

এবারে বলো ঋজুদা খোলসা করে, কেন আমরা এখানে এসেছি। আমাদের কী করতে হবে।

আমি ভটকাইয়ের ওপরে ভীষণ বিরক্ত হয়ে বললাম।

কাজটা অতি সোজা, আবার অতি কঠিনও। হাসিল করতে পারলে তিনদিনেই হয়ে যাবে। না হলে, তিন বছরেও হবে না। এই দ্যাখ ম্যাপটা। ভাল করে দ্যাখ। যাকে আমাদের খুঁজে বের করতে হবে সে যে মাহেতেই আছে এই মুহূর্তে, তার কোনওই মানে নেই। তার সম্বন্ধে পরে বলছি। আগে জায়গাটা সম্বন্ধে ভাল করে জেনে নে। তোরা দেখি আমেরিকান ট্যুরিস্টদের মতো অধৈর্য হয়ে গেলি।

ঠিক আছে, বলো। আমি বললাম।

ম্যাপটা দ্যাখ, দেশটার ইতিহাস সম্বন্ধে আরও একটু জেনেনে। সুবিধে হবে তোদেরই।

তুমি যে ইতিহাস পড়াবার জন্যে এতো খরচাপাতি করে আমাদের এতদূরে নিয়ে আসবে কে ভেবেছিল? নিজেদের আসল বাবারাও হয়তো করতেন না।

চুপ করবি তুই ভটকাই!

আমি ধমকে বললাম।

সবচেয়ে আগে কিন্তু আরব, ইন্দোনেশিয়া এ সব দেশের নাবিকেরাই জল, খাবারদাবারের খোঁজে স্যেশেলস-এর দু-একটা দ্বীপে নেমেছিল। তার অনেক পরে অন্যরা আসে। এর প্রমাণস্বরূপ শিট দ্বীপে আরব নাবিকদের কবর পাওয়া গেছে। ফরাসিরা এই দ্বীপপুঞ্জের দখল নেওয়ার পরেই মরিশাস আর পুব এবং মধ্য আফ্রিকা থেকে ওরা ক্রীতদাসদের নিয়ে আসে নানারকম চাষবাস করার জন্যে।

কীসের চাষ?

যা কিছুরই চাষ এখানে হতে পারত। তুলো, তামাক, নারকেল, দারচিনি এবং আরও অনেক কিছু।

কতগুলো দ্বীপ আছে এই দ্বীপপুঞ্জে ঋজুদা?

আমি শুধোলাম।

ম্যাপে হয়তো অল্পকটা অস্পষ্ট বিন্দু দেখতে পাবি, কিন্তু দ্বীপ আছে অনেকগুলোই। শুনেছি, এই দ্বীপপুঞ্জের ভূভাগের পরিমাণ চারশো বর্গ মাইল মতন হলেও দ্বীপ আছে নাকি প্রায় শ’খানেক। তার মধ্যে গোটা চল্লিশেক প্রবাল দ্বীপ আর গোটা ষাটেক গ্রানাইট পাথরের।

এখন বলো, আমাদের এখানে কী করতে হবে। আর ধৈর্য ধরা তো সম্ভব হচ্ছে না।

ভটকাই বলল।

কেন? অত অধৈর্য কেন? মনে কর, বেড়ানোর জন্যেই এসেছিস। খারাপ লাগছে কি? কলকাতার ক’জন মানুষ স্যেশেলসে সশরীরে এসেছেন তা হাতে গুনে বলা যায়। ইংল্যান্ড, আমেরিকা, কানাডা, ইউরোপ, সিঙ্গাপুর, ব্যাঙ্কক, হংকং ঘোরা লক্ষ লক্ষ মানুষ পাবি, কিন্তু স্যেশেলস বা সেরেঙ্গেটি বা রুআহা দেখছেন এমন মানুষ ডান হাতের কর গুনেই হয়তো শেষ করতে পারবি।

সেটা ঠিক। কিন্তু মঁসিয়ে পঁপাদুর জন্যেও তো আমাদের কিছু করা দরকার।

নিশ্চয়ই। করব বলেই তো আসা। এখন যা বলি, তা মনোযোগ দিয়ে শোন।

কত শত কোটি টাকার লুণ্ঠিত হিরে জহরত সোনাদানা যে এই সব দ্বীপে লুকোনো আছে, তা সমুদ্রের হাওয়া আর এই গাছেরাই জানে। যা লুকোনো হয়েছিল, তার খুব সামান্য অংশই জলদস্যুরা পরে ফিরে এসে নিয়ে গেছে। কত জলদস্যু আর এদিকে আসতেই পারেনি। কেউ মরে গেছে তিনশো বছর আগে, কারও জাহাজডুবি হয়েছে দুশো বছর আগে, কেউ বা মারা গেছে লুটপাট করার সময়ে বা অন্য জলদস্যুদের সঙ্গে লড়াইয়ে, দেশে ফেরার পথে। তাদের মধ্যে যাঁরা বেঁচেছিল, তাদেরও অনেকেই গুপ্তধনের কথা অন্য কাউকে বলে যেতে পারেনি, পাছে দলের কেউ তা জেনে ফেলে। যারা দলবদ্ধভাবে লুণ্ঠিত জিনিস লুকিয়ে রেখেছিল, তাদের তো উপায়ই ছিল না দলের বাইরের কাউকেই বলার।

ঋজুদা একটু থেমে পাইপটা ধরাতেই ভটকাই বলল, বলো, থামলে কেন?

বলছি।

তারপরই সেন্টার টেবলের ওপরে ছড়ানো ম্যাপটার দিকে তাকিয়ে, পাইপের স্টেমটা দিয়ে একটি ছোট বিন্দু দেখিয়ে ঋজুদা বলল, দ্যাখ। এই দ্বীপটার নাম হচ্ছে শ্যিলুট। মাহে থেকে মাইল তিরিশ দূরে। এখন এখানের বাসিন্দার সংখ্যা হবে শ’আড়াই৷ হোটেল আছে। তবে মাত্র একটি। এই দ্বীপেই পৃথিবীময় কুখ্যাত জলদস্যু ইদুল মারা যায় আজ থেকে কয়েকশো বছর আগে। খুব ঘটা করে তার অন্ত্যেষ্টি হয়েছিল এখানে। এখনও স্থানীয় মানুষদের মুখে সেই বেরিয়াল-এর গল্প শোনা যায়। অবশ্য তারাও শুনেছে তাদের পূর্বপুরুষদের মুখ থেকেই।

জলদস্যুর আবার অন্ত্যেষ্টি! তাও ঘটা করে। শুনেছি তো সলিল সমাধি হয় তাদের।

আমি বললাম।

কেন হবে না? সবাই কি আর সমুদ্রের ওপরে চলন্ত জাহাজে মারা যায়? আর যাই হোক, মানুষগুলো তো সাহসী ছিল। ঘুষঘাষ খেত না, ফিসফাস করে। দেশের হয়ে বিদেশ থেকে জিনিস কেনার সময়ে কিক-ব্যাক বা কাট-মানিও নিত না।

তখন দস্যুতা একটি খোলাখুলি জীবিকা ছিল। অপরাধী অবশ্যই ছিল তারা। কিন্তু দেশদ্রোহী ছিল না। দস্যুবৃত্তি ত্যাগ করে অনেকেই তাই ফিরে যেতে পেরেছিল নিজের নিজের দেশে। কেউ কেউ আবার নতুন জীবনের আশায় নোঙর ফেলে থেকেও গেছে নতুন নতুন দেশে।

নামটা কী বললে ঋজুদা? ইঁদুর?

ভটকাই জিজ্ঞেস করল।

ঋজুদা হেসে বলল, না রে। ইঁদুল।

কোন দেশি?

জানি না, সম্ভবত ফরাসি, কারণ আমাদের মঁসিয়ে পঁপাদু তো তাঁরই নাতির পুতি। তবে ফরাসি না হয়েও পাঁচ পুরুষ ফরাসি দেশে বাস করলে তো আচারে-আচরণে, ভাষাতে ফরাসিই হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক।

তা ঠিক। কিন্তু পুতি মানে? আমি আর ভটকাই একই সঙ্গে জিজ্ঞেস করলাম।

পুতি মানে জানিস না? আরে নাতির ছেলেকে বলে পুতি। তোদের মতো সাহেবদের জন্যেই দেশটা গোল্লায় গেল। নাতি-পুতি’ কথাটাও শুনিসনি?

ভটকাই ও প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়ে বলল, বাঃ। মঁসিয়ে পঁপাদু তো নিজেই প্রায় ঘাটের মড়া। তিনি আবার কার পুতি?

হাসিরই কথা। হাঁ। তবে পরে হেসো। এখন যা বলছি, তা শোনো।

বলো।

মঁসিয়ে পঁপাদুর পূর্বপুরুষেরা এমনিতেই যথেষ্ট বড়লোক ছিলেন। বুঝতেই পারছিস মঁসিয়ে ইদুল না হয় কিছু গুপ্তধন স্যেশেলসেই পুঁতে রেখে গেছিলেন, কিন্তু সারা জীবন যা লুটপাট করেছিলেন, তার অধিকাংশই তো ফ্রান্সেই নিয়ে গেছিলেন। তা দিয়েই চার-পুরুষের হেসেখেলে ফুটানি করে দিব্যি কেটে যাচ্ছিল। মঁসিয়ে পঁপাদুর ছেলেবেলাও ভালই কেটেছিল। কিন্তু জালার জল, সে জালা যত বড়ই হোক না কেন, গড়িয়ে খেলে আর কতদিন চলে! মধ্য-যৌবন থেকেই অবস্থা একটু খারাপ তাঁর। তবে এখনও বহু মিলিয়নেয়রকেই চাকর রাখতে পারেন। কিন্তু কষ্ট ব্যাপারটাতো তো আপেক্ষিক ব্যাপার। আমার তোর পক্ষে যে আর্থিক অবস্থা পরম আরামের, তাই অন্যের পক্ষে কষ্টকর বলে গণ্য হতে পারে। পারে না কি?

তা পারে।

আমি বললাম।

মঁসিয়ে পঁপাদু অর্থকষ্টে পড়েন। কিন্তু সেই অর্থকষ্ট মানে ভাবিস না যে আমার মতো মানুষের অর্থকষ্ট। তারপরে শোন! অর্থকষ্টে পড়ার পরে প্যারিসের বি. এন. পি-র একটি শাখার লকারে যে তাঁর দাদু পূর্বপুরুষের কিছু পারিবারিক সম্পত্তি রেখে গেছিলেন, সে কথা হঠাৎই মনে পড়ে যায় মঁসিয়ে পঁপাদুর।

বি. এন. পি-টা কী জিনিস?

আমি বললাম।

নাঃ। তোদের জ্ঞানগম্যি বড় কম। বি.এন. পি-রও নাম শুনিসনি?

ব্যাঙ্কোয়া নাশিওনাল দ্য পারি’র সংক্ষিপ্ত নাম বি.এন. পি। ফ্রান্সের জাতীয় ব্যাঙ্ক। ফ্রেঞ্চ ওপেন টেনিস টুর্নামেন্টের প্রধান স্পনসর। সুইজারল্যান্ডেও প্রায় একচেটিয়া ব্যবসা।

তাই? জানতাম না তো। আমরা দুজনেই অবাক হয়ে বললাম। আমরা অবশ্য কতটুকুই বা জানি!

তা, সেই বি.এন.পি-এর লকার থেকে একটা ম্যাপ বেরোল স্যেশেলস-এর তিনটি দ্বীপের। মানে, কোন কোন দ্বীপে যে গুপ্তধন পোঁতা ছিল তার মোট হদিস দেওয়া ছিল তাতে। কিন্তু ঠিক কোথায় কোথায় যে গুপ্তধন পোঁতা ছিল, তা তাতে দেখানো ছিল না। সেই তথ্য ছিল অন্য একটি ম্যাপে এবং সেই ম্যাপটি তিনটুকরো করে ইদুল এবং তার দুই সহ-জলদস্যু, ফ্রেদরিক এবং দেনির ব্যাঙ্কের আলাদা আলাদা লকারে রাখা ছিল। এই ম্যাপটির কথা উঁদুল তার বংশধরদের বলে যেতে পেরেছিল। কিন্তু দেনি আর ফ্রেদরিক তা পারেনি। ফ্রেদরিক হঠাৎই মারা গেছিল একদিনের জ্বরে বেহুশ হয়ে। আর দেনি মারা গেছিল জাহাজডুবি হয়ে ম্যাডাগাস্কারের কাছে, খুবই অল্প বয়সে। তার একমাত্র ছেলের বয়স তখন সাত।

তারপর?

বলো বলো, এতক্ষণে রহস্যের গন্ধ একটু একটু পেতে আরম্ভ করলাম।

এতক্ষণ যে কী ভূগোল আর ইতিহাস নিয়ে পড়েছিলে ঋজুদা।

ভটকাই বলল।

যে মঁসিয়ে পঁপাদুকে তোরা দেখলি কলকাতাতে, সে হচ্ছে ইঁদুলের পুতি। দেনির পুতির নাম হচ্ছে মঁসিয়ে ব্লঁদা। আর ফ্রেদরিকের বংশধর একটি মেয়ে। তার নাম জাকলিন পুজে। মাদমোয়াজেল পুজে অত্যন্ত বুদ্ধিমতী। তাঁর

প্রপিতামহর বিশাল সম্পত্তি নিয়ে তাঁর পিতামহ ও পিতা পৃথিবীব্যাপী ব্যবসা/ ফেঁদেছিল। ওদের পারিবারিক গ্রুপের নাম এখন এফ. জি. এফ. এস. এ। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি। ওরা করে না এমন ব্যবসা নেই। কয়েক লক্ষ কোটি ডলারের মালিক এখন প্লুজেঁ। বিয়ে করেনি এখনও। পঁয়ত্রিশ বছর বয়স। অপরূপ সুন্দরী। ওরই লোক হচ্ছে পিয়ের।

বাবাঃ অতবড় নাম? এফ. জি. এফ. এস. এ।

না, নামটা এফ. জি. এফ। আর এস. এ.’ হচ্ছে সুইস লিমিটেড কোম্পানি। আমাদের যেমন লিমিটেড বা LTD। তারপর একটু থেমে বলল, পাদুর মতো প্লুজেঁও ফ্রেদরিকের লকার থেকে ছেঁড়া ম্যাপের টুকরো পেয়েছে। ম্যাপের টুকরো পেয়েছে মঁসিয়ে ব্লঁদাও। ব্লঁদা আর পাদু মাদমোয়াজেল প্লুজেঁর সঙ্গে যোগাযোগ করার পরে প্লুজেঁ বলেছে, আমার টুকরো আমি দেব না। তোমরা নিজেরা তো আর অত পয়সা খরচ করে এই বিরাট ঝুঁকি এবং ঝামেলার কাজ সামলে উঠতে পারবে না, তাই তোমরা বরং তোমাদের ম্যাপের টুকরো দুটি আমাকে বিক্রি করে দাও। খুব ভাল দাম দিচ্ছি আমি যাতে তোমাদের লাভ হবে অনেক এবং তা হবে কোনওরকম ঝক্কি-ঝামেলা ছাড়াই।

এ কথা প্লুজেঁ যে বলেছে তা তুমি জানলে কী করে? আমি বললাম।

আমাকে বলেছে, মঁসিয়ে পঁপাদু। তবে এ কথার সত্য সম্বন্ধে আমরা অন্ধ বিশ্বাস নাও রাখতে পারি।

আমি বললাম।

ভটকাই বলল, বিশ্বাসে মেলায় বস্তু তর্কে বহুদূর।

ঋজদা বলল, তারপরে শোন।

এতেই মঁসিয়ে পঁপাদু এবং ব্লঁদার সন্দেহ গম্ভীর হয়েছে যে, ফ্রেদরিকের কাছে যে ম্যাপের টুকরোটি ছিল তাতে গুপ্তধনের পুরো হদিসই প্রায় রয়েছে এবং ইদুল এবং দেনির কাছে যে টুকরো ছিল, সে দুটি অসম্পূর্ণ। ওদের দুজনের ভাগ বিপুল অর্থ দিয়ে কিনতে চাইছে প্লুজেঁ ওদের দুজনকে বুঝিয়েছে যে, যাই পাওয়া যাক না কেন, স্যেশেলস সরকারের ন্যায্য পাওনা ট্যাক্সও তো তাদের দিতে হবে। তা ছাড়া, কী পাওয়া যাবে, তাও তো অনিশ্চিত। ওরা গুপ্তধন সন্ধানের কোটি কোটি ডলার খরচ অনির্দিষ্টকাল ধরে দিতে কি রাজি আছে?

তারপরে?

ভটকাই বলল।

প্লুজেঁর সব শর্ত ব্লঁদা আর মঁসিয়ে পঁপাদু মেনে নেওয়ার পরও প্লুজেঁ বেঁকে বসেছে। বলেছে, ওর অন্যান্য ব্যবসা নিয়ে ও খুবই ব্যস্ত, তাই এখনই ওর পক্ষে ওই ‘ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো, বা ‘ওয়াইল্ড-গুজ চেজ’ সম্ভব নয়।

তাতে মঁসিয়ে পঁপাদু এবং ব্লঁদা না-দমে নিজেদের সামর্থ্য একসঙ্গে করে খুঁজেকে না জানিয়ে নিজেরাই এসে এখানে খোঁজাখুঁজি শুরু করেছে। দ্বীপগুলির হদিস তো ছিলই, কিন্তু কোন দ্বীপের ঠিক কোন জায়গাতে যে গুপ্তধন পোঁতা আছে, তার হদিস ছিল না।

ওরা কি খোঁড়াখুঁড়িও শুরু করে দিয়েছে?

খোঁড়াখুঁড়ি ওরা শুরু করতে পারেনি, কারণ ওদের ধারণা, বিরাট ধনী প্লুজেঁ তা হলে সঙ্গে সঙ্গে খবর পেয়ে যাবে। কিন্তু খোঁড়াখুঁড়ি না হলেও খোঁজাখুঁজি যে শুরু হয়েছে সে খবরও নাকি ইতিমধ্যেই পৌঁছে গেছে প্লুজেঁর কাছে এবং তার ফলে যা ঘটার কথা, তাই ঘটেছে।

কী।

আমরা সমস্বরে বলে উঠলাম।

প্লুজেঁ মঁসিয়ে ব্লঁদা এবং মঁসিয়ে পঁপাদুকে খতম করার জন্যে স্যেশেলস-এ তার চর পাঠিয়েছে।

তারপর ঋজুদা বলল, যা বললাম এ পর্যন্ত, তাই হল মঁসিয়ে পঁপাদুর ব্রিফ।

ওরা তো ব্ল্যাক-ক্যাটের মতন নিজেদের জন্যে বডিগার্ডের বন্দোবস্তই করতে পারে। ব্ল্যাক ক্যাটের মতো পেশাদারেরা যা পারবে, আমরা কি তা পারব?

আমি আর ভটকাই প্রায় একই সঙ্গে বললাম।

সব পেশারই একই দোষ। পেশার সীমিত ক্ষেত্রের বাইরে তাদের চোখ বা মগজ চলতেই চায় না। স্যেশেলস-এর মতো আন্তর্জাতিক কিন্তু ছোট্ট ট্যুরিস্ট স্পটে গুলি করে কেউ কাউকে মারবার মতন মূর্খ নয়। মারতে চাইলে, একজনকে এখানে কতভাবে মারা যেতে পারে। হোটেলের পাশের ঘরে টুরিস্ট সেজে এসে সমুদ্রে স্নান করতে, বা স্কুবা ডাইভিং বা স্নারকেলিং করতে করতে জলের তলায় লোকের চোখের আড়ালে একজনকে মেরে দেওয়া খুবই সোজা। খাদ্য বা পানীয়র সঙ্গে বিষ মিশিয়ে দিয়ে মারাও সোজা। ধর, যে গাড়ি একজন ব্যবহার করছে এই পাহাড় আর সমুদ্র-ঘেরা দ্বীপগুলিতে, সেই গাড়ির ব্রেক-শ্য জ্যাম করে দিয়ে, টাইরড-এর অবস্থা এমনই করে দিয়ে, যাতে পাহাড়ের মাথায় চড়ার পর টাইরড কেটে বা খুলে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়ি সমুদ্রে পড়ে। আরও কতরকম করে মারা যায়। আজকাল তো কারোকে বাঁচানোর চেয়ে মারাটা অনেকই সোজা। গাড়িতে, রেস্তোঁরার খাবার টেবিলের নীচে, টাইমবম্ব রেখে দিয়ে, বহু দূরে বসে ইলেকট্রনিকালি বোমা ফাটিয়েও মানুষকে মারা যায়।

ভটকাই শুনতে শুনতে গম্ভীর হয়ে গেল। বলল, কী দরকার ছিল এই ঝামেলাতে ফাঁসবার? তার চেয়ে কায়দা করে ওই ঘেঁড়া ম্যাপের তিনটি খণ্ডই কোনওরকমে হাতিয়ে নিয়ে চলো ঋজুদা, আমরা কলকাতাতে ভাগলবা হই। আমাদের নাতিরা এসে পরে কোটিপতি হবে।

তারপরে একটু চুপ করে থেকে বলল, আরও একটা পথ আছে।

কী?

আমি আর ঋজুদা সমস্বরে জিজ্ঞেস করলাম।

তুমি প্লুজেঁকে বিয়ে করে নাও।

ওর কথাতে আমি আর ঋজুদা খুব জোরে হেসে উঠলাম।

হাসির কী আছে? তোমার মতো বর সে কোথায় পাবে? যত বড় রাজকন্যাই সে হোক না কেন!

ঋজুদা বলল, অনেক ভাঁড়ামো করেছিস। সিরিয়াস হ। কারণ, মঁসিয়ে পঁপাদু কলকাতাতে আমাকে এই খবরটাই দিতে এসেছিলেন যে, প্লুজেঁ পরশুদিন জিনিভা থেকে মাহেতে এসে পৌঁছচ্ছে। লোকে জানছে ছুটি কাটাতেই আসছে। আসলে নাকি আসছে সরেজমিনে তদন্ত করতে।

ভটকাই বলল, বড্ড তেষ্টা পেয়েছে ঋজুদা। গলা শুকিয়ে কাঠ। এ কোথায় আনলে। চারদিকে হাজার হাজার মাইল সমুদ্র আর এক ফোঁটা খাবার জলও নেই। শেষে কি ইলেকট্রিক বালব খেয়ে তৃষ্ণা নিবারণ করতে হবে?

ঋজুদা বলল, ভয়ে?

মানে?

গলা শুকিয়ে কাঠ কি তেষ্টাতে হয়েছে? না ভয়ে? আমি বললাম।

তোকে ওই জন্যেই নিয়ে আসতে চাইনি। বিপজ্জনক কাজ তো বটেই। জেনেশুনেই তো এসেছি আমরা।

ঋজুদা বলল।

বিপজ্জনক কি না জানি না, তবে কাজটা যত না রহস্যের, তোমার কাজের ফিরিস্তি আরও বেশি রহস্যের। মোদ্দা কথায় আমাদের যে কী করণীয়, তাই তো এখনও বুঝতে পারলাম না।

ভটকাই বলল।

ঋজুদা হেসে ফেলল। বলল, সেটা ঠিক। কারণ আমি নিজেই এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি, তা তোদের বোঝাব কী করে! চল পেছনের বারান্দাতে গিয়ে বসি। সূর্য ডুববে একটু পরে। পুরীতে, দীঘাতে, গোপালপুরে বা কোভালমে বা গোয়র সূর্যাস্ত দেখা এক আর এখানে আর এক। তবে আন্দামান বা লাক্ষাদ্বীপও কম সুন্দর নয়। আসলে আমাদের দেশের মতো সুন্দর দেশ পৃথিবীতে নেই। যদি আমরা মানুষের মতো মানুষ হতাম তবে এই দেশ নিয়ে কী যে আমরা করতে পারতাম তা ভাবলেও রোমাঞ্চ হয়। কাজ না করলে, সৎ না হলে, জেদ না থাকলে কোনও দেশই কি বড় হতে পারে রে! চালাকির দ্বারা কোনও বড় কাজই হয় না।

এমন সময়ে ফোনটা বাজল।

ভটকাই রিসিভারটা তুলেই ঋজুদাকে দিয়ে বলল, কে রে বাবা! বলছে, সিয়ে বোঁস?

রিসিভারটা ভটকাই-এর হাত থেকে নিয়ে ঋজুদা বলল।

আই অ্যাম কার্লোস সিয়ে। আই অ্যাম কামিং আপ উইথ আ লেডি।

হু ইজ শি?

মাদমোয়াজেল ভৈঁয়সা।

মাদমোয়াজেল ভৈঁয়সা?

ইয়া। শি উইল টেক উ্য ডাউন টু হার হোটেল অ্যাট বো ভাঁলো।

হোয়াই?

পিয়ের হ্যাজ অলরেডি স্পটেড উ্য অল। ইট উডনট বি সেফ ফর উ্য অল টু স্পেন্ড দ্য নাইট অ্যাট দ্য ভিলা।

ওকে। প্লিজ কাম আপ। উই আর থারস্টি।

কার্লোস বলল, আই নো। আই উইল টেক কেয়ার। বলেই, ফোনটা ছেড়ে দিল।

ভঁইষাটা কী ব্যাপার ঋজুদা? এখানে মোষ আছে না কি? মানে, আমাদের হিন্দুস্থানি ভঁইষা?

সদা-ইনকুইজিটিভ ভটকাই বলল।

ঋজুদা খুব জোরে হেসে উঠল ভটকাইয়ের কথাতে।

বলল, উঁইষা না রে। মাদমোয়াজেল ভৈঁয়সা। ভৈঁয়সাটা পদবি। নাম মারিয়েল। Marielle আর ভৈঁয়সা বানান হচ্ছে Vincent।

ভাল জায়গাতেই নিয়ে এলে। পদে পদে নামে-পদবিতে হোঁচট খাব, না নিজের পথ দেখে পা ফেলব। Vincent-এর উচ্চারণ যে ভৈঁয়সা তা কে জানবে বলো!

আমি হাসছিলাম। নিঃশব্দে। ভটকাই যে কথাটা খুব অযৌক্তিক বলেছে এমন নয়।

ঋজুদা বলল, ভাগ্যিস আমরা কিছুই আনপ্যাক করিনি। করলে, ঝামেলা হত। এখন চল দেখি কোথায় নিয়ে গিয়ে ওঠায় কার্লোস আর মারিয়েল ভৈঁয়সা। তবে বোঁ ভালো হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর সি-বিচ। আমি তো হাওয়াইয়ান দ্বীপপুঞ্জের ওয়াইকিকিতেও গেছি। বোঁভালো ওয়াইকিকির চেয়েও অনেক বেশি লম্বা বিচ এবং অনেক বেশি সুন্দর। পাঁচ মাইল লম্বা।

তুমি কি ভৈয়সাকে আগেই চিনতে নাকি?

চাক্ষুষ আলাপ নেই, তবে চিনি। ফোটো দেখেছি নানা ভঙ্গিমাতে। আসলে, মারিয়েল ভৈঁয়সা, মঁসিয়ে পঁপাদু আর মঁসিয়ে ব্লঁদার সঙ্গে পার্টনারশিপে গেছে। অথচ ওর কিন্তু পয়সার লোভ নেই। অপরূপ সুন্দরী। জাকলিন প্লজেরই মতো। ওর সঙ্গে জাকলিনের একটি ব্যক্তিগত বৈরিতা আছে দীর্ঘদিনের। ওরা দুজনে দুজনকে চেনে। এবং সমবয়সী। কোনও বিশেষ কারণের বৈরিতা। মেয়েদের, এবং বিশেষ করে ওই বয়সী মেয়েদের বৈরিতা নানা কারণে হতে পারে। আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব নয়।

জাকলিনটা আবার কে রে বাবা! উঃ, কী মুশকিলেই ফেললে তুমি ঋজুদা আমাদের।

এবারে, আমিই বললাম।

এ যে স্নেক-ল্যাডার। যতটা উঠছি সঙ্গে সঙ্গে নেমে যাচ্ছি আরও বেশি।

ভটকাই আমাদের অবস্থা সবিস্তারে ব্যাখ্যা করল।

ঋজুদা বলল, কী আশ্চর্য! একটু আগেই তো বললাম মাদমোয়াজেল প্লুজেঁর পুরো নাম জাকলিন প্লুঁজো। বলিনি?

মারিয়েল ভৈসাঁ নিজে শেষ পর্যন্ত আসতে পারেননি।

শাঁতাল, কার্লোস-এর সঙ্গে আমাদের নিতে এসেছিল দ্য ঈলস রুস্ট’ থেকে। আমাদের দেখাশোনা করার জন্যে তাকে নিযুক্ত করেছেন মারিয়েল ভৈঁয়সা। বয়স আমার বা ভটকাইয়ের থেকে বেশি বোধহয় নয়, কিন্তু সপ্রতিভ আর ব্যক্তিত্বে আমরা ওর কাছাকাছিও নই। ওরই তত্ত্বাবধানে আমাদের রাতের খাওয়াদাওয়া হয়েছে। খেতে গিয়েও দাঁত ভেঙে যাওয়ার উপক্রম। না, খাদ্যদ্রব্যের জন্যে নয়, রান্না-খাবারের পদ উচ্চারণ করতে গিয়ে।

আমরা পৌঁছানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই মারিয়েল ভৈঁয়সা এসে পৌঁছলেন। আমাদের সকলের সঙ্গে তাঁর আলাপ করিয়ে দিল শাঁতাল।

মারিয়েল ভৈঁয়সার হোটেলটা একটা পাহাড়ের ওপরে, সামনে সমুদ্র। সেটি এই পৃথিবীর অন্যতম সেরা সমুদ্রতট। বো ভাঁলো। সাদা বালির তটরেখা। এই বালি দেখতে দুধ-সাদা। কারণ, আসলে বালি বলতে যা বোঝাই আমরা, এ তা নয়। প্রবালের গুঁড়ো। ঋজুদা বলছিল। সাধে কি আব পৃথিবীর সব সমুদ্র-পাগল মানুষ স্যেশেলস, স্যেশেলস আর নাচানাচি করে।

রাতের খাওয়া সারলেও মারিয়েল ভৈঁয়সার হোটেলে আমাদের রাত্রিবাস করা হচ্ছে না। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা এখান থেকে চলে যাব। আপাতত আমরা হোটেলের একটি ঘরের লাগোয়া বারান্দাতে বসে আছি। আমাদের ঘরের আলো নেভানো। কার্লোস আর শাঁতাল একটি ঢাকা ভ্যানে করে আমাদের নিয়ে এসেছে ‘The Eagle’s Roost’ থেকে। মারিয়েল ভৈঁয়সা নিজে যাননি পিয়ের সন্দেহ করতে পারে বলে। জাকলিন প্লুজেঁ এখনও জানে না যে, মঁসিয়ে ব্লঁদা আর মঁসিয়ে পঁপাদুর সঙ্গে মারিয়েল ভৈঁয়সা হাত মিলিয়েছে।

কার্লোস একটা ব্যাগ খুলে স্মল-আর্মস দেখাল। আমি নিয়েছি স্পেইন দেশে তৈরি একটি পয়েন্ট টু টু ব্যারেটা পিস্তল। ভটকাইকে দিয়েছে ঋজুদা একটা থ্রি পয়েন্ট টু ওয়েবলি-স্কট-এর ইংলিশ রিভলভার। আর নিজে নিয়েছে সাইলেন্সর লাগানো থ্রি এইট অ্যামেরিকান কোল্ট পিস্তল। নিজেদের জীবন রক্ষা করা ছাড়া আর কিছুর জন্যেই গুলি ছোঁড়া যে যাবে না, তা বার বার বলে দিয়েছে ঋজুদা। একটি ছুঁড়লে অপরপক্ষ যে অবহেলায় দশটি খুঁড়তে পারে, এই সাধারণ বুদ্ধিটা যেন আমাদের থাকে, সে কথাও বলে দিয়েছে। এগুলো সঙ্গে রাখা ততটা ব্যবহারের জন্যে নয়, যতটা মনের শান্তির জন্যে।

আমরা এখনও স্যুটকেস আনপ্যাক করিনি, কারণ এখান থেকে আবার নাকি আমাদের স্যেশেলসের সেরা হোটেল, এই সি-বিচেরই ওপরে, হোটেল বোঁ ভালো বে-তে গিয়ে উঠতে হবে। মারিয়েল অ্যান্ড কোং অর্থাৎ মারিয়েল, ব্লঁদা আর পাদু ঠিক করেছে আমাদের প্লুজেঁর একেবারে নাকের ডগাতেই রাখবে। প্রদীপের নীচেই যেমন অন্ধকার, তেমন তার অত কাছে থাকাতে আমাদের সন্দেহ করবে না হয়তো। আমরা যে হোটেলে এখন আছি, সাবধানতার কারণেই আমাদের এখানে আনা হয়েছে। বো ভাঁলোতে মারিয়েল এবং কার্লোসের সঙ্গে ঋজুদার এই মিটিং মোটেই সহজ ছিল না। রাত ন’টা নাগাদ আমরা ‘বো ভাঁলো বে হোটেলে যাব। কারণ, ওই সময়েই নাইরোবি থেকে একটা ফ্লাইট আসে। ওই সময়ে চেক-ইন করলে কেউই সন্দেহ করবে না। কালোস, কিনিয়া এয়ারওয়েজের কিছু ব্যাগেজ-ট্যাগও দিয়ে দিয়েছে আমাদের। এয়ার-ইন্ডিয়ার ট্যাগ ছিঁড়ে ফেলে ওগুলো আমাদের ব্যাগেজে লাগিয়ে নিতে হবে, যাতে কারও সন্দেহ না হয়।

সমুদ্র থেকে হু-হু করে হাওয়া আসছে। এখানের নারকেল গাছগুলো ভারী মজার। পাড়ে দাঁড়িয়ে সমুদ্রকে যেন নুয়ে পড়ে প্রণাম করছে এমনভাবে সমুদ্রের ওপরে ঝুঁকে পড়েছে। নারকেলগুলোর রং হলুদ। এখানে কোকো-ডে-মেয়্যার নামের এক ধরনের বিরাট বিরাট কালো আর হলদেটে, সামুদ্রিক নারকেল হয়। নাকি। এই কোকো-ডে-মেয়্যার পৃথিবীর আর কোথাওই নাকি পাওয়া যায় না, বলছিল ঋজুদা। এখনও দেখা হয়নি, দেখতে হবে। আর আছে বিরাট বিরাট দৈত্যকচ্ছপ। অলিভ রিডলের চেয়ে অনেকই বড়। ল্যান্ড টরটয়েজ। আরও কত কী আছে। ক’দিন থাকলেই জানতে পাব।

ঋজুদা বলল, মাদমোয়াজেল প্লজেঁকে নিয়ে তোদের ভাবতে হবে না। তোরা শুধু পিয়ের কে হতে পারে, সেটা আন্দাজ করার চেষ্টা করবি। কার্লোস এখনও তার ছবি আমাদের হাতে তুলে দিতে পারেনি। সুতরাং কাজটা খুব সহজ হবে না। তবে পিয়ের বা তার লোকজন যে আমাদের কাছাকাছি থাকবেই, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কাজে লাগাতে হবে অনুমানশক্তি। তোদের দুজনকেই অনেক টাকা, মানে লোকাল কারেন্সি, দিয়ে দেব। যাতে অর্থকষ্ট না হয়। জিন-এর ব্যাগ ওরা আনিয়েই রেখেছে। তার মধ্যে ইনফ্রা-রে দূরবীন, অন্ধকারে দেখার জন্যে, আর পিস্তল রিভলভার যার যার, রাখবি। কার্লোস বন্দোবস্ত করে দেবে। পাসপোর্ট আর টাকা থাকবে কোমরে বাঁধা। তেমন বেগতিক দেখলে জিন-এর ব্যাগটা ফেলে নিজের নিজের প্রাণ নিয়ে সটকাবি। তোদের যে হোটেলেই ফিরে আসতে হবে, তার কোনও মানে নেই। কাজের সুবিধার জন্যে যেখানে খুশি থাকতে পারিস। টাকার অকুলান হবে না। কার্লোস মোবাইল-ফোনও দিয়ে দেবে এখুনি একটা করে, যাতে অসুবিধে না হয়। বো ভালো হোটেলের গেট দিয়ে একবার ঢুকে পড়ে ভিতরে চলে এলে সম্পূর্ণ নিরাপদ। এর চারদিকে ক্লোজড-সার্কিট টিভি আছে। ছদ্মবেশে অনেক গার্ড আছে। কেউ ড্রাইভার, কেউ হোটেলের বেল-বয়, কেউ ট্রাভেল সার্ভিসের লোক–এই সব ভেক ধরে। প্রত্যেকে ক্যারাটের ব্ল্যাকবেল্ট। তা ছাড়া তাদের প্রত্যেকেরই সঙ্গে আছে, পিস্তলও, সাইলেন্সার লাগানো। ভিতরে ঢুকে এলে কেউই আর তোদের অনিষ্ট করতে পারবে না। প্রাণ কোনও কারণে বিপন্ন বোধ করলে বো ভাঁলোর চত্বরে ঢুকে পড়বি। তবে কাল আমরা একসঙ্গেই বেরোব। যাব Praslin নামে একটি দ্বীপে।

কী করে যাব?

কেন? প্লেনে। আইল্যান্ডার প্লেন আছে ছোট ছোট। সেই ফ্লিটের কম্যান্ডার আবার একজন ভারতীয়। প্লেন-এ জনা কয়েক বসতে পারে। সিঙ্গল প্রপেলারের প্লেন। সমুদ্র টপকে গিয়ে নারকেল গাছেদের মাথার ওপর দিয়ে নেমে পড়বে প্লেন দ্বীপে।

টিকিট পাব কোথায়?

আহা রে। মাখনবাবুরা।

ঋজুদা বিরক্তির গলায় বলল।

তারপর বলল, এয়ারপোর্টে গেলেই টিকিট পাবি। শাটল-সার্ভিস৷ যায় আর আসে। প্যাসেঞ্জার অনুযায়ী ফ্লাইট যায়। সন্ধের পরে চলাচল করে না। সেই জন্যে খুব ভোরে ব্রেকফাস্ট খেয়েই বেরিয়ে পড়ব আমরা। আমিওতো যাচ্ছি তোদেরই সঙ্গে, না, কি?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *