ঋজুদার সঙ্গে পুরুণাকোটে – বুদ্ধদেব গুহ
অমরিক সিং-এর এমনিতে দুর্জয় সাহস। একবার জ্বলন্ত চেলা কাঠ নিয়ে সে একটা বড় বাঘকে তাড়া করে গিয়েছিল। বাঘটা কাঠ ঢোলাইওয়ালাদের মোষ ধরবার জন্য ক্যাম্পের কাছে ঘুর ঘুর করছিল যখন সন্ধে রাত্তিরে। কিন্তু দুঃসাহসী অমরিক সিং-এর সবরকম ভূতের ভয় ছিল। রাজ্যের কুসংস্কার ছিল। শিয়াল জিপের সামনে দিয়ে পথের বাঁদিক থেকে ডানদিকে গেলে, খরগোশ ডানদিক থেকে বাঁদিকে গেলে সে জিপ থামিয়ে গ্রন্থসাহেব থেকে মন্ত্র আওড়াত ভক্তিভরে বেশ কিছুক্ষণ পরেই আবার মন্ত্রপড়া শেষ হলে তারপরই জিপের অ্যাকসিলারেটরে কষে চাপ দিত। ভূত বলে ভূত। বাঘঘডুম্বা ভূত। অমরিক সিং যে কী জোরে জিপ ছুটিয়েছিল সে রাতে তা কী বলব! গিয়ার বদলাতে পর্যন্ত ভুলে গিয়েছিল ভয়ের চোটে। পুরো পথটাই সেকেন্ড গিয়ারে এল জিপ গাঁক গাঁক করতে করতে। বনেটের নীচ থেকে ধোঁয়া বেরোতে লাগল। আমি ভাবলাম বুঝি আগুনই লেগে যাবে জিপে। তারপর বড় রাস্তাতে পড়ে এক চাষার বাড়ির পুকুর থেকে অনেক বালতি জল জিপের গায়ে মাথায় এবং রেডিয়েটরে ঢেলে তবেই জিপকে ঠাণ্ডা করা হয়–আর একটু গেলে সত্যি সত্যিই আগুন লেগে যেত। রেডিয়েটরে জল ছিল না এক ফোঁটাও। তাই বলছিলাম, বাঘডুম্বা নিয়ে স্যার ঠাট্টা করবেন না। অমন সাংঘাতিক ভূত ইন্ডিয়ার আর কোথাও নেই।
তিতির টিপ্পনী কেটে বলল, অমরিক সিং-এর কথা তো বললেন, আপনি ভয় পেয়েছিলেন কি না তা তো বললেন না?
মহান্তিবাবু হাসলেন। বললেন, ভয় কি আর পাইনি ম্যাডাম। ভয়ের চোটে দাঁতকপাটি লেগে গিয়েছিল কিন্তু আমি যে মুহুরি, ম্যানেজার। আমিও যদি ভয় পাই তাহলে তো অ্যাডমিনিস্ট্রেশন লাটে উঠবে। এই বাঘডুম্বা ভূতের কথা ছেড়ে দিন, বাঘডুম্বার বাঘের ভয়ও কি পাইনি! দু রাতে বাঘটা ক্যাম্পে আমার ঘরের সামনে এসেছিল।
সে তো আপনার গড়গড়া থেকে তামাক খেতে।
আমি বললাম, গিয়ার চেঞ্জ করতে করতে।
মহান্তিবাবু হেসে ফেললেন। বললেন, তা হতেও বা পারে। কিন্তু সাতসকালে উঠে তার পায়ের দাগ আমার ঘরের সামনে দেখে আমি নিজেই পা দিয়ে মুছে দিয়েছিলাম, যাতে কেউ টের না পায়। যা বলার, তা আমি শুধু বাবুকেই রিপোর্ট করতাম। অ্যাডমিনিস্ট্রেশন চালানো কি সোজা কথা! টাটা কোম্পানিও কোম্পানি, আমাদের পট্টনায়েক অ্যান্ড কোম্পানিও কোম্পানি। তফাত বিশেষ নেই। রুসি মোদিও যা, আমিও তাই।
দেখতে দেখতে আমরা অঙ্গুলে পৌঁছে সিমলিপদাতে বিমলকান্তি ঘোষের বাড়ি পৌঁছে গেলাম। উনি আগেই খবর পেয়েছিলেন। পুরুণাকোট পুলিশ চৌকি থেকে অঙ্গুলের বড় থানাতে ওয়্যারলেস করে দিয়েছিল। থানা থেকে বিমলবাবুকে ফোনে খবর দিয়ে রেখেছিল। বিমলবাবু বাদাম দেওয়া, ধনেপাতা দেওয়া, চিড়ে ভাজা, আর বড় বড় পিস-এর রুই মাছ ভাজা খাওয়ালেন পৌঁছবার সঙ্গে সঙ্গেই আদর করে। বিমলবাবুর স্ত্রীর রান্নার হাতই আলাদা।
ঋজুদা বলল, কত যে অত্যাচার করেছি বউদির উপরে একসময়ে আমরা। আমরা চাও খেলাম। উনি ঋজুদার জন্য এক বোতল হোয়াইট লেবেল স্কচ হুইস্কি দিয়ে দিলেন। বললেন, খেতে খেতে ভুবনেশ্বরে চলে যান। চাঙ্গা লাগবে। বহু বছর আগে গুহসাহেব শিকারে এসে দিয়ে গেছিলেন। রাখা ছিল। আমি তো জন্মে জল, চা, সরবৎ আর ঢাকার আয়ুর্বেদিক ঔষধালয়ের সারিবাদি সালসা’ ছাড়া অন্য কোনও তরল পদার্থই খাইনি। তবে প্রায় চল্লিশ বছর আগে টিটাগড় পেপার মিলের উইলিস সাহেব টুকার জঙ্গলে বাঘের মুখে পড়ে সাংঘাতিকভাবে আহত হওয়ার পর তাঁকে দেখেছিলাম স্কচ-এর বোতল খুলে নীট-হুঁইস্কি বোতল থেকে খেতে। কটক অবধি যেতে যেতে মরে যে যাননি তাও ওই হুইস্কির জন্য, ডা. প্রধান আমাকে বলেছিলেন কটকে। সেই দিনই বুঝেছিলাম এ জিনিস মৃতসঞ্জীবনী। তবে নিজের কখনও খাওয়ার প্রয়োজন হয়নি। তাই গুহ সাহেবের প্রেজেন্ট করা ভালবাসার দান রেখে দিয়েছিলাম যত্ন করে। এমন সৎকাজে লাগবে আগে জানিনি। ঋজুবাবু আমার খুবই ভালবাসার জন। তাঁকে আমি একাধিক কারণে শ্রদ্ধাও করি।
ওই। শুরু করলেন। বোতলটা দিন তো বক্তৃতা থামিয়ে।
জিপটাকে আমি বিমলবাবুর বাড়ির সামনের মস্ত তেঁতুল গাছটার ছায়াতে রেখেছিলাম। ঋজুদার জিপ থেকে নামার মতো অবস্থা ছিল না।
জিপে বসেই চিড়ে ভাজা আর মাছ ভাজা খেল। ঋজুদার মুখের হাসি কিন্তু নেভেনি। অনির্বাণ। ঋজুদা চা না খেয়ে হুইস্কি খেল বোতল থেকে স্ট্রেট দু’চুমুক। স্বীকার করছে না বটে কিন্তু বেশ ঘোরে আছে। তিতির কপালে হাত দিয়ে দেখল, জ্বরও এসেছে।
বিমলবাবু বললেন, এবারে খুব জোরে চালিয়ে চলে যাও রুদ্র। আর দেরি কোরো না। ডা. পানিগ্রাহীকে বলে দিয়েছি। উনি আজ বাড়িতে খেতে যাবেন না। চেম্বারেই থাকবেন। চেম্বার ভুবনেশ্বরে ঢোকার মুখেই পড়বে। সঙ্গে নার্সিং হোমও আছে। সব বন্দোবস্ত করা আছে। হাইওয়ের উপরেই পড়বে। প্লেনের টিকিটও উনি কিনে রেখেছেন। আমি একটু পরেই রওনা হচ্ছি খেয়ে-দেয়ে, আমার ড্রাইভারকে সঙ্গে নিয়ে। বড় গাড়ি থাকলে ঋজুবাবুকে তাতেই ট্রানসফার করে দিতাম। মারুতি এইট হান্ড্রেড তো! আমি সোজা এয়ারপোর্টে যাব। ড্রাইভার জিপ চালিয়ে ফিরে আসবে ফ্লাইট টেক-অফ করার পরে। আর আমি গাড়ি নিয়ে ফিরব মহান্তিবাবুকে সঙ্গে নিয়ে। ফেরার পথে ঢেনকানল-এ তাঁকে নামিয়েও দিয়ে যাব।
আপনারা নার্সিং হোমের থেকে ফ্লাইটের সময় বুঝে রওনা হবেন এয়ারপোর্টের দিকে। হুইল চেয়ারের বন্দোবস্ত আমি করে রাখব আগেই। এয়ারপোর্ট ম্যানেজারকেও বলে রাখব।
বাড়িতে না নামিয়ে পট্টনায়েকবাবুর বাড়িতেই নামাবেন বরং।
যুধিষ্ঠিরটা চলে গেল।
মহান্তিবাবু বললেন।
ওঃ তাই তো। আমরাও তো একবার যাওয়া উচিত। বিমলবাবু বললেন। এত বড় সর্বনাশ হয়ে গেল ভদ্রলোকের। যুধিষ্ঠির ছেলেটা বড়ই ভাল ছিল। বিনয়ী, ভদ্র। বড়লোক বলে কোনও চাল-চালিয়াতি ছিল না। অন্য অনেক বড়লোকের ছেলেদের মতো। পান-সিগারেট পর্যন্ত খেত না। সুন্দর স্বভাব।
মহান্তিবাবু বললেন, ভাল কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন বিমলবাবু। আপনার গড়গড়াটা আনতে বলুন তো জগবন্ধুকে, তাম্বুরি তামাক সেজে। বড় বড় দুটান লাগিয়েই ‘জয় মা কটকচণ্ডী: বলে ভুবনেশ্বর রওনা দিই।
তারপর বললেন, শুনেছেন নাকি সে কথা? হটবাবু বলছিলেন বাঘিনীটা নাকি ক্যাম্পে ঢুকেছিলই আমার সুগন্ধি তামাক সাজা গড়গড়াতে দু’টান লাগাবে বলে।
আমরা সকলেই হেসে উঠলাম।
মহান্তিবাবু গড়গড়াতে গুড়ুক গুড়ুক করে কয়েক টান লাগানোর পরে, বিমলবাবু বললেন, আর দেরি নয়। এগোন। এখোন।
পেইনকিলার ট্যাবলেট কিছু কি দিয়ে দেব?
ঋজুদা হোয়াইট লেবেল-এর বোতলটা দেখিয়ে বলল, এই তো নিজৌষধি দিলেন। সর্বরোগহারী। আর কিছুই লাগবে না।
তারপর বলল, এবারে এদের কিছুই দেখাতে পারলাম না। শীত থাকতে থাকতেই আর একবার আসার ইচ্ছে আছে। তবে আমি কখন কোথায় থাকি, তা নিজেই জানি না। নিজে না আসতে পারলে এদের আপনার হেপাজতেই পাঠিয়ে দেব। ভাল করে সাতকোশীয়া গন্ড ঘুরিয়ে দেবেন।
পাঠাবেন। দেখিয়ে দেব। নিশ্চয়ই দেব। তবে আপনি এলে মজাই আলাদা। চেষ্টা করবেন আসবার অবশ্যই।
আমরা বিমলবাবুকে হাত নেড়ে এগোলাম। সিমলিপদা থেকে বড় রাস্তায় পড়েই অ্যাকসিলারেটরে চাপ দিলাম। তবে জিপে আশি কিলোমিটারের চেয়ে জোরে যানবাহন ভরা পথে যাওয়া বিপজ্জনক। এক বিপদ থেকে বেঁচে অন্য বিপদে না পড়ি।
ঋজুদা বলল, জিপটা বাঁদিকে করে একটু আস্তে কর রুদ্র। পাইপটা ধরাব।
ধরাও। বলে আমি অ্যাকসিলারেটর ছেড়ে দিয়ে সটাসট করে গিয়ার চেঞ্জ করে গতি কমালাম। বললাম, ভাল করে ধরাও তো। আর থামাথামি নেই। তিতিরের কাঁধে হেলান দিয়ে এবার একটু ঘুমিয়ে পড়ো৷
একদম না।
মহান্তিবাবু বললেন। চোখের পাতা একেবারে এক করবেন না। গল্প করতে করতে চলুন।
ঋজুদা বলল মহান্তিবাবুকে, রাইট ইউ আর।
তারপর আমাকে বলল, আফ্রিকার গুগুনোগুম্বারের দেশের কথা মনে পড়ে রুদ্র? সেই সেরেঙ্গেটি প্লেইনস-এ ভুষুন্ডার বিশ্বাসঘাতকতার কথা?
আদিগন্ত ঘাসবনে পথ হারাবার কথা? হায়নাদের আক্রমণের কথা। তুই যে কতবার আমাকে কতভাবে বাঁচাবি রুদ্র, তুই-ই হচ্ছিস আমার বিপদে মধুসূদন।
তিতির বলল, ‘গুগুনোগুম্বারের দেশে’ বইটাও তুমি দারুণ লিখেছিলে রুদ্র।
তারপর আর কথা না বলে, জিপ চালাতে চালাতে আমি ভাবছিলাম, যুধিষ্ঠিরের অমন মর্মান্তিক মৃত্যু না হলে আমরা এতক্ষণে মহানদী পেরিয়ে, মানে মহানদীর গণ্ড পেরিয়ে কোথায় না কোথায় চলে যেতাম। বৌধ, নয়তো ফুলবানীতে। ফুলবানী অনেক উঁচু জায়গা। নয়তো চারছক হয়ে দশপাল্লা। যেখানে টাকরা গ্রামে পৌঁছে বুরতং নালাকে ডানপাশে রেখে, চলে যেতাম সুউচ্চ বিরিগড় পাহাড়শ্রেণীর নীচের ছোট্ট গ্রাম বুরুসাইতে। সেখান থেকে পাহাড়ে চড়তাম। এই সব অঞ্চলে খন্দ উপজাতিদের বাস–যাদের পূর্বপুরুষরা মেঘের ভেলাতে চড়ে এসে ওই সুউচ্চ পাহাড়ে নেমে বসতি স্থাপন করেছিল।
যখনই আমার মন খারাপ হয়, আমি রুদ্র রায়, নিজেই নিজের লেখা ‘ঋজুদা সমগ্র’র পাতা খুলে বসে পড়ি। আর কোথায় না কোথায় চলে যাই। কত কথাই যে মনের কোণে ভেসে ওঠে। ভাগ্যিস ঋজুদা ছিল আমাদের!
