ঋজুদার সঙ্গে পুরুণাকোটে – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

আমরা যখন ঋজুদাকে জিপের পিছনের সিটে শুইয়ে নিয়ে পুরুণাকোটের বাংলোতে এলাম তখন বাংলোর সামনেটা লোকে লোকারণ্য। খুশির জোয়ার বইছে চারদিকে। এতদিন বাঘিনী বাঘঘমুণ্ডার জঙ্গলে যারা কাঠ কাটতে যেত এবং হাতিগির্জা পাহাড়ের দিকে যেত, তাদেরই ধরেছিল। এই প্রথম পুরুণাকোটের এত কাছে নন্দিনী নালার পাশে পট্টনায়েকবাবুর ক্যাম্পের সামনে থেকে দিনমানে এবং মোটর গাড়ির একেবারে পাশ থেকে অন্য মানুষদের সামনেই যুধিষ্ঠিরকে নেওয়াতে পুরুণাকোটে আতঙ্কের ছায়া নেমে এসেছিল। রাতের বেলা তো অলিখিত কার্টু ছিলই, ইদানীং দিনের বেলাতেও মানুষজন বাড়ির বাইরে যেতে সাহস করত না আর। তাই বাঘিনীর মৃত্যুর সংবাদে স্বাভাবিকভাবে আনন্দের জোয়ার বয়ে গিয়েছিল। ৪৫৪

টিকরপাড়া থেকে কটকগামী বাস থামিয়ে মানুষে করতপটা গ্রামে এই সুসংবাদটি দিতে অনুরোধ করল ড্রাইভার আর কনডাক্টরকে। করতপটা’ শব্দটির মানে হচ্ছে করাত দিয়ে চেরা। করাতি বা কাবাড়িদের গ্রাম বলেই গ্রামের নাম করতপটা। লবঙ্গী যাবার পথ ছাড়িয়ে আরও কিছুদূর পরে একটা ছোট নদীর পারে সেই গ্রাম। পথটা নদীর উপর দিয়েই গেছে।

ঋজুদার একটা আচ্ছন্ন ভাব এসেছে। সেটা মোটেই ভাল নয়। পুরুণাকোট বাজারের মধ্যেই অঙ্গুল ও কটক যাবার পথের বাঁদিকে একটা ছোট হাসপাতাল আছে রাজ্য সরকারের। সেখানে ভালুকে নাক কান ছিঁড়ে নেওয়া, সাপের কামড় খাওয়া এবং বাঘ বা চিতার আক্রমণে আহত বা নিহত হওয়া, হাতির লাথি খেয়ে পিলে ফাটা মাথা থ্যাঁৎলানো অথবা বাইসনের বা গাউরের শিঙের গুঁতোতে বিপজ্জনকভাবে আহত মানুষদের প্রায়ই চিকিৎসার জন্য অথবা ডেথ সার্টিফিকেটের জন্য আনা হয়। কখনও বা যাদের নেহাতই মন্দভাগ্য সেইসব মানুষের লাশ চটে-মোড়া অবস্থাতে মাছি ভন ভন করতে করতে গোরুর গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হয় অঙ্গুল বা কটকে। ঈশ্বরের ভরসায় ক্রন্দনাকুল আত্মীয়স্বজনেরা সেই দুর্গন্ধ ফুলে-ঢোল লাশ নিয়ে হা-পিত্যেশ করে বসে থাকে কখন লাশকাটা ঘরের ডাক্তারবাবু আর ডোমেদের দয়া হবে শবব্যবচ্ছেদ করে, যে ঘোরতর মৃত, তাকেই দিন কয় পরে মৃত বলে ঘোষণা করে, একটা সার্টিফিকেট দেবার।

পৃথিবীর খুব কম দেশেই সম্ভবত আমাদের দেশের মতো সাধারণ, সংযোগহীন, গরিব মানুষ মরে গেলেও তার নিস্তার নেই। কী লাশকাটা ঘরে, কী শ্মশানে, ডোমদের এবং অন্যান্যদের হৃদয়বিদারক অত্যাচার চোখে দেখা যায় না।

পুরুণাকোটের হাসপাতালে বেনজিন ডেটল এবং কিছু পেইনকিলার ট্যাবলেট এবং টেডভ্যাক ইনজেকশন ছাড়া ঋজুদার আর কোনও চিকিৎসাই হল না। আমি আর তিতির ঠিক করলাম যে, অঙ্গুলে গিয়ে, অঙ্গুল তো কটকের পথেই পড়বে, বিমলবাবুকে সঙ্গে নিয়ে আমরা সোজা ভুবনেশ্বরে চলে যাব। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা করিয়ে সন্ধের প্লেন ধরে, যে-প্লেনটা হায়দ্রাবাদ হয়ে আসে, নয়তো ভুবনেশ্বর-পাটনা-রাঁচি হয়ে কলকাতায় যায়, সেই প্লেনে কলকাতা ফিরে যাব।

ভুবনেশ্বর, ওড়িশার রাজধানী। সেখানে অত্যন্ত দক্ষ সব ডাক্তার এবং ভাল ভাল হাসপাতালও আছে কিন্তু আমরা ঋজুদার ব্যাপারে দায়িত্ব নিতে রাজি ছিলাম না। ঋজুদাতো শুধুমাত্র আমার আর তিতির আর ভটকাই-এর ঋজুদা নয়, ঋজুদা জাতীয় সম্পত্তি। তাঁর কিছু একটা হয়ে গেলে, অন্যদের কথা ছেড়েই দিলাম, শ্রীমান ভটকাইচন্দ্র এবং গদাধরদাই আমাদের পিঠের চামড়া খুলে নেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট ছিল।

যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের মালপত্র জিপের সামনের সিটে উঠিয়ে নিয়ে তিতির ঋজুদাকে কোলে শুইয়ে বসল পিছনে। সঙ্গে সামনে মহান্তিবাবুও উঠলেন পট্টনায়েকবাবুর প্রতিভূ হিসাবে। ওঁরা কৃতজ্ঞ যেমন ছিলেন, লজ্জিতও কম ছিলেন না। তারপর স্টিয়ারিং-এ বসে আমি টিকিয়া উড়ান চালালাম জিপ অঙ্গুলের দিকে।

বিমলবাবুর বাড়িতে সিমলিপদাতে এক মিনিট দাঁড়িয়ে বিমলবাবুকে খবরটা দিয়ে যেতে হবে, যাতে উনি বড় হাসপাতালে ওঁর ড্রাইভার এবং অন্য একটা গাড়ি নিয়ে আসেন এক্ষুনি। জিপ তো কারও চালিয়ে ফিরতে হবে ভুবনেশ্বর থেকে!

করতপটার কাছাকাছি এসেই ঋজুদা বলল, আমার শীত করছে রে। আমাদের সঙ্গে একটা করে কম্বল ছিল। তিতির তাই চাপিয়ে দিল ঋজুদার গায়ে। উধ্বাঙ্গের সমস্ত ক্ষত থেকে তখনও রক্ত চোঁয়াচ্ছিল। রক্তক্ষয় হয়েও কিছু না হয়ে যায়। ভাবছিলাম আমি। তা ছাড়া বাঘের নখে ও মুখে তীব্র বিষ থাকে। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে ক্ষতগুলোতে ‘গ্যাংগ্রিন’ সেট করে যাবে। তখন বাঁচানো মুশকিল। হাত পা হলে তা কেটে বাদ দিয়ে রোগীকে বাঁচানো যায় কিন্তু এ তো বুক, পেট, কাঁধ ও বাহুর সংযোগস্থলের ক্ষত। বাম উরু থেকেও এক খাবলা মাংস উড়িয়ে নিয়েছে নিজে মরতে-বসা বাঘিনী।

করতপটার মানুষরা পথের উপরে জটলা করে দাঁড়িয়েছিল। তারা মহান্তিবাবুকে দেখেই হই হই করে জিপ থামিয়ে ঋজুদাকে মালা পরাল, প্রণাম করল। ছাড়তেই চায় না। মহান্তিবাবু ধমক-ধামক দিয়ে এবং আগামীকাল থেকে তাদের কাজে যোগ দিতে বলে আমাকে বললেন, এবারে জিপ এগোন।

আমি আবার জোরে অ্যাকসিলারেটরে চাপ দিলাম।

ঋজুদার আচ্ছন্নভাব কাটাবার জন্য মহান্তিবাবু বললেন, বুঝলেন কিনা ঋজুবাবু, আপনার ক্ষত পচে যাবার কোনও দুর্ভাবনাই আর নেই। ভাগ্যিস হাড়িবন্ধু ওখানে এসেছিল। ব্যাটা করে না এমন নেশা নেই। ওকে একবার একটা গোখরো সাপ কামড়ে দিয়েছিল।

তারপর?

তিতির বলল।

তারপর আর কী। সাপটাই হাড়িবন্ধুর শরীরের বিষে ঢলে পড়ল।

ওই টেনশনের মধ্যেও আমি হেসে উঠলাম, বললাম, বলেন কী?

তবে আর কী বলছি। বাঘ বা চিতা যদি কামড়ায় তবে সঙ্গে সঙ্গে যদি সেখানে মুতে দেন তবে অ্যান্টিসেপটিকের কাজ করে। অমন অ্যান্টিসেপটিক খুব কমই আছে।

তিতির হেসে উঠল মহান্তিবাবুর কথায়।

আমার চোখের সামনে বাগানে পাইপে করে জল দেওয়ার মতো ডান হাতে প্রত্যঙ্গটি যত্নভাবে ধরে হাড়িবন্ধুর ঋজুদার সর্বাঙ্গে সেই দুর্গন্ধ জল দেওয়ার ছবিটা ফুটে উঠল। আর জলও কী জল! যেন পি সি সরকারের ‘ওয়াটার অফ ইন্ডিয়া। না আছে আদি, না অন্ত, পড়ছে তো পড়ছেই।

হঠাৎ জড়ানো গলাতে ঋজুদা বলে উঠল, মহান্তিবাবু ঠিকই বলেছেন। এতে কত শিকারি বেঁচে গেছে। হটবাবু খুবই বুদ্ধিমানের কাজ করেছিলেন।

তারপর আমাকে বলল, তুই আফ্রিকান হোয়াইট হান্টার Pondoro-র লেখা পড়িসনি রুদ্র? সেই যে একটা লেপার্ড গুলি খেয়ে গাছের উপর থেকে ওঁর গায়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওকে সাংঘাতিকভাবে আহত করল আর তখন তাঁর আফ্রিকান Gun-bearer তাঁর গায়ে ওই কর্ম করে দিয়ে তাঁকে ডিসইনফেক্ট করল!

আমি বললাম, হ্যাঁ হ্যাঁ। মনে পড়েছে। ভুলেই গিয়েছিলাম।

হুঁ। মনে রাখবি। যেখানে সঙ্গে সঙ্গে মেডিক্যাল অ্যাটেনশান পাওয়ার সম্ভাবনা কম সেখানে প্রিভেন্টিভ হিসাবে এই প্রক্রিয়ায় ভিজতে পারলে ভালই।

তিতির হেসে বলল, উঃ মাগো। আমি মরে গেলেও যাব কিন্তু তোমার এই প্রেসক্রিপশনের ওষুধ আমি খাব না।

খাবে কেন? লাগাবেই তো শুধু। আমি বললাম।

খেলেই বা দোষ কী?

ঋজুদা বলল।

তারপর বলল, মোরারজি দেশাই তো নিয়মিত খেতেন। আমি তাঁর পঁচাশি বছর বয়সে তাঁকে কাছ থেকে দেখেছি। কী রং, কী গড়ন, যেন সাহেবের বাচ্চা।

আমি আর ওই মূত্র-তত্ত্বে সামিল হলাম না। মনটা খারাপ লাগছিল। বাঘিনীটার চামড়া ছাড়ানোর সময়ে ভাল করে খুঁটিয়ে দেখতে হত, কেন সে মানুষ ধরা আরম্ভ করল, কোন দুঃখে?

কোনও দুঃখ বা অসীম অসুবিধা ছাড়া কোনও বাঘই মানুষখেকো হয় না। সুন্দরবনের বাঘের কথা ছাড়া। তারা বংশপরম্পরায় আনন্দের সঙ্গেই মানুষ মেরে আসছে বহু যুগ থেকে। বাঘ বা বাঘিনী যে দুঃখে বা শারীরিক যন্ত্রণার কারণে মানুষখেকো হয়, সেই দুঃখ কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষেরই দেওয়া। এটা আমাদের লজ্জা। নইলে বাঘের মতো মহান, পুরুষ-মানুষের সংজ্ঞা, অকুতোভয়, ভদ্রলোক, জ্ঞানী, পৃথিবীতে নেই। মানুষের অনেকই শেখার ছিল তাদের কাছ থেকে। মানুষ মূর্খ বলে, আত্মম্ভরিতার শিকার বলেই বাঘের কাছ থেকে শিখল না কিছুই।

তিতির বলল, ওরা বোধহয় এখন বাঘকে নিয়ে করতপটাতে আসবে। চামড়া ছাড়াতে দেরি হয়ে গেলে চামড়াটা নষ্ট হয়ে যাবে।

কিছু হবে না। হাড়িবন্ধু আছে, ভীম্ব আছে। ওরা সব বাঘের চামড়া ছাড়াতে ওস্তাদ। পেটের চর্বি, বাঘের নখ, বাঘের গোঁফ এসব তো ওরাই নেবে কিনা! কোনও চিন্তা করবেন না, চামড়া ছাড়িয়ে, নুন আর ফটকিরি দিয়ে ফকিনা কলকাতাতে আপনাদের ঠিকানাতে প্যাক করে পাঠিয়ে দেব।

আমি বললাম, না না, আমাদের কারও ঠিকানাতেই নয়, কলকাতার কার্থবাটসন অ্যান্ড হার্পার অথবা ম্যাড্রাসের ভ্যান ইনজেন অ্যান্ড ভ্যান ইনজেন-এ পাঠাতে হবে। দু’জনের ঠিকানাই আমি আপনাকে দিয়ে যাব।

ঋজুদা ঘোরের মধ্যেই বলল, কবে থেকে চোর হলি তুই রুদ্র?

মানে?

মানে, বাঘটা কি তোর? না আমার?

মহান্তিবাবু বললেন, এ কী কথা। বাঘটাতো আপনারাই মারলেন। আপনাদের নাতো বাঘিনী কার?

ঋজুদা কষ্ট করে হলেও হেসে বলল, বাঘিনী মিস্টার হটবাবুর।

সে কী। সে ব্যাটাই তো তার গাদা বন্দুক হাঁকড়ে বাঘটাকে খণ্ডিয়া করে দিল। খন্ডিয়া না হলে কি আর সে আপনাকে আক্রমণ করত?

খন্ডিয়া মানে কী?

তিতির জিজ্ঞেস করল।

খন্ডিয়া মানে আহত। ইনজিওরড।

ও।

ঋজুদা বলল, সে যাই হোক, বাঘ শিকারের নিয়ম হল, যে বাঘের শরীর থেকে প্রথম রক্তপাত ঘটাবে বাঘ তারই।

এ আবার কী নিয়ম? কোনও আনাড়ি যদি বাঘের ল্যাজে বা পায়ের থাবাতে গুলি করে তবেও সে বাঘ তার?

হ্যাঁ, তার। যে-শিকারি নিজের জীবন বিপন্ন করে সেই সামান্য আহত কিন্তু অত্যন্ত ক্রুদ্ধ বাঘকে খুঁজে পেতে মারবেন বাঘ তাঁর নয়। যে আনাড়ি প্রথম রক্তপাত ঘটিয়েছে বাঘ তারই।

ভারী অদ্ভুত নিয়ম তো।

সে ষড়া সেই বাঘকু চম লইকি কন করিবে? কুয়ারে রাখিবে? তাংকু ড্রয়িংরুম অছি না আউ কিছি। আমিই ওটা নিয়ে নেব।

ঋজুদা বলল, আপনার ক’জন শালি মহান্তিবাবু।

তা ভগবানের দয়াতে কম নয়। ছ’জন শালি আমার।

তবে আর কী? ছয় শালিকে রোমহর্ষক মানুষখেকো বাঘ শিকারের গল্পও শোনাতে পারবেন এবং ওই কল্পিত ভয়াবহ কাহিনী শুনে শালিরা আপনার বীরত্বে গা ঘেঁষে বসে বলবে, বাপ্পালো বাপ্পা। উঁইবাবু আপনংকু এত্বে সাহস!

চাইকি কোনও শালী চুমুও খেয়ে দিতে পারে।

আমরা এবং মহান্তিবাবু নিজেও হেসে উঠলেন ঋজুদার কথাতে। তারপর উনি সখেদে বললেন, দুঃখের কথা কী বলব আমার স্ত্রীই সবচেয়ে ছোট বোন। সবচেয়ে বড় শালির বয়স সাতাশি আর আমার স্ত্রীর উপরে যিনি তাঁর বয়স পঁয়ষট্টি। সিনিয়র সিটিজেন। অর্ধেক ভাড়াতে ট্রেনে যাতায়াত করেন। সকলেই কি আর শালিবাহন হয় ঋজুবাবু? সে সব কপালের ব্যাপার!

ঋজুদা হেসে ফেলল রসিক মহান্তিবাবুর কথা শুনে।

অঙ্গুলে পৌঁছে কোনও দোকানে হুইস্কি পাওয়া যায় কি না দেখিস তো রুদ্র।

তুমি তো ওসব খাওনা।

খাইতো নাই। সেই জন্যই এখন খেলে ওষুধের কাজ দেবে। এখানে তো স্কচ পাবি না, রয়্যাল চ্যালেঞ্জ অথবা পিটার স্কট বা ওকেন-গ্লো যাই পাস তাই নিবি। Shock কেটে যাবে। মৃত্যুর হাত থেকেই তো বেঁচে এলাম।

মহান্তিবাবু দার্শনিকের মতো বললেন, জীবন আর মৃত্যুর মধ্যে তফাত তো এক চুলের। জন্মের পর থেকেই তো মৃত্যুর হাতে হাত রেখেই আমাদের চলা। আপনি তো তাও বাঘিনীকে গুলি করে জখম হলেন, যুধিষ্ঠির যে হিসি করতে গিয়ে অতর্কিতে অক্কা পেল। আর মৃত্যু কী রকম! ভয়াবহ! ওর আত্মা কি আর মুক্ত হবে? সে নিশ্চয়ই বাঘডুম্বা হয়ে যাবে।

বাঘডুম্বা আবার কী জিনিস?

বাঘডুম্বার নাম শোনেননি?

নাতো। সে কি বাঘমুণ্ডার কোনও জানোয়ার?

মহান্তিবাবু বললেন, বাঘঘডুম্বার সঙ্গে বাঘমুন্ডার কোনও সম্পর্ক নেই। যেসব মানুষে বাঘের হাতে মরে, তারা এক রকমের স্পেশ্যাল ভূত হয়ে যায়। পাখির রূপ ধরে তারা রাতের বেলা ঘুরে বেড়ায়। মাঝে মাঝে ডেকে ওঠে কিরি-কিরি কিরি-কিরি, ধ্রুপ-ধুপ-ধ্রুপ-ধ্রুপ। ওড়িশার কালাহান্ডিতে অনেক বাঘঘডুম্বা আছে। কারণ, সেখানে প্রায় সব বাঘই মানুষখেকো। বাঘমুন্ডার জঙ্গলেও আছে।

কী করে জানলেন?

ঋজুদা জিজ্ঞেস করল।

আমি একবার বিকেল-বিকেল ট্রাক ড্রাইভারের মুখে আমার স্ত্রীর ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়া হয়েছে খবর পেয়ে পট্টনায়েকবাবুর জিপ নিয়ে ড্রাইভারের সঙ্গে রাতের বেলা ঢেনকানলে যাচ্ছিলাম। এইট্টি সেভেনের এপ্রিল মাসে। বাঘমুন্ডার জঙ্গলে রাতে ট্রাক ড্রাইভাররাও হাতির ভয়ে ট্রাক চালায় না। দিনের আলো থাকতে থাকতে আসে আবার দিনের আলো ফুটলেই রওনা দেয় কটকের দিকে। বাঘমুন্ডা বন-বাংলোর কাছেই আমাদের ক্যাম্প পড়েছিল সেবারে। বাংলোর হাতাতে যে কুয়ো আছে, সেখান থেকেই খাবার জল আসত আমাদের, চান, কাপড় কাঁচা সবই ওই কুয়োতেই হত। ক্যাম্প থেকে গভীর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে জিপ চলছে, গরমের দিন, জঙ্গল ফাঁকা ফাঁকা হয়ে গেছে, আগাছা একেবারেই নেই। একটা বাঁক নিয়েছিল রাস্তাটা। প্রায় সমকৌণিক বাঁক। এবং সেই বাঁকের মুখেই হাতির দলের সঙ্গে মোলাকাত হয় বলে ড্রাইভার অমরিক সিং খুব সাবধানে বাঁকটা ঘুরল গতি কমিয়ে যাতে হাতির পেটে গিয়ে গুঁতো না মারে। কিন্তু বাঁক নিতেই দেখি হাতি-টাতি নেই। পথের উপরে নাইটজার পাখির একজোড়া চোখ লাল আগুনের গোলার মতো দপ করে জ্বলে উঠল। ওই পাখিগুলো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ওড়ে না, জিপ যখন তাদের ঘাড়ে গিয়ে পড়ে তখন সোজা উপরে উঠে যায়, এমনভাবে যায়, যেন মনে হয় বনেট ফুড়েই উঠল। পাখিটা উড়ে ওঠামাত্রই বাঁপাশের একটি মিটকুনিয়া গাছের ঝাঁকড়া ডালের আড়াল থেকে বাঘঘডুম্বা ডেকে উঠল কিরি-কিরি-কিরি-কিরি, ধূপ-ধূপ-ধূপ-ধ্বপ! সেই ডাক শুনে তো আমাদের পিলে চমকে গেল। এর চেয়ে হাতির দলের গায়ে ধাক্কা মারাও কম বিপজ্জনক ছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *