ঋজুদার সঙ্গে পুরুণাকোটে – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

ঋজুদা বলল, তিতির তোকে কিন্তু বাংলোতে রেখেই যাব।

কেন?

গোয়েন্দাগিরিতে তুই রুদ্রর চেয়ে অনেক দড়, কিন্তু এইরকম সাংঘাতিক মানুষখেকো বাঘকে পায়ে হেঁটে গিয়ে মারা সত্যিই বড় বিপজ্জনক। ভটকাই এবারে এলে ওকেও নিয়ে যাওয়ার কোনও প্রশ্নই উঠত না। তা ছাড়া, বন্দুক তো মাত্র দুটো। তাও গুলিগুলোর যা চেহারা দেখলাম, সময়-বিশেষে ফুটলে হয়। অন্য একটা ভাল বন্দুক থাকলেও না হয় কথা ছিল। রাগ করিস না। ভুলও বুঝিস না আমাদের। প্লিজ। তুই বাংলোতে বসে বই পড় বা পাখির ডাক শোন। আজ রাতেই দেখতে পাবি সামনের বিস্তীর্ণ ধানখেতে হাতির পাল নামবে এসে বাঘমুণ্ডা আর হাতিগির্জা পাহাড়ের দিক থেকে। ততক্ষণে, আশাকরি আমরাও অক্ষত অবস্থাতে ফিরে এসে তোর পাশে বসে হাতি দেখব।

কখন ফিরবে তোমরা?

তা কী করে বলব?

টর্চ নিয়ে যাও। আর জলের বোতল।

নিয়েছি। তবে দিনে দিনেই ফিরে আসার চেষ্টা করব। অন্ধকারে মানুষখেকো বাঘের সঙ্গে পায়ে হেঁটে মোকাবিলা করার মতো বাহাদুর আমি নই। জিম করবেট তো সকলে নয়।

বলেই বলল, চললাম রে তিতির।

আমি হাত তুললাম তিতিরের দিকে।

তিতির বলল, গুড লাক। গুড হান্টিং।

পট্টনায়েকবাবু একেবারেই ভেঙে পড়েছেন। তিনি পুরুণাকোটের বড় চায়ের দোকানটার সামনের বেঞ্চিতে আধশোওয়া হয়ে বসেছিলেন আর তার সামনে পুরুণাকোটের অনেকেই দাঁড়িয়ে বসে ছিল। ওঁকে সকলেই চিনত এবং ওদের মধ্যে কেউ কেউ ওঁর কাছে কাজও করেছে বিভিন্ন সময়ে। উনি কেবলই বিলাপ করছিলেন: আমি যুধিষ্ঠিরের মাকে গিয়ে কী বলব! এই পোড়া মুখ দেখাব কি করে। মহান্তিবাবু পাশে বসে তাঁকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু সান্ত্বনা কি দেওয়া যায় সদ্য পুত্রহারা বাবাকে? তা ছাড়া যে ছেলের মৃত্যু এমন বীভৎসভাবে হয়েছে, এমন মর্মান্তিকভাবে। বাবারই চোখের সামনে।

পট্টনায়েকবাবুর ড্রাইভারের সঙ্গে স্থানীয় দুজন সাহসী লোক সামনের সিটে বসল। আমি, ঋজুদা আর একনলা গাদা বন্দুকধারী শিকারি, মাঝবয়সি, ফরসা, বেঁটে, যার নাম হট, সেও। ঋজুদা ড্রাইভারকে বলল, তোমরা কেউ গাড়ি থেকে নামবে না।

তাদের কারুরই মুখের ভাব এবং নিঃসাড় অবস্থা দেখে অবশ্য আদৌ মনে হল না যে তারা একজনও গাড়ি থেকে নামবার জন্য ছটফট করছে। বিশেষ করে ড্রাইভার তো নয়ই, গাড়ির পিছনের সিটে বসে যুধিষ্ঠিরের স্বর্গযাত্রা সেও তো চাক্ষুষ করেছিল। যুধিষ্ঠিরের পতনের পর সেই তো গাড়ি চালিয়ে, বিহারে যাকে বলে টিকিয়া উড়ান চালিয়ে রুদ্ধশ্বাসে পুরুণাকোটে এসে পৌঁছেছিল। আধঘণ্টার পথ দশ মিনিটে।

এই ‘টিকিয়া উড়ান’ কথাটা ঋজুদার কাছ থেকেই শেখা। হিন্দি কথা। চালক যখন এত জোরে গাড়ি চালায়, বিশেষ করে জিপ যে, তখন তার টিকিটা মাথার পিছনে হাওয়ার তোড়ে পতাকার মতো খাড়া হয়ে বুনো শুয়োরের লেজের মতো উড়তে থাকে। গাড়ি বা জিপের সেই উদ্দাম গতিকেই বলে ‘টিকিয়া উড়ান।

একটুক্ষণ পরেই ড্রাইভার ক্যাম্পের সামনে আমাদের নামিয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে চলে গেল। গাড়িটার সাইলেন্সার পাইপে ফুটো আছে একটা, ফাস্ট রেসিং-এর ফরমূলা কার-এর মতো কান-ফাটানো আওয়াজ করে চলবার সময়ে। গ্রামাঞ্চলে অনেক গাড়ির মালিকের ধারণা আছে, এত টাকা দিয়ে গাড়িই যখন কিনেছি তখন তা নিঃশব্দেই যদি চলল তা হলে জানান দেওয়া যাবে কী করে যে তিনি গাড়ি চড়ছেন! কিন্তু জঙ্গলের কিছু জানোয়ার, বিশেষ করে হাতি এই ভটভট আওয়াজকে এবং মোটর সাইকেলের আওয়াজকেও বিশেষ অপছন্দ করে এবং অনেক সময়ে রে-রে-রে করে তেড়ে আসে, যেমন আসে শহরের পথের কুকুরও। এই ছিদ্রিত শব্দ তাদের irritate করে, চুলকানির মতো।

পথপাশের একটা বড় কালো পাথরে বসে আমরা যার যার বন্দুক এবং গুলি দেখে নিলাম। ব্রিচ ভেঙে বন্দুকটা লোডও করে নিলাম। ঋজুদার শিক্ষা মতো ডান ব্যারেলে এল জি এবং বাঁ ব্যারেলে বুলেট পুরি শটগানে যদি বন্দুকের ব্যারেলে ‘ডাবল চোক’ থাকে। এই বন্দুক বেলজিয়ান। ১২ বোরের আর ঋজুদারটা অঙ্গুলের ঠিকাদার বিমলবাবুর। ইংলিশ টলি বন্দুক। বন্দুকটার চেহারা ছবি ভাল। যত্নে রাখেন মনে হয়। আমার বন্দুকটার দু ব্যারেলেই ময়লা আছে। শেষবার গুলি ছুঁড়ে আর পরিষ্কার করা হয়নি। ভাল শিকারি ও যত্নবান মানুষে নিজের নিজের বন্দুককে নিজের বউ-এর চেয়েও আদরে রাখেন। এই বন্দুকের মালিক বন্দুকেরই যদি এত অযত্ন করেন তবে বউ-এর কী অযত্নই না করেন! ভেবে শিহরিত হলাম, নিজের বউ না-থাকা সত্ত্বেও।

বুলেট বলতে আমার স্টক-এ একটামাত্র লেথাল বল। ইন্ডিয়ান অর্ডন্যান্স কোম্পানির। আমাদের দেশে বন্দুক ভালই তিৈর হয়, কিন্তু গুলি, বিশেষ করে ছররা গুলির এমনই জারিজুরি যে বুনো হাঁস পর্যন্ত গায়ে লাগলে ডানা ঝেড়ে অত্যন্ত বিরক্তির সঙ্গে ঝুরঝুর করে ফেলে দেয়। এক দানা ছররাও ডানা ভেদ করে শরীরে প্রবেশ করে না। জানি না, এখন হয়তো ইন্ডিয়ান অর্ডন্যান্সের গুলির মান উন্নত হয়েছে। গুলিগুলোতে শ্যাওলা জমে গেছে, ফাঙ্গাস। কে জানে, কত বসন্ত এবং বর্ষার সাক্ষী এরা! পিতলের ঝকঝকে ক্যাপ নীল হয়ে গেছে দীর্ঘদিনের অবহেলায়।

আমি মাঝেমধ্যে দায়ে পড়লে মিথ্যা কথা বলি না এমন নয়। তাই এই–ফোঁটা গুলির বন্দুক হাতে করে হতভাগা বাঘের ভোগে লেগে আমারও সত্যবাদী যুধিষ্ঠির হবার কোনও বাসনা আদৌ ছিল না। কিন্তু কী করা যাবে। এই হাতিয়ার হাতেই যথাসাধ্য করতে হবে। একটা মানুষকে শব বানিয়ে সেই রাক্ষস এখন তাকে খাচ্ছে।

ঋজুদার মুখ দেখে মনে হল সেও এমনই ভাবছিল গুলি লোড করতে করতে। কিন্তু কী আর করা যাবে! নিজেদের হাতের বন্দুক রাইফেল ছাড়া মানুষখেকো বাঘের মোকাবিলা করা সত্যিই বড় অস্বস্তিকর।

আমাদের সঙ্গী মিস্টার হট অথবা হটবাবুর পরনে একটা গেরুয়া খেটো ধুতি। গায়ে একটা ঘোর লাল রঙের গেঞ্জি। তার উপরে ঘোরতর বেগুনে রঙের বিনুনি করা র‍্যাপার। ঋজুদার নিম্নাঙ্গে হালকা ছাইরঙা ফ্লানেলের ট্রাউজার এবং উপরে বিস্কিট রঙের জমির উপরে অতি হালকা সবুজ স্ট্রাইপের ব্লেজার। আমি পরেছি একটা ফিকে নীল জিনস তার উপরে বড় মামিমার বুনে দেওয়া লেমন ইয়ালো রঙা ফুলহাতা পোলো-নেক সোয়েটার, টেনিস খেলার সাদা ফ্রেড-পেরি গেঞ্জির উপরে। শিকারিদের সাজ-পোশাক দেখলে বাঘ এমনিতেই ভিরমি খাবে। গুলি আর করতে হবে না। তা কী আর করা যাবে। এখানে এসে যে মানুষখেকো বাঘের মোকাবিলা করতে হবে তা কে জানত আগে।

হটবাবু লোকটার ভয়ডর একটু কমই আছে। বটুয়া থেকে বের করে সেজে দুটো অখয়েরি গুণ্ডি মোহিনী পান মুখে দিয়ে অনেকখানি গুণ্ডি ফেলে বলল, চলন্তু, জীবা।

অকুস্থলে পৌঁছে হটবাবু পাথরে বসে মনোযাগ সহকারে তার গাদা বন্দুক গাদছিল। তিন আঙুল মতো বারুদ গেদে তারপর সামনে সিসের একটা রেকটাঙ্গুলার তাল (আদৌ গোল নয়) গেদে দিয়ে সে বাঘের বাপের নাম খগেন’ করবে বলে দৃঢ়প্রত্যয় হয়ে রওয়ানা হবে বলে তৈরি যখন হচ্ছে তখন ঋজুদা তার টগবগে উত্তেজনাতে ঠাণ্ডা জল ঢেলে দিয়ে বলল, হটবাবু, আপনি এখানেই থাকুন। এই বড় আমগাছটার উপরের ডালে চড়ে দেখুনতো কিছু দেখতে পাচ্ছেন কি না! আপনি এখানে উচ্চাসনে বসে আমাদের বলতে পারবেন কিছু দেখতে পাচ্ছেন কি না এবং যা দেখতে পাচ্ছেন তা কোথায়?

হটবাবু হতাশ গলাতে বললেন, আমি সঙ্গে যাব না?

ঋজুদা মাথা নেড়ে বলল, না। আপনি এখান থেকে আমাদের ডিরেকশন দিলে ভারী সুবিধা হবে। আপনিই তো হলেন গিয়ে আমাদের ডিরেক্টর। যেমন ডিরেকশন আপনি দেবেন আমরা তেমন তেমন কাজ করব।

আবারও বুঝলাম, মানুষটা সাহসী। বাঘটার টাটকা ক্রিয়াকাণ্ড সম্বন্ধে সব জেনেও আমাদের সঙ্গে যাবার জন্য উন্মুখ।

এই ডিরেক্টর শব্দটা হটবাবুর খুব মনে ধরল।

তিনি বললেন, ঠিক আছে। আপনি যেমন বলবেন, তেমনই হবে। বলেই, তিনি বড় আমগাছটাতে ওঠার তোড়জোড় শুরু করলেন। ঋজুদা বলল, আপনি উঠে গেলে তবেই আমরা এগোব।

আচ্ছা। উনি বললেন।

ঋজুদা বলল, আমরা এই গাছের নীচে এসে আপনাকে আওয়াজ দিলে তখনই তাড়াতাড়ি নেমে আসবেন। আর আমরা না-আসা পর্যন্ত এই গাছ থেকে একেবারেই নামবেন না। বুঝেছেন? একেবারেই নয়। এই বাঘটা কিন্তু মহাধূর্ত।

আইজ্ঞাঁ।

মনমরা হয়ে বললেন, হটবাবু।

আমরা দুজনে আগে পরে সিংগল ফরমেশানে এগিয়ে যেতে যেতে যেখানে বাঘটা যুধিষ্ঠিরের ঘাড়ে লাফিয়ে পড়ে তার টুটি কামড়ে তাকে হেঁচড়ে টেনে নিয়ে গেছে সেখানে মনোযোগ দিয়ে পথের লাল ধুলোর উপরে বাঘের থাবার দাগ ভাল করে লক্ষ করলাম।

আমি বললাম, ঋজুদা, এ তো বাঘিনী!

হু। তাতে কী হয়েছে! বাঘ হলেও মানুষখেকো, বাঘিনী হলেও তাই।

ঋজুদা পাইপটার ছাই ঝেড়ে বুক পকেটে ঢুকিয়ে দিয়ে বলল।

তারপরে নিচু গলায় বলল, আরও একটু গিয়ে আমরা ব্রাঞ্চ-আউট করে যাব। বুঝেছিস। তুই যদি আগে দেখতে পাস তা হলে আমার জন্য এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে সঙ্গে সঙ্গে গুলি করবি। আমি যদি কাছাকাছি থাকি তবে হাতের ইশারাতে বলবি বাঘ কোনদিকে গেল, মানে, যদি এক গুলিতে না পড়ে। তবে একদমই হড়বড় করবি না। বড় বাঘিনী, তার উপর ধূর্ত মানুষখেকো। ভাইটাল জায়গাতে গুলি করবি। রেঞ্জ-এর বাইরে গুলি মোটেই করবি না। যত কাছ থেকে করতে পারিস ততই ভাল। বন্দুক ও গুলি কোনওটার উপরেই তো ভরসা নেই। দুই-ই তো পরস্মৈপদী। আমি যদি আগে দেখতে পাই তো আমিও গুলি করব। এই সুযোগ নষ্ট হলে সাত দিনের মধ্যে আর হয়তো সুযোগ পাওয়াই যাবে না। বুঝেছিস। তোদের তো ঘুরিয়ে সব জায়গা দেখাতেও হবে, যেজন্য এবারে আসা!

হুঁ। আমি বললাম।

তারপর যতদূর ড্র্যাগ-মার্ক আছে, রক্তের দাগ আছে ততদূর আমরা আগে-পিছে করে এগোতে থাকলাম। ড্র্যাগ-মার্ক দেখে বোঝা গেল যে, বাঘটা যুধিষ্ঠিরকে নিয়ে পথের ডানদিক থেকে পথ পেরিয়ে বাঁদিকের জঙ্গলে গেছে। প্রায় সমকোণে। তার মানে নন্দিনী নালার দিকেই নিয়ে গেছে লাশ। সেই পথে খাওয়া সেরে, জল খেয়ে বনের গভীরে কোথাও রোদের মধ্যে আরামে ঘুমোবে।

এখন নালার এপাশেই আছে না, নালা পেরিয়ে ওপাশে গেছে, তা দেখতে। হবে। যা শীত! দশটা বাজে কিন্তু এখনও জমির উপরের শিশির-ভেজা ঘাস ও ঝোপঝাড়ের পাতা পুরোপুরি শুকোয়নি। বড় গাছের পাতাগুলো অনেক বেশি রোদ পায়। তারা প্রায় শুকিয়ে এসেছে। একটা মস্ত কুচিলা গাছে বসে অনেকগুলো বড়কি ধনেশ হ্যাঁক-হ্যাঁক, হক্ক-হক্ক করছে। ভারী কর্কশ ডাক এই পাখিগুলোর।

পথের লাল ধুলোতে লাশ হেঁচড়ে টেনে নিয়ে যাওয়ার দাগ এবং রক্ত পড়েছিল। তখনও রক্ত শুকোয়নি। তখনও দুজনে এক সঙ্গেই এবং কাছাকাছিও ছিলাম। যখন বাঘের বা লাশের চিহ্ন আর খুঁজে পাওয়া যাবে না তখনই আমরা আলাদা হয়ে যাব দুদিকে। এমনই ঠিক ছিল।

বনের গভীর থেকে ময়ূর ডাকছে। দুটো কুম্ভাটুয়া পাখি, ইংরেজিতে যাদের নাম Crow Pheasant, বাদামি আর কালো, বড় লেজ-এর গুব-গুব-গুব-গুব করে ডেকে বনের আনোছায়ার রহস্যময়তা আরও যেন বাড়িয়ে দিচ্ছে। রাতের বেলা। এদের ডাক শুনলে বুক দুরদুর করে। কেন কে জানে! কপারস্মিথ পাখি ডাকছে। টাকু-টাকু-টাকু-টাকু করে। আর তার দোসর সাড়া দিচ্ছে নন্দিনী নালার ওপার থেকে। শীতের সকালের মন্থর হাওয়াতে বাঁশবনে নিচুগ্রামে স্বগতোক্তির মতো কটকটি আওয়াজ উঠছে। বাঁশের গায়ের হলুদ আর পেঁয়াজখসি রঙের হালকা, মসৃণ ফিনফিনে খোলস উড়ছে ঝিরিঝিরি করে বয়ে-যাওয়া ঠাণ্ডা হাওয়ায়। চারিদিকে সবুজের সে কী সমারোহ! সবুজ যে কত রকমের হতে পারে তা জানতে হলে আমাদের দেশে নয়তো পশ্চিম আফ্রিকাতে যেতে হয়। পরতের পর পরত, গাঢ় থেকে ফিকে, ফিকে থেকে গাঢ়, কত বিভিন্ন ছায়ার সবুজ যে আছে। এখানে।

আমরা নালার পারে এসে দাঁড়ালাম। বাঘিনী লাশটাকে নিয়ে প্রস্তরময় এবং বালুময় নন্দিনী নালা পেরিয়ে ওপারে চলে গেছে। নানা পাথরের উপরে এবং বালিতে রক্তের দাগের সঙ্গে যুধিষ্ঠিরকে হেঁচড়ে টেনে নিয়ে যাওয়ার দাগ আর বাঘিনীর থাবার দাগ। বালির উপরে যুধিষ্ঠিরের রক্তমাখা ধুতি, পাঞ্জাবি, আন্ডারওয়্যার এবং আলোয়ান বিভিন্ন জায়গাতে, আগে-পরে ফালাফালা হয়ে ইতস্তত ছড়িয়ে আছে। চটি-জোড়া অবশ্য যেখানে বাঘ তার ঘাড়ে পড়েছিল সেখানেই উল্টে পড়েছিল। নদীর ওপারের কোনও নিভৃত জায়গাতে নিয়ে গিয়ে সে খাচ্ছে যুধিষ্ঠিরকে অথবা খেয়েছে অথবা ফেলে চলে গেছে জঙ্গলের গভীরে কোথাও গাছ-গাছালির চন্দ্রাতপের নীচে লাশটাকে, শকুনের চোখের থেকে আড়াল করে, পরে এসে খাবে বলে।

এমন সময়ে, হঠাৎ ঋজুদা একটা শিস দিল। বুলবুলির শিস-এর মতো।

ঋজুদার চোখকে অনুসরণ করে দেখলাম যে বাঘিনীর থাবার দাগ। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেখান থেকে কিছুটা বাঁদিকেই নদীর বালির উপরে।

বাঘিনী কি নদী পেরিয়ে বাঁদিক দিয়ে উঠে এপারে এসেছে লাশ ফেলে রেখে? বালির উপরে দাগগুলো ধেবড়ে রয়েছে। তার মানে, খুব তাড়াতাড়ি হেঁটে এসেছে সে।

কতক্ষণ আগে নদীটা পেরিয়ে এদিকে এসেছে তা কে জানে। আমাদের গাড়ির শব্দ শুনে বা আমাদের কথাবার্তা শুনেই কি সে কী ব্যাপার’ তা দেখতে এসেছে? নাকি, তাকে আমরা অনুসরণ করে এখানে এসে পৌঁছবার একটু আগেই নদী পেরিয়ে এদিকে এসেছে। গাড়ির আওয়াজ এবং আমাদের এখানে আসার শব্দ পেয়ে অন্য বাঘ হলে তার বনের আরও গভীরের নিরাপত্তাতে চলে যাওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল লাশ নিয়ে অথবা না-নিয়েই, কিন্তু সে না পালিয়ে, আবারও এপারেই এসেছে। আমাদের বেয়াদবির উচিত শিক্ষা দেবার জন্যেই কি? না, নিছক ঔৎসুক্যরই কারণে?

সুন্দরবনের মানুষখেকোরাও নাকি এরকম। মানুষের ভয় তাদের চলে গেছে। পারে নৌকো ভিড়লে, এমনকী বনবিভাগের দেওয়া আছাড়ি পটকার শব্দ শুনলেও, তারা পালিয়ে না গিয়ে, সেই শব্দর কাছে আসে, সুযোগ খোঁজে, মানুষ ধরার। বাঘের মতো তীব্র ঔৎসুক্য খুব কম প্রাণীরই আছে। ঋজুদা বলে ‘inquis itivness’-ই হচ্ছে শিক্ষিত মানুষের লক্ষণ। এই জন্যই বাঘকে ঋজুদা খুবই জ্ঞানী বিবেচনা করে। পৃথিবীর সব চাইতে সাহসী প্রাণী হিসাবে তো করেই।

খবরের কাগজের ভাষায় যাকে বলে কিংকর্তব্যবিমূঢ়, তাই হয়ে আমরা দুজনে যখন সিচুয়েশনটা সাইজ-আপ করছি ঠিক সেই সময়েই পট্টনায়েকবাবুর পুরনো ক্যাম্পের দিক থেকে গদ্দাম করে একটা গুলির আওয়াজ হল। বন্দুকের গুলি তো ফুটল না, যেন গাঁঠিয়া ফুটল। সে আওয়াজে মেদিনী কম্পমান হল। এবং সঙ্গে সঙ্গে হটবাবুর গলা ফাটানো চিৎকার শোনা গেল, স্যর। স্যর। সে বাঘ সে পাখের গন্ধা। সাবধান! সাবধান!

গুলির আওয়াজ এবং হটবাবুর চিৎকার শুনে আমরা দুজনে দুপাশে সরে গিয়ে পজিশন নিলাম বসে পড়ে। ঋজুদা আমাদের পিছনের রাস্তা এবং পাশের জঙ্গলে চোখ রাখল আর আমি নদীর দিকে।

পট্টনায়েকবাবুর পুরনো ক্যাম্পটা থেকে আমরা বড়জোর পাঁচশো গজ এসেছি। হটবাবুর গুলি খেয়ে অথবা না-খেয়ে বাঘের আমাদের কাছে পৌঁছতে অতি সামান্য সময়ই লাগার কথা। অথচ বনে অথবা নদীতে কোনওই শব্দ নেই।

গুলির শব্দ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দূর থেকে অগণ্য হনুমান হুপ-হুঁপ-হুঁপ করে উঠেছিল। অসংখ্য অদৃশ্য পাখি উত্তেজিত হয়ে ডালে ডালে নাচানাচি করতে করতে ডাকছিল। কিন্তু তাদের কলরবও এখন থেমে গেছে পুরোপুরি। এখন মৃত্যুর নৈঃশব্দ্য চারদিকে। নন্দিনী নালার জলের চলার শব্দই শুধুই ছিদ্রিত করছে দিনমানের সেই ভৌতিক গা-ছমছম নিস্তব্ধতাকে।

এমন সময়ে হঠাৎই জলে একটা ছপছপ শব্দ শুনতে পেলাম। শব্দটা এল ঋজুদা যেদিকে ছিল, সেই বাঁদিক থেকেই। নন্দিনী নালা সেখানে একটা ঠিক পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি বাঁক নিয়েছিল।

আমি যেখানে ছিলাম সেখান থেকে নদীর ওপাশটা দেখতে পাচ্ছিলাম না। ছপছপ শব্দ শোনার সঙ্গে সঙ্গেই ঋজুদা দ্রুত নদীর দিকে এগিয়ে গিয়ে Prone Position-এ আগাছা-টাগাছার উপরেই শুয়ে পড়ল। তাতে যে শব্দ হল তা নিশ্চয়ই বাঘের অতি-সজাগ কান এড়াল না। তারপর…।

বন্দুকটাকে সোজা করে ঋজুদা চকিতে নিশানা নিয়ে গুলি করল।

কী হল বোঝা গেল না। ততক্ষণে আমিও ঋজুদার দিকে দৌড়ে গেছি। কিন্তু ঋজুদা, আমি পৌঁছবার আগেই স্লিপ খাবার মতো করে নদীর বুকে নেমে পড়েছে। তাকিয়ে দেখি, বাঘিনী, দুটো পাথরের মাঝে নদীর জলে পড়ে রয়েছে এবং তার শরীরের রক্ত নদীর বহমান জলকে ধীরে ধীরে গোলাপি করে দিয়ে বইছে।

ভাবলাম, তাহলে হটবাবুর কামানের গুলি কি ফসকে গেল? ঋজুদার গুলিই লাগল এখন? ঋজুদা, জল, বালি ও পাথর এক এক লাফে টপকে-টপকে বাঘিনীর দিকে এগোচ্ছিল। উদ্দেশ্য, বাঘের খুব কাছে গিয়ে তাকে আবার গুলি করা। আমিও ঋজুদার পিছন পিছন ছুট লাগালাম। বাঘিনী থেকে যখন হাত কুড়ি দূরে তখন ঋজুদা দাঁড়িয়ে পড়ে বাঁদিকের ব্যারেল ফায়ার করল। কিন্তু গুলি ফুটল না। যে বাঘিনী মরে গিয়েছিল ভেবেছিলাম, সে-ই মুহূর্তের মধ্যে ছিলা-ছেঁড়া ধনুকের মতো ছিটকে উঠে, উড়ে এল ঋজুদার উপরে। আমি ঋজুদার হাত দুয়েক ডানদিকে ছিলাম এবং হাত পাঁচেক পিছনে। বন্দুক তুলে বাঘিনীর লাফানোর সঙ্গে সঙ্গে আমি ডানদিকের ব্যারেল ফায়ার করলাম উড়ন্ত বাঘের গলা লক্ষ্য করে। ডানদিকের ব্যারেলে ভাগ্যিস এল জি. পুরেছিলাম। এল জি-র বড় বড় দানাগুলো তার গলাতে ও ঘাড়ে প্রচণ্ড ধাক্কা দিল।

শর্ট-রেঞ্জে শটগানের মতো কার্যকরী আর কিছুই নয়। হাই-ভেলোসিটি রাইফেলের গুলি বাঘের শরীর এফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়ে চলে যায় বটে, কিন্তু তার আগে বাঘও সহজে মেরে দিয়ে যেতে পারে শিকারিকে। শর্ট-ডিসট্যান্সে, রাইফেলের গুলি কিন্তু ধাক্কা দিয়ে আহত বিপজ্জনক জানোয়ারকে উলটে ফেলে দিতে পারে না। বন্দুকের গুলি পারে।

এত করেও ঋজুদাকে বাঘিনীর হাত থেকে বাঁচাতে পারলাম না। দু’হাত আর দু’পা প্রসারিত করে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড নখ ছড়িয়ে বাঘিনীটা ঋজুদার উপরে এসে পড়ল। বন্দুকের গুলির স্টপিং-পাওয়ার short-range-এ সত্যিই মারাত্মক। তাই বাঘিনী তার শরীরের কয়েকমণ ওজন নিয়ে ঋজুদার বুকে পড়ে তাকে আহত করল বটে কিন্তু তার দম ফুরিয়ে এসেছিল তখন। শুধু গতিজাড্যতেই তার শরীরটা এসে পড়েছিল ঋজুদার উপরে, তার আক্রমণে জোর ছিল না একটুও। বাঘিনী, ঋজুদাকে বালি আর জলের মধ্যে ধাক্কা দিয়ে ফেলে নিজেও বালির মধ্যেই পড়ে গেল। ঋজুদার গা ঘেঁষে।

আমি কোনও ঝুঁকি না নিয়ে দৌড়ে গিয়ে তার বাঁ কানের ফুটোর কাছে ব্যারেল ঠেকিয়ে বাঁদিকের ব্যারেল ফায়ার করলাম। খট করে একটা শব্দ হল। কিন্তু গুলি ফুটল না।

কিন্তু বাঘিনী তখন স্বর্গলাভের জন্য ব্যাকুল। কানের কাছে সেই খট শব্দেই সে চোখ দুটো বন্ধ করে মাথাটা এলিয়ে দিল। এমনই ভাবে এলাল। যেন ঋজুদাকে কোল বালিশ করেই শুতে চায়।

ইতিমধ্যে ক্যাম্পের দিক থেকে গদ্দাম করে আরেকটা আওয়াজ হল হটবাবুর গাদা বন্দুকের। সে আওয়াজ পুরুণাকোট অবধি পৌঁছবার দরকার ছিল না। তার আগেই আগেপিছে পরপর তিনটা গুলির আওয়াজে পট্টনায়েকবাবু এবং মহান্তিবাবু নিজেরাই গাড়িতে বসে ড্রাইভারকে এবং অন্য একজনকে নিয়ে জোরে গাড়ি চালিয়ে ক্যাম্পের কাছে এসে পৌঁছেছিলেন। পৌঁছেই হটবাবুর কাছে ফাস্ট ইনফরমেশন রিপোর্ট নিয়ে গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন পুরুণাকোট থেকে সকলকে আসার জন্য খবর দিতে।

ঋজুদার সমস্ত শরীর রক্তে ভিজে যাচ্ছিল। তবু উঠে বসে ডান হাত দিয়ে ডান কানে হাত দিয়ে বলল, এই কান ধরলাম, আর কোনওদিন অচেনা বন্দুক আর অচেনা গুলিতে এ জীবনে শিকার করব না। ভাগ্যিস তোর গুলিটা ফুটেছিল নইলে আমাকে বাঘিনী ছিঁড়ে খুঁড়ে দিত।

তোমার কিন্তু আসলে হয়নি কিছুই। নখও তেমন ঢোকেনি ভিতরে। তোমার মোটা টুইডের কোটটা খুব কাজে দিয়েছে।

তা ঠিক। আঘাত গুরুতর নয় অবশ্যই। কিন্তু তবু কথায় বলে, বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা।

তুমি নিজে হেঁটে যেতে পারবে?

আমি ঋজুদাকে জিজ্ঞেস করলাম।

তারপর স্বগতোক্তি করলাম, রক্ত যাতে বন্ধ হয় তার জন্য কিছু করতে হবে।

মনে হয় তো পারব। তবে একটা shock তো হয়েছেই। দাঁড়া। পাথরে হেলান দিয়ে বসে পাইপটা ধরাই।

ইতিমধ্যে হটবাবুর সঙ্গে পট্টনায়েকবাবু, মহান্তিবাবু আর পট্টনায়েক বাবুর ড্রাইভার লাফাতে লাফাতে নদীর মধ্যে নেমে এলেন।

পট্টনায়েকবাবু বললেন, আমার ছেলের খুনের বদলা নিতে গিয়ে আপনি নিজের প্রাণটাই দিয়ে বসেছিলেন ঋজুবাবু। কী করে যে কৃতজ্ঞতা জানাব। বলেই কেঁদে ফেললেন ঝরঝর করে।

মহান্তিবাবু নদীর পারে ফোঁটা জংলি গ্যাঁদার পাতা কোঁচড় ভরে ছিঁড়ে এনে দুহাতে কচলে কচলে তার রস নিংড়ে ফেলতে লাগলেন ঋজুদার ক্ষতগুলির উপরে।

ঋজুদা রাগের গলাতে পট্টনায়েকবাবুকে বললেন, এই গুলিগুলো কার কাছ থেকে এনে দিয়েছিলেন। তাকে আমি গুলি করে মারব। খুনের দায় বাঘিনীর নয়, সেই দায়িত্বজ্ঞানহীন লোকেরই।

আমি হটবাবুকে বললাম, কোথায় গুলি করেছিলেন আপনি বাঘের শরীরের? বাঘটা এল কোন দিক থেকে?

তা কী আমি জানি! আপনারা চলে যেতেই দেখি বাঘটা ক্যাম্পে মহান্তিবাবুর ঘর থেকে বেরিয়ে পথে পড়ে আপনাদের দিকে গুঁড়ি মেরে এগোচ্ছে। গাছের ওপরে যে তার যম বসে আছে তা তো সে দেখেনি।

হটবাবু তারপরে বললেন, তার মানে, আমরা যখন এখানে কথাবার্তা বলছিলাম বাঘ তখনি নদী পেরিয়ে এসে মহান্তিবাবুর ঘরে চোখের আড়ালে ঢুকে পড়েছিল। কে জানে! হয়তো মহান্তিবাবুর গড়গড়া টানতে এসেছিল।

আমি বললাম, বাঘ নয়, বাঘিনী।

উনি বললেন, ওই হল। ডোরাকাটা তো!

তারপর?

তারপর কী? আমি দেখলাম হারামজাদি তো এবারে আপনাদের একজনকে ধরবার তালে আছে। তাই আর কালবিলম্ব না করে দেগে দিলাম আমার একনলি গাদা বন্দুক তার শিরদাঁড়া লক্ষ করে।

গুলিটা সম্ভবত শিরদাঁড়াতে না লেগে পাশে লেগেছিল।

শিরদাঁড়াতে লাগলে ওইখানেই চিৎপটাং হত। দেখো, একশো গ্রামেরও বেশি সিসে দিয়ে তালের বড়ার সাইজের বল বানিয়ে ছিলাম। আমার বন্দুকের নল সেই প্রায় চারকোনা বল-এর বলে ফেটে যায়নি এই বাঁচোয়া। কিন্তু বাঘিনী বিলক্ষণ বুঝেছে হটকুমার দাস-এর মার কী জিনিস। তার জ্ঞাতি-গোষ্ঠী কেউ কখনও আমার সামনে এ জীবনে আসবে না। মাটিতে বসে পড়েছিল গুলি খেয়েই। তারপর হাঁচোড়-পাঁচোড় করে কোনওক্রমে উঠেই নদী বলে ভোঁ দৌড়। দোনলা বন্দুক আমার কাছে থাকলে পথেই ওকে থাকতে হত।

দোনলা বন্দুক থাকলে কী হত? গুলিই তো ফোটে না! তা ছাড়া এতই যদি আপনার আত্মবিশ্বাস তো এতদিনে বাঘিনীকে মারলেন না কেন?ন’নটা, ন’টা কেন যুধিষ্ঠিরকে নিয়ে দশজন মানুষ খেল!

হটবাবু কথা ঘুরিয়ে বলেন, ওই বটকেষ্ট দাস অমনই। মহা কেপ্পন। তা ছাড়া ও তো মারে চুরি করে হরিণ কুটরাই। বাঘের সামনে গেছে কখনও? ধুতি হলুদ হয়ে যাবে না!

তারপর বললেন, আমি এমনি চিতা বা বড় বাঘও মেরেছি কিন্তু এই মানুষখেকোর হরকৎ দেখে আমার রক্ত ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল। আপনারা এসে বল দিলেন। তাই বল পেয়ে বন্দুকে বল দেগে সঙ্গে এলাম। একা আমার সাহসে কুলোত না। আমিও ফাইটার কিন্তু আমার একজন ক্যাপটেন লাগে। ক্যাপটেন ছাড়া আমি অচল।

একটু পরে পট্টনায়েকবাবুর গাড়ির পিছনে পিছনে জিপ চালিয়ে তিতিরও এসে গেল।

ঋজুদা তিতিরকে দেখে উঠতে গিয়েই পড়ে গেল। কে জানে! কী ধরনের আঘাত হয়েছে। হার্ট কী লাংস-এ বাঘিনীর নখ ঢুকে গেল না তো? বাঁ কাঁধ আর বাহুর সংযোগস্থলে বেশ ভালই জখম হয়েছে বোঝা গেল। বাঁ হাত তুলতে বা নাড়াতে পারছিল না।

মহান্তিবাবুর নেতৃত্বে একদল নদী পেরিয়ে গেল যুধিষ্ঠিরের লাশের যা অবশিষ্ট আছে, তা খুঁজে আনতে। আরেক দল বাঘকে বয়ে নিয়ে যাবার জন্য কাঠ কেটে দোলার মতো বানাতে লাগল বুনো লতা বেঁধে বেঁধে। আর অন্য একদল তাড়াতাড়ি একটা বাঁশের চালি বানাল। যেমন চালিতে করে মৃত মানুষকে ইলেকট্রিক চুল্লিতে ঢোকানো হয়। সেই চালিতে করে ঋজুদাকে জিপ অবধি বয়ে নিয়ে যাবে তারা। মানুষটা তো আর রোগা পটকা নয়। আমাদের ঋজুদাও তো বাঘই।

বাঁশের চালিটা দেখে আমার মন খারাপ হয়ে গেল। তিতির আমার চোখের দিকে তাকাল। আমি ওর চোখের দিকে।

তিতির এসে ঋজুদাকে ধরল, আমি অন্য দিকে। তিতির তার লালরঙা সিল্কের স্কার্ফটা, যেটা ও মাথায় বেঁধে বসে থাকে জিপে যাওয়া-আসার সময়ে এবং যার উপরে হলুদ আর লাল ফুল ফুল প্রিন্টের কাপড়ের টুপিটা পরে উড়ন্ত চুলকে বশ করার জন্য, সেটা ঋজুদার বাঁ কাঁধে জড়িয়ে দিল। রক্তের লাল আর স্কার্ফের লাল মিশে গেল।

হঠাৎ ঋজুদা থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। বলল, শীত করছে কেন রে আমার?

আমার ভীষণই ভয় করতে লাগল।

ঋজুদাকে তুলে নদী ধরে ওরা ক্যাম্প বরাবর চলতে লাগল যাতে পথে উঠতে সুবিধা হয়। ক্যাম্পের কাছে ঘাট মতো করা ছিল। যত কাবাড়ি চান করত, খাবার জল রান্নার জল সব নিত তো ওই ঘাট দিয়ে নেমে নদী থেকেই।

এমন সময়ে পট্টনায়েকবাবু দৌড়ে চলে গেলেন তাঁর গাড়ির দিকে। ঋজুদাকে আমরা সকলে মিলে ক্যাম্পের সামনের ফাঁকা জায়গাতে যখন উঠিয়ে আনলাম তখন পট্টনায়েকবাবু একটা বোতল নিয়ে দৌড়ে এলেন। দেখলাম গায়ে লেখা আছে Doctor’s Brandy। ঋজুদার ক্ষতস্থানগুলোতে একটু একটু করে ঢেলে দিলেন পট্টনায়েকবাবু। তারপর বোতলটা ঋজুদার হাতে দিয়ে বললেন, ওষুধ। একটু একটু করে খান ঋজুবাবু।

তারপরই হটবাবু অবিশ্বাস্য কাজ করলেন। হাঁক পাড়লেন, হাড়িবন্ধু। হাড়িবন্ধু কুয়ারে গন্ধে?

হাঁ আইজ্ঞাঁ। বলেই এক বিকটদর্শন সাড়ে ছ’ফিট লম্বা দৈত্যপ্রমাণ মানুষ–তার নাক নেই, যেখানে নাক থাকার কথা সেখানে বিরাট দুটি ফুটো–এসে দাঁড়াল। বুঝলাম, ভালুকে তার নাক খুবলে নিয়েছে। নীচের ঠোঁটেরও কিছুটা। হটবাবু আমাদের সকলকে সরে যেতে বললেন দূরে, তারপর হাড়িবন্ধুকে বললেন, ভালো করি কি বাবুকি সব্ব ক্ষতেরে মুত্বি পকা।

আমরা সরে যেতেই হতভম্ব ঋজুদাকে আরও হতভম্ব করে সেই বিশালাকৃতি হাড়িবন্ধু তার বিশালাকৃতি প্রত্যঙ্গটি বের করে লাজ-লজ্জার মাথা খেয়ে ঋজুদার সর্বাঙ্গে হিসি করতে লাগল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে। যেন বাগানে জল দিচ্ছে। তিতির দূরে গিয়ে অন্যদিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে রইল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *