ঋজুদার সঙ্গে ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জে – বুদ্ধদেব গুহ
রাবড়ি আনিসনি? পরোটার সঙ্গে কেমন জমত বলত?
ভটকাই বলল!
এনেছি।
এনেছিস। কোথায়?
ফ্রিজে আছে।
বের করতে বল, বের করতে বল। কিষুণকেও দিতে বলিস।
ঋজুদা বলল।
পাতলা পাতলা পরোটা, মুচমুচে করে ভাজা, বেগুন ভাজা, মেটে চচ্চড়ি, লেবু আর বড়কা বড়কা লঙ্কার আচার আর রাবড়ি–একেবারে জমে যাবে।
হ্যাঁ। ভাল করে খেয়ে নে। নো লাঞ্চ আজকে। রাতে মোহনের কাছে ডিনার। কী খাবি? মিষ্টি পোলাউ আর মুরগির মাংস, না বিরিয়ানি, না লিট্টি? ফোন তো ঠিকই হয়ে গেছে। মোহনকে ফোন করে দিচ্ছি।
লিট্টিটা আবার কেন? কাল রাতে তো শুয়োরের ভিণ্ডালু না গিন্ডালু খেলে। লিট্টি আবার কীসের মাংসে তৈরি হয়? সজারু না শেয়াল?
না, না লিট্টি ছাতু দিয়ে তৈরি হয়। তবে ডেলিকেসি। খেয়ে দেখতে পারিস। গাওয়া ঘিতে চুবিয়ে চুবিয়ে খেতে হয়, সঙ্গে আলুর ঝাল-তরকারি, লেবুর আচার আর ডালটনগঞ্জের জেলহাতার ঝুমরুর দোকানের রাবড়ি।
আঃ, আঃ, আঃ: আর বোলো না। আনন্দে আমি মরেই যাব। মহুয়া-মিলনে, রিচুঘুটা, হেহেগাড়া তারপর আবার রাবড়ি।
তারপরই ভটকাই বলল, চল রুদ্র। আমি আর তুই একটা মিষ্টি আর নোন্তার দোকান খুলি। ঋজুদা তো আজকাল খুনি ধরে ধরে ছেড়ে দিচ্ছে। আমার মেজমামা যেমন মিরগেল মাছ ধরে আর ছাড়ে। বলে, আহা কেষ্টর জীব। তাই আমাদের গোয়েন্দাগিরি আর অ্যাডভেঞ্চারের ভবিষ্যৎ খুবই খারাপ।
ভাবলাম, এখুনি দেবে ঋজুদা ভটকাইকে।
কিন্তু ঋজুদা ঠাণ্ডা গলাতে টোস্ট-এ মাখন লাগাবারই মতো স্নেহ মাখিয়ে বলল, জানি যে, তোরা খুবই অবাক হয়েছিস। তবে ওসব নিয়ে এখানে আর কোনও আলোচনা নয়। ট্রেনে ডালটনগঞ্জ যেতে যেতে সব বলব।
তারপর বলল, তোরা কী খাবি ভেবে বল। মানে, রাতে। সেই মতো ফোন করে দেব মোহনকে। আর ব্রেকফাস্ট সেরে মালপত্রগুলো গাড়িতে তোল কিযুণের সঙ্গে। কিষুণকে রাবড়ি পাঠালি? না, নিজেই সব মেরে দিলি। কীরে ভটকাই?
এই তো পাঠাচ্ছি। খায় সবাই, বদনাম হয় শুধু আমার। মকবুল মিঞা জলদি আও। ড্রাইভারবাবুর জন্যে রাবড়ি লে যাও।
কী খাবি বলবি তো তিতির।
লিট্টি। লিট্টি। লিট্টি। ভটকাই বলল, আগে কখনও খাইনি।
ঋজুদা ফোন করতে গেল অফিস ঘরে। তারপরই ঋজুদার গলা শুনতে পেলাম।
হ্যাঁ। কে? মোহন? নেই? কোথায় গেল? রাংকাতে? সে কী, এই তো শুনলাম শরীর খুব খারাপ। ব্লাডসুগার খুব বেড়েছে? কথা না শুনলে জোর করো। তোমরা আছ কী করতে। আচ্ছা নিমাই, একটু রমেনদাকে দাও তো।
বলো, রমেনদা কেমন আছ? না, না কলকাতা থেকে নয়, ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জ থেকে বলছি। হ্যাঁ। একটু কাজে এসেছিলাম। বাবলু কেমন আছ? শোনো, আমরা ট্রেনে ডালটনগঞ্জ পৌঁছচ্ছি। আজই। চারজন। আপ চৌপান এক্সপ্রেস-এ। সেটা এগারোটা নাগাদ আসবে এখানে। স্টেশনে একটা গাড়ি পাঠিয়ো।
কে? হ্যাঁ আছে তো৷ কিষুণ গাড়ি নিয়েই যাচ্ছে। আমরা ট্রেনে যাব। ও যদি ট্রেনের আগে পৌঁছয় তো ওকেই পাঠাতে পার। নইলে অন্য কোনও ড্রাইভারকে পাঠিয়ো।
আর শোনো, রাতে আমার সৈন্যদল লিটি খেতে চায়। জুম্মান আছে তো?
নেই? কাল আসবে?
তো লালটু পাণ্ডে আর গিরধারীদেরই বোলো। কাল জুম্মান এসে না হয় পোলাও-মাংসই খাওয়াবে। ঠিক আছে। মোহন রাতেই তো ফিরবে? তবে আর কী? ভাগ্যকে খবর দিয়ে একটা। আরে! ভাগ্য কটা আছে ওখানে? অধিকাংশই। তো হতভাগ্য। পেট্রল পাম্পের মালিক ভাগ্যধর দাস।
ঠিক আছে। ছাড়ছি।
.
আমাদের স্টেশনে পৌঁছে দিয়ে কিষুণ গাড়ি নিয়ে চলে গেল।
ট্রেনটা প্রায় আধঘণ্টা লেট ছিল। আমাদের দেখেই মাজিদ দৌড়ে এল। চা খাব নাকি জিজ্ঞেস করল। টোড়ির স্টেশন মাস্টার কোনও কাজে এসেছিলেন এখানে। তিনি ঋজুদাকে চিনতেন। তিনি এসে অনেক গল্প-টল্প করলেন। পুরনো দিনের কথা। উনি নাকি আগে চিপাদোহরের এ এস এম ছিলেন।
ট্রেনে যারা এল বারকাকানা বা খিলাড়ি থেকে, তাদের কেউই টিকিট কেটেছে বলে মনে হল না। তবে দু-একজন দয়াপরবশ হয়ে গেট-এ দাঁড়ানো চেকারকে কাটা, মুলোটা, এক জোড়া ডিম এসব হাতে গুঁজে দিয়ে যাচ্ছে দেখলাম।
ঋজুদা বলল, কথাতেই বলে না, ‘Charity begins at home এই যে আইন–মানার অভ্যেস, জীবনের সবক্ষেত্রেই একদিন অজান্তেই ছড়িয়ে যাবে। ওদের মধ্যে যারা বড়লোকও হবে, তারাও সেলসট্যাক্স দেবে না, ইনকামট্যাক্স দেবে না, রাস্তাতে ট্রাফিক সিগন্যাল মানবে না। অনিয়মানুবর্তিতাতে একবার অভ্যস্ত হয়ে গেলে, তা মজ্জায় মজ্জায় সেঁধিয়ে যাবে।
তুমি শুধু এদের দোষ দিচ্ছ কেন ঋজুদা? হাওড়া-শিয়ালদাতে লোকাল ট্রেনে করে যত লক্ষ লক্ষ যাত্রী যাওয়া-আসা করে প্রতিদিনই তাদের মধ্যে কতজন টিকিট কাটে? এরা তো খুবই গরিব, অশিক্ষিত।
আমি তো শহুরেদের সমর্থন করছি না। নীরদ সি চৌধুরি কি এমনি এমনি ব্রিটিশরাজের প্রশস্তি করেছেন। ইংরেজ আমলে কিন্তু আইনশৃঙ্খলার এমন অবস্থা ছিল না। শুনেছি, কারও নাকি সাহসই ছিল না টিকিট না-কেটে যাওয়ার। কলকাতার বা মফস্বলের পথেও কী রিকশ আর কী ঠেলাগাড়ি বা সাইকেল কারোরই উপায় ছিল না আলো ছাড়া সন্ধের পরে পথে বেরবার। গত সপ্তাহে শান্তিনিকেতনে গেছিলাম একটা কাজে। পূর্বপল্লী থেকে অ্যান্ড্রুজপল্লীতে মোহরদির বাড়ি যাব বলে বেরিয়ে কত বার যে সাইকেল রিকশ আর সাইকেলে চাপা পড়তে পড়তে বেঁচে গেছি তা কী বলব। না আছে পথে কোনও আলো, না আছে যানবাহনে। দেখবার কেউই নেই। অথচ সেটা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একটা জায়গা। রতনপল্লীর দিকে তো আরও ভয়াবহ অবস্থা।
তারপরে বলল, আসলে স্বাধীনতার মধ্যে যে, কিছু কিছু স্বেচ্ছারোপিত পরাধীনতাও মেশানো থাকে, এইটে আমাদের রাজারা এবং প্রজারাও না-জানাতে আমাদের দেশের সঙ্গে স্বাধীন আফগানিস্তান বা জায়রে বা কঙ্গোর আজও যে খুব একটা তফাত হয়েছে তা বলতে পারি না। এর চেয়ে বড় লজ্জা আর কী হতে পারে।
আমরা একটা ফার্স্ট ক্লাস কামরাতে উঠেছি টিকিট কেটে কিন্তু পয়সাই নষ্ট হয়েছে তাতে। সেই কামরাতে ছাগল-মুরগি, লাউ কি কুমড়োর সঙ্গে করে হাটুরেও উঠেছে, ভিখারি, ধানের বস্তা নিয়ে ব্যাপারি। ছাগল ডাকছে ব্যাঁ-এ-এ, মুরগি ডাকছে, কঁক, সর্দি হওয়া শিশু কাশছে খক্-খ। আর অন্য সকলেই অবিরত বকবক করছে। কেউ কেউ হাতে খৈনি মারছে। কেউ বিড়ি খাচ্ছে।
তিতির নাক কোঁচকাচ্ছিল। মুখে বলল, কী বিচ্ছিরি গন্ধ। এদের নামিয়ে দাও গাড়ি থেকে।
ঋজুদা একটু হাসল। বলল, এই একটা কামরা থেকে নামালেই তো সমস্যার সমাধান হবে না। এদের তো চিরদিন আমরা মাটিতেই নামিয়ে রেখেছি, মানুষ বলে তো গণ্য করিনি। সাহেবরা বলেছে ‘ডার্টি নিগার’, আর আমাদের হেলিকপ্টার থেকে-নামা দুগ্ধ-ফেননিভ পোশাক পরা সব দলেরি নেতারা এদের বড় দরদভরা গলাতে ডেকেছে: ভাইয়ো ঔর ব্যহেনো’ বলে। কিন্তু তোরই মতো এদের পাশে বসতে নাক সিঁটকেছে। বসেছে যে, তা নয়, বসেছে। খেয়েছেও পাশে বসে। কিন্তু শুধু নির্বাচনেরই আগে। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষদের প্রতি বিদেশি ইংরেজদের যে ঘৃণা ছিল তাতে কোনও ভেজাল ছিল না। কিন্তু স্বাধীন ভারতবর্ষের নেতাদের দেশের সাধারণ মানুষদের প্রতি যে দরদ তার সবটাই ভেজাল। এরা সব ভোটেরই কাঙাল, গদির ভিখারি।
শেষের দিকে ঋজুদার গলাটা ভারী হয়ে এল। মুখটা ঘুরিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে চেয়ে রইল।
আমরাও সবাই চুপ করে গেলাম।
ঋজুদা তারপর বলল, বুঝলি তিতির, এই হচ্ছে আসল ভারতবর্ষ। এদের ঘৃণা করে ভালবাসতে শেখ। এদের নামিয়ে দিয়েছি বলেই আমরাও নেমে এসেছি এত নীচে। পল রোবসন-এর গাওয়া সেই বিখ্যাত গানটা শুনেছিস কি তোরা!
কোন গান?
আমি বললাম।
We are in the same boat brother,
If you tip the one end
You are going to rock the other
We are in the same boat brother.
আমরা আবার চুপ করে গেলাম। যতবারই ঋজুদার সঙ্গে বেরই, সাধারণ গরিব মানুষদের প্রতি ঋজুদার যে গভীর ভালবাসা ও মমত্ববোধ তা যেন নতুন করে প্রতিবারই জানতে পারি। জেনে, ঋজুদার জন্যে গর্বে বুক ফুলে ওঠে। গদাধরদার প্রতি, কিযুণের প্রতি, মাজিদ-এর প্রতি তার যে ভালবাসা, সেটা লোক-দেখানো আদৌ নয়।
ট্রেনে ওঠার সময়ে মাজিদের হাতে একটা একশো টাকার নোট দিয়েছিল ঋজুদা।
মাজিদ অবাক হয়ে বলল, ঈ ক্যা? ঈ ক্যা হ্যায় সাহাব! আপ তো হামকো চায়েভি পিলানে নেহি দিয়া ইককাপ। উস রোজভি জাদা পয়সা দেকর গ্যায়া। কার্নি মেমসাবকি লিয়ে আপ কেয়া কিয়েথে আর কেয়া নেহি কিয়েথে, উ সবহি তো হামলোগোকি ইয়াদ হ্যায়।
ঋজুদা কপট ধমক দিয়ে বলেছিল, বকোয়াস মত করো। বদমাশ। আজ জুম্মাবার হ্যায়। রাতমে মোর্গা বানাও ঘরমে।
গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে বাঁশি বাজিয়ে। মাজিদ আর টোড়ির মাস্টারবাবু যতক্ষণ আমাদের দেখা যায়, ততক্ষণ হাত নেড়েছে ও নেড়েছেন সমানে। তারপর ট্রেনটা একটা বাঁক নিয়ে জঙ্গলে ঢুকে যেতেই আর দেখা যায়নি ওঁদের।
এখন ট্রেনের গতিটা কমে এসেছে।
ঋজুদা বলল, মহুয়া-মিলন-এ পৌঁছে গেলাম। কী সুন্দর নাম, না?
তারপর তিতিরকে বলল, তুই তো তোর ফেভারিট লেখকের ওপর অথরিটি–এই মহুয়া-মিলনের পটভূমিতে লেখা তাঁর একটা উপন্যাস আছে। নাম বাসনাকুসুম। পড়েছিস কি?
তিতির হেসে বলল, কার যে বেশি ফেভারিট তা তো বুঝতে পারছি না। তুমি তো আমার চেয়েও অনেকই বেশি পড়েছ তাঁর বই দেখছি।
ঋজুদা পাইপ ভরা শেষ হলে রনসন-এর লাইটার দিয়ে আগুন দিয়ে বলল, শত্রুর সমস্ত গুণাগুণ সম্বন্ধে আপ-টু-ডেট জ্ঞান না থাকলে তাকে বধ করব কী করে! তার দোষের খবর না রাখলেও চলে কিন্তু গুণের খবর রাখতে হয় বইকী! পারলে, পড়িস বইটা। ইন্টারেস্টিং রিডিং। কিন্তু গভীরতা আছে।
নামটা ভারী সুন্দর কিন্তু, না? বাসনাকুসুম।
হ্যাঁ।
ঋজুদা বলল।
ভটকাই অনেকক্ষণ থেকেই উসখুস করছিল। আর থাকতে না পেরে বলেই ফেলল, লিন্ডওয়ালের কী করবে ঋজুদা?
কী করব?
স্টিভ ওয়ার ফ্যাক্স যা বলছে… তাতে তো কোনও সন্দেহই থাকছে না যে–
স্টিভ এডওয়ার্ড, ওয়া নয়।
ওই হল, যা বলছে, তাতে তো কোনও সন্দেহই থাকছে না আর যে, কেনেথ লিন্ডওয়ালই ম্যাক টেইলর।
তা ঠিক। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম বোকাও তা বুঝবে। তা ছাড়া স্টিভ-এর ফ্যাক্স আসার আগে কাল রাতেই আমি ম্যাকের উল্টোপাল্টা কথা শুনেই বুঝেছিলাম।
তা সত্ত্বেও তুমি তোমার বন্ধু স্টিভকে জানাবে না?
জানাব বইকী!
জানাবে?
অবাক হয়ে বলল, ভটকাই।
আমি আর তিতিরও একটু অবাক হয়েই চুপ করে রইলাম।
ঋজুদা বলল, জানাব যে, ম্যাক টেইলর ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জ-এ যে থাকে না, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত।
কবে জানাবে?
আজই। ডালটনগঞ্জ থেকেই জানাব। মোহনের ফ্যাক্স থেকে।
কিন্তু এমন করা কি ঠিক হবে?
ঠিক জানি না। হয়তো হবে। হয়তো হবে না। আমার কাছে যা ঠিক তা অন্যের কাছে ঠিক না হতেও পারে।
তারপরই আমাদের সকলকে উদ্দেশ করেই বলল, তোরা অরুন্ধতী রায়ের নাম শুনেছিস?
ভটকাই হাঁ করে তাকিয়ে থাকল।
তিতির বলল গড অফ স্মল থিংগস।
আমি বললাম, বুকার প্রাইজ পেয়েছে যে বইটি?
বইটা পড়েছিস?
নাঃ। বড্ড দাম। আমার ভারী একটা দোষ আছে। দাগ না দিয়ে বই পড়তে পারি না। সেই জন্যে লাইব্রেরি থেকেও আনতে পারি না বই।
তিতির বলল, আমি পড়েছি।
অরুন্ধতী এখন মেধা পাটকর-এর সঙ্গে নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনে নেমেছেন। কাগজে দেখে থাকবি হয়তো।
দেখেছি।
ইংরেজিটা একেবারে ওর নিজস্ব। দেখার চোখ, বলার ভাষা, সবই নিজস্ব। নর্মদা বাঁচাও প্রসঙ্গে ও একটা বই লিখেছে, বইটির নাম: ‘The Greater Common Good’।
তার সঙ্গে ম্যাক টেইলর-এর কী সম্পর্ক?
ভটকাই ফুট কাটল।
ঋজুদা বলল, ম্যাককে ধরিয়ে দিলে, যদি সে খুন নাও করে থাকত তবেও তার জন্যে ইলেকট্রিক চেয়ার বরাদ্দ হত হয়তো। নয়তো যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর। কিন্তু টেড গিলিগান মানুষটা কেমন ছিল? ম্যাক সত্যিই তাকে খুন করেছিল কি না? খুন করলে, কেন খুন করেছিল? এসব তো আমরা জানি না। অন্য কোনও কুচক্রী মানুষ নিজে খুন করে খুনের দায়টা ম্যাক-এর ওপরে চাপিয়েও দিতে পারে। তা ছাড়া আমার দৃঢ় বিশ্বাস ও খুন করেনি। যে খুনি সে সারাজীবন সন্দেহের জীবন কাটাবে। সে কখনও অচেনা, অজানা, কলকাতা থেকে-আসা আমাদের শিকারের কথা আলোচনা করার জন্যে কার্নি মেমসাহেবের বেয়ারা মাজিদ-এর কথাতেই আমাদের নেমন্তন্ন করত না। যদি শিকারে গিয়েই ও টেডকে খুন করে থাকত তবে সমস্ত বাকি জীবন ও শিকারের প্রসঙ্গই এড়িয়ে চলত। তবে মানুষ হিসেবে ও খুবই অসাবধানী। খুনিরা গুনে গুনে ড্রিঙ্ক করে, কখনও বেসামাল হয় না, নিজের চার ধারে একটা দুর্ভেদ্য দেওয়াল তুলে বাস করে সারাজীবন।
তারপর একটু চুপ করে থেকে বলল, এই গঞ্জেই আমার কটেজ যখন ছিল, তখন এক বাঙালি ভদ্রলোক তাঁর বেলজিয়ান স্ত্রীকে নিয়ে এখানে থাকতেন। তাঁর বাড়ির ঘরটরও ভাড়া দিতেন ট্যুরিস্টদের। তাঁর আচরণ, কথাবার্তা আমার কাছে খুবই রহস্যময় মনে হত। কিছুদিন পরেই যেমন ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হয়েছিলেন, তেমনই ধূমকেতুরই মতন উধাও হয়ে গেলেন। তিনি যে খুনিই বা অন্য কোনও অপরাধী এমন সন্দেহই দৃঢ় হয়েছিল।
তিতির বলল, ঋজুকা, তোমার কথা মানলাম কিন্তু অন্য দিক দিয়েও ভেবে দেখো। ভুল তো তুমিও করতে পার।
পারি বইকী। হয়তো কেন? মনে করো ভুল করেছি। ইচ্ছে করেই করেছি। কিন্তু করেছি, For a Greater Common Good.
মানে বুঝলাম না।
কালকে কেনেথকে বা ম্যাককে দেখে আমার এত সুখী মনে হল ওদের দম্পতি হিসেবে যে, ওদের এই নীড় এখন ভেঙে দিলে অরেঞ্জ মিনিভেট পাখির নীড় ভাঙার মতোই পাপ হতো আমার। টেড গিলিগানকে আমি চিনি না। স্টিভকেও এক-দুবার কানাডাতে শিকারে গিয়েই দেখেছি। শিকারিরা একে অন্যকে বলেন, ‘হি ইজ মাই শুটিং প্যাল। কেউ তোর শুটিং প্যাল হলেই যে তুই তার নাড়িনক্ষত্র জানবি এমন কোনও কথা নেই। আমার তো কেনেথকে অনেক বেশি শিক্ষিত, রুচিসম্পন্ন, ভদ্র এবং যাকে বলে, আঃ, কী যেন বলে রে, বাংলাটা বল না রুদ্র…
কীসের বাংলা?
Refined-এর।
পরিশীলিত।
ঠিক। পরিশীলিত বলে মনে হল। তা ছাড়া ও একজন ভাস্করও! সে কথা তো স্টিভ আমাকে বলেইনি। সেই তুলনাতে টেড গিলিগান, মানে যে খুন হয়েছিল, সে অত্যন্তই রুক্ষ প্রকৃতির মানুষ। এমন ধরনের শিকারি, যারা রক্ত আর মাংস লোলুপ, যারা মদ্যপ, যাদের কোনও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল নেই, যাদের জীবনের একমাত্র কৃতিত্ব, একমাত্র প্রার্থনা, ট্রফির মাপ। কে কত বড় শিংএর Moose মেরেছে, কে কত বড় সিংহ মেরেছে, বা কত বড় দাঁতি হাতি… এই তাদের একমাত্র অর্জন’ জীবনের। কেনেথ সে ধরনের মানুষই নয়। তা ছাড়া আরও একটা কথা, এই ভাস্কর এখন এমন এক মূর্তি গড়তে শুরু করেছে, যে মূর্তি কথা বলবে, হাসবে, গাইবে, খেলবে। এই সৃষ্টির তন্ময়তার মধ্যে কোনও শিল্পীকে বিরক্ত করা কি উচিত?
মানে?
ভটকাই বলল।
মানে,… তিতির তুই কিছু বুঝেছিস?
তিতির মুখ নিচু করে বলল, আমার মনে হচ্ছিল। এখন তোমার কথাতে বুঝছি যে ঠিকই মনে হয়েছিল।
কী বলছ কী তোমরা? কিছুই তো বুঝছি না।
ভটকাই মহাবিরক্ত হয়ে বলল।
সব কথা সকলের না বুঝলেও চলবে।
তিতির বলল, ডরোথি মা হবে।
সে কী? তুমি কী করে জানলে ঋজুদা? পুরুষ হয়ে?
এমনভাবেই বলল কথাটা ভটকাই যে, আমরা সকলেই হেসে উঠলাম। মনে হল, ও যেন বলতে চাইছে যে, ঋজুদা নিজেই যদি সেই অনাগত সন্তানের বাবা না হয়, তবে এই সত্য তার জানারই কথা নয়।
ঋজুদা হাসতে হাসতেই বলল, ভটকু, ভাল গোয়েন্দা হতে হলে সবচেয়ে আগে যা দরকার তা একজোড়া তীক্ষ্ণ চোখ এবং the most uncommon of all qualities…
সেটা কী?
তিতির বলল, Common sense, বুঝেছ। সাধারণ বুদ্ধি। ঋজুদা বলল, ওদের সুখের সংসার, ওদের দুজনের দুজনের প্রতি ভালবাসা গভীর, আমার মন ভরে দিয়েছে। তা ছাড়া দুজনেই কী সুন্দর। যেন, মেড ফর ইচ আদার।
উইলস-এর কমপিটিশানে নাম দেয় না কেন? দিলে গাড়িটা ওরা নির্ঘাত পেতে পারত।
ভটকাই বলল। তারপর না হয় আমাকে দিয়ে দিত।
ঋজুদা বলল, একজন অত্যন্ত সজ্জন মানুষও কোনও ক্ষণিক উত্তেজনায়, কোনও অন্যায় দেখে, নিজেকে বা অন্যকে সাঙ্ঘাতিক বিপদ থেকে বাঁচাতে খুন করতে পারে। পৃথিবীর ফৌজদারি আইনে ঘুণ ধরে গেছে। আইন কানুন সব আমূল বদলে দেওয়া উচিত। পয়সা থাকলেই নব্বইভাগ ক্ষেত্রে অপরাধী পার পেয়ে যায়।
আমি বললাম, এত জায়গাতে আমরা গেছি, মানুষখেকো বাঘ, কি গুণ্ডা হাতি মারতে, কত খুনের কিনারা করতে, কিন্তু এইরকম সমাপ্তি আর কখনওই হয়নি, না ঋজুদা?
ঠিকই বলেছিস রুদ্র।
মারা বা ধরা যত না কঠিন, ছাড়া তার চেয়ে অনেকই বেশি কঠিন।
তিতির বলল।
বাঃ। চমৎকার বলেছিস।
ভটকাই বলল, ইস৷ কোনও মানে হয়। একটা দিন থেকে গেলে মিসেস লিন্ডওয়াল কত কেক-টেক খাওয়াতেন আমাদের।
আমি বললাম, দুঃখ কীসের মিস্টার ভটকু? কেক তো অনেকই খেয়েছিস, লিট্টি কখনও খেয়েছিস? ছাতুর লিট্টি, খাঁটি গাওয়া ঘিতে ডুবিয়ে ডুবিয়ে? আজ রাতেই খাবি।
তিতির বলল, জিনেট্যাক বা র্যানট্যাক আছে তো?
ঋজুদা বলল, সব আছে। প্রিন্স অফ পালাম মোহন বিশ্বাসের কাছে বাঘের দুধ চাইলে তাই পাবি।
ফাইন।
ঋজুদা বলল, আমি জানি যে, তোদের সকলের মনেই অনেক প্রশ্ন রয়ে গেল। কোনওই চিন্তা নেই। হাতে অনেকই সময় আছে। তিনদিন। তোদের সব প্রশ্নেরই উত্তর দেব। এখন যে জন্যে ট্রেনে করে আসা তাই কর। দু ধারের দৃশ্য দেখতে দেখতে চল, কথা না বলে।
ট্রেনের গতি আবার আস্তে হয়ে গেল।
ঋজুদা বলল, টোড়ি সামনে। আজ বড় হাট লাগে এখানে। আমাদের সহযাত্রীদের অনেকেই নেমে যাবে এখানে। এবারে হাত-পা ছড়িয়ে বসতে পারবি তোরা।
গাড়ির গতি আরও আস্তে হয়ে এল।
