কোনও বার্কিং-ডিয়ার বা হনুমানের দল আমাদের দেখে ফেললেই মুশকিল ছিল। তাদের এলার্ম-কল-এ হাতি হয়তো সাবধান হয়ে যাবে। ডিড-ড্য-ডু-ইট পাখির নজরে পড়লেও বিপদ ছিল। জানাজানি কানাকানি হয়ে যেত। মুশকিল হত ধারেকাছে অন্য হাতিরা থাকলে। তা নিশ্চয়ই নেই। থাকলে, গুণ্ডা হাতি এসে এখানে থাকত না।
ঋজুদাও বলছিল, পথে আসতে-আসতে যে, বহুবারই মাঠিয়াকুদু নালার ক্যাম্পে এসে থেকেছে ফুটুদার সঙ্গে। কিন্তু এখানে হাতি কখনওই দ্যাখেনি। জায়গাটা উপত্যকা, তায় একটা খোলের মধ্যে। এখানে ঢোকা সোজা। বেরনো মুশকিল। তা ছাড়া বসতিও খুব দূরে দূরে। খেতের ফসল, যেমন ধান, এই খোলের মধ্যে আদৌ হয় না মানুষের বসতি না থাকাতে। গুণ্ডা হয়ে গেছে বলেই বোধহয় হাতিটা এই নিরিবিলি গর্তে এসে রয়েছে। এর দৌড় এখান থেকে লবঙ্গি ও পম্পাশর।
কুড়ি মিনটি পথ খুব আস্তে-আস্তে গিয়ে আমরা গভীর জঙ্গলের মধ্যে পৌঁছে গেলাম। এতক্ষণ দুর্গাদা আর ঋজুদা হাতিটার পায়ের দাগ নজর করে-করেই আসছিল। এখন এই জায়গাটা ঘন ঘাসে ভরা থাকায় পায়ের দাগ নজর করার অতখানি সুবিধে হচ্ছিল না, কিন্তু জমি নরম বলে হাতির ওজনের কারণে সুবিধেও হচ্ছিল পায়ের দাগ খুঁজতে।
চারদিক দিনমানেই এখন অন্ধকার। আন্দাজে আর এগনোও যায় না। সামনে শখানেক গজ দুরেই মস্ত দহটা। নালাটা এখানে এসে ছড়িয়ে গেছে যে, শুধু তাই-ই নয়, প্রতি বছর নানা জানোয়ারে গরমকালে এখানে এসে গা ডুবিয়ে বসতে বসতে বা ওয়ালোয়িং করতে করতে জায়গাটা খুব গভীরও হয়ে গেছে নিশ্চয়ই।
ঋজুদা, দুর্গাদাকে ইশারাতে বলল, ঝাঁকড়া একটা বসি গাছে চড়ে দেখতে। এবং হাতিকে দেখতে যদি পায়, তবেই আমাদের ইশারা করে জানাতে। নইলে চুপ করে থাকতে। দুর্গাদাই এখন আমাদের স্কাউট।
হাতি যতক্ষণ দহতে গা ডুবিয়ে থাকবে, যদি আদৌ এখানে থেকে থাকে, তবে তখন গুলি করা চলবে না। সেটা আনস্পোর্টসম্যানসুলভ হবে। তা ছাড়া কাদায়-থাকা অবস্থায় হাতি মারা গেলেও তাকে তোলা যাবে না। দাঁত এবং গোড়ালি কেটে নেবার অনেক অসুবিধে হবে।
দুর্গাদা খুব আস্তে-আস্তে কসি গাছটাতে চড়তে লাগল। এই গাছের ডাল খুব শক্ত হয় বলে এই গাছেরই কাঠ দিয়ে ওড়িশার গ্রামাঞ্চলে গোরুর গাড়ির চাকা তৈরি করে মানুষেরা।
ঋজুদা দুর্গাদাকে বলে দিয়েছিল যে, হাতিকে দেখতে পেলেই মাত্র একবারই ডান হাতটি নাড়াবে। হাতি যদি কাদায় বসে থাকে তবে দুর্গাদা নিজের মাথায় হাত দেবে। তারপর হাতি যখন কাদা ছেড়ে উঠবে, তখন দুবার পরপর মাথায় হাত দেবে।
ভাবছিলাম, অত হাত-নাড়ানাড়ি ও মাথায় হাতাহাতি হাতির যদি চোখে পড়ে যায়? হাতি অবশ্য তেড়ে এলে দুর্গাদা চেঁচিয়েই সে বাতা আমাদের জানাতে পারে। বড় গাছে চড়ে থাকলে হাতি কিছু ক্ষতি করতে পারবে না। তা ছাড়া একলা হাতি। দলে তো নেই। চেঁচিয়ে বললে, বার্তা পাব ঠিকই, কিন্তু আমাদের কাছে বার্তা পৌঁছনোর সঙ্গে-সঙ্গে হাতিও হয়তো পৌঁছে যাবে।
আমরা দেখলাম, দুর্গাদা খুব সাবধানে একটু একটু করে উপরে উঠল। তারপর বেশ উঁচু ডালে উঠে পাতার আড়ালে বসে চারধারে ইতিউতি চাইতে লাগল। ঠাহর দেখে মনে হল, সে এখনও দেখার মতো কিছু দেখতে পায়নি।
তা হলে? হাতি কি চলে গেছে দহ ছেড়ে?
অথবা দহতে নামেইনি আদৌ?
একটুক্ষণ পর নাক উঁচিয়ে যেন অনেক দূরে তাকিয়ে হাতিকে দেখতে পেয়েছে এমন ভাব-ভঙ্গি করে একবার ডান হাত নাড়ল সে। পরক্ষণেই নিজের মাথায় হাত দিল। তখন আমাদেরও আক্ষরিকভাবে মাথায় হাত দেবারই অবস্থা।
তারপরই আমাদের দিকে চেয়ে হাত প্রসারিত করে বোঝাল যে, হাতি একটু দূরে আছে। কাছের দহে নেই।
ঋজুদা হাত নেড়ে বলল, ঠিক আছে।
মানে, আমরা বুঝেছি তার সঙ্কেতের অর্থ।
ভাবছিলাম, কম্যান্ডোদেরই মতো প্রত্যেক ভাল শিকারিরই সিগন্যালিং-এ ভাল ট্রেনিং থাকা দরকার। তারপর ঋজুদা আমাকে কানে কানে বলল, বিশ্রাম করে নে একটু।
জায়গাটা বিশ্রাম করার উপযুক্তই বটে। কুসুম গাছের লাল ফুলে ফুলে মনে হচ্ছে যেন আগুন লেগেছে বনে বনে। চারধারে গ্রীষ্মবনের মধ্যেও নানা জলজ গন্ধ ও শব্দ। তার মধ্যে স্কার্লেট-মিনিভেট, বুলবুলি, বউ কথা কও, কোকিল, আরও কত পাখি যে ডাকতে-ডাকতে ফুল ঝরিয়ে ওড়াউড়ি করছে, তা কী বলব। বড় বড় সব গাছের নীচে-নীচে অঞ্জন গাছ। ভারী সুন্দর দেখতে এদের পাতা। চেরা-চেরা বটল-গ্রিন রঙা এদের পাতা। কার্তিক-মাঘ মাসে সুপুরির মতো দেখতে, ফলসারঙা গোল-গোল ফল ধরে এই গাছগুলোতে। জলপাই-এর মতো স্বাদ। টক করে খায় পাহাড়বনের গ্রামের লোকেরা। অণ্ঠনের কচি পাতাও বর্ষাকালে টক করে খায়। অগুন ফল বিছানাতে রাখলে ছারপোকা হয় না বিছানাতে।
কুসুম আর হরজাই বনের ওধারে শুধুই গেলি। শিমুল এবং পলাশও আছে। বাঁশের বনে ফুল ফোঁটা শেষ। মরার পালা এবার। কিন্তু জংলি আমগাছগুলোতে বোল এসেছে। জংলি কাঁঠাল গাছে মুচি। রুখু হাওয়াতে তাদের মিষ্টি গন্ধ ভাসছে। অনেক গাছে পন্বস ধরে গেছে। ওড়িয়াতে কাঁঠালকে বলে পন্থস। এঁচড় এবং কাঁঠালের একই নাম। আদিগন্ত লাল ফুলের মাঝে-মাঝে আমের সাদা-সাদা ফুলগুলোকে দারুণ দেখাচ্ছে।
বেলা পড়ে আসছে। নানা জানোয়ার দলে দলে আসছে। নানা পাখি। দূর থেকে হু-য়া-ও করে বাঘ ডেকে উঠল। জলে আসছে বোধহয়। এখনও দূরে আছে অনেক। বাঁশে-বাঁশে কটকটি আওয়াজ উঠছে। ঝরা পাতারা উসখুস করে ঝরে পড়ছে। মৌটুসি পাখি তারই মধ্যে ফিসফিস করছে। শেষ বিকেলের হাওয়ায় পাতা দুলছে। আলো-ছায়ার চিরুনি বুলোচ্ছে দীর্ঘ-চুলের গাছেরা সন্ধের আগে। কাঁপা কাঁপা চিলতে চিলতে রোদ ঝলকাচ্ছে তাদের পাতায়-পাতায়। একজোড়া নীলচেরঙা রক-পিজিয়ন গুটিগুটি পায়ে পাথরের আলসেতে পায়চারি করছে। যেন, রিটায়ার্ড বুড়োর সঙ্গে বুড়ি। চারদিকের এই গন্ধের সমারোহ ও শব্দমঞ্জরির মধ্যে আমার ক্লান্ত চোখ মুহূর্তে জড়িয়ে এল। ঋজুদা পাশে থাকলে কোনও ভয় নেই। যমদুয়ারেও ঘুমোতে পারি আমি। ঘুমিয়ে পড়লাম।
হাতিটাও কি ঘুমোচ্ছে এখন? লাল থকথকে কাদার মধ্যে গা ডুবিয়ে গাছের ছায়াতে? কী স্বপ্ন দেখছে ও কে জানে? হয়তো গাইছে নয়নামাসির মতো, সেই রবীন্দ্রসঙ্গীতটি;
এ পরবাসে রবে কে হায়!
কে রবে এ সংশয়ে সন্তাপে শোকে।
হেথা কে রাখিবে দুখভয়সঙ্কটে
তেমন আপন কেহ নাহি হে প্রান্তরে হায় রে ॥
হাতিটারও একদিন সব ছিল। সবাই ছিল। আজ কেউই নেই। কস্ফুরই মতো। কম্ফুর ইতিহাস জানলে উন্মাদ হাতিটা উন্মাদ কল্ফকে হয়তো ক্ষমা করে দিত। একজন বিতাড়িত, অপমানিত মানুষ আর একটি হাতির মধ্যে হয়তো এক-ধরনের সখ্য জন্মাত। যা জন্মালে স্বজন-বিরোধ ঘটাত না হাতিটা।
হাতির চোখ দিয়ে তো জল পড়ে দুঃখ হলে। হাতিটা কি কাঁদছে এখন? তার চোখের জল নিঃশব্দে গিয়ে মিশছে দহর জলে।
এ-ছায়াচ্ছন্ন দহর মধ্যে আমি মৃত্যুর গন্ধ পাচ্ছিলাম। আজ কেউ মরবে। হয় আমাদের মধ্যে কেউ। নয় হাতিটা। মৃত্যুর গন্ধটা কোনও ঝাঁঝালো নাম-না-জানা ফুলের গন্ধের মতো। হাওয়ার দমকে ভেসে আসে। নাক জ্বালা করে। পরমুহূর্তে ভেসে চলে যায়।
কতক্ষণ পরে ঠিক জানি না, যেন একযুগ পরে, ঋজুদা ঠেলা মারল আমাকে আস্তে করে। পেটে।
তাকিয়ে দেখি ঋজুদা হাঁটু গেড়ে বসে সাবধানে মাথা উঁচিয়ে দেখছে।
আমিও তাই করলাম।
শুনতে পেলাম খ, হাপুস-হুঁপুস, পকাত্-চকাত্ বিচিত্র সব শব্দ। লাল কাদা-জল মেখে একটা লাল পাহাড়ের মতো ঘোলা, বিচ্ছিরি, লাল কাদা দহ থেকে উঠল গুণ্ডা হাতিটা। আমাদের সামনে যে দহ, তাতে সে ছিল না, ছিল তার পেছনের দহে। তার প্রকাণ্ড দাঁত দুটোও লাল কাদাতে লাল হয়ে গিয়েছিল। হাতি শুকনো ডাঙায় উঠেই বড়-বড় পা ফেলে নালা পেরিয়ে ঘন হরজাই বনের মধ্যে দিয়ে চলতে লাগল, আমরা যেদিক থেকে এসেছিলাম সেই দিকে মুখ করে।
বোধহয় গেলি বনের দিকেই যাচ্ছে।
ঋজুদা বুকে হেঁটে ঠিক নয়, নিচু হয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হাতিটার দিকে এগোতে লাগল ঝোপঝাড়ের আড়ালে আড়ালে। আমাকেও এগোতে ইশারা করে। হাতিটা প্রথম চা-এ অনেকখানিই এগিয়ে গিয়েছিল। হাতি জোরে চললে মানুষের পক্ষে তার নাগাল পাওয়া ভার। তবে এখন চলছে বেশ আস্তে। তবুও গজেন্দ্রগমন বলে কথা।
গতি কমিয়েছে। কেন যে, সে সেই জানে।
এবারে আমরা প্রায় হাতিকে ধরে ফেলেছি। কিন্তু আমাদের আসার কথাটা সে যেন না জানে। এখানে এই দহর কাছে জঙ্গল খুবই গভীর। সব গাছেই পাতা আছে। অস্তগামী সূর্যের আলো খুব কমই পৌঁছেছে। যখন হাতিকে প্রায় ধরে ফেলেছি, হাতির বেশ কাছাকাছি পৌঁছে গেছি, ঠিক তখনই হঠাৎ হাতিটা হারিয়ে গেল।
কোথায় যে লুকিয়ে পড়ল অতবড় জানোয়ারটা বুঝতে পর্যন্ত পারলাম না একটুও। আমাদের দুজনের কেউই নয়। আর ঠিক সেই সাঙ্ঘাতিক মুহূর্তেই ঋজুদা আঁক শব্দ করে একটা বড় গর্তের মধ্যে পড়ে গেল। মস্ত বড় শিমুলের শিকড়ের আঘাত লাগল কোমরে। মুখটা বিকৃত হয়ে গেল। মনে হল, কোমরের হাড় ভেঙে গেছে বুঝি।
যে ঝোপঝাড়ের মধ্যে ঋজুদা পড়ল, তারা ঝরঝর শব্দ করে নড়েচড়ে উঠল। ভয়ে আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল। এই নিবিড় জঙ্গলে গরমের দিনে রাত নামার ঠিক আগে-আগে জলের পাশে সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে খুনি গুণ্ডা হাতিটাও ইচ্ছে করে হারিয়ে গেল আর ঋজুদাও পড়ে গেল এমনভাবে যে, শিগগিরই যে সে উঠতে পারবে, মনে হল না।
ঋজুদার দিকে আমি অসহায়ের মতো তাকালাম এক ঝলক। তখন সমবেদনা জানাবার সময় ছিল না।
ঋজুদা কথা না বলে, নিজের রাইফেলটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে আমার রাইফেলটা নিজে নিয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে রইল রাইফেলটার নল সামনে করে। আমাকে ইশারাতে বলল, এগিয়ে যেতে।
কমান্ডারের আদেশ। এবং সামনে অমিত পরাক্রমশালী অদৃশ্য শত্রু। এগিয়ে যেতে লাগলাম আমি নিচু হয়ে। প্রায় লেপার্ড-ক্রলিং করে। আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল কম্ফু-বদ্যির তালগোল পাকানো রক্তাক্ত পিণ্ডের মতো মৃতদেহ।
ভাবছিলাম, মানুষের মৃত্যু কত বিভিন্ন রূপ ধরেই না আসে।
ঋজুদা আছাড় খেয়ে পড়বার সময় শব্দ হয়েছিল আগেই বলেছি। তার চেয়েও বড় কথা গুলি ভরা রাইফেলের গুলি ছুটে যেতেও পারত। এবং দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। তা ঘটেনি। একটাই ভরসার কথা ছিল এই যে, হাতিটাকে আমরা হারিয়ে ফেলার আগে হাতির মুখ ছিল সামনে। মানে, আমাদের ঠিক উলটো দিকে এবং ঋজুদার পড়ে যাওয়ার আওয়াজ যদি সে শুনেও থাকে তবুও সে হয়তো আমাদের অবস্থানটি দ্যাখেনি। এই ভেবেই সান্ত্বনা দিচ্ছিলাম নিজেকে। হাতি শব্দ শুনলে বা ঋজুদাকে দেখতে পেলে এতক্ষণে রে! রে! করে তেড়ে আসত নিশ্চয়ই!
এগিয়ে তো গেলাম, কিন্তু প্রায়ান্ধকারে হারিয়ে-যাওয়া গুণ্ডা হাতির পেছনে আন্দাজে যাবটা কী করে? ঋজুদার কাছ থেকে আমি প্রায় পঞ্চাশ গজ এগিয়ে এসেছি। ঋজুদাকে এখন আর দেখাও যাচ্ছে না। অতি দ্রুত আমার চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসছে। বনের চন্দ্রাতপের নীচে আছি। বড়জোর মিনিট-পাঁচেক রাইফেল দিয়ে গুলি করার মতো আলো থাকবে আর এখানে। ভয়ে হাত-পা অবশ হয়ে এল। ঘাম দিতে লাগল খুব। আর না এগিয়ে উবু হয়ে বসে আমি ফ্রিজ করে গেলাম রাইফেলটাকে রেডি-পজিশানে ধরে।
রাইফেলটাও তেমন। চোদ্দ পাউন্ড ওজন। ফ্রিজ করে গিয়ে খুব আস্তে-আস্তে ঘাড় ঘুরিয়ে চারপাশে দেখতে লাগলাম। এতই আস্তে যে, কোনওরকম চাঞ্চল্য যেন কারও চোখেই না পড়ে তা নিশ্চিত করে। কিন্তু কিছুই যে দেখতে পাই না। চারধারেই গাছের কাণ্ড। গাছেরা চারপাশে আমাকে ঘিরে আছে। তাদের সোঁদা গন্ধ গা নিয়ে। মোটা গাছ, মাঝারি গাছ, সরু গাছ। সার-সার নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তারা। একটা কুটুরে ব্যাঙ ঠিক সেই সময়ে কুটুর-কুটুর ডেকে উঠল। হয়তো আমাকে ভয় পাওয়াবারই জন্য।
একবার ডাইনে থেকে বাঁয়ে আর-একবার বাঁ থেকে ডাইনে ঘাড় পুরো ঘুরিয়ে নিয়ে দেখলাম এবং ঘাড়টা ঘোরানো দ্বিতীয়বার যখন শেষ করে এনেছি প্রায় ঠিক সেই সময়েই আমার হৃৎপিণ্ড একদম বন্ধ হয়ে গেল। হঠাৎ লক্ষ করলাম যে, আমার ডান দিকে খুবই কাছে দুটো গাছের কাণ্ডর রং সাদাও নয় কালোও নয়। লাল। এবং সেই দুটি গুঁড়ি থেকে তখনও কাদা ও জল ঝরছে। চোখের দৃষ্টি যতখানি তীক্ষ্ণ করা যায়, ততখানি তীক্ষ্ণ করে আমি সেই লাল গুঁড়ি দুটিকে লক্ষ করে দেখলাম আরও একটি মড়া গুঁড়ি সামনে আছে। তারপর দুটি মোটা লাল গুঁড়ির মধ্যে এবং একটি গুঁড়ির সঙ্গেই প্রায় আরও একটা গুঁড়ি চোখে পড়ল।
আমার মধ্যে থেকে অদৃশ্য কে যেন চিৎকার করে বলে উঠতে গেল : হাতি-ই-ই-ই।
কিন্তু অদৃশ্য অন্য কেউ যেন আমার মুখ সজোরে চেপে ধরল দুহাতে। কম্ফুর চেহারাটা আবারও মনে পড়ল।
পেশি এবং স্নায়ু যথাসাধ্য শক্ত করে আবারও আস্তে আস্তে ঘাড় ঘুরিয়ে একবার পেছনে চেয়ে দেখলাম। না, কেউ নেই। তখনও ঋজুদা সেই গর্ত থেকে উঠে আসতে পারেনি।
কিন্তু দুর্গাদা?
পরমুহূর্তেই ভাবলাম, সেই বা খালি হাতে এসে কী করবে?
ঋজুদার সঙ্গে দেশে-বিদেশে অনেক বিপজ্জনক প্রাণীর মুখোমুখি হয়েছি, আজ অবধি কিন্তু এমনটি বিপদ আর কখনও হয়নি।
নিজেকে শক্ত করতে লাগলাম। ভটকাইয়ের কথা মনে পড়ে গেল। ব্রাদার, লাইফে তোমার আসলে কেউই নেই। একা এসেছ, একা যাবে। তুমি পটল তোলার পর তোমাকে কেউ বারোটি ঘণ্টাও মনে রাখবে না। এই হচ্ছে সার কথা। তবে আর ভয়-ভাবনা করা কেন?
হাতিটা নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাতিই তো? এত কাছে? মেরুদণ্ড বেয়ে একটা ঠাণ্ডা সাপ নেমে গেল। পাগুলো ও গুঁড়টাতে এতটুকুও কম্পন নেই। এত বড় একটা জানোয়ার কী করে যে এমন নিশূপে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, তা আমার কল্পনারও বাইরে ছিল। এদিকে সময় চলে যাচ্ছে দ্রুত। হাতিটার মাথা বা কান কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। শরীরের কোনও ভটকাইটাল অংশই নয়, যেখানে গুলি করতে পারি।
নিশ্বাস বন্ধ করে, তাকে আর-একটু ভাল করে দেখতে পাওয়ার আশায় আমি এক গজ এগোলাম। চুলচল করে করে। যেন, একযুগ ধরে। এবং এগোতেই, ডালপালার আড়াল সরে গিয়ে হাতির শরীরটা এবারে নজরে এল। তাও লাল কাদা-মাখা। হাতিটা আমার এতই কাছে দাঁড়িয়ে আছে যে, ইচ্ছে করলেই আমাকে খুঁড় দিয়ে জড়িয়ে নিতে পারে। হাতিটার শুড় দেখে বুঝলাম যে, ঋজুদা যেখানে গর্তে পড়েছে সেই মস্ত শিমুলের দিকেই সে চেয়ে আছে। একদৃষ্টে। দুর্গাদাটা আবার নড়াচড়া না করে! হাতিটা কি দেখতে পেল ঋজুদাকে?
আর ভাববার সময় নেই। হাতির মাথা বা কানের পাশে গুলি করার সুযোগ যখন নেই, তখন আমি মায়ের মুখ স্মরণ করে হাতির হার্টটা যেখানে থাকতে পারে বলে অনুমান করলাম, সেইদিকে নিশানা নিয়ে চুলচুল করে রাইফেলটা ওঠালাম। ফোর-সেভেনটি-ফাইভ ডাবল ব্যারেল রাইফেলটার ওজন চোদ্দ পাউন্ড। এ রাইফেল কপিকলে করে তুললে মানায়। ঋজুদার মতো লম্বা-চওড়া মানুষ বলেই এই রাইফেল অবহেলায় নাড়াচাড়া করে। অত ভাবার সময় আর নেই। আমি এখন আর আমি নেই। রোবট হয়ে গেছি কোনও। রিমোট কন্ট্রোলে ঋজুদাই যেন নির্দেশ দিচ্ছে।
নিনিকুমারীর বাঘ মারতে গিয়ে ভটকাইয়ের গুলিকা বাঘিনী যে ডান হাতটা জখম করে দিয়েছিল গত শীতে তা এখনও মাঝে-মাঝেই কষ্ট দেয়। হাতটা এখনও, এত ভারী আর বড় বোরের রাইফেল চালাবার মতো পোক্ত হয়নি। কিন্তু এখন শুধু ঋজুদার আর দুর্গার্দারই নয়, আমার নিজেরও প্রাণ-সঙ্কট।
রাইফেলের নলটা সোজা হতেই ব্যাক-সাইট আর ফ্রন্ট-সাইট যতখানি ভাল করে পারি দেখে নিয়ে সেফটি ক্যাচ অন করতে করতেই ট্রিগারে ফাস্ট প্রেশার দিলাম এবং পর মুহূর্তেই সেকেন্ড প্রেশার।
