ঋজুদার সঙ্গে লবঙ্গি বনে – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

শিকারে যাওয়ার সময় যে জিপেই যাই, জিপের হুড খোলা থাকে। সামনের উইন্ডস্ক্রিনও শোয়ানো থাকে বনেটের উপর। এই কারণেই সেডান বডির জিপ আমরা কখনওই নিই না। কিন্তু এতখানি পথ আসতে হবে বলে, হুড যদিও খোলা ছিল উইন্ডস্ক্রিন নামানো ছিল না চোখে হাওয়া লাগে বলে। বোধহয় কুড়ি গজও উঠিনি চড়াই-এ এমন সময় পেছন থেকে এক চিৎকার শুনে রিয়ার-ভিউ-মিরারে চেয়ে দেখি, লোকটা পেছন দিক দিয়ে জিপ থেকে এক লাফ মেরে নেমে হাতিটার দিকেই দৌড়ে যাচ্ছে।

ব্রেক করে মুখ ঘুরিয়ে আমি তাকিয়ে রইলাম সেদিকে। কী হয়, কী হয়!

হাতিটা বন থেকে বেরিয়ে যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানেই তখনও চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। এই লোকটা যে কে আমি জানি না, তবে টারজান বা অরণ্যদেবের মতো কেউ হবে বোধহয় এইটুকু মনে হচ্ছিল, নইলে কোনও গুণ্ডা হাতি কোনও মানুষের কথা এমন শোনে!

লোকটা টালমাটাল পায়ে হাতিটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল ডান হাত তুলে হাতিকে কী বোঝাতে বোঝাতে।

হাতিটা মুহূর্তের মধ্যে ক্যানাডিয়ান লোকোমোটিভ স্টিম এঞ্জিনের মতো এক দমে শুঁড় লটপটিয়ে ছুটে এসে লোকটাকে শুড় দিয়ে এক ঝটকাতে উপরে তুলে নিল। এবার তার পিঠে বসাবে মনে হল। কিন্তু পিঠে না বসিয়ে পথের পাশের কতগুলো বড় পাথরের স্তূপে লোকটাকে এক প্রচণ্ড আছাড় মারল হাতিটা। এবং সঙ্গে-সঙ্গেই শব্দ করে লোকটার কপাল ফেটে গেল। হাড়গোড় সব চুরচুর হয়ে গেল। থকথকে ঘিলু ছিটকে গিয়ে লাগল কালো পাথরে। ই। রে! লালচে-হলদেটে রঙের ঘিলু।

তারপর হাতিটা লোকটাকে মাটিতে ফেলে প্রথমে বাঁ পা তারপর ডান পা দিয়ে তাকে যেন ঘন ঘৃণার সঙ্গে বারেবারে মাড়াল। মাড়িয়ে, জিপের দিকে এবং রাইফেল-হাতে দাঁড়িয়ে থাকা শিকারি, আমার দিকে ভ্রূক্ষেপমাত্রও না করে পথটা পেরিয়ে যেদিক দিয়ে এসেছিল, তার ঠিক উলটো দিকের পত্রশূন্য, রোদ-ঝাঁঝাঁ-করা গেণ্ডুলি বনে ঢুকে গেল। পত্রশূন্য বলেই, দেখতে পেলাম, অবিশ্বাস্য গতিতে চোখের পলকে সে এত দূরে চলে গেল যে, কিছু পরে তাকে আর দেখাই গেল না।

এমন সময় দেখলাম, ঋজুদারা দৌড়ে আসছে।

ওঁদের দেখেই আমি সঙ্গে সঙ্গে জিপ ব্যাক করে তাড়াতাড়ি ওঁদের দিকে নিয়ে গেলাম।

নিজের উপর বড়ই ঘেন্না হচ্ছিল আমার। আর প্রচণ্ড রাগও হচ্ছিল ঋজুদার উপরে। হাতে ফোর-ফিফটি ফোর-হান্ড্রেড লোডেড ডাবল-ব্যারেল রাইফেল থাকতেও আমার সামনে একটা লোক দিনদুপুরে খুন হয়ে গেল, অথচ তাকে বাঁচাতে পারলাম না আমি। এমনকী বাঁচাবার চেষ্টাও করলাম না। ছিঃ। এই না হলে শিকারি। এবার থেকে ঋজুদার চামচেগিরি করাই ছেড়ে দেব। মনে-মনে ঠিক করলাম।

ঋজুদা একবার দ্রুত গেণ্ডুলি বনের দিকে তাকাল, তারপর পড়ে-থাকা মানুষটার দিকে। তাকে মানুষ বলে চেনার আর উপায় ছিল না কোনও। তাকে তালগোল পাকিয়ে দিয়ে হাতি তার লজ্জামোচন করছিল।

দুর্গার্দা, রাজেনদা আর ঋজুদা আমাকে ধর্তব্যের মধ্যে না এনে নিজেরা নিচু গলায় কীসব আলোচনা করল দ্রুত। পরক্ষণেই রাজেনদা আর ঋজুদা আমাকে কিছু না বলেই খুব দ্রুত গেণ্ডুলি-বনের উপত্যকাতে নেমে গেল। এবং দ্রুতগতি হাতিটারই মতো অদৃশ্য হয়ে গেল কিছুক্ষণের মধ্যে।

দুর্গাদা গুটিগুটি ওই মানুষটার কাছে এগিয়ে গেল। তারপর তাকে ভাল করে দেখে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে নালার দিকে ফিরে গিয়ে গাছের ছায়ায় বসে পড়ল। বসে পড়ে আমাকেও ডাকল ইশারাতে।

জিপের এঞ্জিন তখনও চলছিল। সেটাকে বন্ধ করে রাইফেল হাতেই আমি দুর্গাদার কাছে গিয়ে পাশে বসলাম একটা পাথরের উপরে। তারপর ফিসফিস করে বললাম, তুমি দেরি করলে কেন? জল খেতে কতক্ষণ লাগল তোমার?

দুর্গাদা বলল, জল খেতে আর পারলাম কোথায়?

সে কী! কী করলে তা হলে এতক্ষণ!

নালার কাছে গিয়ে একটু পরিষ্কার জল দেখে নিচু হয়ে বসেছি, আর দেখি হাতি।

কোথায়?

আমার ঠিক পেছনে।

বলো কী! তারপর?

আর কী। জল খাওয়া তো মাথায় উঠল। সামনেই একটা মস্ত আমগাছ। কিন্তু সেটা এতই মোটা যে, দুহাতে তার বেড় পাওয়া অসম্ভব। অতএব তার পাশেই যে কসি গাছ ছিল, সেই গাছে বাঁদরের চেয়েও তাড়াতাড়ি উঠে গেলাম তরতর করে। হাতি একবার শুড় বাড়িয়ে ধরার চেষ্টাও করল আমাকে, কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল, সে আমার প্রতি আর মনোযোগী নয়। একটুও শব্দ করল না কিন্তু।

হাতি ওখানে ছিল তো ঋজুদাদের ধরল না কেন?

আমিও তো তাই ভাবছি।

হাতি একবার শুড় দিয়ে ধরবার চেষ্টা করে যখন আমার নাগাল পেল না, তখনই তোমার দিক থেকে একটা শম্বর ডাকল ধ্বক করে। তুমি কোনও শম্বর দেখেছিলে?

হ্যাঁ। শম্বরটা বন থেকে বেরিয়ে আমাকে দেখেই ডেকে আবার বনের ভিতরে চলে গেল।

কী শয়তান হাতি দ্যাখো। শম্বরের ডাক শুনে ও বুঝেছিল যে, শম্বরটা কিছু দেখে অবাক হয়েছে। তবে বাঘ দ্যাখেনি। বাঘ দেখলে শম্বরেরা যেমন করে ডাকে, সে ডাক অন্য।

হাতিটা শম্বরের ডাক শুনেই সঙ্গে-সঙ্গে জঙ্গলের ছায়ায়-ছায়ায় সোজা ডান দিকে চলে গিয়ে বাঁ দিক দিয়ে গিয়ে তোমার দিকে চলে এসেছিল।

ওই লোকটা এল কোথা থেকে? লোকটা কে?

কোথা থেকে এল তা কী করে জানব। তবে ও তো আমাদের কল্ফ। আহা, কার কী পরিণতি! ও কত বড় ডাক্তার ছিল, তোমরা বিশ্বাস করবে না, জানলেও। ওর কাছে কর্কট রোগের ওষুধ ছিল জানো?

মানে, ক্যানসারের ওষুধ?

হ্যাঁ। না তো কী?

আমাদের একটা মোষের ভেঙে যাওয়া পা ও যেমনভাবে সারিয়েছিল অল্প দিনে, তেমনভাবে কটকের নামী হাড়ের-ডাক্তার আর ছুরি-চালানো ডাক্তারেরাও পারত না। পুটুকাসিয়া লতার গোড়া, কচি শিমুলের গোড়ার শিকড়, হাড়কালির ছাল, জড়া তেলের সঙ্গে বেটে সেই ওষুধটা তৈরি করেছিল। তারপর সেই ওষুধ লাগিয়ে ডবা বাঁশ কেটে প্রিন্টার তৈরি করে তা দিয়ে বেঁধে দিয়েছিল পা। ক্যুর মতো বদ্যি এদিকের পাহাড়-বনে কমই ছিল। সপরস খেয়ে লোকে অসুস্থ হলে কফ্ একটি বটি দিত আর সঙ্গে-সঙ্গে সব ঠিক। বুঝে দ্যাখো। একটি মাত্র বটি।

এতই বড় বদ্যি যদি সে, তা হলে তোমরা তাকে এমন করে মরতে দিলে কেন দুর্গাদা? তাকে ঘরে কেউই জায়গা দিলে না কেন?

দুর্গাদা ডান হাতটা কোমর অবধি তুলল। তারপর অনেক কিছু বলতে চেয়েও থেমে গিয়ে সংক্ষেপে বলল, বন যাকে জাদু করে, মরণ যাকে ডাকে, তাকে ঘরে ধরে রাখে এমন সাধ্যি আছে কার? সবই আমাদের কপাল রুদ্রবাবু।

তা হাতিটা যদি ওখানেই ছিল, ঋজুদা আর রাজেনদাকে ধরল না কেন? ওরাই বা দেখতে পেল না কেন? অবাক কাণ্ড!

সত্যিই তাই। হতি তো ছিলই। একেবারে ওদের পাশেই ছিল। দোষ তো রাজেনের। মাঠিয়াকুদু নালাতে হাতির পায়ের ছাপ কাল যেখানে দেখেছিল সটান সেখানেই নিয়ে যাচ্ছিল ঋজুবাবুকে। আরে, কাল যেখানে হাতি ছিল আজও যে ঠিক সেখানেই থাকবে, এ-কথা কোনও শিকারির পক্ষে কী করে বিশ্বাস করা সম্ভব হল, তা তো আমি ভেবে পাই না। আসলে ঋজুবাবুর পোশাক, হাতের রাইফেল আর পাইপের গন্ধে হাতি সামলে নিয়েছিল। নিজেকে। রাজেন একা থাকলে আজ কম্ফু বেঁচে যেত। ওই মরত।

ঋজুদারা গেল কোথায়?

হাতির পিছনে।

দেখা পাবে? পেছনে-পেছনে দৌড়ে?

পাগল! হাতি ততক্ষণে দুমাইল চলে গেছে। গেণ্ডুলি বনের বাঁ দিকে একটা বড় দহ আছে। মাঠিয়াকুদু নালাটা গিয়ে পড়েছে সেখানেই। ওই নদীতে দহমতে আছে একটা। হাতি নিশ্চয়ই দুপুরবেলাটা সেখানেই গা ডুবিয়ে থাকবে।

তুমি যদি জানোই তবে সঙ্গে গেলে না কেন?

আমাকে নিয়ে গেলে তো। রাজেন এ-জঙ্গলের কী জানে? ও রেড়াখোল আর ঢেক্কানলের জঙ্গলের মুহুরি। এই মাঠিয়াকুদুতে আমি পরপর পাঁচ বছর ক্যাম্প করে থেকেছি। ফুটুবাবুদের লক্ষ লক্ষ টাকা লাভ হয়েছে এই জঙ্গল থেকে। এমন ভাল কাঠ খুব বেশি জঙ্গলে নেই। তা রাজেন মাতব্বরের আমার সঙ্গে শলা করারও সময় হল না! থাকগে! মরুকগে ঘুরে।

তা তো বুঝলাম। কিন্তু ঋজুদা কি জানে না তোমার অভিজ্ঞতার কথা?

জানবে না কেন?

তবে?

ওই রাজেনের লোভ।

কিসের লোভ? অবাক হয়ে বললাম আমি।

ঋজুদা বলেছে না ওকে একটা থ্রি-ফিফটিন রাইফেল কিনে দেবে এবং ডিভিশনাল কমিশনারকে বলে লাইসেন্সও করিয়ে দেবে। তাই ও তেল দিচ্ছে ঋজুবাবুকে। তেল দিতে গিয়ে ঋজুবাবুর প্রাণটাই নিয়ে নেবে। যা মনে হচ্ছে তাতে।

তেল দিলে ঋজুদা কি বুঝতে পারত না?

কী যে বলেন রুদ্রবাবু! ভগবানও পর্যন্ত বুঝতে পারেন না, আর ঋজুবাবু! তেলের মতো সাঙ্ঘাতিক বিষ আর নেই। তা ছাড়া রাজেন আমাদের হুঁশিয়ার লোক। তেল কি সকলে দিতে জানে? মবিলের ফুটোয় পেট্রল, আর পেট্রলের ফুটোয় মবিল দিয়ে দিলেই সব গোলমাল। রাজেন তেমন ভুল করে না। চালু পাট্টি।

রাজেনদা তো খুব ঠাণ্ডা লোক। মুখে কথাটি নেই। কারও নিন্দা করে না কখনও। তুমি তার সম্বন্ধে এমন খারাপ কথা বলছ কেন আমাকে? শুনে আমার কী লাভ?।

ভাবছ তাই। ও জায়গা বুঝে চলে। হাড়কেপ্পন বদমাশ লোক। জায়গা বুঝে দাতা। জায়গা বুঝে বক্তা। নিজে হাতে পিঁপড়ে মারে না বলে মানুষে জানে। অথচ বাঘ-ভাল্লুক ওই মারে আকছার। তবে অন্যের ঘাড়ে বন্দুক রেখে। কারও জানবার জো-টি পর্যন্ত নেই। বড় সাঙ্ঘাতিক মানুষ আমাদের এই ভাজা মাছটি উলটে খেতে-না-জানা ভাবকরা রাজেন মুহুরী। আমাদের এই গুণ্ডা হাতির চেয়েও ও বেশি ভয়ের।

এতোই যদি খারাপ ধারণা রাজেনের সম্বন্ধে তা হলে সঙ্গে থাকো কেন?

ওই তো। আমাদের মালিক যে এক। মালিক যদি চোখ বন্ধ করে থাকেন, নাকে তেল দিয়ে ঘুমোন, শুধুই নিজের লাভের কড়ি গোনেন তবে রাজেনের মতো মানুষের বাড় বাড়বে না? লাভ-লোকসান ছাড়াও কিছু অঙ্ক থাকে জীবনে, যা সময়ে না মেলালে পরে আর মেলে না। বুঝেছ রুদ্রবাবু? সেটাই আমার মালিক বুঝলেন না।

এতসব বড় বড় এবং গোলমেলে কথা আমার মাথা গোলমাল করে দিল। দুর্গার্দাকে আমার যেমন ভাল লাগে, তেমনই রাজেনদাকেও লাগে। এসব শুনতে আমার ভাল লাগছিল না।

আমার মনের কথাই যেন বুঝতে পেরে দুর্গাদা বলল, পৃথিবীর সব মানুষ, সব জানোয়ারই ভাল ঋজুবাবু, এমনকী এই হাতিটাও ভাল। ভাল, যতক্ষণ না তোমার স্বার্থে সে হাত দিচ্ছে। স্বার্থে হাত পড়লেই শুধু বোঝা যায়, স্বার্থ ভাগাভাগি করে খাওয়ার সময়েই জানা যায় কে কত্ত ভাল। তার বাইরের ভাল-মন্দ নেহাতই পোশাকি। বুঝেছ?

ঋজুদা আর রাজেনদার গলা শুনতে পেলাম। ওরা ফিরে আসছে।

ওদের গলা শুনে আমি ও দুর্গাদা উঠে দাঁড়িয়ে ওদের দিকে এগিয়ে গেলাম।

কী হল? আমি বললাম।

ঋজুদা হাসছিল।

বলল, কিছু হয়নি এখনও, তবে হতে পারে।

দুর্গাদা বলল, বড় নদীর দহটার দিকে গেছিলে?

ঋজুদা অবাক হয়ে বলল, কোন্ দহ?

দুর্গাদা বলল, রাজেন কি জানো দহটার কথা?

বিরক্তির গলায় রাজেনদা বলল, কোন্ দহ? এ-জঙ্গলে কোনও দহ-টহ নেই। মাঠিয়াকুদুতে চাকরি করেছ সুরবাবুদের ক্যাম্পে, তা বলে জঙ্গল আমার চেয়ে তুমি ভাল চেনো দুর্গা তা আমি বিশ্বাস করি না।

দুর্গাদা চুপ করে রইল মাথা নামিয়ে। তা

রপর বলল, তবে তাই।

ঋজুদা বলল, রাজেন, আগে কম্ফুর কী বন্দোবস্ত করবে, তা ঠিক করো। ওর কোনও আত্মীয়স্বজন নেই?

এক ভাই আছে।

কোথায়?

চৌ-দুয়ারে।

সে তো অনেক দূর। এক্ষুনি নিয়ে যাওয়া যাবে না। তা ছাড়া যে-ভটকাই দাদাকে এইভাবে আজ দু বছর ছেড়ে রেখেছে জঙ্গলে-পাহাড়ে, শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষায়, সে মুখে আগুন দিল কি দিল না তাতে যায় আসে না কিছুই। ওকে আমরাই দাহ করব মাঠিয়াকুদু নালার ধারে। সেখানেই বহু বছর ও থেকেছে। ক্যাম্পে কাজ করেছে। চলো, আমরা ওকে সেখানেই বয়ে নিয়ে যাই। দাহ করব রাতে।

যদি পুলিশে গোলমাল করে? পুলিশের একমাত্র কাজই তো গোলমাল করা।

দুর্গাদা বলল।

না, তা না। তবে পোস্টমর্টেমের মতো দুর্গন্ধ, লজ্জাকর প্রহসনের কোনও দরকার নেই। গ্রামাঞ্চলের দু-একটি পোস্টমর্টেমের অভিজ্ঞতা আমার আছে। ওসব ভুলে যাও তোমরা। পুলিশ তো গ্রেপ্তার করবে আপনাকে এই মৃতদেহ জ্বালিয়ে দিলে। সে আমি বুঝব এখন। তোমাদের চিন্তা নেই।

রাজেন তুমি বন্দুক হাতে গাছে বসে ওর শব পাহারা দেবে। ততক্ষণে দুর্গাকে নিয়ে আমরা হাতিটার একটু খোঁজ করে আসি।

এখন যাবেন? এই রোদে! দুটো প্রায় বাজতে চলল। খাওয়াদাওয়া? রাজেন বলল।

এই কথাতে অত্যন্ত বিরক্ত মুখে তাকাল ঋজুদা রাজেনের দিকে।

কম্ফুকে তো আমার চেয়ে তোমরা অনেক বেশি চেনো। তোমাদেরই সহকর্মী ছিল সে। তার মৃত্যুর কারণে আমাদের সকলেরই আজ উপোস। তার আত্মার প্রতি সম্মান দেখানোর জন্য।

দুর্গাদা বলল, নিশ্চয়ই। নিশ্চয়ই। তাই তো করা উচিত।

ঋজুদা বলল, চল, নালা থেকে পেট ভরে জল খেয়ে নিই। যা রোদ। কখন আবার খাওয়া জোটে তার ঠিক কী।

আদৌ কোনওদিন জোটে কি না, তারই বা ঠিক কী!

আমি বললাম, কম্ফুর দিকে চেয়ে।

যা বলেছিস।

বললাম, চলো।

ঋজুদা বলল, তার আগে চল সকলে ধরাধরি করে কম্ফুকে ছায়াতে নিয়ে গিয়ে শোওয়াই। বড় রোদ লাগছে বেচারার। একটা মানুষের মতো মানুষ ছিল রে কস্ফু। ওর বউ ওর মতো মানুষের দাম বোঝেনি।

আমি বললাম, যদি নাই-বা দাম বোঝে কেউ তা হলেও চোরের উপর রাগ করে মাটিতে ভাত খাওয়ার তো কোনও মানে নেই।

নিশ্চয়ই নেই।

ঋজুদা বলল।

আগে আমরা রাইফেলগুলো জিপে রাখলাম। জিপটাকেও ছায়াতে নিয়ে এসে দাঁড় করালাম। তারপর চারজনে হাত লাগিয়ে ওই রক্তাক্ত মাংসপিণ্ডকে বয়ে নিয়ে এসে নালার পাশে ঠাণ্ডা স্নিগ্ধ জায়গাতে রাখলাম। রেখে, নালার জলে হাত ধুলাম ভাল করে। মানুষের রক্তেও জানোয়ারের রক্তের মতো বগন্ধ থাকে। তারপর উজানে গিয়ে পরিষ্কার জল দেখে চোখে-মুখে-ঘাড়ে কানের পিছনে জল দিয়ে পেট ভরে জল খেলাম।

ঋজুদা বলল, চল এবার। ডে-লং-নাইট-লং ভিজিত্। হাতিটাকে যখন চাক্ষুষকরা গেছে এই সুযোগ নষ্ট করলে চলবে না। তা ছাড়া কম্ফুকে ও এমন করে চোখের সামনে মারাতে ওর সঙ্গে আমাদের এক ধরনের ব্যক্তিগত শত্রুতাও জন্মে গেল। এখন ভেত্তো র সময়। খুনের বদলা খুন।

রাজেনকে নিজের পাইপের টোব্যাকো-পাউচ থেকে একটু সুগন্ধি তামাক দিয়ে ঋজুদা বলল, আচ্ছা রাজেন, আমরা তা হলে এগোচ্ছি। তুমি পারলে কিছু জ্বাল কাঠ কেটে রাখো এখনই। ফিরে এসে আমরা ক্যুকে দাহ করব।

দুর্গাদা বলল, আমাদের মধ্যেও কাউকে করতে হতে পারে। কে বলতে পারে?

ঋজুদা ধমকে বলল, বাজে কথা বলবে না দুর্গা। ভাল কাজে বেরনোর আগে আজেবাজে কথা ভাল লাগে না।

তারপর বলল চলি আমরা রাজেন।

আইজ্ঞাঁ। রাজেনদা বলল।

আমরা তিনজনে গেলি বনের মধ্যে মাইলখানেক যাওয়ার পর ঋজুদা বলল, হাতিটা কিন্তু ওই দহ না কী বলছে দুর্গা, সেদিকেই গেছে। এতক্ষণে হাতির কাছে পৌঁছে যাওয়া যেত। কেন যে রাজেন বলল না।

রাজেন জানতই না ঋজুবাবু।

তা তুমি এলে না কেন? আমি তো এবার শিকার করতে আসিনি। সঙ্গে-সঙ্গে গুলি করার সুযোগ পেলে ঝামেলাই মিটে যেত।

আমাকে তো ডাকলেনই না। ঝড়ের মতো চলে গেলেন। আমাকে তো থাকতেই বলে গেছিলেন।

তাও তো থাকলে না। হাতির হাতে মরার কথা তো তোমারই ছিল আজ।

আমি বললাম।

তাই?

অবাক হয়ে ঋজুদা বলল।

তাই নয়?

মাথা নিচু করে দুর্গাদা বলল, জল খেতে গেছিলাম আর আমগাছ থেকে কিছু কাঁচা আমও পাড়তাম। পঞ্চমী কাঁচা আম খেতে খুব ভালবাসে। বিয়ে হয়ে চলে যাবে মেয়েটা।

ঋজুদা সহানুভূতির গলায় বলল, যাই হোক, এমন মূখার্মি আর কোরো না।

এটুকু বলেই থমকে দাঁড়িয়ে গেল ঋজুদা।

কী, হল? আমি বললাম।

হাওয়া ঘুরে গেছে।

দুর্গা সঙ্গে সঙ্গে হাঁটু গেড়ে বসে মাটি থেকে একমুঠো ধুলো নিয়ে উড়িয়ে দিল। ধুলোগুলো আমাদের সোজা সামনে উড়ে গেল। দুর্গাদার মুখ প্রসন্নতায় ভরে গেল।

কী? ঋজুদা শুধোল।

না ঠিক আছে। আমরা দু মাইল গিয়ে তারপর অপেক্ষা করব। এই। হাওয়াতে হাতি গন্ধ পাবে আমাদের। কারণ দহটা, আমরা যেখান থেকে বাঁয়ে মোড় নেব, সেখান থেকে প্রায় আধমাইলটাক ভেতরে।

ঋজুদা বলল, বাঁচালে দুর্গা। তবে কথাবাতা এখন থেকে একদম বন্ধ। কথাবার্তা হবে মাঠিয়াকুদু নালাতে কম্ফুর মৃতদেহের কাছে ফিরে গিয়ে।

দুর্গাদাও সে কথাতে সায় দিল।

বৈশাখের মাঝামাঝি। রোদ বেশ কড়া। গাছে পাতা থাকলে রোদ অবশ্য বোঝাই যেত না। লু-এর মতো দমকে দমকে বাতাস বইছে শুকনো পাতা আর লাল ধুলো উড়িয়ে। নাকের মধ্যে দিয়ে সে হাওয়া গিয়ে মাথার মধ্যে, যেখানে যা-কিছু আর্দ্রতা ছিল, তা শুকিয়ে দিচ্ছে।

আমরা সিঙ্গল ফরমেশনে হেঁটে চলেছি, নরম সাদা গেলি বনের ঝাঁঝ-ওঠা জঙ্গলে। মাথার নীচের খুলি গরম হয়ে উঠছে। গরম হয়ে উঠছে রাইফেল। যেখানে হাত লাগছে ইস্পাতে, ছেকা লেগে যাচ্ছে। আস্তে-আস্তে হাঁটছি আমরা। কিন্তু আস্তে হাঁটতেও কষ্ট হচ্ছে এই রোদে। ঘড়িতে দুটো বেজে পনেরো এখন। সকাল থেকে সেই ডিমের পোচ আর চা ছাড়া পেটেও কিছু পড়েনি।

ঋজুদা ফিসফিস করে কানের কাছে মুখ লাগিয়ে বলল, এক কাপ চা পেলে বেশ হত। কী বল?

মাথা নাড়লাম আমি। ভাবছিলাম, ভটকাই আর তিতির, এবিকাকু আর ফুটুদার তত্ত্বাবধানে জম্পেশ করে খেয়েদেয়ে এখন হয় ঘুম লাগিয়েছে, নয় ওয়ার্ড-মেকিং খেলছে। দরজা-জানলা বন্ধ ঠাণ্ডা ঘরে। এই গেণ্ডুলির বনে যদি কেউ পথ হারায় তো পথ সে খুঁজে পাবে না বছরের অন্য সময়ে। এখন ন্যাড়া বলে আমাদের ডান দিকের উঁচু পাহাড়, মায় লালমাটির রাস্তাটাসুদু দেখা যাচ্ছে। সেই শিঙাল-শম্বরটা ওই রাস্তা দিয়ে পাহাড়ের গায়ে গায়ে একা হেঁটে যাচ্ছে শিঙ উঁচিয়ে খাঁখাঁ খর রোদে।

ভাবছিলাম, যত পাগল এসে জুটেছে এখানে, কী মানুষ, কী জানোয়ার!

কতক্ষণ হাঁটলাম, খেয়াল ছিল না। একসময় ঘড়িতে দেখলাম, সাড়ে-তিনটে বাজে।

দুর্গা ইশারাতে বলল, এবার আমাদের বাঁয়ে মোড় নিতে হবে। আধ মাইল গেলেই দহ। সেখানে গভীর জঙ্গল। ছায়াচ্ছন্ন। নিবিড়। এই গ্রীষ্মেও আরাম।

ভাবলাম, হাতিও সে কারণেই গেছে। এয়ার কন্ডিশন্ড কমফর্টে।

ঋজুদা একমুহূর্ত দাঁড়িয়ে কী যেন ভেবে নিল। তারপর পাইপটাকে নিভিয়ে, ছাই ঝেড়ে বেল্টের সঙ্গে গুঁজে রাখল।

দুর্গাদা একটা বিড়ি ধরিয়েছিল। বিড়িটা শেষ না-হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করল ঋজুদা। তারপর আমরা বাঁ দিকে মোড় নিয়ে আস্তে-আস্তে এগোলাম।

কিছুক্ষণ চলার পরই অন্যান্য গাছ দেখা যেতে লাগল। এমন গাছ, যাদের পাতা ঝরে না এবং ঝরলেও ঝরে শীতকালে। একটু-একটু ছায়া পেতে লাগলাম এখন। হাওয়াটাও তত গরম লাগছে না আর। জলের দিকে এগোচ্ছি বলেও হয়তো-বা। আর-একটু যেতেই লাল কাদা মেখে লালমুখো সাহেব-হয়ে-যাওয়া একদল শুয়োরের সঙ্গে দেখা হল আমাদের। তাদের মধ্যে কয়েকটি বেশ বড় দাঁতাল ছিল।

আমরা থমকে দাঁড়িয়ে গেলাম। সম্মান দেখালাম ওদের, যোগ্য সম্মান। শুয়োর-টু যেই খেয়েছে, সেই সম্মান দেখায়। আমরা সকলেই কখনও-না-কখনও খেয়েছি।

শুয়োরেরা জলের দিকে চলে গেল। আমরা যেদিক দিয়ে গেণ্ডুলি বনে ঢুকেছিলাম, ওরা তার উলটো দিক থেকে এসেছিল। তার পর দেখা হল একদল বিরাট-বিরাট গল্বর সঙ্গে। গাউর বা ইন্ডিয়ান বাইসন। তারা শুয়োরেরা যেদিক থেকে এসেছিল, সেদিকে চলে গেল। মানে, দহর দিকে। তারাও আমাদের কিছু বলল না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *