বড় তেতরা বা মিটকুনিয়া গাছের উঁচু ডালে, রোদে বাদামি ঝিলিক তুলে চমকে বেড়াবে এ-ডাল থেকে ও-ডালে নেপালি ইঁদুর বা জায়ান্ট-স্কুইরেলরা। মিটকুনিয়া গাছেদের ডালের পাতায়-পাতায় ঝরনার শব্দ উঠবে ঝরঝর করে। রোদ ছিটকে যাবে ঘন সবুজ ক্লোরোফিল-ভরা পাতায়-পাতায়।
ঋজুদা বলল, রাজেনদা, প্রথমেই লবঙ্গি বাংলোতে যাবে? না মাঠিয়াকুদু নালায়, যেখানে পায়ের ছাপ দেখেছ গুণ্ডাটার?
সেখানেই প্রথম চলুন। মানে, নালায়। দেখেটেখে এসে তারপর বুদ্ধি আঁটা যাবে।
বেশ। রুদ্রকে পথ বলে দিও। আমি তো অনেক বছর পরে আসছি। এদিকে।
ঋজুদা বলল।
পুরানাকোটের মোড়ে এসে পৌঁছলাম। সামনে টুকা যাবার পথ চলে গেছে। আর ডান দিকে গেলে পুরানাকোট। আমরা বাঁয়ে অঙ্গুলের পথ ধরলাম। এই পথেই পম্পাশর পৌঁছে আমরা ডাইনে মোড় নেব। তারপর পাহাড়ের পর পাহাড় পেরিয়ে এগোব লবঙ্গির দিকে।
ঋজুদা বলল, এই নালাই কি সেই নালা যেখানে ফুটুদারা একবার কাঠ কাটার জন্য ক্যাম্প করেছিল বছর কুড়ি আগে? আমিও এসে ছিলাম কদিন? এবিকাকু একদিন থেকে চলে গেছিল?
হ্যাঁ, সেই নালাই তো! মনে নেই? ট্রাকে করে কাঠ টানার মোষ আনবার সময় একটা মোষ ট্রাক থেকে খাদে পড়ে গেছিল? তারপর জড়িবুটির বৈদ্য কম্ফু তাকে ধীরে-ধীরে সারিয়ে তুলল? কম্ফুর বউও ছিল সীতা। ছেলে কুশ।
আছে মনে। কম্ফু কেমন আছে? কোথায় আছে এখন?
সে আর জিজ্ঞেস করবেন না ঋজুবাবু। তার সঙ্গে হয়তো জঙ্গলেই দেখা হয়ে যাবে আমাদের। ভাবলেই কষ্ট হয়।
কেন, কী হয়েছে তার? এই গুণ্ডা হাতির জঙ্গলে কী করছে সে?
কম্ফু পাগল হয়ে গেছে ঋজুবাবু। তার বউটা তার ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে তাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার পর থেকেই পাগল-পাগল ভাব হয়েছিল। এখন উন্মাদ। একেবারেই উন্মাদ।
সে কী! থাকে কোথায়? কোনও ডেরা-টেরা নেই?
ওই লবঙ্গির জঙ্গলেই। বাংলোতে, না বস্তিতে?
না বাবু, জঙ্গলে। গান গায়! কখনও খালি গায়ে চাঁদনি রাতে বনময় ঘুরে বেড়ায়। গুহাতে বা নদীর ধারে গাছের ছায়ায় থাকে। এই গরমের আর বর্ষার দিনেই ভয়। যে-কোনওদিন সাপ বা বিছের কামড়ে মারা যাবে। আর মরে গেলে কেউ জানতেও তো পারবে না। হায়েনাতে শেয়ালে শকুনে ছিঁড়ে-খুঁড়ে খাবে। জংলি জানোয়ারে আর কম্ফুতে কোনও তফাত নেই এখন আর।
ইশ। খায় কী কম্ফু?
ঋজুদা দুঃখিত গলায় বলল।
খাবে আর কী! নদীর জল আর বনের ফলমূল। ওই অঞ্চলে খুব বড়-বড় আমগাছ যে আছে, তা তো জানেনই। গরমের সময় আম খেয়েই পেট ভরে যায়। তবে ভয়ও আছে সেখানে। আম তো হাতি আর ভালুরও প্রিয় খাদ্য। আর এখানে যে কী প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড ভালু আছে তা তো আপনি দেখছেনই। আর এখন তো হাতির দল নয়, গুণ্ডা হাতির রাজত্ব। দুটো ভালুকেও থেঁতলে দিয়েছে গুণ্ডাটা। কাল দেখে এলাম আমরা। শকুন পড়েছে তাদের তালগোল পাকানো পিণ্ডর উপরে। হাতিটা কাছেই ছিল কি না তা কে জানে! জঙ্গলে হাতি যখন চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে, গুণ্ডা হাতি হলে তো কথাই নেই, তখন তার গায়ের সঙ্গে ধাক্কা লাগার আগে তো বোঝা পর্যন্ত যায় না।
তা ঠিক। ঋজুদা বলল।
তারপর আমাকে বলল, বুঝলি রুদ্র, হাতিদের পথঘাট, চড়াই-উতরাই সম্বন্ধে এমনই জ্ঞান যে এঞ্জিনিয়াররাও তাদের সম্মান করে। ঠাট্টা নয় কিন্তু। যে-কোনও জায়গাতেই পি-ডব্লু-ডি অথবা ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট, অথবা জঙ্গলের ঠিকাদাররা কাঠ গভীর জঙ্গল থেকে বের করে নিয়ে আসবার জন্য রাস্তা যখন তৈরি করে তখন হাতিদের চলাচলের পথ ধরেই সে রাস্তা তৈরি করা হয়। বিশেষ জরিপ, এ্যাডিয়েন্টের হিসেবপত্রের ঝামেলা অনেক কমে যায়। অবশ্য এই সুবিধা পাওয়া যায় যে-জঙ্গলে হাতি থাকে সেখানেই। কোন জংলি নদীর ঠিক কোনখানে ব্রিজ হবে তাও ঠিক করা হয় অনেক সময় হাতিদের নদী-পারাপারের জায়গা দেখে।
এবার পম্পাশরের মোড়ে এলাম আমরা। বড় রাস্তা ছেড়ে ডান দিকের পাহাড়ে চড়ালাম জিপ। খুব খাড়া নয় পাহাড়। সেকেন্ড গিয়ারেই টেনে নিল। একটু গিয়েই ডান দিকে দুর্গার্দার বাড়ি। দুর্গাদা তার স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করবে বলে নামল জিপ থেকে। ঋজুদাকে বলল, একটু কিছু খেয়ে যাবেন না? রুদ্রবাবু তো এই প্রথম পম্পাশরে এল।
ঋজুদা বলল, তোমাদের বাড়িতে অনেকবার খেয়েছি। আর রুদ্র তো তোমার জামাই নয়। এবার শুধু জল খাব। তাড়াতাড়ি করো।
জামাইয়ের কথা বলায় দুর্গাদা আর আমি দুজনেই লজ্জিত হলাম।
দুর্গাদা জিপ থেকে নেমে দৌড়ল।
রাজেনদা বিড়ি খাওয়ার জন্য জিপ থেকে নেমে গাছের আড়ালে যাচ্ছিল। ঋজুদা তাকে বকে দিয়ে বলল, তোমাকে অনেকদিন বারণ করেছি। বলেছি না, আমার সামনেই বিড়ি খাবে।
দুর্গাদা একটু পরেই ফিরে এল ঝকঝকে করে মাজা পেতলের ঘটি হাতে করে। সঙ্গে দুগর্দার ত্রয়োদশী, লাল শাড়ি পরা, নাকে পেতলের নোলক আর হাতে লালরঙা কাঁচের চুড়ি পরা লজ্জাবতী মেয়ে। তার হাতেও ঝকঝকে করে মাজা পেতলের থালা, তাতে দুটি ঝকঝকে গ্লাস উপুড় করা আর কটি বাতাসা। লজ্জাবতী ঝোপের পাশে দাঁড়ানো দুর্গাদার উজ্জ্বল মেয়েকে ভারী সুন্দর দেখাচ্ছিল।
ঋজুদা শুধোল, তোমার নাম কী?
সে বলল, পঞ্চমী।
আমি ভাবলাম, ত্রয়োদশীর পঞ্চমী হতে আরও দুবছর বাকি।
দুর্গাদা বলল, মেয়ের বিয়ে ঠিক করেছি। সামনের শীতে। আপনি আসবেন তো ঋজুবাবু? রুদ্রবাবুদের সকলকে নিয়ে আসবেন। তিতির দিদিমণি, ভ্যাটকালুবাবুকে।
আমি বলল, ওর নাম ভ্যাটকালু নয়, ভটকাই।
দুর্গাদা জিভ কাটল।
ঋজুদা বলল, আসতে পারি আর না পারি নেমন্তন্নের চিঠি যেন অবশ্যই পাই তারিখ জানিয়ে। খুব জরুরি কাজ না থাকলে অবশ্যই আসব।
গেলাস দুটো সোজা করে দিয়ে শক্ত হাতে থালাটা ধরল পঞ্চমী। দুর্গাদা জল ঢেলে দিল ঘটি থেকে। আঃ, কী মিষ্টি, ঠাণ্ডা জল। ঝরনার জল বোধহয়।
জামাই করে কী? ও দুর্গা?
দুর্গাদা বলল, জামাই বিনকেইতে থাকে। ওদের একটা নৌকো আছে। তার বাবা আর সে চৌকো চালায়। যখন ভাড়া না পায় তখন মাছ ধরে। সাতকোশিয়া গণ্ডে।
আমি ভাবলাম, বাঃ। কলকাতার খবরের কাগজগুলোতে পাত্র-পাত্রীর কলামে বিজ্ঞাপন বেরোয় পাত্র সুদর্শন, ব্যাঙ্কের চাকুরে অথবা ডাক্তার, এঞ্জিনিয়ার, চাটার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। তারপর থাকে, কলিকাতায় পৈত্রিক/নিজস্ব বাড়ি। আর পঞ্চমীর বিয়ে হবে যার সঙ্গে তার পরিবারের দুপুরুষের সম্পত্তি বলতে একখানি নৌকো। অবশ্য মাথা গোঁজার মতো ঘর ডাঙাতেও নিশ্চয়ই থাকবে একটা!
দুর্গাদা যেন আমার মনের কথাই শুনতে পেয়ে বলল, জমিজমা থাকলে কি আর নৌকো চালিয়ে খায়। ওই গভীর গণ্ড। তাতে কুমির ভরা। কিন্তু কী করব। গরিবের তো কোনও চারা নেই। যেমন জুটল তেমনই দিলাম। তাও আবার ছেলের বাপ একটা সাইকেল চায়। দশজন বরযাত্রীকেও খাওয়াতে হবে বিয়ের রাতে। খরচ কি কম!
ঋজুদা বলল, তোমার জামাইয়ের সাইকেলটা না হয় আমিই দিয়ে দেব। ও নিয়ে মোটেই চিন্তা কোরো না তুমি। আর পঞ্চমীকে দেব একটা সম্বলপুরি সিল্কের শাড়ি। এইরকমই লাল। যেমন লাল ও পরেছে। লাল রং বুঝি তোমার খুব পছন্দ? কী পঞ্চমী? মধ্যে হাতির কাজ করা থাকবে। কী রে, পঞ্চমী, পছন্দ হবে তো?।
পঞ্চমী লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নিল। মনে হল, কেউ যেন ওর পায়ের কাছে লজ্জাবতীর ঝোপে আঙুল ছুঁইয়েছে। পঞ্চমী দাঁড়িয়েই ছিল লজ্জাবতীর ঝাড়ে। এমনও কি হয়? ভাবছিলাম আমি।
দুর্গাদাও কম খুশি নয়। বলল, বাবু, পূর্বজন্মে আপুনি মোর বাপ্প থিলা।
ঋজুদা হেসে ফেলে বলল, ভালই বলেছ।
তারপর বলল, সময় নষ্ট না করে নাও এবার চললো। যদি এ যাত্রা বেঁচে ফিরি তে ফেরার সময় তোর আর তোর মায়ের হাতে ডাল-ভাত খেয়ে ফিরব। বুঝলি পঞ্চমী?
পঞ্চমী সঙ্গে-সঙ্গে হেসে মুখ সামনে করে বলল, কী ডাল খাবে?
ঋজুদা বলল, বিরি ডাল।
পঞ্চমী মাথা হেলিয়ে বলল, আচ্ছা। তখন না বললে হবে না কিন্তু।
আমি ভাবছিলাম, খুব সপ্রতিভ, ঝকঝকে মেয়ে এই পঞ্চমী।
বিরি ডাল মানে কলাই ডাল। গরমে ঋজুদার খুবই প্রিয়।
রাজেনদাকে, যেকটা বাতাসা ছিল, দুর্গাদা জোর করে খাইয়ে দিল। ঘটি থেকে রাজেনদা ঢকঢকিয়ে জল খেল, তারপর তার নীলরঙা ফুলহাতা শার্টের হাতা দিয়ে মুখটা মুছে নিল।
আমি জিপটা স্টার্ট করলাম।
দুর্গাদা পঞ্চমীকে বলল, মু চলিলি রে মা। সাবধানে রহিবি তমমান্তে।
পঞ্চমী মাথা হেলাল।
মাথা হেলানো দেখে মনে হল কথা বললে ওকে অত সুন্দরী দেখাত না। আমার এই সুন্দর দেশের গরিব ঘরের ঘর-আলোকরা রাজকন্যে!
পাহাড় চড়তে-চড়তে আমি শুধোলাম, সাতকোশিয়া গণ্ড কী ব্যাপার ঋজুদা?
সে কী রে! তুই ভুলে গেলি?
অবাক গলায় বলল ঋজুদা। সেই যে প্রথমবার তুই এসেছিলি আমার কাছে, যখন আমার সাতটা দিশি কুকুর ছিল জঙ্গলে, যাদের নাম ছিল, সা-রে-গা-মা-পা-ধা-নি। আর তুই তো সেবারের আসা নিয়ে ঋজুদার সঙ্গে জঙ্গলে না কী একটা বইও লিখেছিলি!
ও তাই তো! ভুলেই গেছিলাম। নয়নামাসিরাও তখন এসেছিল টিকরপাড়া বাংলোতে। তাই না?
হ্যাঁ। ঋজুদা বললে।
তারপর বলল, সাতকোশিয়া গণ্ড হচ্ছে সাত ক্রোশ বা চোদ্দ মাইল লম্বা GORGE বা গিরিখাত, যার আরম্ভ হচ্ছে বিকেইতে। চৌদুয়ারে পৌঁছবার আগেই হঠাৎ চওড়া হয়ে ছড়িয়ে গেছে মহানদী, তিস্তা যেমন কালিঝোরার পর করোনেশন ব্রিজ পেরিয়েই হয়েছে, জব্বলপুরের মার্বেল রক পেরিয়েই যেমন নর্মদা। এই গণ্ডের দুপাশেই গভীর জঙ্গল-পাহাড়। এখানের নদীতে মাছ আর কুমিরের ছড়াছড়ি। হাজার-হাজার বাঁশের ভেলা বানিয়ে ঠিকাদাররা বাঁশ চালান দেয় কাগজকলে। সেই ভেলা করে একবার গিয়েছিলাম টিকরপাড়া থেকে চৌদুয়ার। তার ডায়েরিও রেখেছিলাম একটা। খুঁজে বের করতে হবে। সে এক অভিজ্ঞতা।
এইবার জিপ বেশ উঁচুতে চলে এসেছে। পাহাড়ের একেবারে গায়ে-গায়ে নাবাল মাটির রাস্তা আর তার ডান দিকে গভীর খাদ। গভীর জঙ্গলে ভরা তা। কিন্তু নীচের সব কটি গাছই গেণ্ডুলি। একটি শিমুলও আছে। গেলি গাছে এখন একটি-দুটি পাতা এসেছে, শিমুল গাছেও নতুন পাতা এসেছে। ওই ন্যাড়া, রুক্ষ পটভূমিতে শিমুল গাছগুলোর গায়ে কিছু কিছু কিশলয় কী যে সৌন্দর্য এনে দিয়েছে তা বলবার নয়।
ঋজুদা বলল, এই গেলি গাছগুলো কেন বড় করা হচ্ছে জানিস? লালনপালন?
কেন?
এই গাছ দিয়ে, সম্ভবত এর আঠা দিয়ে, পলিয়েস্টার ফাইবার তৈরি হয়। নরম গাছ তো! আঁশ থাকে এতে। যেসব মানুষ পলিয়েস্টারের জামা পরতে ভালবাসেন, তাঁদের যদি ওই গাছগুলোকে গ্রীষ্মে বা শীতে বা বর্ষায় বা বসন্তে একবার দেখবার সুযোগ দেওয়া হত, তা হলে তাঁরা সকলেই বলতেন, থাক, থাক। এই গাছগুলো বাঁচুক, বন বাঁচুক। পলিয়েস্টারের জামা আমরা পরব না। বিজ্ঞানের অগ্রগতিটুকুই আমাদের চোখ ধাঁধাঁয়, কিন্তু সমস্ত চোখ-ধাঁধানো নতুন-নতুন পণ্যের পেছনে যে প্রকৃতি চোখের জল ফেলতে-ফেলতে রিক্ত, বিবস্ত্র, নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে, বিশেষ করে কাণ্ডজ্ঞানহীন মানুষে-ভরা এই দেশে, তার খবর কজন আর রাখে বল?
দুর্গাদা আমাকে বলল, রুদ্রবাবু, এবার একটু আস্তে চলোলা। সামনে পর পর বাঁক আছে কয়েকটা। হাতির জায়গায় তো পৌঁছেই গেছি আমরা। বিশ্বাস কী তাতে? জিপের শব্দ শুনেই হয়তো বাঁকের মুখে এসে দাঁড়িয়ে রইল। এক ধাক্কায় জিপকে ফেলে দেবে নীচে।
ঋজুদা বলল, জিপটা একটু দাঁড়ই করা রুদ্র। রাইফেল আর গুলিগুলো বের করে নে।
রাজেনদা বলল, পরে বের করলেও হবে। আমার হাতে তো দুনলা বন্দুক আছে।
ঋজুদা বলল, এ যদি তোমার বন্দুকেরই কম্ম হত রাজেন, তবে কি আমাকে কষ্ট দিয়ে ডেকে আনতে তোমরা? নিজেরাই কখন কাজ সেরে রাখতে যে, না জানতে পেতাম আমি, না ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট!
রাজেনদা লজ্জা পেল।
আমি জানতাম যে, রাজেনদা চোরা শিকার করে। দুর্গাদাও করে। কিন্তু তা করে একটু মাংস খেয়ে মুখ বদলাবারই জন্যে। নমাসে-ছমাসে একটু মাংস খেতে পায় ওরা। সেজন্য বন-জঙ্গলের বেশি মানুষই প্রোটিন ডেফিসিয়েন্সিতে ভোগে। সমস্ত ন্যায়-অন্যায়ই রিলেটিভ, মানে আপেক্ষিক। প্রত্যেক মানুষকে তার পটভূমিতে ফেলে বিচার করে তারপরই রায় দিতে হয়। তাই বোধহয়। কথায় বলে, ল ইজ নাথিং বাট কমন সেক্স।
তোর রাইফেলে গুলি ভরিস না। আমার রাইফেলটা দে। হাতে ধরে বসে থাকি।
ঋজুদা বলল আমাকে, রাইফেল দুটো বের করার পর।
পথটা এঁকেবেঁকে চলেছে। বাঁ দিকে একেবারে সোজা পাহাড়। কোথাওবা একটু ন্যাড়া-ন্যাড়া দেখায়। সেরকম একটি ন্যাড়া জায়গাতে দেখি বাঁদরদের সভা বসেছে। ওদের পঞ্চায়েত নির্বাচন বোধহয় এসে গেছে। নেতা বক্তৃতা করছে। অন্যেরা শুনছে, কেউ গালে, কেউ মাথায় হাত দিয়ে বসে। কেউবা শুনছে মাথার উকুন বাছতে-বাছতে। অনেকেরই মুখ বাঁদরদের ভবিষ্যৎ চিন্তায় উদ্বিগ্ন। জনগণ সম্বন্ধে ভেবে ওদের নেতাদেরও রাতে ঘুম হচ্ছে না। মাথার চুলও পাতলা হয়ে গেছে।
রাজেন বলল, এবারে পথটা ছেড়ে ডান দিকের নীচের পথে নামতে হবে মাঠিয়াকুদু নালার দিকে।
দেখতে-দেখতে গভীর জঙ্গলের দিকে জিপ গড়িয়ে যেতে লাগল। বেলা দশটাতে ছায়াচ্ছন্ন জায়গাটা। দূর থেকেই দেখা যাচ্ছিল।
মাঠিয়াকুদু নালার কাছাকাছি পৌঁছে জিপ থামিয়ে দিলাম।
রাজেনদা বলল, জিপটাকে ছেড়ে যাওয়া চলবে না। রুদ্রবাবু আর দুর্গা জিপেই থাকুন। এবং জিপটা ঘুরিয়ে একটু ফাঁকা জায়গায় নিয়ে দাঁড় করান। গায়ে রোদ লাগলে লাগবে। তবু হাতি এলে তাকে দেখার সুযোগ পাবেন। জঙ্গল থেকে একটু দূরেই থাকুন। আমি আর ঋজুবাবু একটু নেমে দেখে আসি।
রাজেনদার কথামতোই কাজ করলাম।
ঋজুদা বলল, এবার তোর রাইফেলে গুলি ভরে নে। তবে হাতি এলেও তুই একা গুলি করবি না। জোরে জিপ চালিয়ে চলে যাবি। দুর্গা লবঙ্গির ফরেস্ট বাংলোর পথ চেনে।
কেন?
যা বললাম তাই করিস। এখন তর্কাতর্কির সময় নয়।
আমরা না হয় হেঁটেই ফিরব তেমন হলে। তবে ফিরতে ফিরতে বিকেল হয়ে যাবে। দেরি দেখলে আবার জিপ নিয়ে ফিরে আসিস, বা নালা অবধি না ফিরে, দূরে দাঁড়িয়ে থাকিস। ফাঁকায়। গুলি করতে পারিস নেহাত প্রাণ বাঁচানো জরুরি হয়ে পড়লে। ওই হাতি শিকারের জন্যে তোর রাইফেল দিয়ে গুলি করিস না আমি সঙ্গে না থাকলে। আবারও বলছি। মনে রাখিস।
চলে যাবার আগে, ঋজুদা বলল, হাতির কোথায় গুলি করতে হবে জানিস তো? মনে আছে? রুআহাতে ভাল করে শিখিয়েছিলাম তোকে।
হ্যাঁ, মনে আছে। বিরক্ত গলায় বললাম।
ঋজুদাটা বুড়ো হয়ে যাচ্ছে। একই কথা বারবার বলে আজকাল।
গুলি কিন্তু তুই করছিস না। নেহাত প্রাণ বিপন্ন না হলে।
ঠিক আছে।
আরও বিরক্ত হয়ে বললাম।
ঋজুদা আর রাজেনদা গাছগাছালির মধ্যে হারিয়ে গেল।
রোদের মধ্যে বসে বা দাঁড়িয়ে থেকে ছায়াচ্ছন্ন জঙ্গলের দিকে চাইলে জঙ্গলকে আরও বেশি ছায়াচ্ছন্ন ও স্নিগ্ধ লাগে। দুর্গাদাকে বললাম, তুমি জিপের পেছনে বসে সামনের দিকে দ্যাখো আর ডান দিকে।
আমি বসে ছিলাম লোডেড রাইফেল নিয়ে জঙ্গলের দিকে মুখ করে, ঋজুদারা এগিয়ে গেল সেইদিকেই।
দুর্গাদা বলল, তেষ্টা পেয়ে গেল যে। তুমি বোসো। আমি নালা থেকে একটু জল খেয়েই আসছি।
সাবধানে যাবে। নিজের বাড়িতে জল খেতে পারলে না? হাতির ফুটবল হওয়ার ইচ্ছে হয়েছে বুঝি তোমার?
আমি বললাম।
দুর্গাদা বলল, রাখো তো। হাতি সেটি মু পাঁই ঠিয়া রহিছি। হঃ। অর্থাৎ ছাড়ো তো, হাতি যেন আমার জন্য সেখানে দাঁড়িয়ে আছে।
নালাটা তো দেখা যাচ্ছে না এখান থেকে। তুমি যাচ্ছটা কোথায়?
কাছেই।
বলেই দুর্গাদা জঙ্গলের দিকে এগোল। যাবার আগে বলে গেল, চুপ করে থাকলে জল বয়ে যাওয়ার কলকুলানি শব্দ তুমিও শুনতে পাবে।
ঘড়িতে চেয়ে দেখলাম, প্রায় এগারোটা বাজে। কী করে যে সময় যায়! দুর্গাদা চলে গেছে বেশ কিছুক্ষণ। জল খেয়ে ফিরে আসতে এতক্ষণ সময় লাগার কথা নয়। আমার মন কীরকম যেন করছে। কখনও এমন করে না। গুণ্ডা হাতি সম্বন্ধে কোনও অভিজ্ঞতাই আমার নেই। তিতিরটা সঙ্গে থাকলে বেশ হত।
ঋজুদার কাছে গল্প শুনেছিলাম, ডুয়ার্সের এক চা-বাগানের একজন ইংরেজ, অল্পবয়সী অ্যাসিস্টান্ট ম্যানেজার, সার্গেসান, একদিন বর্ষাকালের এক বিকেলে মুরগি মারতে গেছিল। ঝোপের মধ্যে মোরগের ডাক শুনেই যেই না ঢুকেছে পাশে মেঘমেদুর বিকেলে নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা হাতি অমনি খুঁড়ের এক ঝটকানিতে তাকে তুলে নিয়ে মাটিতে ফেলে পা চাপিয়ে দিয়েছিল তার মাথার উপর। সে না ফেরাতে, রাতে দুশো কুলি নিয়ে মশাল জ্বেলে তার বাগানের এবং অন্যান্য বাগানের ম্যানেজাররা রাইফেল নিয়ে গিয়ে খুঁজতে খুঁজতে তার বীভৎস মৃতদেহ পায়।
দুর্গাদাটা তো আচ্ছা লোক। এমন খামোখা চিন্তা করাতে পারে না। ভারী বিরক্ত লাগছে আমার। জল খেতে গেল তো ভগবানের নামেই গেল।
পথের পাশের বড় বড় সব প্রাচীন গাছে নেপালি ইঁদুররা একে অন্যকে তাড়া করে ফিরছে। ঝরঝর শব্দ হচ্ছে পাতায়। স্নিগ্ধ বৈশাখী সকালে রোদ ছিটকে যাচ্ছে বড় গাছেদের সবুজ পাতা থেকে, তাদের দৌড়াদৌড়িতে। এমন সময় একটি বিরাট শিঙাল শম্বর বন থেকে বেরিয়ে এসেই জিপটা ও আমাকে দেখে চমকে উঠে ঘ্যাক করে একবার ডেকেই বনের ভিতরে চলে গেল। জল খেতে যাচ্ছিল বোধহয়। লবঙ্গির জঙ্গল এমনিতেই অত্যন্ত গভীর এবং জনমানবশূন্য। হাতির অত্যাচার তাকে আরও ভয়াবহতা দিয়েছে। এই নির্জনে অন্ধকার নামা পর্যন্ত জলে যাবার জন্য অপেক্ষা করার প্রয়োজন বোধ করছে না। আর জানোয়ারেরা।
এমন সময় মনে হল, দুর্গাদার গলার স্বর শোনা গেল। তা হলে কি ঋজুদারাও ফিরে এল? এত তাড়াতাড়ি? কথা বলল, কার সঙ্গে?
উৎসুক চোখে তাকিয়ে রইলাম নালাটা যেখানে থাকার কথা সেদিকে।
সবুজ অন্ধকারের গভীর থেকে যে-লোকটি বেরিয়ে এল, সে কিন্তু দুর্গাদা নয়। অন্য লোক। সম্পূর্ণ নগ্ন। বড় বড় চুল-দাড়ি। প্রকাণ্ড বড়-বড় নখ হাত-পায়ের। কানের চুলও ঝুপড়ি হয়ে আছে। নাকের চুলও। লোকটা বেশ লম্বা। আর তার চোখ দুটোতে আগুন জ্বলছে। তার হাত-পায়ের নখের মধ্যে লাল মাটি ঢুকেছে এমন করে যে মনে হচ্ছে, রক্ত খেয়েছে হাত দিয়ে কোনও কিছুর মাংস ছিঁড়ে।
লোকটা কী যেন বিড়বিড় করে বলতে-বলতে সোজা আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।
কাছে আসতেই শুনলাম, বলছে, আলো শুকিলা সারু, মন মরি গলা দ্বিপাহারু।
বারবার এই এক কথাই বলছে।
বাক্যটির মানে হল, ওরে শুকনো কচু! তোর মন মরে গেল দ্বিপ্রহরেই!
লোকটা আমার সামনে এসে দাঁড়াল। তীক্ষ্ণ চোখে আমার চোখে চেয়ে রইল। তারপর বলল, মু হেৰা বারুঙ্গা আউ তু ভদ্দরনোক। মু মারিলে তু বাঁচিবি? চা। গোণ্ডুলি বন-মধ্যরে আজি তমকু কব্বর দেবি মু।
কী বিপদেই পড়লাম রে বাবা। বনের প্রাণীদের মোকাবিলা করতে পারি, কিন্তু বনের মানুষকে নিয়ে কী করি?
তার ভাবগতিক দেখে আমি রাইফেলটাকে তুলে নিয়ে কোলের উপরে রাখলাম।
তা দেখেই লোকটা হাহা করে হেসে উঠল। তার হাসিতে ছায়াচ্ছন্ন বন আর রৌদ্রদগ্ধ গেণ্ডুলি বনও যেন হাহা করে উঠল।
বলল, মত্বে মারিবি তু? গুলি মত্বে বাজিবনি।
বলেই দুটো হাত দুপাশে তুলে ঝরনা খেলাল।
আমি ততক্ষণে জিপের বনেট থেকে নেমে দাঁড়িয়েছি রাইফেল হাতে।
হঠাৎ লোকটা দুহাত তার মুখের কাছে নিয়ে, যেদিকের বনে শিঙাল শম্বরটা ঢুকে গিয়েছিল, সেদিকে মুখ ঘুরিয়ে খুব জোরে ডাকল, কুয়ারে পলাইলিরে ঐরাবত্ব। চঞ্চল করিকি আ তু! আ রে। চঞ্চল করিকি আ।
বলতেই, ওইদিকের জঙ্গলের গভীরে একটি আলোড়নের শব্দ শুনতে পেলাম আমি। গায়ের রোম খাড়া হয়ে উঠল আমার। উত্তেজনায়। তিরিশ সেকেন্ডের মধ্যে পাহাড়ের মতো এক হাতি সত্যিই জঙ্গল ফুঁড়ে বেরিয়ে এসে এক মুহূর্ত দাঁড়াল। তার দাঁত দুটো মাটিতে লুটোচ্ছিল। এত বড় হাতি যে, মনে হল আফ্রিকাতেও দেখিনি। হতবাক হয়ে গেলাম আমি। হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল তার চেহারা দেখেই।
হাতিটা পাঁচ মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে এক দৌড়ে এগিয়ে এল খুব আস্তে-আস্তে। আমি রাইফেল তুলে তার কপালে নয়, কানের পাশে কাভার করে রইলাম। যদি সত্যিই চার্জ করে। কিন্তু ঋজুদার কথাও মনে পড়ে গেল সঙ্গে-সঙ্গে। এক ধাক্কায় আমি সেই লোকটাকে জিপের পেছনের সিটে ফেলে স্টিয়ারিং-এ বসে যত তাড়াতাড়ি পারি এঞ্জিন স্টার্ট করে জিপ ছোটালাম রাইফেল পাশে শুইয়ে রেখে।
