ঋজুদার সঙ্গে জঙ্গলে – বুদ্ধদেব গুহ
পাঁচ
মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল।
কি যেন একটি জানোয়ার ডাকতে ডাকতে পাহাড় থেকে নামছে। ডাকটা এমন অদ্ভুত আর ভয়াবহ যে, গা ছমছম করে এই ক্যাম্পের মধ্যে, কম্বলের তলায় শুয়েও। প্রথমে সা-রে-গা-মা-পা-ধা-নি সাতজনেই ভুক-ভুক, কুঁই-কুঁই, কুঁক-কুঁক করে ডেকে উঠে সেই জানোয়ারকে, অন্যায়ভাবে আমাদের ঘুম ভাঙ্গাবার জন্যে বকে দিল। কিম্বা পরক্ষণেই বুঝলাম, তারা বারান্দার আগুনের কাছে, ঋজুদার খাটের একেবারে পাশে গুঁড়ি-সুড়ি মেরে বসল চুপটি করে।
আবার জানোয়ারটা ডাকল–হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ করে।
ডাকটা এমন যে, শুনলে বুকের মধ্যেটা যেন কেমন করে। বিশেষ করে এই গভীর জঙ্গলের মধ্যে শীতের শিশিরে-ভেজা মাঝ রাতে!
আবার ডাকতেই বুঝলাম, এটা একটা হায়না।
শুয়ে শুয়েই আমি বুঝতে পারছিলাম, ভিজে ধুলো মাড়িয়ে, পাথরনুড়ি, ঘাস-পাতা, ফুল-লতা সবকিছু এড়িয়ে এডিয়ে হায়নাটা পাহাড় থেকে নেমে আসছিল। শিশিরে তার অফ-হোয়াইট রঙা লোমে ভরা গা’টা ভিজে গেছে। গায়ের কালো কালো রেখাগুলো নিশ্চয়ই আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পাহাড় বেয়ে নামছে আর মাঝে মাঝে পেছনের ছোট দুটো পায়ে ভর দিয়ে সামনের দুই পায়ে দাঁড়িয়ে মুখ ঘুরিয়ে এদিকে-ওদিকে দেখছে।
ঝিঁঝি ডাকছে অন্ধকারে, একটা কুম্ভাটুয়া পাখি ডাকছে একটানা ঢাব-ঢাব-ঢাব-ঢব করে। সে ডাক অন্ধকার শীতার্ত ভিজে জঙ্গলে-পাহাড়ে, ফিনফিনে বাঁশ পাতায়, গিলিরী ফুলে, ঝর্ণার পাশে গজিয়ে-ওঠা নতুন-চিকন-সবুজ ঘাসে ঘাসে ছড়িয়ে যাচ্ছে। ধ্রুবতারাটা চুপ করে দাঁড়িয়ে তার নীল চোখে রাতের এই একটুকরো জঙ্গলে কোথায় কি হচ্ছে দেখছে।
হায়নাটা আবার ডেকে উঠছে হাঃহাঃহাঃহাঃ করে। হায়নাটা যেন সকলকে বিদ্রূপ করছে–ও যেন ঘুমিয়ে-থাকা সব প্রাণীর ঘুমন্ত বুকে ওর এই ঠাট্টার তীক্ষ্ণ অস্বস্তি উলের কাঁটার মত ফুটিয়ে দিয়ে যাচ্ছে।
হায়নাটা পাহাড় থেকে নেমে আমাদের ক্যাম্পের পাশের পথ বেয়ে গ্রামের দিকে চলে গেল।
অনেকক্ষণ আর ঘুম এল না। কুম্ভাটুয়া পাখিটা ডেকেই যেতে লাগল। ও কি রাতে ঘুমোয় না? ও খালি ডাকে ঢাব-ঢাব করে। বাঁশঝাড়ে, সাহাজ ও কুরুমের জঙ্গলে, ঠাণ্ডায় কুঁকড়ে যাওয়া পাহাড়ে পাহাড়ে ওর ডাক ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে।
কি জানি, এমনি রাতেই বাঘুডুম্বা ডাকে কিনা। যে-সব মানুষ নরখাদক বাঘের হাতে মারা যায় তারা এসব পাহাড়ে জঙ্গলে বাঘুডুম্বা ভূত হয়ে যায়। তারা হঠাৎ হঠাৎ কিরি-কিরি-কিরি-কিরি–ধূপ-ধূপ-ধূপ-ধূপ করে আচমকা ডেকে ওঠে। ডাকতে ডাকতে অন্ধকার জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়। জানি না, হয়ত এরকম রাতের বুনো-মোষদের দেবতা টাড়বাড়ো মোষের দলের সঙ্গে পাহাড়ের উপরের কোনো শিশির-ভেজা ঘাসে ভরা মাঠে দাঁড়িয়ে কথা বলে।
এই বন, এই পাহাড়, রাতের বেলায় এই গা-ছমছম করা পরিবেশ, এই পরিবেশেই বুঝি যারা দিনের আলোয় ঘুমিয়ে থাকে, সোনালি রোদে দেখাই যায় না, তারা সব ঘুম ভেঙে উঠে চলাফেরা করে, ফিসফিস করে।
শুয়ে শুয়ে আমি টিকরপাড়ার কথা ভাবছিলাম। ভাবছিলাম, আমাদের দেশটা সত্যিই কত সুন্দর, কত বিচিত্র!
এখন টিকরপাড়ার ঘাটে গিয়ে দাঁড়ালে কেমন লাগবে ভাবছিলাম।
নিস্তব্ধ রাত্রি। শুধু কুলকুল করে গভীর অতল গণ্ড দিয়ে জল বয়ে চলেছে–কোনো মাছের নৌকোর রাত-জাগা মাঝি বুঝি একা ছইয়ের নীচে বসে হুঁকো খাচ্ছে। বাঁশের ভেলা যাচ্ছে ঘুমন্ত মাঝিদের নিয়ে চৌদুয়ারের দিকে। নদীর ওপারের বৌধ রাজ্যের মাথা-উঁচু পাহাড়ের সায়ান্ধকারে একলা শিঙাল শম্বর নদীর দিকে চেয়ে কত কি ভাবছে।
ভাবছিলাম, এখন বড়মূল আর বড়সিলিঙার জঙ্গল কেমন দেখাচ্ছে। তারাভরা আকাশের নীচে বিস্তীর্ণ দুধলি-ফুল-ভরা মাঠ পেরিয়ে গুহায় ফিরছে। বড় বাঘ। চিতল হরিণের দল আমলকী তলায় জলের তলার মাছের ঝাঁকে মত চমকে উঠছে বাঘকে দেখে, তারপর পিছল অন্ধকার পেরিয়ে অন্য কোনো মাঠের দিকে চলে যাচ্ছে।
কোথাও কোনো শব্দ হচ্ছে না, শুধু টুপটাপ করে শিশির পড়ছে, শুধু ধ্রুবতারা তাকিয়ে আছে নীল চোখে, শুধু ঝিঁঝিদের ঝিম-ধরা কান্নায় ভরে আছে মাঠ, বন, পাহাড়; ভরে আছে শুকিয়ে-যাওয়া ঝর্ণার হলুদ কোল; ভরে আছে। পাহাড়তলির স্যাঁতসেঁতে, শ্যাওলা-ধরা খোল।…।
বোধহয় মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে গেছিল, আর সেজন্যেই সকালে অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছিলাম। কখন যে পুবের রোদ বড় পিয়াশাল গাছটার ডাল থেকে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল আমার কম্বলে, আমার মুখে, কিছু টের পাইনি।
চোখ মেলে দেখি, অমৃদাদা আমার চৌপায়ার পাশে দাঁড়িয়ে। বলছে, কেয়া ইয়ার? আজ দিন ভর শোনা কেয়্যা?
আমি ধড়মড়িয়ে উঠে বসলাম।
বাইরে বেরিয়ে দেখি, রোদে ভরে গেছে চারপাশ। একদল টিয়া পাশের গাছগাছালিতে টা টা করছে ক্যাম্পফায়ারের পোড়া কাঠের গন্ধ বেরুচ্ছে, সামনের টুন গাছের ডালে একজোড়া খয়েরী-কালোয় মেশা বড় কাঠবিড়ালি পাতায় পাতায় ঝরঝরানি জাগিয়ে উঁচু ডালময় দৌড়োদৌড়ি করে বেড়াচ্ছে। শীতের সকালের খুশীভরা উষ্ণ রোদ এসে পড়েছে ওদের ভেলভেটের মত নরম গায়ে।
মুখ-টুখ ধুয়ে ক্যাম্পচেয়ারে বসলাম, চা খেলাম।
এমন সময় দেখি ঋজুদা গ্রামের দিকে ফিরল। ঋজুদা অলিভগ্রীন রঙা শিকারের পোশাক পরেছে। ইতিমধ্যেই চান-টান করে তৈরী।
ঋজুদার আমি সত্যি সত্যিই একজন দারুণ ভক্ত। বোধহয় আমার দাদা, বাবা, মামা, জামাইবাবু কাউকেও আমার এত ভাল লাগে না। ঋজুদার হাঁটা, বসা, ঋজুদার কথা বলা, ঋজুদার একলাফে জীপে ওঠার ভঙ্গী, ঋজুদার সকলের প্রতি ভালো ব্যবহার, ছোট-বড় সকলের প্রতি ভালোবাসা, এসব মিলে আমার চোখে ঋজুদা আমার আইডল হয়ে উঠছে। ঋজুদা আমাকে যা-ই করতে বলুক না কেন, আমি বিনা-প্রতিবাদে তাই করতে রাজী আছি।
ঋজুদা এসে আমার সামনে বসল। বলল, ঘুম ভাঙল রুদ্রবাবুর?
–হুঁ। তুমি কোথায় গেছিলে?
গেছিলাম গ্রামের প্রধানের কাছে–একটা কাজে। তোমাকে আর আমাকে এক্ষুনি একবার বেরুতে হবে। আজকে রাতে ফেরা নাও হতে পারে।
–কোথায় যাব? আমি আনন্দে নেচে উঠলাম।
ঋজুদা পাইপটা ভরতে ভরতে বলল, চলোই না। আজ ক্যালকেসিয়ান বাবু মজা বুঝবে। জীপে যাওয়ার রাস্তা নেই–পায়ে হেঁটেই যেতে হবে। সারাদিনে পনেরো মাইল পথ হাঁটতে পারবি না?
–প–নে–রো মাইল? আমি আতঙ্কিত গলায় বললাম।
ঋজুদা হাসল; বলল, তা তো হবেই। পনেরো না হলেও বারো-তেরো মাইল তো বটেই।
আমি একটু মিইয়ে গেলাম। বললাম, কোথায় যাবে, যাবে কেন?
ঋজুদাকে একটু অন্যমনস্ক দেখাল। ঋজুদা বলল, একটা আশ্চর্য কথা শুনলাম। যম-গড়া পাহাড়ের একটা বড় গুহার কাছে নাকি অবিশ্বাস্য সব ব্যাপার দেখতে পাওয়া যায়।
আমি বললাম, কি? ভূত?
ঋজুদা হাসল; বলল, তুই কি ভূতে বিশ্বাস করিস নাকি?
আমি বললাম, কখনো তো দেখিনি, না দেখে বিশ্বাস করব কি করে?
ঋজুদা হাসল; বলল, চল আজই তোকে দেখিয়ে দেবো। ডিম্বুলি গ্রামের ওরা অনেকেই নাকি দেখেছে। তাই চল, আমরাও দেখে আসি ব্যাপারটা কি? এমন একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার, শোনার পরও না দেখার কোনো মানে হয় না।
আমি বললাম, কি ব্যাপার বলো না?
ঋজুদা আবার হাসল; বলল, না, তা এখন বলা চলবে না। তোমাকে দেখাতেই যখন নিয়ে যাচ্ছি, তখন মুখে আর বলব কেন? তারপর ঋজুদা বলল, তাড়াতাড়ি চান সেরে ব্রেকফাস্ট খেয়ে নাও, আমাদের ন’টার মধ্যে বেরোতে হবে।
আমি বললাম, বেশ।
তারপর ঋজুদা হঠাৎ বলল, রুদ্র, তোর ভয় করবে না তো?
ভয় আমার ইতিমধ্যেই করতে শুরু করেছিল, কিন্তু ঋজুদার সঙ্গে গেলে ভয় কি? তাছাড়া ভয়ের কথা কি মুখ ফুটে বলা যায়?
আমি হাসলাম, মুখে খুব সাহসের ভাব এনে বললাম, না না, ভয় কিসের?
–না করলেই ভাল। ঋজুদা বলল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা তৈরী হয়ে নিলাম। ব্রেকফাস্ট সেরে, জামাকাপড় পরে নিলাম। তারপর আমার ও ঋজুদার দুটো হ্যাঁভারস্যাকে কিছু খাবারদাবার, চায়ের সরঞ্জাম, পেয়ালা এবং একটা করে বেশী জামা পুরে দিল মহান্তী।
আরো অনেক টুকটাক জিনিস। ঋজুদা দূরবীনটা নিল আর কোমরে বেল্টের সঙ্গে বেঁধে নিল ছোট্ট কালো চকচকে পয়েন্ট-টুটু পিস্তলটা।
আমি বললাম, কি ঋজুদা? বন্দুক রাইফেল কিছু নেবে না?
–না রে। শিকারে যাচ্ছি না তো আমরা, ভূত দেখতে যাচ্ছি। তোর বন্দুকও রেখে যা। বন্দুক রাইফেল ছাড়া খালি হাতে জঙ্গলে ঘোরার আনন্দ আলাদা–তাতে ভয় থাকে নিশ্চয়ই কিন্তু ভয় থাকে বলেই তার আনন্দটাও অন্যরকম। তবে ভয়ের আর কি? সত্যিই যদি খালি হাতে গেলেই লোকে বিপদে পড়ত, তাহলে এই ডিম্বুলি গ্রামের ওরা সারাজীবন বনে-পাহাড়ে ঘুরে বেড়ায় কি করে?
আমি বললাম, বাঃ রে। ওদের বিষ-মাখানো তীর আর ধনুক থাকে না? টাঙ্গী থাকে না?–ওরা কি একেবারে খালি হাতে যায়?
ঋজুদা বলল, মেয়েরা? তারা তো হাতে কিছু না নিয়েই জঙ্গলে চলাফেরা করে। যাই হোক, তোকে একটা টাঙ্গী নেওয়ার পারমিশান দেওয়া গেল। বলেই অমৃতদাদাকে ডেকে একটা ভাল ধারওয়ালা চকচকে টাঙ্গী এনে আমাকে দিতে বলল।
একটু পরেই ডিম্বুলি গ্রাম থেকে দুজন লোক এসে হাজির, তাদের কাঁধেও টাঙ্গী। পিঠে গামছা-বাঁধা পুঁটলি, বোধহয় খাবার আছে কিছু। ওদের গা খালি, খালি-পা, একটা মোটা ধুতি পরেছে সামনে কোঁচা ঝুলিয়ে–এদিকে ধুতি উঠে রয়েছে প্রায় হাঁটু অবধি। ওরা দু ভাই। একজনের নাম শিব্ব, অন্যজনের নাম ভীম।
ঋজুদা মহান্তীকে ডেকে কিছু চাল, ডাল, তরকারী ওদের পুঁটলিতে দিয়ে দিতে বলল। মহান্তী চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজ এসব দিয়ে দিল।
আমি বললাম, কি ব্যাপার? আমরা কি পিকনিকে যাচ্ছি?
ঋজুদা বলল, পিকনিকই তো।
তারপর আমরা, যে পাকদণ্ডী পথটা ক্যাম্পের পাশ দিয়ে পাহাড়ে উঠে গেছে–যে-পথে কাল রাতে হায়না নেমেছিল পাহাড় থেকে–সে-পথ বেয়ে উঠতে লাগলাম।
যাওয়ার আগে, ঋজুদা মহান্তীকে বলেছিল, খিচুড়ির বন্দোবস্ত রেডি করে রাখতে আগামী কাল আমরা দুপুর বারোটা থেকে রাত বারোটার মধ্যে যে-কোনো সময় ফিরতে পারি, এবং ফেরার আধঘন্টার মধ্যে গরম গরম খিচুড়ি, আলুভাজা এবং ডিমসেদ্ধ এবং শুকনো লঙ্কা ভাজা চাই-ই।
পাহাড়ে যখন উঠতে লাগলাম, তখন দুপাশে দেখার বিশেষ কিছু ছিল না। কারণ দু’পাশে জঙ্গল বেশ ঘন ছিল এবং জায়গাটা দিনের বেলাতেও সায়ান্ধকার ছিল। বড় বড় উঁচু গাছের পাতার আড়াল থেকে রোদের টুকরো-টাকরা এসে নীচে পড়েছে। নানারকম লতা, ফুল, নানারকম প্রজাপতি, পাখি। উঁচু ডালে বসে বড় ধনেশ পাখিগুলো (গ্রেটার ইন্ডিয়ান হবিল) ওদের বড় বড় ঠোঁট ফাঁক করে হাঁ হ্যাঁ করে ডাকাডাকি আর ঝগড়া করছে।
পাখিগুলো যেখানেই থাকে, বড় গোল বাধায়, চেঁচামেচি করে জঙ্গল সরগরম করে তোলে। এগুলোকে বেশীর ভাগ দেখা যায় কুচিলা (নাক্স-ভমিকা) গাছে বসে থাকতে। কুচিলা গাছগুলো বেশ বড় হয়, পাতার মধ্যেটার রঙ একটু সাদাটে সাদাটে দেখায়। ধনেশ পাখি যখন একেবারে মগডালে বসে থাকে এবং যখন আওয়াজ করে না, তখন বোঝাই যায় না যে ওখানে পাখি আছে–ওদের সাদা বুকটাকে মনে হয়, আর একটা কুচিলা গাছের পাতা বুঝি।
আমি আর এতসব জানব কোথা থেকে? ঋজুদাই বলছিল তাই শুনছিলাম। ঋজুদা বলছিল, আরেকরকম ধনেশ পাখি আছে, ছোট; তাদের বলে (লেসার ইন্ডিয়ান হর্নবিল); তারাও চেঁচামেচি করতে ভালবাসে, তবে এত না। এখানে ভালিয়া বলে একরকমের গাছ আছে, ওদের সে গাছে ফল খেতে দেখা যায়। এখানের লোকরা তাই বড় ধনেশকে বলে কুচিলা-খাঁই, ছোট ধনেশকে বলে ভালিয়া-খাই।
এই ভালিয়া-খাঁই পাখিগুলোকেই গতকাল দেখছিলাম সন্ধের আগে আগে।
আমি ডিম্বুলি গ্রামের পথে হাঁটছিলাম।
গোধূলির আলো এদিকের পাহাড়, ওদিকের বন এবং বন ও পাহাড়ের মধ্যের বিস্তৃত স্তব্ধ শান্ত ক্ষেতকে কেমন এক সোনা রঙে ভরিয়ে দিয়েছিল। দূরের জঙ্গলের কিনারে মাঠ পেরিয়ে কতগুলো বুনো তালগাছ ছিল, সেই তালগাছগুলোর পাশ দিয়ে বহুরঙা-মেঘে রঙীন আকাশের পটভূমিতে একটি ছোট ভালিয়া-খাঁইর ঝাঁক তাদের ছিপছিপে শরীর নিয়ে ভেসে যাচ্ছিল–রঙীন আকাশের পটভূমিতে সেই ছবিটি আমার চোখে গাঁথা হয়ে গেছিল; বুঝি গাঁথা হয়ে থাকবে চিরদিন।
আমরা মাথা নীচু করে উঠছি–কারণ পথটা খাড়া। ঋজুদা বলে, পাহাড়ে পথ চলার নিয়ম হলো, “চড়াইমে বুড্ডা ঔর উত্রাইমে জওয়ান।” মানে, উঠবার সময় শরীরের ভারটা মাথা সামনে ঝুঁকিয়ে দিয়ে সামনে করতে হয়, আর নামবার সময় মেরুদণ্ড সোজা করে মাথা পেছনে করে নামতে হয়।
আমরা উঠছি, এমন সময় কি একটা জানোয়ার খড়খড় করে বাঁদিকের জঙ্গল বেয়ে ওপাশের খাদে নেমে গেল।
শিব্ব অমনি ওদিকে চেয়ে বলল, “বাব্দু গুট্টে বড্ড শম্বর চালি গম্বা।”
ঋজুদা বলল, তা যাক। যে যাচ্ছে, তাকে যেতে দাও। তারপর আমার দিকে ফিরে বলল, দেখতে পেলি?
আমি বললাম, না। দেখার আগেই তো চলে গেল।
আরো কিছুদূর ওঠার পর যখন প্রায় রীতিমত হাঁফ ধরে গেছে, তখন আমরা পাহাড়ের উপরে এসে পৌঁছলাম। সে জায়গাটা যে কি সুন্দর তা বলার মত ভাষা আমার নেই। আমি যদি কোনো কবি বা সাহিত্যিক হতাম, তবে হয়ত বলতে পারতাম।
সেই মালভূমি একটি গড়ানো তৃণভূমি–সকালের রোদ সবেমাত্র এই শিশির-ভেজা তৃণভূমিকে শুকিয়ে খটখটে করে তুলেছে। মাঝে মাঝে এখানে ওখানে একটি-দুটি বড় গাছ। এদিকে ওদিকে ছোট-বড় শৌখীন বাগানের টিলার মত কালো পাথরের টিলা। একপাশে একটা কবরখানা। এলোমেলোভাবে অনেকগুলো এবড়ো-খেবড়ো কিন্তু চোখা পাথর মাটিতে পোঁতা আছে।
কতরকম যে ঝোঁপঝাড় চারিদিকে। মুতুরী, গিলিরী, শিয়ারী লতা আর না-নউরিয়া ফুলের ঝোঁপ। প্রতিটি ঝোপে ও লতাতেই প্রায় ফুল ধরে আছে। এক জায়গায় পাঁচ-ছটি আমলকী গাছ ঝুরু ঝুরু পাতা ঝরা তাদের শেষ হয়ে গেছে তখন। যতদূর চোখ যায়–সবজে-পাটকিলে রঙা মালভূমিটি দূরের নীল দিগন্তরেখায় মিশে গেছে।
কথা না বলে আমি অবাক হয়ে সেদিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
ঋজুদা আমার কাঁধে হাত ছোঁওয়াল; হেসে বলল, কি রে? ভাল লাগছে?
আমি বললাম, দা-রু-ণ!
ঋজুদা বলল, কষ্ট করে যে পাহাড় চড়লি এতটা, তাই তো এমন সুন্দর জায়গায় আসতে পেলি। কষ্ট না করলে, পাহাড় না চড়লে, কোনো সুন্দর কিছুই যে পাওয়া বা দেখা যায় না, বুঝলে রুদ্রবাবু!
বললাম, হুঁ। ভাবছিলাম এইজন্যেই ঠাকুমা বলেন, কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে। দেখছি, কথাটা তো সত্যিই।
ঋজুদা বলল, তুই তো একেবারে হাঁপিয়ে গেছিস রে; ঠিক আছে, বসে নে এই গাছতলায় দশ মিনিট, তারপর আবার যাওয়া যাবে।
আমি আর দেরী না করে একটা পাথরে বসে পড়লাম, তারপর ঋজুদার কথানুযায়ী ফ্লাস্ক থেকে একটু কফি নিজে নিলাম এবং ঋজুদাকে দিলাম।
ঋজুদা কফির প্লাস্টিকের গ্লাসটা পাশে রেখে পাইপ ভরতে ভরতে শিব্ব আর ভীমকে পকেট থেকে বিড়ির বাণ্ডিল বের করে দিল।
আমি কফিটা শেষ করে গ্লাসটা ওয়াটার-বটুলের জলে ধুয়ে হ্যাঁভারস্যাকে রাখতে যাব, এমন সময় ঋজুদা আমার কাঁধে হাত ছোঁওয়াল। চমকে উঠে দেখি, দূরের আমলকী গাছগুলোর তলায় একদল চিতল হরিণ আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে চরছে।
দলটা বেশ বড়। কিছু হরিণ শুয়ে-বসে আছে, জাবর কাটছে। আর অন্যগুলো দাঁড়িয়ে।
যেগুলোর মাথায় বড় বড় শিং তারা এদিকে ওদিকে প্রহরীর মত দাঁড়িয়ে। একটা হরিণের রঙ কেমন কালচে হয়ে গেছে।
ওর রঙ কালচে হয়ে গেছে কেন শুধোতেই ঋজুদা বলল, ও খুব বুড়ো হয়ে গেছে–তাই হলুদ রঙে কালচে ছোপ লেগেছে। এই মালভূমি ভগবানের। এখানে কেউ শিকার করে না। এখানে শুধু শান্তি। দ্যাখ-না, এটা আগে আদিবাসীদের গোরস্থান ছিল।
আমি বললাম, ওরা কি কেউ মরে গেলে কবর দেয় নাকি? পোড়ায় না?
ঋজুদা বলল, সাধারণত পোড়ায়, কিন্তু যদি কেউ দুর্ঘটনায় মারা যায়, অথবা যদি কোনো শিশু মারা যায়, অথবা যাদের সন্তান হবে এমন কোনো মেয়েমানুষ যদি মারা যায়, তাহলে তাদের এখানে এনে কবর দেয়। জানিস তো, এই সব অঞ্চলে খন্দ বলে একটা উপজাতি ছিল, ওরা মানুষ বলি দিত। জীবন্ত অবস্থায়ই কোনো মানুষের গা থেকে খুবলে খুবলে মাংস কেটে নিত। লোকটা যখন দৌড়ত, তার পেছন পেছন দৌড়ে ওরা ওরকমভাবে মাংস খুবলে খুবলে তাকে অর্ধমৃত করে ফেলার পর তার মাথার খুলিতে আঘাত করে মেরে ফেলত। সেই সব লোককে ওরা বলত “মেরিয়া”।
–এদিকে খা আছে? আমি ভয়ে ভয়ে শুধোলাম।
–আছে। তবে এদিকে বেশী নেই, খন্দুদের বাস খন্দমালে–মহানদীর ওপারে–দশপাল্লা, আর বৌধে বেশী আছে। তবে এখন কি আর ও সব প্রথা আছে? আগে ছিল।
আমি শুধোলাম, ঋজুদা, তুমি কখনো বাঘুডুম্বা দেখেছ?
ঋজুদা একগাল ধোঁয়া ছেড়ে হাসল একবার, তারপর বলল, চলোনা, তোমাকে আজ রাতেই দেখাব।
আমাদের এই ফিসফিসানিও বোধহয় হরিণগুলোর কানে গিয়ে থাকবে। ওরা আস্তে আস্তে আবার ঝোঁপ-ঝাড়ের আড়ালের সবুজ অন্ধকারে ফিরে গেল হলুদ আলোর রাজ্য থেকে।
ঋজুদা লাফিয়ে উঠল। বলল, চল। আর দেরী নয়।
আমরা মালভূমিটা যেখানে সবচেয়ে কম চওড়া এই দেড়শ’ মিটার মত হবে) সেখান দিয়ে মালভূমিটা পেরিয়ে পাহাড় থেকে নামতে লাগলাম।
এখন পথ বলতে কিছুই নেই। এখন যে পথে আমরা নামছি, তাতে কোনো মানুষের পা ছ’মাসে ন’মাসে পড়ে কি না সন্দেহ। এটা একটা জানোয়ার চলার পথ, ইংরিজীতে যাকে “গেম-ট্র্যাক” বলে।
পায়ের খুরে খুরে মাটি উঠে গেছে, দাগ সরে গেছে। যেখানে যেখানে সেই পথ ধুলো বা নরম মাটির উপর দিয়ে গেছে সেখানে কত যে জানোয়ারের পায়ের দাগ তা কী বলব!
ভীম আমাদের আগে আগে যেতে যেতে ধারাবিবরণী দিতে দিতে চলেছে।–এইটা চিতল হরিণের দাগ, এই যে কালো কালো ছাগল-নাদির মত নাদি পড়ে আছে এগুলো কুটরা হরিণের। এইখান দিয়ে শুয়োরের দল পথ ছেড়ে পাশের জঙ্গলে ঢুকে গেছে। এটা নীলগাই। এগুলো একজোড়া চিতার পায়ের দাগ। এটা শম্বরের। ইত্যাদি ইত্যাদি।
ভাবতেও আশ্চর্য লাগে, এই যে এত জানোয়ার এপথে যাওয়া-আসা করে, তারা এখন কোথায়?–তাদের সঙ্গে আমাদের দেখা হচ্ছে না কেন? শেষকালে কথাটি জিজ্ঞেস করেই ফেললাম ঋজুদাকে।
ঋজুদা বলল, এ কি আর কোলকাতার রাস্তা পেয়েছিস! এরা বেশীর ভাগ সময়েই চলাফেরা করে রাতের অন্ধকারে, তবে দিনেও যে করে না এমন নয়–এখনও অনেকে হয়ত এ পথেই আসছিল, কিন্তু আমরা যেরকম গল্প করতে করতে হাঁটছি তা তো ওরা আধমাইল দূর থেকেই শুনতে পাবে, হাওয়ায় আমাদের গন্ধ পাবে এবং সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের জঙ্গলে ঢুকে যাবে; আড়াল নেবে। ওদের মধ্যে অনেকে হয়ত আড়াল থেকে আমাদের লক্ষ্যও করবে। জঙ্গলের পরিবেশে জংলী জানোয়ার তোর থেকে মাত্র পাঁচ হাত দূরে এমন করে লুকিয়ে থাকবে যে, তুই টেরও পাবি না।
কিছুদূর যাওয়ার পর পথটা পাহাড়ের একটা খাঁজ ধরে প্রায় সমান্তরাল রেখায় চলেছে। বাঁদিকে জঙ্গলময় পাহাড় উঠে গেছে–আর ডানদিকে খাড়া খাদ। খাদের অনেক নীচে একটা নদী বয়ে চলেছে। নদীর নাম–সহেলী। উপর থেকে সহেলী নদীর শীর্ণ বুক দেখা যাচ্ছে–পাথর আর বালির মধ্যে মধ্যে তিরতির করে জল বয়ে চলেছে।
একটা মোড় ঘুরেই চোখে পড়ল, নদীর ধারে অনেকগুলো পাতার কুঁড়ে। অত উপর থেকে দেখার জন্য কুঁড়েগুলোকে ক্ষুদে ক্ষুদে দেখাচ্ছিল। রান্না হচ্ছে। তার মধ্যে কতগুলোতে–ধোঁয়ার কুণ্ডলী খাদ বেয়ে উঠে উপরের দিকে আসছে। অনেকগুলো রঙীন শাড়ি মেলা রয়েছে নদীর বালিতে; পাথরে।
ঋজুদা শিব্বর দিকে চেয়ে বলল, অঙুলের ব্রজ দাস এখানে ক্যাম্প করেছে। বুঝি?
শিব্ব বলল, হ্যাঁ। সাঁওতাল রেজা কুলি এনেছে পথ বানাবার জন্যে।
আমি বললাম, রেজা কুলি কাকে বলে? আর পথ বানাবে কেন ঋজুদা?
ঋজুদা বলল, রেজা কুলি মানে মেয়ে কুলি। আর যারা বড় ঠিকাদার, তাদের প্রত্যেককেই নিজেদের পথ নিজেদেরই বানিয়ে নিতে হয় জঙ্গলে–নইলে কাঠ কেটে সে পাহাড় থেকে নামাবে কি করে লরী দিয়ে? যে জঙ্গল উনি ইজারা নিয়েছেন তা হয়ত পাহাড়ের মাথায়–সেখানে কাঠ কাটলেই তো হলো না, কাঠ তো নামিয়ে এনে শহরে পৌঁছাতে হবে। তাই প্রত্যেককেই নিজের নিজের পথ বানিয়ে নিতে হয়।
আমি বললাম, তুমি বানাওনি! ঋজুদা হাসল; বলল, এ বছরে আমার সব জঙ্গল ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের পথের আশেপাশেই। তাই আমাকে আর আলাদা করে পথ বানাতে হয়নি। নইলে অন্যান্য বছরে পথ বানাতে হয় বৈকি। পথ বানানোটাও খুব ইন্টারেস্টিং ব্যাপার। ব্লাস্টিং করে করে পাথর ফাটিয়ে একটু একটু করে কোদাল আর গাঁইতি চালিয়ে চালিয়ে পথ তৈরী করতে হয়। একবার ঐ সময়ে আসিস, এলে দেখতে পাবি।
ব্রজ দাসের ক্যাম্প আর দেখা যাচ্ছে না।
যখন আমরা হরিণ দেখেছিলাম তখন থেকে প্রায় দেড়ঘন্টা আমরা হাঁটছি। এখন রোদটা বেশ কড়া হয়েছে। হাঁটতে হাঁটতে বেশ ক্ষিদেও পেয়েছে। কিন্তু পথের যা দৃশ্য তাতে ক্ষিদে তেষ্টা সব ভুলে গেছি।
হঠাৎ দুটো নীল রঙা রক-পিজিয়া আমাদের সামনে পথের উপর উড়ে এসে বসল। ওরা পাহাড়ী নদীর বুকে এতক্ষণ বসে ছিল। জানি না, কি করছিল। ভারী সুন্দর দেখতে পাখিগুলোপায়রাই, তবে নীলচে-সবজে রঙ। এরা পাহাড়ে জঙ্গলে পাথুরে জায়গায় থাকে–তাই এদের নাম রক্-পিজিয়ান।
পাখির কথা আর কি বলব? কত যে পাখি সকাল থেকে দেখলাম–কতরকম যে তাদের গায়ের রঙ, কতরকম যে তাদের গলার স্বর!
হলুদবসন্ত পাখির হলদেকালো নরম শরীর–পাখিগুলো সুন্দর ডাকে। ঋজুদা এই পাখি ভীষণ ভালোবাসে। আমি একদিন একটা পাখি মারতে গেছিলাম, ঋজুদা এমন বকুনি লাগিয়েছিল আমায় যে, জীবনে তা ভুলব না। সত্যি এমন সুন্দর পাখি মারা উচিত নয়।
নীলকণ্ঠ পাখির ঘন নীল রঙ, টিয়ার সবুজ কচি কলাপাতা সবুজ, টুই-এর পাখনার গাঢ় সবুজ, বনমোরগের সোনালি কালো, ময়ূরের মেঘের মত নীল, রাজঘুঘুর মখমল বাদামি, মৌ-টুশকি পাখির মুঠিভরা মেটে রঙ।
টিয়া ডাকছে ট্যাঁ ট্যাঁ, টুই ডাকছে টি-টুই-টি-টুই। টুই বসে বসে যত না ডাকে তার চেয়ে বেশী ডাকে হাওয়ায় দোল খেতে খেতে-হাওয়ার নাগরদোলায় চেপে শীষ দেয় ওরা। রাজঘুঘুর গম্ভীর ঘুঘুরঘু দুপুরের নির্জনতায় ঘুম পাড়িয়ে দেয় যেন। নানারঙা মৌ-টুশকিরা তাদের ছোট ছোট চিকন ঠোঁটে কি যে সব ফিসফিস করে বলে, বোঝা যায় না। কোনো কোনো অনামা অজানা পাখি ডাকে তো না, যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
কারো ডাক শুনলে মন আনন্দে নেচে ওঠেকারো ডাক শুনলে মন খারাপ। হয়ে যায়। আর এইসব ছোট বড় নানান পাখির ডাক ছাড়িয়ে উপত্যকার উপরে চক্কর-মারা খয়েরী চিল আর বাজেদের তীক্ষ্ণ চিকন বাঁশী বেজে ওঠে চি চি করে আর কানে আসে পাহাড়ের অন্ধকারে কুচলিগাছে বসে থাকা ধনেশ পাখিদের হেঁড়ে গলার ডাক—হ্যাঁক হ্যাঁক, হক্ক–হক্ক।
আমরা আরো এগিয়ে গেলাম। সেই সহেলী নদী কিন্তু বরাবরই আমাদের ডান পাশেই চলেছে। এক এক জায়গায় নদীর এক এক চেহারা। কোথাও শুধু বালি, কোথাও শুধু পাথর, কোথাও শুধু ছায়ায়-জমা গভীর জল। তার চারপাশের পাথরে শ্যাওলা ধরে আছে, নানারকম অর্কিড গজিয়েছে গাছের গুঁড়ি থেকে, সে সব জায়গায় ঝর্ণা নেমেছে এ-পাশ ওপাশ থেকে নদীতে।
আরো মিনিট পনেরো হাঁটার পর হঠাৎ আমার চোখ পড়ল নদীটার দিকে। গেরুয়া বালি, এক জায়গায় খুব বড় বড় চোলো পাথর অনেকগুলো। সেই পাথরের উপরে লাল লাল তিনটে কি জানোয়ার শুয়ে আছে।
ঋজুদা আমার সামনে সামনে যাচ্ছিল, কিন্তু বাঁদিকের ঝোঁপের মধ্যে ফুটে-থাকা একরকমের হলুদ গোল-গোল ফলের দিকে মনোযোগ দিয়ে দেখতে দেখতে হাঁটছিল!
আমি দু পা দৌড়ে গিয়ে পেছন থেকে ঋজুদার বেল্ট ধরে টানলাম।
ঋজুদা চমকে গিয়ে ও একটু বিরক্ত হয়ে থেমে পড়ে মুখ ফিরিয়ে বলল, কি রে রুদ্র?
আমি ঋজুদাকে নদীর দিকে দেখালাম। ঋজুদা পথের একেবারে ডানদিকে চলে গিয়ে একটা গাছের নীচে বসে পড়ল। বলল, তোর বরাত তো খুব ভাল রে রুদ্র। জঙ্গলে একশ’ বছর থাকলেও এমন দৃশ্য দেখা যায় না।
আমি ঋজুদার পাশে বসে বললাম, ওগুলো কি জানোয়ার ঋজুদা?
ঋজুদা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, কি জানোয়ার তা-ই বুঝতে পারিসনি? বাঘ রে বাঘ। রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। মা বাঘ তার দুই বাচ্চা বাঘকে নিয়ে রোদ পোয়াচ্ছে।
শিব্ব আর ভীমও আমাদের পাশে বসে পড়ল। মুখে দুজনেই সমস্বরে বলল, ‘আলো বাপ্পালো।’
আমি ঋজুদাকে ভয়ে ভয়ে বললাম, এখানে যে খুব বসে পড়লে, যদি তিনজনে একসঙ্গে উপরে উঠে আসে?
ঋজুদা হাসল; বলল, ওদের পায়ে বাত আছে; আসবে না।
আমার তখন বিশেষ অবস্থা ভাল নয়, এদিকে ওদিকে বড় গাছ আছে কিনা। দেখছি, যাতে বাঘে তাড়া করলে তাড়াতাড়ি উঠে পড়তে পারি।
সত্যি কথা বলতে কি, আমার ঋজুদার উপর রাগ হতে লাগল–এই রকম ভয়াবহ জঙ্গলে কেউ খালি হাতে আসে? ঐ পুঁচকে পিস্তলটা থাকলেই বা কি, না থাকলেই বা কি? ঋজুদাটার সবই বেশী বেশী; কি যে করে না!
আমি ফিসফিস করে বললাম, ঋজুদা, তুমি বললে যে ঐ দুটো বাচ্চা, কিন্তু তিনটেই তো সমান। তিনটেই যে বেশ বড়।
ঋজুদা কথা না বলে দূরবীনটা আমার হাতে দিল। বলল, ভাল করে দেখে নে, সারা জীবনে এমন দৃশ্য আর দেখার সুযোগ নাও আসতে পারে। বলে, নিজে পাইপ বের করে পাইপ পরিষ্কার করতে লাগল।
আমার মন বলল, এখন তো কোমর থেকে পিস্তলটা বের করে হাতে নিলেই পারে, একটু আগেই তো পাইপ খেল, এমনি করে বাঘের মাথার উপরে পা ঝুলিয়ে বসে পাইপ খাওয়ার কি যে দরকার জানি না।
দূরবীনটা চোখে লাগাতেই বাঘগুলো যেন লাফিয়ে কাছে চলে এল শুয়ে শুয়েই।
পরিষ্কার দেখতে পেলাম, বড় বাঘিনীটা চার পা শূন্যে তুলে কিরকম মজা করে রোদ পোয়াচ্ছে। তার তলপেটের সাদা লোমগুলো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, দেখা যাচ্ছে নাকের কালো অংশ। অপেক্ষাকৃত ছোট বাঘ দুটো পাশ ফিরে শুয়ে আছে। একজন তো তার মাকে কোল বালিশ করে সামনের এক পা তুলে দিয়েছে তার গায়ে।
আমরা কতক্ষণ বসে ছিলাম হুঁশ ছিল না।
শিব্ব বলল, বাবু, একটা ঢিল ছুঁড়ব?
আমি তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম, না, না।
ঋজুদা বলল, কেন? ওরা রোদ পোয়াচ্ছে তাতে তোমার কি অসুবিধাটা হলো?
কিন্তু আমাদের কথাবার্তা বলার জন্যেই হোক কি ঋজুদার পাইপের মিষ্টি গন্ধেই হোক, একটা বাচ্চা বাঘ তড়াক করে ডিগবাজী খেয়ে উঠে বসে উপরের দিকে তাকাল। ও ওদের ভাষায় চাপা গলায় কিছু বলেছিল কি না তা আমি শুনতে পাইনি, কিন্তু তারপরেই দেখলাম মা বাঘ এবং অন্য বাচ্চাটাও ঘুম ভেঙ্গে উঠে উপরে তাকাল।
মা-বাঘ একবার আমাদের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে উঠে মুখ তুলে ডাকল, উঁ–আও।
সমস্ত বন পাহাড় গমগম করে উঠল সেই ডাকে।
কিন্তু তারা আমাদের দিকে উঠে না এসে, পরক্ষণেই নদী পেরিয়ে সুন্দর সহজ দৌড়ে ওপারের ঘন জঙ্গলে অদৃশ্য হয়ে গেল।
ঋজুদা বলল, চল্ এবার যাওয়া যাক। তারপর বলল, বাচ্চা দুটো বেশ বড় হয়ে গেছে। দিন দশ-পনেরোর মধ্যেই ওরা মাকে ছেড়ে চলে যাবে।
আমি বললাম, কেন, চলে যাবে কেন?
কারণ, তাই-ই নিয়ম।
ওরা যখন ছোট থাকে–মা’র কাছে থাকে। শহরের মায়েরা যেমন বাচ্চা নিজে খেতে শিখলে, চান করতে শিখলে, কারো হাত না-ধরে বড় রাস্তা পেরোতে শিখলে নিশ্চিন্ত হন, বাঘেদের মায়েরাও তেমনি জঙ্গলের নিয়ম-কানুন, শিকার ধরার কায়দা ইত্যাদি সব শেখানো হয়ে গেলে বাচ্চাদের ছেড়ে দেয় স্বাধীনতা দিয়ে। প্রত্যেকটা বাঘ তাদের স্বাধীনতাকে ভীষণ ভালবাসে। এমনকি বাঘ ও বাঘিনীও একসঙ্গে থাকে না। ঘর-সংসার করার জন্যে বছরের কিছু সময় তারা একসঙ্গে থাকে–তারপরই যে যার স্বাধীন। খুব ভাল সিসটেম, তাই না?
আমি বললাম, ঠিক বলেছ, মা আর বাবা আলাদা আলাদা ভাবে থাকলে বেশী ঝগড়া-ঝাঁটি হতে পারত না, না?
ঋজুদা হাসল; বলল, দাঁড়া তোর বাবাকে আমি লিখে দিচ্ছি।
আমি বললাম, এ্যাই, ভাল হবে না বলছি।
ওখান থেকে ওঠবার আগে ঋজুদা শিব্বকে শুধোল, আমরা যেখানে যাব, সে জায়গাটা এখান থেকে কতদূর?
শিব্ব বলল, আরো ঘন্টাখানেকের পথ।
আমরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে এ পর্যন্ত প্রায় ছ-সাত ঘন্টা হেঁটেছি। ঋজুদা বলল, এমনি ভাবে হাঁটলে সমান রাস্তায় একজন মানুষ ঘন্টায় চার মাইল হাঁটতে পারে। আর এই পাহাড়ী রাস্তায় ঘন্টায় দু-আড়াই মাইল হাঁটা যায়, বিশেষ করে চড়াই-এর রাস্তায় রুদ্রবাবুর মত ক্যালকেসিয়ান সঙ্গে থাকলে।
আমি বললাম, তাহলে আমরা কত মাইল এলাম?
তা প্রায় মাইল সাতেক হবে। একটু বেশীও হতে পারে, ঋজুদা বলল। তারপরই আবার বলল, চল্ ওঠা যাক। ওখানে পৌঁছে আবার দিনের আলো থাকতে থাকতে খাওয়াদাওয়ার বন্দোবস্ত করতে হবে। তোর তো ক্ষিদে পেয়ে গেছে নিশ্চয়ই।
আমার রাগ হলো। আমি বললাম, আহা! আমার একারই যেন পেয়েছে, তোমার বুঝি আর পায়নি!
ঋজুদা হাসল; বলল, চটছিস কেন? সকলেই খাব–পেট ভরে। রাতে কি না কি দেখতে হবে তা কে জানে? এই হয়তো শেষ খাওয়া। বলে আমার দিকে আড়চোখে তাকাল।
তারপর আমরা সকলে উঠে পড়লাম।
এবার আর একটু গিয়েই আমরা সেই নদীর পাশের পথ ছেড়ে বাঁদিকে ঢুকে গেলাম।
শিব্ব ঋজুদাকে বলল, ঐ নদীর পাশের পথটায় একটু গিয়েই একটা ‘নুনী’ আছে, পথটা ওখানে শেষ হয়ে গেছে।
আমি শুধোলাম, ‘নুনী’ কি ঋজুদা?
ঋজুদা বলল, ‘নুনী’ বলে এখানে, বাংলায় বলে নোনামাটি, ইংরিজীতে বলে সল্ট-লি। পাহাড়ে জঙ্গলে এক একটা জায়গা থাকে, যেখানে মাটিতে নুন থাকে। জানোয়ারেরা সেখানে আসে মাটি চেখে নুন খেতে। নুন খেলে আফিং-এর মতো ওদের নেশা হয়ে যায়। যে সব জানোয়ার ঘাসপাতা খেয়ে থাকে, তারাই সাধারণত আসে এসব নুনীতে, আর তাদের পেছনে পেছনে তাদের ধরবার জন্যে আসে বাঘ।
আমি বললাম, একদিন জানোয়ার দেখবার জন্যে এখানে নিয়ে আসবে আমাকে?
ঋজুদা বলল, এতদূরে আসবি কেন? আমাদের ক্যাম্পের দু মাইলের মধ্যেই একটা ভাল ‘নুনী’ আছে, নিয়ে যাব একদিন, তবে এখন নয়। পূর্ণিমার রাতে। ওখানে তো আর টর্চ জ্বালিয়ে দেখতে পাবি না।
এখানে রাস্তাটা আবার চড়াইয়ে উঠেছে। তাই সকলেই একটু আস্তে আস্তে চলছে।
আমরা প্রায় আধঘন্টাটাক হলো বাঘের জায়গা থেকে চলে এসেছি। রোদের তেজ আর এখন তেমন নেই।
চড়াইটা ওঠা শেষ হলেই দেখলাম সামনে একটা ফাঁকা মাঠ। একেবারে ফাঁকা না–জংলী ঘাস, দুধলি ফুল, মাঝে মাঝে নাম-না-জানা ফুলের ঝোঁপ-ঝাড় আর সেই মাঠ পেরিয়ে ঐ দূরে দেখা যাচ্ছে একটা পাহাড়, তার পাশে একটা ভাঙ্গা গড় মতো। গড়ের গা বেয়ে বট-অশ্বথের চারা গজিয়েছে।
ভীম বলল, গড় আসি গ্বলা।
আমরা সকলে অবাক হয়ে ঐ দিকে তাকিয়ে এগোতে লাগলাম।
সূর্য ততক্ষণে পশ্চিমে বেশ হেলে পড়েছে।
গড়ের কাছাকাছি এসে আমরা পাহাড়টা ভাল করে দেখলাম। পাহাড়টা ছোট, কিন্তু পাহাড়ের গায়ে একটা বিরাট গুহামুখ।
আমরা যখন সেই গড়ের ফটক পেরিয়ে ভিতরে ঢুকলাম তখন প্রায় চারটে বাজে।
ফটকই আছে, চারপাশের দেওয়াল সব ধ্বসে গেছে।
ফটক দিয়ে ভিতরে ঢুকছি এমন সময় আমাদের পেছনে দূর থেকে ঘন ঘন বাঘের ডাক শোনা গেল। বোধহয় যে বাঘগুলোকে আমরা দেখলাম, সেই বাঘগুলোই ডাকছিল, নদীর ওপার থেকে। নির্জন জঙ্গলে পাহাড়ে বাঘ ডাকলে তার প্রতিধ্বনি দু-তিন মাইল দূর থেকে সহজে শোনা যায়।
আমি ঋজুদাকে বললাম, ঐ বাঘগুলো রাতে আমাদের এখানে চলে আসতে পারে কি, এতদূরে?
ঋজুদা হাসল; বলল, ইচ্ছা করলে বাঘ এক রাতে পঞ্চাশ মাইলের চক্কর লাগায়, আর এ তো বাঘের ঘরের বারান্দা। আসতে পারে বই কী। কিন্তু রুদ্রবাবু কি ভয় পাচ্ছ? ভয় পেলে তোমাকে আর কখনও আমার সঙ্গে নিয়ে আসব না।
আমি লজ্জা পেলাম। বললাম, না, না, ভয় পাব কেন? এমনি জিজ্ঞেস করছিলাম।
ঋজুদা শিব্ব আর ভীমের সঙ্গে অনেকক্ষণ ধরে কি সব কথাবার্তা বলল, তারপর গড়ের বারান্দায় একটা জায়গা পরিষ্কার করতে বলল ওদের।
ভাঙ্গা গড়, মধ্যে বাদুড় চামচিকেতে ভর্তি। সাপ-খোপ থাকাও স্বাভাবিক। তাই ঋজুদা বলল, আমরা বাইরের বারান্দাতেই থাকব রাতে। তিন দিকে দেওয়াল পাব, আর যেদিক খোলা সেদিকেই গুহার মুখ। যদি কিছু দেখার থাকে তো দেখা যাবে।
শিব্ব আর ভীম আশপাশের ঝোঁপঝাড়ে গিয়ে টাঙ্গী দিয়ে ডালসুদ্ধ পাতা কেটে আনল, এবং সেই ডাল ধরে পাতাগুলোকে ঝাঁটা মত ব্যবহার করে বারান্দাটা পরিষ্কার করতে লাগল।
ঋজুদা বলল, দূরবীন-টুরবীন সব এখানে থাক। আয় রুদ্র, আমরা খাওয়ার বন্দোবস্ত করি।
শিব্বর পুঁটলি থেকে একটা মাটির হাঁড়ি বেরোল; চাল, ডাল ইত্যাদিও বেরোল। মহান্তী যা যা দিয়ে দিয়েছিল সব। এ সব নিয়ে ঋজুদার সঙ্গে আমি গিয়ে গড়ের পাশের ঝর্ণাতলায় পৌঁছলাম।
কুলকুল করে জল বয়ে যাচ্ছে, পরিষ্কার জল, পাথরে পাথরে লাফিয়ে লাফিয়ে চলেছে। এপাশে ওপাশে অসংখ্য পাথর–বড়, ছোট, গোল আর সমান; বিভিন্নাকৃতি।
ঋজুদার কথামতো, হাঁড়ি ধুয়ে, হাঁড়িতে জল ভরে, হাতে করে মুঠো মুঠো চাল-ডাল ধুয়ে আমি হাঁড়িতে পুরলাম, তারপর তার মধ্যে আলু পেঁয়াজ ইত্যাদি যা ছিল সব দিলাম।
শিব্ব এসে তিনটে গোল পাথর এক করে তার মধ্যে কিছু শুকনো কাঠ ও পাতা গুঁজে দিয়ে, ঋজুদার কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে দেশলাই ঠুকে দিল।
আগুন দেখতে দেখতে গনগনে হয়ে উঠল।
ঋজুদা বলল, তুই এখানে বসে রান্না কর রুদ্র। জঙ্গলে এলে সব করতে হয়, সব কিছু শিখতে হয়। এই বলে একটা শুকনো ডাল ভেঙ্গে আমায় দিয়ে বলল, এই তোর হাতা বা খুন্তী যাই-ই বলো তাই। মাঝে মাঝে এ দিয়ে হাঁড়ির ভিতরের খিচুড়ি নাড়বি, নইলে তলায় ধরে যাবে।
ঋজুদা চলে গেল।
ওখানে বসে দেখতে পেলাম, অনেক শুকনো কাঠ এনে জড়ো করছে শিব্ব আর ভীম। সারা রাত বোধহয় আগুন জ্বলবে, তাই।
ঝর্ণার কাছে আমি একা বসে আছি, হাঁড়ি সামনে করে। আগুন বেশ জোর হয়েছে। একটু পরেই ট্যগ করে জল ফুটবে–খিচুড়ি পাকবে।
ঝর্ণায় ঝর ঝর করে জল বয়ে চলেছে। নানারকম পাখির ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। বিকেলের রোদ পড়ে আসছে–সমস্ত মাঠটা, দূরের জঙ্গল, পেছনের পাহাড় ও গুহা সব কেমন এক সোনালি রহস্যের আঁচল মুড়ি দিয়ে ফেলেছে। একটু পরেই অন্ধকার হয়ে যাবে। সন্ধ্যাতারাটা উঠবে একা একা–তারপর দিগন্তরেখার উপরে স্থির হয়ে শান্তি ছড়াবে সমস্ত রাতের পৃথিবীতে।
হঠাৎ আমার মাথার কাছ থেকে ছিক ছিক করে একটা আওয়াজ শুনলাম।
মুখ তুলেই দেখি, আমার পেছনের কুরুম্ গাছটার মাঝের ডাল থেকে দুটো বড় বাদামী কাঠবেড়ালি কুতকুতে চোখ মেলে আমাকে দেখছে।
এই কাঠবিড়ালিগুলো দেখতে ভারী ভাল। এখানের লোকেরা বলে ‘নেপালী মুসা। মানে নেপালি ইঁদুর। কেন এমন বলে জানি না।
আমি মুখ তুলে ওদের দিকে ভাল করে তাকাতেই আবার একটা ছি ছি আওয়াজ হলো এবং তারপরই ওরা দুজনে পাতায় পাতায় ঝরঝর আওয়াজ তুলে এ ডাল থেকে ও ডালে, ও ডাল থেকে সে ডালে এবং দেখতে দেখতে চোখের আড়ালে চলে গেল। ওরা চলে যাবার পরও অনেকক্ষণ পাতায় পাতায় হিসহিসানি শোনা যেতে লাগল।
এবার খিচুড়ি আবার আওয়াজ দিতে লাগল–টগবগ, বগবগ করে। আমিও আমার ভাঙ্গা ডাল নিয়ে তাকে নাড়াচাড়া করতে লাগলাম। খিচুড়ি তো প্রায় হয়ে এল। কিন্তু আমার ভাবনা হলো, খাব কোথায়? তাড়াতাড়ি তো প্লাস্টিকের ডিশটিশ কিছুই আনা হয়নি।
একটু পর ঋজুদা এল। বলল, কি রে? ও কিসের আওয়াজ? ক্ষিদেয় তোর পেট কাঁদছে, না খিচুড়ি কাঁদছে?
আমি বললাম, হয়ে গেছে।
ঋজুদা একটু দেখে নিল। আমি কাগজে মোড়া নুনের থেকে একটু নুন মিশিয়ে দিয়ে সেই ডালটা দিয়ে নেড়ে দিলাম হাঁড়ি।
শিব্ব আর ভীমও এল।
ওরা নীরব কর্মী, বিনা বাক্যব্যয়ে আঁজলা করে জল নিয়ে, উনুনের আশপাশের চার-পাঁচটা পাথর ধুয়ে দিল, তারপর শালপাতা আর জংলী-কাঁটা দিয়ে গেঁথে গেঁথে অনেকগুলো দোনা বানিয়ে ফেলল। সেই বড় বড় পাতার দোনা পেতে দিল সেই পাথরগুলোর ওপর।
আমরা সবাই হাত-মুখ ধুয়ে নিলাম ঝর্ণাতে–তারপর বসে গেলাম খেতে। শিব্ব হাঁড়িটা কচি পাতা দিয়ে ধরে আমাকে ও ঋজুদাকে ঐ গাছের ডালের হাতা দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বের করে দিল।
ঋজুদা খুব অল্প খায়–অল্প একটু নিল ঋজুদা। আমার কিন্তু দারুণ ক্ষিদে পেয়েছিল। আমি অনেকখানি নিলাম।
আমাদের দেওয়ার পর হাঁড়িসুদ্ধ নিয়ে শিব্ব আর ভীম বসে গেল।
খিচুড়িটা দারুণ হয়েছে–গন্ধ যা বেরোচ্ছে তা কি বলব! কিন্তু একবার মুখে দিতেই আমার কথা বন্ধ হয়ে গেল।
আমি মুখ নীচু করে আড় চোখে ঋজুদার দিকে তাকালাম।
দেখলাম, ঋজুদার মুখেও খিচুড়ি। খিচুড়ি গেলা হলে ঋজুদা আমার দিকে চেয়ে বলল, কেমন লাগছে? নিজের রান্না করা খাবার!
আমি জিভ বের করে বললাম, উঃ।
ঋজুদা হাসতে হাসতে বলল, উঃ-ই করো আর আঃ-ই করো, এখন পেটভরে খেয়ে নাও, নইলে সারারাত ক্ষিদেতে মরবে।
আমিই নুন দিয়েছিলাম, কিন্তু এত নুন দিয়ে ফেলেছিলাম যে একেবারে নুন-কাটা হয়ে গেছে। মোটে মুখে দেওয়া যাচ্ছে না।
শিব্বদের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, ওরা দুজনে বেশ তৃপ্তি করেই খাচ্ছে।
ঋজুদাও যেন বেশ তৃপ্তি সহকারে খেতে খেতে বলল, প্রথম প্রথম এরকম সকলেরই হয়। পরে আন্দাজ হয়ে যায়।
আমার বেশ লাগছিল। এই মাটির হাঁড়িতে খোেলা-আকাশের নীচে গড়ের পাশে রান্না, পাথরে বসে পাথরের উপরে শালপাতার দোনায় খাওয়া। পশ্চিমে অস্তগামী সূর্য, পুবে অন্ধকার গুহা, মনের মধ্যে রাতের ভয়ের প্রতীক্ষা। দারুণ লাগছিল।
ঋজুদার সঙ্গে না থাকলে তো এতসব অভিজ্ঞতা হতো না।
.
ঋজুদা ইতিমধ্যে খাওয়া শেষ করে পাইপ ধরিয়েছে।
শিকারের পোশাক-পরা পাইপ-মুখে ঋজুদা একটা পাথরের উপর মুখ ফিরিয়ে বসে আছে। পশ্চিমাকাশের পটভূমিতে দারুণ দেখাচ্ছে ঋজুদকে। দারুণ হ্যাণ্ডসাম্।
বড় হলে আমি ঋজুদার মত হব। সমস্ত জীবন আমি এমনি করে পাহাড়ে জঙ্গলে কাটাব। এই জীবনের সঙ্গে কোলকাতার জীবনের কোনো তুলনা চলে? কত কী শোনার আছে, দেখার আছে এখানে; কত কিছু জানার আছে, ভাবার আছে; চাওয়ার আছে, পাওয়ার আছে। এই জীবনে আমার নেশা লেগে গেছে বড় হলেও সারা জীবন এই জঙ্গল, পাহাড়, এই দুলি ফুল, এই শাখায় শাখায় ঊর্ধ্বপুচ্ছ কাঠবিড়ালি–এরা সবাই আমাকে চিরদিন হাতছানি দেবে। আমার শরীরটা যেখানেই থাকুক, আমার মনটা পড়ে থাকবে এইরকম কোনো জঙ্গলে পাহাড়ে।
আমাদের খাওয়া শেষ হতে হতে বেলাও পড়ে এল। এখন বেশ শীত। আমরা হাত-মুখ ধুয়ে রাতের মতো তৈরী হয়ে নিলাম। ওয়াটার-বটলে জল ভরে নেওয়া হলো।
তারপর আমরা সকলে সেই গড়ের ভিতরে ঢুকে বসলাম।
বারান্দার যে কোণটা পরিষ্কার করা হয়েছিল সেখানে বড় বড় কাঠের টুকরো এনে রেখেছিল শিব্ব আর ভীম।
বারান্দার পাশেই সারা রাতের মতো আগুন জ্বালাবার বন্দোবস্ত করা হলো, যাতে ভাল দেখা যায় এবং জংলী জানোয়ার না আসে কাছে।
এখনো অন্ধকার হয়নি। অন্ধকার পুরো হলে তখন আগুন জ্বালানো হবে। আয়োজন সব প্রস্তুত রয়েছে।
আমি একটা কাঠের গুঁড়িতে কম্বল বিছিয়ে আরেকটাতে হেলান দিয়ে আরাম করে বসেছি। খাওয়াটা একটু বেশী হয়ে গেছে। ঋজুদা বারান্দায় দাঁড়িয়ে গুহাটার দিকে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কি যেন দেখছে। একবার দূরবীনটা চোখে লাগিয়ে দেখল। ঠিক তক্ষুনি শিব্ব আর ভীম বলল যে, ওরা আমাদের সঙ্গে এখানে থাকবে না রাতে।
শুনে আমার খুব রাগ হয়ে গেল, কিন্তু ঋজুদা হেসে বলল, তাহলে কোথায় থাকবি? এখানে থাকার আর জায়গা কোথায়?
ওরা বলল যে, এখান থেকে আধমাইল দূরে একটা পরিষ্কার গুহা আছে, সেখানে গিয়ে ওরা আগুন জ্বালিয়ে রাত কাটাবে।
ঋজুদা বলল, এখন তোদের আমি ছাড়তে পারি না কারণ সন্ধে হয়ে এসেছে; এই সময় আধমাইল পথ যেতে রাত হয়ে যাবে। তোরাই বলিস যে সন্ধের মুখে এ জায়গা ভীষণ বিপদের জায়গা। এ ভাবে তোদের ছেড়ে দেওয়া যায় না। যদি যেতেই হতো তো অনেক আগেই তোদের যাওয়া উচিত ছিল।
এ কথাটা শুনে ওরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করল, এবং বাইরের সায়ান্ধকারে বিস্তীর্ণ মাঠ, জঙ্গল আর পাহাড়ের দিকে চেয়ে নিজেরা কি যেন বলাবলি করল। তারপর বলল যে, ওরা থাকতে পারে, কিন্তু গুহার দিকে মুখ করে থাকবে না–উল্টোদিকে মুখ করে বসে থাকবে।
ঋজুদা একটু বিরক্ত হয়ে বলল, তোদের যেদিকে ইচ্ছা সেদিকে মুখ করে বসে থাকিস। তোরা ঘুমিয়েও থাকতে পারিস। কিন্তু এখান থেকে তাদের আমি আমার দায়িত্বে ছাড়তে পারব না। তারপর আমার দিকে ফিরে বলল, জংলী জানোয়ারের ভয় ওরা করে না, কিন্তু অন্য ভয়ে হার্টফেলও করতে পারে।
এ কথা শুনে ওরা মহা খুশী।
ওদের দুজনের মধ্যে ভীম একটু সাহসী। ও বলল, ভয় আমি পাইনি, এই শিব্বটা পেয়েছিল, ও ঘুমোক। আমি তোমাদের সঙ্গে আছি, বুঝলে সানোবাবু।
সানো মানে ছোট–তাই ওরা বলছে আমাকে সানোবাবু। এর পর আর কোনো কথাবার্তা হলো না। ঋজুদা কোমরের বেল্ট থেকে পিস্তলটা খুলে ম্যাগাজিনটা বের করে গুলি সব ভরা আছে কিনা দেখে নিল, তারপর ঠেলে ম্যাগাজিনটাকে ভিতরে ঢুকিয়ে দিল। ক্লিক করে একটা শব্দ হলো। তারপর হ্যাঁভারস্যাক থেকে আরেকটা গুলি-ভরা ম্যাগাজিন বের করে নিজের পকেটে রাখল।
সন্ধে প্রায় হয়ে গেছে। এখন চতুর্দিক অন্ধকার। কিন্তু বনে জঙ্গলে অন্ধকার হয়ে যাবার পরও অনেকক্ষণ যে আলোর অস্তমিত আভাস থাকে তা স্থির হয়ে ফিকে গোলাপী ও বেগুনী রঙ ধরে জঙ্গল আর পাহাড়ের মাথা-ছোঁওয়া দিগন্তে কাঁপছে।
অন্ধকার সম্পূর্ণ হয়ে গেলে, ভীম গিয়ে আগুনটা জ্বালাল। প্রথমে কিছু ভুসভুস্ শব্দ হলো পাতা পোড়ার, খড়কুটো পোড়ার ফুটফাট, তারপরই বড় কাঠে আগুন ধরার চটপট আওয়াজ শোনা যেতে লাগল।
দেখতে দেখতে আগুনটা ধরে গেল।
ঋজুদা গিয়ে একটা আগুন-ধরা ডালকে নেড়েচেড়ে ঠিক করে বসাল আর অমনি আকাশে আগুনের ফুলঝুরি ফোয়ারার মতো লাফিয়ে উঠল।
এখন কোথাও কোনো শব্দ নেই, কিছু দেখার নেই। চতুর্দিকে জমাট বাঁধা নয়, তরল অন্ধকার। আগুনের আলো যতদূর যায় ততদূর পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, কিন্তু সেই বৃত্তের বাইরের অন্ধকারের রহস্য আরো বেড়ে গেছে।
আমি আগুনের দিকে চেয়ে তন্ময় হয়ে গেছিলাম। আমার আর কোনোদিকে খেয়াল ছিল না। আগুন যে এমন আরতি করে, আগুনের মধ্যে যে এত রঙ তা কোনোদিনও জানতাম না আগে। লাল, বেগুনী, গোলাপী, নীল আগুন যে প্রতিমুহূর্তে নিজেকে কতশত রঙে রঙীন করে তোলে, তা আগুনের দিকে চেয়ে থাকলে বোঝা যায়। তার জিভ দিয়ে কোনো প্রাচীন সরীসৃপের মতো হিস হিস শব্দ বেরোয়, আর সে মাঝে মাঝে উল্লাসে লাফিয়ে উঠে আকাশ ছোঁয়ার চেষ্টা করে। সহসা রঙীন ফুলঝুরি তার সহস্র আঙুল হয়ে
ভীমসেন যোশীর গানের মতো আকাশময় ছড়িয়ে পড়ে।
কতক্ষণ অমনি তাকিয়ে ছিলাম মনে নেই, হঠাৎ আমার হুঁশ হলো একটা আওয়াজে।
চমকে উঠে দেখলাম, ঋজুদা দাঁড়িয়ে উঠে গুহার উল্টোদিকের অন্ধকার মাঠের দিকে তাকিয়ে আছে।
সেখান থেকে যেন অনেকগুলো টি-টি পাখি ডাকছে উড়ে উড়ে, ডাকছে একসঙ্গে।
প্রথমে মনে হলো বোধ হয় দশ-বারোটা পাখি। তারপরই বুঝতে পারলাম, ওখানে কম করে একশ’ পাখি ডাকছে। সমস্ত অন্ধকার মাঠ তাদের টী-টীর-টি-টি-টীটীর-টি-টি, ডিড-ইউ-ডু-ইট আওয়াজে মুখরিত হয়ে উঠেছে।
ঋজুদা নিজের মনেই বলল, ইটস্ স্ট্রেঞ্জ, ইটস্ রিয়্যালি স্ট্রেঞ্জ।
এমন সময় পাখিগুলো যেন একসঙ্গে কোনো রেসে নেমেছে এমনভাবে দল বেঁধে আকাশ জুড়ে আমাদের এই আগুনের দিকে উড়ে এল–আগুনে লাল আকাশটুকু ওদের পাখায় পাখায় ছেয়ে গেল–শূন্যে ওদের লম্বা লম্বা সরু সরু পাগুলো ঝুলতে লাগল, দুলতে লাগল। ওরা ঝাঁকে ঝাঁকে আগুনের কাছ অবধি উড়ে এসেই আবার ফিরে যেতে লাগল, আবার পরক্ষণেই দল বেঁধে উড়ে আসতে লাগল।
এমন সময় সেই গুহার মধ্যে হঠাৎ একটা আলো জ্বলে উঠল। আলোটা সাদা। বেশী এলুমিনিয়াম চূর্ণ দিয়ে বানানো রংমশালের আলোর মতো। আলোটা দপ করে জ্বলে উঠে কয়েক সেকেণ্ড থেকেই নিভে গেল।
এবার মাঠের শেষের জঙ্গলের ধার থেকে হাতির বৃংহণ শোনা গেল। মনে হলো কোথা থেকে যেন এক বিরাট দলে ওরা এসে ওদিকে জমায়েত হয়েছে। যেদিকে ‘নুনী’ ছিল, সেদিক থেকে নানারকম হরিণের চীৎকার শোনা যেতে লাগল। কোট্রা, শম্বর, খুরান্টি, চিতল, নীলগাই সবাই এক সঙ্গে ডাকতে লাগল।
আমি ঋজুদার মুখের দিকে তাকালাম।
ঋজুদাকে বেশ বিস্মিত দেখাল, কিন্তু সেই বিস্ময়ে তাঁর এতই আনন্দ যে তাঁর ঠোঁটে একটা চাপা হাসি ফুটে উঠছে।
আমার কিন্তু মোটেই হাসি পাচ্ছিল না।
আমি আমার টাঙ্গীটা পাশে রেখে সোজা হয়ে বসে রইলাম।
পেছনে তাকিয়ে দেখলাম, শিব্ব চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমোবার চেষ্টায় নাক-মুখ ঢেকে শুয়ে আছে। আর ভীম একটা কাঠের উপর বসে টাঙ্গী হাতে করে আমাদের দিকে চেয়ে আছে।
হঠাৎ ঋজুদা আমাকে ডেকে নিয়ে আগুনের কাছে গেল। বলল, আগুনটা নিভাতে পারবি?
আমি বললাম, কেন?
হ্যাঁ, নেভাও।
আমি ওয়াটার-বটলটা থেকে সব জল আগুনে ঢালোম, কিন্তু অত বড় আগুন তাতে নেভে না।
ঋজুদা আমার হাত থেকে ওয়াটার-বটলটা নিয়ে ঝর্ণার দিকে চলে গেল। অন্ধকারে; জল ভরে নিয়ে এল। এমনি করে তিন-চারবার জল ঢালল, আমি আমার টাঙ্গী দিয়ে জ্বলন্ত কাঠগুলো সরিয়ে আগুনটাকে আলগা করে দিলাম।
ততক্ষণে শিব্ব ঘুম থেকে উঠে আগুন নিভাতে দেখে খুব চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে। ভীম মুখে কিছু বলছে না, কিন্তু খুবই অসন্তুষ্ট।
ঋজুদা শিব্বকে ধমক দিয়ে চুপ করতে বলল।
আগুনটা নিভে আসতেই ঋজুদা আমাকে বলল, রুদ্র, ভিতরে চলে আয়।
আমি আর ঋজুদা দুজনেই গড়ের বারান্দায় উঠে এলাম।
চতুর্দিক থেকে তখনো নানারকম জানোয়ার ও পাখিদের চিৎকার শোনা যাচ্ছিল। আগুন নিভে যেতেই চতুর্দিকে যেন ঝড় উঠল।
টি-টি পাখিরা ঝাঁকে ঝাঁকে ডাকতে ডাকতে গড়ের পাশ দিয়ে সেই গুহার মুখের সামনে গিয়ে পৌঁছল; তারপর গুহার মুখের পাশে উড়তে উড়তে ডাকতে লাগল।
মাঝে মাঝে হাতির দলের বৃংহণ শুনতে পাচ্ছিলাম। এবার মনে হলো তারা যেন চলতে শুরু করেছে, এদিকেই আসছে যেন।
ঋজুদা বারান্দার কোনায় গিয়ে মুখ বাড়িয়ে ফিসফিস করে বলল, রুদ্র দেখবি আয়।
আমি ঋজুদার পাশ ঘেঁষে দাঁড়ালাম–বাইরে তাকিয়ে দেখি, তারার আলোয়। ভরা শীতের আকাশের পটভূমিতে এক বিরাট হাতির দল হেলতে-দুলতে এদিকে এগিয়ে আসছে। মাঝে মাঝে বড় হাতিগুলো দাঁড়িয়ে পড়ে শুড় তুলে পৃথিবী-কাঁপানো চিৎকার করছে।
এমন সময় হঠাৎ ভীম বলল, বাবু, সাপ!
আমরা চমকে পেছন ফিরেই দেখি, একটা তিন-চার হাত লম্বা সাপ বিদ্যুতের মতো ফণা তুলে গড়ের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে নেভাননা আগুনের পাশ দিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
ঋজুদাকে এবার একটু চিন্তিত দেখাল।
ফিসফিস করে বললাম, ওটা কি সাপ?
ঋজুদা বলল, শঙ্খচূড়।
আমরা আর কথা না বলে, সবাই বাবান্দার কোনায় একত্র হয়ে বসলাম।
ঋজুদা পিস্তলটা এবার হাতে নিল।
আমি ভয় পেয়ে বললাম, কি?
ঋজুদা বলল, কিছু না, যদি কেউ ঘাড়ে এসে পড়ে তাই।
তারপর বলল, কথা বলিস না। গুহার দিকে তাকিয়ে থাক। যেদিকে সাদা আলো দেখা গেছিল সেদিকে নিশ্চয়ই কিছু দেখা যাবে।
একটু পরই আমাদের সামনের আকাশ কালো হয়ে অন্ধকার হয়ে গেল।
হাতির দলটা গড়ের সামনের মাঠে এসে পৌঁচেছে। আমাদের দৃষ্টি আবদ্ধ। আমরা চুপ করে বসে রইলাম। ধীরে ধীরে ওরা সামনের মাঠ পেরিয়ে ঝর্ণার পাশের ডালপালা ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে গুহার দিকে যেতে লাগল।
অন্যদিক থেকেও নিশ্চয়ই হরিণ এবং অন্যান্য জানোয়াররা আসছিল। চতুর্দিকে এত বিচিত্র সব আওয়াজ হচ্ছিল তখন যে, কোনটা কোন্ জানোয়ারের আওয়াজ তা বোঝার উপায় ছিল না কোনো।
টি-টি পাখিগুলো তখনো গুহাটার মুখের উপরে ঘুরে ঘুরে উড়ে বেড়াচ্ছে।
দশ-পনেরো মিনিট এমনিই চলল। সমস্ত আওয়াজ, জঙ্গল তোলপাড়–সব এখন পাহাড়ের দিকে। এমন সময় হঠাৎ আবার সেই আলোটা দপ করে জ্বলে উঠল। এবং সমস্ত গুহা একটা চোখ ঝলসানো সাদা আলোয় ভরে গেল। আর কিছুই দেখা গেল না। আলোটা বোধহয় মিনিট খানেক রইল। তারপরই আবার যেমন জ্বলেছিল, তেমনি হঠাৎই নিভে গেল।
হাতিগুলো আর ফিরে এল না এ পথে। ঐ পাহাড়ের তলা দিয়ে কোন্-না-জানি-কোন্ জঙ্গলে চলে গেল।
অনেকক্ষণ অবধি ঐ দিক থেকে জানোয়ারদের আওয়াজ আসতে শোনা গেল। তারপর আধঘণ্টাখানেক পর সব চুপচাপ।
আবার ঝিঁঝির ডাক শোনা যেতে লাগল চারপাশ থেকে, আবার শিশির পড়ার শব্দ। উত্তেজনা নিভে গেলে, যার জন্যে প্রতীক্ষা করা তা দেখা শেষ হলে, বড় শীত করতে লাগল।
ভীম বলল, বাবু, আগুনটা জ্বালাই?
ঋজুদা ঘড়ি দেখে বলল, মোটে সাড়ে আটটা বেজেছে এখন। এই শীতে সারারাত এখানে কষ্ট পেয়ে মরে কি লাভ? চল, ক্যাম্পে ফিরে যাই।
শিব্ব আপত্তি করল; বলল, এই রাত্তিরে যাবে বাবু? কি দরকার?
ঋজুদা বলল, চল-না। হাতিরা তো ঐ দিকে চলে গেছে। ভয় তো হাতিদেরই। চল্ চল, এখানে বসে ঠাণ্ডায় মরতে হবে।
আমার কিন্তু শুনেই দারুণ ভয় লাগল। এ এক দারুণ অভিজ্ঞতা। রাতের বেলায় এই গহন বনে এতখানি পথ হেঁটে-যাওয়া। কত জানোয়ারের ডাক, কত ফুলের গন্ধ, কত রাতচরা পাখির গান শুনতে শুনতে যেন এক স্বপ্নের মধ্যে স্বপ্নময় সেতু পেরিয়ে ক্যাম্পে পৌঁছনো।
কতক্ষণ যে হাঁটলাম, তার হিসাব ছিল না। তবে এখন বরাবরই প্রায় উত্রাই। তাই খুব তাড়াতাড়ি আসা যাচ্ছিল। শীত যতই থাকুক, হাঁটতে হাঁটতে গা গরম হয়ে শেষে রীতিমত ঘাম হতে লাগল।
আশ্চর্য! অতখানি রাস্তা ঐ গভীর বনের মধ্য দিয়ে পেরিয়ে এলাম, কিন্তু দেখা হলো মাত্র একটা বিরাট বড় শজারুর সঙ্গে। আরো দেখা হয়েছিল একদল জংলী কুকুরের সঙ্গে। ভীম বলল, জংলী কুকুরের দল এদিকে ঘুরছে বলেই অন্য সব জানোয়ার সরে পড়েছে এ জঙ্গল থেকে।
আমরা যখন ঋজুদার ক্যাম্পে পৌঁছলাম তখন রাত দেড়টা।
পাহাড়ের উপর থেকেই নীচে ক্যাম্পটা দেখা যাচ্ছিল। আগুন জ্বলছিল বাইরে। হ্যাঁজাকটা ঝুলছিল বাঁশে। জীপটা দাঁড়িয়ে ছিল শিশুগাছের তলায়। ঘরের মধ্যে কমানো হ্যারিকেনের মিটমিটে আলো মাটির দেওয়ালের ফাটাফুটো দিয়ে বাইরে এসে পড়েছে।
বড় ভাল লাগল। ভাল লাগল সেই আশ্চর্য বনজ ও অপ্রাকৃত অভিজ্ঞতার পর; ভালো লাগল শীতের রাতে গরম বিছানার কথা ভেবে, মাথার উপরে ছাদের কথা ভেবে; ভালো লাগল অন্য মানুষের সঙ্গর কথা ভেবে।
মহান্তী খিচুড়ি রেডি করে রেখেছিল ঋজুদার কথামতো। শিব্ব ও ভীমকেও খেয়ে যেতে বলল ঋজুদা।
সে রাতে, আমার রান্না খিচুড়ির পর মহান্তীর রান্না খেয়ে এখন বুঝতে পারলাম যে, সে কতখানি ভাল রাঁধে।
