ঋজুদার সঙ্গে জঙ্গলে – বুদ্ধদেব গুহ
চার
চামড়া-টামড়া ছাড়াতে অনেক বেলা হয়ে গেল। শুয়োরগুলো ওরা গ্রামেই নিয়ে গেছিল। দাঁতাল শুয়োরগুলোর দাঁত দিয়ে যেতে বলেছিল ঋজুদা, ওরা দাঁতগুলো ছাড়িয়ে দিয়ে গেছিল। ইয়াব্বড় সব দাঁত।
ঋজুদা বলল, কোলকাতা নিয়ে গিয়ে কাৰ্থবার্টসন হাপারের দোকানে দিয়ে দিবি, যা বলবি তাই বানিয়ে দেবে ওরা।
কি বানানো যায় শুয়োরের দাঁত দিয়ে? ঋজুদাকে শুধোলাম।
ঋজুদা বলল, অনেক কিছু। টেবলে রাখার পেন হোল্ডার বানাতে পারিস, চাবির রিঙ বানাতে পারিস মধ্যে ফুটো করে নিয়ে, কিংবা জাস্ট সুভ্যেনির হিসাবে রেখে দিতে পারিস।
চিতাবাঘের চামড়াটা ছাড়িয়ে নিয়ে তাতে ফিটকিরি-টিটকিরি লাগিয়ে যত্ন করে রেখে দেওয়া হলো। কাল ভোরে অমৃদাদা কটক যাবার সময় সঙ্গে করে নিয়ে যাবে, সেখান থেকে ঋজুদার এক বন্ধু এটাকে ম্যাড্রাসে পাঠিয়ে দেবে ভ্যান ইনজেন্ এণ্ড ভ্যান ইনজে কোম্পানীতে। ওরা নাকি সবচেয়ে ভাল ট্যান করে শিকারের চামড়া-টামড়া।
ঋজুদা বলল, তাড়াতাড়ি চান করে খেয়ে নে রুদ্র। আমরা খাওয়া-দাওয়ার পর টিকরপাড়া যাব, মহানদীর ঘাটে। অনেকদিন মাছ খাওয়া হয়নি, ঘাট থেকে মাছ কিনব। তাছাড়া তোর নয়নামাসীরা ওখানের বাংলোয় আছে। নয়নামাসী আর তোর মেসো। দ্যাখ, যদি ওদের রাজী করাতে পারিস এই জঙ্গলে এসে এক-দুদিন থাকতে। তোর মেমসাহেব মাসীর কি জঙ্গলে থাকতে ভাল লাগবে?
আমি তো শুনে অবাক। নয়নামাসী টিকরপাড়ায় এসে রয়েছে, আর আমি জানি না? কেন, তা বলতে পারব না, নয়নামাসীকে আমার খুব ভাল লাগে। নয়নামাসী ভীষণ মেয়ে-মেয়ে। মেয়েরা যদি ছেলে-ছেলে হয় তাহলে আমার একদম ভালো লাগে না। কবরীপিসী কেমন ছেলে-ছেলে। কবরীপিসির একটু একটু গোঁফ আছে, কেমন চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কথা বলে, পিসের সঙ্গে কথায় কথায় ঝগড়া করে, আমার একটুও ভাল লাগে না। নয়নামাসী যদিও আমার আপন মাসী নয়, কিন্তু আমার সব পিসী-মাসীর চেয়ে আমি নয়নামাসীকে বেশী ভালোবাসি। নয়নামাসীর কাছে গেলেই ভাল লাগে।
খাওয়াদাওয়ার পর আমরা জীপে উঠে বসলাম। ঋজুদা আর আমি। আমি আমার বন্দুকটা নিচ্ছিলাম, ঋজুদা বলল, তুই কি আমায় জেলে পাঠাবি? স্যাংচুয়ারীর মধ্যে দিয়ে রাস্তা। কোনো কিছু শিকার করা মানা।
জীপের উইণ্ডস্ক্রীনটা নাবিয়ে দিলাম আমরা, নইলে ভীষণ ধুলো হবে। জীপের পদাও খুলে ফেলা হলো, কারণ এখন দুপুরবেলা, রোদটা ভারী আরামের। রোদ খেতে খেতে যাওয়া যাবে।
আমরা রওয়ানা হয়ে পড়লাম। কাঁচা রাস্তাটা গভীর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলে গেছে ঘনসন্নিবিষ্ট গাছগাছালিতে ভরা পাহাড়গুলোর গা ঘেঁষে ঘেঁষে টুম্বকা, পূর্ণাকোট হয়ে টিকরপাড়ার দিকে।
টিকরপাড়া উড়িষ্যার সবচেয়ে বড় নদী মহানদীর একটি ঘাট। এখানে নদী পারাপারের জন্যে নৌকো আছে। মানুষজন, গাড়ি, ট্রাক সব নদী পেরিয়ে যায় এখানে। পূণাকোট থেকে আমরা বাঁয়ে যাব–আর ডাইনে যদি যেতাম তাহলে অঙুল হয়ে ঢোনলে পৌঁছে যেতাম।
টুম্বকা থেকে পূণাকোটের রাস্তাটা সত্যিই অপূর্ব। দিনের বেলাতেও গা ছমছম করে, এমন কি গাড়িতে যেতেও। এ পথে রোজ গাড়ি যায় না। যদি কখনো কোনো ঠিকাদারের কাজ এ অঞ্চলে চালু থাকে তাহলেই যায়। কাজ চালু থাকলেও ট্রাক এ রাস্তা দিয়ে বড় একটা যায় না কটকে, কারণ ঘুর হয়। জানিসাহী হয়ে, আটগড় হয়ে চলে যায় কটক।
পথের মধ্যে ঘাস, বুনো ফুল গড়িয়ে আছে। এখানে ওখানে হাতীর ময়লা, লাল ধুলোয় নানা জানোয়ারের পায়ের দাগ। দু’পাশের জঙ্গল এত ঘন যে, ভিতরে ঢুকতে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকতে হয়।
ঋজুদার ক্যাম্প থেকে আমরা মাইল তিনেক এসেছি, জীপ চলছে আস্তে আস্তে–এ পথে জোরে যাওয়া সম্ভব নয়। হঠাৎ পথের ডানদিকে একটা ছোট টিলার সামনে ঋজুদা জীপ থামিয়ে দিল। তারপর ঐ টিলাটার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, দেখছিস কী সুন্দর ফুলগুলো! ফিকে নীল থোকা থোকা ফুটে আছে। ওগুলোর নাম গিলিরী। তারপরই বলল, যা তো রুদ্র, কয়েক তোড়া ফুল তুলে নিয়ে আয়। তোর নয়নামাসী চুলে ফুল খুঁজতে ভালবাসে। তোর মাসীকে দিবি–খুশী হবে।
আমি জীপ থেকে নেমে জঙ্গলের ভিতরে ঢুকতেই আমার ভয় করতে লাগল। যদিও দুপুরবেলা, তবুও খালি হাতে এই জঙ্গলে ঢুকতে বড়ই ভয় করে। আস্তে আস্তে টিলাটার উপরে উঠে গিয়ে ফুল তুলছি, এমন সময় টিলার ওপার থেকে একটা জোর নিঃশ্বাসের শব্দ শুনলাম। ওদিকে তাকিয়ে দেখি, টিলাটার ওপাশে, একফালি সমান জমি। তাতে ঘন সবুজ বড় বড় নরম ঘাস। পিছন দিয়ে একটা পাহাড়ী নালা বয়ে চলেছে তিরতির করে। আর সেই ঘাসের মধ্যে পা-ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একদল প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড কালো কুচকুচে মোষ। মোষগুলোর ইয়া ইয়া শিং; আর আশ্চর্য, প্রত্যেকটা মোষের কপালের কাছটা সাদা এবং পায়ের কাছে, আমরা যেমন মোজা পরি, যেন তেমনি সাদা লোমের মোজা। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম, তারপর আর থাকতে না পেরে উৎসাহে চেঁচিয়ে ডাকলাম, ঋজুদা, ঋজুদা!
ঋজুদা পাইপ ধরাচ্ছিল, স্টীয়ারিং-এ বসে–আমার ডাক শুনে মুখ তুলে বলল, কি রে?
আমি বললাম, একদল দারুণ দারুণ মোষ।
ঋজুদা বলল, এই জঙ্গলে মোষ? তারপরই তড়াক করে স্টীয়ারিং ছেড়ে লাফিয়ে নেমে তাড়াতাড়ি আমার দিকে আসতে লাগল; আসতে আসতে বলল, কথা বলিস না, ওখানে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাক।
ইতিমধ্যে আমার ডাকাডাকিতে ঐ মোষগুলো সব এক জায়গায় হয়ে গেল–এক জায়গায় হয়ে গিয়ে সব আমার দিকে মুখ করে মাথা নীচু করে বিরাট বিরাট শিং বাগিয়ে রইল। ওদের নাক দিয়ে ভোঁস ভোঁস করে নিশ্বাস পড়তে লাগল।
ঋজুদা আমার পাশে এসে পৌঁছল। পৌঁছেই বলল, বাইসন।
এগুলোই তাহলে বাইসন, যাদের কথা এত শুনেছি।
ঋজুদা ফিসফিস করে বলল, দ্যাখ, ভাল করে দেখে নে। তারপর কথা না বলে আস্তে আস্তে নীচে নেমে যা, গিয়ে জীপে বসবি।
আমি ঘাবড়ে গিয়ে বললাম, চল এক্ষুনি যাই, ওরা যদি তেড়ে আসে?
ঋজুদা আস্তে আস্তে বলল, কিচ্ছু করবে না, ভাল করে দেখে নে। দিনের বেলায় এতবড় বাইসনের দল এমন দেখা যায় না।
আমাদের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে ওরা আস্তে আস্তে এক এক করে জঙ্গলের গভীরে ঢুকে গেল ঐ মাঠ ছেড়ে। সবচেয়ে শেষে গেল সবচেয়ে বড় বাইসনটা। ঋজুদা বলল, দ্যাখ, এই হচ্ছে সর্দার।
বাইসনের দল চলে যেতেই আমরা আস্তে আস্তে নেমে এসে জীপে বসলাম। ঋজুদা জীপ স্টার্ট দিল। বলল, ফুলগুলো ভাল করে রাখ, উড়ে না যায়।
অনেক পাহাড়ের গা ঘেঁষে গিয়ে, অনেক শুকনো শাল সেগুনের পাতা মচমচিয়ে মাড়িয়ে, অনেক পাহাড়ী নালার তিরতিরানি গান শুনতে শুনতে আমরা পূর্ণাকোটের কাছাকাছি প্রায় এসে গেলাম।
ঋজুদা বলল, কি রে, চা তেষ্টা পেয়েছে?
আমি বললাম, তুমি যদি খাও।
আরে তোর পেয়েছে কি না বল-না?
মুখ ফিরিয়ে হেসে বললাম, পেয়েছে।
ফরেস্ট চেকপোস্ট পেরিয়ে এসে পূর্ণাকোটের বড় রাস্তায় একটা ছোট চায়ের দোকানে দাঁড়ালাম আমরা। দোকানী ছোট ঘোট গ্লাস সাজিয়ে চা বানাতে লাগল। আমার মনে হলো পুরোনোমোজা দিয়ে চা ছাঁকছে। ঋজুদাকে বলতেই ঋজুদা আমাকে ধমক দিয়ে বলল, কি করে চা ছাঁকচে তা তোর দেখার দরকার কি? চা পেলেই তো হলো। অন্যদিকে কি তাকাবার কিছুই নেই?
পথের ঐ দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সত্যি চোখ ফেরানো যায় না। দূরের ঐ পাহাড়গুলো আর এই রাস্তার মধ্যে অনেকখানি সমান জমি। ফসল লাগানো হয়েছিল–সমস্ত মাঠটা সোনালী আর হলুদে মেশা একটা গালচে বলে মনে হচ্চে। মধ্যে মধ্যে শর্ষের চোখ-ধাঁধানো হলুদের ছোপ। এখানে ওখানে ফসল পাহারা দেওয়ার জন্যে তৈরী খড়ের মাচা। মাঠময় বগারী পাখির একটা বড় ঝাঁক দোলা-লাগা কাঁপা কাঁপা মেঘের মত একবার মাটি ছুঁয়ে আবার পরক্ষণেই যেন মাটি ছেড়ে আকাশে উড়ে যাচ্ছে। রাস্তার পাশের হাসপাতালের কুয়োর লাটাখাটা উঠছে নামছে। তার ক্যাঁচোর-ক্যাঁচোর শব্দ সমস্ত শান্ত শীতার্ত দুপুরের নির্জনতা একটা গোঙানিতে ভরে দিয়েছে।
চায়ের দোকানী চা নিয়ে এল। আমরা গেলাস হাতে নিয়ে চা খেলাম। তারপর পয়সা মিটিয়ে দিয়ে আমরা এগিয়ে গেলাম টিকরপাড়ার ঘাটে।
পূণাকোট থেকে টিকরপাড়ার পথের দুপাশে পাহাড় নেই বটে, তবে জঙ্গল এত গভীর যে দিনের বেলাতে যেতেও গা-ছমছম করে। ধুলোয় ধুলোয় দু’পাশের গাছপালার পাতা লালচে হয়ে আছে।
দুপুরবেলার বনের গায়ে একটা আশ্চর্য গন্ধ আছে। ঋজুদার সঙ্গে ঘুরে ঘুরে হয়েছে কিনা জানি না, এ ক’দিনেই আমি জলের শব্দ, গন্ধ, চেহারা সব খুব খুঁটিয়ে দেখতে শিখেছি। সকালের বনের গায়ের গন্ধের সঙ্গে রাতের কিংবা দুপুরের বনের গায়ের গন্ধ মেলে না; যেমন মেলে না রাতের বনের শব্দের সঙ্গে সকালের বনের শব্দ।
এখানে রাস্তাটা অপেক্ষাকৃত চওড়া ও পথ সমান বলে ঋজুদা বেশ জোরে জীপ চালিয়ে চলল। এখানেও দু’পাশে ঘন জঙ্গল, তবে যে জঙ্গল পেরিয়ে এলাম, তেমন নয়।
টিকরপাড়ার কাছাকাছি আসতেই জঙ্গল পাতলা হয়ে এল। মাঠের চারপাশটা ফাঁকা ফাঁকা। কিছু কিছু ঘরবাড়ি, ছোট ছোট দোকান এই সব।
চুলে লাল নীল রিবন্ দিয়ে ফুলের মত করে ঝুটি বেঁধে কালো কালো ছটফটে ঘাসিয়ানি মেয়েরা ঘাটের চারধারে দাঁড়িয়ে-বসে রোদ পোয়াচ্ছে।
ঘাটের পাশে জীপ থেকে নেমেই আমার দু চোখ জুড়িয়ে গেল। এত সুন্দর দৃশ্য এর আগে কখনও দেখিনি। কী-ই বা দেখেছি ছাই দেখার মত!
দুপাশে মাথা-উঁচু পাহাড়–ঘন সবুজ জঙ্গলে ভরা। মধ্যে দিয়ে ঘন নীলচে-সবুজরঙা জল বয়ে চলেছে মহানদীর। এখানে মহানদী যে কত গভীর তা কেউ জানে না। ঘাটের কাছে এবং ওপাশে বাদামী রঙা বালির চর পড়েছে সামান্য জায়গায়। এই জায়গাটুকু ছাড়া মহানদীর এই গণ্ডে কোথাও চর নেই। ঋজুদা বলল, লোকে একে বলে সাতকোশীয়া গণ্ড। চোদ্দ মাইল পাহাড়ে পথ কেটে মহানদী এমনি এক গভীর গণ্ডের মধ্যে দিয়ে বয়ে গেছে এখানে। বিকেই থেকে বড়মূল।
নৌকো করে গাড়ি বা ট্রাক পার করে দেয় ওরা। ঐ পারে পৌঁছে ডানদিকের পথ ধরে জঙ্গলে জঙ্গলে শীতলপানি হয়ে লোকে চলে যায় বৌদ্ধ রাজ্যে। চারছক, ফুলবানী এইসব জায়গায়। আর একটা পথ বাঁয়ে চলে গেছে ছবির মত জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে বড়মূল হয়ে, বড়সিলিঙা হয়ে টাকরা–দশপাল্লা রাজ্যে।
গভীর জঙ্গলে ভরা মাথা-উঁচু পাহাড়গুলোর নদীর নীল আরসিতে সারা দুপুর মুখ দেখে। পাহাড়ী বাজেরা সারা দুপুর নদীর উপরে ও পাহাড়ের কোলে কোলে ঘুরে ঘুরে ওড়ে। তাদের খয়েরী ডানায় দুপুরের রোদ ঠিকরোয়। ঠাণ্ডা জল ছেড়ে মেছো কুমীররা বালিতে উঠে রোদ পোয়ায়। মাছের নৌকো বাদামী পাল তুলে গণ্ডের নীল জলে বড় বড় আঁশের মহাশোল, রুই আর কালা মাছের খোঁজ করে।
মাঝে মাঝে জল বেয়ে হিলজার্স কোম্পানীর বাঁশ যায় চৌদুয়ারের কাগজের কলে। একসঙ্গে হাজার হাজার বাঁশ লখীন্দরের ভেলার মত ভেসে চলে স্রোত বেয়ে।
গল্পের বইয়ে, ইংরিজী সিনেমায় অনেক সুন্দর এবং ভয়াবহ জায়গার বর্ণনা পড়েছি এবং দেখেছি, কিন্তু আজ এই অপরাহুবেলায় ঋজুদার হাত ধরে এমনই এক জায়গায় এসে দাঁড়ালাম যে, এমন কিছু-যে আমাদের দেশেই আছে, এ কথা ভেবে আমার গর্ব হলো। হঠাৎ বুঝতে পারলাম, কী সুন্দর দেশ আমাদের এই ভারতবর্ষ!
কি আশ্চর্য বিচিত্র আর অপূর্ব এর নিসর্গসৌন্দর্য।
ঘাট থেকে দুটো বড় বড় রুইমাছ কিনলো ঋজুদা; বলল, একটা তোর মাসীকে দিবি, অন্যটা আমাদের। অবশ্য তোর মাসী আমাদের সঙ্গে গেলে দুটোই আমরা নিয়ে যাব।
ঋজুদা বলল, চল, এবার বাংলোয় যাই। তোর ফুলগুলো শুকিয়ে যাওয়ার আগে আগে তো নয়নামাসীকে দিতে হবে, তাই না?
বাংলোয় যেতে ঘাট থেকে পিছিয়ে এসে বাঁয়ে যেতে হলো আমাদের।
বাংলাটা ভারী সুন্দর। একেবারে নদীর উপর।
জীপটা বাংলোর হাতায় ঢুকে যখন বাংলোর সামনে দাঁড়াল তখন দেখলাম, মেসো আরো তিন-চারজন ভদ্রলোকের সঙ্গে গাছতলায় রোদে শতরঞ্জি পেতে বসে তাস খেলছে। আর নয়নামাসী একা, দূরে, একটা গাছতলায় চেয়ার পেতে বসে আছে নদীর দিকে চেয়ে।
ঋজুদা মেসোদের কাছাকাছি যেতেই মেসো চিনতে পেরে বলল, আরে কি ব্যাপার, ঋজুবাবু যে! বসে পড়ন, বসে পড়ন, আরে মশাই, আমরা দিনের মধ্যে বাইশঘন্টা তাস চালাচ্ছি এখানে। তাস খেলার এমন জায়গা ভূ-ভারতে নেই।
ঋজুদা হেসে বলল, মাপ করবেন, ঐ খেলাটা আমি শেখবারই সুযোগ পাইনি।
মেসো বলল, বলেন কি? জীবনে তাহলে করলেন কি? তাহলে যান মিসেসের সঙ্গে গল্প করুন। চা না খেয়ে যাবেন না কিন্তু। এখানে এরা এমন তন্ময় হয়ে খেলছে যে, এদের রসভঙ্গ না করাই ভাল।
সঙ্গের ভদ্রলোকেরা আমাদের দিকে ভাল করে তাকালেনও না। দেখলেন, মাঝখানে একটা ডিসের উপর অনেকগুলো টাকা চাপা দেওয়া।
ততক্ষণ নয়নামাসী আমাদের দেখতে পেয়েছিল। দেখতে পেয়ে এদিকে আসছিল। আমি দৌড়ে গিয়ে ফুলগুলো দিলাম।
মাসী আমাকে আদর করে বলল, বাঃ বাঃ, তুই তো ভারী মিষ্টি ছেলে হয়েছিস। কোথা থেকে পেলি রে ফুলগুলো? কি নাম?
আমি কৃতিত্বের সঙ্গে বললাম, গিলিরী। ঋজুদা পাড়তে বলেছিল তোমার জন্যে। তারপরই বললাম, জানো মাসী আজ বাইসন দেখলাম।
বাইসন? সত্যি? আমি বললাম, সত্যি। তারপর বললাম, মাসী, তোমাদের জন্যে ঋজুদা মাছ এনেছে। খাবে তো?
মাসী হাসল, আমাকে আদর করে বলল, খাব না কেন?
ঋজুদাকে আসতে দেখে মাসী প্রথমে মুখ নামিয়ে নিল, যেন দেখেইনি।
আমার মনে হলো, মাসীর সঙ্গে ঋজুদার নিশ্চয়ই এর আগে কখনো খুব ঝগড়া-টগড়া হয়েছিল। নইলে কাউকে দেখে মুখটা অমন করে?
তারপর হঠাৎ মাসী মুখ তুলে হেসে বলল, তারপর ঋজুদা, কি মনে করে? পথ ভুলে এলেন বুঝি?
ঋজুদা হাসল। হাসলে ঋজুদাকে ভারী ভাল লাগে। ঋজুদা বলল, পথ ভুলে কেন? আমার এই-ই তো পথ। এ ছাড়া অন্য পথ নেই। এ পথেই যাওয়া-আসা।
তারপর হঠাৎই বলল, তুমি কেমন আছ বলে?
মাসী একবার মেসোদের দিকে চোখ তুলে দেখল, তারপর বলল, ভাল। খুব ভাল। দেখতেই তো পাচ্ছেন। খারাপ আছি বলে মনে হচ্ছে কি?
ঋজুদা বলল, জানি না, আমার নিজের দেখার চোখ থাকলে তো দূর থেকেই দেখতে পেতাম।
এমন সময় আমি বলতে গেলাম, মাসী, তোমাদের আমরা নিয়ে যাওয়ার জন্যে এসেছিলাম, কিন্তু আমি কথা আরম্ভ করার আগেই ঋজুদা আমাকে চোখ দিয়ে ধমকে দিল। কিন্তু কেন, তা আমি জানি না।
মাসী বলল, আপনি কিন্তু খুব রোগা হয়ে গেছেন ঋজুদা। অনেকদিন পরে দেখলাম আপনাকে।
ঋজুদা জবাবে কিছু বলল না, নদীর দিকে চেয়ে রইল।
মাসী বলল, আপনারা বসবেন না? বসুন। এতদূর থেকে এলেন, এখানে রাতে খেয়ে যেতে হবে কিন্তু। কি রে রুদ্র? থাকবি না?
ঋজুদা বলল, জঙ্গলের গেট বন্ধ হয়ে যাবে যে একটু পরে। দেরী করা যাবে নয়না।
নয়নামাসী একটু রাগ রাগ গলায় বলল, এমন ভাবে আসার কি মানে হয়? না এলেই হতো।
ঋজুদা আবার হাসল; বলল, হয়ত তাই। না এলেই হয়ত হতো। তবু এলাম। এলাম বলে দেখা হলো তোমার সঙ্গে। কি? তাই না?
এবার মাসী আমার দিকে চেয়ে বলল, রুদ্র তুই যা তো, গিয়ে দ্যাখ, চৌকিদার কি করছে। চৌকিদারকে ডেকে নিয়ে আয় তো। লক্ষ্মী ছেলে।
আমি চলে গেলাম। কিন্তু আমার মন বলল, চৌকিদার ব্যাটা উপলক্ষ। কোনো কারণে মাসী আমাকে তাড়াতে চাইছে। কেন যে তাড়াতে চাইছে সেটা বুঝতে পারলাম না।
চৌকিদারবাবু ঘুমোচ্ছিলেন। তাঁকে ঘুম থেকে ডেকে নিয়ে আমি যখন ফিরলাম, দেখি ঋজুদা চলে এসে জীপের কাছে পৌঁছে গেছে। মাসী জীপের স্টীয়ারিং-এর পাশে দাঁড়িয়ে আছে। মাসীর মুখটা খুব শুকনো দেখাল। মনে হলো, মাসী যেন কাঁদছে।
আমি বললাম, মাসী, এই যে চৌকিদার।
মাসী বলল, তোর ঋজুদা একটুও বসতে পারবেন না, আর চৌকিদারকে দিয়ে কি করব বল? তারপরই চৌকিদারকে বলল, চৌকিদার, আমার ঘরে ঢেকানল থেকে আনা পোড়-পিঠের একটা ঠোঙ্গা আছে, নিয়ে এসো-না।
চৌকিদার ঠোঙ্গাটা আনতেই মাসী আমার হাতে ওটা দিয়ে বলল, রুদ্র, এটা তোরা নিয়ে যা। জঙ্গলে দিনের পর দিন কি খাস রে?
আমি হাসলাম; বললাম, কত কি খাই!
ঋজুদা বলল, চল রুদ্র, উঠে পড়।
স্টীয়ারিং-এ বসে ঋজুদা মেমসাদের দিকে হাত নাড়ল।
মেসো বাঁ হাতে তাস ধরে, সিগারেট মুখে দিয়ে ডান হাত নাড়ল, তারপর সিগারেটটা মুখ থেকে নামিয়ে বলল, সাংঘাতিক জিতছি, জিতছিই; এখন আসা সম্ভব নয়। ডোন্ট মাইণ্ড। প্লিজ। সী-ইউ।
ঋজুদা মাসীর দিকে চেয়ে শুধোল, গজেন কি বলল? জিতছে?
মাসী ডান হাতে কপালে-পড়া চুল ঠিক করতে করতে বলল, সাংঘাতিক জিতছে।
ঋজুদা এঞ্জিনটা স্টার্ট করল। স্টীয়ারিং-এ রাখা ঋজুদার হাতের উপর আঙুল ছুঁইয়ে মাসী বলল, পরশু কোলকাতা ফিরব, চিঠি লিখবেন, কেমন? লিখবেন তো?
ঋজুদা উত্তর দিল না, শুধু মুখ ঘুরিয়ে একবার মাসীর দিকে তাকাল। তারপর জীপ ব্যাক করে নিয়ে ঋজুদা একসিলারেটরে ভীষণ জোরে চাপ দিয়ে খুব স্পীডে গাড়ি চালাতে লাগল। সময়মত যেতে না পারলে জঙ্গলের গেট বন্ধ হয়ে যাবে। রাতে আর ফেরা যাবে না ডিম্বুলিতে।
আমার মনে হলো, ঋজুদার বোধ হয় ভীষণ দেরী হয়ে গেছে।
ফেরার পথে সারা রাস্তা ঋজুদা কোনো কথা বলল না আমার সঙ্গে। মাঝে মাঝে কি যে হয় ঋজুদার, সে-ই জানে। পাইপটা ভরবার জন্যে শুধু একবার একটা নালার পাশে দাঁড়াল-তারপর সারা রাস্তা আর একবারও দাঁড়াল না।…
.
আমরা প্রায় ক্যাম্পের কাছে পৌঁছে গেছি, ক্যাম্প থেকে পাঁচশ মিটার দূরে একটা বাঁক আছে মারাত্মক। একটা সাঁকো কাঠের। একেবারে নড়বড়ে। সাঁকোটা পেরিয়েই পথটা হঠাৎ কোনাকুনি ঘুরে গেছে বাঁয়ে। সেই বাঁকটা ঘুরতেই আমার মনে হলো, সামনে পথটা বুঝি শেষ হয়ে গেছে–আর পথ জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা পাহাড়।
কি হলো বোঝার আগেই ঋজুদা জোরে ব্রেক কষল। জীপের হেডলাইটের আলোতে দেখলাম, পথ জুড়ে একটা হাতি দাঁড়িয়ে আছে। একা হাতি। হাতিটা পাশ ফিরে দাঁড়িয়ে ছিল। জীপটা তার কাছে গিয়ে পৌঁছতেই হাতিটা অতবড় শরীরটা ঘুরিয়ে আমাদের দিকে মুখ ফেরাল।
আমি ঋজুদার দিকে মুখ ফেরালাম, দেখলাম ঋজুদার চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে, ঋজুদা ডান হাতটা ট্রাফিক কনস্টেবলের মত তলে আমার বুকে ছোঁয়াল, আর ইশারায় আমাকে চুপ করে থাকতে বলল।
আমি এমনিতেই চুপ করে গেছিলাম, আমাকে ঋজুদার বলার কোনও দরকার ছিল না কোনো।
হাতির চোখ বলে কিছু আছে বলে মনে হলো না। তখন চোখে চোখে তাকাবার মত অবস্থাও ছিল না আমার। সামনের সমস্তটুকু পথ বন্ধ করে হাতিটা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে কান নাড়তে লাগল। শুড়টা একবার তুলে জীপের বনেটের উপর দিয়ে, ছোটবেলায় ঠাকুমা যেমন বাচ্চাদের “হাত ঘোরালে নাড় পাবে” বলে হাত ঘোরাতেন, তেমন করে ঘুরিয়ে নিল।
ঋজুদারও বোধহয় কিছুই করার ছিল না। আমরা দুজনে যেন বিরাট এক দৈত্যের সামনে লিলিপুটিয়ান মানুষদের মত কতক্ষণ যে নিশ্চল হয়ে বসে থাকলাম মনে নেই।
বহুক্ষণ পর ডালপালা ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে, আপন মনে, যেন কিছুই সে করেনি, এমন ভাব করে হাতিটা রাস্তা ছেড়ে বাঁ দিকের জঙ্গলে ঢুকে গেল।
ঋজুদা জীপটা আবার স্টার্ট করে আস্তে আস্তে ক্যাম্পের দিকে যেতে লাগল।
ঋজুদা বলল, বুঝলি রুদ্র, এই হাতিটাকে যেমন ভালোমানুষ দেখলি, ও কিন্তু তেমন নয়। এ পর্যন্ত ও তিনবার জঙ্গলে ট্রাক উল্টে দিয়েছে, তিন-চারজন লোক মেরেছে এবং ঘর ভেঙ্গেছে অনেকগুলো। প্রত্যেক পূর্ণিমার দিনে হাতিটার পাগলামি বাড়ে।
আমি বললাম, তুমি এত আস্তে চালাচ্ছ কেন ঋজুদা, তাড়াতাড়ি চালাও না, যদি ও আবার আমাদের তাড়া করে আসে?
ঋজুদা হাসল; বলল, ভয় নেই, এখন ও আর কিছু করবে না।
আশ্চর্য লাগে ভাবলে, ঋজুদা কি করে সব বোঝে, সবকিছু জানে? কখন কোথায় গেলে চিতল হরিণকে কি খেতে দেখা যাবে, অশ্বত্থ গাছ ছেড়ে উড়ে যাওয়া হরিয়ালের ঝাঁক আবার ফিরে আসবে কিনা, এবং এলে কখন আসবে? ভালিয়া-ভুলুর পাহাড়ের উঁচু রাস্তায় আমরা বিকেলে হাঁটতে যাওয়ার সময় সেই বুড়ো ভালুকমশাইর সঙ্গে আমাদের দেখা হবে কি হবে না, এ-সবই ঋজুদা ঠিক ঠিক বলে দিতে পারে।
কি করে বলতে পারে জিজ্ঞেস করলেই ঋজুদা হাসে; বলে, ওদের সকলের কুষ্ঠি আমার কাছে আছে।
