ঋজুদার সঙ্গে জঙ্গলে – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

দুই

সেদিন সকালবেলা আকাশ মেঘলা করেছিল।

ক্যাম্পের আশপাশের জঙ্গল থেকে ময়ূর ডাকছিল, কেঁয়া কেঁয়া করে। ঝিরঝির করে একটা হাওয়া ছেড়েছিল মহানদীর দিক থেকে।

মুহুরীরা সকলেই ভোর বেলা চান করে জঙ্গলে চলে গেছিল। ক্যাম্পের বাখারীর বেড়ার উপর তাদের মেলে দিয়ে যাওয়া নানারঙা লুঙ্গিগুলো হাওয়ায় ওড়াউড়ি করছিল। একটা বাদামী লেজঝোলা কুম্ভাটুয়া পাখি সাহাজ গাছ থেকে নেমে এসে ক্যাম্পের চারধারে লাফিয়ে লাফিয়ে এক্কাদোক্কা খেলছিল, আর কি যেন বলছিল নিজের মনে।

ঋজুদা ইজিচেয়ারে শুয়ে ছিল।

আমি পাশের চেয়ারে বসে বন্দুক ও রাইফেলগুলো পরিষ্কার করছিলাম।

ঋজুদা এখন প্রায় ভাল হয়ে গেছে। কাল থেকে জঙ্গলে বেরোবে নিয়মিত কাজ দেখাশুনো করতে। এরপর থেকে শিকার-টিকারও একটু-আধটু হতে পারে।

ঋজুদা বলল, ভাল করে পুল-থু দিয়ে টেনে টেনে রাইফেলগুলো পরিষ্কার কর, তারপর তেল লাগা। ওদের যত্ন না করলে ওরা ভারী অভিমান করে, বুঝলি।

আমি ঋজুদার দিকে মুখ তুলে তাকিয়েছি, এমন সময় একটা ভারী সুন্দর হলদে-কালোতে মেশা পাখি এসে ক্যাম্পের সামনের কুরুম্ গাছটার ডালে বসল।

আমি অবাক হয়ে পাখিটাকে দেখতে লাগলাম।

ঋজুদা আমার চোখ দেখে পাখিটার দিকে চাইল, বলল, কি পাখি জানিস?

আমি বোকার মত বললাম, না।

ঋজুদা বলল, নাঃ, তুই সত্যিই একেবারে ক্যাকেসিয়ান–কোলকাতায় থেকে থেকে একেবারে নিরেট ইট হয়ে গেছি। এটা হলুদ-বসন্ত পাখি। নাম শুনিসনি?

আমি বললাম, নাম শুনেছি, কিন্তু আগে দেখিনি। সত্যি! কী সুন্দর দেখতে, না?

ঋজুদা যেন নিজের মনেই বলল, জঙ্গলে যখনি আসবি, চোখ-কান খুলে রাখবি, নাক ভরে শ্বাস নিবি, দেখবি, কত সুন্দর সুন্দর পাখি, প্রজাপতি, পোকা, আর কত সুন্দর সুন্দর গাছ লতাপাতা ফুল চোখে পড়বে।

বুঝলি রুদ্র, মাঝে মাঝে ভাবি, চোখ-কান তো আমাদের সকলেরই আছে, কিন্তু আমাদের মধ্যে বেশীরভাগ লোকই তো কাজে লাগাই না।

আমি কিছু বললাম না। চুপ করে রইলাম।

দেখতে দেখতে রাইফেল দুটো পরিষ্কার হয়ে গেল। বন্দুকটাতে হাত দিয়েছি, এমন সময় সামনের ডিম্বুলি গ্রাম থেকে কয়েকজন লোক এসে ঋজুদাকে দণ্ডবৎ হয়ে কি যেন সব বলল।

দেখলাম, ঋজুদা ইজিচেয়ারে সোজা হয়ে বসল। তারপর ওদের ভাষায় কড়মড় করে অনেকক্ষণ কি সব কথাবার্তা বলল।

আমি কিছুই বঝলাম না ওদের ভাষা, খালি “বারা” “বারা” এই কথাটা শুনলাম। কিছুক্ষণ পর ওরা হাত নেড়ে নেড়ে উত্তেজিত গলায় কি আলোচনা করতে করতে চলে গেল।

ঋজুদা বলল, বুঝলি কিছু?

আমি বললাম, বারা বারা।

ঋজুদা হাসল। বলল, তাহলে তো বুঝেইছি। বারা মানে শুয়োর। লোকগুলো বলে গেল যে, সারা রাত ধরে শুয়োরের দল এসে ওদের ক্ষেত সব তছনছ করে দিয়ে যাচ্ছে, যদি আমি ক’টা শুয়োর মেরে দিই তাহলে খুব ভাল হয়। তাছাড়া শুয়োরের মাংসও ওরা খুব ভালবাসে।

তুমি কি বললে? আমি জিজ্ঞেস করলাম।

ঋজুদা আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। বলল, রুদ্রবাবুর কি ইচ্ছা?

আমার চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল; হেসে বললাম, শিকারে যাওয়ার।

ঋজুদা বলল, রুদ্রবাবুর যখন ইচ্ছা, তখন যাওয়া হবে।

তারপর আবার হাসতে হাসতে বলল, তোর দাদা এত বড় বৈষ্ণব, যিনি গায়ে মশা বসলে মশাটি পর্যন্ত মারেন না, আর তাঁর ভাই হয়ে কি না তুই এতবড় জহ্লাদ হলি? তোর দাদা আমার মুখও দেখবেন না আর। তার ভাইকে আমি একেবারে জংলী করে দিচ্ছি, তাই না?

এমন সময় অমৃতলাল কটক থেকে ট্রাক নিয়ে এল। কটকে কাঠ নামিয়ে দিতে গেছিল সে কাল ভোরে। আজ ফিরে এল।

অনেকদিনের খবরের কাগজ, ঋজুদার জন্যে পাইপের টোব্যাকো, চা, কফি, বিস্কুট, আরো অনেকানেক জিনিসের বাণ্ডিল হাতে করে নামল অমৃতলাল।

এই অমৃতলালকে আমার বেশ লাগে। আমি বলতাম, অমৃত দাদা।

ফর্সা, রোগা দাড়িহীন পাঞ্জাবী। বয়স এই তিরিশ-টিরিশ হবে। হাসিটা খুব মিষ্টি আর দারুণ উৎসাহী। শিকারে যেতে বললে তো কথাই নেই। না-খেয়ে-দেয়ে সে সারাদিন পনেরো-কুড়ি মাইল জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরবে।

অমৃত দাদা পায়জামা পাঞ্জাবি আর নাগরা জুতো পরত ট্রাক চালাবার সময়, মাথায় একটা গামছাও লাগাত। গামছাটাতে রুপোর চুমকির মত কি সব চকমকি লাগানো ছিল।

অমৃত দাদা বলত, সমঝা লোন্তা, ঈ রোলেক্স গামছা।

শিকারে যাবার সময় কিন্তু অমৃত দাদার সাজ বহু বিচিত্র হতো। দিনে যদি যেত ততো ও একটা হাফ প্যান্ট, বুশ-কোট ও কালো বুট জুতো পরত। এই তিনটি জিনিসই তাকে তার ফৌজী কাকা ভালবেসে কোনোদিন দিয়েছিল। কিন্তু অমৃত্ দাদার কাকার জামা-কাপড় এতই ঢোলা ছিল যে তার মধ্যে দুজন অমৃত দাদা বিনা কষ্টে ঢুকে যেতে পারত। তাই সেই জামা-কাপড়ে ওকে অদ্ভুত দেখাত। আর পায়ে বুটটা এতই বড় হতো যে হাঁটলেই সবসময় খ-খাপ্র, গবর-গাবর শব্দ হতো।

ঋজুদাও ওকে ঐ জন্যে কক্ষনো শিকারে নিয়ে যেতে চাইতেন না। কিন্তু অমৃত দাদা ঐ জামা-কাপড় কিছুতেই ছাড়বে না, ওর মিলিটারী কাকা ভালবেসে দিয়েছে, ও কি তার অমর্যাদা করে? যতবার বুট পরত, প্রতিবারই বুটের মধ্যে ট্রাকের এঞ্জিন মোছর একগাদা তুলো খুঁজে নিত, যাতে পায়ে ফোস্কা না পড়ে।

রাতের পোশাক ছিল তার আরো বিচিত্র। সারা শরীরে একটা ঢোলাঢালা মেকানিকদের তেল-কালি মাখা ওভার-অল্ পরত, আর মাথায় সেই রোলেক্স গামছা, এবং গায়ে ওয়াটারপ্রুফ। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা যে কোনো সময়ই রাতে শিকারে বেরোলেই ওয়াটারপ্রুফটা গায়ে সে চাপাবেই। আর পায়ে সেই গবর-গাবর বুট জুতো।

খুব মজার লাগত আমার অমৃত দাদাকে।

অবকাশের সময় নানা গল্প করত অমৃত দাদা আমার সঙ্গে।

বেলা বাড়লে রোদটা যখন কড়া হল তখন চান করতে গেলাম আমি। বারোটা বাজলেই চান করতে যেতে হবে, তারপর ঠিক একটার সময় ঋজুদার সঙ্গে খেতে বসতে হবে।

ঋজুদা রোজ ভোর বেলা চান করে নেয়।

এখানে চান করতে ভারী আরাম। ঋজুদা বলত, সবসময় সারা গায়ে যত পারিস রোদ লাগাবি।

এখানে তো আর বাথরুম নেই। কলও নেই। চান করতে যেতাম প্রায় তিনশ’ গজ দূরে একটা পাহাড়ের উপরের ঝর্ণায়। ঝর্ণাটার নাম ছিল মিঠিপানি। মিঠিপানির মত সুন্দর ঝর্ণা আমি খুব কম দেখেছি।

হাতে সরষের তেলের শিশি ও জামা কাপড় ভোয়ালে নিয়ে চলে যেতাম পাহাড়টাতে। যেখান থেকে ঝর্ণা নেমেছে সেটা ঠিক পাহাড় নয়, একটা টিলামত, সেই টিলাই পরে উঁচু হয়ে উঠে গেছে বড় পাহাড় হয়ে।

সে জায়গাটাতে বিশেষ গাছগাছালি ছিল না। একটা সমান চেটালো কালো পাথরের উপর দিয়ে ধাপে ধাপে বয়ে গেছে মিঠিপানি ঝর ঝর করে। এক-একটা ধাপের নীচে গর্ত হয়েছে পাথর ক্ষয়ে ক্ষয়ে–সেই সব গর্তে প্রায়। এক কোমর জল। উপর থেকে সমানে জল পড়ায় জল স্বচ্ছ ও পরিষ্কার।

এই জলাধারটা সমানভাবে একটু বয়ে গিয়ে নীচে, বেশ নীচে লাফিয়ে পড়েছে একটা বড় ঝর্ণা হয়ে। তারপর মিঠিপানি নদী হয়ে গড়িয়ে গেছে। ডিম্বুলি গ্রামের দিকে।

ঝর্ণার্তা যেখানে নীচে পড়ে নদী হয়েছে সেখানে একটা বড় গর্ত। জল বেশ গভীর। সেখানে গাঁয়ের লোকেরা, মেয়ে-বউরা, গরু-মোষরা সব চান করতে আসে।

কিন্তু আমরা যেখানে যাই চান করতে, সেখান থেকে ঐ জায়গা দেখাই যায় না। কারণ আমরা থাকি টিলার মাথায়। আর টিলাটা একেবারে খাড়া নেমে গেছে ঝর্ণার সঙ্গে, তাই নীচ থেকে কোনো লোক এদিকে আসেও না।

এইখানে পাথরের উপরগুলো পরিষ্কার। মাঝে মাঝে শুধু কি সব বুনন ঝোঁপ-বেগুনী বেগুনী ফুল ফুটে আছে তাতে। বেশ লাগে দেখতে। পাথরের উপরে সবুজ গাছের ঘন ঝোঁপ–আর মাঝে মাঝে জল বয়ে চলেছে। ঝর ঝর করে।

ঋজুদা বলেছিল, এখানে লজ্জা-শরমের কিছু নেই। ঝোঁপের আড়ালে সব জামাকাপড় খুলে ফেলে সমস্ত শরীরে অনেকক্ষণ ধরে সর্ষের তেল মাখবি বসে বসে। তারপর পাথরের উপর শুয়ে থাকবি এখানে উপুড় হয়ে, তারপর চিত হয়ে, দেখবি সমস্ত শরীর রোদ লেগে কেমন গরম হয়ে ওঠে। তারপর ঝর্ণায় চান করে জামাকাপড় পরে ক্যাম্পে ফিরবি।

শুধিয়েছিলাম, তুমিও কি তাই কর?

ঋজুদা বলেছিল, নিশ্চয়ই। তুইও কর-না। এমন আরামে চান করলে দেখবি কোলকাতায় গেলে এই ক্যাম্পের জন্যে কেমন কষ্ট হয় তোর।

প্রথম প্রথম লজ্জা করত। ক্যাম্পের দিক থেকে যদি কেউ চলে আসে? কিন্তু ক্যাম্পের সকলেই ভোরবেলা চান করে নিত, তখনই রান্নার জল নিয়ে নিত, কাপড়-টাপড় কেচে নিত এখানে পাথরে বসেই; তাই দুপুর বেলায় আমার চানের সময় কেউই আসত না এদিকে। তাছাড়া, ক্যাম্পের সব লোক তো কাজেই বেরিয়ে পড়ত সাত-সকালে।

বেগুনী ফুলে ছাওয়া ঝোঁপের পাশে পাথরে জামা কাপড় ছেড়ে সারা শরীরে তেল মাখতাম। মাঘ মাস, প্রথমে হাত-পা বেশ কনকন করত। কিন্তু সর্ষের তেল মাখতে মাখতে রোদ আর পাথরের গরমে একটু পরেই শরীর গরম হয়ে যেত। উপরে তাকিয়ে দেখতাম যতদূর দেখা যায়–নীল, দারুণ নীল আকাশ। চতুর্দিকে ঘন গহন জঙ্গল। বড় বড় ডালে বাদামী রঙা কাঠবিড়ালিগুলো লাফালাফি করে পাতা ঝাঁকাত। কত কি পাখি ডাকত দু’পাশ থেকে। পাহাড়ের মধ্যের জঙ্গল থেকে ডিম্বুলি গ্রামের মোষেদের গলার কাঠের ঘন্টা বাজতে ডুঙ-ডুঙিয়ে। মোষগুলো খুব কাছে চলে এলে, আমার লজ্জা করত, আমি আঙ্গাপাঙ্গা হয়ে থাকতাম, তাই মোষগুলো বড় বড় চোখ করে আমার দিকে তাকালে প্রথম প্রথম আমার খুব লজ্জা করত। কিন্তু সত্যি বলছি, দারুণ লাগত।

কেউ কোথাও নেই–কি সুন্দর শান্তি চারদিকে। মাথার উপরে নীল ঝকঝকে আকাশ, পায়ের নীচে কালো চেটালো পাথর আর লাফিয়ে লাফিয়ে চলা ফেনা-ছিটানো বহুবিভক্ত ঝর্ণা, আর চতুর্দিকে গভীর সবুজ বন।

মধ্যে আমি আঙ্গাপাঙ্গা, একা।

ঋজুদা বলত, বুঝলি রুদ্র, আমাদের আসল মা কিন্তু এই আকাশ, পাহাড়, নদী, এই প্রকৃতি। আমি জানি, ছোটবেলায় তোর মা মরে গেছেন, তাই তোর কষ্ট। কষ্ট হওয়া স্বাভাবিক। তবে তুই যদি এই মাকে ভালবাসতে পারিস তবে দেখবি কত ভালো লাগে।

ঋজুদার কোনো কারণে মন খারাপ থাকলে বলত, জানিস, আমি এদের সবাইকে বলি যে, আমি যেখানেই মরি না কেন, তোরা আমাকে জঙ্গলে এনে কবর দিয়ে যাস। পোড়াস না আগুনে। চারদিকে গাছঘেরা একটা দারুণ সূর্যালোকিত জায়গায়, পাখির ডাকের মধ্যে, হাওয়ার শীষের মধ্যে তোরা আমাকে কবর দিয়ে রাখিস।

তখন ঋজুদার কথা শুনতে শুনতে চোখে জল এসে যেত। ঋজুদা সত্যি ভীষণ ভালবাসে জঙ্গল পাহাড়কে। ভীষণ ভালবাসে। ঋজুদার সঙ্গে থেকে আমিও ভালবাসতে শিখেছি। আস্তে আস্তে এই জঙ্গল আর পাহাড়ের মধ্যে আমার ছোট্টবেলার হারিয়ে-যাওয়া মাকে খুঁজে পাচ্ছি যেন।

চান করার মাঝে মাঝে জল থেকে উঠে এসে ভেজা শরীরে পাথরের উপর হেঁটে বেড়াতাম। পাথরের উপর আমার নিজের শরীরের ছায়াকে দৌড়ে তাড়া করতাম। পিছন ফিরে আমার ভেজা পায়ের ছাপ দেখতাম পাথরের উপর। কখনো বা হাত নাড়িয়ে ইংরিজী-স্যারের মত ইংরিজী বলতাম, একা একা, আঙ্গাপাঙ্গা–হাওয়ার সঙ্গে, রোদের সঙ্গে, বনের সঙ্গে।

তখন, সেই সমস্ত মুহূর্তগুলোতে আর সবকিছুই ভুলে যেতাম। আমার মনে হতো আমিই এই পাহাড়, জঙ্গল, ঝর্ণা আর এই আদিগন্ত সবুজ সাম্রাজ্যের রাজা। আঙুল নেড়ে নেড়ে হাওয়ার ধমক দিয়ে দিয়ে ওদের সবাইকে শাসন করতাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *