ঋজুদার সঙ্গে বক্সার জঙ্গলে – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

আট

পরদিন লেট-ব্রেকফাস্টের পরেই রওয়ানা হওয়া হল। প্রায় দশটা নাগাদ। ব্রিজ তত বন্যায় ভেঙেই গেছে। আবার কবে নতুন করে সে ব্রিজ বানানো হবে, তা ঈশ্বর আর পি. ডব্লু. ডি.র ঈশ্বরের মতন ইঞ্জিনিয়ার এবং ঠিকাদারদেরই দয়া।

আমরা নদীর বুকে নেমে গেলাম জিপ নিয়ে, তারপর পথ কোনটা আর বিপথ কোনটা তা বোঝার কোনও উপায়ই রইল না।

জয়ন্তী নদীর শুকনো বালিময় বুকের মধ্যে মধ্যে অনেকখানি কোনাকুনি গিয়ে তারপর নদী পেরুনো হল। কিন্তু নদী কি একটা? কিছুদূর যাবার পরেই ফাসখাওয়া নদী পেরিয়ে, চুনিয়াঝোড়া নদী পেরিয়ে তুরতুরি চা বাগানের মধ্যে দিয়ে গিয়ে ময়নাবাড়ি বীট অফিসে পৌঁছলাম মিনিট পঁয়তাল্লিশ পরে। ময়নাবাড়ি, নর্থ রায়ডাক রেঞ্জের একটি বীট। বীট অফিসার অভিজ্ঞ সুভাষচন্দ্র রায় জঙ্গলের পোকা। ময়মনসিংহ জেলাতে বাড়ি। আমাদের চা খাওয়ালেন। ভটকাই, ওরই মধ্যে আড়ালে তাঁর সঙ্গে কথাবার্তা বলে ঋজুদার জন্যে শুঁটকি মাছের বন্দোবস্ত ফিট করে এল! এই নইলে, ঋজুদা ওকে তালেবর বলে!

সুভাষবাবু বললেন, আমার ফ্যামিলি এখানে থাকে না। তবে, শুঁটকির বন্দোবস্ত একটা হবে।

বীট অফিসের পাশেই একটি ছোট ডোবা মতন ছিল। তার পাড়ে পাড়ে রাশ রাশ টাটকা সবুজ কলমি শাক ফুটেছিল। ডোবাতে হাঁস চড়ছিল, সাদা আর বাদামিতে মেশা। স্বগতোক্তি করতে করতে। আমার ইচ্ছে হল একমুঠো শাক তুলে নিয়ে যাই। ভুটানঘাটের বাংলোতে পৌঁছে গরম ভাত দিয়ে খাওয়া যাবে। মেঘলা আকাশের নীচে সজনে গাছের ফিনফিনে পাতারা তিরতির করে কাঁপছিল। কোথায় যেন কে মুসুরির ডালে কালোজিরে শুকনো লংকা ফোড়ন দিল। গন্ধে ভরে গেল প্রলম্বিত সকাল। নীল আকাশ, চারধারে জঙ্গল, সহজ মন্থর জীবনযাত্রা। তাড়া নেই, টেনশান নেই, হাঁসের প্যাঁকপ্যাকানি, মৃদুমন্দ হাওয়া বইছে। দূরে মেঘ করে আসছে। মনে হয়, বৃষ্টি হবে। ভারী ভাল লাগছিল।

ওইখানেই খবর পাওয়া গেল যে দার্জিলিং থেকে কনসার্ভেটর, হিলস, এস, এস. বিস্ত সাহেব একটু আগেই বীট অফিস পেরিয়ে ভুটানঘাটের বাংলোর দিকে চলে গেছেন ঋজুদার সঙ্গে আলাপিত হতে। তারপর লাঞ্চ খেয়ে আবার ফিরে যাবেন দার্জিলিং। চিঠি এবং ফোনেই কথাবার্তা হয়েছে দুজনের এ যাবৎ, চাক্ষুষ দেখাসাক্ষাৎ হয়নি।

দেখেছ কাণ্ডটা!

ঋজুদা বলল।

তারপরই বলল, হাউ নাইস অফ হিম।

ময়নাগুড়ি বীট অফিস থেকে বাঁয়ে ঘুরেই আমরা দুদিকে গভীর জঙ্গলের মধ্যে পাউডারের মতন ধূলি-ধূসরিত পথে এগিয়ে চললাম।

জয়ন্তী থেকে রওয়ানা হবার সময় থেকে যখন এক ঘণ্টা দশ মিনিট মতন হয়েছে ঘড়িতে, তখন পথের ডান দিকে একটি দোতলা বাংলোর হাতার মধ্যে রেঞ্জার সুবীর বিশ্বাসের জিপটি ঢুকে পড়ল। দেখলাম, একটি লাল বাতি লাগানো সাদা অ্যামবাসাডর দাঁড়িয়ে আছে।

বিস্ত সাহেব ছিপছিপে, ফর্সা, ছোট্ট-খাট্ট মানুষটি। কিন্তু একজোড়া জবরদস্ত পাকানো গোঁফ আছে। ভারী অমায়িক মানুষ।

ঋজুদা আর উনি দোতলার বারান্দাতে বসে নানা বিষয়ে কথা বলতে লাগলেন আর আমি আর ভটকাই ঘুরে ঘুরে বাংলো এবং বাংলোর আশপাশ দেখতে লাগলাম রেঞ্জার সুবীর বিশ্বাসের সঙ্গে। বাংলোর হাতাতে শিশু ও আম গাছ আছে দেখলাম। একটি বেঁটে-মোটা জারুল গাছ। এমন জারুল সচরাচর দেখা যায় না। জারুলেরা সচরাচর ছিপছিপে ও লম্বা হয়। তাই হঠাৎ একে দেখলে জারুল বলে চেনাই যায় না। একটি শিশু গাছের গায়ে অর্কিড হয়েছে। যে-গাছটা আমরা চিনতাম না, তা চেনালেন বীট অফিসার সুভাষবাবু। জানি না, ঋজুদারও চেনা আছে কিনা। গাছটার নাম উদাল বা ওদাল। বাংলোর পাশ দিয়ে রায়ডাক নদীর দিকে যাবার যে রাস্তাটি আছে। তারই বাঁ পাশে আছে গাছটি। সেদিকে পাম্প হাউসও আছে। সেই উদাল বা ওদাল গাছে এখন লাল লাল ফল এসেছে। ফুল ফোটে নাকি হলুদ ও বেগুনি রঙা, ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে। এই গাছের বটানিকাল নাম হল Streculia Villosa। বললেন, সুভাষবাবু। দেশলাই কাঠি হয় এই কাঠ থেকে। নরম কাঠ। ছাল থেকে ফাইবার বা তন্তুও হয়। আঠাও হয়। তবে তেমন সুবিধের নয়।

তারপর সুভাষবাবু বললেন, খয়ের গাছ দেখেছেন কখনও?

ভটকাইকেই কেন জিজ্ঞেস করলেন, কে জানে! ওর চেহারাটা আমার চেয়ে ভারিকি আর হাবভাব জ্যাঠার মতন বলেই বোধহয়।

ভটকাই বলল, না। লজ্জার মাথা খেয়ে।

আমার সামনে মিথ্যেটা বলে কী করে?

আমি বললাম, কেন? নিনিকুমারীর বাঘ মারতে গিয়ে সেই গড়-এর নীচে তো খয়েরের জঙ্গলও ছিল রে। তুই একটা কানা।

ভটকাই, ফর আ চেঞ্জ, নিরুত্তর রইল।

খয়ের কী করে বানায়?

আমাকে ইগনোর করে ভটকাই প্রশ্ন করল।

বলব এখন পরে আপনাদের।

সুভাষবাবু বললেন।

আমি বললাম, আমি জানি।

ভটকাইয়ের জন্যে আমার লজ্জা করছিল। ঋজু বোসের ইজ্জত ঢিলে করে দিল একেবারে তার এই নতুন চেলা। ওকে বললাম, কোয়েলের কাছে বলে একটা উপন্যাস আছে, পালামৌর পটভূমিতে লেখা। পড়ে নিস। তাতে কী করে খয়ের বানানো হয় তার বিস্তারিত বর্ণনা আছে।

ভটকাই সুভাষবাবুকে জিজ্ঞেস করল, বাবুর্চিকাম-চৌকিদারের নামটা কী?

মনবাহাদুর।

কেন?

না। একটু আলাপ করে আসি।

বুদ্ধিমান সুভাষবাবু ভটকাই-এর মুখ দেখেই যা বোঝার বুঝেছিলেন। বললেন, এই জঙ্গলে তো কিছুই পাওয়ার জো নেই। তবু আপনাদের জন্যে মুরগি আর কাতল মাছ জোগাড় করেছি। মাছ আনাতে হয়েছে সেই আলিপুরদুয়ার থেকে।

তেকাটা আর বরোলি মাছ বুঝি এ অঞ্চলে পাওয়া যায় না?

ভটকাই জিজ্ঞেস করল।

ওইসব মাছ বেশি পাওয়া যায় ডিমা, নোনাই, কালচিনি ইত্যাদিতে। জয়ন্তী বা রায়ডাকে হয়তো পাওয়া যায় কিন্তু ধরে কে এই জঙ্গলে! বাঘ যতি সাপ গাউরে ভরা যে ভীষণ জঙ্গল! থাকেই বা ক’জন মানুষ! সাপ্তাহিক হাটে মোরগা-আণ্ডা, পাঁঠা-শুয়োর ওঠে, ওই দিয়েই মুখ বদলানো আর কী!

এই সব অঞ্চলে মানুষ থাকে না?

থাকে বই কী! মাঝে মাঝে বস্তি আছে। চা বাগানে তো মেলাই মানুষ।

তারা কি সাঁওতাল?

না, সাঁওতাল নয়। এদিকের চা বাগানের কর্মীদের মধ্যে বেশিই মোদেশিয়া। তাদের ভাষার নাম সাদরী। টোটোরাও আছে। টোটোপাড়া বলে একটা বস্তিই আছে। রায়মাটাং-এর দিকে। রাভারাও আছে। মেচ আছে। এখানে বলে মেচিয়া। তবে কম। গারোরাও আছে।

সুবীরবাবু বললেন, আপনারা বুঝি Anthropology-তে ইন্টারেস্টেড?

ভটকাই Anthropology শব্দটার মানে না বুঝে apologetically বলল, শুনেছিলাম হাতিদের একটা রোগ হয়, তার নাম Anthrax।

ভটকাই-এর নির্বুদ্ধিতায়, লজ্জায় মাথা কাটা গেল আমার।

নাঃ। ঠিক করলাম ঋজুদাকে বলতেই হবে যে, ওকে নিয়ে আর কোথাওই যাওয়া নয়।

সুবীরবাবু বুঝতে পেরেছিলেন যে ভটকাই শব্দটার মানে বুঝতে পারেনি।

উনি বললেন, আমি নৃতত্ত্বের কথা বলছি।

বুঝেছি। আদিবাসীদের নৃত্যের কথা বলছেন তো!

ভটকাই আবারও স্মার্টলি কেলো করল।

আমি ধমকে বললাম, এখন চুপ কর। পরে তোর সঙ্গে আলোচনা করব।

দুপুরের খাওয়ার পরে মিতাহারী বিস্ত সাহেব চলে গেলেন তাঁর ব্যবহারে ও সৌজন্যে আমাদের মুগ্ধ করে।

আমরা এখন দোতলার বারান্দাতে বসে আছি। বাংলোর পাশেই একটি নুনী বা Salt Lick-। কুদরতি নয়, বানাওটি। আর তার ঠিক পেছনেই ভুটানের পাহাড় দেখা যাচ্ছে। পাহাড়ের মাথার কাছের কিছুটা জায়গা সাদা দেখায়, সেখান থেকে পাথর বা কোনও ধাতব পাথর বের করাতে। মনে হয়, যেন বরফ পড়েছে। বারান্দায় বসে সেই দিকে চাইলে নুনীটা দৃষ্টিপথেই পড়ে। চারটি চিতল হরিণী আর একটি শিঙাল নুন চাটতে এসেছে। জোর হাওয়া আসছে নদী থেকে। আর ঝরঝরানি আওয়াজ।

রাতে বেশ ঠাণ্ডা হবে। ভাবলাম।

ঋজুদা বলল, মনে হচ্ছে, রাতে দুটি কম্বল লাগবে জানালা-দরজা বন্ধ করেও। অথচ মাসটা মার্চ।

বললাম, রায়ডাক নদী ঘুমপাড়ানি গান গাইবে সারারাত।

রাইট।

বলে, অনেকক্ষণ বাদে ঋজুদা পাইপটা ধরাল। পাইপ খাওয়া অনেকই কমিয়ে দিয়েছে আজকাল। দুপুরের খাওয়ার পরে একটু খায়, আবার রাতের খাওয়ার পরে। ব্রেকফাস্টের পরেও খায় কখনও কখনও।

এদিকে মনে হয় একটাও তক্ষক নেই। ট্রাক টু-উ-ট্রাক-টু-উ ডাক একেবারেই শোনা যাচ্ছে না।

আমি বললাম।

আছে হয়তো। নদীর শব্দের জন্যেই হয়তো শোনা যাচ্ছে না।

খাওয়াটা বড় জোর হয়ে গেল র‍্যা।

ভটকাই বলল।

খেতেই তো এসেছিস তুই।

আমি বললাম।

চল, বিকেলে চা খেয়ে হাঁটতে বেরোব।

ঋজুদা বলল।

নদীতে যাব তো?

যাব। কিন্তু বাংলোর পাশের পাম্পঘরের পাশ দিয়ে নয়। সামনের পথ দিয়ে যাব।

কেন?

ওইখানে নদী খুব চওড়া।

বেশ!

তারপর কাল সকালে তোদের নিয়ে পীপিং-এ যাব। ভুটান আর পশ্চিমবাংলার সীমান্তে। বিস্ত সাহেব বলছিলেন। ভুটানের নদীটির নাম ওয়াক্কু। গিরিখাতের মধ্যে দিয়ে বইছে। পীপিং-এ পৌঁছে, সমতলে পড়েই, ছড়িয়ে গেছে নদী। হাত পা শরীর সব মেলে দিয়েছে। তার নাম হয়ে গেছে সেখানে এই রায়ডাক।

রায়ডাক নাকি নদ? শুনেছি।

হবে। কিন্তু আজকাল তো ছেলেদের সঙ্গে মেয়েদের তফাত করা যায় না। লেখিকা বলেন না কেউই, বলেন লেখক। তাই রায়ডাক পুরুষ না নারী তা। নিয়ে বৃথা তর্ক করে কী লাভ?

গল্পে গল্পে দেখতে দেখতে বেলা পড়ে এল। কিছুক্ষণ আগে আকাশে একটু মেঘ মেঘ করেছিল। এখন পরিষ্কার হয়ে গেছে। মনবাহাদুর দোতলার বারান্দাতে চা নিয়ে এল। রেঞ্জার সুবীর বিশ্বাসও লাঞ্চের পরে চলে গেছিলেন তাঁর রেঞ্জ অফিসে। বলে গেছিলেন সন্ধের পর আসবেন। কল্যাণ দাস, অ্যাডিশনাল ডি. এফ. ও.ও আসবেন বলেছিলেন।

বলতে একেবারেই ভুলে গেছিলাম যে, বিস্ত সাহেব আসার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বিদ্যুৎ সরকার, অ্যাসিস্ট্যান্ট কনসার্ভেটর এসেছিলেন। ঋজুদার ভক্ত। উনিও খাওয়া-দাওয়ার পর বিস্ত সাহেবের সঙ্গেই ফিরে গেলেন। ঋজুদার খুবই পছন্দ হয়েছে তাঁকে। বলল, ছেলেটি খুবই ব্রাইট। অনেক খোঁজ-খবর রাখে। দেখিস, জীবনে খুব উন্নতি করবে। তোরা দেখতে পাবি। তখন আমি হয়তো আর বেঁচে থাকব না। কল্যাণ দাসও অবশ্য ভাল। দুজনেই ভাল। তবে দুরকম।

চা খেয়ে আমরা বেরোলাম। তখনও বেলা ছিল। দিনে দিনেই ঘুরে আসব। সঙ্গে টর্চও নিইনি। ধূলি-ধূসরিত পথ ধরে পীপিং যাওয়ার রাস্তাতে আমরা হেঁটে এগোলাম। তারপর এক ফার্লং মতন গিয়ে সেই পথ ছেড়ে ডান দিকে যে পথটি চলে গেছে তাতে ঢুকলাম। সে পথে ট্রাকের চাকার দাগ ছিল।

ঋজুদা বলল, নদীতে ট্রাক যাওয়া-আসা করে কেন? কীরে ভটকাই?

ভটকাই বলল, পিকনিক পার্টি?

তোর মাথা! এই মার্চ মাসে কেউ পিকনিক-এ আসে! তাও আজ তো রবিবারও নয়। ভেবে বল।

মার্চ মাস হলেও ওয়েদার তো প্লেজেন্ট।

পিকনিক-এ আসতে হলে মনেরও কিছু বলার থাকে। জমাটি শীত না পড়লে, রোদে বসে আরাম না হলে, কি পিকনিক করার কথা মনে হয় কারোরই?

তাহলে? ভেবে নিয়ে ভটকাই আবার বলল, বালি আনতে গেছিল হয়তো নদীর বুকে।

বালি তো জয়ন্তী, ফাসখাওয়া, চুনিয়াঝোড়া যে-কোনও নদী থেকেই আনা যেত। এত দূরে ঠেঙিয়ে আসার দরকার কী?

তবে?

পাথর রে, পাথর। নদীর বিছানা থেকে পাথর আনতে যাওয়া-আসা করে ট্রাক।

এখানে নানা রকমের ধাতু আছে, না? ঋজুদা?

আমি জিজ্ঞাসা করলাম।

নিশ্চয়ই।

ঋজুদা বলল।

কী? কী? ঋজুদা?

ডলোমাইট, লাইমস্টোন, ক্যালকারিয়াস টুফা, কপার ওর, কয়লা, আয়ন ওর আর ক্লে।

ওর কী জিনিস?

ভটকাই বলল।

ধাতু তো আলাদা থাকে না। পাথরের সঙ্গেই মেশানো থাকে। পাথর থেকে তাদের আলাদা করে তারপর তা গলিয়ে মানুষ নানা কাজে লাগায়। সেই ধাতব পাথরকেই বলে ORE বাংলায় বলে আকর।

হাঁটতে হাঁটতে আমরা নদীর কাছে এসে পৌঁছলাম। এদিকে চিলৌনি, সিঁদুরে গাছ, ডেউয়া, ডুমুর এবং আকাতরু গাছ দেখা গেল। বহেড়া এবং আমলকী। যদিও হিমালয়ের পাদদেশকে বলে তেরাই, এই সব কিন্তু ভাব্বার অঞ্চল। এ অঞ্চলে জল থাকে ভূস্তরের অনেকই নীচে। গাছেদের অনেক গভীরে শিকড় নামিয়ে দিতে হয় জল পাওয়ার জন্যে। এই শিকড়দের বলে Tap Roots। সুন্দরবনের ম্যাংগ্রোভ জঙ্গলের গাছেদের শিকড়দের যেমন বলে, Aerial Roots।

একরকমের মাঝারি গাছ দেখিয়ে ঋজুদা বলল, এগুলোর নেপালি নাম কী জানিস?

কী? ঝিমুনি। দ্যাখ, পাতাগুলো দেবদারু ও লিচুপাতার মতন। আর ওই যে দ্যাখ, মেড়া গাছ। ঘন সবুজ পাতা। বেনটিক লতা, বউভোনিয়া লতা।

এই বউভোনিয়াই কি Bauhinia Vali?

আমি জিজ্ঞেস করলাম।

ঋজুদা বলল, কার-রে-ক্ট। শেষ শব্দটির ওপর জোর দিয়ে।

তারপর বলল, এদের স্থানীয় নাম ভেড়লা।

ভেড়লা? কী নাম রে বাবা!

ভটকাই বলল।

রাইফেলবন্দুক সঙ্গে কিছুই নেই। কড়াকপিং করতে পারছে না। ভটকাই-এর মন ভাল নেই। উদাসী-উদাসী ভাব। নিনিকুমারীর বাঘ মারার অ্যাডভেঞ্চারের পরে তো মণিপুরের ইম্ফল আর নাগাল্যান্ডের কাঙ্গপোকপিতে যাওয়া হয়েছিল মৃত্যুরহস্যর কিনারা করতে। সেখানেও বন্দুক রাইফেলের দরকার ছিল না। ছিল পিস্তলের।

এবারে বনের বুকের কোরক আর মাথার উপরে পাতার সবুজ চাঁদোয়ার ছায়া পেরিয়ে আমরা নদীর পাশে এসে দাঁড়ালাম।

আঃ। অপূর্ব!

ভটকাই-ই বলল প্রথমে।

সত্যিই অপূর্ব। আমার মুখ থেকে অনবধানেই বাক্যটা বেরিয়ে এল।

ঋজুদা কিছুই না বলে, সেদিকে চেয়ে পাইপের পোড়া ছাই ঝেড়ে ফেলে পাইপে নতুন তামাক ভরতে লাগল।

তোমার এই তামাকটার গন্ধ ভারী ভাল ঋজুদা। কী তামাক?

গ্ল্যামার। চেরী র‍্যাভেন্ডিশ। ডাচ টোব্যাকো। হল্যান্ডে তৈরি। গত সপ্তাহে, ডিটার রাইমেনস্নাইডার ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে নিয়ে এসেছিল আমার জন্যে।

তিনি আছেন কেমন? আমাকে ডাকলে না?

আমি বললাম।

ভালই। তিন দিনের জন্যে এসেছিলেন। খুব ব্যস্ত, তাই…

বাঃ। দারুণ সুন্দর গন্ধ কিন্তু। যারা কাছে থাকে তাদের দিলখুশ হয়ে যায়।

রোদ আস্তে আস্তে পড়ে আসছে।

নদীর ওপারে ভুটান। প্রায় হাজার ফিট উঁচু খাড়া পাহাড় চলে গেছে বরাবর নদীর সমান্তরালে। আর সেই পাহাড়ের পেছনে ঢেউ-এর পর ঢেউ-এ পাহাড় মাথা তুলেছে। ক্রমশ সবুজ থেকে কালচে হয়েছে তাদের রং, কাছ থেকে যত দূরে গেছে। পাহাড়ের পায়ের কাছেই নদীর দুধলি জলধারা বেগে নীচের পাথরে হোঁচট খেতে খেতে চলকে-ছলকে বিভিন্ন রঙা পাথরের উপর দিয়ে, বিভিন্ন সমতার তল বেয়ে বেগে ধেয়ে চলেছে। আসলে, জলের তো কোনও রং নেই, অবয়বও নেই। যার বুকে যখন থাকে জল তখন তারই রঙের হয়ে যায়। যার উপর দিয়ে বয়ে যায় জল, তারই আয়তনকে সে নিজস্ব করে নেয়। তাই তার রং আর চেহারার এত হাজার রকম।

জোর শব্দ উঠছে সেই উচ্ছল জলরাশি থেকে। বিদায়ী সূর্যের নরম কমলা রোদ, সাদা নুড়িময় শুকনো নদীরেখা, দ্রুতধাবমানা জলরাশি আর তার পেছনের স্থির গম্ভীর পাহাড়শ্রেণী মিলে মিশে হু-হুঁ হাওয়ার মধ্যে এক আশ্চর্য অনড় ছবির সৃষ্টি করেছে।

স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম আমি। কথা বলতেও ভুলে গেলাম।

হঠাৎ ঋজুদা পাইপধরা ডান হাতটা তুলে কী যেন দেখাল দূরে।

আমরা দেখলাম, একজোড়া সাদা কালো Wood Duck ভাঁটা থেকে উজানে, পীপিং-এর দিকের ওয়াঙ্গু নদীর দিকে উড়ে যাচ্ছে, রায়ডাক নদীর বুকের উপর দিয়ে। তাদের সাদা কালো নরম কোমল ডানা-মেলা সম্ভ্রান্ত উড়াল শরীরে দিনশেষের কমলা আলো পড়ে মাখামাখি হয়ে তাদের যেন সোনার পাখি বলেই মনে হচ্ছে।

যতক্ষণ দেখা যায় ততক্ষণ চেয়ে রইলাম আমরা সকলেই।

আবার ঋজুদা বলল, ওই দ্যাখ।

বলেই, এগিয়ে চলল জলের দিকে।

আমরা অবাক হয়ে দেখলাম শিমুলের বীজ-ফাটা তুলো আলতো হয়ে ভেসে আসছে হাওয়াতে দ্রুতগতিতে। সেই জোড়া উড-ডাক যেদিকে উড়ে গেল সেই দিক থেকেই। তুলোর আঁশেরা ধীরে ধীরে উচ্চতা হারিয়ে এসে জলে পড়ছে একেক করে। আর ধাবমানা জল তাদের ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে প্রচণ্ড বেগে, যেমন করে আমাদের দেশে হাজার হাজার তীর্থক্ষেত্রে প্রিয়জনের মঙ্গল কামনা করে, নদীর বুকে পুণ্যার্থীদের ভাসিয়ে দেওয়া ফুল-পাতার দোনাতে বসানো প্রদীপগুলি ভেসে যায়।

ভাবছিলাম, কে জানে! এই নির্মল কলুষহীন তীব্র হাওয়া কার বা কাদের মঙ্গল কামনা করে কোন অচিনপুরের দিকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এই অগণন বীজ-ফোঁটা শিমুলের তুলোর প্রদীপ?

ঋজুদা বলল, চল, আমরা পথ দিয়ে না গিয়ে নদীর বুক ধরেই ভুটানঘাট বাংলোতে ফিরে যাই। পাম্প হাউসের কাছে গিয়ে, জল পেরিয়ে উঠব গিয়ে বাংলোর পিছন দিয়ে। ওদিকের জলধারায় স্রোতের বেগও কম। পেরুতে অসুবিধে হবে না।

ভটকাই বলল, চলো।

এই আশ্চর্য সৌন্দর্যর মুখোমুখি হয়েই ভটকাই-এর মতন বাঁচালও সৌন্দর্যহত হয়ে একেবারেই নীরব হয়ে গেছে।

আমি বললাম, ঋজুদা।

বলেই, বালিতে দেখালাম, ডান হাতের তর্জনী দিয়ে।

একটা লেপার্ড জল খেয়ে জঙ্গলের দিকে ফিরে গেছে। তার টাটকা পায়ের দাগ বালিতে।

ভটকাই দাঁড়িয়ে পড়ে মনোযোগ সহকারে দেখল।

ঋজুদা বলল, ফিমেল।

তারপরই দেখলাম, আর একটু এগিয়েই একটি বড় বাঘ, মানে টাইগারের পায়ের দাগ। সেও জল খেয়ে জঙ্গলে ফিরে গেছে। তবে ছাপটি দিন চার-পাঁচের পুরনো। বালির উপরে রাতের শিশিরে আর দিনের রোদ-হাওয়াতে ছাঁচ ভেঙে গেছে।

বললাম, পুরুষ বাঘ। তাই না?

ঋজুদা থুতনিটা নিচু করে সায় দিল।

ঋজুদাও কথা বলছে না কোনও। এমন সৌন্দর্য মানুষকে বোবা করে দেয়। হয়তো কাঁদাতেও পারে। আমার তাই মনে হচ্ছিল ভটকাই-এর সৌন্দর্যহত মুখটির দিকে তাকিয়ে।

এবারে দ্রুত অন্ধকার হয়ে আসছে। দিন ও রাতের মধ্যের এই ক্ষণটুকুকেই অর্যমা বলে। সিনে ক্যামেরার মিক্সিং-এর মতনই ঘটছে এই সন্ধে নামা ব্যাপারটা। নিঃশব্দে। ওপারের ভুটানের দিক থেকে হাতির বৃংহণ ভেসে এল মার্সিডিজ ট্রাকের হর্ন-এর তীক্ষ্ণ আওয়াজের মতন। হাওয়াটা ক্রমশই জোর হচ্ছে এবং ঠাণ্ডা।

নদীতে সামনেই একটি প্রপাত মতন আছে। এক কোমর সমান উঁচু হবে। জল কম, অথচ কী আওয়াজ! কী স্রোত! জুতোসুদু পা একবার ডুবিয়েই মনে হয়েছিল ভাসিয়ে নিয়ে যাবে রায়ডাক আমাকে বিন্দুমাত্রও হাঁকডাক না করে। ডান দিকের প্রায়ান্ধকার জঙ্গলের মাথার উপরে একজোড়া ওয়াটেন্ড ল্যাপউইং ডাকছিল, ডিড উ্য ডু ইট? ডিড ঊ্য? ডিড উ্য ডু ইট?

চাঁদটা উঠেছে ভুটান পাহাড়ের পিঠের ওপরে কিন্তু কোনও প্রাগৈতিহাসিক জানোয়ারের মতন পাহাড়টার অন্ধকার রোমশ পিঠ সেই আলো শুষে নিচ্ছে। টিটি পাখি দুটো নিশ্চয়ই কোনও মাংসাশী জানোয়ার দেখে থাকবে। সাবধান করছে তৃণভোজীদের। অথবা কোনও নড়াচড়া দেখেছে। হয়তো নদীর পাথর আর বালিভরা বুকে চলমান আমাদের তিনমূর্তিকে দেখেই ডাকছে, তাও হতে পারে। এমন সময়ে আমাদের পেছন থেকে একটা অদৃশ্য কোটরা হরিণ খুব জোরে ব্বাককব্বাক ধ্বক করে ভয় পাওয়া ডাক ডেকে উঠল।

ভটকাই বলল, বাঘ কি চিতা দেখেছে।

ঋজুদা ফিসফিস করে বলল, রুদ্র সেই গানটা গা তো।

কোন গানটা ঋজুদা?

সেই যে, ও আমার দেশের মাটি… তুই বড় ভাল গাস গানটা!

ভটকাইও যেন নীরবে আমাকে অনুরোধ করল গানটি গাইতে।

আমি ধরলাম :

ও আমার দেশের মাটি, তোমার
’পরে ঠেকাই মাথা।
তোমাতে বিশ্বময়ী, তোমাতে
বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা ॥

আমার গানের সঙ্গে সঙ্গে যেন নদীর জলের আওয়াজ আরও জোর হতে লাগল এবং গাঢ় হতে লাগল অন্ধকার।

আমরা তিনজন নুড়ির আর বালির উপর দিয়ে হেঁটে যেতে লাগলাম আমাদের এই আশ্চর্য সুন্দর দেশের এক সুন্দর কোণে, এক সুন্দরতর সন্ধ্যাতে। গর্বে আমার চোখ জলে ভরে এল, আমরা এই দেশে জন্মেছি যে, এই কথা ভেবে।

কারও মুখেই কোনও কথা ছিল না।

আমরা তিনজনে….

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *