ঋজুদার সঙ্গে বক্সার জঙ্গলে – বুদ্ধদেব গুহ
পাঁচ
বিকেলেও আমরা চা খাওয়ার পরে হাঁটতে বেরিয়ে ছিলাম। নর্বু বলল, জঙ্গলের ভিতরে যাবেন না।
কেন?
হাতি আছে। আর ছিনতাই পার্টিও আছে।
হাতিরা ছিনতাই পার্টিদের কিছু বলে না?
দেখি না তো বলতে।
হাসি পেল আমার নর্বুর কথা শুনে। বেঁটেখাটো, পিটপিটে চোখের নর্বু তামাং ভারী ইন্টারেস্টিং মানুষ।
ভটকাই বলল, হাতিরা আমাদের পোষা।
তাই?
নর্বুর মুখে এমন একটা ভাব ফুটে উঠল যেন ও বলছে যে, ব্যাটারা হাতি নাতি খেয়ে মরলে খুবই খুশি হই।
জঙ্গলের মধ্যে বেড়িয়ে শেষ বিকেলে ফিরে এসে গরম জলে চান-টান করে আমরা পরদিন জয়ন্তী জায়গাটা কেমন হবে সেই আলোচনাতে উত্তেজনার সঙ্গে মগ্ন হলাম। জয়ন্তীর নাম শুনছি সেই কবে থেকে! ভারী সুন্দর জায়গা নাকি? এতদিনে সত্যি সত্যিই যাওয়া হবে।
গল্পে গল্পে সন্ধে হল। সন্ধে থেকে রাত।
ঋজুদা বলল, কাল সকাল সকাল জয়ন্তীর পথে বেরিয়ে পড়া যাবে।
কতক্ষণ লাগবে যেতে?
জানি না। যতক্ষণ খুশি লাগুক। আমাদের হাতে অঢেল সময়।
যা বলেছ! সময় দিয়ে গোল্লা পাকিয়ে ঢিল মারা যায়।
ভটকাই বলল।
যত উদ্ভট উদ্ভট আইডিয়া তোর মাথাতেই আসে।
এমন সময় ওয়্যারলেস টেলিফোনে খবর এল যে, জয়ন্তীর রেঞ্জার বিমান বিশ্বাস, জিপ পাঠাবেন দুপুরের খাওয়ার পরে আগামীকাল আমাদের নিয়ে যেতে। সকালে নয়।
ভটকাই বলল, যাক। কাল দুপুরেও তা হলে গাছ-পাঁঠা খাওয়া যাবে। যাই বল আর তাই বল এখানের এঁচোড়গুলোর স্বাদই আলাদা। তা হলে কাল ব্রেকফাস্টের পরে হুইসপারিং-ট্রেইলের শেষ অবধি যাওয়া যাবে।
কালকের কথা কালকে। রাতে কী মেনু করে এসেছিস রে ভটকাই?
আমি বললাম।
হ্যাঁ। তুইই তো আমাদের কোয়ার্টার-মাস্টার!
ঋজুদাও বলল।
রাতে বিশেষ কিছু বলিনি। নর্বুকে বলেছি এই সাহেবকে, মানে ঋজুদাকে ভাল করে খাওয়াও। সাহেব সারা পৃথিবীর বনে বনে ঘুরে বেড়ায়। আর আরও যত্ন করে খাওয়াও ওই রুদদরবাবুকে, কারণ, তাঁর হাতে কলম এবং দারুণই নিন্দুক সে। যত্ন-আত্তির একটু খামতি হয়েছে তো সঙ্গে সঙ্গে নাম উঠে যাবে খাতায়। পরে কেঁদে কূল পাবে না।
আহা, মেনুটা কী বল না?
ঋজুদা বিরক্ত হয়ে বলল।
সিম্পল। ভটকাই বলল, এই জঙ্গলে বিশেষ কিছু তো পাওয়া যায় না। তাই ও মুগ-মুসুরি মেশানো খিচুড়ি করবে, মধ্যে জম্পেশ করে গাওয়া ঘি ঢেলে, কড়কড়ে করে আলু ভাজা, মুরগি ভাজা, লেড়ো বিস্কুটের ক্র্যাম দিয়ে, পাথালি করে বেগুন ভাজা, মানে, যজ্ঞিবাড়িতে আগে যেমন হত আর কী! এঁচড়ের চপ, টোম্যাটো-প্যাঁজ কাঁচালঙ্কা দেওয়া স্যালাড আর শুকনো লঙ্কা ভাজা। এই। সিম্পল-এর উপরেই করতে বললাম আর কী!
ঋজুদা বলল, পশ্চিমবঙ্গের বন বিভাগের নেমন্তন্ন এই প্রথম এবং এই শেষ। আর নেমন্তন্ন করবেন না ওঁরা। জঙ্গলের কোনও হাতিও বোধহয় এত খায় না।
ভটকাই বলল, খাও রেলিশ করে তোমরাই আর আমি খাই তোমাদের গালাগালি।
রাতের খাওয়া-দাওয়ার পরে আমরা বারান্দাতে সব আলো নিভিয়ে দিয়ে চাঁদের আলো উপভোগ করছি। বিজলি আছে এখানে। বিজলি আলো থাকলে আলোপাখার আরাম পাওয়া যায় অবশ্য কিন্তু জঙ্গলকে জঙ্গল বলে মনে হয় না। আজ সপ্তমী বা অষ্টমী হবে। শুক্লপক্ষ। চাঁদটা, মেঘ-মেঘ ভুটান পাহাড়ের মাথা ছাড়িয়ে উঠেছে। আকাশ মাঝে মাঝেই মেঘলা হয়ে যাচ্ছে। আলিপুরদুয়ারের কাল রাতের সেই পাগলা হাওয়াটা আমাদের পিছু নিয়ে এখানেও এসে দাপাদাপি করছে। দিনে বেশ গরমই ছিল। রাতে বাইরে বসলে ভারী প্লেজেন্ট। কী সাবান দিয়ে চান করেছে জানি না ঋজুদা, গা দিয়ে ভুরভুর করে চন্দনের গন্ধ বেরুচ্ছে।
ভটকাই বলল, হাতিরা তোমার গায়ের গন্ধেই চলে আসবে কিন্তু বাংলোর কাছে।
আমি বললাম, ওই গন্ধের জন্যেই হয়তো আসবে না।
কেন?
ভাবতেও পারে তো চন্দনবনের চোরা শিকারি ভীরাপ্পানের কাজিন!
আমার বাক্যটিও শেষ হয়েছে আর সঙ্গে পটকার আওয়াজ, ক্যানেস্তারা বাজানোর আওয়াজ, কাঁসর-ঘণ্টা ও শাঁখ বাজানোর আওয়াজে রেললাইনের ওদিকটাতে, স্টেশানের কাছকাছি একেবারে সরগরম হয়ে উঠল। মশালে আগুন জ্বেলে লোকজন চিৎকার করতে করতে ছুটে বেড়াতে লাগল ওইদিকে। আমরা উঠে রেলিং-এ হাত রেখে অন্ধকারের মধ্যে অন্ধকারতর চলমান কোনও তূপ দেখা যায় কিনা তা দেখার চেষ্টা করতে লাগলাম। ভটকাই দৌড়ে তার ফ্ল্যাশ-লাগানো ক্যামেরাটা নিয়ে এল। যদিও ফ্ল্যাশের রেঞ্জ মাত্র পনেরো ফিট। কিন্তু হাতি যে যায়নি, যাচ্ছে না, তা বোঝা গেল।
এমন সময় দেখলাম নর্বু তামাং পথ দিয়ে হেঁটে হেঁটে গলা ছেড়ে গান গাইতে গাইতে বাংলোর দিকে আসছে।
চিট্টি আয়ে না।
মেনো মায়ানুকো মলাই চিট্টি আয়ে না।
চিট্টি আয়ে না।
গানের মানে না বুঝলেও ভারী চমৎকার লাগছিল শুনতে নর্বুর গান ওই পরিবেশে। বাংলোর পাশেই একটা ছোট্ট সরু নালা। তার ওপারে একটি দোতলা বাংলোতে অনেক নেপালিরা রয়েছেন সংসার নিয়ে। সেদিক থেকেই আসছিল সে।
ভটকাই উত্তেজিত হয়ে নর্বুর ভালর জন্যেই চেঁচাল, নর্বু! নর্বু! বি কেয়ারফুল। এলিফ্যান্ট! হাতি!
নর্বু বলল, গণেশটা। ওইটা প্রায়ই আসে তো। কলা খাইতে।
কলা খেতে? হাতি? হাতি কি হনুমান?
ভটকাই না-দমে বলল।
কখনও হাতিও খায়। কলাগাছও খায় ডালবহিস্যা।
নর্বু বলল।
থোড় খায়? বেড়ে তো! রাঁধে কী দিয়ে? তাতে নারকোলও কুরিয়ে দেয়? আহা!
কিছুক্ষণ পর শোরগোল ধীরে ধীরে কমে এল। মশালও নিভে এল।
নর্বু সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে এসে বলল, এই জন্যেই আপনাদের জঙ্গলে যাইতে মানা করছিলাম। রাজাভাতখাওয়ার চারধারেই হাতি। দিন রাত বলিয়া কিছু নাই। বাইরাইলেই হইল। ভালবাসিয়া একখান পা তুইল্যা দিলেই তো শ্যাষ। অথবা শুড় দিয়া উঠাইয়া একখান আছাড়। মাইনষের জানের থিক্যা তো ইঁদুরের জানও শক্ত।
পরদিন বেড-টি খাওয়ার পরই যেদিকে কাল রাতে হাতি এসেছিল সেই দিকেই হেঁটে রওয়ানা দিলাম। কাক-উড়ান-এ যেতে পারলে সামান্যই দূরত্ব কিন্তু এঁকে বেঁকে হেঁটে গেলে আধ মাইলটাক পড়ে। যেখানে পৌঁছে দেখা গেল নর্বুর কথাই ঠিক। হাতিটা একটা কুঁড়েঘরকে প্রদক্ষিণ করেছে অতি সামান্য জায়গার মধ্যে দিয়ে ওই বিরাট শরীর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে। তারপর ছোট্ট একখানি চষা ক্ষেতের উপরে দাঁড়িয়ে একটা কলাগাছ উপড়ে নিয়ে ফিরে গেছে পেছনের জঙ্গলে রেলের হাসপাতালের একেবারে গা ঘেঁষে। সেই কুঁড়েতে তখন একজন বুড়ি আর একটি বছর বারো-তেরোর মেয়ে ছিল। মেয়েটি আমাদের চেয়ে অনেকই সাহসী। গত রাতের অতিথির কথা বলছিল নির্বিকারভাবে। চষা ক্ষেতে তার পায়ের পাতার গোলাকার ছাপ পড়েছে।
ভটকাই ফটাফট ছবি তুলল। বলল, আমাদের বাগবাজারের পাড়াতে ফিরে গেলে পরেশ, নান্টা, অভিষেক, দীপ্ত বিশ্বাসই করবে না যে হাতির সঙ্গে এনকাউন্টার করে এলাম।
আমি বললাম, ওরা তোকে জানে ভাল করেই। তোর এনকাউন্টার যে কী প্রকারের হতে পারে সে সম্বন্ধে…
নিনিকুমারীর বাঘ-এর চামড়াটার বোঁটকা গন্ধ কি ওরা নিজ নিজ নাসিকাতে শোঁকেনি? ভটকাই যে কী জিনিস তা ওরা জানে। তুই আমাকে চেপে রাখার চেষ্টা করলে কী হবে!
হাতিটার পেছনের একটা পায়ে চোট আছে কোনওরকম। পায়ের দাগ লক্ষ করে বলল ঋজুদা।
কিন্তু হাতিটা গণেশ কি না তা কী করে জানা যাবে?
আমি বললাম।
পায়ের দাগ দেখে শুধু গণেশ কেন, কার্তিকও বোঝা যাবে না। যারা হাতিটাকে কাছ থেকে কখনও দেখেছে তারাই নিশ্চয় দেখেছে যে সেটা গণেশ।
গণেশ কাকে বলে?
ভটকাই শুধোল।
যে পুরুষ-হাতির একটা দাঁত থাকে তাকে বলে গণেশ। আর মাকনা হল, সেই হাতি, যে পুরুষ-হাতির দাঁতই থাকে না, থাকে না মানে, বাইরে থেকে দেখা যায় না।
কী সব অদ্ভুত ব্যাপার-স্যাপার!
হাতির দলের যে নেতা তার দাঁত নিশ্চয়ই বিরাট হয়।
হাতির দলের নেতা সাধারণত পুরুষ-হাতি হয়ই না। মেয়ে-হাতি হয়। তবে বিরাট হাতি।
মেয়ে-হাতিদের দাঁত থাকে?
না। মানে বাইরে থেকে দেখা যায় না। তবে, আফ্রিকার হাতিদের মধ্যে মেয়েদেরও দাঁত দেখা যায়।
অসভ্য মেয়ে।
ভটকাই বলল।
