ঋজুদার সঙ্গে বক্সার জঙ্গলে – বুদ্ধদেব গুহ
চার
আমরা দোতলার বারান্দাতে বসে ছিলাম।
ভটকাই বলল, প্রায় এগারোটা বাজে। ছিন-ছিনারি দেখতে দেখতে এক এক কাপ করে চা হয়ে গেলে জমে যেত, না?
তা যা বলেছিস। নীচে গিয়ে বলে আয় তবে।
সঙ্গে সঙ্গে ধ্বপ ধ্বপ শব্দ করে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ভটকাই নেমে গেল নীচে।
একতলাতে থাকার ঘর নেই। একটাই ঘর। সেটি খাবার। লাগোয়া কিচেন। দোতলায় দুটি ঘর পাশাপাশি। বিরাট বিরাট চানঘর। একটি ড্রয়িং রুম। তিন দিকে অগণ্য জানালা আছে। চমৎকার। আর ড্রয়িং রুম আর বেডরুম দুটির সামনেই এই মস্ত চওড়া বারান্দা। যেখানে আমরা এখন বসে আছি।
একটু পরেই আবারও ধ্বপ ধ্বপ করতে করতে ভটকাই উঠে এসে বলল, টি ইজ কামিং। দুপুরের মেনুটাও জেনে এলাম।
কী?
বাসমতি চালের ভাত, বেগুন ভাজা, বিউলির ডাল, স্যালাড আর মুরগির মাংস হচ্ছে। ব্রয়লার চিকেন নয়। বড়কা, দিশি মুরগি। ছাইয়ে আর সাদায় মেশা রং ছিল।
কী করে জানলি?
আমি বললাম।
পালক দেখেই বুঝলাম। যেমন তোকেও তোর পালক দেখেই চিনি ইডিয়ট। আর তার সঙ্গে তোর জন্যে একটু গাছ-পাঁঠারও বন্দোবস্ত করে এলাম। ওঃ। বাংলোর পেছনেই একটি কাঁটাল গাছে যা এঁচড় এসেছে না! গাছ কাঁচা রিয়্যাল কাঁচা-এঁচড়। তোর মতন এঁচড়ে-পাকা নয়।
তারপরই বলল, ঠিক করিনি? বলল, ঋজুদা?
ঠিক। উ্য আর ওলওয়েজ রাইট।
ঋজুদা সত্যিই খুবই বদলে গেছে। ভাবছিলাম আমি। আফ্রিকার রুআহাতে আমাদের অ্যাডভেঞ্চারের শেষে আমিই ঋজুদার হাতে-পায়ে ধরেই প্রায় রাজি করিয়েছিলাম ভটকাইকে দলে নিতে আর এখন ভটকাইই ঋজুদার ব্লু-আইড বয় হয়ে গেল! সংসারে কারওই ভাল করতে নেই। বাঙালির তো নয়ই! ন’জ্যাঠাইমা ঠিকই বলেন।
বাঃ। এখানে চেয়ার পেতে বসে থাকলেই দিব্যি দিন কেটে যাবে।
আমি বললাম।
কেন? তুই কি রিটায়ার্ড জজসাহেব?
ভটকাই ফুট কাটল।
আমার পক্ষে ওকে আর সহ্য করাই সম্ভব হচ্ছে না।
বললাম, হঠাৎ জজসাহেব হতে যাব কেন? তা ছাড়া, জজসাহেবরা ছাড়া। আর কেউই কি চেয়ার পেতে দোতলার বারান্দায় বসেন না?
হয়তো বসেন কিন্তু রিটায়ার্ড জজসাহেবরা বসেনই। বসতে হয়ই!
কেন?
পথের দিকে চেয়ে, জনস্রোতের দিকে চেয়ে ভাবেন ঈসস। যে-মানুষগুলোর জেলের বাইরে থাকার কথা ছিল না, তোরই মতন, তাঁর দেওয়া রায়-এ তারাই সকলে বাইরে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে আর যারা নিরপরাধ তারাই সব জেলে পচছে।
ঋজুদা বলল, জজসাহেবদের কী দোষ? দোষ তো দেশের আইনের। এই সব আইন বাতিল করে নতুন সব আইন করা উচিত। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন না কমলাকান্তর দপ্তরে? পড়েছিস রুদ্র?
কী?
সেই যে রে! আইন! সে তো তামাশামাত্র। বড়লোকেরাই পয়সা খরচ করিয়া সে তামাশা দেখিতে পারে।
সত্যি! আমাদের দেশে যার পয়সা আছে, কোনও আইনই তার কেশাগ্রও স্পর্শ করতে পারে না।
সংস্কৃতে বলল ভটকাই, কেশাগ্র।
শুধু আমাদের দেশে-ই বা কেন? এমনটা হয় হয়তো আজকাল সব দেশেই।
ঋজুদা বলল, চল, চা-টা খেয়ে বেরিয়ে পড়ি। সার্ভে করে আসি জায়গাটা। এখানে থাকব তো মোটে এক রাত। কাল দুপুরেই তো চলে যাব জয়ন্তী।
ঠিক।
জয়ন্তী না একটা নদীর নাম?
তাইতো!
ঋজুদা বলল।
আবার জায়গারও নাম?
তাও ঠিক। তুই কি প্রথম শুনছিস এমন ভটকাই? ভারতের বনে-পাহাড়ের আনাচে-কানাচে এমনই গ্রাম আছে হাজারে হাজারে যাদের নাম নদী বা ঝোরা বা নালা বা খোলার নামে। আরে আগে নদী না আগে গ্রাম? নদী কোথা দিয়ে বইছে তা দেখেই তো জলের সুবিধের জন্যে তার আশেপাশেই বা উপরে নীচে গ্রামের পত্তন হয় আস্তে আস্তে।’
তাই?
হ্যাঁ।
এগুলো কী গাছ ঋজুদা? বাবাঃ কী বিরাট বিরাট গাছ! আর গাময় লাল লাল পাতা এসেছে, কুসুম গাছের মতন।
ভটকাই জিজ্ঞেস করল।
আমি বললাম, বাসনাকুসুম।
সেটা আবার কী?
একটা উপন্যাস, মা পড়ছিলেন সেদিন।
ঋজুদা বলল, চিনতে পারলি না গাছটাকে? তা পারবিই বা কী করে! তুই তো এদের দেখেছিস, হয় শুধুই শান্তিনিকেতনে, নয় অন্য কোনও বড়লোকের বাড়ির বাগানে। এগুলো শিরিষ। পড়িসনি? প্রাঙ্গণে মোর শিরিষ শাখায়..
গাছগুলো এইখানে এইরকম বিশাল বিশাল কেন ঋজুদা? এতবড় শিরিষ তো আগে দেখিনি।
আমি বললাম।
এসব যে ভার্জিন ফরেস্টস রে বোকা। এসব কি আর বনবিভাগের লাগানো প্ল্যানটেশানের গাছ? না, বড়লোকের মালীর? দ্যাখ চারধারে আরও কত রকমের গাছ। সবই প্রাচীন। শাল, সেগুন, শিশু, চিকরাসি, আকাতরু। আর ওই দ্যাখ, দূর থেকে শালের মতন দেখতে অথচ অনেকই উপরে সোজা উঠে তারপর শাখা-প্রশাখা ছড়িয়েছে, ওগুলোর স্থানীয় নাম গোকুল। এমন বনে এলে গা ছমছম করে। না?
কী সব নাম রে বাবা! চিকরাসি।
গাছগুলো আমাকে ভাল করে চিনিয়ে দেবে কে?
ভটকাই বলল।
কেন? তোর জিগরী-দোস্ত রুদ্রই।
আমার বয়েই গেছে। তা ছাড়া এখানকার সব গাছ আমি নিজেই থোরি চিনি।
আমি বললাম।
হবে হবে। বৎসগণ। সব হবে। শনৈঃ শনৈঃ।
ঋজুদা বলল।
তারপরই বলল, শাল, সেগুন, কিন্তু এই অঞ্চলের স্বাভাবিক বাসিন্দা নয়। বন-বিভাগেরই লাগানো।
কী বলো তুমি! কী বিরাট বিরাট সব গাছ।
বন-বিভাগও তো বহু পুরনো। আরে বোকা! প্রাচীন আর আদিম শব্দ দুটোর মধ্যে তফাত আছে। এই শাল-সেগুনেরা এই সব বন প্রাচীন অবশ্যই কিন্তু প্রাকৃত নয়। বাসিন্দা আর আদিবাসীদের মধ্যে যা তফাত তাই আর কী। দেখেছিস, ওই দ্যাখ, ওই শিরিষ গাছটার ডালে অর্কিড এসেছে।
এই উচ্চতাতেই অর্কিড? হয় বুঝি?
উচ্চতা কম হলেও আবহাওয়ার আর্দ্রতার কারণেও হয়। এসবই তো হিমালয়ান ফুটহিলস।
ভটকাই বলল, দেখতে পাচ্ছিস না? মেঘের মতন দেখা যাচ্ছে, ঢেউ-এর পরে ঢেউ, পাহাড়শ্রেণী।
বলেই, আবার চেঁচিয়ে উঠল ভটকাই, দ্যাখ দ্যাখ রুদ্র। ময়ূর। ময়ূর।
দেখেছি। অত চেঁচাচ্ছিস কেন?
দ্যাখ, আমাদের বাংলোর দিকেই আসছে। ঢুকবে মনে হয়।
স্বাভাবিক।
আমি বললাম।
কেন? স্বাভাবিক কেন?
স্বাভাবিক এই জন্যে যে, সাপ দেখেছে।
সাপ? কোথায়?
চমকে উঠে বলল, ভটকাই। বলেই, চেয়ার ছেড়ে রেলিং-এ দু হাত রেখে ঝুঁকে পড়ে বাংলোর হাতার এদিকে-ওদিকে দেখতে লাগল। হাতার মধ্যেটাতে গাছ-গাছালি বিশেষ নেই। কাঠটগর, রঙ্গন, কাঁঠালিচাপা ইত্যাদি গাছ, যেসব গাছ বিনা যত্নে বড় হয়। গেট-এর পাশেই একটি গাছ আছে, এই দু মানুষ মতন উঁচু। জংলি গাছ। ফুলও এসেছে হলদেটে-লাল। চিনতে পারিনি এখনও।
বাংলোতে, নীচে, নেই তো রে সাপ? এই বাংলোর একতলার কাঠের পাটাতনের নীচেও যতখানি জায়গা ফাঁকা, সাপ তো কিসসুই নয়, বাঘও থাকতে পারে।
ভটকাই বলল। উত্তেজিত গলায়।
তা পারে। কিন্তু ময়ুর সাপ দেখেছে বাংলোর কাঠের পাটাতনের নীচে নয়, দোতলার বারান্দাতেই।
মানে?
বললাম, ঢোঁড়া সাপ। এইমাত্র চেয়ারে এসে বলল।
ভটকাই ঋজুদার দিকে ফিরে বলল, ঋজুদা, তোমার চামচে রুদ্র রায়কে বলে দাও সবসময়ে যেন এইরকম না করে।
আমি চামচে আর তুই হলি হাতা। তোকে আমি ঋজুদার হাতে-পায়ে ধরে দলে ঢোকালাম আর তুই সঁচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বেরোলি। আর যেই ছাড়ক, তোকে আমি ছাড়ছি না। তুই একটা বহুতই বাজে লোক।
এই যে, চা এসে গেছে। এবার থামা তোদের কিচির-মিচির। তোরা দুটোই বাঁদর।
ঋজুদা বলল।
নর্বু তামাং টি-কোজিতে মোড়া পট-এ করে চা এবং দুধ চিনি আলাদা আলাদা করে ট্রেতে করে এনে ঝকমকে পেয়ালা পিরিচ চামচ সব সাজিয়ে সেন্টার-টেবিলের উপরে রাখল। কায়দাকানুন জানে।
ঋজুদা বলল, চা কর রুদ্র।
ভটকাই বলল, আমার তিন চামচ চিনি। মনে থাকে যেন। তুই তো কেবলই ভুলে যাস। তারই বলল, ঋজুদা, দ্যাখো, ওই গাছটার কাঁধ থেকে একটি সম্পূর্ণ অন্য প্রজাতির গাছ বেরিয়েছে। এটা কীরকম হল? হলই বা কেমন করে?
ঋজুদা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে বলল, এরকম তো হয়! প্রকৃতির রাজ্যে কত কিছু হয়। শিরিষ গাছের মধ্যে রাধাচুড়ো।
কিন্তু হল কী করে?
হয়তো ওই শিরিষ গাছের কাণ্ডর জায়গাতে একটা ফোকর ছিল। হয়তো কেন, নিশ্চয়ই ছিল। কোনও পাখি হয়তো বীজ এনে ফেলেছিল রাধাচূড়া গাছ থেকে। অনেক সময় হাওয়াতেও ফুলের পরাগ উড়ে আসে। ফোকরটার মধ্যে বৃষ্টির জল পড়ে নরম হয়ে-যাওয়া ফোকরের নোংরার সঙ্গে ঝড়ে ও হাওয়ায় ওড়া পাতাগুলোও পড়ে পচে। সেই পচনধরা কাঠ ও পাতার বীজ ধারণের মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়। তাই বীজ পড়তেই প্রকৃতির অদৃশ্য নিয়মে গাছ জন্মাল। অন্য গাছের কাঁধ বা উরু বা কোমর থেকে।
এমন করেও জন্মায়? আমি জিজ্ঞেস করলাম, অবাক হয়ে।
অবশ্যই। আর এই প্রক্রিয়াকে বলে symbiosis.
উচ্চারণ কী? বটানিক্যাল আর মেডিক্যাল নাম কোনও ভদ্রলোকের পক্ষে ঠিকমতন উচ্চারণ করা সম্ভবই নয়। থাইসিস, নিউমোনিয়া এই সব বানানের আগেও একটা ‘P’ বসবে। কোনও মানে হয়? গভীর চক্রান্ত।
ভটকাই বলল, উত্তেজিত হয়ে।
ঋজুদা হেসে বলল, তুই যে দেখি, জ্যোতি বসু হয়ে গেলি! সবেতেই গভীর চক্রান্ত দেখছিস। উচ্চারণটা সীমবাওসিস।
নাও, চা খাও।
বলে, ঋজুদাকে আমি পিরিচসুন্ধু পেয়ালাটা এগিয়ে দিলাম। পাতলা লিকার, কম দুধ, এক চামচ চিনি। ইদানীং সকালের প্রথম কাপের পরে চা খেলে দুধ-চিনি ছাড়া শুধুই পাতলা লিকার খায় ঋজুদা। তাই বললাম, দুধ-চিনি দিয়েই দিলাম।
দে। যা তোর দয়া।
চায়ে চুমুক দিয়ে ঋজুদা বলল, এই প্রকৃতির মধ্যে, বন-জঙ্গল নদীর মধ্যে কত যে রহস্য! যতই জানবি, ততই অবাক হবি। কতরকম মানুষ এই পৃথিবীতে, কতরকম গাছ, ফুল, ফল, কত হাজার রকমের পাখি, সাপ, পশু, কতরকম প্রজাপতি, কত কোটি বছর ধরে আমাদের এই পৃথিবী এবং সূর্য, চন্দ্র, অগণিত গ্রহ, উপগ্রহ এবং নক্ষত্র নির্ভুল সময়ে এই ব্রহ্মাণ্ডে আবর্তিত হচ্ছে। কে যে অদৃশ্য থেকে অলক্ষ্যে এই বিরাট ক্রিয়া কাণ্ড পরিচালনা করছেন তা আমরা বুঝি, মনে মনে জানি, কিন্তু স্বীকার করতে চাই না। আমরা যে বিজ্ঞান-বিশ্বাসী। বিজ্ঞানের সঙ্গে যে এই অদৃশ্য পুরুষের কোনও ঝগড়া নেই এ কথা যে সবাই মানতে চায় না।
চলো এবারে বেরোই। চা তো খাওয়া হল।
হ্যাঁ।
বাংলোর হাতার গেট-এর কাছে যে গাছটাকে চিনতে পারিনি, তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ে ঋজুদাকে বললাম, এটা কী গাছ ঋজুদা?
এটা গামহার রে। চিনতে পারলি না? গামহার তো তুই দেখেছিস আগে।
কোথায়?
বাঃ। অ্যালবিনো বাঘের ডেরা হাজারীবাগের মুলিমালোয়ার জঙ্গলে। শুধু একটা দেখেছিস? গামহার তো সে অঞ্চলে, গদাধরের বনবিবির বনে যাকে বলে টিপ্পি নেগে রয়েছে, সেইরকমই ছিল।
কিন্তু এটাকে দেখে তো গামহার বলে চেনা যায় না।
আমি বললাম
যাবে কী করে! এর যে বালক বয়স! তুমি যখন ক্লাস থ্রি-তে পড়তে তখন যেমন দেখতে ছিলে, আজও কি তেমন দেখতে আছ সোনা?
ঋজুদা আমার প্রতি এই ঠাট্টাতে ভটকাই পরম খুশি হয়ে গলা আর নাক দিয়ে ঘোঁৎ আর হোঁৎ-এর মাঝামাঝি একটা শব্দ করল আমার দিকে ট্যারা চোখে তাকিয়ে।
আমি ইগনোর করলাম।
চল, রেল স্টেশানে যাই। ছোট লাইনের ট্রেন।
চলো।
হেঁটে হেঁটে আমরা চললাম। স্টেশানটা ছোট্ট। ঘুমন্ত। সকালে বিকেলে দুটি করে প্যাসেঞ্জার ট্রেন যায় এখন। দেশভাগের আগে এই স্টেশানই গমগম করত! স্টেশান দেখে আমরা ইনফরমেশান সেন্টারের দিকে এগোলাম। পথে বন-বিভাগের নানা কর্মীর কোয়ার্টার। হাতির ভয়ে এখানে সব বাড়িই দোতলা। কাঠের বাংলো অবশ্য। সিমেন্ট কংক্রিটের উপরে ভারতীয় বুনো হাতিদের খুবই রাগ। আফ্রিকার হাতিদের কথা জানি না।
এগুলো কী গাছ ভটকাই? জানিস?
ঋজুদা বলল।
না জানলে, চলবে কী করে! এটা জারুল। অর ওই যে সিঁদুরে-লাল ফুল ফুটেছে উঁচু গাছটাতে ওটার নাম পারুল।
পারুল মানে? ওরে বকুল পারুল শাল পিয়ালের বন?
হ্যাঁ। যিনি বকুল পারুল পিয়াল কোনওদিন দেখেনইনি চোখে, শাল দেখলেও দেখে থাকতে পারেন হয়তো, তিনি রবীন্দ্রনাথের গান গাইবেন কী করে? চোখের সামনে চিত্রকল্প না ফুটে উঠলে কী ভাব ফুটবে গানে? ফুটবে
বলেই আজকালকার তাবড়তাবড় রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়কের গানের অমন ছিরি। কাষ্ঠং শুষ্কং স্বরলিপি পাঠ করা।
পারুলের ফুলগুলো অগ্নিশিখার মতন না অনেকটা?
ভটকাই বলল।
তুই অগ্নিশিখা কোথায় দেখলি?
বা রেঃ। শান্তিনিকেতনে!
শান্তিনিকেতনে যে গাছে ওইরকম ফুল দেখেছিস সেগুলো আসলে আফ্রিকান টিউলিপ।
আফ্রিকান টিউলিপ? তা হলে মন্টিদাদু বললেন যে অগ্নিশিখা!
দুইই ঠিক। রবীন্দ্রনাথই দিয়েছিলেন ওই নাম। অনেক ফুলেরই দিয়েছেন। সাহিত্যিক বনফুল, মানে, বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ও যেমন পাখিদের সুন্দর সুন্দর নাম দিতেন নিজের ইচ্ছেমতন। ওঁরা কবি-সাহিত্যিক। ওঁরা দিতেই পারেন। কিন্তু তোর আমার মতন সাধারণ মানুষের তো আসল নাম আর ভালবেসে-দেওয়া নাম এই দুইই নামই জানতে হবে। কত গাছ, কত পাখি আছে আমাদের দেশে, তাদের কত বিচিত্র সব নাম, রাজ্য ভেদে, লোকালয় ভেদে। ইংরেজি নামই আমি জানি, যাদের নাম জানি, কিন্তু তাদের দিশি নামগুলোও তো কম মজার নয়। কি গাছেদের আর কি পাখিদের!
যেমন?
ভটকাই বলল, যেন ঋজুদাই কিন্ডারগার্টেনের ছাত্র আর ও ক্লাসটিচার।
যেমন ধর, Short Toed Eagle বলে আমি যে পাখিকে জানি তার নাম বাংলাতে সাপমারিল। কেন না, সাপ মেরে খায়। কেউটেশঙ্খচূড় সব বিষধর সাপ দিয়ে ব্রেকফাস্ট সারে এরা। আবার ধর, যে পাখির মেঠো ইঁদুর না হলে লাঞ্চ খাওয়াই হয় না, যার ইংরেজি নাম বাজার্ড, তার দিশি নাম চুহামার।
কী নাম বললে?
আমি বললাম।
চুহামার। ঋজুদা বলল।
লালুপ্রসাদ যাবদের রাজ্যের বাসিন্দা?
ভটকাই বলল।
তারপরই বলল, দারুণ লাগে কিন্তু আমার।
কী দারুণ লাগে? চুহামারকে না। লালুপ্রসাদ যাদবকে?
লাল্লুবাবুকে।
কেন?
আরে কথা বলে কি মানুষটা! একেবারে দিলচসপি।
কীরকম?
সেদিন টি.ভি.তে দেখলাম, একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন ওঁকে, আপনার রাজত্ব আর কতদিন?
তা উনি চোখ পিটপিট করে বললেন, যবতক সামোসামে আলু রহেগা, তবতক বিহারমে লালু রয়েগা।
আমি আর ঋজুদা হেসে উঠলাম কথা শুনে।
বললাম, সত্যি?
সত্যি।
ভটকাই বলল, জোরের সঙ্গে।
বুঝলি। একেই বলে সেল্ফকনফিডেন্স। তুড়ি মেরে রাজত্ব না করতে পারলে ভিক্ষাপাত্র নিয়ে, আমাকে দয়া করো আমাকে দয়া করো বলে ভোট ভিক্ষা যারা করে, তারা কি নেতা নাকি?
থামা এবার তোদের নেতাতত্ত্ব। ওই দ্যাখ সামনে একটা মিনি-চিড়িয়াখানা। অনেক জানোয়ার আছে মনে হচ্ছে। ঋজুদা বলল। তারপরই বলল, নিশ্চয়ই ধরা পড়েছে। পরে জঙ্গলে ছেড়ে দেবেন হয়তো কর্তৃপক্ষ।
আমরা পায়ে পায়ে গিয়ে সেখানে পৌঁছতেই জানোয়ারগুলোর যিনি রক্ষণাবেক্ষণ করছেন তিনি বললেন এটা Rescue Centre। Rescue Centre কেন নাম হল বুঝলাম না।
দেখলাম, একটা অল্পবয়সী চিতা, একটা হগডিয়ার, একটা বার্কিং-ডিয়ার (কোটরা) এবং একটা ক্লাউডেড লেপার্ড আছে। ক্লাউডেড লেপার্ডটিকে দেখে কষ্ট হল। এদের বাস ঠাণ্ডা আবহাওয়ায়। অথচ এখানে তার খাঁচার মধ্যে রোদ এসে পড়েছে। মাথার উপরের পাতার আস্তরণ পর্যন্ত শুকিয়ে গেছে। রোদের তাপও কিছু কম নয়। তা ছাড়া, যে খাঁচাটিতে তাকে রাখা হয়েছে, সেটি এতই ছোট যে, সে বেচারি নড়াচড়াই করতে পারছে না। অত্যন্ত নোংরাও হয়ে ছিল সেই খাঁচা। দেখে, কষ্ট হল। শুনলাম, তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। তবে কখন এবং কোথায় সে ব্যাপারে উপরওয়ালাদের কাছ থেকে এখনও কোনও স্পষ্ট নির্দেশ আসেনি। কবে আসবে, জানাও নেই কারও। তবে যত শিগগির আসে, ততই মঙ্গল। প্রাণীটি বেঁচে যাবে! তাকে কিছুদিন আগেই ধরা হয়েছিল। জঙ্গলের গ্রামের এক বুড়িকে নাকি কষে থাপ্পড় কষিয়েছিল। জানি না, সেই বুড়ি কষতে-দেওয়া অঙ্ক পারেনি, না অন্য কোনও অপরাধে দোষী ছিল।
ভটকাই বলল, দ্যাখ দ্যাখ ল্যাজটা কী লম্বা। নিজের শরীরের দৈর্ঘ্যের প্রায় দুগুণ।
ওদের লেজ অমন লম্বাই হয়। তবে সবচেয়ে লম্বা লেজ হয় স্নো-লেপার্ডের।
আমি বললাম, বিজ্ঞর মতন।
এমন সময়ে উল্টোদিক থেকে এক লম্বামতন ভদ্রলোক এসে ঋজুদার নাম করে বললেন, চলুন ‘ইনফরমেশান সেন্টার’-এ নিয়ে যেতে এলাম আপনাকে।
আপনার নাম?
আমার নাম প্রদীপ ভট্টাচার্য। আমি রাজাভাতখাওয়ার বীট-অফিসার।
নমস্কার।
বলল, ঋজুদা। রেঞ্জার সাহেব কোথায়?
তিনি ব্যস্ত আছেন। কনসার্ভেটর পালিত সাহেব এসেছেন তো। তাঁর সঙ্গে থাকা, তাঁর খাওয়া-দাওয়া সবকিছুই তো দেখাশোনা তাঁরই করতে হয়।
ইনফরমেশান সেন্টারে পৌঁছবার আগেই সম্ভবত আমার আর ভটকাই-এর লাগাতার প্রশ্নবাণে তিতিবিরক্ত তো বটেই কিঞ্চিৎ ভীতও হয়ে (এটা কী গাছ? ওটা কী ফুল? এটা কী লতা? সেটা কী অর্কিড? ওটা কী পাখি?) ভটচায্যি মশায় অন্য একজনকে ডেকে আমাদের দায়িত্ব তাঁর উপরে দিয়ে বললেন, আমার একটু যেতে হবে। ইলেকট্রিক-এর পোল মেরামতি হচ্ছে তো।
বলেই, পালালেন।
ঋজুদা পাইপটা মুখ থেকে বের করে হেসে বলল, কী বিপদেই যে তোরা ফেলেছিলি ভদ্রলোককে! অনেক মানুষের কাছেই গাছের নাম, গাছই! পাখির নাম পাখিই। নদীর নাম নদী। এইরকম উত্তরেই সন্তুষ্ট থাকা উচিত তোদের। তার চেয়ে বেশি জানতে চাওয়া সবসময়েই অপরাধের।
রাজাভাতখাওয়া টাইগার প্রজেক্ট-এর ইনফরমেশান সেন্টারটি সত্যিই চমৎকার। এটি এস. এস. বিস্ত সাহেবই করে গেছেন। অভিনন্দন তাঁর অবশ্যই প্রাপ্য। এই এলাকার নানা পাখি, জানোয়ার, ফুল এবং অর্কিড ইত্যাদির কিছু কিছু নিদর্শন রাখা আছে। অডিও-ভিজুয়াল ডিসপ্লের বন্দোবস্তও। মালায়ান জায়ান্ট স্কুইরেল, ওড়িশার লবঙ্গীর জঙ্গলের স্থানীয় মানুষেরা যাদের বলতেন ‘নেপালি মুসা’ অর্থাৎ নেপালি ইঁদুর। পায়েড হর্নবিল, অর্থাৎ আমাদের দেশের ধনেশ পাখি। ওড়িশার জঙ্গলে এদেরই আবার বলে বড়কি (গ্রেটার) ধনেশ আর ছোটকি (লেসার) ধনেশ। আরও নাম আছে। কুচিলা খাঁই ও ভালিয়া খাঁই। এত খাই খাই ওদের বেশি খাঁই-এর জন্যে কিন্তু আদৌ নয়। বড়কি ধনেশ কুচিলা গাছে আর ছোটকি ধনেশ ভালিয়া গাছে বসে সেই সব গাছের ফল খায় বলেই ওদের এরকম নামকরণ হয়েছে। ইন্ডিয়ান বাইসন বা গাউরও আছে। ময়ূর, ময়ূরী, পরিযায়ী কালো সারস, নানারকম সাপ, পাইথন, মোলারাস এবং রেটিকুলেট পাইথন, হগডিয়ার, চাইনিজ প্যাঙ্গোলিন, হাতি, লেপার্ড, ক্লাউডেড লেপার্ড ইত্যাদি।
যিনি সেন্টারের চার্জ-এ ছিলেন তিনি বললেন, হাতির কথা না বলাই ভাল। প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড দলে হাতি দেখা যায় এখানে। এই তো কলকাতা থেকে সেদিন মস্ত দল নিয়ে এসেছিলেন ওয়াইল্ডলাইফ-এর কনসার্ভেটর অতনু রাহা, চিফ গেম ওয়ার্ডেন সুবিমল রায় এবং আলিপুরদুয়ার থেকে বনবিভাগের কয়েকজন কর্মী কদিন আগেই। ওঁরা একটি বড় হাতিকে ঘুমপাড়ানি ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে গলায় রেডিয়ো কলার লাগিয়ে দিয়ে গেছেন। ওই হাতির গলার বিপ বিপ বিপ আওয়াজ শুনেই পুরো দলের রাহান-সাহান জানা যাবে এবার থেকে।
এ দলে কতগুলো হাতি ছিল?
শুনেছি, আশিটা।
ভটকাই বলল, এই ঘুমপাড়ানি ওষুধটা কী ব্যাপার বলো তো ঋজুদা? ঘুম পাড়ানো হল তা নয় ঠিকই আছে কিন্তু ঘুমটা ভাঙায় কী করে?
ঋজুদা বলল, সে অনেক গোলমেলে ব্যাপারস্যাপার। তবে তোদের অল্পকথাতে বলছি, শোন।
তারপর ঋজুদা আমার দিকে ফিরে বলল, রুদ্র, তুই তো আমার সঙ্গে আফ্রিকাতে গেছিলি, আহা’ আর ‘গুগুনোগুম্বারের দেশে’তে। তখন তো আফ্রিকান আদিবাসী ওয়ান্ডারাবো চোরাশিকারিদের কথা জেনেইছিলি। তারা যেমন Blow Pipe দিয়ে বিষ মাখানো তীর ছুঁড়ে হাতির মতন বড় জানোয়ারকেও শিকার করে, তেমনই আর কী। তবে ওরা মারে। এঁরা ঘুম পাড়ান এই তফাত। ঘুমপাড়ানি ওষুধের ডার্ট BLOW GUN দিয়েও ছোঁড়া হয় কাছাকাছি থেকে। ধর, চিড়িয়াখানার কোনও অসুস্থ জানোয়ারকে চিকিৎসা করার জন্যে বা অন্য চিড়িয়াখানায় চালান দেওয়ার জন্যে তাদের ঘুম পাড়ানোর প্রয়োজন হয় অনেকই সময়। কিন্তু জঙ্গলের মধ্যে BLOW GUN-এ ভাল কাজ হয় না। কারণ দূর থেকে ছুঁড়তে হয়। সেখানে Blow Rifle দিয়ে ডার্ট ছুঁড়ে ঘুম পাড়ানো হয়। রাইফেলের রেঞ্জ তো অনেকই বেশি গান-এর চেয়ে। তা ছাড়া, ব্যারেলের উপরে রিয়ার সাইট থাকাতে তা ঠিক মতন বেশি বা কম উঠিয়ে নিয়ে অ্যাডজাস্ট করে বেশ দূর থেকেও ছোঁড়া যায় সেই ডার্ট।
কোথায় মারে? মানে শরীরের কোন অংশে? রাইফেল বা শট-গান দিয়ে শিকার করতে হলে আমরা জানোয়ারের যে-সব ভাইটাল জায়গায় মারতে চাই, সেইসব জায়গাতেই কি?
আরে না, না। সেখানে নয়। রাইফেল-এ বন্দুকের মার তো জানোয়ারকে একেবারে মেরে ফেলারই জন্য। এবং তাও যত তাড়াতাড়ি পারা যায় এবং যথাসম্ভব কম কষ্ট দিয়ে। ভাল শিকারি মাত্ররই তাই করণীয়।
হঠাই ভটকাই গেয়ে উঠল–
তোমায় গান শোনাব।
ও মোর ঘুমপাড়ানিয়া
তোমায় গান শোনাব
ও মোর ঘুমভাঙানিয়া
তোমায় গান শোনাব।
ভাগ্যিস সেন্টারে তখন আর কেউই ছিলেন না আমরা ছাড়া। ইন-চার্জ ভদ্রলোক অবশ্য ওই ভটকাই-এর আচমকা কায়দায় ছোঁড়া বোমার মতন গান শুনে হেসে ফেললেন জোরে।
আমি ভটকাই-এর এহেন কদাকার চ্যাংড়ামিতে অপরিচিতের সামনে লজ্জা পেয়ে ভদ্রলোককে ধন্যবাদ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম। ঋজুদাও পিছু পিছু এল।
ঋজুদা কিছু লিখল Visitors Book-এ বেরিয়ে আসার আগে।
বাইরে এসে বললাম, আচ্ছা ঋজুদা, ঘুম তো পাড়ান এঁরা কিন্তু জাগান কেমন করে? নিজের থেকেই জেগে যায় কি ঘুমন্ত জানোয়ার?
তা হয়তো জাগে কিন্তু ওই অবস্থাতে তাদের ফেলে রেখে গেলে নানারকম ক্ষতি হতে পারে। তাই প্রায় সবসময়েই কাজ হয়ে গেলে অন্য ইনজেকশান দিয়ে ওষুধের ঘোর ভাঙানো হয়।
শরীরের কোথায় মারতে হয় ডার্ট গান দিয়ে বললে না তো?
নাছোড়বান্দা ভটকাই বলল।
ও হ্যাঁ। সাধারণত মারে সামনের দু পা যেখানে শরীর থেকে বেরিয়েছে সেইখানে, মানে গলা, ঘাড়, হার্ট এবং লাংস-এর নীচে। নয়তো মারে, পেছনের দু পা যেখানে গিয়ে পৌঁছেছে শরীরে, ঠিক সেইখানে। মানে যে জায়গাকে ইংরেজিতে আমরা বলি ‘Rump’। মোদ্দা কথা, মাংসল জায়গাতে মারে।
কী ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়ায়?
আমি জিজ্ঞেস করলাম। আর এইসব বন্দুক রাইফেল পাওয়াই বা যায় কোথায়?
এই সব বিশেষ বন্দুক, রাইফেল বানায় জার্মানি, স্টেটস এবং সুইটজারল্যান্ড। আরও হয়তো অনেক দেশই বানায়। আমি জানি না। সেইসব দেশ থেকেই ইমপোর্ট করতে হয়। আর ওষুধ তো অনেকই রকম আছে। ওষুধও স্পেশ্যাল ইমপোর্ট লাইসেন্স-এর জোরে আমদানি করতে হয়।
কী নাম ওষুধের?
ওষুধটা হচ্ছে জাইলাজাইন হাইড্রোক্লোরাইড কিন্তু রমপান (Rompun) ট্রেড নেম-এ বাজারে ছাড়ে প্রস্তুতকারীরা। Bayer Company। পাউডারের মতন, জলে গুলে নিয়ে ডার্ট-এ ভরতে হয়। ইম্মোবিইলন নামেরও অন্য ওষুধ আছে। Immobile, মানে চলচ্ছক্তিহীন করে, তাই এই নাম।
এখন Immbobilon বা Rompun এই দুই ঘুমপাড়ানো ওষুধ কেথায় পাব তা কি বলবে?
ভটকাই সিরিয়াস মুখ করে বলল।
কেন?
আমি একটা জানোয়ারকে ইম্মোবাইল করব।
কী জানোয়ার?
তার প্রজাতিতে মাত্র একটিই প্যায়দা করেছিলেন মিস্টার ব্ৰহ্মা।
নাম কী?
রুদ্র রায়।
ঋজুদা জোরে হেসে উঠল।
আমি বালখিল্য ভটকাইকে উপেক্ষা করে বললাম, আচ্ছা! এই যে ঘুম-পাড়ানো-ঘুম-ভাঙানো হয় এসব কীসের জন্যে?
বাঃ। বললামই তো। কত কিছুর জন্যে।
যেমন?
চিড়িয়াখানাতে কত জানোয়ার অসুস্থ হয়। তার মধ্যে বাঘ, সিংহ, চিতাও। যেমন আছে আবার গণ্ডার, জলহস্তী, হাতি, জিরাফও থাকে। ধর, গণ্ডারের কানে ঘা হয়েছে বা জিরাফের ঠ্যাং ভেঙে গেছে, তা তাদের ঘুম না পাড়ালে ভেটরিনারি সার্জন অপারেশনটা করবেন কী করে? টু-এ এবং চাট-এ তো ডাক্তারের পেট ফেঁসে যাবে, নইলে মুণ্ডু গড়াবে ভঁয়ে। তা ছাড়া, বন্য প্রাণীদের মধ্যেও যখন কোনও প্রাণী হঠাৎ বন ছেড়ে লোকালয়ে চলে আসে বা মানুষ অথবা গবাদি পশুর ক্ষতি করে তখনও তাদের ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে অন্য জায়গায় নিয়ে গিয়ে, হয় খাঁচায় পোরা হয়, নয় চিড়িয়াখানাতে দিয়ে দেওয়া হয়। কখনও বা আবার বনেই ছেড়ে দেওয়া হয়। দেখিস না এইসব খবর কাগজে?
আমি কাগজ পড়ি না। সব গুলতাল ছাপে, পড়ে কে সময় নষ্ট করে!– আচ্ছা ঋজুদা, বিপজ্জনক জানোয়ারেরা কখনও চিকিৎসা করার বা কলার-পরানোর আগেই ঘুম ভেঙে উঠে পড়ে না? তখন কী হয়?
আমি জিজ্ঞেস করলাম।
ঋজুদার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে ভটকাই বলল, আবার কী হয়? অন্য কী হতে পারে? কেলো হয়! গ্রেট কেলো।
এমন ঘটনা ঘটে বইকী! আবার এও ঘটে যে, ওষুধের ডোজ বেশি হয়ে যাওয়াতে বা কোনও বন্য প্রাণীর হৃদয় দুর্বল থাকাতে বা হঠাৎ শক-এই তারা মারা যায়। ঘুম আর ভাঙেই না।
কই? এমন খবর তো পড়িনি কাগজে।
কাগজে যা ছাপা হয় বা পড়িস তোরা তা আসল খবরের এক সামান্য ভাগ মাত্র। প্রত্যেক কাগজই এক-একটি আইসবার্গ, হিমবাহ। এক-অষ্টমাংশ দেখা যায় আর বাকিটা অগোচরে থাকে।
কিন্তু এও তো এক ধরনের খুনই হল। শিকারিরা মারলেও মরল আর এঁরা ঘুমের ওষুধ খাইয়ে মারলেও মরল! মরবে?
এঁরা তো আর ইচ্ছা করে মারেন না। অনেক সময় ভাল করতে গিয়েও খারাপ হয়ে যায়। তার আর কী করা যাবে? ইটস ওল ইন দ্যা গেম।
যারা মরে, তারা কি জানতে পায় যে, তাদের ভালর জন্যেই তারা মরল? ইটস্ অল ইন দ্যা গেম?
ভটকাই গম্ভীর মুখে বলল।
ঋজুদা হেসে উঠল ভটকাই-এর কথা শুনে। বলল, ফাজিল।
ভটকাই বলল, দ্যাখ রুদ্র, তোকে যখন আমি ঘুম পাড়াব তখন তুই মরে গেলেও যেন ভাবিস না যে, তোর খারাপের জন্যেই মারলাম তোকে। সবসময়ই আমি তোর ভালই চাই।
ওরে, সাড়ে বারোটা যে বেজে গেল। রোদ চড়া হয়ে যাবে। চল এবারে Whispering Trail’-এ একটু হেঁটে, বাংলোতে ফিরে যাই।
ঋজুদা বলল।
ইনফরমেশান সেন্টারের হাত থেকে বেরোতে বেরোতে ভটকাই বলল, আবার উল্টোদিকে হাঁটাবে ঋজুদা? এই রোদে? চাঁদি যে ফেটে যাবে। এমনিতেই তো বহুদূর হাঁটতে হবে শুধু গাছ দেখতে দেখতে এমন গেছো দাদার মতন হাঁটতে কি ভাল লাগে?
চল চল। এত সব পদ রান্না হল, ক্ষিদে না হলে সব নষ্ট হবে যে। তা ছাড়া সব জায়গাতেই কাঙ্গপোকপির ইবোচবা সিং আর নিনিকুমারীর বাঘ’ থাকতে হবে নাকি! আরে দ্যাখ দ্যাখ…।
ঋজুদা বলল।
আমরা দেখলাম ইনফরমেশান সেন্টারের একদিকের দেওয়ালে দারুণ একটি রঙিন ছবি। রাজাভাতখাওয়ার। দুই রাজা মহা সমারোহে ভাত খাচ্ছেন।
ভারী কালারফুল কিন্তু। তাই না?
ঋজুদা বলল।
সত্যি!
সঙ্গী ভদ্রলোক বললেন, কলকাতা থেকে আর্টিস্ট আনিয়ে আঁকানো হয়েছে।
নাম জানেন কি?
তা বলতে পারব না। আর্টিস্ট।
বাইরে বেরিয়ে Whispering Trail-এ একটু ঢুকতেই দু পাশের জঙ্গল যেন গলা টিপে ধরল। সত্যি!
আক্ষরিকার্থে যাকে বলে Suffocating! এরকম জঙ্গল আমার ভাল লাগে না। সরু পায়ে-চলা পথ দেড় কিমি. মতন চলে গেছে গহন বনের মধ্যে দিয়ে। দু পাশেই আন্ডারগ্রোথ, মানে, গাছেদের পায়ের কাছে ঝোপঝাড় লতা-পাতা এই মার্চ মাসেও এত নিচ্ছিদ্র যে, রীতিমতো একধরনের ভয়মিশ্রিত অসহায়তার বোধ জন্মায় মনে।
আমাদের ভয় একরকমের, আর সঙ্গী ভদ্রলোকের, মানে, ভটচায্যিবাবু যাঁকে আমাদের সঙ্গে দিয়েছিলেন, তাঁর ভয় অন্যরকমের। সেকেন্ডে সেকেন্ডে এটা কী গাছ? ওটা কী লতা? এটা কী ঝাড়? সেটা কী ঝোপ? শুনতে শুনতে এবং প্রায় কোনওটারই উত্তর না দিতে পেরে উনি দাঁড়িয়ে পড়ে বললেন, আমারে এবারে বাড়ি যেতে হবে স্যার। ছেলেটার খুব জ্বর। ওষুধ আনতে হবে।
ঋজুদা বলল, হ্যাঁ, আপনি যান। এতক্ষণ বলেননি কেন? আশ্চর্য মানুষ তো আপনি! আমরাও ফিরছি। রোদও খুব চড়া হয়ে গেছে। তবে এখানে আমরা আবারও আসব। Whispering Trail-এ শেষ অবধি যাব। তখন খবর দেব আপনাকে, মানে ভটচায্যিবাবুর মাধ্যমে।
ভদ্রলোকের যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল আপাতত। বললেন, আমার চেয়ে ভাল অনেকেই আছেন, যাঁরা সব গাছ-মাছ চেনেন। তেমনই কারোকে পাঠিয়ে দেব তখন।
ঠিক আছে।
উনি প্রায় দৌড়েই আমাদের মায়া কাটালেন।
ঋজুদা বলল, এই ভদ্রলোক কী কাজ করেন জানি না। বন বিভাগের কোনও কর্মীর বেড়াতে-আসা শালা বা ভগ্নিপতিও হতে পারেন। কিন্তু কনসার্ভেটরেরা সব গাছ ঝোপ লতা পাতা না চিনলেও না চিনতে পারেন, তাঁদের অনেকটা সময় ঘরে বসে কাজ করতে হয় কিন্তু রেঞ্জাররা, ফরেস্টগার্ডেরা বা বীট-অফিসারেরা, যাঁদের কাজই হল জঙ্গলের গভীরে সারাবছর থাকা, তাঁরা কেন সব গাছ ঝোপ ঝাড় পাখি প্রজাপতি চিনবেন না? আসলে বুঝলি না, ভালবাসাটা অনেকেরই নেই।
আর্টিস্টও চেনা উচিত।
ভটকাই বলল।
মানে?
রাজাদের ভাত খাওয়ার ছবির আর্টিস্ট।
আমি বললাম, এমার্সনের সেই কবিতাটার কথা মনে পড়ে? কোনটা?
Bold as the engineer
Who fells the wood
Love not the flower they pluck
Know it not,
And all their Botany
Is Latin names!
বাঃ!
ঋজুদা বলল।
ভটকাই বলল, তোর স্মৃতিশক্তি খুবই ভাল। কবে ঋজুদার মুখে একবার শুনেছিলি, হুবহু মনে রেখেছিস। নাঃ, তুই ছেলেটার অনেকই গুণ। শুধু আমার পেছনে সবসময় লাগিস, এই যা দোষ।
তারপরই বলল, থাকগে! ভদ্রলোক পালিয়ে বাঁচার আগে দুটো নতুন গাছের নাম তো জানলাম। চিনলামও।
কী কী?
ঋজুদা জিজ্ঞেস করল।
লালি আর দুধে লালি।
বাঃ! চিনিয়ে দে রুদ্রকে।
ভটকাই বলল, আমাদের পাড়ার ভুট্টাদার ছোট বোনের নাম লালি। ভুরু-টুরু চেঁচে, আইব্রো পেনসিল ঘষে সে নিজেকে ইন্দ্রাণী হালদার ভাবছে আজকাল। কিন্তু গায়ের রং কেলে-হাঁড়ির মতন আর মুখটাও হাঁড়িচাঁচার মতন। ফিরে গিয়েই ওকে একটা আয়না প্রেজেন্ট করব আর ওর নাম দেব দুধে লালি।
ঋজুদা বলল, ভটকাই, তুই মহা ফক্কড় হয়েছিস।
ভটকাই বলল, না হলে তোমাদের এনটারটেইন করত কে এখানে? গুণ্ডা হাতি নেই, মানুষ-খেকো বাঘ নেই, খুনি নেই কোনও, শুধু গাছ আর পোকা আর ছারপোকা। বোরড হয়ে যেতে যে একেবারে!
আমি ভটকাইকে বললাম, ছারপোকার বৈজ্ঞানিক নাম জানিস?
নাঃ।
বিরক্ত হয়ে বলল, ভটকাই।
আমাদের সর্বজ্ঞ ভটকাই উত্তর হিসেবে ‘না’কে বড়ই অপছন্দ করে। ‘না’ বলা মানেই যে, হেরে যাওয়া। হারতে একদমই ভালবাসে না ভটকাই।
একদিন ঋজুদা বলেছিল আমাকে, এইটাই মস্ত গুণ ভটকাই-এর। যারা হারতে ভালবাসে না, দেখা যায়, জীবনে তারাই শেষ পর্যন্ত জেতে।
ভটকাই বলল, তুই জানিস, তো তুইই বল। আমি ছারপোকাবিশারদ নই।
নাছোড়বান্দা ভটকাই বলল।
হেটেরোপটেরা।
কী বললি?
হেটেরোপটেরা। অর্থাৎ ছারপোকার বংশ।
আমি বললাম।
ছারপোকার আবার জ্ঞাতি-গুষ্ঠিও আছে নাকি? আমি তো জানতাম সে একাই একশো!
আছে বইকী! এই বক্সা বাঘ প্রকল্পের এলাকাতেই আছে তেষট্টি রকমের।
উরিঃ ফাদার!
তবে নাম না জানলেও তোর ক্ষতি নেই। পশ্চাৎদেশ, নাম জানলেও যেমন জ্বলবে, নাম না-জানলেও তেমনই জ্বলবে।
কী জ্বালাতন! ছারপোকারও এতো জ্ঞাতি গুনল কারা? কোন অকর্মারা?
সে সব সাহেবরাই গুনে-গেঁথে গেছে। যে-ইংরেজদের রাজত্বে একসময়ে সূর্য কখনও অস্ত যেত না, সেই ইংরেজদের অনেকই গুণ ছিল রে!
ঋজুদা বলল।
