ঋজুদা এবং ডাকু পিপ্পাল পাঁড়ে – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

নয়

সকালে উঠে আমরা বাইরের বারান্দাতে বসে আছি, চমনলাল চায়ের পট, দুধ, চিনির পট সব ট্রেতে করে সাজিয়ে এনে রাখল টেবল-এর উপরে। চায়ের ব্যাপারে গোপাল খুবই শৌখিন। ছিল। সব ব্যাপারেই সে শৌখিন ছিল খুবই।

চা ঢালছে কাপে গোপাল এমন সময়ে করম মালি এল, গেট খুলে।

সে বলল, নমস্তে বাবু।

আজকে এত দেরি করে এলে করম? আমরা যে আসব তা অবশ্য তুমি জানতে না। গোপাল বলল।

না বাবু। আমি তো রোজই ছটার সময়েই আসি। নইলে কি আর বাগান এত সুন্দর থাকত?

তবে আজ দেরি করলে বড়?

কোতোয়ালিতে সারা শহর ভেঙে পড়েছে বাবু। তাই দেখে এলাম আমিও।

কী দেখে এলে?

ডাকু পিপ্পাল পাঁড়ে আর তার আটজন সঙ্গীর লাশ। ভোর তিনটের সময় এসেছে লাশ। হাজারিবাগ কোতোয়ালি থেকে দশ ট্রাক রাইফেলধারী পুলিশ গেছিল। আর চাতরা থেকে এসেছিল পাঁচ ট্রাক। দু’ ট্রাক এসেছিল চান্দোয়া-টোড়ি থেকে। উনিশটা গুলি লেগেছে শরীরে। গোলিসে বিলকুল ভুঞ্জ দিয়া। তিনদিক, থেকে পিপ্পালকে ঘিরে ফেলে গুলি করে মেরেছে পুলিশ। রাত একটার সময়ে খোদ পুলিশ সাহেব জিপে করে গেছিলেন।

কোথায় লড়াই হল?

সীমারিয়া আর টুটিলাওয়ার মধ্যের জঙ্গলে। ডাকুর ডেরাতে।

পাঁচজন পুলিশও মারা গেছে। কোতোয়ালির ঘোট দারোগা গজানন ঝাঁও মারা গেছেন।

আমি দেখলাম, ডান হাতে চা ঢালতে থাকা গোপালের হাতটা কেটলিসুদ্ধ কাঁপছে।

আমি চুপ করে রইলাম।

গোপাল বলল, তোমারটা তুমি ঢেলে নাও ঋজু।

বৈশাখের ভোরের ফুলগন্ধবাহী হাওয়া বইছিল গোপালদের পূর্বাচল’-এর উক্যালিপটাস গাছেদের সুগন্ধি ঝরা-পাতা আর নানা ফুল আলতো হাতে ঝাঁট দিয়ে।

চায়ের কাপ মুখ দিয়েও নামিয়ে রাখলাম। সম্ভবত আমাদের দেওয়া চাটা খাওয়ার অবকাশ আর হয়নি পিপ্পালের। ভাবছিলাম, পুলিশের চোখে, সমাজের চোখে সে জঘন্য অপরাধী কিন্তু হাজার হাজার গরিব, মূক, সহায়হীন অত্যাচারিতদের কাছে সে ছিল আশার আলো। এই পৃথিবীতে সে জঘন্য অপরাধীদের কলঙ্ক গায়ে মেখে মরল বটে কিন্তু স্বর্গের দ্বারে তার জন্যে মঙ্গলধ্বনি বাজছে এতক্ষণে।

গোপাল হঠাৎ বলল, কত মানুষ জন্মাচ্ছে, মরে যাচ্ছে, কে তাদের খোঁজ রাখে। কিছু কিছু মানুষ, খুব কমই মানুষ, কোনও বিশেষ কাজ নিয়ে পৃথিবীতে আসে। তারা নিজেদের জন্যে বাঁচতে আসে না এখানে, অন্যদের জন্যে মরতে আসে। এরাই তো মানুষের মতো মানুষ। কী বলে?

আমি আর কী বলব। আমার গলা বন্ধ হয়ে এসেছিল। কিছুই না বলে আমি লালমাটির প্রান্তর পেরিয়ে দূরের সবুজ মোরব্বা ক্ষেতের দিকে চেয়ে চুপ করে বসে রইলাম। দু’জনের চায়ের পেয়ালাই পড়ে রইল।

চমনলাল এসে বলল, চায়ে তো ঠাণ্ডা হো গ্যয়ে। ফিন লা রহা হ্যায়।

গোপাল তার বাঁ হাতের পাঁচখানা আঙুল দেখিয়ে মুখে কোনও কথা না বলে, তাকে ইশারাতে বলল, পরে।

ঋজুদার ডাকু পিপ্পাল পাঁড়ের গল্প শেষ হয়ে যাবার পরে হাজারিবাগের সেই দুঃখভরা বৈশাখী সকালটি যেন আমাদের সকলেরই বুকের মধ্যে উঠে এল।

আমরা সকলেই চুপ করে বসে রইলাম।

এমনকি নাজিম সাহেবের বড় ছেলে আজ্জু মহম্মদও।

ঋজুদা বলল, অনেকই কথা, অনেককেই বলার জন্যে ভিড় করে এল আমাদের দু’জনেরই বুকের মধ্যে। কিন্তু আমরা নীরবেই বসে থাকলাম।

গোপাল বলল, আমাদের যাওয়া উচিত ছিল ওর কাছে। মরে যাবার সময় কী ভাবল পিপ্পাল পাঁড়ে আমাদের? ছিঃ!

আমি বললাম, ভাবল, আমরাই বিশ্বাসঘাতক! ভাবল আমরাই খবর দিয়েছি হাজারিবাগের কোতোয়ালিতে, ওর ডেরার হদিশ জানিয়েছি।

গোপাল ভারি গলাতে বলল, জানো ঋজু, এর চেয়ে ওর পাশে থেকে পুলিশের সঙ্গে লড়াই করে মরে যাওয়াই ভাল ছিল আমাদের। মরতে তো একদিন সকলকেই হবে কিন্তু কে কী ভাবে, কোন বিশ্বাস বুকে নিয়ে মরল, সেটাই আসল কথা।

আমি চুপ করে রইলাম।

কী বলব! কাকে বলব!

যাকে অনেক কথাই বলার ছিল, সে তো তখন শব হয়ে গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *