ঋজুদা এবং ডাকু পিপ্পাল পাঁড়ে – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

ছয়

ভোর তখনও হয়নি। তবে পুবের আকাশ সাদা হয়েছে সবে। এখনও রাতে একটু একটু শিশির পড়ে এই জঙ্গুলে জায়গাতে। আমি আর গোপাল তৈরি হয়ে বারান্দাতে এসে দাঁড়ালাম। জিপটার বনেটের ওপরে শিশির পড়ে রয়েছে। সিটের কোনাগুলোও ভিজে রয়েছে।

আমি বললাম, গোপাল তুমি দেখো, ওরা তৈরি হল নাকি। আমি ততক্ষণে জিপটা স্টার্ট করি।

একটু পরেই লটকা আর সফর চাচা তৈরি হয়ে বাইরে এল। সফর চাচার মাল বলতে লাল-সবুজ লুঙি-মোড়া কাপড়-চোপড় আর একটি পেতলের বদনা।

বদনা মানে কী?

তিতির আবারও বলল।

বদনা বা গাডু আমাদের ঘটিরই মতো। কিন্তু মুখটা ঘটির চেয়ে ছোট এবং সরু শুড় থাকে, যার মধ্যে দিয়ে জল বেরোয়। মুসলমানেরা হিন্দুদের চেয়ে অনেকই বুদ্ধিমান। কারণ, বদনা, ঘটির চেয়ে অনেক বেশি ভাবনা চিন্তা করে বানানো হয়েছে।

বলেই বলল, তোরা ‘গলতাকিয়া’ কাকে বলে জানিস?

‘গলতাকিয়া’?

আমরা সমস্বরে বিস্ময় প্রকাশ করলাম।

হ্যাঁ। গলতাকিয়া। আবদুল হালিম শরর সাহেবের পুরাতন লক্ষ্মৌ বলে একটি বই আছে। তার বাংলা অনুবাদও পাওয়া যায়। বইটা পড়বি। পড়লেই জানতে পারবি।

তারপর বলল, আমরা যখন বালিশের উপরে পাশ ফিরে শুই তখন আমাদের গালের নীচেটা ফাঁকা-ফাঁকা ঠেকে না কেমন?

ঠেকেই তো।

ভটকাই বলল।

লক্ষৌ-এর নবাবেরা ছোট্ট-ছোট্ট খুব পাতলা গোল-গোল বালিশ ব্যবহার করতেন গালের নিচে দিয়ে শোবার জন্যে। বালিশের বা তাকিয়ার উপরে এই ছোট ছোট গাকিয়া’ ব্যবহার করতেন, সিল্কের ওয়াড় পরানো, আতর মাখানো।

জীবনে কী করে বাঁচতে হয়, তা ওরা জানে।

তিতির বলল।

কী করে মরতে হয়, তাও জানে। ভোগের চরম করতেও যেমন ওদের ফালতু লজ্জা নেই, ত্যাগের চরম করতেও মুসলমানেরা দু’বার ভাবে না। ওরা জিতলে যেমন উল্লসিত হয়, হারলেও তেমন বিমর্ষ হয় না। আমার তো অন্তত তাই মনে হয়।

ঋজুদা বলল।

ভটকাই জোরে জোরে তিনবার বলল। গলতাকিয়া! গলতাকিয়া! গলতাকিয়া!

মুখস্থ করে রাখ। আমি কাল সকালেই আমাদের পাড়ার পদ্মা বেডিং স্টোর্স-একটা গলতাকিয়ার অর্ডার দেব।

দিলে, একটা কেন দিবি? দু’গালের জন্য দুটো দিবি। আমি বললাম।

ঠিক বলেছিস।

হ্যাঁ। এবার বলল, ঋজুকাকা। তা সফর আলি তার জামাকাপড় নিল কেন সঙ্গে?

রাতেই আমরা ঠিক করেছিলাম যে সফর আলির মনে যখন মৃত্যুভয়ই জেগেছে তখন আমরা নিজেরাই ওকে চাতরা পৌঁছে দিয়ে আসব।

মৃত্যুভয়? মৃত্যুভয়ের কথা বলেছিল নাকি?

তিতির বলল।

হ্যাঁ। রাতে পানের দোকান থেকে আসতে আসতে বলছিল, পিপ্পালের, আমার উপর অনেকই রাগ আছে। নানা কারণে। সে সব কথা আমি আপনাদের বলতে পারব না। অথচ যা কিছুই আমি করেছিলাম তা আমার মালিকেরই নির্দেশে। চাকরদের যে কী জ্বালা, তা চাকরেরাই জানে।

তখন আমরা বললাম যে, এ কথা জানার পর তো চাচা আপনাকে একা ছাড়া যাবে না। লটকাও চলুক আমাদের সঙ্গে। আমরা ফেরার সময়ে ওল্ড চাতরা রোড দিয়ে ফিরে এসে টুটিলাওয়ার কাছে উঠে তারপর সীমারিয়াতে আসব। পথে কিছু শিকার যদি মিলে যায়। জঙ্গল তো সে পথে গভীর খুবই।

পথে সফর আলি বলল, আপনারা ছেলেমানুষ, ওই পথে আপনাদের আমি একা ছাড়ব না। তাহলে চলুন! সকলে মিলেই যাব। ভোরেভোরে বেরিয়ে ওই পথ দিয়েই চাতরা পৌঁছব। জিপ রয়েছে সঙ্গে, কার তো নয়, পথ অব্যবহৃত হলেও পৌঁছে যাবে। ভয় একটাই। ওই পথেরই ডানদিকে বাঁদিকে কোথাও পিপ্পাল পাঁড়ের আস্তানা আছে। আস্তানা গেড়ে যখন আছে তখন দেখবেন আজকালের মধ্যেই কাছাকাছি কোনও বড় শেঠ-এর বাড়িতে বা গদিতে ডেকাইতি হবে।

আমরা যেন পিপ্পাল পাঁড়ের সঙ্গে দেখা হোক, তা মোটেই চাই না এমন ভাব দেখিয়ে চিন্তিত হবার ভান করে বললাম, তাহলে তো চিন্তার কথা হল। তার সঙ্গে যদি মোলাকাত হয়ে যায়?

গোপাল বলল, সে হতে পারে কিন্তু অব্যবহৃত বলেই তো ওল্ড চাতরা রোডে শিকারও পাওয়া যায় খুব। ইজাহার বলছিল না সেবারে। কাল একেবারে ভোরেভোরে বেরোব আমরা। আজকে একটু শিকারই খেলা যাক।

লটকা তখন বলল, আমি তো বসে বসে খেয়ে খেয়ে আরও মোটা হচ্ছি। শিকার খেলতে এসে শিকার খেলাই দেখলাম না। আমিও তোমাদের সঙ্গে যাব। রামখিলাওন একা থাকুক, রান্নাবান্না করে রাখবে। আজকে সীমারিয়ার হাট আছে। কচি পাঁঠা কাটবে। পাঁঠার মাংস, ভাল করে ঘি গরমমশলা ফেলে আর ডুমো ডুমো করে আলু ফেলে দিয়ে রান্না করবে আর ঘি-ভাত। সঙ্গে মুচমুচে করকে আলুভাজা। মেটের বহতই ঝাল চচ্চরি। তারপর রাবড়ি আর প্যারা তো আছেই।

গোপাল বলল, সফর চাচা হয়তো ডাকু পিপ্পাল পাঁড়ের হাতে মরলেও মরতে পারে কিন্তু তুমি লটকা দাদা, মরবে খেয়েই।

লটকা দু’হাত দু’দিকে তুলে বলল, লেহ্ লকা। তারপর বলল, জিতা রহো গোপালবাবু। ঐসা মওতহিতো মুঝে চাহিয়ে। ইস দেশমে সব্বেত ভুখাহি মরতা হ্যায়। ম্যায়নে জি-খোলকর খা কর মরেগা, এক ঝটকামে লেহ্ লটকা।

লটকার ওজন প্রায়, দু’মণ হবে। যখন হাঁটে, দুটি উরু দুটি ঊরুর সঙ্গে লেগে যায়। যখন কথা বলে, তার লাল মোটা জিভটা মুখের ভিতর থেকে কোটরের মধ্যের সাপের মাথার মতো মাঝে মাঝেই বেরিয়ে আসে।

রওয়ানা তো হওয়া গেল দুর্গা দুর্গা করে।

লটকা দু’হাত কপালে ঠেকিয়ে বলল, জয় মাতাজি কি জয়।

তার ইতিমধ্যেই ধুঁয়ো-ওঠা ঠাণ্ডা জলে চান হয়ে গেছে। পুজোও হয়ে গেছে। কপালে মেটে-সিদুরের ফোঁটা। কিছুটা চুঁইয়ে নাকের ওপরে পড়েছে। বাঁ কানে একটি জবাফুল গোঁজা। কোত্থেকে যত্র তত্র জবাফুল পায়, কে জানে! কিন্তু পেয়ে যায়।

গোপাল এই প্রশ্ন করাতে জবাবে কাল বলেছিল, মাতাজি কি দয়া রহনেসে বাঘোয়াকা দুধভি মিলতা হ্যায় ঔর ইয়ে ফুল কওসি বড়ি বাত হ্যায়।

সফর আলি চান সারেনি কিন্তু ফজিরের নামাজ সেরে নিয়েছে।

লটকার হাতে একটা বাঁশের কঞ্চি। ওর যা চেহারা, তাতে আস্ত বাঁশ নিলেও মানিয়ে যেত। কঞ্চিটাকে ওর হাতে দেখে, গোপাল বলল, লরেল অ্যান্ড হার্ডি।

টুটিলাওয়ার কাছে ওল্ড চাতরার পথের মোড়ে আমরা যখন পৌঁছলাম তখন রোদ সবে উঠেছে। শিশির ভেজা পাতায় পাতায় ঝিলমিল করছে রোদ আর সেই হাওয়াটা ছেড়েছে, মহুয়া, করৌঞ্জ আমের মুকুল আর শালফুলের গন্ধ বয়ে নিয়ে। রবীন্দ্রনাথ যে হাওয়া নিয়ে গান বেঁধেছিলেন বৈশাখের এই ভোরের হাওয়া।

আমি জিপ চালাচ্ছিলাম। আমার বন্দুকের শুধু গুলি ভরিনি। বন্দুকটা পাশেই শোয়ানো ছিল। গোপাল আর সফর আলি গুলি পুরে নিয়েছিল তাদের বন্দুকে। আমার বুশশার্ট-এর উপরে ক্রস-বেল্টে গুলি গোঁজা ছিল। প্রয়োজনে বন্দুকটা তুলে নিয়ে গুলি ভরতে পনেরো সেকেন্ড লাগবে।

গতবার আমি আর গোপাল যে জায়গাটাতে সেই কাঠুরেদের দেখেছিলাম, সে জায়গাটা পেরিয়ে এলাম। আমি ইংরেজিতে বললাম গোপালকে, ক্যান উ্য প্লেস দিস স্পট?

সার্টেনলি আই স্যু।

গোপাল বলল।

লটকা বলল, হামলোঁয়োকা আংরেজি আতা নেহি। আংরেজি বাত-চিত মত কিজিয়ে গা। সমঝমে নেহি আতা। গালি দে রহা ক্যা আপলোঁগ হামলোঁগোকি?

আমি হেসে বললাম, নেহি নেহিজি। খ্যয়ের ঠিকে হ্যায়। ঔর ইংরেজি বোলি নেহি বোলেগা হামলোঁগ।

হ্যাঁ। ঐসাহি কিজিয়েগা।

বাঁদিকের জঙ্গল থেকে একদল ময়ূর বেরিয়ে জিপের সামনে দিয়ে পথ পেরোল ধীরেসুস্থে। সফর আলি বন্দুক উঠিয়ে ছিল। গোপাল বন্দুকের নল হাত দিয়ে সরিয়ে দিল।

কাহে লা?

সফর আলি বলল।

আরে ইস জঙ্গলমে ডাকু রহনেসে খাতরা না বন যায়েগা। ঔর খাতরাতো আপহিকি না হ্যায়। আভূভি হিয়া গোলিকা আওয়াজ নেহি না করনা চাহিয়ে।

সফর আলি বাঁ হাতটা দাড়িতে বুলিয়ে বলল, সাহি বাত।

আরও মিনিট পনেরো যাবার পরে পথ একেবারে সরু হয়ে এল। দু’পাশ থেকে জঙ্গল পথটাকে গলা টিপে মারার মতলব করেছে। পথের মধ্যে মধ্যে পুটুস-এর ঝাড় জন্মে গেছে। পথ, জায়গায় জায়গায় ভেঙে গিয়ে খোয়াই-এর মতো হয়ে গেছে। এই জঙ্গল হরজাই জঙ্গল। ফলে, সেগুন কম। পন্নন, পাঁইসার, গামহার, শিরিষ, জংলি আম, তেঁতুল, সালাই হলুদ, পলাশ এবং আরও নানারকম নাম না জানা জ্বালানি কাঠ-এর গাছ আছে। মনে হল, জিপ নিয়ে বুঝি এই বৈতরণী আর পেরুনো যাবে না।

জিপটা দাঁড় করিয়ে স্টার্ট বন্ধ করে গোপালকে ফিসফিস করে বললাম, আমি স্টিয়ারিং-এ বসে আছি। তুমি আর সফর আলি পায়ে হেঁটে একটু এগিয়ে গিয়ে দেখো, জিপ নিয়ে আর এগুনো যাবে কি না?

লটকা আমাকে বলল, এ বাবু, হাম না উতরায়েব।

সফর আলি চাপা স্বরে বলল, কাহে লা?

ইতনা সরু রাস্তেমে হামারা তোঁদ ফাঁস যায়েগা।

আস্তে হলেও, আমরা হেসে উঠলাম।

এই বাক্যটির মানে কী হল ঋজুদা? তোঁদ মানে কী?

তিতির বলল।

ঋজুদা বলল, লটকা ছিল রসিক চূড়ামণি। সে বলল, আমি ওই সরু পথ দিয়ে হেঁটে যেতে গেলে আমার ভুড়ি জঙ্গলে আটকে যাবে। তাই, আমি জিপেই আছি।

আমি তর্জনী ঠোঁটে চুঁইয়ে কথা বলতে বারণ করে সিটে হেলান দিয়ে আরাম করে বসলাম। সেখানে জঙ্গল এমনই গভীর যে, শেষ চৈত্র আর প্রথম বৈশাখের পর্ণমোচী বনের মধ্যেও আলো যেন ঠিকমতো পৌঁছচ্ছে না।

গোপালরা গেল তো গেলই। ফেরার নাম নেই। সামনে কিছুটা দেখে এসে তো বলবে যে, এগোব কী না! প্রায় দশ মিনিট যখন হয়ে গেল তখন আমার চিন্তা হতে লাগল। ভাবলাম, আমিও গিয়ে দেখি, কী ব্যাপার হল। যেই জিপ থেকে ডান পাটা বের করেছি অমনি লটকা পেছন থেকে তার শালপ্রাংশু কালো বাহু দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, মুঝে একেলা ছোড়কর মত যানা বাবু। ডরকে মারে ম্যায় রো পড়ে গা।

মানে কী হল?

ভটকাই বলল।

আরে একটুও বুঝতে পারলি না? যেওনা বাবু। তুমি আমাকে একা রেখে গেলে, আমি ভয়ের চোটে কেঁদে ফেলব।

তিতির বলল।

আমরা সবাই হেসে উঠলাম।

তারপর?

তারপর আর কী? আমি হাসব না কাঁদব ভেবে পেলাম না। লটকার যা চেহারা, যেমন লম্বা, তেমন চওড়া, তার উপর দু’মণ ওজন। বড় বাঘের সঙ্গে নির্জন পথে তার দেখা হলে বাঘই ভয়ে হার্ট ফেইল করে মারা যাবে আর সে বলে কিনা ভয়ে কেঁদে ফেলবে।

তারপর?

ইতিমধ্যে গোপাল আর সফর আলি হন্তদন্ত হয়ে ফিরে আসছে দেখা গেল। পথের সামনেই বাঁদিকে একটি বাঁক তাই ওদের আগে দেখতে পাইনি। ওরাও এসে পৌঁছল আর পথের ওপাশ থেকে মানুষের গলার শব্দ পাওয়া গেল। বোঝ গেল যে, একটি বয়েল গাড়ি অর্থাৎ ষাঁড়ে-টানা গাড়ির ষাঁড়দের গাড়োয়ান তার নিজস্ব ভাষাতে তাদের লেজ মুলতে মুলতে কিছু বলছে। গাড়িটা ঘোরাচ্ছে পথের উপরে। এমন সময়ে চিহাঁ-হ-হ-হ করে একটা ঘোড়ার হ্রেষা রব শোনা গেল। কে যেন উঁচু থেকে বলল, আররে, এ ফাগুরা! ঘঘাড়ে চিল্লাতা কাহে লা? তুমহিকো দিখকর?

জি হাঁ।

গাড়োয়ান বলল।

তারপরই প্যাঁক-এক, প্যাঁ-এ-এক আওয়াজ করে কতগুলো রাজহাঁস একসঙ্গে ডেকে উঠল।

লটকা তার ডান হাতের পাতা গোল করে বলল, বড়কা বড়কা আণ্ডা হোগা। ওমলেট বড়িয়া বনে গা বাবু। ঔর বড়া বওককি রোস্টোয়া।

অর্থাৎ বড় বড় ডিম দিয়ে ওমলেট খুব ভাল হবে আর বড় হাঁসের রোস্ট যা হবে, তার জবাব নেই।

আমি ভাবছিলাম, জঙ্গলের মধ্যে ঘোড়া এল কোথা থেকে?

গোপাল এসে বলল, পিপ্পাল পাঁড়ের আস্তানাতে এসে পৌঁছে গেছি আমরা। পাঁচ ছটা ঘোড়া বাঁধা আছে নীচে। দূরে পাতায়-ছাওয়া তিন চারটে অস্থায়ী ঘর। রান্না বসেছে। উনুন থেকে ধুয়ো উড়ছে। একটা মস্ত মহুয়া গাছের মাঝামাঝি ডালে বেশ বড় একটা মাচার উপরে দু’জন লোক বসে আছে। একজন ডানদিকে, মানে পুবে মুখ করে, অন্যজন পশ্চিমে মুখ করে। দু’জনের মধ্যে একজন গাছের ডালে হেলান দিয়ে হুঁকো খাচ্ছে।

ওই বয়েল-গাড়িটা?

সফর আলি বলল, সম্ভবত সীমারিয়া থেকে কাল বিকেলের দিকে ওদের রসদ নিয়ে এসেছিল। আজ ভোর হতেই ফিরে যাচ্ছে। বাঘের ভয়ে, রাতের বেলা যায়নি।

তার মানে ওখান থেকে জঙ্গলে জঙ্গলে সীমারিয়াতে যাবার কোনও পথ আছে। যে পথ দিয়ে বয়েল-গাড়ি আরামে যেতে পারে। পথের এই দিকটাই একেবারে অব্যবহার্য হয়ে গেছে তাই পিপ্পাল ডেরা করেছে এখানে।

কথাবার্তা আমরা খুব আস্তে আস্তেই বলছিলাম।

সফর আলি আমাদের মুখের দিকে চেয়ে বলল, ক্যা কিজিয়েগা?

জঙ্গলেই যাব। কেন আমাদের কাল ‘পাণ্ডুক’ শিকারি বলে খুব ঠাট্টা করেছে বারবার, খোকাবাবু! খোকাবাবু! বলেছে। ওর সঙ্গে টক্কর দিয়ে তবেই যাব। হাতে বন্দুক থাকলে যমকেও ভয় করার কিছু নেই।

গোপাল বলল, তাহলে রাত নামার জন্যে অপেক্ষা করতে হবে। দিনের আলোতে তো এগোনোই যাবে না। ওই মাচানের লোক দুটোর কাছে বন্দুক আছে। ওরা স্কাউট। আমাদের দেখতে পেলেই দূর থেকে কড়াক-পিউ করে দেবে। জিপও স্টার্ট করে এই পথে ব্যাক গিয়ারে ফেলে ঘুররাতে, তারপর ফাস্ট গিয়ারে গেলে প্রচুর শব্দ হবে। আসার সময় শব্দ হয়তো ওরা পায়নি। হাওয়াটা ওদিক থেকে এদিকে বইছে।

লটকা বলল, হায় রাম। দিনভর হিয়ের বৈঠ রহনা হোগা?না দানা, না পানি। তবিয়ৎ হামারা সুখ যায়ে গা।

আমি ভাবলাম, ওই শরীর শুকোতে একমাসের উপোস লাগবে।

গোপাল বলল, এক কাজ করা যাক। তুমি স্টিয়ারিং-এ বোসো, আমরা তিনজনে ঠেলছি। গিয়ার নিউট্রাল করে দাও। ঠেলে, পেছনে নিয়ে, আবার ঠেলে সামনে নিয়ে, আরও কিছুটা ঠেলে এগিয়ে গিয়ে চলো স্টার্ট করে সীমারিয়া ফিরে যাই। তারপর বেলা পড়লে আবার আসব। সফর আলির এমন বিপদ। তা ছাড়া, আমাদেরও এমন অপমান-এর একটা ফয়সালা তো করতে হবে।

মনে হল, আমাদের কথা শুনে সফর আলি একটু অবাকই হল। তার জীবনের ভয়ের কারণে আমরা এত বড় ঝুঁকি নিতে যাচ্ছি দেখে তার অবাক না হয়ে উপায়ও ছিল না। আমাদের পাণ্ডুক মারা’ শিকারি বলতে যেটুকু অপমান হওয়ার কথা, আমাদের তার চেয়ে অনেক বেশিই হয়েছে বলেই বুঝতে তার অসুবিধে হল একটু। তাকে চিন্তান্বিতও দেখাল।

আমরা যে আসলে শিকারে আসিনি, ডাকু পিপ্পাল পাঁড়ের সঙ্গেই টুকরাতে এসেছি, এ কথা তো আর কারওকে বলতে পারছি না। গোপালের বাবা অথবা তাঁর মক্কেল বা অন্য কেউও এ কথা ঘুণাক্ষরে জানলে আমাদের আসতেই দিতেন না।

সফর আলি শুধু একবার ক্ষীণ প্রতিবাদ করে বলল, আপলোগ বাঁচ্চে হ্যায়। কলকাত্তা কি বড়ে খানদান কি আওলাদ হ্যায়, আপলোঁগ শিকারকি সঁখ বিতানেকি লিয়ে হিয়া আয়া, আপনোগোঁনে কাহে হামারি মামলে মে ফাঁসিয়েগা ঝুঠঠো।

মানে, আপনারা ছেলেমানুষ, কলকাতায় বড় ঘরের ছেলে, শিকারের সঁখ মিটাতে এসেছেন, আপনাদের কী দায় পড়েছে আমার জন্যে এই বিপদে মিছিমিছি জড়াতে।

গোপাল বলল, দায় না পড়লেও তো মানুষকে শুধুমাত্র মনুষ্যত্বের কারণেও কিছু কিছু কাজ করতে হয় আলি সাহেব। নইলে আমরা মানুষ কীসের?

এমন ভাবেই গোপাল ডায়ালগটা ঝাড়ল উর্দু-মিশ্রিত হিন্দিতে যে আমার মনে হল যেন হিন্দি সিনেমার হিরোই কথা বলছে।

জিপটা ঠেলে ব্যাক করে তারপরেও ঠেলে বেশ কিছুটা এগিয়ে নিয়ে স্টার্ট করতেই লট্রা বলল, লেহ্ লা আভি আভূভিতো জান বাঁচ গ্যয়া। সামমে হাম ঔর নেহি আবেগা। ভুখভি লাগলথু জোর।

তারপরই সুর করে দু’লাইন গান গেয়ে দিল হাতে তাল দিয়ে, দুদু মুঠি চুড়াহ দিহ, তানি তানি দহি দিহ, ঝাচামাচা! ঝাচামাচা! ঝাচামাচা!

বুঝলাম যে, ঝাচামাচা’টা করতাল-এর আওয়াজ-এর ধ্বনির অনুকরণ।

সফর আলি বন্দুকটি কাঁধে শুইয়ে খোদার কাছে দোয়া মাঙ্গার মতো করে দুটি হাত উপরে তুলে, মির সাহেবের শের আবৃত্তি করলেন,

মুদ্দয়ি লাখ বুঢ়া চাহে তো ক্যা হোতা হ্যায়?
ওবহি হোতা হ্যায় যো মঞ্জুরে খুদা হোতা হ্যায়।

মানে কী হল?

ভটকাই বলল।

মানে হল, লাখো লাখো শত্রু তোমার খারাপ চাইলে কী হবে, খোদা তোমার জন্যে যা মঞ্জুর করে, মানে, বরাদ্দ করে রেখেছেন, তাই হবে, তাই হবে।

এটা কেন বললেন?

তিতির বলল!

বললেন, কেন না তাঁর ব্যক্তিগত বিপদের সঙ্গে ছেলেমানুষ, কলকাতা থেকে আসা আমরা যে এমন করে স্বেচ্ছায় জড়িয়ে পড়ব এ তো খোদারই দোয়া। এবং আশীর্বাদ। অর্থাৎ, ঈশ্বর তোমার সহায় হলে তোমার কোনও ভয় নেই।

লটকা বলল, এ বাবু, ওয়াক্ত কিতনা হুয়া আভভি?

কাহে?

নেহি, সীমারিয়ামে গিরধরকি দুকান মে সাড়ে সাত বাজিমে বড়ি আচ্ছা হিংকি কচৌরি ঔর চানা কি ডাল বনতা হ্যায়, সাথমে বড়ি মিঠি কালাজামুন! বড়হি ভুখ লাগলথু বাবু!

গোপাল হেসে বলল, চলো, ভুখ সব্বেকি লাগা হ্যায়।

আমি জোরে অ্যাকসিলারেটরে চাপ দিয়ে একেবারে ‘টিকিয়া-উড়ান’ ছোটালাম জিপ। খিদে আমাদের সকলেরই লেগেছিল। খিদের চেয়েও যেটা বেশি পীড়িত করছিল আমাকে, তা রাতের বেলার ক্রিয়া-কৌশল। ভগবান করলে আমরা আজই পিপ্পাল পাঁড়েকে ধরব। ভাবছিলাম, ধরতে পারলে সুব্রতর বাবা, হাজারিবাগের পুলিশ সাহেব মেসোমশাই আমাদের নিয়ে কী করবেন। আর তা না দেখে, আমাদের জিগরি দোস্ত সুরবোতো বাবু আর গার্জেন-ফিলসফার নাজিম সাহেবই বা কী বলবেন আমাদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *