রাত তখন তিনটে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

চোদ্দো

ফিরতি পথে আমাদের গাড়ি যখন মধুপুর-গিরিডি রোডে পড়েছে, ড্রাইভারের পাশের আসন থেকে পিছন দিকে তাকিয়ে তখন সদানন্দবাবুকে জিজ্ঞেস করলুম, “আংটিটা কোথায় পাওয়া গেল?”

 

“চৌধুরিজির বাড়ির পিছনে একটা ফুলগাছের ঝাড় আছে, দেখেছেন?”

 

“দেখেছি। বুগেনভিলিয়ার ঝাড়।”

 

“তার তলায়। জায়গাটা জঙ্গলমতো হয়ে আছে, তাই বোধহয় কারও চোখে পড়েনি।”

 

“ওখানে ওটা কী করে এল?”

 

“অসাবধানে পড়ে গিয়ে থাকবে। তা ছাড়া আর কী হতে পারে।”

 

গাড়ি চালাতে চালাতেই ভাদুড়িমশাই বললেন, “এ নিয়ে এখন আর কোনও কথা নয়। রাত্তিরে কথা হবে।”

 

বললুম, “কিন্তু জিনিসটা ফেরত দিতে হবে তো।”

 

“তাও এখন নয়,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপাতত এ নিয়ে কাউকে কিছু বলবেন না।”

 

খানিকক্ষণ চুপচাপ কাটল। মহেশমুণ্ডায় পৌঁছে গাড়ি বাঁ-দিকে মোড় ফিরতে বললুম, “এক্ষুনি তা হলে আমরা গিরিডিতে যাচ্ছি না?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “গিরিডিতে পরে যাব। আপাতত মুকুন্দবাবুর সঙ্গে একবার দেখা করা দরকার।”

 

দেউড়ি পেরিয়ে ড্রাইভওয়ে দিয়ে গেস্ট হাউসের দিকে আসতে-আসতে চোখে পড়ল, সামনে-এল-ঝোলানো একটা পুরনো মডেলের উল্লি গাড়ি নিয়ে একটি মেয়ে ড্রাইভিং শিখছে। মেয়েটি যে এ-বাড়ির পুত্রবধূ রিয়া, সেটা আন্দাজ করে নেওয়া শক্ত হল না। রিয়ার হাতে স্টিয়ারিং হুইল, পাশের আসনে যে লোকটি বসে আছে, তার মুখে চাপদাড়ি। লোকটিকে চিনতে পারলুম। প্রথম দিন যখন এই বাড়িতে আসি, গিরিডি থেকে এই লোকটিই ফিয়াট গাড়িটা চালিয়ে আমাদের এখানে নিয়ে এসেছিল। সম্ভবত এদের পুরনো ড্রাইভার। রিয়াকে গাড়ি চালাতে শেখাচ্ছে।

 

গেস্ট হাউসের একতলাতেই মুকুন্দবাবুর দেখা পাওয়া গেল। আমাদের দেখে ভদ্রলোক এগিয়ে এসে বললেন, “কোথায় গিয়েছিলেন?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “মধুপুরে একটা কাজ ছিল। সেটা মিটতে-মিটতে দেরি হয়ে গেল।”

 

“দুপুরের খাওয়া?”

 

“ওখানেই সেরে নিয়েচ্ছি। একটু বাদে আবার গিরিডি যেতে হবে।”

 

“রাত্তিরে এখানেই খাবেন তো?”

 

“তা খাব,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তবে খাবারটা যেন দোতলায় আমাদের ঘরে ঢাকা দিয়ে রেখে দেয়। চৌধুরিজি ফিরেছেন?”

 

“না। কোনও খবরও দেননি।”

 

“আপনি একটু উপরে আসতে পারবেন? দু-একটা কথা ছিল।”

 

“বেশ তো,” মুকুন্দবাবু বললেন, “আপনারা উপরে যান, আমি চায়ের ব্যবস্থা করে আসছি।…না না, দেরি হবে না।”

 

মিনিট পাঁচ-সাতের মধ্যেই মুকুন্দবাবু উপরে চলে এলেন। সঙ্গে বেয়ারা। তার হাতে ট্রে। তাতে চায়ের সরঞ্জাম সাজানো। ড্রইং রুমের সেন্টার টেবিলের উপরে ট্রেটা নামিয়ে রেখে সেলাম ঠুকে বেয়ারা চলে গেল। মুকুন্দবাবু চা খান না। সদানন্দবাবুকে জিজ্ঞেস করতে তিনি তাঁর পুরনো যুক্তিটাই রিপিট করে বললেন যে, তাঁর দৈনিক বরাদ্দ তিন কাপ, সেটা ইতিমধ্যেই খাওয়া হয়ে গেছে। চায়ের সঙ্গে যে প্লেটভর্তি প্যাড়া এসেছিল, তাতে অবশ্য তাঁর কোনও আপত্তি দেখা গেল না।

 

চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “চৌধুরিজির ড্রাইভার মোট ক’জন?”

 

“রাজাবাবুর ট্রাকের ব্যাবসা আছে না?” মুকুন্দবাবু বললেন, “ড্রাইভারও তাই অনেক আছে। তাদের সকলকে আমি চিনি না।”

 

“আর বাড়ির গাড়ি?”

 

“বাড়ির গাড়ি দুজন ড্রাইভার ঢালায়। তাদের একজন তো রাজাবাবুকে নিয়ে আসানসোল গেছে। অন্যজন বহুজিকে গাড়ি চালানো শিখলাচ্ছে। আসবার সময় তাকে দেখলেন না?”

 

“দেখেছি।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “মুখে দাড়ি, মাথায় বাবরি চুল। প্রথম দিন তো ওই আমাদের গিরিডি থেকে এখানে নিয়ে এসেছিল।”

 

“হাঁ, ভাদুড়িসাব। আপনার মনে আছে দেখছি।”

 

“বাড়ির ড্রাইভাররা কতদিন হল এখানে কাজে ঢুকেছে?”

 

মুকুন্দবাবু একটু চিন্তা করে নিয়ে, আঙুলের কর গুনে বললেন, “যোগিন্দর, মানে রাজাবাবুকে নিয়ে যে আসানসোল গেল, সে এখানে আট মাস আগে কাজে ভর্তি হয়েছে, আর হাজারিলালের ভি করিব পাঁচ মাস হয়ে গেল।”

 

“ওরা কি এই বাড়ির মধ্যেই থাকে?”

 

“না।” মুকুন্দবাবু বললেন, “দুজনেই গিরিডি থেকে আসে। তবে ভোরবেলায় গাড়ি বার করবার থাকলে আগের রাতে এখানেই থেকে যায়।”

 

“ওরা খায় কোথায়?”

 

“দুপুরের খাওয়া এই গেস্ট হাউসের কিচেন থেকেই খেয়ে নেয়।”

 

“আপনি কোথায় থাকেন?”

 

“শিউমন্দিরের পিছনে। ওখানে দুটা কামরার একটা ছোট বাড়ি আছে। সেখানে থাকি।”

 

“আপনার বাড়িতে আর কে থাকেন?”

 

“কেউ না।” মুকুন্দবাবু হাসলেন, “আমি একা থাকি।”

 

“তা হলে এখন কয়েকটা দিন একটু সাবধানে থাকবেন।” ভাদুড়িমশাই সোফা থেকে উঠে পড়লেন। তারপর বললেন, “এখন একবার গিরিডিতে যাব। … বড়িদিদিকে আজ ফোন করেছিলেন?”

 

“দুপুরে করেছিলুম।” মুকুন্দবাবু বললেন, “আপনার উপরে বড়িদিদির খুব ভরোসা। বললেন, “ভাদুড়িসাব যখন আছেন, তখন ভাবনা নেই, ভাইয়ার মুশকিলের এবার আসান হবে।”

 

ভাদুড়িমশাই আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “চলুন, যাওয়া যাক।”

 

শব্দটা ঠিক সেই সময়েই পাওয়া গেল। গাড়িতে-গাড়িতে ধাক্কা লাগলে যে-রকমের শব্দ হতে পারে, সেই রকমের শব্দ। তাড়াতাড়ি সবাই মিলে নীচে নেমে দেখলুম, যা ভেবেছি তা-ই। গেস্ট হাউসের সামনে ড্রাইভওয়ের উপরে ভাদুড়িমশাই আমাদের ফিয়াট গাড়ি রেখে ভিতরে ঢুকেছিলেন, উলটো দিক থেকে উল্লিটা এসে তার বনেটে ধাক্কা মেরেছে।

 

গাড়ি থেকে নেমে, মাথা নিচু করে, রিয়া চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। পাশেই হাজারিলাল। মুকুন্দবাবু হাজারিলালকে জিজ্ঞেস করলেন, “কী ব্যাপার? ফির ধাক্কা লাগায়া?”

 

হাজারিলাল বলল, “মেরা ক্যা কসুর? ম্যয়নে তো বোলা বাঁয়ে কাটাইয়ে। তো ভাবিজি ডাইনে কাটালেন। বাস, ধাক্কা লেগে গেল।”

 

রিয়া কোনও কথা বলল না। চোখ তুলে আমাদের দিকে তাকাল একবার। কিন্তু কিছু দেখছে বলে মনে হল না। সেই শূন্য দৃষ্টি। পরক্ষণেই চোখ নামিয়ে দৌড়তে-দৌড়তে বাড়ির মধ্যে গিয়ে ঢুকে পড়ল।

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওহে হাজারিলাল, তোমার গাড়িটা একটু ব্যাক করো তো। না হলে তো ফিয়াটটার দফা কী হল, সেটা বুঝতেই পারব না।”

 

হাজারিলাল উল্লিতে উঠে, স্টার্ট দিয়ে, গাড়িটা হাত কয়েক পিছিয়ে নিল। ভাদুড়িমশাই ফিয়াটে উঠে ইগনিশন-কি ঘুরিয়ে স্টার্ট দিতে দেখলুম, এ-গাড়িটা গোঁ-গোঁ করে উঠেছে। এবারে গাড়ি থেকে নেমে বনেট তুলে তিনি দেখলেন, অন্য কোনও ক্ষতি হয়েছে কি না। তারপর বনেট নামিয়ে বললেন, “নাঃ, রেডিয়েটারও ঠিকই আছে। বিশেষ কোনও ড্যামেজ হয়নি। শুধু বডিটা সামনের দিকে একটু তুবড়ে গেছে।”

 

হাজারিলাল বলল, “না স্যার, সির্ফ বাম্পারে লেগেছে, কুছু ড্যামেজ হয়নি।”

 

“বডিটা তা হলে সামনের দিকে তুবড়ে গেল কী করে?”

 

“ওটা স্যার আগেই ছিল। এই গাড়িতে আগেও একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল। ওটা তখনকার বেপার।”

 

ভাদুড়িমশাই এর পরে আর হাজারিলালকে কিছু বললেন না। আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তা হলে আর দাঁড়িয়ে থেকে লাভ কী, উঠে পড়ুন।”

 

মুকুন্দবাবু বললেন, “এই গাড়ি নিয়েই বেরোবেন?”

 

গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “ভাল করে তো দেখে নিলুম, মাঝপথে বিগড়ে যাবে বলে মনে হয় না। আর তা যদি যায়ই তো ফোন করব। তখন না হয় হাজারিলালকে দিয়ে উল্লিটা পাঠিয়ে দেবেন।”

 

গৌতমদের বাড়িতে পৌঁছতে-পৌঁছতে সাতটা বাজল। একতলায় গৌতমের চেম্বার। কলিং বেল বাজাতে কম্পাউন্ডার দরজা খুলে দিল। ভাদুড়িমশাই বললেন, “ডাক্তারবাবু নেই?”

 

“কলে বেরিয়েছেন।”

 

“ঠিক আছে, তাঁর স্ত্রীকে একটা খবর দিতে হবে।”

 

খবর দেবার জন্যে ছোকরা-কম্পাউন্ডারটিকে আর দোতলায় উঠতে হল না। দোতলার বারান্দা থেকেই গৌতমের স্ত্রী সম্ভবত আমাদের দেখতে পেয়েছিল। নীচে নেমে বলল, “আপনারা উপরে এসে বসুন, ও এক্ষুনি এসে পড়বে।”

 

গৌতম চলে এল মিনিট দশেকের মধ্যেই। আমাদের খবর বোধহয় কম্পাউন্ডারের কাছে পেয়ে থাকবে, তাই একতলায় তার চেম্বারে না ঢুকে সরাসরি উপরে এসে জিজ্ঞেস করল, “কী খবর মেসোমশাইরা?”

 

“অন্য সব খবর পরে হবে,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপাতত বলো তো তোমার এখান থেকে স্ট্রেট ডায়ালিং করা যায়? আমাকে বাইরে গোটাকয় ফোন করতে হবে।”

 

“স্বচ্ছন্দে করুন।” গৌতম হেসে বলল, “চা দিতে বলে দিচ্ছি। আমি ততক্ষণ নীচে গিয়ে হাতের কাজটা সেরে ফেলি। জনা তিনেক রোগী বসে আছে।”

 

গৌতম চলে গেল। ভাদুড়িমশাই বললেন, “জানকী দেবীর মতামতটা আগে জানা দরকার।”

 

ব্যাঙ্গালোরের লাইন পেতে দেরি হল না। অতঃপর যে একতরফা কথা শুনলুম, সেটা এইরকম “বেহেনজি, আমি ভাদুড়ি কথা বলছি। যা বলছি, খুব মন দিয়ে শুনুন।”

 

*

 

“না না, ও-সব কথা এখন ছেড়ে দিন। টাকা এমন-কিছু লাগছে না। খর্চা যা হচ্ছে, সে আমি নিজের পকেট থেকে চালিয়ে নিতে পারব।”

 

*

 

“আবার কেন সেই পেমেন্টের কথা তুলছেন? বেহেনজি, আগে আমার কথাগুলো শুনুন, ও-সব কথা পরে হবে। আপনি যে কাজ আমাকে দিয়েছেন, তার খবরটা আগে শুনে নিন। এরই মধ্যে যেটুকু যা বুঝতে পেরেছি, তাতে মনে হচ্ছে, আপনাদের ফ্যামিলির লোক এর মধ্যে জড়িয়ে যেতে পারে। এখন বলুন, আমি আর এগোব কি না। যদি আপনার মনে হয় যে, আর এগোনো ঠিক হবে না তো সেটা সাফ-সাফ আমাকে জানিয়ে দিন, আমি তা হলে এইখানেই বাস্ করে দিয়ে ফিরে যাই।”

 

*

 

“ঠিক আছে, আপনি রাগ করবেন না, আমি জানতুম যে, আপনি এটাই বলবেন। তবু আমার তরফে আপনাকে ওয়ার্ন করবার দরকার ছিল।”

 

*

 

“না, না, তা হলে আর কাজ ছেড়ে দিয়ে ভাগব কেন? বাস, তা হলে ওই কথাই রইল। নমস্কার।” রিসিভারটাকে আলতো হাতে ক্রেডলের উপরে নামিয়ে রেখে ভাদুড়িমশাই বললেন, “নমস্যা মহিলা। বললেন, ফ্যামিলি নিয়ে আপনাকে মাথা ঘামাতে হবে না, আপনাকে চোর ধরতে পাঠিয়েছি, আপনি চোর ধরে দিন। বাস।”

 

চা এসে গিয়েছিল। সদানন্দবাবু সেই যে মধুপুরে মেজর ভার্মার বাড়ি থেকে চা খেয়ে বেরিয়েছিলেন, তারপর তিনি মহেশমুণ্ডার গেস্ট হাউসেও চা খাননি, এখানেও খেলেন না। তবে সেখানে যেমন গোটা চারেক পেল্লায় সাইজের প্যাড়া খেয়েছিলেন, এখানেও তেমন টেনিস-বলের চেয়ে একটু ছোট মাপের দু’দুটো লেডিকেনি একেবারে অক্লেশে সাঁটিয়ে, ঢকঢক করে এক গেলাশ জল খেয়ে নিয়ে, রুমালে মুখ মুছতে-মুছতে বললেন, “জল-হাওয়ার গুণ ছাড়া আর কী বলব মশাই, এখানে আসা ইস্তক দেকচি খিদেটা অসম্ভব বেড়ে গেছে!”

 

চায়ের পেয়ালা শেষ করেই ভাদুড়িমশাই ফের ফোনের ডায়াল ঘোরাতে শুরু করেছিলেন। লাইনে ডিস্টাবান্স ছিল নিশ্চয়, কিংবা এমনও হতে পারে যে, বোম্বাইয়ের যে-নম্বরটা তিনি চাইছিলেন, প্রতিবারই দেখা যাচ্ছিল সেটা এনগেজড। মোট কথা সেটা পেতে-পেতে আটটা বেজে গেল। এবারে যে একতরফা কথা আমাদের কানে এল, স্মৃতি থেকে উদ্ধার করে সেটাও এখানে যথাসম্ভব তুলে দিচ্ছি :

 

“দিস এগেন ইজ ফাইভ জিরো ডাবল এইট। রিপিট ফাইভ জিরো ডাবল এইট। কিছু পাওয়া গেল?”

 

“হ্যাঁ, আমি শুনতে পাচ্ছি, বলে যাও।”

 

“কত? লাখ দশেক?”

 

*

 

“সে কী? পাওয়াই যাচ্ছে না?”

 

*

 

“হাল ছেড়ো না, কিপ ওয়ার্কিং অন ইট। আর হ্যাঁ, একজন কনভিক্ট সম্পর্কেও লেটেস্ট খবর চাই। নামটা লিখে নাও…(গৌতম ঠিক এই সময়ে হঠাৎ ঘরে এসে ঢোকায় এক মুহূর্তের জন্যে আমার মনোযোগ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, ফলে কী নাম বললেন, শুনতে পেলুম না), দ্যাট অফ কোর্স ইজ ওয়ন অব হিজ মেনি নেমস। কাল আবার ফোন করব।”

 

ভাদুড়িমশাই ফোন নামিয়ে রাখলেন। তারপর মুখ তুলে গৌতমকে দেখে বললেন, “আরে এসো এসো।”

 

গৌতম বলল, “আজ আর রুগি দেখব না। চেম্বার বন্ধ করে দিয়ে এলুম। কিন্তু তা তো হল, ‘আপনার কাজ কী রকম এগোচ্ছে?”

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “এসেছি তো চুরির তদন্ত করতে, তার প্রোগ্রেস রিপোর্ট চাও তো বলি, খুব একটা খারাপ নয়।”

 

“প্রমাণ-টমান কিছু পেলেন?”

 

“এভিডেন্সের কথা বলছ তো? সে-সব পাবার জন্যে আমাকে খুব একটা চেষ্টা করতে হচ্ছে না, নিজের থেকেই একের পর এক সেগুলো আসতে শুরু করেছে। তার মধ্যে আবার আজ বিকেলে একটা অ্যাকসিডেন্টও হয়ে গেল।”

 

“তার মানে?”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “জব্বর অ্যাকসিডেন্ট। ভাগ্যিস তখন আমরা গাড়ির মধ্যে ছিলুম না।”

 

গৌতম বলল, “কী হয়েছিল বলুন তো? সত্যি কেউ কোনও চোট পাননি?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আরে না না, ইট্স আ মাইনর ম্যাটার। যে ফিয়াট গাড়িটা আমি ব্যবহার করছি, চৌধুরিদের গেস্ট হাউসের সামনে সেটা পার্ক করা ছিল। সেই সময় তোমার পেশেন্ট একটা উল্লি গাড়িতে করে এসে সেটাকে ধাক্কা মারে।”

 

“রিয়া?” গৌতম বলল, “তাকে তো আমি বারবার বলেছি এখন যেন সে ড্রাইভিং শেখবার চেষ্টাটা অন্তত কিছুদিনের জন্যে বন্ধ রাখে। ছি ছি, তার শরীর ভাল নয়। এই অবস্থায় কেউ গাড়ি চালায়? পেশেন্ট কথা শুনবে না, যা খুশি তা-ই করবে, এ-রকম চললে তো ও বাড়িতে ডাক্তারি করা আমাকে ছেড়ে দিতে হবে দেখছি।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন; “আর যা-ই করো, ওটি কোরো না। আর তা ছাড়া রিয়া যে ডিপ্রেশানের রুগি, সে-কথা ভুলে যাচ্ছ কেন? ড্রাইভিং শিখলে যদি ওর মনটা একটু ভাল থাকে তো শিখুক।”

 

“আর এইরকম অ্যাকসিডেন্ট করুক?”

 

“আহা, রোজ কি আর অ্যাকসিডেন্ট করবে? প্রথম-প্রথম এ-রকম দু-চারটে অ্যকসিডেন্ট সবাই করে। তাও তো কারও ক্ষতি হয়নি, স্রেফ ফিয়াট গাড়িটার সামনের দিকে একটুখানি তুবড়ে গেছে। তো বয়েই গেল। ও নিয়ে তুমি ভেবো না। বরং একটা উপকার করো তো। কাল সকালে…এই ধরো দশটা নাগাদ…মুলচাদজির সঙ্গে আমার একটু দেখা করিয়ে দাও। উনিও তো তোমার পেশেন্ট। তাই না?”

 

“তা ঠিক। কিন্তু চৌধুরিজির উনি এনিমি নাম্বার ওয়ান। দুজনের বাক্যালাপ নেই।”

 

“তা হোক, কাল সকাল সাড়ে ন’টায় তোমার কাছে আসছি। অ্যাপয়েন্টমেন্টটা কিন্তু করে রেখো।” গৌতম বলল, “ব্যাপারটা আমার ভাল লাগছে না, মেসোমশাই। কিন্তু ঠিক আছে, কাল সকালে চলে আসুন, আমি বলে রাখব।”

 

ভাদুড়িমশাই উঠে পড়লেন। তারপর দরজা পর্যন্ত এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, “ও হ্যাঁ, আজকের অ্যাকসিডেন্ট সম্পর্কে একটা কথা না বলে পারছি না। টাইমিংয়ের একটু গণ্ডগোল হয়ে গেছে। ধাক্কাটা বড্ড দেরিতে লাগল। দু-এক দিন আগে লাগলে সত্যি একটু ধাঁধায় পড়ে যেতুম।”

 

কিছুই বুঝতে পারলুম না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *