অন্য শিকার (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

এখন অন্ধকার। বাইরে ঝিঁঝি ডাকছে একটানা। ভোঁর ঘাসের মাঠের মধ্যে দিয়ে বারাশিঙার দল রাত পেরিয়ে যাচ্ছে, হাঁটুতে ঝাঁকি তুলে তুলে, মানুষদের বিয়েবাড়ির সোনার বেনারসি-পরা, কোমরে রুপোর চাবির গোছা-ঝুলনো, পাঁয়জোর-পরা মেয়েদেরই মতো। নৈঃশব্দ্যের শব্দ যারা শুনতে পায়, শুধু তাদেরই কানে এই ঝুমঝুমি বাজে।

বানজার নদীর ঠিক মধ্যিখানে, সাদা-দাড়ি শিকারির তাঁবুটা থেকে দুআড়াই শো মিটার দূরে একটি আবর্ত-মতো আছে। জল সেখানে জোরে ধাক্কা খেয়েই উছলে ওঠে। অনন্তকাল থেকেই উছলে উঠছে, সমুদ্রের ঢেউ যেমন বেলাভূমিতে আছড়ে পড়ে চরকি-খাওয়া ঘোলের মতো। পাথরের মধ্যে মধ্যে জমে আছে আঁজলা আঁজলা নিশ্চল জল। গান্ধালা আর গাংগারিয়া ফুল ফুটে আছে সেই জলে। পাথরের খাঁজে খাঁজে। ফুলগুলোকে অন্ধকারে বোঝা যায় না। চাঁদ উঠলে তারা রুপোর ফুল হয়ে রূপের হাট মেলে বসে।

দিনের বেলা, নদীর উজানে তিন মাইল দূরের বাইগাদের গ্রাম রুজঝানি থেকে জঙ্গলের সুঁড়িপথে হেঁটে এসে একটি অথর্ব বুড়ো এবং তার শিশু নাতি ওই পাথরগুলোরই উপরে ছিপ ফেলে বসে থাকে সারাদিন। পৃথিবীর সব ঘুম চোখে নিয়ে মৃত্যুপথযাত্রী বুড়ো শীতের সূর্যের দিকে কালকেউটের মতো চৰ্চকে সরু কোমর ফিরিয়ে ঝরনার মধ্যে ঝিমোয়। আর তখন মুখে দুধের-গন্ধ-ভরা তার ছোট্ট-নাতি ওম-ধরা রোদে উবু হয়ে বসে নানারকম স্বপ্ন দেখে। মাছের স্বপ্ন। গানের স্বপ্ন। পরীর স্বপ্ন। যে-জীবন তার সামনে পড়ে আছে, বাঁকের ওপাশের অদেখা, অজানা নদীরই মতো; সেই না-হাঁটা, না-দেখা জীবনের স্বপ্ন। যে-জীবনে সেই শিশু একদিন বয়ে যাবে এই চকে-চলা বাজার নদীরই মতো, যৌবনে পৌঁছে।

বেচ্চারি! ছোট্ট ছেলে তো! জানে না তাই যে, নদীরই মতো বয়ে যেতে যেতে, জীবনের বেগ বাড়তে বাড়তে, একসময় নিজের আর কোনওই জারিজুরি খাটবে না নিজের জীবনেরই উপরে। জীবনের ভারে চাপা পড়ে গিয়ে হয়তো ভেসেই যাবে স্রোতের শিকড়-আলগা-হওয়া গান্ধালা ফুলেরই মতো। বেশির ভাগ মানুষই যেমন ভাসে।

তার দাদুর সব স্বপ্নই দেখা শেষ হয়ে গেছে এ-জন্মের মতো। সে কুঁজো হয়ে বসে, জীবন আর মৃত্যুর মোহানার কাছে পৌঁছে মনে-মনে পেছন ফিরে চেয়ে এখন শুধুই ভাবে। ভাবে, ভাবে আর ভাবে। বুড়ো, অকেজো ষাঁড় যেমন করে গলকম্বলের নীচে অনেক খড়কুটোর মতো পৃথিবীর সমস্তটুকু সময় গলার মধ্যে ভরে নিয়ে জাবর কাটে; তেমনি করে।

যে-জায়গায় বুড়ো আর নাতি বসে মাছ ধরছে সে-জায়গা থেকে অনবরত উঠে-আসা জলের ছলছলানি অন্ধকার শীতের রাতের হিমেল স্তব্ধতাকে একটানা ছলাত ছলাত শব্দে স্তব্ধতর করে তুলছে। সমস্ত শব্দের মধ্যেই শব্দহীনতা ঘুমিয়ে থাকে। সমস্ত শব্দহীনতার মধ্যেও সজাগ থাকে শব্দ। নাতি জানে না। দাদু জানে।

বুড়হা বাঘাটা বানজার নদীর পারের আড়াল দিয়ে এগিয়ে আসছিল তাঁবুটার দিকে। তাঁবুর বাইরের আগুন নিভুনিভু হয়ে এসেছে। আগুন যখন নিভে আসে, তখন সে নিজের সঙ্গে চাপা, ফিসফিসে গলায় কথা বলে। হাতেখড়ির আগুন, বিয়ের আগুন, চিতার আগুন, সব আগুনই। রাতের আগুন লাল নীল সবুজ কমলা হাসি হাসছিল। নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলছিল ফুট-ফাট করে।

বুড়ো শিকারি ক্যাম্প-খাটে পাশ ফিরে শুয়ে ছিল। গায়ের উপর জলপাইরঙা কম্বল। তাঁবুর অন্য কোণে আরেকটি ক্যাম্পখাটে তুরু শুয়ে আছে। বাস্তারের বাইসন-হর্ন মারিয়াদের হাতে-বোনা কম্বলে মাথা মুড়ে। তারার আলোতে, তাঁবুর পাশে একটা মস্ত কাসসিগাছের নীচে দাঁড় করিয়ে রাখা রায়পুরের নাম্বার-প্লেট লাগানো জিপটাকে একটা ভুতুড়ে ছোট্ট কুঁড়ে বলে মনে হচ্ছে। শিশিরে ভিজে সপে করছে জিপের বনেট। উইন্ডস্ক্রিনের উপর শিশিরের মেঘ জমেছে। বুড়ো শিকারির মাথার কাছে বাঁশ দিয়ে বানানো গার্যাকে ফোর-সেভেন্টি ডাবল-ব্যারেল জেফরি নাম্বার টু রাইফেল আর হল্যান্ড-অ্যান্ড-হল্যান্ডের ডাবল-ব্যারেল টুয়েলভ-বোর শটগানটা দাঁড় করানো আছে। তুরুর মাথার কাছেই তাঁবুর গায়ে হেলান-দেওয়ানো আছে পয়েন্ট টু টু ব্রুনো রাইফেল আর তুরুর একনলা বন্দুকটা।

রাবারের বালিশে মাথাটা কাত হয়ে রয়েছে বুড়ো শিকারির। তুরুর নাক এমনই ডাকছে যে, মনে হচ্ছে একটা ধাড়ি শুয়োরই বুঝি ঢুকে পড়েছে তাঁবুর মধ্যে।

বুড়ো শিকারিকে সকলেই খুব সুখী লোক বলে জানে। খুবই বড় চাকরি করত সে। বুড়োর একমাত্র সন্তান, ছেলে। সে অ্যামেরিকায় থাকে। অ্যামেরিকান মেয়ে বিয়ে করে অ্যামেরিকান সিটিজেনশিপ নিয়ে নিয়েছে। এই পোড়া দেশে আর থাকবে না ঠিক করেছে। ফিজিসিস্ট সে। নিউক্লিয়ার বোমা বানাতে জানে। ধ্বংসবীজ বোনে। অনেক টাকা রোজগার করে। কালো ক্যাডিলাক গাড়ি আছে তার। নিজের বাগানওয়ালা বাড়ি। বউ কম্পুটার প্রোগ্রামার : মৃত্যু বোনে।

এখানে আর আসে তারা। ফিরবেও না বলেছে। বুড়োকে বড়দিন আর জন্মদিনে কার্ড পাঠায় কিন্তু কর্তব্য করে।

বুড়ো শিকারি চেয়েছিল, তার ছেলে দেশে ফিরে এসে এ দেশের ভাল করুক। তার বিদ্যাবুদ্ধি দেশের কাজে লাগাক। একটু না-হয় খারাপই থাকবে, খারাপই খাবে-পরবে, না-হয় দিশি গাড়িই চড়বে। কিন্তু হয়নি তা। মাঝে-মাঝেই ওখানে যাওয়ার জন্যে লেখে ছেলে-বউ। টিকিট কেটেও পাঠিয়ে দিতে চায়। তবুও বুড়ো যায় না। অদ্ভুত টেটিয়া বুড়ো একটা। অ্যামেরিকায় বারবার যাওয়ার সুযোগ থাকতেও যায় না। অন্য অনেক ফোরেন-প্রেমী ভারতীয় মানুষ একথা শুনে বুড়োকে পাগল বলে।

বুড়ো দশ বছর আগে একবার শুধু গেছিল। ছেলে-বউকে দেখে এসেছিল। তারপর যায়নি আর। যাবেও না।

ভাল লাগে না বুড়োর। এই দেশ গরিব কিন্তু বড় সুন্দর। যে দেশে এই বুড়ো শিকারির জন্ম, তার বাবা ও ঠাকুর্দার জন্ম, এই জঙ্গল-পাহাড়, নদী-নালা, এই বিরাট নানা-ভাষাভাষী, নানাজাতের, নানাপথের, নানামতের দেশকেই বুড়ো শিকারি তার সব কিছু বলে জানে। ভাবে, এই দেশেই তার জন্ম, যেন এই দেশেতেই সে মরে। দেশের মানুষরা যদি নিজের দেশ ছেড়ে ভাল খাওয়া, ভাল পরার জন্যে বিদেশেই চলে যায়, তাহলে দেশের কী হবে? যে-কোনও দেশের পরিচয় তো সে-দেশের মানুষদেরই দিয়ে!

বুড়ো শিকারির ভাল লাগে না। যারা দেশ ছেড়ে অভিমানে চলে যায়, তাদের অভিমানটা চোরের উপর রাগ করে মাটিতে ভাত খাওয়ার মতোই এক অভিমান। ভাবে, বুড়ো। কিন্তু ছেলে বোঝেনি। দেশের কথা দশের কথা বোঝে, ভাবে, এমন লোক এখন দেশে যে বেশি নেই। বড় অভাগা এই দেশ; ভারতবর্ষ।

বুড়ো শিকারির নিজের চলে-যাওয়ার মতো টাকা পয়সা আছে। নিজের বেঁচে থাকা, এমনকী ছোটখাটো শখের জন্যেও সে কারও দয়ার ওপর নির্ভর করে না। বুড়োর বন্ধু-টন্ধু বেশি নেই। যে-মানুষ গভীর, বোধহয় তার বন্ধুবান্ধব কখনও বেশি থাকে না। যে-পাখি আকাশে উঁচুতে ওড়ে, তাকে একা-একাই উড়তে হয়। অনেক বন্ধু থাকে শুধু চড়ুই, আর কাকেদেরই। খুব উঁচুতে কালো বিন্দুর মতো যাকে দেখা যায়, সেই বাজপাখিরই বন্ধু থাকে না কোনও।

বুড়োর স্ত্রীও নেই। মারা গেছেন বহুবছর আগে। তার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা এবং তার একমাত্র ভাইও তাকে খারাপ বাসে না। বুড়োর জীবনে কোনও অসুখ নেই, অভাই নেই, অনুযোগ নেই। সবকিছুই ঠিকঠাক চলে। সময়মতো চা, খবরের কাগজ, ভোপালের আহমেদনগরের পথে প্রাতঃভ্রমণ, গরম জলে চান, ব্রেকফাস্ট খাওয়া, ক্লাবের লাইব্রেরি থেকে বই এনে পড়া, গান-বাজনা শোনা। তারই মতো বুড়ো-হয়ে-যাওয়া দুএকজন শিকারি বন্ধুর সঙ্গে কখনও সখনও পুরনো দিনের শিকারের গল্প, জঙ্গলের গল্প করা; এই-ই। মানসম্মান, শখ, শান্তি কোনও কিছুরই ঘাটতি ছিল না বুড়োর জীবনে। তবুও এই সাদা-দাড়ির শিকারি যে কেন এই বয়সে একেবারে একা একাই এই বুড়হা বাঘার মোকাবিলা করতে চায়, তার কারণটা কারও জানা নেই।

কারণটা, বুড়ো শিকারি শুধু নিজেই জানে। কিন্তু বলে না কাউকেই।

শিকারি বন্ধুদের মধ্যে দুজন নামী শিকারি সাদা-দাড়ির সঙ্গে আসতেও চেয়েছিল। বুড়োর ছোট ভাই অনেক করে মানা করেছিল। বুড়োর শালা এবং এক শালিও অনেক অনুনয় বিনয় করেছিল। কারও কথাই শোনেনি একগুঁয়ে। বুড়ো। হেসেছিল শুধু, আর ভুসস্ ভুসস্ করে পাইপের ধোঁয়া ছেড়েছিল।

শিকারি, সাদা-দাড়ি বুড়োটা চিরদিনই বুনো শুয়োরেরই মতো একগুঁয়ে।

এখনও জঙ্গলে কেন যান দাদা? কী আছে সেখানে আপনার?

ভাইয়ের স্ত্রী অনুযোগ করে জিজ্ঞেস করেছিল। বুড়ো হেসে বলেছিল, আছে, আছে। এখনও বাকি আছে কিছু। সব যে পাওয়া হয়নি, সব নেওয়া হয়নি এখনও। সব দেওয়াও হয়নি; যা দেওয়ার, জঙ্গলকে। বুঝেছ রানু?

তার জানাশোনা সব শিকারিই যে বাঘকে মারতে গিয়ে নিজেরা মরেছে, নয় কোনওক্রমে প্রাণ নিয়ে ফিরে এসে আতঙ্কে শিকারই ছেড়ে দিয়েছে জন্মের মতো, বন্দুক রাইফেল পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছে দু-একজন; সেই সাংঘাতিক বাঘটার চেয়েও বোধহয় অনেক বড় কিছু মারতে এসেছে এবারে বুড়ো শিকারি, এই বাজারের তীরের, বিন্ধ্য, সাতপুরা আর মাইকাল পর্বতশ্রেণীর পাহারা-ঘেরা গহন জঙ্গলে।

যা সে মারতে এসেছে, সেটা কী? সেটা ভূত? না কোনও অপদেবতা? নাকি ড্রাগন বা ডাইনোসারের মতোই কোনও প্রাগৈতিহাসিক জন্তু? সে সম্বন্ধে বুড়োর পরিচিতদের কারও কোনও স্পষ্ট বা অস্পষ্ট ধারণাও নেই। এমনিতে সকলেই জানে যে, বুড়ো-শিকারি বুড়হাবাঘাকেই মারতে এসেছে। একটা আত্মম্ভরী, জেদি, গর্বিত, খ্যাপাটে বুড়ো। বড়ই বাড় বেড়েছে মানুষটার। বুড়হাবাঘার হাতে তার মৃত্যু অবধারিত। তার দিন ঘনিয়ে এসেছে।

বুড়োর ঘুমের মধ্যে, তার ঘুমন্ত মুখের আধফোঁটা হাসির মধ্যে, সেই না-বলা গোপন কথাটিই যেন দুলছে গাঢ় নিশ্বাসের সঙ্গে বাজার নদীর বুকের মধ্যের আধো-ফোঁটা গান্ধালা ফুলেরই মতো।

সব বুড়োরাই বড় মিষ্টি হয়। শিশুদেরই মতো। বুড়োদের মুখেও দুধের গন্ধ থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *