অন্য শিকার (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ
তুরু বলল, বাপ্পা, কোন দিকে এবার?
সাদা দাড়ির বুড়ো শিকারি বলল, মুখ থেকে পাইপটা নামিয়ে, সোজা।
সোজাই তো এলাম এত মাইল।
আরও সোজা…যেতে হবে।
তোমার কথার মানে বুঝি না আমি। পাহাড়টা তো উঁচু ভীষণ সোজা যাব কী করে?
কারও কথার মানেই কেউ বোঝে না। দাঁড়িয়ে পড়ে বোঝার চেষ্টা করিস না। চলতে-চলতেই বোঝার চেষ্টা কর তুরু। মানে বুঝবি।
তোমার কথার মানে সত্যিই বুঝি না আমি।
যা বলি, তাইই কর। সব কথার মানে খুঁজিস না।
কী খুঁজছ তুমি এই জঙ্গলে বাপ্পা?
নিজেকে খুঁজছি।
তুমি বড় হেঁয়ালি করো। ইতিয়া বাইগা বলছিল যে, তুমি সোনার খনির খোঁজ পেয়েছ বুড়হা বুডাং পাহাড়ের কোলে।
কে বলছিল, বললি? কানে শুনি না আজকাল ভাল আমি। সাদাদাড়ি বুড়ো শিকারি বলল।
ইতিয়া বাইগা। বললামই তো!
বলল বুঝি?
হ্যাঁ। বলল, তুমি সোনা খুঁজে পেলে ধরতির সবচেয়ে বড়লোক হয়ে যাবে।
তাও বলল?
হ্যাঁ। আরও বলল..
কী বলল রে আরও?
বলল, সোনা খুঁজে পেলেই তুমি আমাকে মেরে ফেলবে, যদি আমি দেখে ফেলি। তারপর সেই সোনার গুহায় পুঁতে ফেলবে। যক করে দেবে আমাকে। অনন্তকাল ধরে আমি তোমার ধনরত্ন পাহারা দেব। যা হতে পারত তোমার, তা আমার হয়ে যাবে। যকের ধন।
বুড়ো শিকারি হেসে ফেলল। বলল, তুই একটা গাধা। যে-ধনকে পাহারা দিয়ে রাখতে হয়, সে-ধন ধনই নয়। সোনা আমি খুঁজছি ঠিকই। তবে সে-সোনার রঙ সোনালি নয়।
আবারও হেঁয়ালি? তোমার কথা বুঝি না আমি।
বোঝার দরকার নেই রে তুরু। পথ দেখে পা ফেল। এক পা এক পা করে। দেখবি, একসময় বুড়হা বুডাং পাহাড়ের চুড়াতেই পৌঁছে গেছিস না-জেনেই। সোনাও পেয়েছিস।
তুরু দাঁড়িয়ে পড়ল একটা খয়েরগাছের চিকন ছায়ায়। দুহাতের পাতা শালপাতার দোনার মতো করে মুড়ে পাহাড়ের চুড়োর দিকে চাইল।
বলল, ইরেঃ। ই কম্ম আমার দ্বারা হবে না গো। এটা কি যে-সে পাহাড়? কম কি উঁচু? আমার দ্বারা বুড়হা বুডাং-এ চড়হা হবেই না। তায় আবার কাঁধে এই ভারী রাইফেল।
বুড়ো শিকারি আবারও হাসল। বলল, চুড়োটা দেখলি বুঝি? যারা চুড়োয় পৌঁছতে চায়, তারা কখনও চুড়োর দিকে চেয়ে দেখে না।
কী যে বলো না? চুড়োর দিকে না-দেখলে চুড়োয় পৌঁছবে কী করে?
যারা এক লাফে চুড়োয় চড়তে চায় এবং কখনও তা পারে না, তারাই নীচে দাঁড়িয়ে চুড়োর দিকে চেয়ে থাকে। তুই তোর ডান পাটা এর পরে কোন্ পাথরে বা খাঁজে ফেলবি, সেইদিকে শুধু চেয়ে দ্যাখ। পায়ের পর পা ফেলে যা। একসময় দেখবি, পাহাড়চুড়ো তোর তামারঙা পায়ের নীচে লুটোচ্ছে।
জানি না কী হবে। তবে শুনলাম কথা, তোমার। কিন্তু মুক্কির লোকেরা বলল যে, তুমি বুড়ো বাঘাকে মারতে এসেছ। এদিকে বানজার বামনি বস্তির লোকেরা বলছে যে, তুমি সোনার খনি খুঁজতে এসেছ। তুমি এদিকে ওই দুইয়ের কিছুই না করে জঙ্গল তোড়পাড় করে বেড়াচ্ছ আর বলছ, তুমি নিজেকে খুঁজতে এসেছ! এটা হেঁয়ালি নয়? তুমিই বলো?
বেঁচে থাকাটা, জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি হেঁটে যাওয়াটাই একটা হেঁয়ালি তুরু। যখন বড় হবি, তখন বুঝবি। এখন এসব কথা থাক।
বড় হব? আর কত বড় হব? তিন হাত লম্বা হলাম, বাঘ মারলাম, ভালুক মারলাম, তামাক আর ধান বুনলাম, তুললাম গোলা ভরে, বছরের পর বছর। বিয়ে করব আজ বাদে কাল। আরও বড়? কত বড়? তুমি পাগল হয়েছ বুড়ো শিকারি? বাপ্পা!
না রে, হইনি। তুই যা হয়েছিস, তাতে তোর ঘর ভরেছে, পেট ভরেছে, খেত ভরেছে ধান-তামাকে, তুই লম্বা হয়েছিস, ফুলে উঠেছিস, কিন্তু বড় হোসনি।
সে কী কথা বাপ্পা! এ আবার কোন নতুন হেঁয়ালি?
হেঁয়ালি নয় তুরু। এইটেই কথা। তুই যখন বড় হবি, তখন বুঝবি। সত্যিই বুঝবি রে।
বুঝে কাজ নেই আমার। এখনও দাঁড়াও দেখি একটু। ওয়াটারবটল থেকে জল খেয়ে নিই। এতখানি কি চড়া যায় একটানা?
তুরু দাঁড়িয়ে পড়ল প্রথমে। তারপর বসল একটা পাথরে। তার কোমরে বাঁধা গামছা দিয়ে মুখের ঘাম মুছল। বলল, দেখেছ, এই শীতেও কী ঘাম!
শীতের ঘাম গরমের ঘামের চেয়ে অনেক দামি। আরামেরও রে।
কী জানি! তুমি জল খাবে তো এই নাও।
নাঃ। আমি খাব না। বলে, বুড়ো শিকারি দূরবীন দিয়ে পাহাড়ের চুড়োর দিকে দেখতেই লাগল।
পাহাড়ের উপরটা মনে হয় মালভূমির মতো। বড় বড় পা সোনারঙা; রেশমি-নরম ঘাসের উধাও মাঠ আর আফ্রিকান টিউলিপগাছে ছাওয়া। ভাল বোঝা যায় না, চুড়োয় কী আছে। আদৌ কিছু আছে কি নেই। গুহা যে আছে অনেকগুলো, তা বোঝা যায়। একেবারে চুড়োয় একটা মস্ত শিঙাল শম্বর ছবির মতো শিংয়ের ডালপালা বিছিয়ে নীল আকাশের পটভূমিতে কালোরঙা পুতুল-শম্বরের মতো একটা চ্যাটালো পাথরের উপর দাঁড়িয়ে আছে। তুরুর মনে হল, পৃথিবী বোধহয় ঠিক ওইখানেই গিয়ে শেষ হয়েছে। দেবতারা সব যে ওইখান থেকেই মেঘের গাড়িতে চড়ে দেবলোকের দিকে উড়ে যান, সে-বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
তুরু শূন্য চোখে তাকিয়ে থাকল ওইদিকে। অনেকক্ষণ। তারপর মুখ ঘুরিয়ে একবার বুড়োর মুখে তাকাল।
বুড়ো একদৃষ্টে তাকিয়েই ছিল পাহাড়চুড়োর দিকে। তার সাদা দাড়ি উড়ছে উত্তুরে হাওয়ায় কাঁপাসতুলোর মতো। তার ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক হাসি।
সে-হাসির কোনও ব্যাখ্যা হয় না।
তুরু বলল, এতক্ষণ ধরে অত দেখছ কী? শম্বরটা রাইফেলের রেঞ্জের অনেক বাইরে আছে। তা ছাড়া ওকে মারলে তো ধ্বপধপিয়ে পড়বে নীচের খাদেই। শেয়াল হায়নাতে বা চিতাতে খেয়ে যাবে। আমার বা বস্তির লোকদের কাজে লাগবে, না ঘন্টা। বলো তো আমি আরও একটু এগিয়ে গিয়ে ধড়কে দিই। কড়াক পিং। এমন করে, যাতে গুলি খেয়ে নীচে না পড়ে। ওখানেই থাকে।
বুড়ো তবু কথা বলল না। দূরবীন চোখে লাগিয়ে এদিক থেকে ওদিক–একশো আশি ডিগ্রি দেখল। একবার নয়। বারবার।
তুরু মনে মনে ভাবল, সত্যিই পাগল। পাগলই হয়ে গেছে। আসলে বুড়ো হলে সব মানুষই একটু শিশু-শিশু, খ্যাপাটে, পাগলাটে হয়। সাদাদাড়ি শিকারি বুঝি বদ্ধ পাগলই হয়ে গেছে। কী কুক্ষণে যে এবারে এল পাগলের সঙ্গে! না এলেই ছিল ভাল।
এবার অধৈর্য গলায় তুরু বলল, দেখছ কী বাপ্পা? পেলে, সোনার খনি? এগোবে তো এগোও।
বুড়ো অস্ফুটে বলল, হল্লা করিসনি ছোঁওড়া। দেখছি।
আরে, দেখছ যে, সে তো আমি নিজেও দেখছি। দেখছটা কী তা তো বলবে।
জঙ্গল।
সেও তো আমিও দেখছি। অত করে দেখার কী আছে? জঙ্গল তো জন্মাবার পর থেকেই দেখছি। দেখে দেখে তো পচে গেল চোখ।
আছে রে তুরু, আছে। পরতের পর পরত। কত সব পাথর, পাথরের বুকে বুকে মাটি, কিচুলরাজার কত যত্ন করে বয়ে-আনা মাটি, কত নাম-না-জানা পাখিদের ঠোঁটে করে বয়ে-আনা কত-রঙা বীজ তাতে পড়েছিল যুগ-যুগ ধরে। তাই তো ঘাস জন্মাল। তারপর ঝোপঝাড়। ফুলদাওয়াই, পুটুস, কেলাউন্দা, গিলিরি, না-নউরিয়া, পোকামাকড়, লাল সবুজ নীল। প্রজাপতি, রামধনুরঙা পাখি, চিকন পালকের, মেঠো ইঁদুর–নতুন চালের গন্ধে-ভরা যাদের সাদা শরীর, বর্ণালি সাপ, যারা ধীর স্বপ্নের মতো চারিয়ে যায় বনের গভীরে, কোটরে; ফাঁকে-ফোকরে। হরিণ, চিতা, চিল। তারও পর বড়-বড় সব মহীরুহ এল। সময় লাগল কত। তোর বড় হয়ে ওঠার চেয়েও কত্ব কত্ব বেশি সময় বল? জঙ্গল কী অত সহজে হয়েছিল রে তুরু যে, এত সহজেই দেখা ফুরিয়ে যাবে?
কোনও জানোয়ার দেখেছ কি বাপ্পা তুমি ওই জঙ্গলে? শম্বরটা ছাড়া? বুড়হা-বাঘা কি? দেখলে বোলো। তোমার বকবকানি বুঝি না আমি। বুড়হা-বাঘার সঙ্গে মোলাকাত হলে ঝামেলা মেটে।
নাঃ। সে দেখা দেয়নি। দেবে না সহজে। সেও তো আমারই মতো।
কী রকম?
সেও তো হেঁয়ালিই। গুমোর-ভরা বুড়ো এক আমারই মতো। দুজনে দুজনকেই খুঁজছি। দেখা হয়ে গেলে তো মিটেই গেল। তবে, তাকে খুঁজতে হবে না। কোনও সন্ধের মুখে সে আপনিই এসে দাঁড়াবে মুখোমুখি। তখন…
তখন কী?
বোঝাপড়া।
কী?
শোধবোধ।
তবে? এত কী খুঁজছ তুমি বাপ্পা? যদি জানোই যে, শুভদৃষ্টি আপসেই হয়ে যাবে কোনওদিন, তবে এত তকলিফ কিসের? তবুও কী খুঁজছ এখনও?
নিজেকে। বলেইছি তো।
নিজেকে? নিজে তো এই দাঁড়িয়েই আছ জলজ্যান্ত আমার সামনে। তোমার পাইপ থেকে ধোঁয়া বেরুচ্ছে, তোমার জার্কিনের গন্ধ পাচ্ছি নাকে। নিজেকে খুঁজছ তুমি, দূরে? অত দূরে? মানে?
ঠিক। তুরু! নিজেকে নিজের থেকে বাইরে অনেক দূরে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে তার উপরে আলো ফেলে তাকে না দেখলে দেখাই হয় না, জানা হয় না। বিশ্বাস কর আর না-ই কর, নিজেকেই খুঁজছি আমি। সকলেই হয়তো খোঁজে। চুরি করে। কেউ পায়, কেউ পায় না খুঁজে।
মরোগে যাও। তুমি কি ওই দূরের শম্বরটা, যেটাকে পুতুলের মতো দেখাচ্ছে, তার মধ্যে ঢুকে গেছ? তুমি কি দারহা? উইক্কে বা সাইআম্-এর শক্তি কি ভর করেছে তোমার শরীরে?
না, না, ওসব নয়। সব কথা যে তোর বোঝার নয় রে। এত প্রশ্ন করিস কেন তুরু? তার চেয়ে তুই জল খা।
খেয়েছি।
খেয়েছিস? তো আরও খা।
খেয়েছি।
তো কফি খা। দূরবীন থেকে চোখ না নামিয়েই বলল, সাদা-দাড়ির বুড়ো শিকারি।
কফি নেই। ফুরিয়ে গেছে।
তবে হাওয়া খা, রোদ খা, জীবন খা, মরণ খা, যা খুশি কর তুই, শুধু এত কথা বলিস না, প্রশ্ন করিস না। জঙ্গলে এসে কথা বলিস না তুরু, শিকার কর, আর না-ই কর। জঙ্গল যে যুগযুগান্ত থেকে অনেক কথাই জমিয়ে রেখেছে তার বুকের মধ্যে। বলার জন্যে। অনেক দীর্ঘশ্বাস, অনেক হাসি, অনেক গান, কান্নাও অনেক। অনেক রঙ আর গন্ধ বুনে বুনে বাস্তারের ঠাসবুনোন বাইসন-হর্ন মারিয়াদের কম্বলের মতো মেলে রেখেছে বনস্থলীতে। তুই কী বোকা রে তুরু! এতদিন হল জঙ্গলে আসছিস আর জঙ্গলকে দু চোখ মেলে, দু কান খুলে তোর সব বোধবুদ্ধি দিয়ে একবার অনুভবও করলি না? তুই ব্যাটা এক নম্বরের বুদ্ধুই রয়ে গেলি। বুদ্ধু নাম্বার ওয়ান। তোর বাবা অন্য রকম ছিল।
আমি আমার মতো হতে চাই। অন্য কারও মতে, এমনকী বাবার মতোও হতে চাই না। আমি না হয় বুদ্ধু, জঙ্গল দেখলাম না বলে। কিন্তু তুমিও কম বুদ্ধু নও বাপ্পা।
বুড়ো দূরবীন নামিয়ে দিল। পেটের কাছে দুলতে লাগল সেটা। পা ফেলল সামনে। একটা পাহাড়ি বাজ, ভয় পেয়ে, ভুল করে ঝোপঝাড়ের আলোছায়ার আশ্রয় ছেড়ে উপরের নীল, বেআবরু আকাশে হঠাৎ উড়ে-যাওয়া একটা কালি-তিতিরকে ধাওয়া করে ধরে ফেলল। মওত। জঙ্গলের নিয়ম। জীবনেরই মতো। ময়ূর, বনের ছায়াচ্ছন্ন গভীরে শঙ্খচূড় সাপের উদ্ধত ফণার দর্পচূর্ণ করে তাকে ধরাশায়ী করে বিজয়োল্লাসে চেঁচিয়ে উঠল হঠাৎ কেঁয়া কেঁয়া কেঁয়া। ময়ুর বড় গর্বিত পাখি। রূপ আর গুণের গায়ে গর্ব লেগে থাকে। একটা কপারস্মিথ পাখি ঘনান্ধকার শীতার্ত উপত্যকা থেকে ডাকতে লাগল টাকু-টাকু-টাকু-টাকু। টাকু! টাকু!
