নিনিকুমারীর বাঘ (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

পাঁচ

আমরা যখন চা খাচ্ছি তখন খচর-মচর করে বুট-পায়ে রুট-মার্চের শব্দ শুনতে পেলাম। ডাবল্-ফাইলে ওরা হেঁটে আসছে কাঁচা লাল মাটির পথ ধরে। দূর থেকে লম্বা খাকিরঙা কোনো প্রাগৈতিহাসিক অজগর সাপের মত মনে হচ্ছে সেই অশেষ সারিকে। বুটের ঘায়ে ঘায়ে উড়ছে লাল ধুলো। কমাণ্ডারের নাম বলভদ্র নায়েক। সপ্রতিভ, উৎসাহী, সাহসী ভদ্রলোক। সুদর্শনও। প্রথম আলাপেই পরিষ্কার বাংলায় ঋজুদাকে বললেন, আপনাকে নিয়ে লেখা অনেক বই পড়েছি বাংলায়। ঋজু বোসকে কে না চেনে?

ঋজুদাও পরিষ্কার ওড়িয়াতে বলভদ্রবাবুকে বললেন, জয়ন্ত মহাপাত্রর সঙ্গে আমার আলাপ আছে। উৎকলমণি গোপবন্ধুর আমি একজন বড় ভক্ত এবং বর্তমান ওড়িয়া সাহিত্য ও কবিতার কিছু খোঁজ আমিও রাখি।

বলভদ্রবাবু খুশি হলেন। বললেন, আমি আপনার সঙ্গে বাংলায় কথা বলি, আর আপনি বলুন ওড়িয়াতে। দুজনেরই প্র্যাকটিস হবে।

ভাল কথা। ঋজুদা বলল। তারপর বলভদ্রবাবুকে বিস্তারিত বোঝাল প্ল্যানটা। কথা শুনে মনে হল, উনিও শিকার করেছেন একসময়। পুরো ব্যাপারটা বুঝে নিলেন আমাদের সঙ্গে চা খেতে খেতেই।

ঋজুদা বলল, আমাদের জিপটা আজ এখানেই থাকবে। গতকালই বিশ্বল সাহেবের লোক রাতের বেলা জিপে করে সাম্বপানিতে এসে খবর দিয়ে গেছে যেন আজ কেউ শিকার-গড় এবং সাম্বপানির আশপাশের জঙ্গলে পাহাড়ে কোনো কাজেই না যায়। গ্রামেই যেন থাকে। যদি যায়, তাহলে নিনিকুমারীর বাঘের ভয় ছাড়াও পুলিসের রাইফেলের গুলিও লেগে যাবার আশঙ্কা আছে।

আমরা সকলে পায়ে হেঁটে রওনা হলাম। ঋজুদা ভটকাইকে সঙ্গে নিয়ে কিছুটা পথ আমাদের সঙ্গে গিয়ে জঙ্গলে ঢুকে গেল, পাহাড়ের উৎরাই ভেঙে নিচে নদীতে গিয়ে পৌঁছবে বলে। যাবার সময় ঋজুদা তার অ্যালার্ম-দেওয়া রোলেক্স হাত ঘড়িটা দেখিয়ে বলভদ্রবাবু আর আমাকে বলল, ঠিক দশটায় সময়ে আপনারা গুলি করতে করতে বিটিং আরম্ভ করবেন। দশটার আমি পজিশন নিয়ে নিতে পারব আশা করি নদীর ওপাশে।

গুড হান্টিং, বলে ঋজুদা নেমে গেল ডানদিকে, নিচে।

ভটকাই বাঁ হাত তুলে বিগলিত মুখে বলল, ওকে! বেস্ট অফ লাক্ রুদ্র রায়। হড়-বড় কোরো না। মেজাজ ও বুদ্ধি ঠাণ্ডা রেখ।

আমি চাপা গলায় বললাম, ফাজিল।

আমরা রওনা যখন হলাম তখন সাড়ে সাতটা বাজে। শিকার-গড়ের দুর্গের বেশ খানিকটা পেছনে, সাম্বপানি গ্রাম ছাড়িয়ে একটা কল্পিত লাইন বরাবর রাইফেলধারী পুলিসেরা ছড়িয়ে গেল। তাদের প্রত্যেকের হাতে সেমি-অটোমেটিক রাইফেল। হ্যাভারস্যাকে লোড-করা গোটা ছয়েক অতিরিক্ত ম্যাগাজিন। অতখানি পথ যদি গুলি করতে করতে নামতে হয় তাহলে অনেক গুলি তো লাগবেই!

সাড়ে নটা নাগাদ স্টার্টিং-পয়েন্টে পৌঁছে গিয়ে পুলিসদের বিশ্রাম নিতে বলে বলভদ্রবাবু একটা বড় পাথরের ওপর বসে পানের ডিবেটা নিজের হ্যাভারস্যাক থেকে বের করে বললেন, চলবে নাকি?

আমি খাই না। কিন্তু উত্তেজনার মুহূর্তে অনেকেই অনেক কিছু করে। বলভদ্রবাবু কখন যে ভালবেসে একটি গুণ্ডিমোহিনী আমার হাতে তুলে দিয়েছেন তা খেয়াল না করেই মুখে পুরে দিয়েছি। চমৎকার লাগছে চিবোতে। প্রথম ঢোক গিলে ফেলেছি ভাল করে বোঝার আগে। এবং তারপরই দারুণ মাথা ঘুরতে শুরু করায় সব ফেলে দিলাম থুঃ থুঃ করে।

বলভদ্রবাবু ওয়াটার বটল থেকে জল খাওয়ালেন। বললেন, আগে তো বলবেন যে গুণ্ডি খান না। আর গুণ্ডি বা জর্দা না খেলে পান খেয়ে লাভই বা কী? ঘাসপাতা খেলেই হয়।

আমি চুপ। রাইফেলটা পাশে রেখে শুয়ে পড়লাম। ওপরের গাছে বড়কি-ধনেশ ডাকছে। কুচিলা-খাঁই। হ্যাঁক্কো- হ্যাঁক্কো হক্কো-হক্কো। বড় আওয়াজ করে পাখিগুলো। যেমন করে জলহস্তীরা, আফ্রিকায়। জন্তু-জানোয়ার পাখ-পাখালির মধ্যেও কিছু কিছু প্রজাতি বড় বাচাল হয়। ঝিরঝির করে হাওয়া দিচ্ছে। দূরে একটি ক্রো-ফেজেন্ট ডাকছে। মাথার ওপর দিয়ে শনশন্ আওয়াজ করে উড়ে গেল একঝাঁক হরিয়াল কোনো ফলভারাবনত বট বা অশ্বত্থ গাছের দিকে। কাঠঠোকরা কাঠ ঠুকছে। বড় শান্তি এখন চারিদিকে। দশটা বাজলেই এই শান্তি বিঘ্নিত হবে অগণ্য রাইফেলের বজ্রনির্ঘোষে।

দশটা বাজতে দু মিনিট বাকি। আমি উঠে বসলাম। মাথাটা তখনও ঘুরছিল। বললাম, আমি আপনার কিছুটা পেছনে থাকব। যদি এই অসমসাহসী বাঘ এত রাইফেলের গুলির শব্দ অগ্রাহ্য করে বিটারদের লাইনের উল্টোদিকে আসে তখন তার মোকাবিলা করতে পারব।

মনে মনে বললাম, এত রাইফেলধারী পুলিসের সামনে সামনে গিয়ে তাদের গুলি খেয়ে মরতে আদৌ রাজি নই আমি।

বলভদ্রবাবু বললেন, ঠিক আছে।

দশটা বাজতেই যেন কুরুক্ষেত্রর যুদ্ধ শুরু হল। সব পুলিস বলভদ্রবাবুর সঙ্গে থেমে থেমে গুলি করতে করতে এগিয়ে যেতে লাগল ঝোপ-ঝাড় ভেঙে। সমস্ত জঙ্গল-পাহাড় সচকিত হয়ে উঠল। অসংখ্য প্রজাতির অগণ্য পাখি, হনুমান ও হরিণের ডাকে ও দ্রুত দৌড়োদৌড়ির শব্দে বন সরগরম হয়ে উঠল। আমি রাইফেল রেডি পজিশনে ধরে ওদের পঁচিশ-তিরিশ হাত পেছনে। পৌনে এগারটার সময়, শিকার-গড় পেরিয়ে পুলিসের বেষ্টনী পাহাড় ধরে নামতে লাগল। আমি একবার গড়ের নিচের সেই ছায়াচ্ছন্ন গুহায় সাবধানে গিয়ে পৌঁছলাম। নাঃ। বাঘ কাল রাতে এখানে আসেনি। তারপর গড়ের ভাঙা দেওয়াল টপকে নহবতখানার কাছে পৌঁছে খুবই সাবধানে ভেতরে উঁকি দিলাম। বাঘের টাটকা পায়ের দাগ আছে এখানে। রাতে শুয়ে থাকার দাগও স্পষ্ট ধুলোর ওপরে। পুলিসের গুলির শব্দ শুনেই বাঘ নহবতখানা ছেড়ে চত্বর পেরিয়ে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে গেছে। আজ কিছু একটা ঘটবে। ঋজুদার অনুমান পুরোপুরি ঠিক। বাঘ যদি নদী পেরোতে যায় তবে আজই তার জীবনের শেষ দিন।

গতি বাড়িয়ে পুলিসদের ধরবার চেষ্টা করলাম। ঋজুদার এক গুলিতে নিনিকুমারীর বাঘ যদি ধরাশায়ী না হয় তখন বিটারদের লাইন ক্রস করে সে আবার শিকার-গড়েই ফিরে যাবার চেষ্টা করবে হয়ত। আহত মানুষ যেমন বাড়ি ফেরার জন্যে আকুলি-বিকুলি করে, আহত হিংস্র জানোয়ারও মরার সময় মরতে চায় তার প্রিয় বিশ্রামস্থলে, গুহায় বা অন্য কোথাও ফিরে গিয়েই। তাদের ঠিকানা থাকে।

বেলা তখন ঠিক বারোটা, তখন পুলিসের লাইন এবং আমিও, নদীর কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। ঋজুদাকে বা বাঘকেও কোথাওই দেখা যাচ্ছে না। সম্ভবত ঋজুদা নদীর পারের কতগুলো বড় পাথরের আড়ালে বসে আছে। ভটকাই কোথায় কে জানে। আমার ভয় হচ্ছে আনাড়ি ভটকাই, ঋজুদা গুলি করার আগে বাঘকে দেখতে পেয়ে তার বন্দুক দিয়ে গুলি না করে দেয়। তাহলে যে কী হবে তা ঈশ্বরই জানেন।

নদী যখন আর মাত্র পঞ্চাশ গজ দূরে তখন আমি বলভদ্রবাবুকে হাত দিয়ে ইশারা করে থামতে বললাম।

ইনি রুমাল নেড়ে, সিজ-ফায়ারের নির্দেশ দিলেন। প্রায় নিরবচ্ছিন্ন এবং শয়ে-শয়ে গুলির শব্দ হঠাৎ থেমে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই মৃত্যুর মত নিস্তব্ধতা নেমে এল জঙ্গলে, পাহাড়ে, নদীতে। নদীর বয়ে-যাওয়ার কুলকুলানি শব্দ হঠাৎ স্পষ্ট হলো একটা মাছরাঙার ভয়-পাওয়া কর্কশ চিৎকার দূরে চলে যাওয়ার পর নদীর কুলকুল আওয়াজই একমাত্র শব্দ হয়ে কানে আসতে লাগল। নিনিকুমারীর বাঘ নদী আর আমাদের বেষ্টনীর মধ্যে এমন কোনো আড়ালে লুকিয়ে আছে যে, আমরা তাকে দেখতে পাচ্ছি না। ওপার থেকে ঋজুদা কি তাকে দেখতে পাচ্ছে? এইসব ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ লালচে উল্কার মত বাঘ একটা ঝাঁকড়া তেঁতুল গাছের মোটা গুঁড়ির আড়াল ছেড়ে দুলাফে নদীর জলে গিয়ে পড়ল এবং সে আরেকটি লাফেই নদীর ওপারের জঙ্গলে গিয়ে পৌঁছবে। বাঘ জলে পড়তেই গদ্দাম করে বন্দুকের আওয়াজ হল ওপার থেকে। রাইফেলের নয়, বন্দুকের আওয়াজ। ভয়ার্ত চোখে চমকে তাকিয়ে দেখি, ভটকাই একটি সেগুন গাছের ডালে বসে ফোটাকার্তুজের জায়গায় অন্য কার্তুজ ভরছে। বাঘ ভটকাইকে দেখেছিল বোধহয়। তাই নদী পেরচ্ছিল না।

এত্ত রাগ হল যে কী বলব! বাঘের গায়ে গুলি লেগেছে কিনা বোঝা গেল না, কিন্তু বাঘ মুহূর্তের মধ্যে কোমরে এক মোচড় দিয়ে জলের মধ্যে জল-ছিটকে ঘুরে গেল আমাদের দিকে। এবং সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় এই যে, ঋজুদা কোথায় আছে বোঝা গেল না এবং কোনো গুলিও হল না ঋজুদার রাইফেল থেকে। বাঘটা সটান লাফিয়ে উঠল ওপরে গোল হয়ে ধনুকের মত। বুঝলাম পেটে গুলি লেগেছে। বাঘ জলে পড়তেই নদীর জল ছিটকাল। ঝিকমিক করে উঠল জল সকালের রোদে হাজার হীরের মত।

বাঘ জলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভেবেছিলাম ঋজুদা গুলি করবে। ঋজুদা কোথায় আছে তা না জেনে এদিক থেকে গুলিও করতে পারছি না আমি। তাছাড়া বাঘ মারার দায়িত্ব আমাকে দেওয়া হয়েছে, বাঘ যদি বিটার্স লাইন ভাঙে, তবেই।

এবারে বাঘ সংহার মূর্তিতে আমাদের দিকে তেড়ে এল রক্তে জল লাল করে। না গুলি করল ভটকাই, না ঋজুদা। যে-কোনো স্বাভাবিক বাঘ হলে সে ঋজুদার অবস্থান লক্ষ করে আক্রমণ করত।

বাঘটা তার আশ্রয়ের দিকে ফিরে পালিয়ে গিয়ে বাঁচার শেষ চেষ্টা করল। পুলিসেরা কেউই শিকারি নয়। ওদের বাঁচাবার জন্যে আমি বাঘের দিকে দৌড়ে এগিয়ে গেলাম হাত দশেক। তারপর দাঁড়িয়ে পড়ে দ্রুত দৌড়ে আসা বাঘ আমার কাছাকাছি আসতেই তার বুক লক্ষ্য করে গুলি করলাম। আমার গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হল না। কিন্তু বাঘ আর এক লাফ মারল। এবারে এমন প্রলয়ঙ্করী গর্জন করল সে, যে মনে হল গাছ পড়ে যাবে। সেই গর্জনে হাত-পা পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে যায়। আমার দু চোখের দৃষ্টি, মস্তিষ্কের সব ভাবনা আচ্ছন্ন করে বাঘ মুহূর্তের মধ্যে উড়ে এল আমার ওপরে। দ্বিতীয় গুলিটা সে শূন্যে থাকতেই করলাম, কিন্তু বাঘ এসেই পড়ল আমার ওপরে। পড়ে গেলাম। ওপরে বাঘ। আমার ডান বাহুতে কে যেন হাজার মন হাতুড়ি দিয়ে বাড়ি মারল একটা। পরক্ষণেই কানের তালা ফাটিয়ে দিয়ে একটা রাইফেলের গুলি হল আমার বাঁ কানের কাছে ছ ইঞ্চি পাশে।

তারপর আমার আর কিছুই মনে নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *