নিনিকুমারীর বাঘ (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

চার

বন্দুকধারী লোকটার নাম নন্দ। বয়স হবে চল্লিশ-টল্লিশ। জামাকাপড় দেখলে মনে হয় বেশ অবস্থাপন্ন। মানে, যুধিষ্ঠির বা সুঝানি গ্রামের অন্যদের তুলনায়। তাছাড়া যার নিজের বন্দুক আছে, সে গাদা বন্দুকই হোক আর যাই হোক, সুঝানি গ্রামে সে যে বড়লোক, সে বিষয়ে অন্য কারও কোনও সন্দেহ ছিল না।

লোকটা কিন্তু আমাদের খাওয়াল না। যে লোকটা আমাদের তার বাড়িতে নিয়ে গিয়ে মাটির ঘরে পাটি পেতে বসতে দিয়ে ঝকঝকে করে মাজা পেতলের থালাতে গরম গরম লাল ঢেঁকিছাঁটা চালের ভাত, কাঁচালঙ্কা কালো-জিরে দিয়ে রাঁধা মসুরের ডাল, কাঁচা পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা আর কাঁচকলা ভাজা আর কলাই ডালের বড়া ভাজা দিয়ে যত্ন করে খাওয়াল সে কিন্তু সত্যিই খুব গরিব। নন্দরা পয়সা জমাতে জানে। একটা টাকা বাঁচানো মানেই একটা টাকা রোজগার করা। বড়লোকদের মধ্যে অধিকাংশই এই রহস্য জানে এবং মানে। যে খরচ করে এবং নিজের স্বার্থ ছাড়াই খরচ করে, সেই মানুষের পক্ষে বড়লোক হওয়া বড়ই কঠিন।

ঘুমটা বেশ ভালই হয়েছিল। ঘড়িতে যখন সাড়ে তিনটে বাজে তখন বালাবাবু তুলে দিলেন আমাকে। পেতলের ঘটিতে করে চা বানাল কেউ আদা ও এলাচ দিয়ে। সেই চা ভাগাভাগি করে খেয়ে রওনা হলাম আমরা।

নন্দ মহান্তিও সঙ্গে চলেছে তার গাদা বন্দুক এবং একটা পাঁচ ব্যাটারির টর্চ সঙ্গে নিয়ে। ঝর্ণা যেখানে সর্ষেক্ষেতে শুরু সেখানে মিটকুনিয়া গাছে একটা মাচা বাঁধিয়েছে সে। ওখানে পৌঁছে মাচাটা দেখে আমার পছন্দ হল না। জমি থেকে মাত্র দশ ফুট মত ওপরে দুটো বড় ডালের সংযোগস্থলে একটা বাঁশের মোড়াকে শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। যুধিষ্ঠিরও সঙ্গে বসবে পিতৃহন্তার ওপরে প্রতিশোধ নিতে। আমি বারণ করা সত্ত্বেও শোনেনি কিছুতেই। সে নন্দ মহান্তির থেকে একটু পেছনের ডালে নিজেকে ডালের সঙ্গে গামছায় বেঁধে নিয়ে বসবে এবং নন্দ মহান্তির গাদা বন্দুকের ওপরে আলো ফেলবে। যুধিষ্ঠিরের বাড়িতেও বার তিনেক স্টেজ-রিহার্সাল দিয়ে নিয়েছে তারা। ওরা দুজন পরে মাচায় বসবে। তার আগে বালাবাবু, গ্রামের একজন লোক আর যার বাড়ি আমরা খেলাম সে ঝর্ণাতে নেমে এল আমাদের কুসুম গাছের মাচা অবধি পৌঁছে দিতে। বালাবাবু ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের লোক। মাচাটা বেশ পোক্ত করেই বেঁধেছেন। চারটে কাঠের তক্তা লতা দিয়ে দুটো বড় ডালের সংযোগস্থলে বাঁধা হয়েছে।

আমরা তাড়াতাড়ি উঠে পড়লাম। ভটকাই যেদিকে খাদ, সেদিকে বসবে। আমি যেদিকে গাছের ডাল পাহাড়ের দিকে, সেদিক। আমার রাইফেলের সঙ্গে ছোট টর্চ ফিট করা আছে ম্যাগাজিনের ওপরে। বুক পকেটে ব্যাটারি থাকে। মোটামুটি নিশানা হয়ে গেলে রাইফেল-ধরা বাঁ হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে টর্চের লাইটিং-মেকানিজম্ ছুঁলেই ব্যাকসাইট ও ফ্রন্ট-সাইটে আলো পড়বে। পুরো ব্যারেলের ওপরেই পড়বে আলো। ফ্রন্ট-সাইটে রেডিয়াম পয়েন্ট আছে। অন্ধকারেও জ্বলে। আলো পেলে তো জ্বলবেই। তারার আলো এবং চাঁদের আলোতে অসুবিধে নেই। এই রাইফেল দিয়ে গুলি করতে খুবই সুবিধে।

ভটকাইয়ের হাতে যে দোনলা বন্দুক তার সঙ্গে লাগানো ক্ল্যাম্পে তিন ব্যাটারির টর্চ ফিট করা আছে। উইনচেস্টারের টর্চ। এছাড়াও ব্যাগে আছে একটা পাঁচ ব্যাটারির টর্চ। ঐ ব্যাগ দিনে বা রাতে যখনই আমরা শিকারে বেরুই না কেন সবসময়ই সঙ্গে যায়। আর জলের বোতল। ভটকাই মাচায় কতখানি অনড় হয়ে যে বসতে হয় সে সম্বন্ধে অবহিত নয় বলেই জলের বোতল আনা সত্ত্বেও মাচায় বসে জল খাওয়া যে মানা সে কথা ওকে বলেছি। ঘুম ভাঙার পর নন্দ মহান্তিই ওর সে-অ্যাপয়েন্টেড মাস্টারমশাই বনে গিয়ে শিকারের এবং বিশেষ করে মাচানে বসার অ-আ-ক-খ সম্বন্ধে বিশদ জ্ঞান দিয়ে দিয়েছে।

মাচাতে আমাদের বসিয়ে দিয়ে বালাবাবুরা ফিরে গেছেন দুজনে। হল্লা-গুল্লা করে নয়, নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলতে বলতে। রাতটা বালাবাবু ঐ লোকটার বাড়িতেই কাটাবেন। মানুষটা ভারী ভাল। নাম গগনবিহারী। বিকেল বিকেল এক হাঁড়ি মুগডালের খিচুড়িও রেঁধে রেখেছে তার লাজুক বৌ। বালাবাবু এবং তারা তো খাবেই, যদি ফিরে যেতে পারি তবে আমরাও ঐ খেয়েই ঘুমোব। মাচাটার মুখ হয়েছে ঝর্ণার যেখানে শুরু, সর্ষেক্ষেতের মাঝে, সেদিকে। কিন্তু ব্যাপারটা আমার অস্বস্তিকর লেগেছে। ঐ দিকে মুখ করে না বসে যুধিষ্ঠিরের বাবার মৃতদেহ যেখানে আছে সেদিকে মুখ করে বসেছি। ঋজুদা বলেছিল চিতাটার ডান দিক দিয়েই আসার সম্ভাবনা বেশি। আমারও তাই মনে হয়েছিল। ডানদিকে আমি নজর রাখব। ভটকাইকে বলেছি বাঁ দিকটা দেখতে। ঝর্ণার বুক বেয়ে চড়াই উঠে আসতে হবে তাকে বাঁদিক দিয়ে এলে। আর ডানদিক দিয়ে এলে উতরাই নেমে। কিন্তু ডানদিক দিয়ে এলে ঝর্ণার ফাটলে পৌঁছবার আগেই তো নন্দ মহান্তির গাদা-বন্দুকের গুলি খাবে সে। এবং গুলি তার গায়ে লাগুক। আর নাই লাগুক গুলির আওয়াজ হলে পর চিতা যে এ রাতের মত এ তল্লাটে থাকবে তা মনে হয় না।

ভটকাইকে আমি বারবার বলে দিয়েছি যে ভুলেও যেন সে গুলি না করে। অনেকদিন দর্শক থাকতে হয়। তারপরই না হয় শিকারি হবে!

আলো আস্তে আস্তে পড়ে আসছে। পাহাড়ের গায়ে এবং পাহাড়তলি থেকে ময়ূর, বনমুরগি এবং নানারকম পাখি দিনশেষের ডাক ডাকছে। সুঝানি গ্রাম থেকে গাইবলদের, পোষা মোরগের এবং কুকুরের ডাক ভেসে আসছে। বাঁদিকে, ভটকাই যেদিকে বসেছে; গাছপালার ফাঁক-ফোঁকর দিয়ে অনেক দূরে এবং নিচে নদীর একটা বাঁকের একাংশ দেখা যাচ্ছে শুধু।

ঋজুদা এখন কোথায় কে জানে! সারাদিন কী করল? কী খেল? নিনিকুমারীর বাঘের দেখা পেল কিনা কে জানে? ঋজুদাকে এবারের মত সিরিয়াস এবং আপসেট হতে কখনও দেখিনি আগে। নাকি, না-বেরিয়ে-বেরিয়ে ঋজুদার যোগ্যতা এবং দক্ষতা কমে গেছে?

একটা ব্যাপারে খুব ভাল লাগছে। আমাদের কুসুম গাছের থেকে পঞ্চাশ গজের মধ্যে একটা মস্ত তেঁতুল গাছ। তাতে বাঁদরে ভর্তি। আমরা যখন মাচায় চড়তে আসি তখন তারা আমাদের দেখে মহা লাফালাফি আর ডাকাডাকি শুরু করে দিয়েছিল। কিন্তু এখন কুসুম গাছের ঘন পাতার আড়ালে অলিভ-গ্রীন রঙের জামা পরে অনড় হয়ে বসে থাকাতে এবং বালাবাবুর গগনবিহারীকে নিয়ে চলে যাওয়া লক্ষ করে তারা এখন চুপ। খুব ভাল হয়েছে। ঝর্ণা বেয়ে চিতা যদি ওপরে উঠে আসে তবে বাঁদরদের নজর এড়িয়ে আসতে পারবে না। তাছাড়া বাঁদরদের আর গৃহপালিত কুকুরদের সবচেয়ে বড় শত্রু হচ্ছে চিতা। চিতাটা যদি কোনো কারণে যুধিষ্ঠিরের বাড়ির দিক দিয়ে আসে তবে গ্রামের কুকুরেরা হয়ত তাকে দেখলেও দেখতে পারে। বা গন্ধ পেতে পারে। কিন্তু মানুষ ধরার পরও সেই মানুষের বাড়ি বেয়ে সে যে কেন আসবে তা জানি না। তাছাড়া দশরথকে মারার পর এতদূর বয়ে নিয়ে এসেও একটুকরো মাংসও যে কেন খেল না এটা ভেবেই ভারী অবাক লাগছে।

একদল হরিয়াল একটু আগে শন্ শন্ করে উড়ে গেল পাহাড়ের মাথার ওপর দিকে। তাদের ঘন সবুজ উড়াল ডানাগুলো যেন মুছে দিল তখনও যেটুকু আলো বাকি ছিল পশ্চিমের আকাশে। পুরো অন্ধকার তখনও হয়নি বাইরে। তবে আমরা পাহাড়ের ফাটলের মধ্যে ঝর্ণার খোলের দহতে বসে আমি এবং কুসুম গাছের ছায়ায়, তাই অন্ধকার নেমে এসেছে এখানে।

মিনিট পনেরো যেতে না যেতেই পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে গেল। একটা তক্ষক ডাকতে লাগল আমাদের পেছন থেকে। তার দোসর সাড়া দিয়ে বলল, ঠিক! ঠিক! ঠিক! সুঝানি গ্রামের মধ্যে কোনো শিশু অতর্কিতে জোর গলায় কেঁদে উঠল। আর মা তাড়াতাড়ি তার মুখ চেপে ধরে কান্না বন্ধ করল বলে মনে হল। যেখানে দিন-দুপুরেই প্রাণ-সংশয় হয় সেখানে রাতে তো কথাই নেই।

সাতটা বাজল। গাছের ডালের ফাঁক দিয়ে আকাশভরা তারা দেখা যাচ্ছে। নানারকম মিশ্র গন্ধ উঠছে রাতের বনের গা থেকে। বাদুড় উড়ে গেল মাথার ওপর দিয়ে ডানায় সপ সপ করে। ঝিঁঝিঁর ডাক ভেসে আসতে লাগল একটানা পাহাড়তলি থেকে। পাহাড়তলির দিকে তাকিয়েছি, ঠিক সেই সময় বাঁদরগুলো সমস্বরে ডেকে উঠল। ডালে ডালে ঝাঁপাঝাঁপি করতে লাগল পাগলের মতো। খুব আস্তে আস্তে বড় টর্চটা দেখিয়ে দিলাম আমি ভটকাইকে। বলা আছে ওকে যে আমি ওর হাঁটুতে আঙুল ছোঁয়ালে ও টর্চটা জ্বালাবে। যদি আদৌ দরকার হয়। আর ও যদি কিছু দেখে, কোনও নড়াচড়া, অন্ধকারের মধ্যে অন্ধকারতর কোনও স্তূপ তবে ও-ও যেন আমার হাঁটুতে আঙুল ছোঁয়ায়।

উৎকর্ণ উন্মুখ হয়ে ঐ দিকে খুব আস্তে আস্তে ঘাড় ঘোরালাম আমি। না, দেখা কিছুই যাচ্ছে না। সব অন্ধকার। কোনও শব্দও নেই। বাঁদরদের চিৎকার চেঁচামেচি কিন্তু আরও জোর হয়েছে। এমন সময় পাহাড়তলি থেকে একটি কোটরা হরিণ ডেকে উঠল ভয় পেয়ে। খুব জোরে। ব্বাক্ ব্বাক্ ব্বাক্ করে।

হঠাৎই একটা অদ্ভুত শব্দ শুনতে পেলাম। মনে হল কেউ যেন কোনো ভলিবল ড্রপ করাতে করাতে ঝর্ণার বুক বেয়ে উঠে আসছে খুব আস্তে আস্তে। শব্দটা একবার ঝর্ণার একদিকের দেওয়ালে লাগছে অন্যবার অন্যদিকের। ব্যাপারটা যে কী হতে পারে কিছুই বুঝতে পারছি না। বাঁদরগুলো এমনই ভয় পেয়েছে যে মনে হচ্ছে ডাল ফসকে দু-একটা পড়েই যাবে নিচে। এদিকে শব্দটাও এগিয়ে আসছে। মনে হচ্ছে কোনো মাতাল লোক মদটদ খেয়ে এলোমেলো হাতে ভলিবল থাবড়াতে থাবড়াতে এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে।

যুধিষ্ঠিরের বাবা দশরথের মৃতদেহ যেখানে পড়ে আছে সে জায়গাটা পুটুস ঝোপে গভীর অন্ধকার। কিন্তু সে জায়গায় কোনো জানোয়ারকে পৌঁছতে হলে ওপরে ও নিচে হাত দশেক ন্যাড়া জায়গা পেরিয়ে যেতে হবে। জানোয়ারটা যে কী, তা এখনও বুঝতে পারছি না। কারণ কোনো জানোয়ারেরই চলার এমন হরকৎ সম্বন্ধে আমার কোনরকম অভিজ্ঞতাই ছিল না। ভয়ে কাঁটা হয়ে আছি। বিপদের প্রকৃতি জানা হয়ে গেলে আর ভয় থাকে না। কিন্তু যতক্ষণ না জানা যাচ্ছে ততক্ষণই ভয়। ঋজুদা ঠিকই বলে, অজ্ঞতাই ভয়ের জনক।

জানোয়ারটা কুসুম গাছের নিচে চলে এসেছে। বাঘ বা চিতা মড়িতে আসে ভোজবাজির মত। চারচোখ মেলে চেয়ে থাকলেও তারা চোখ এড়িয়ে যায়। জঙ্গলে এত শব্দ করে চলাফেরা করে শুধু শুয়োর আর ভাল্লুক। হরিণ জাতীয়রাও অবশ্য করে। তাহলে এ কোন্ কিম্ভুতকিমাকার জানোয়ার যে মানুষকে মেরে রাতের দুই প্রহর আর সারা দিন ফেলে রেখে এখন এমন করে তাকে খেতে আসছে।

যে জানোয়ারই হোক না কেন, ভেবেছিলাম কিল-এর কাছে এসে থামবে। আশ্চর্য! দেখি, মড়ি যেখানে আছে সে জায়গাটা পেরিয়ে সে আরও উপরে উঠে গেল। রাইফেলের টর্চ বা ভটকাইয়ের জিম্মাতে রাখা বড় টর্চও জ্বালাতে পারছি না। আলো দেখলেই জানোয়ারটা আর এই তল্লাটে থাকবে না। এক লাফে অদৃশ্য হয়ে যাবে। আলো জ্বালা যাবে তখনই যখন মোটামুটি নিশানা নেওয়া হয়ে গেছে।

এবার জানোয়ারটার যেন হুঁশ হল। চার পাঁচগজ এগিয়ে গেছিল সে ওপরের দিকে, এবার ফিরল। কিন্তু ফিরল যেন বহু কষ্ট করে। যখন ন্যাড়া জায়গাটুকু সে পেরোয় তখন জানোয়ারটা যে চিতাই সে বিষয়ে অন্ধকারেও আমার সন্দেহ ছিল না। কিন্তু তার চলন দেখেই সব গণ্ডগোল হয়ে গেল। ঝর্ণার মধ্যে এগিয়ে গিয়ে ঘুরতেই যে তার খুব কষ্ট হল তা বুঝতে পারলাম। তার চলন যেন সুন্দরবনের স্যাঁতস্যাঁতে কাদায় বুকে হেঁটে চলা কুমীরের মত। এবার সে ফিরে আসছে। সহজে গুলি করা যায় এখন। কিন্তু ঋজুদা প্রথমদিন থেকে শিখিয়ে এসেছে, বাঘ বা চিতা তোর দিকে সোজাসুজি মুখ করে থাকলে গুলি না করারই চেষ্টা করিস। অবশ্য নেহাত উপায় না থাকলে অন্য কথা। কারণ হিসেবে বলেছিল যে, গুলি খেয়েই সামনে লাফ মারার প্রবণতা থাকে নাকি তাদের। কিন্তু আমার গুলি খেয়ে চিতা এবং বড় বাঘকেও আমি সোজা ওপরে ছিলা-ছেঁড়া ধনুকেরই মত লাফিয়ে উঠতে দেখেছি। অবশ্য এ কথা ঠিক যে তাদের পেটে গুলি লেগেছিল। পরে কখনও ঋজুদার সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করা যাবে। এখন অন্য কিছুই ভাবার সময় নেই।

চিতাটা যখন পুটুসের ঝোপের কাছে এসে থামল এবং ডানদিকে শরীরটাকে ঘোরালো তখনই আমি খুব আস্তে রাইফেল কাঁধে তুলে সেটি-ক্যাচটি নিঃশব্দে অন করে টর্চের মেকানিজম-এ রাইফেলে রাখা বাঁ হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে সামান্য চাপ দিলাম। আলোর ছোট বৃত্ত গিয়ে পড়ল প্রায় বাঘেরই মত বড় মস্ত চিতার পিঠ আর ডান বাহুর সংযোগস্থলে। আর সুইচ টেপার আগেই ট্রিগারের ফাস্ট প্রেসার দিয়েছিলাম। এবারের বাকিটুকু দিলাম তর্জনীর দুই করের মধ্যের নরম অংশ দিয়ে। এক লাফ মেরে চিতাটা ঝর্ণার দেয়ালে সোজা গিয়ে ধাক্কা খেলো এবং সম্ভবত আছড়ে পড়ল যুধিষ্ঠিরের বাবা দশরথের মৃতদেহরই ওপরে। ভটকাইকে বলতে হয়নি। গুলি করার সঙ্গে সঙ্গেই ও বড় টর্চটা জ্বেলে ঐখানেই ফেলে রাখল। পুটুসের ঝোপ আন্দোলিত হল কিছুক্ষণ। তারপর অতর্কিত মৃত্যুর আগে অনেক জানোয়ারই যেমন নিজের সঙ্গে নিজে স্বল্পক্ষণ কথা বলে তেমন করে কথা বলল চিতাটা। তারপর সব চুপচাপ হয়ে গেল।

বাঁদরগুলো যে এতক্ষণ সমানে ডেকে যাচ্ছিল তা শোনার মত অবস্থা আমাদের ছিল না। চিতা স্থির হয়ে এলে বাঁদরদের ডাক মাথা গরম করে দিল। ভটকাই বাঁদরদের বাড়ি, সেই তেঁতুল গাছের দিকে একবার আলোটা ঘুরিয়ে যেন নীরবে বলে দিল আমরা তোমাদের উত্তরসুরি। কেন মিছে গোল করছ?

ঝর্ণার ওপর থেকে নন্দ মহান্তি হেঁকে বলল, কড় আঁইজ্ঞা? গুলি বাজিলা কি?

অর্থাৎ কি হল স্যার? গুলি কি লাগল?

আমিও চেঁচিয়ে বললাম, বাজিলা আঁইজ্ঞা। সেঠি টিক্কে রহিকি তেব্বে আসন্তু এঠি।

মানে ওখানে একটু থেকে তারপরে আসুন।

ভটকাইকে বললাম, তোর বন্দুকের দুটো কার্টিজ ছুঁড়ে মার তো। দেখি সে নড়েচড়ে কিনা!

ভটকাই আমাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে বলল, কনগ্রাচুলেশনস্! তোর এলেম আছে।

বললাম, কী করছিস। ছাড় ছাড়।

মনে মনে খুশিই হলাম। বন্ধু যদি বলে এলেম আছে, তবে কার না ভাল লাগে?

দুটো লেথাল বল হাত দিয়ে ছুঁড়ে মারল ভটকাই চিতাটার গায়ে। তবুও যখন সে নড়ল না তখন উৎসাহে ডগমগ হয়ে ও বলল, নামছি আমি।

আমি বললাম দাঁড়া। আমি আগে নামব। ভুলে যাস না যে আমরা নিনিকুমারীর বাঘের রাজত্বে আছি। এবং সে অক্ষতই আছে।

আমরা নিচে নামতে না নামতেই ওপর থেকে চামড়ার পাম্পশুর খচরমচর শব্দ করতে করতে নন্দ মহান্তি তার গদার মত গাদা বন্দুক উঁচিয়ে নেমে এল। পেছনে পেছনে উৎসাহী যুধিষ্ঠির। যুধিষ্ঠির অধীর হয়ে বলল, মু মো বাপ্পকু টিকে দেখিবি। মো বাপ্পকু।

বেচারি যুধিষ্ঠির! বাবার মৃতদেহ আর কীই বা ও দেখবে? দশরথের মৃতদেহের ওপরেই চিতাটা এমনভাবে পড়েছিল যে মৃতদেহটা দেখাই যাচ্ছিল না প্রায়। আমি রাইফেল নিয়ে পাহারাতে দাঁড়ালাম। ভটকাই, নন্দ মহান্তি আর যুধিষ্ঠির চিতাটার লেজ আর পেছনের পা ধরে টেনে সরিয়ে ন্যাড়া জায়গাটাতে চিৎ করে ফেলল। চামড়াও রাতারাতি এখানেই ছাড়িয়ে ফেলতে হবে।

চিতাটাকে চিৎ করে ফেলার পর ভটকাই তার বড় টর্চ এনে জ্বালতেই আমি চমকে উঠলাম। কী বীভৎস চেহারা! বেচারির দুটি চোখই অন্ধ। শুধু তাইই নয়, সামনের ডানদিকের থাবাটা ফালা ফালা হয়ে গেছে। মুখে নাকে চোখে রক্ত জমে ভূতের মত দেখাচ্ছে। বেচারির পেটটা একেবারে পিঠের সঙ্গে লেগে গেছে। খেতে পায় না বহুদিনই। এখন প্রাঞ্জল হল কেন সে দশরথের শব নিয়ে নালায় নামবার সময় পড়ে গেছিল, আর কেনই বা কুমীরের মত এঁকেবেঁকে ধাক্কা খেতে খেতে সে মড়িতে আসছিল।

নন্দ মহান্তি বলল, এ বাঘ তো আমার। প্রথম গুলি তো আমিই করেছিলাম। রক্ত এখনও লেগে আছে।

আমি কিছু বললাম না। দায়িত্বজ্ঞানহীন নন্দ মহান্তির গাদা বন্দুক দিয়ে মারা কামারবাড়িতে বানানো নানারকম লোহার গুলি চিতাবাঘটার চোখে মুখে পায়ে এবং বুকেও লেগে তাকে একেবারে অসহায় করে তুলেছিল। এই চিতা এবং যুধিষ্ঠিরের বাবার মৃত্যুর জন্যেও নন্দ মহান্তিই দায়ী। তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তবে ঠিক করলাম, আমি কিছু বলব না এখন। ঋজুদাকেই বলব কাল। তারপর ঋজুদা এর যে বন্দোবস্ত করার তা করবে। বেচারি যুধিষ্ঠির। চিতাবাঘ উপলক্ষ মাত্র।

গুলির শব্দ শুনে গগনবিহারী ও চার-পাঁচজন লোক হ্যারিকেন লণ্ঠন বর্শা এবং টাঙ্গি নিয়ে এসে হাজির। নিনিকুমারীর বাঘ এ গ্রাম থেকে কোনদিনও মানুষ নেয়নি। আর এই নিরুপায় চিতাটা যে কেন দশরথকে মেরেছিল তাও ওদের বুঝতে অসুবিধা হল না।

আমি ভাবছিলাম, কতখানি বেপরোয়া এবং ক্ষুধার্ত হলে চিতাটা এরকমভাবে মড়িতে ফেরে। ঝর্ণার রেখা ধরে ভটকাইকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে যা দেখলাম তাতে অবাক হয়ে গেলাম। চিতাটা ঝর্ণার নিচ থেকে উঠে আসেনি। পাহাড়ের আধাআধি একটা গুহা আছে। তার সামনে নরম ধুলো। এখন অবশ্য শিশির ভিজে রয়েছে। চিতাটা ঐ গুহাতেই সারা দিন শুয়েছিল। সে যে বুক ঘষে ঘষে এদিকে ওদিকে ধাক্কা খেতে খেতে বেরিয়েছে গুহা থেকে, তার চিহ্নও দেখা গেল। সম্ভবত নন্দ মহান্তির গুলিতে ওর চোখেরই মত কান দুটোও গেছিল নষ্ট হয়ে। নইলে অতটুকু দূর থেকে সে সকালে আমাদের এখানে আসা, দুপুরে মাচা বানানো, বিকেলে এসে মাচায় বসা–এই সবই দেখতে বা শুনতে পেত।

ভটকাই খুব বুদ্ধিমানের মত প্রশ্ন করল একটা। বলল, এই যদি তার অবস্থা, এতই যদি তার ক্ষিদে তবে যুধিষ্ঠিরের বাবাকে ধরে সর্ষে ক্ষেতে এসে খেল না কেন?

আমি বললাম বাঃ। দারুণ প্রশ্ন। তারপর বললাম, সংস্কার। সংস্কার আর অভ্যাসের বশে, জন্মগত সাবধানতার অভ্যাসের বশে মড়ি নিয়ে আসছিল লুকিয়ে রাখা এবং লুকিয়ে খাবার মত জায়গায়। কিন্তু ঝর্ণার মুখ থেকে এই তিরিশ চল্লিশ ফিট দশরথকে সুদ্ধ নিয়ে পড়ে যাওয়ায়, আমার মনে হয় ওর নতুন করে চোট লেগেছিল। পুরনো ক্ষতর মুখগুলো সব খুলে গেছিল নতুন করে। রক্তক্ষরণও হয়েছিল। তাছাড়া গাদা বন্দুকের লোহাগুলো তার মস্তিষ্কের মধ্যে কী ঘটিয়েছিল তাই বা কে জানে। বোঝাই যাচ্ছে যে পুরোপুরি ডেজড রাহুগ্রস্ত অবস্থায় ছিল বেচারি। কী করছে, কোথায় যাচ্ছে কিছুই বোঝার মত মানসিক অবস্থাও ওর ছিল না। চোখ কান হাতের কথা তো ছেড়েই দিলাম।

ভটকাই বলল, সারা দিনের মধ্যে তো ও এসে খেতে পারত। খেল না কেন?

তাও হয়ত সংস্কার। চিতারা শিকার ধরে রাতে। খায়ও রাতে। দিন রাতের তফাতটা বোঝার মত কোনো ক্ষমতা ওর নিশ্চয়ই ছিল।

ফিরে গিয়ে দেখি নন্দ মহান্তি মহা সমারোহে তার চিতার চামড়া ছাড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। আমি ভটকাই আর গগনবিহারী এবং অন্য একজনকে নিয়ে শুকনো কাঠ সংগ্রহ করে এবং টাঙ্গি দিয়ে কেটে ঝর্ণার একটু নিচে একটু সমতল জায়গাতে যুধিষ্ঠিরের বাবার চিতা সাজালাম।

চিতায় আগুন ধরাবার সময় যুধিষ্ঠির একবার হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল। আমি ওকে হাত ধরে নিয়ে এসে পাথরে আমার পাশে বসালাম। ভটকাই একমুঠো লাল আর হলুদ পুটুস ফুল ছিঁড়ে এনে চিতায় দিল। হু হু করে চিতা জ্বলতে লাগল। পুটপাট করে আগুন

নিজের মনে নিজের কথা বকতে লাগল। সেই কথার তোড়ে নন্দ মহান্তির দম্ভভরা প্রলাপ চাপা পড়ে গেল।

ঋজুদাকে বলে, ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নালিশ করে লোকটার বন্দুকটা বাজেয়াপ্ত করাতে হবে আর যুধিষ্ঠিরকে জমি টমি ক্ষতিপূরণ দেওয়াবার ব্যবস্থাও করতে হবে। নন্দ মহান্তির টাকাকড়ি তো কিছু কম নেই। সেই তো আসল খুনী! আসলে খুন করেছে দশরথকে। চিতাটা উপলক্ষ মাত্র। বেচারি দশরথ! বেচারি চিতা!

.

ঋজুদা কনসর-এর শাখা নদীর ধারে একটা বড় পাথরের উপরে শুয়েছিল মুখের উপর টুপি চাপা দিয়ে। বোধহয় ঘুমোচ্ছিল। জিপটা কাছাকাছি যেতেই উঠে বসল। মুখময় দু’দিনের দাড়িতে গালটা সবুজ দেখাচ্ছিল। নাকের নিচটাও।

আমরা জিপ থেকে নামতেই বলল, হ্যালো মিস্টার ভটকাই। কেমন লাগলো প্রথম রাত মাচাতে?

ভটকাই সকাল থেকেই উত্তেজিত হয়েছিল। উত্তেজনা চরমে ওঠায় তুতুলে বলল দা-দা-দারুণ।

বাঃ। ফাস্টক্লাস। এমনি করেই হবে। মাউন্টেনীয়াররা কি বলেন জানিস? কখনও পর্বতশৃঙ্গের দিকে তাকাতে নেই। নিচে দাঁড়িয়ে পবর্তশৃঙ্গে তাকালে মনে হয় ওখানে পৌঁছনো কিছুতেই সম্ভব নয়। কেউ তাকানও না তাঁরা। পরের পাটি কোথায় ফেলবেন শুধু সেদিকেই নজর যাবে তাঁদের এমনি করেই এবং পায়ের পর পা ফেলে একসময় তাঁরা শৃঙ্গে পৌঁছন। তোরও হবে। রুদ্র পারে, তিতির পারে, আর তুই পারবি না কেন? তবে সবকিছুই পারার আগে শিক্ষানবিশ থাকতে হবে। বিভিন্ন কাজের জন্যে বিভিন্ন সেই শিক্ষানবিশীর সময়কাল। এইটা মনে রাখলেই হবে। তারপর বলল, নে, এখন উঠে পড় জিপে। সোজা কুচিলাখাঁই পাহাড়ের নিচের বাংলোতে যাব আমরা। ভাল করে চান করে জমিয়ে ব্রেকফাস্ট করে ঘুম।

জিপে উঠতে উঠতে ভটকাই বলল, কতক্ষণ?

যতক্ষণ না ভাঙে।

ফাস্টক্লাস!

ভটকাই বলল, রাত-জাগা চোখ ছোট করে।

ঋজুদা বলল, তোদের ব্যাপারটা কি হল?

আমি বললাম বিস্তারিত।

ভটকাই বলল, আর নিনিকুমারীর বাঘ?

আছে।

দেখা হল?

দূর থেকে।

তারপর?

পরে। ঘুমভেঙে উঠে পাইপে আচ্ছা করে তামাক ঠুকে বুদ্ধির গোড়ায় ভাল করে ধোঁয়া দিয়ে তারপর তাকে কব্জা করার বুদ্ধি বের করতে হবে। শুভস্য শীঘ্রং!

বাংলোয় পৌঁছে চান করে ফেনাভাত, ডিমসেদ্ধ, আলুসেদ্ধ আর খাঁটি গাওয়া-ঘি দিয়ে পেট পুরে খেয়ে আমরা সকলেই ঘুম লাগিয়েছিলাম। ফেনাভাতটা জব্বর রেঁধেছিল জগবন্ধুদাদা।

ঘুম যখন ভাঙল তখন শেষ বিকেল। ময়ূর ডাকছে, মুরগী ডাকছে, কুচিলা-খাঁইরা ঘুমোতে যাবার আগে শেষ রাউন্ড ঝগড়া করে নিচ্ছে।

ভটকাই তখনও ঘুমোচ্ছিল। বিকেল হলেই ঝপ করে শীত বেড়ে যায়। ওর কম্বলটা সরে গেছিল কাঁধ থেকে। কম্বলটাকে ভাল করে গুঁজে দিয়ে আমি বারান্দায় এলাম। দেখি ঋজুদা রাইফেল পরিষ্কার করছে চায়ের কাপ পাশে রেখে। আমি সকালে ফিরেই করেছিলাম। ঋজুদাও সবসময় তাই করে। এক রাউন্ড ফায়ার করলেও করে। বুঝলাম, খুবই ক্লান্ত ছিল। সেজন্যেই পারেনি।

চা খাবি না?

বলে আসছি–জগবন্ধুদাদাকে।

ভটকাইকেও তুলে দে। ওর জন্যেও চা দিতে বলে আয় গিয়ে।

আমরা যখন আবার এলাম বারান্দাতে বেলা প্রায় মরে এসেছে। বাংলোয় হাতাতে বড় বড় ঘাসের গায়ে বার্কিং-ডিয়ারের গায়ের রঙের মত সোনালি নরম রোদ এসে লেগেছে। পাখিদের কলকাকলীতে ভরে উঠেছে চারদিক। এক জোড়া লেসার ইন্ডিয়ান হর্নবিল (ভালিয়া-খাঁই) গ্লাইডিং করে ভেসে যেতে যেতে কুচিলা খাঁই পাহাড়ের বুকের ভাঁজে হারিয়ে গেল।

ঋজুদা বলল, চল্ ভেতরে গিয়ে বসি। দরজাটা বন্ধ করে দিস রে ভটকাই। খিল তুলে দিস।

তোমাকে বলতে হত না। যে কাণ্ড চিতায় ঘটাল তা জানার পর নিনিকুমারীর বাঘকে আর বিশ্বাস করি।

হো হো করে হেসে উঠল ঋজুদা।

বলল, অ্যাই তো জ্ঞানচক্ষু খুলছে আস্তে আস্তে।

ভটকাই বলল, আমরা তোমাকে নদীর পারে ছেড়ে যাবার পর কী হল বল ঋজুদা।

তা শোনার আগে রাতে খাওয়া দাওয়ার কি হবে একটু দেখেশুনে আয়। কী খাবি, না বললে হয়ত বরাদ্দ হয়নি বলে কিছুই না রেঁধেই বসে থাকবে বশংবদ জগবন্ধু। বশংবদ হওয়া ভাল কিন্তু এতখানি বাবুমুখাপেক্ষী হওয়া আবার খারাপ। কী বলিস?

বলতে বলতে জগবন্ধুদা এসে আমাদের সামনে দাঁড়াল।

ঋজুদা বলল, ভাল্ব হেব্বা। রাতবেল্বে খাইবা-পিবা পাঁই কঁড় করিবা?

আপনমানে যা কহিবে আইজ্ঞা!

ঘরু অছি কঁড়?

সল্লু অছি। নাই কঁড়? কুকুড়া অছি, ডিম্ব অছি, অমৃতভাণ্ড অছি, আলু পিঁয়াজ। আউ ক্ষীরভি অছি। দুই ঢাল্ব ক্ষীর পঠাই দেইথ্বেলে বিশ্বল সাহেব।

ক্ষীর খাব! ক্ষীর! বলে, মহা আবদারে নড়েচড়ে বসল ভটকাই।

ঋজুদা হেসে ফেলল ভটকাই-এর কথা শুনে।

ভটকাই লজ্জিত হয়ে বলল, হাসছ যে!

ঋজুদা বললো, ক্ষীরের পুতুল।

আমি হাসতে হাসতে বললাম, ওড়িয়াতে দুধকেই বলে ক্ষীর।

তাই?

অবাক হয়ে বলল ভটকাই। এখানে ঢালে করে দুধ পাঠানো বিশ্বল সাহেব তাহলে বল্লমে বেঁধে কি পাঠান দেখা যাক।

ওরে বোকাটা। ঢাল নয়। ওড়িয়াতে ঢাল্ব মানে ঘটি। হিন্দি, লোটা। বুঝলি?

অ। তাই বলো! আমি ভাবি, ঢালে করে ক্ষীর পাঠানোই বুঝি শিকার-গড় রাজ্যের কায়দার মধ্যে পড়ে।

এখন খাবি কি তা বলেছো? সিম্পল পদ। জগবন্ধু বেচারিরও তো আমি না ফেরায় চিন্তায় চিন্তায় দু রাত ঘুম হয়নি। স্বয়ং পালের গোদাকে ম্যানইটার ইট করে কিনা সে তো চিন্তারই কথা!

ভটকাই বলল, কুক্কুড়া মানে কি কুকুর?

ঋজুদা বলল, এবারে তুই ফাজলামি করছিস। সংস্কৃত কুক্কুট শব্দের মানে জানিস তো?

সংস্কৃতে পাঁচ নম্বর পেয়ে ছেড়ে দিয়েছিলাম। সংস্কৃতর কথা আমাকে বোলো না।

নর নরৌ নরাঃ, মর মরৌ মরাঃ।

ভটকাই মাথা নিচু করে বলল।

তুই ছেড়ে দেওয়াতে মহাকবি কালিদাসের ভাষার ক্ষতি কিছুই হয়নি। কুক্কুট মানে মুরগী। সে কুক্কুট থেকেই কুক্কুড়া। ওড়িয়া তদ্ভব শব্দ।

তাহলে কুক্কুড়ার ঝোল আর ধান্যই হোক।

আমরা আবারও হেসে ফেললাম। আমি বললাম, ভাতকে ওড়িয়াতে ভাত্বই বলে।

তাছাড়া ধান্য কি ভাত?

মান্য করলেই ভাত।

ভটকাই বলল।

সঙ্গে একটু আলুভাজাও হবে নাকি রে রুদ্র?

হোক। আমি বললাম।

ভটকাই বলল তার সঙ্গে একটু পেঁয়াজকলি ভাজা হলেও মন্দ হত না।

ঋজুদা বলল, দুধ যখন আছে এবং ভটকাই যখন ক্ষীরের এত ভক্ত তখন দুধ জ্বাল দিয়ে ক্ষীরও করতে বলে দিচ্ছি।

বরাদ্দ হেল্বা। এৰ্ব্বে যাইকি চঞ্চল রান্ধিবা। বুঝিলে জগবন্ধু?

হ আইজ্ঞা।

বলে জগবন্ধু চলে যাচ্ছিল।

ঋজুদা পিছু ডেকে বলল, বেশি করে কোরো জগবন্ধু যাতে বালাবাবুর, তোমার ও আমাদের সকলেরই পেট ভরে। বালাবাবু করছেন কি?

বালাবাবু শুই পড়িলানি।

খাইবার টাইমরে ডাকিবা তাংকু।

আইজ্ঞা।

ভটকাই বলল, ওড়িয়া ভাষাটা ভারী মিষ্টি। তাছাড়া বাংলার সঙ্গে তফাতও বেশি নেই।

নেই-ই তো। ওড়িয়া ভাষাই শুধু নয়, ওড়িয়া মানুষরাও খুব মিষ্টি। ভদ্র, শিষ্ট, প্রকৃত বিনয়ী এবং সংস্কৃতিসম্পন্ন।

বাঙালীরা ওড়িয়া বলতে পারে না অথচ প্রায় প্রত্যেক শিক্ষিত ওড়িয়া বাংলা পড়তে তো পারেনই, বলতেও পারেন বাঙালীদেরই মত।

আমি বললাম।

সেটা ওঁদের গুণ। আমাদের দোষ। বাঙালীদের যে কতগুলো ফালতু সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্স আছে না, সেই কমপ্লেক্স-এর জন্যেই জাতটা ডুবতে বসল। আমাদের মত এমন উদার জাত যেমন কম, তেমন এমন কূপমণ্ডুক জাতও নেই।

ঋজুদা বলল।

এটা আবার কি শব্দ বললে ঋজুদা? কূপমণ্ডুক? এটাও কি ওড়িয়া শব্দ।

ভটকাই বলল।

তোকে নিয়ে মুশকিলেই পড়লাম রে মহামূর্খ।

ঋজুদা হাসতে হাসতে বলল।

তারপর বলল, কূপমণ্ডুক সংস্কৃত শব্দ। কূপ মানে কুঁয়ো। আর মঞ্জুক হল ব্যাঙ। মানে, কুঁয়োর ব্যাঙ। কুঁয়োর মধ্যে থেকে যেটুকু আকাশ দেখা যায় সেইটুকুই তার পৃথিবী। তার বাইরেও যে কিছু আছে এ কথা সে ধারণাতেও আনতে পারে না।

তা বললে হবে কেন? বাঙালীরা যত বাইরে যায় প্রতি বছর, ভারতবর্ষের অন্য কোনো রাজ্যের লোকে যায় না। কি? যায়?

ভটকাই বলল।

তা ঠিক। তবে শারীরিকভাবে বাইরে গিয়ে তীর্থস্থান বা সুন্দর সব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখলেই তো হবে না, নিজেদের মনে অন্যদের সম্বন্ধে সত্যিকারের ঔৎসুক্য জাগাতে তো হবে। বেড়াবার আসল লক্ষ্য সেটাই হওয়া উচিত। আসলে, তুই যাই বলিস আমরা আমাদের প্রতিবেশীদের সম্বন্ধে শ্রদ্ধা, ভালবাসা, ঔৎসুক্য কিছুই রাখি না, আর রাখি না বলেই আজ আমাদের এত দুরবস্থা।

ভটকাই বলল, এবারে বলো ঋজুদা।

ঋজুদা বলল, তোরা তো আমাকে নামিয়ে চলে গেলি। আমিও ধীরে সুস্থে পায়ের দাগ দেখে এগোলাম। যতই এগুতে থাকি বন ততই নিবিড় হয়। কী বলব তোদের, এত জঙ্গলে ঘুরলাম, এরকম জঙ্গল দেখিনি। মাইলখানেক শুধুই চাঁর গাছ। মধ্যে দিয়ে নদী বয়ে চলেছে এঁকেবেঁকে। পুরো জায়গাটা ছায়াচ্ছন্ন, স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে রয়েছে। মৃত্যুর গন্ধ চারিদিকে। কখনও আস্তে আস্তে উঠে গেছে জমি, কখনও নেমে গেছে। পাহাড়ের মতন নয়, শাড়ির ভাঁজের মত। চাঁর গাছের জঙ্গল পেরনোর পরই একেবারে উদোম টাঁড়। আর তার মধ্যে মধ্যে কালো টিলা। টিলাও বলব না, অনেকটা, বুঝলি রুদ্র, আফ্রিকার কোপজের মত। ঐ টাঁড়ের মধ্যে গিয়ে পৌঁছবার পর আর বাঘের পায়ের দাগ পেলাম না। যেন মন্ত্রবলে মুছে দিয়েছে কেউ। টাঁড়ের অন্য প্রান্তে কোনো গ্রাম আছে বলে মনে হল। কারণ দূরে সরষেক্ষেত দেখা যাচ্ছিল। হলুদ প্যাস্টেল-কালারে কেউ যেন ছবি এঁকেছে। এই সময়ে সরষে গাছে ফুল আসার কথা নয়। অবাক লাগল দেখে। সারা রাত ঘুমোইনি। চোখে ভুল দেখছি কি না কে জানে! নিজেকেই বললাম। তারপর ঠিক করলাম একটু ঘুমিয়ে নিয়ে চাঙ্গা লাগবে। ঘুমিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিয়ে তারপর টাঁড় পেরিয়ে ওদিকের জনপদের দিকে যাওয়া যাবে ধীরে-সুস্থে। তখনও সামনে সারা দিন পড়ে আছে। জুতো দু’পাটি নিচে খুলে রেখে মোজা পায়ে একটা মস্ত চাঁর গাছে উঠে দুটো কেঁদো ডালের মধ্যে ইজিচেয়ারের মত জায়গা দেখে ডালের একটি খোঁচাতে স্লিংসুদ্ধ রাইফেল আর টুপিটাকে ঝুলিয়ে দিয়ে আরামে গাছের ডালের খোঁদলে পিঠ দিয়ে লম্বা হলাম। রোদ এসে পড়েছিল গায়ে, পাতার ঝালরের ফাঁক দিয়ে। আরামে চোখ বুজে এল। অনেক ঘুম জমেছিল চোখের পাতায়।

যদি পড়ে যেতে?

রসভঙ্গ করে ভটকাই বলল।

পড়তাম না রে। গাছে একবার ঘুমনো রপ্ত করলে তোর আর বিছানাতে শুয়ে ঘুমোতে ইচ্ছেই করবে না।

আমি বললাম, তারপর?

তারপর যা হল, বললে হয়ত তোরা বিশ্বাস করবি না। আমার নিজেরও এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না।

কী হল বল না!

ঘুম যখন ভাঙল, তখন বেলা পড়ে এসেছে। আমার কোনও তাড়া ছিল না। বিশেষ কিছু করারও ছিল না। এদিকে এসেছিলাম বাঘের বিট সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল হতে। বাঘের সঙ্গে মোকাবিলা যে হবে তা আদৌ ভাবিনি। সে কারণেই হয়ত অমন দায়িত্বজ্ঞানহীনের মত ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

উঠে বসে সামনে তাকিয়ে যা দেখলাম তা এককথায় অপূর্ব। বছরের এই সময়ে ঝড় বৃষ্টি হয়ই না বলতে গেলে। কিন্তু ঘনমেঘে পুবের আকাশ ঢাকা। তখনই যেন সন্ধে নেমে এসেছে। মাঝে মাঝে কড়কড় শব্দ করে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। আর সেই দিনমানের মেঘ অন্ধকার আর বিদ্যুৎ হলুদ সর্ষেক্ষেতের উপরে যে কী চমৎকার এক ছবির সৃষ্টি করেছে তা কী বলব! অত মেঘ কিন্তু শিগগির যে বৃষ্টি হবে তা মনে হচ্ছে না। শিরশির করে হাওয়া দিচ্ছে। এক দল তিতির টাঁড় থেকে চরতে চরতে বেরিয়ে এসে একটি কোপজে-এর আড়ালে চলে গেল। কালি তিতির বা ব্ল্যাক পাট্রিজ ডাকতে লাগল একটি কোপজে-এর ওপার থেকে। একঝাঁক হরিয়াল উড়ে এল চাঁর বনে। হয়ত রাত কাটাবে বলে। মোহিত হয়ে বসে প্রকৃতির ঐ অপূর্ব সাজ দেখতে দেখতে আমার হঠাৎ আবার হাই উঠতে লাগল। কে যেন জোর করে আমাকে ঘুম পাড়াতে লাগল। সারা দিন ঘুমোবার পরও যখন আমার একটুও ঘুম আসার কথা নয় তখনই ঘুমে আমার দু চোখের পাতা একেবারে বুঁজে এল। গাছ থেকে নেমে নদীতে মুখ ধুয়ে যে টাঁড়ের দিকে যাব, সে ইচ্ছেও অচিরেই উবে গেল।

–তারপর? ভটকাই বলল।

বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল ঋজুদা। পাইপ খেল কিছুক্ষণ।

তারপর বলল, আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। যখন ঘুম ভাঙল তখন রাত হয়ে গেছে। চাঁর গাছেদের তলায় গাটু গভীর অন্ধকার। বালির উপরে উপরে নদী বয়ে যাবার ফিসফিস শব্দ রাত নামাতে জোর হয়েছে এখন। প্রথমে ঘুম ভেঙে আমি কোথায় আছি, কী করছি তা মনেই করতে পারলাম না কিছুক্ষণ। শুনেছি, মানুষ বুড়ো হলে এরকম হয়। কিন্তু বুড়ো হওয়ার তো দেরী আছে এখনও অনেক। কিছুক্ষণ সময় কেটে যাওয়ার পর সবে ঘুম ভাঙা চোখে অন্ধকার বেশ খানিকটা সয়ে এল। পশ্চিমাকাশে সবজে নীল আগুনের বড় টিপের মত শান্ত হয়ে জ্বলজ্বল করছে সন্ধ্যাতারা। মেঘ কেটে গেছে কখন কে। জানে। দূরের সর্ষেক্ষেত আর টাঁড়ের ওপর দিয়ে হু হু করে হাওয়া বয়ে আসছে। অথচ সেটা পুব দিক। বছরের এই সময়ে নির্মেঘ আকাশ আর পরিষ্কার আবহাওয়ায় পুবদিক থেকে হাওয়া আসাটা খুবই আশ্চর্যের। কিন্তু যেদিক দিয়েই আসুক না কেন শীত করতে লাগল বেশ। এদিকে ওদিকে ছড়ানো জড় পদার্থ কোপজেগুলোর মধ্যের ফাঁক-ফোকর-গুহায় এখন প্রাণ জেগে উঠছে। নানারকম রাত পাখির ডানা ঝাপটানো, অস্ফুট মৃদু এবং তীব্র স্বর, টাঁড়ের জমিতে ইঁদুর খরগোসের দৌড়াদৌড়ির শব্দ মিলে মিশে রাতের শব্দমঞ্জরী রাধাচূড়ার স্তবকের মত দুলছে কানের কাছে। তার একটু পরই প্রায় আমার গাছের নিচেই হাড়-কামড়ানোর কড়কড়কটাং আওয়াজে ভীষণ চমকে উঠলাম। আমি। নিচটা এতই অন্ধকার যে কিছু দেখাও যাচ্ছে না। কিন্তু বুঝতে পারলাম যে বাঘে বা চিতায় কোনো কিছু খাচ্ছে। এই চাঁরবনে শম্বরদের দলটা কাল ঢুকেছিল বটে, কিন্তু আমি এখানে ঐ দলটা ছাড়াও গেম-ট্র্যাকে বাঘের এবং এক জোড়া কোটরার পায়ের দাগ দেখেছি।

জার্কিনের জিপ টেনে দিয়ে কলার তুলে দিলাম নিঃশব্দে। তারপর টুপি আর রাইফেলটা গাছের খোঁচ থেকে নিতে গিয়ে নিলাম না। ব্যাপারটা যে কি আগে না বুঝে নড়াচড়া করাটা ঠিক হবে না। টর্চ জ্বালতে পারছি না, যদি নিনিকুমারীর বাঘ হয়? কিছুক্ষণ মনোযোগ দিয়ে শুনলাম। এবং এবারে অন্ধকারের মধ্যে অন্ধকারতর জানোয়ারের অবয়বও দেখতে পেলাম। বেশ বড়। নড়াচড়ার কায়দা দেখে মনে হল বাঘ। কিন্তু কোন বাঘ?

সামান্যক্ষণ ভেবে নিয়ে ঠিক করলাম যে বাঘই হোক নিনিকুমারীর বাঘের রাজত্বে একটি নিরপরাধ বাঘকে মেরে ফেললেও যেমন গর্হিত অপরাধ হবে না যদি বাঘের পেটে যাওয়া হতভাগ্য মানুষদের সংখ্যার কথা মনে রাখি।

খুব আস্তে আস্তে হাত বাড়িয়ে গাছের খোঁচ থেকে টুপি এবং রাইফেলটাকে নিলাম। টুপিটা মাথায় দিয়ে কান অবধি টেনে নামিয়ে দিলাম। তারপর রাইফেলটাকে খুব আস্তে আস্তে দু-হাতে ঘুরিয়ে বাহু আর কাঁধের সংযোগস্থলে আনলাম। বাঘটা কী খাচ্ছে জানি না। তবে আওয়াজ শুনে মনে হল ছোট কোনো জানোয়ার। এ জানোয়ারের শরীরে মাংস কম। যে জানোয়ারই হোক বাঘ একে কিছুক্ষণ আগেই ধরেছে। গতকালের মড়ি হলে পচা দুর্গন্ধ বেরত।

জার্কিনের পকেটে টর্চ ছিল। কিন্তু টর্চ জ্বালাবার জো ছিল না। রাইফেলের ব্যারেলের সঙ্গে লাগানো পেনসিল টর্চের সুইচ ছিল ব্যারেলের সমান্তরালে লাগানো পাতলা লোহার পাতে। রাইফেলটার নলকে অন্ধকারেই যথাসম্ভব টার্গেটের দিকে ঘুরিয়ে নিশানা নিয়ে তর্জনী দিয়ে ফার্স্ট-প্রেসার দিয়ে বাঁ হাতের বুড়ো আঙুলের মাথা ছুঁইয়ে টর্চের লোহার পাতের সুইচে চাপ দিলাম। এবং সঙ্গে সঙ্গে সেকেন্ড প্রেসার দিলাম ট্রিগারে। ঘন জঙ্গলের মধ্যে রাইফেলের আওয়াজ বাজপড়ার আওয়াজের মত শোনাল এবং এই চাঁর জঙ্গলে এবং সামনের টাঁড়ে যে কতরকম পাখির বাস তা বোঝা গেল তাদের সম্মিলিত চিৎকারে। ট্রিগারে সেকেন্ড প্রেসার দেওয়ার সময়ে ঐ ক্ষীণ আলোতে বাঘকে দেখেছিলাম এক ঝলক। তাড়াতাড়ি রাইফেলটা কোলে শুইয়ে জার্কিনের পকেট থেকে টর্চ বের করে এবারে নিচে আলো ফেললাম। দেখি বাঘ নেই। একটি যুবকের মৃতদেহ পড়ে আছে। তার গালের একদিক, সেদিকের চোখ এবং নাকটি খেয়েছে বাঘে। পাছার মাংস। কান এবং শরীরের অন্যান্য নরম জায়গাগুলো। একটি পা। রক্তে আর লাল ধুলোয় মাখামাখি ফর্সা মরা মানুষটাকে বীভৎস দেখাচ্ছে। থুতনি ঠোঁট খেয়ে নিয়েছে বলে দাঁতের পাটি দুটিকে মনে হচ্ছে কঙ্কালের দাঁত বুঝি। মড়ি আছে কিন্তু বাঘ নেই। আমার গুলি বাঘকে মিস করে যেখানে গিয়ে পড়েছে সেখানে একটি খোঁদল হয়ে গেছে। সফট-নোজড গুলি। খাবলা খাবলা ধুলো তখনও বাষ্পর মত উড়ছে সেই খোঁদলের ওপর, কিন্তু বাঘ নেই।

বাঘ নেই এবং বাঘের গায়ে গুলি লাগেনি জেনেই আমি সঙ্গে সঙ্গে টর্চটা নিবিয়ে দিয়ে রাইফেলটার কুঁদো আর ম্যাগাজিনের সংযোগস্থলে ভালবাসায় পোষা প্রিয় কুকুরের ঘাড়ে যেমন আদরের হাত রাখে তার মালিক তেমনই আদরে আর বিশ্বাসে হাত রাখলাম। দুটো চোখ, দুটো কান আর নাকের দুটো ফুটো দিয়ে যতকিছু দেখা, শোনা ও শোঁকা সম্ভব তাই দেখার শোনার ও গন্ধ নেবার চেষ্টা করতে লাগলাম। কিন্তু রাত নীরব। গাছের নিচের সুন্দর ধবধবে ফর্সা মৃত যুবকের মতই গা ছমছম করা নীরব। গুলির শব্দর প্রতিধ্বনি দীর্ঘ চাঁর গাছেদের আর কোপজে’দের আর হুহু-হাওয়া টাঁড়ে ল্যাব্রাডর গান-ডগ-এর মত দৌড়ে বেড়িয়ে এখন থেমে গেছে।

আধঘণ্টা কেটে গেল। কোনো শব্দ নেই, নড়াচড়া নেই কোথাওই।

আধঘণ্টা যে কেটে গেছে তা ঘড়ি দেখে বুঝিনি। আন্দাজে বুঝেছি। নিশ্চল হয়ে বসে অন্ধকার বনে সময়ের জ্ঞান থাকে না যেমন থাকে না হাইওয়েতে জোর গাড়ি চালালে গাড়ির বাইরে তাকিয়ে গতিবেগের। তাই অভিজ্ঞরা বলেন রাতের জঙ্গলে ঘড়ি এবং হাইওয়েতে স্পীডোমিটারে চোখ রেখে চলতে হয় সবসময়।

হঠাৎ একঝাঁক শকুন উড়ে এল টাঁড়ের দিক থেকে! রাতের বেলা শকুন ফাঁকা জায়গা এবং দিনমানে খেতে শুরু করা মড়ির উপরে ছাড়া দেখিনি কখনও আগে। বড় বড় ডানায় সপ সপ ভুতুড়ে আওয়াজ করে তারা মড়ির উপরে না পড়ে আমি যে গাছে বসেছিলাম তার চারপাশে ঘুরে ঘুরে উড়তে লাগল। ওদের বড় বড় ডানা নেড়ে স্বচ্ছন্দে ওড়ার মত জায়গা ছিল না সেখানে তবু ওরা যেন দুঃস্বপ্নের শকুন, কোনো বাধাই ওদের কাছে যেন বাধা নয়, এমনি করে উড়তে লাগল। আমার সত্যি ভীষণ ভয় করতে লাগল। হিচক-এর দ্য বার্ডস বলে একটা ছবি দেখেছিলাম অনেকদিন আগে। দেখার পর বহুদিন ঘুমোতে পারিনি রাতে ভাল করে। সেই ছবিটির কথা মনে এল। কিছুক্ষণ আমাকে ভয় দেখিয়ে তারা ফিরে গেল।

তারপরই হায়না ডেকে উঠল টাঁড়ের দিক থেকে হাঃ হাঃ হাঃ হুঃ হাঃ হাঃ হাঃ করে।

হায়নার ডাক তো জীবনে প্রথম শুনলাম না। কিন্তু কেন যেন ভয়ে গা ছমছম করে উঠল। তারপরই মনে হল বাঘটা ফিরে এসে আবার খাওয়া শুরু করেছে। খাওয়ার শব্দও কানে এল। গুলি করার পরও মানুষখেকো বাঘ মড়িতে ফিরে এল? কী রকম!

একমুহূর্ত ভেবে আমি আবার রাইফেল তুললাম ফার্স্ট-প্রেসার দিতে দিতে এবং সেই কালো মূর্তির ঘাড় আর বুকের সংযোগস্থলে নিশানা নিয়ে সুইচে আঙুল ছুঁইয়ে দেখে নিয়েই চকিতে গুলি করলাম। রাইফেল ফেলে রেখে, বড় টর্চ জ্বালাতেই দেখি বাঘ নেই। আগের গুলিটি যেখানে লেগেছিল তারই পাশে আর একটি খোদলের সৃষ্টি হয়েছে। বাঘ ধারে কাছে কোথাওই নেই। গুলির শব্দর সঙ্গে সঙ্গে আবার সেই কলকাকলীর ঐকতান। প্রতিধ্বনি, শিকারি কুকুরের মত আবার দৌড়াদৌড়ি। তারপরই গ্রামের নদীপারের শ্মশানেরই মত নিস্তব্ধতা। শকুন-শিশুর বুক চমকানো চিৎকারে যে নিস্তব্ধতা চমকে চমকে ওঠে শুধু।

তারপর?

ভটকাই বলল।

তারপর আরও আধঘণ্টা চুপচাপ। কিছুক্ষণ পর আবার মনে হল বাঘ ফিরে এসেছে। মনে হল না, সত্যিই এসেছে। এবারে একটু সময় দিলাম তাকে। অন্ধকারে যখন তার অন্ধকারতর চেহারা বেশ ভাল দেখতে পাচ্ছি তখন আবার রাইফেল তুললাম। মাত্র পনের-ষোল ফিট উপর থেকে যে শিকারী পরপর ছ’বার প্রায়-অনড় হয়ে থাকা বাঘের মত বিরাট জানোয়ারের গায়ে গুলি লাগাতে না পারেন তাঁর শিকার ছেড়ে দেওয়া উচিত।

আমি বললাম, বাঘের গায়ে গুলি লাগাতে যতটা মার্কসম্যানশিপ-এর দরকার হয় তার চেয়ে বেশি দরকার হয় সাহসের। তোমার একথা মানিনা তাই আমি।

তারপর কী হল? ভটকাই আবার শুধোলো।

রাইফেল তুলেছি, নিশানা নিয়েছি। আলোটা টিপতে যাব। আলোটার কোনো দোষ ছিল না, রাইফেলের ব্যাক সাইডের মধ্যে দিয়ে গিয়ে ফ্রন্ট সাইডের রেডিয়ামে লাগলে টার্গেট পরিষ্কার দেখাচ্ছে সে বারবারই নির্ভুলভাবেই। দোষ হচ্ছে অন্য কিছুর। শিকারীরই। আলোটা জ্বালতে যাব বাঁ হাতের বুড়ো আঙুল ছুঁইয়ে ঠিক সেই সময়েই একটা মস্ত বাদুড় ঝপ করে উড়ে এসে আমার মাথার টুপির উপরের দিকে ঠোকর মেরে একগাদা বদগন্ধ ছড়িয়ে চলে গেল এবং ততক্ষণে ঐ ঝামেলাতে আমার রাইফেলের ব্যারেল অনেকটাই উঁচু হয়ে যাওয়ায় গুলিটা সামনের গাছে গিয়ে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে রাইফেল কোলে নামিয়ে বড় টর্চটা জ্বাললাম।

তারপর?

তারপর আর কি? এমনি করেই রাইফেলের ব্যারেল ও ম্যাগাজিনের যে কটি গুলি পোরা ছিল তা শেষ হয়ে গেল। তখন আমি সত্যি ভয় পেয়েছি। মন বলছে ও বাঘের পিছনে ঘুরে কাজ নেই। আমার অবস্থাও বহু অন্য শিকারীদের মতই হবে। তাছাড়া তোদের দুজনকেই কাল ভোরেই কলকাতা ফেরত পাঠাব। এ বাঘ সত্যিই ঠাকুরানীর বাঘ। জিম-করবেট-এর টেম্পল-টাইগারের মত। শিকার-গড়-এর দেবী একে কোনো আশীর্বাদে অমর করে দিয়েছেন।

তারপর? আমি বললাম।

ভোররাতে বোধহয় অজানিতেই ঘুমিয়ে পড়ে থাকব। গাছের ডালে প্রথম ভোরের পাখিদের ডাকাডাকিতে ঘুম ভাঙল। তখনও আলো ফোটেনি।

সকাল হবার পরে কি দেখলে?

সকাল চিরদিনই বনে জঙ্গলে সব অবিশ্বাস, ভয়, কুসংস্কার, আড়ষ্টতা ভেঙে দেয়। যেই ভোরে একটু করে আলো ফুটতে থাকে তারপর সেই আলো ক্রমশই ছড়িয়ে যেতে থাকে, তীব্রতর হতে থাকে, মনের ওপর থেকে সবকম আচ্ছন্নতা কুয়াশারই মত কেটে যেতে থাকে। আলো একটু স্পষ্ট হলে, যখন নদীর জল দেখা যাচ্ছে, দেখা যাচ্ছে চারপাশ তখন আমি খুব সাবধানে নামলাম। বেশি সাবধানতার দরকার ছিল এইজন্যে যে রাইফেলে আর গুলি ছিল না একটিও। গাছতলায় নেমে চারদিক তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে, যেখানে মড়ি পড়েছিল, সেদিকে এগিয়ে গেলাম। নীল রঙের বড় বড় মাছি পড়েছে তাতে। তারা সংখ্যায় এত এবং এত জোরে ডানা ভনভন্ করছে যে মনে হচ্ছে যেন দূর থেকে আসা কোনো ছোট প্রপেলার প্লেনের শব্দ শুনছি। মড়ির গায়ে ছিটেফোঁটা মাংস লেগে আছে এখানে ওখানে। চেটে পুটে খেয়ে গেছে বাঘ। এবং পায়ের দাগ স্পষ্টই বলছে যে বাঘ বিভিন্ন নয়, একটিই বাঘ এবং নিঃসন্দেহে নিনিকুমারীর বাঘ।

বাঘ যে নিনিকুমারীর বাঘ সে সম্বন্ধে যখন নিঃসন্দেহ হলাম তখন ব্যাপারটা যে ভৌতিক-টৌতিক নয় সে সম্বন্ধেও নিঃসন্দেহ হয়ে ওঠা গেল। তখন ভাল করে গাছটার চারধার ঘুরে বাঘের আসা-যাওয়ার পায়ের খোঁজ করলাম। দেখা গেল, রাতে যা ভেবেছিলাম তা নয়। প্রথমবার বাঘটা টাঁড়ের দিক দিয়েই এসেছিল মানুষটাকে নিয়ে। সে কেন যে অতখানি টাঁড় পেরিয়ে আসতে গেল, কেন ঐখানে বসেই খেল না তার একমাত্র উত্তর, ভেবে দেখলাম নদীর কাছাকাছি থাকার ইচ্ছা এবং চাঁর গাছেদের গভীর নির্জন ছায়ার আড়ালের সুবিধা। কিন্তু এসেছে যদিও টাঁড়-এর দিক থেকেই প্রতিবার গুলি হবার পরই সে আমার পিছন দিকে, মানে আমি যেদিকে মুখ করে বসেছিলাম তার বিপরীত দিকে নদীর পাশে একটি প্রকাণ্ড চাঁর গাছের আড়ালে গিয়ে লুকিয়েছে। আবার একটু পরে বেরিয়ে এসেছে। এবং খাওয়া দাওয়া সেরে আবার চলে গেছে কাল ভোরে তাকে তার পায়ের চিহ্ন আমরা যেখানে দেখেছিলাম সেইখানেই নদী পেরিয়ে শিকার-গড়ের দিকে। সেটা অবশ্য জেনেছিলাম তোরা জিপ নিয়ে আসার একটু আগে।

এতক্ষণ তুমি কী করছিলে?

তোরা হলেও যা করতিস। প্রথমেই টাঁড় পেরিয়ে সর্ষেক্ষেতের দিকে এগোলাম। উদ্দেশ্য দুটি। কিছু খাবার দাবার পাওয়া যায় কিনা এবং ঐ গ্রামে এর আগেও গেছে এমন মানুষ নিয়েছে কিনা। অন্য কথায় ঐ গ্রাম নিনিকুমারীর বাঘের রেগুলার বীট-এর মধ্যে পড়ে কিনা?

আসলে গ্রাম বলে যা ভেবেছিলাম তা নয়। পৌঁছে দেখি, ঐ কোপজে’র মত পাহাড়গুলোর আড়ালে মাত্র চার পাঁচ ঘর লোকের বাস। তারাই ঐ সর্ষে বুনেছে। তারা নাকি বামরার এক মহাজন, যার তেলকল আছে; তার কাছ থেকেই প্রতি বছর দাদন দিয়ে সর্ষে বোনে তারই জমিতে এবং সুদের খরচ বাদ দিয়ে পাইকারি হারে তাকেই পুরো সর্ষে বিক্রি করে দেয়। তাতে তাদের যা আয় হয় তার চমৎকার সাক্ষী তাদের চেহারা এবং অবস্থা। তবু তারা আমাকে মুড়ি আর গুড় খাওয়াল। এবং যা শুনলাম, বাঘ তাদের দিকে এর আগে আর কখনই আসেনি। নিনিকুমারীর বাঘের এলাকাতে বাস করেও তাদের কোনো ভয় ছিল না কারণ প্রথম এক বছর তারা নিয়মিত মাচা বেঁধে ঐ চাঁর বনেই দিনেরাতে পাহারা রাখত বাঘ টাঁড়ের দিকে আসে কিনা তা দেখার জন্যে। কিন্তু বাঘ কখনই এদিকে আসেনি। কজন মাত্র লোক থাকে, হয়ত সে জন্যেই আসেনি। যাই হোক গতকাল শেষ বিকেলে ওদের একজন ‘ঝাড়া দেইবাকু’ অর্থাৎ বড় বাইরে করবার জন্যে যখন একটি টিলার আড়ালে ‘ঢাল’ ভর্তি জল নিয়ে গিয়ে পৌঁছেছিল বাঘ তখন তাকে নিঃশব্দে ধরে। এবং ওখানে বসেই কিছুটা খায়। লোকটি অন্ধকার হবার পরও ফিরে না আসাতে ওরা বুঝতে পেরে দুয়ার বন্ধ করে রাতটা কাটায়। আমি যখন গিয়ে পৌঁছই তখনই ওরা সদলবলে তাদের সঙ্গীর খোঁজে বেরচ্ছিল। একজন রওয়ানা দিচ্ছিল শহরে। সেখানে বামরার মহাজনের গদীতে খবর দেবে বলে, যাতে অন্ত্যেষ্টির জন্যে কিছু সাহায্য পাওয়া যায়। সে সাহায্যের উপরেও সুদ কষা হবে। সুদ-এর চেয়ে বড় মানুষখেকো বাঘ ভারতবর্ষের বনাঞ্চলে, গ্রামাঞ্চলে আর নেই।

আমি ওদের বললাম যে, মড়ির সামান্যই অবশিষ্ট আছে এবং আমিই দিয়ে যাচ্ছি ওদের। ওরা প্রথমে নিয়ে গেল আমাকে টিলার দিকে। সেদিক থেকে ড্রাগ-মার্ক-এর দাগ যে এসেছে তা আমি লক্ষ্য করেছিলাম। মানুষটিকে কোমরের কাছে কামড়ে ধরে নিয়ে এসেছে বাঘ চাঁরবনে, তার দু-হাত আর দু-পা হেঁচড়েছে মাটিতে–তারই ঘষটানোর দাগ। মাঝে মাঝে মানুষটিকে নামিয়ে রেখে একটু বিশ্রাম নিয়েছে। শিকার-গড়ে যখন বাঘটিকে দেখি তখন মনে হয়েছিল বাঘটি ল্যাংড়া নয়। কিন্তু দীর্ঘপথ তার পায়ের দাগ লক্ষ্য করে আজ বোঝা গেল যে ক্ষতটি তার কাফমাসলের কাছে। কখনও কখনও আরাম পাওয়ার জন্যে সে পা-টি তুলে তুলে চলে। কখনও স্বাভাবিক ভাবে চলে। অভিজ্ঞ শিকারীরা এবং শিকার-গড়-এর স্টেটের অভিজ্ঞ শিকারীরাও যে কি করে ভাবলেন বাঘের পায়ের কব্জীতে নিনিকুমারীর রাইফেলের চোট হয়েছিল তা এখনও বোধগম্য হল না।

আমি বললাম, হয়ত পা চুঁইয়ে রক্ত পড়াতেই এমন ভেবেছিলেন ওঁরা।

ঋজুদা বলল, হয়ত থাবাতেও চোট পেয়েছিল তখন, এখন তা সম্পূর্ণ শুকিয়ে এবং জুড়ে গেছে। প্রকৃতির নিরাময়ের রকমটাই আলাদা।

তারপর?

ভটকাই বলল।

তারপর আর কি? ওরা মড়ির অবশিষ্টাংশ উঠিয়ে নিয়ে গেল। ছেলেটির ছোট ভাই এসেছিল। ঐ অবস্থায় তার স্ত্রীকে না দেখানোর পরামর্শ দিয়ে ওদের একশটি টাকা শ্রাদ্ধের জন্যে দিয়ে আমি নদীপারেই দাহ করে ফিরে যেতে বললাম ওদের। কিন্তু ওরা কথা শুনল না। বলল, ওর বৌ শেষ দেখা না দেখলে কষ্ট পাবে।

জানি না। ওদের সঙ্গে আমি একমত নই। শেষ দেখা সব সময়ই সুন্দরতম দেখা হওয়া উচিত। যখন বিখ্যাত মানুষেরা মারা যান, গায়ক, বাদক, অভিনেতা, সাহিত্যিক তাঁদের যে নাকে তুলো গোঁজা ফোলা-মুখের ছবি কাগজে ছাপা হয় তা আমার বীভৎস লাগে। মৃত মানুষের হাস্যময় ছবিই সব সময় ছাপা উচিত। যে চেহারাটি চোখে লেগে থাকে, প্রিয়জনের কাছে, অনুরাগীদের কাছে, সেই চেহারাটিকেই শোকের দিনে মনে করা উচিত।

ঠিক বলেছ।

আমি আর ভটকাই বললাম, সমস্বরে।

তারপর?

তারপর আর কি? ওদের সাবধানে থাকতে বললাম। ওরা গ্রামে ফিরে গেল মৃতদেহ নিয়ে। আর আমি নদী পেরিয়ে, বাঘ যে নদী পেরিয়ে শিকার-গড়-এর দিকেই গেছে সে সম্বন্ধে নিশ্চিত হয়ে তোদের জন্যে শুধু অপেক্ষা করতে লাগলাম।

আমি বললাম, জানো ঋজুদা। পাহাড়ের উপরে যে গুহা আছে, যার পাশের গাছে আমি সেদিন বসেছিলাম, সেখান থেকে নদীর ঐ জায়গাটা পরিষ্কার দেখা যায়। শম্বরদের দলকে আমি পরিষ্কার দেখেছিলাম নদী পেরিয়ে আসতে। তোমাকেও বাঘ দেখে থাকবে হয়ত।

তবে আমি যে শিকার-গড়ের দিকে যাইনি তাও সে দেখেছে। দেখেছে, জিপে করে তোদের সঙ্গে ফিরে গেছি।

তোমার গুলিহীন রাইফেল নিয়ে ঐ ভাবে শুয়ে থাকাটা অত্যন্ত অবিবেচকের কাজ হয়েছে।

যেখানে অন্য বিবেচনার উপায় নেই। মানে চয়েস নেই, সেখানে উপায় কি?

গ্রামের লোকদের ঐ রাতের শকুন আর বাদুড়ের কথা বলেছিলে? গুলির পর গুলি মিস হওয়ার কথা?

হ্যাঁ।

ওরা কী বলল?

ওরা কিছুই বলল না। ভীত সন্ত্রস্ত চোখে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। ওসব নিয়ে ভাবলে আমাদের চলবে না। কালকেই ঐ বাঘের একটা হেস্তনেস্ত করতে হবে।

কী করে করবে?

কাল বলব। এখন, বালাবাবুকে একবার ডাক ত’! কথা আছে।

ভটকাই গিয়ে বালাবাবুকে ডেকে আনল।

ঋজুদা বলল, কাল খুব ভোরে আপনার একবার বিশ্বল সাহেবের কাছে যেতে হবে জিপ নিয়ে। আমি একটি চিঠি দিয়ে দেব। সাতটার মধ্যে ফিরে আসবেন এখানে। আমরা কিন্তু তার আগেই হেঁটে শিকার-গড়ের দিকে এগিয়ে যাব। বিশ্বল সাহেব আপনার সঙ্গে এক কোম্পানি আর্মড পুলিস দেবেন। তাঁদের ট্রাকও এখানে কুচিলাখাঁই বাংলোতে রেখে যাবেন এবং আপনার জিপও। তারপর গোলমাল না করে বা কথাবার্তা না বলে নিঃশব্দে শিকার-গড়ে ওঠার আগে গ্রামেরও আগে যে মস্ত মহানিমগাছ আছে সেখানে এসে পৌঁছোবেন। তার নিচে আমরা অপেক্ষা করব। তারপর যেমন বলব তেমন হবে। পুলিসদের এবং আপনারও হয়ত সারা দিন খাওয়া হবে না কাল। কিন্তু কিছু করার নেই।

বালাবাবু একমুহূর্ত কী ভাবলেন। তারপর বললেন, চিঠিটা?

লিখে দিচ্ছি।

বলেই, ভটকাইকে বলল, দ্যাখ গিয়ে জগবন্ধুর রান্না হল কী না। আজ তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়তে হবে। জগবন্ধু যেন ভোর চারটেতে আমাদের চা দেয় এবং আমার জন্যে চানের গরম জল।

ঠিক আছে।

বলেই ভটকাই উঠে চলে গেল।

ঋজুদা বলল বালাবাবুকে, আপনাকে চিঠিটা পাঠিয়ে দিচ্ছি রুদ্রকে দিয়ে। আপনিও তাড়াতাড়ি খেয়ে নিন আমাদের সঙ্গেই। কালকে অনেক কাজ।

আমরা যখন কুচিলাখাঁই পাহাড়ের নিচের বাংলো থেকে বেরোলাম তখন পুবের আকাশ সবে লাল হচ্ছে। তখনও পুলিসের গাড়ি আসেনি। এলে আমরা শব্দ পেতাম। ঋজুদা বলেছিলো হেঁটে যাবে কিন্তু জিপ নিয়েই রওয়ানা হলো দেখলাম। কেন প্ল্যান বদলালো জানি না।

জিপ চালাচ্ছে আজকে ভোরে ঋজুদাই। রাইফেলটা আমাকে ধরতে দিয়েছে। হাঁটুর মধ্যে এবং ঋজুদার রাইফেল দুটোকে চেপে আমি দু হাতে ধরে আছি দুটোকে। ভটকাই বসেছে আমার আর ঋজুদার মধ্যে।

শিকার-গড়ের এবং চারপাশের শিকারীদের খবর দেওয়া যায়নি এত কম সময়ে। তাই ঋজুদা আর্মড পুলিসের কোম্পানির সাহায্য চেয়েছে। ব্যাপারটা যে ঠিক মনঃপূত হয়নি তা ঋজুদার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। আমার তো হয়ই নি।

ভারতবর্ষে পুলিসরা সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচারে যতখানি দড় ততখানি দুশমনদের ওপর গুলি ছুঁড়তে নয়। পথের গুণ্ডা বদমাইশদের নিশানা নিয়ে গুলি করলে সে গুলি হয় ফুটপাথের নিরীহ পথচারী নয়ত দোতলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা কোন কৌতূহলী মহিলার গায়ে গিয়েই লাগে। পুলিসদের বিশেষ করে আর্মড পুলিসদের নিশানা ঠিক কেন যে থাকে না তা ভাবলেও অবাক হতে হয়।

বালাবাবুকে ঋজুদা যে মহানিমগাছের কথা বলে দিয়েছিল সেই প্রাচীন গাছের নিচে আমরা জিপ দাঁড় করালাম। সবে ভোর হয়েছে। ঘাস পাতায় সূর্যের নরম সোনালি আঙুলের ছোঁয়া লাগছে সবে। পাখিদের কলকাকলি, ঘাসফড়িঙের তিরতিরে স্বচ্ছ ডানা, শিশিরভেজা মাঠে কান-উঁচু খরগোশের হন্তদন্ত হয়ে এসে নিজের প্রায়-অদৃশ্য গর্তে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া, এই সব দেখছি চুপ করে বসে। একদল বনমুরগি রোদ পোয়াচ্ছে আর ধান খুঁটে খাচ্ছে। গাঢ় বেগুনি, সবুজ, লাল, হলুদ আর সোনালি রঙ ঝিলিক মারছে সকালের নরম রোদে। একটা কোটরা হরিণ, বাদামী দেখাচ্ছে এখন তার গায়ের রঙ, চলে গেল আস্তে আস্তে হেঁটে তার লেজের সাদা পতাকা নাড়তে নাড়তে। দেখতে পায়নি সে আমাদের। আমাদের আজকে বোধহয় কেউই দেখতে পায়নি। নিনিকুমারীর বাঘও আশা করি দেখতে পাবে না।

ঋজুদা জিপ থেকে নেমে, একটা কাঠি ভেঙে নিয়ে পথের ভেজা ধুলোয় ম্যাপ এঁকে আমাদের প্ল্যানটা বোঝাল। বলল, বাঘ যে নদী পেরিয়ে সকালে বা শেষ রাতে শিকার-গড়ে ফিরে এসেছে তা তো কাল দেখাই গেছে। আজও সে শিকার-গড় থেকে বেরিয়ে কোনো দিকে যাবে। কোন দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা? এ পর্যন্ত দেখা গেছে নদী পেরিয়েই সে যায় প্রতিবারে। তারপর নদীর ওপারের ডাইনে বাঁয়ের পথ ধরে বড় বড় গ্রামের দিকে যায়। একটা কথা খুবই আশ্চর্যের যে আমরা আসার আগে সে কিন্তু গড়ের পায়ের কাছের সাম্বপানি গ্রামে অথবা ঐ সর্ষেক্ষেতের গ্রাম থেকে একজনও মানুষ নেয়নি। তার মানে হচ্ছে যে সে দূরে গিয়ে শিকার-গড়ের নিরাপদ আশ্রয়ে নির্বিঘ্নে ফিরে আসতে যদি না পারে সেই ভয়েই হয়ত ইদানীং কাছাকাছি গ্রাম থেকে মানুষ নেওয়া শুরু করেছে।

ভটকাই বলল, কিন্তু ঋজুদা, সাম্বপানির প্রথম মানুষ, মানে সেই বউটাকে তো বাঘ আমরা এখানে আসার সঙ্গে সঙ্গেই নিয়েছিল। তখনও তো বাঘের আদৌ জানার কথা নয়, যে আমরা এসেছি! তুমি তার পরেই তো চণ্ডীমন্দিরে পুজো দেওয়ালে, শিকার-গড়ের নহবৎখানাতে রাত কাটালে। তাই না?

তা ঠিক। ঋজুদা চিন্তান্বিত গলায় বলল।

তারপর বলল, আমি যা ভাবছি তা পুরোপুরি ভুলও হতে পারে। কিন্তু কিছুই না করে বসে থাকলে তো চলবে না। তাছাড়া এই বাঘকে রাতে মোকাবিলা করার অসুবিধা আছে। দিনের আলো থাকতে থাকতেই একে যা করার করতে হবে।

হেসে বললাম, তুমি ভূত-ভগবানকে ভয় পাও? নতুন কথা শুনছি!

পাইপ ধরিয়ে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে ঋজুদা বলল, অন্ধকার বনে বা মানুষখেকো বাঘের নখে ভয় নেই। ভয়টা আমার মনেই। যে কোনো কারণেই হোক পরশু রাতের ঘটনায় আমি সত্যিই ভয় পেয়েছিলাম। সে সব ঘটনার ব্যাখ্যা নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু তা বোঝার সময় এখন নেই। যা কিছুই রোধ করার, প্রতিবিধান বা প্রতিবাদ করা আমার সাধ্যের মধ্যে ছিল না বা এই মুহূর্তে নেই তার সবকিছুকেই আমি ঘৃণা করি। সেই দৃশ্য অথবা অদৃশ্য শক্তিকে, সে শক্তি ভুতুড়ে অন্ধকারই হোক, কোনও দেবীর কৃপাধন্য মানুষখেকো বাঘই হোক বা ক্ষমতান্ধ কোনো রাজনৈতিক নেতা বা দলই হোক, তাকে ছিন্নভিন্ন, নির্মূল না করা পর্যন্ত আমার ঘুম হয় না।

আমি রুটির মধ্যে তরকারি পুরে ঋজুদাকে এগিয়ে দিয়ে বললাম, নাও।

ঋজুদা বলল, তোরা খা। আমি তোদের ব্যাপারটা ততক্ষণে বুঝিয়ে দিই ভাল করে। আমি আর ভটকাই রুটি তরকারি খেতে লাগলাম।

ঋজুদা বলল, নিনিকুমারীর বাঘ শিকার-গড়েই আছে। দিনমানে শিকার-গড়ের সমস্ত জঙ্গল ঝেটিয়ে হাঁকা করে তাকে তাড়িয়ে পাহাড় জঙ্গলের আড়াল থেকে নামিয়ে নদী পার করাতে হবে। রাস্তাটা যেখানে নদীকে কেটে গেছে বাঘ ঠিক সেইখান দিয়েই নদী পেয়োয়। নদী তো বাঁকও নিয়েছে ঐখানে। অতখানি ফাঁকা জায়গা আর কোথাওই নেই। তাকে মারা গেলে ওখানেই যাবে। নইলে বাঘ নিয়ে কপালে দুর্ভোগ আছে অনেক।

আমি বললাম, বাঘ যদি বিটারদের লাইন ক্রস করে বিপরীত দিকে চলে যায়? কাউকে আহত করে? নদীর দিকে সে যদি আদৌ না যায়?

ঠিক বলেছিস। তেমন সম্ভাবনা আছে বলেই আমি বিটিং-এর ঢাক-ঢোল বা শিঙা ব্যবহার করছি না। সাধারণ হাঁকাওয়ালাও নয়। আর্মড পুলিসের কোম্পানি শিকার-গড়ের বাঁদিকে বেড়া তৈরি করবে অর্ধচন্দ্রাকারে। তারপর ত্রিশ সেকেন্ড পর পর গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে পুরো গড় এবং গড়ের সামনে-পেছনের দিকে চিরুনি অভিযান চালিয়ে বাঘকে তাড়িয়ে নিয়ে যাবে। অত লোক আর অত রাইফেলের গুলির আওয়াজ একসঙ্গে শুনে বাঘ স্বভাবতই অচেনা জঙ্গলে না নিয়ে তার চেনা জঙ্গলের দিকেই যাবে। নদী পেরোতে পারলেই তো ডান দিকে বাঁদিকে তার দীর্ঘদিনের পরিচিত শিকারভূমি। এবং নদী পেরোবার সময়ই তাকে মারতে হবে।

তোমার এই অঙ্ক যদি না মেলে? ভটকাই বলল।

ঋজুদা বলল, আমি আর ভটকাই থাকব নদীর ওপারে। আর রুদ্র থাকবে পুলিসের সঙ্গে যারা বিট করবে। বাঘ বিটার-লাইন ক্রস করতে পারে। তাই বিটারদের সঙ্গেও একজন অভিজ্ঞ শিকারী থাকা দরকার।

অভিজ্ঞ কথাটায় আমার নাকের পাটা ফুলে গেল।

ভটকাই আওয়াজ দিল। বলল, বাবাঃ! অভিজ্ঞ শিকারী রুদ্র রায়?

আমি বললাম, তুমি এবার খেয়ে নাও ঋজুদা। চা খাবে তো?

তাড়া করে লাভ নেই? আমর্ড পুলিসের লোকেরা জানে যে সারাদিন তাদের খাওয়া নেই। তাই তারাও জম্পেশ করে আর্লি ব্রেকফাস্ট করেই আসছে। তাছাড়া বেচারাদের কারবার চোর-ডাকাত নিয়ে। নিনিকুমারীর বাঘকে অ্যারেস্ট করতে হবে শুনেই তো অনেকের হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। সে বেচারিরা চাকরি করে। খামোখা মানুষখেকো বাঘের খাদ্যই বা হতে যাবে কেন তারা?

নাও, খাও। আমি বললাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *