নীচে নামো বাঁয়ে ঘোরো (কর্নেল সমগ্র) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
নীচে নামো বাঁয়ে ঘোরো
সেই মরচে ধরা ঘোরালো লোহার সিঁড়ি দিয়ে আগে কর্নেল উঠে গেলেন। তারপর আমি সাবধানে উঠলাম। দোতলার বারান্দায় উঠে কর্নেল আস্তে কাসলেন। একটু পরে ছন্দা বেরিয়ে এলেন। তাকে খুব গম্ভীর দেখাচ্ছিল।
কর্নেল বললেন, এবার তোমার শ্বশুরমশাইকে খবর দাও, আমি দেখা করতে চাই।
ছন্দা টিনির পড়ার ঘরে আমাদের বসিয়ে চাপা গলায় বললেন, আমি আপনাকে মন্দিরে ঢুকতে দেখলাম। আপনি কীভাবে লক খুললেন?
যথাসময়ে বলব। তুমি কুমারবাহাদুরকে খবর দাও!
ছন্দা ভেতরের একটা দরজার পর্দা সরিয়ে চলে গেলেন। বললাম, মন্দিরের ভেতরে বিষ্ণুমূর্তি দেখতে পেলেন তো?
কর্নেল বললেন, এখন কোনও কথা নয়। মুখ বুজে থাকবে কিন্তু!
মুখ বুজে থাকলাম। কিছুক্ষণ পরে টিনির সাড়া পাওয়া গেল। সে সেই ছড়াটা। সুর ধরে বলতে বলতে এ ঘরে ঢুকল। তারপর থমকে দাঁড়িয়ে কর্নেলকে বলল, আবার তুমি এসেছ? তোমার দাড়ি সাদা কেন বলোনি। এখন বলবে?
কর্নেল তাকে হাত বাড়িয়ে ধরতে গেলেন। সে ছিটকে সরে গেল। কর্নেল বললেন, তোমার দাদু কেন বেড়াল মেরেছেন আগে বলো। তা হলে বলব।
আমি দেখিনি।
আহা, বেড়ালটাকে তো দেখেছ?
বাহাদুর মরা বেড়ালটা কোথায় ফেলে দিয়েছে। বাহাদুরকে জিজ্ঞেস করলে বলবে।
তুমি তা-ও দেখনি?
এই সময় ছন্দা এসে বললেন, আপনারা ভেতরে যান। আমি টিনিকে স্নান করাতে যাচ্ছি! টিনি! কাল স্নান করিসনি। আজ স্নান করবি আয়!
টিনি পালাতে যাচ্ছিল। ছন্দা তাকে ধরে ফেললেন। আমরা ভেতরের ঘরে ঢুকলাম। এ ঘরটা ফাঁকা। শুধু কিছু পুরনো আসবাব এক কোণে পড়ে আছে। কর্নেল ঘরটায় চোখ বুলিয়ে সামনের দরজার পর্দা তুলে বললেন, মর্নিং কুমারবাহাদুর। তারপর ঢুকে গেলেন। আমি ওঁকে অনুসরণ করলাম।
সত্যেন্দ্রনাথ তার বিছানায় পা ছড়িয়ে কালকের মতো বালিশে হেলান দিয়ে বসেছিলেন। মুখটা খুব গম্ভীর মনে হল। বললেন, কর্নেলসায়েব! আমি বুঝতে পেরেছি কেন আপনি আবার এসেছেন। একজন ক্রিমিন্যাল শয়তানের জন্য আপনার কেন এত দয়া বুঝতে পারছি না।
কর্নেল খাটের পাশে চেয়ার টেনে বসলেন। আমিও বসলাম। তারপর কর্নেল সহাস্যে বললেন, কুমার বাহাদুর! আপনি ভুল বুঝেছেন। আমার কয়েকটা ক্যাকটাসের গায়ে কতকগুলো রেড স্পট দেখা দিয়েছে। সেই ব্যাপারেই আমি কথা বলতে এসেছি। আমার মনে পড়ছে, আপনি একবার আমাকে কী একটা ওষুধ লিখে দিয়েছিলেন। প্লিজ যদি সেটা আবার লিখে দেন
আমার ডান হাত অচল। আমি বলছি, আপনি লিখে নিন।
কর্নেল পকেট থেকে নোট বই আর কলম বের করে কী একটা খটোমটো নাম লিখে নিলেন। তারপর বললেন, এটা কি যে কোন কেমিস্টের কাছে পাওয়া যায়? সেবার অনেক ঘোরাঘুরি করে তবে একটা ফার্মেসিতে পেয়েছিলাম।
এই পাড়াতেই পাবেন। কুণ্ডু ফার্মেসি-আপনার যাওয়ার পথেই পড়বে।
ছন্দা বলল, আপনার স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়েছে অসুখটা নাকি প্যারালেসিস নয়।
সত্যেন্দ্রনাথ ডান হাত একটু তুলে মুঠো করে বললেন, ইচ্ছাশক্তি। বাহাদুর কাল থেকে ওদের দেশের প্রথায় মালিশ করে দিচ্ছে। একটু আগে বউমাও মালিশ করে দিচ্ছিল। আশা করি, এই সপ্তাহের শেষাশেষি চলাফেরা করতে পারব। আপনি কফি খাবেন তো?
ধন্যবাদ! অসময়ে আর বিরক্ত করব না আপনাকে। চলি।
বসলেন তো আর একটু বসুন। কথা আছে।
বলুন!
আমি ঠিক করেছি, একটু সুস্থ হলেই এই বাড়ি আর গৃহদেবতাসহ মন্দির বেঁচে দিয়ে মোহনপুরে আমাদের পুরনো বাড়িতে গিয়ে থাকব। মোহনপুরের বাড়িটা আপনার মনে পড়তে পারে। মেরামত করলে আরও দু-তিনশো বছর বাস করা যাবে।
কর্নেল হাসলেন। হাজারিলাল মোট উনচল্লিশ লাখ টাকা দিতে চেয়েছে। তাই না?
সত্যেন্দ্রনাথ নড়ে বসলেন। কে বলল আপনাকে? বউমা?
নাহ। ছন্দা জানে না।
তা হলে কে বলল?
আমার সোর্স বলা বারণ। দুঃখিত কুমারবাহাদুর! কর্নেল তার কাঁধের কিটব্যাগটা খুলে দুই ঊরুর ওপর রাখলেন। ফের বললেন, কিন্তু আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, যে-বিষ্ণুমূর্তির জন্য হাজারিলাল আপনাকে তিরিশ লাখ টাকা দিতে চেয়েছে, তা সত্যিই মন্দিরে আছে তো?
সত্যেন্দ্রনাথের চোখ জ্বলে উঠল। কেন থাকবে না? কাল আপনারা যখন ছিলেন, তখন আমি দেখে এসেছি। তারপর সন্ধ্যায় আবার বাহাদুরের সাহায্যে মন্দিরে গিয়ে নিজেই পুজো করেছি। আজ ভোরেও–
কর্নেল তার কথার ওপর বললেন, সেটা আসল না নকল মূর্তি, তা লক্ষ্য করেছেন কি?
কালকের মতো আবার আপনি আসল-নকলের প্রশ্ন তুলছেন। কাল আপনাকে বলেছি, আসল মূর্তিই আছে। আপনার এই হেঁয়ালির উদ্দেশ্য কী।
কুমারবাহাদুর!.কাল আপনি মন্দিরে ঢুকে প্রদীপ জ্বেলেছিলেন কি?
না জ্বাললেও আমাদের গৃহদেবতাকে আমি চিনি। দুচোখে পদ্মরাগ মণি বসানো আছে। বাইরের আলোতেও তা ঝকমক করে ওঠে। তাছাড়া কাল সন্ধ্যায় এবং আজ ভোরে প্রদীপ জ্বেলেছিলাম।
হাজারিলাল বয়সে তরুণ হলেও দুর্ধর্ষ। ওর সাঙ্গোপাঙ্গরা সাংঘাতিক দুবৃত্ত। পুলিসও ওকে সমীহ করে চলে। তাই বলছি, মূর্তি যদি নকল হয়, আপনার বিপদ ঘটতে পারে।
আমার মেজাজ নষ্ট করে দিচ্ছেন কর্নেলসায়েব! আপনি আমার পুরনো বন্ধু। অন্য কেউ হলে জোরে শ্বাস ছেড়ে সত্যেন্দ্রনাথ ফের বললেন, আমার ব্যাপারে প্লিজ আপনি নাক গলাবেন না।
কর্নেল হাসলেন। এ কথা ঠিক যে, নরহরিবাবুকে বিষ্ণুমূর্তি চুরি করানোর জন্যই আপনার ছেলের বন্ধু বীরেশ্বর সেন আপনার গৃহদেবতার সেবাইতপদে সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু ধর্মভয়ে হোক বা আপনার ভয়েই হোক, উনি তা পারছিলেন না। আপনি যখন তা টের পেলেন, তখন সতর্ক হলেন। এবার বলুন, কীভাবে আপনি টের পেয়েছিলেন?
সত্যেন্দ্রনাথ নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে কর্নেলের কথা শুনছিলেন। শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে বললেন, আপনি সব জানেন তা হলে?
কিছু তথ্য থেকেই এটা আমার অনুমান মাত্র।
সত্যেন্দ্রনাথ একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, গতমাসে একদিন বিকেলে দোতলার বারান্দায় বসে আছি। হঠাৎ থামের পাশ দিয়ে দেখি, নীচের গেটে দুর্গাদাস নরহরির হাতে কী একটা গুঁজে দিয়ে চলে গেল। সেটা কোমরে ধুতির ভাঁজে খুঁজে নরহরি চলে এল। আমি ওকে কিছু জিজ্ঞেস করলাম না। সন্ধ্যায় ও মন্দিরে পুজো করতে ঢুকল। তখন আমি ওর থাকার ঘর সার্চ করলাম। মহাধূর্ত। বীরেশ্বরের এয়ারমেলে পাঠানো একটা চিঠি দেয়ালের একটা তাকে পঞ্জিকার তলায় রেখে দিয়েছে। চিঠিটায় চোখ বুলিয়ে মাথায় আগুন ধরে গেল। কিন্তু ওকে আমি পারিবারিক প্রথা অনুসারে তালা খোলার সিস্টেম সরল বিশ্বাসে শিখিয়ে দিয়েছিলাম। ওকে পুলিসের হাতে তুলে দিই বা তাড়িয়ে দিই, একই কথা। পুলিসের হাত থেকে একদিন ছাড়া পাবেই। তখন কী হবে?
এক মিনিট। তালার নাম্বারিং সিস্টেম চেঞ্জ করা যায় না?
নাহ। তবে আমি চেঞ্জ করতে জানি বলে রটিয়েছি। কেন তা বুঝতেই পারছেন!
হ্যাঁ। বাই দি বাই–জয়রাম শর্মা কি সত্যি নিখোঁজ হয়েছিলেন?
সত্যেন্দ্রনাথ হাল ছেড়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, আপনি সবই জানেন দেখছি! •
জেনেছি। জানার দরকার ছিল।
কার স্বার্থে?
কর্নেল একটু হেসে বললেন, নিজের স্বার্থে। আমার হবির কথা আপনার অজানা নয়।
প্লিজ কর্নেল সায়েব! আর এতে নাক গলাবেন না।
ঠিক আছে। গলাব না। কিন্তু আপনি টাকার লোভে হাজারিলালকে নকল বিষ্ণুমূর্তিসহ মন্দির বেচে দেবেন না। আপনার মঙ্গলের জন্য বলছি। মোহনপুরে গিয়েও হাজারিলালের হাত থেকে আপনি বাঁচবেন না। দুর্গাপ্রসাদ মোহনপুরের লোক। কিন্তু সে থাকে এখানে। আপনি ভেবেছেন, মোহনপুরে দুর্গাপ্রসাদের ঘাঁটি আছে। কিন্তু যতই ঘাঁটি থাক, অন্তত আপনার নাতনি টিনির কথা চিন্তা করুন। হাজারিলাল সব পারে।
সত্যেন্দ্রনাথ গলার ভেতর বললেন, কিন্তু হাজারিলালের মূল উদ্দেশ্য দেবতাসহ মন্দির কেনা। ওর প্রচণ্ড ধর্মবাতিক আছে। এদিকে দুর্গাপ্রসাদের কাছে আমার দু লক্ষ টাকার বেশি দেন।
দুর্গাপ্রসাদ বাড়ি কিনতে চাইলে তাকে বেচে দিন।
একই প্রব্লেম। হাজারিলাল রেগে যাবে। আমার হয়েছে উভয়সঙ্কট। দুর্গাপ্রসাদ যেমন দুবৃত্ত, হাজারিলালও তা-ই।
তাহলে কোনও থার্ড পার্টিকে বেচে দিয়ে কলকাতাতেই কোথাও ফ্ল্যাট কিনে চলে যান। বলে কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। তারপর পা বাড়াতে গিয়ে হঠাৎ ঘুরলেন। শুনলাম কাল আপনি এক আছাড়ে একটা বেড়াল মেরেছেন। বেড়ালের নাকি নটা প্রাণ! এক আছাড়ে বেড়াল মারা কম কথা নয়।
সত্যেন্দ্রনাথ বালকের মতো গর্জন করলেন, কী বলতে চান আপনি?
কর্নেল আস্তে বললেন, বলতে চাই, পূর্বপুরুষের জমিদারি রক্ত আপনার শরীরে আছে।
কথাটা বলেই কর্নেল দ্রুত দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। আমিও ওঁকে অনুসরণে দেরি করলাম না। মনে হচ্ছিল, পিঠে জমিদারি শ্বাসপ্রশ্বাসের গরম ঝাঁপটা এসে লাগছে।
ই এম বাইপাসের মোড়ে কর্নেল কালকের মতোই নেমে গেলেন। আমার মনে অনেক প্রশ্ন থেকে গেল। কিন্তু তখন কিছু করার ছিল না।…
সেদিন সন্ধ্যার পর সত্যসেবক পত্রিকার অফিস থেকে কর্নেলকে ফোন করলাম। ষষ্ঠীচরণ সাড়া দিয়ে বলল, বাবামশাই বেইরেছেন। বলে গেছেন, কখন ফিরবেন কিছু ঠিক নেই।
কর্নেলের সাড়া পেলাম টেলিফোনে পরদিন সকালে। মর্নিং ডার্লিং! আশা করি সুনিদ্রা হয়েছে।
বললাম, মর্নি ওল্ড বস! মোটেও হয়নি। চিচিং ফাঁকের ব্যাপারটা
বীরু!
ওঃ কর্নেল!
চলে এস। এখানেই তোমার বেকেরফাস্টোর নেমন্তন্ন।
টেলিফোন রেখে ঝটপট তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম। কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছুতে পৌনে নটা বেজে গেল।
বৃদ্ধ রহস্যভেদী ইজিচেয়ারে বসে চুরুট টানছিলেন। বললেন, আজ কেউ আসছে না। কাজেই নটায় ব্রেকফাস্ট করা যাবে। তারপর কফি।
বললাম, কাল সন্ধ্যায় ফোন করেছিলাম। কোথায় বেরিয়েছিলেন?
বিকেলে ছন্দা ফোন করেছিল। আমি চলে আসার পর কুমারবাহাদুর জঙ্গ বাহাদুরের কোলে চেপে মন্দিরে গিয়েছিলেন। তারপর কেলেঙ্কারি! কর্নেল তাঁর অট্টহাসিটি হাসলেন। মন্দিরে বিষ্ণুমূর্তি নেই। কুমারবাহাদুর হইচই বাধিয়েছেন। পুলিসকেও জানিয়েছেন। আমিই নাকি মূর্তি চুরি করেছি।
সে কী! তারপর?
ওকে আশ্বস্ত করে বললাম, আমি যাচ্ছি। তারপর ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর মিঃ নন্দীকে ফোন করলাম। প্রথমে গেলাম তার কাছে। যতটুকু বলা উচিত, তাকে বললাম। তারপর মোহনপুর প্যালেসের দিকে যাচ্ছি। হঠাৎ শুনি বোমাবাজি শুরু হয়েছে। ওই এরিয়ায় দুর্গাপ্রসাদ আর হাজারিলালের গ্যাং প্রায়ই মারপিট বোমাবাজি করে। লোকেদের গা সওয়া ঘটনা, পুলিসও যায়–তবে যথা সময়ে। কী আর করা যাবে? ফিরে আসছিলাম। পথে আমার আরে পুরনো বন্ধু রঘুবীর সিংহের সঙ্গে দেখা। দমদম ক্যান্টনমেন্টে ছিলেন। উনিও এক কর্নেল। রিটায়ার করে বাড়ি করেছেন ভি. আই. পি. রোডের ধারে। তার বাড়িতে আড্ডা দিয়ে–
ষষ্ঠী এ ঘরে ব্রেকফাস্টের ট্রে আনায় ওঁর কথায় বাধা পড়ল। ব্রেকফাস্টের সময় বললাম, এবার চিচিং ফাঁকের ব্যাপারটা বলুন।
কর্নেল বাঁ হাতে টেবিলের ড্রয়ার থেকে সেই তার নকশাটা বের করে বললেন, এটা লক করা। তালাটার মাঝখানে বিন্দুগুলো জোড়ের চিহ্ন। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে তালাটা দুটো অর্ধবৃত্তে ভাগ হয়ে যায়।
বললাম, মাথামুণ্ডু কিছু বুঝতে পারছি না।
কর্নেল বললেন, টিনির ছড়াটা স্মরণ করো।
নীচে নামো বাঁয়ে ঘোরো।
তবেই তোমার পোয়াবারো।
কর্নেল ছড়াটা আওড়ে বললেন, টি হরফ থেকে নীচে নামলে এইচ। এবার দেখ, ওপরে এক হরফের কাছে তীরচিহ্ন আছে। নবটা ঘোরাতে হবে বাঁদিকে। এইচ থেকে বাঁয়ে ঘুরিয়ে এইচ-কে তীরচিহ্ন-আঁকা এক হরফের জায়গায় পৌঁছে দিলেই পোয়াবারো। তার মানে, কার্যসিদ্ধি। দরজা খুলে যাবে। এই সূত্রটার সঙ্গে নরহরি ভট্টাচার্যের অন্তিম মুহূর্তের কথাটা আমার মাথায় এসেছিল। উনি বীরু বলেছিলেন, নাকি হিরো বলেছিলেন? লক করো! নীচে নেমে অর্থাৎ এইচ হরফ ধেকে বাঁদিকে পড়লে হিরো শব্দটা পেয়ে যাচ্ছি। মধ্যিখানে নবের ওপর লেখা টি হরফ ইংরেজি টার্ন শব্দটার আভাস দিচ্ছে। টি মানে টার্ন অর্থাৎ ঘোরাও বা ঘোরো।
বাহ! বেশ কারিগরি কৌশল তো। আবার এই দেখুন, টি থেকে নেমে ডাইনে ঘুরে পড়লে THEREFORE দাঁড়াচ্ছে!
হ্যাঁ। ইচ্ছে করেই এই গোলকধাঁধা তৈরি করা হয়েছে।
কিন্তু নরহরিবাবু হিরো শব্দটা বলেছিলেন কেন?
মন্দিরের দরজার ভেতরদিকেও একই তালা আছে। ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করলেও লর্ড হয়ে যাবে। তখন বেরুতে হবে নব ঘুরিয়ে তীরচিহ্ন থেকে হিরো সাজতে হবে। কর্নেল স্যান্ডউইচের শেষ টুকরো গিলে বললেন, তখন ছন্দাকে আসতে দেখে আততায়ী মন্দিরের ভেতর লুকিয়ে দরজা টেনে লন্ড করে দিয়েছিল। নরহরি ভট্টাচার্য চেয়েছিলেন, হিরো শুনে বুদ্ধিমতী ছন্দা যদি তালার দিকে তাকায়–সেটা খুবই স্বাভাবিক ছিল। তুমি হিরো শব্দটা শোনার পর তালার দিকে তাকালেই শব্দটা দেখতে পাবে। তাই না?
ঠিক বলেছেন। এখন চোখে পড়ছে বটে।
ছন্দার হিরো শুনে লকের দিকে তাকানো উচিত ছিল। কারণ এত বছর ধরে সে তালাটা দেখছে। সে জানে, তালাটার নাম্বারিং সিস্টেম আছে। বিশেষভাবে ঘোরালেই খুলে যাবে। কিন্তু সে হিরো শুনতে বীরু শুনেছিল। কারণ বীরু তার স্বামীর বন্ধু। পরিচিত নাম।
তা হলে আততায়ী তখন মন্দিরের ভেতর ছিল বলছেন?
ছিল। নরহরিবাবু চেয়েছিলেন, ছন্দা আততায়ীকে দেখুক।
কে সেই আততায়ী?
কর্নেল বাঁহাতে টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা সলিউশনের শিশি বের করে বললেন। এটা তরল আঠার মতো পিছল। জলের মতো রঙ। কোনও শানবাঁধানো জায়গায় মাখিয়ে রাখলে চোখে পড়বে না। কিন্তু পা দিলেই তুমি আছাড় খাবে। আচমকা আছাড় খেলে সব বীরপুরুষই অসহায়! হা–এটা ক্যাকটাসের রোগের সেই ওষুধ।
চমকে উঠে বললাম, বলেন কী! তা হলে কুমারবাহাদুর
হ্যাঁ। কুমারবাহাদুরই খুনী। জরিদারি রক্ত। তাছাড়া বরাবর রাগী এবং গোঁয়ার মানুষ। এদিকে গৃহদেবতা শ্রীবিষ্ণুকে যে চুরি করতে চাইবে, সে-ই তার কোপানলে পড়বে। জয়রাম শর্মা নিখোঁজ হয়েছিলেন। তখন কুমারবাহাদুরের পক্ষে কাকেও নিখোঁজ করে ফেলার সামর্থ্য ছিল এখন অতটা নেই। সময়ও পাননি। ছন্দা দৌড়ে গিয়েছিল!
কিন্তু ওঁর ডান হাত এবং পায়ে
ওটা চালাকি। নরহরি ভট্টাচার্যকে মেরে ফেলার ফাঁদ।
কিন্তু নরহরিবাবুকে খতম করে উনি মন্দিরে আত্মগোপন করেছিলেন, সে-কথা আপনি কী ভাবে জানতে পারলেন?
ছন্দা কাল টেলিফোনে আমার কাছে স্বীকার করেছে, নরহরিবাবুর খুন হওয়ার খবর তার শ্বশুরমশাইকে দিতে এসে সে বিছানায় ওঁকে দেখতে পায়নি। কোনও সত্যিকার পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষ বিছানা ছেড়ে উঠতে পারে না।
তা হলে ছন্দা জানত কে খুনী?
তার সন্দেহ স্বাভাবিক। তখন নীচের হলঘরে মন্দিরে যাওয়ার দরজা ওদিক থেকে বন্ধ ছিল। কাজেই কুমারবাহাদুর লোহার ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে নেমে যান। ছন্দা আমাদের ওই সিঁড়িটা দেখিয়ে এবং সেখান দিয়ে নামতে বলে আসলে একটা আভাস দিতে চেয়েছিল। তাছাড়া কাল টেলিফোনে তার শ্বশুরমশাইয়ের বেড়াল মারার ঘটনা বলেও সে জানাতে চেয়েছিল, কুমারবাহাদুরের হাত কত ক্ষিপ্রগতি এবং কত শক্তিশালী!
আপনি পুলিসকে জানাচ্ছেন না কেন?
যা প্রমাণ করতে পারব না, তা জানিয়ে কী লাভ? কুমারবাহাদুর এতটুকু সূত্র রাখেননি, যা দিয়ে ওঁকে খুনী প্রমাণ করা যাবে। হাতুড়ি বা লোহার রড জাতীয় কিছু ওঁর মার্ডার উইপন। সেটা উনি সম্ভবত মন্দিরের পেছনের পুকুরে ফেলে দিয়েছেন। তা উদ্ধার করা কঠিন। করলেও প্রমাণ করা যাবে না, উনিই ওটা ব্যবহার করেছিলেন।
কর্নেল ব্রেকফাস্ট শেষ করে কফির পেয়ালা তুলে নিলেন। ফের বললেন, নরহরিবাবুকে খতমের প্ল্যান রাত্রেই করেছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ। তোমাকে দেখিয়েছিলাম, মন্দিরের ঘাটের দরজায় সামনে ঝোপঝাড় দুমড়ে-মুচড়ে বাঁকা করা হয়েছে। কিছু ডালও ভাঙা হয়েছে। হুড়কো খুলে এমনভাবে রাখা আছে, তাতে মনে হবে খুনী ওই পথেই চলে গেছে। কিন্তু মাকড়সার জালের দিকে চোখ পড়তেই বুঝতে পেরেছিলাম, খুনী দরজা খুলে পালায়নি। ক্লিয়ার?
ক্লিয়ার। কিন্তু ফোনে আপনাকে হুমকি দিচ্ছিল কে?
কুমারবাহাদুর। বোঝা যাচ্ছে, নরহরিবাবু ফিরে গিয়ে ছন্দাকে আমার কথা চুপিচুপি জানিয়েছিলেন। কুমারবাহাদুর তো সত্যিই পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগী নন। ওত পেতে তা শুনে থাকবেন। জয়ন্ত! এ অনুমান যুক্তিসিদ্ধ। কারণ দ্বিতীয় বার হুমকির ফোন আমি স্বকর্ণে শুনেছি। কুমারবাহাদুরের কণ্ঠস্বর আমার কানকে ফাঁকি দিতে পারেনি। তবে তোমার চোখে পড়া উচিত ছিল, ছন্দার ঘরের টেলিফোনের একটা এক্সটেনশন লাইন কুমারবাহাদুরের ঘরেও ছিল। তিনি আড়ি পেতে আমার সঙ্গে ছন্দার বাক্যালাপ শুনতেন, এটা স্পষ্ট।
এইসময় টেলিফোন বাজল। কর্নেল রিসিভার তুলে সাড়া দিয়ে বললেন, হ্যাঁ। বলো ছন্দা! …হাওড়া স্টেশন থেকে? কী ব্যাপার? …ঠিক আছে। উইশ ইউ গুডলাক। …সেটাই ভালো, তোমাদের আর মোহনপুর প্যালেসে থাকার উচিত নয়। মোহনপুরেই…তো শোনো! আমি তোমার শ্বশুরমশাইকে নকল বিষ্ণুমূর্তিটা ফেরত দিতে চেয়েছিলাম। ..দিতে হবে না? …উনি ফেরত চান না? ঠিক আছে। এগেন উইশ ইউ গুডলাক। ছাড়ছি।
টেলিফোন রেখে কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, কুমারবাহাদুর তার বউমা আর নাতনিকে নিয়ে মোহনপুরে পাড়ি জমালেন। সঙ্গে আসল বিষ্ণুমূর্তি নিয়ে যাচ্ছেন। বাহাদুর মোহনপুর প্যালেসের কেয়ারটেকার হয়ে রইল। অ্যামব্যাসাডর গাড়িটা ছন্দা অগত্যা দুর্গাপ্রসাদকে মাত্র তিরিশ হাজার টাকায় বেচে দিয়েছে। পরে বাড়িটা বেচে দেওয়ার ব্যবস্থা হবে।
বুঝলাম। কিন্তু একজন খুনীকে আপনি ছেড়ে দিলেন, এটা ঠিক হল না।
ডার্লিং! আবার বলছি, এ একটা বিচিত্র কেস। খুনী কে, তা জানা সত্ত্বেও আমি প্রমাণ করতে পারব না। কী আর করা যাবে? তবে এ তো ঠিক, আমাদের দেশের অমূল্য সব মূর্তি যারা বিদেশে পাচার করছে, তাদের ক্ষমা করা যায় না। বিশেষ করে লোক নরহরিবাবু আমার সাহায্য নিতে কেন এসেছিলেন, তোমার তো বোঝা। উচিত। উনি আমার সাহায্যে আসল মূর্তিটা হাতাতে চেয়েছিলেন, তাই নয় কি? আমি আসল মূর্তি উদ্ধার করে দিলে তা উনি বীরেশ্বরকে দিতেন।
বৃদ্ধ রহস্যভেদী কফিতে শেষ চুমুক দিয়ে চুরুট ধরালেন। তারপর অভ্যাস মতো চোখ বুজে ইজিচেয়ারে হেলান দিলেন। চুরুটের নীল ধোঁয়ার একটা রেখা আঁকাবাঁকা হয়ে ওঁর টাক ছুঁয়ে ফ্যানের বাতাসে মিলিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পরে চুরুটের এক টুকরো ছাই ওঁর দাড়িতে যথারীতি খসে পড়ল। সাদা ঝকমকে দাড়িতে ছাইটুকু পড়ামাত্র বলে উঠলাম, সভ্যতার ওপর বর্বরতা!
কর্নেল চোখ খুলে বললেন, কী?
হাসতে হাসলে বললাম, সেদিন বিকেলে আপনি বলছিলেন, সভ্যতার সঙ্গে বর্বরতার সম্পর্ক যেন অচ্ছেদ্য। বর্বরতা ছাড়া সভ্যতা হয়তো টেকে না।
কর্নেল নীলাদ্রি সরকার হাসলেন না। গম্ভীর মুখে বললেন, হ্যাঁ। বর্বরতা দিয়ে সভ্যতাকে রক্ষার প্রয়োজন মাঝে-মাঝে দেখা দেয়। একটা নরহত্যার বর্বরতার একটা সভ্যতার সম্পদকে রক্ষা করেছে।
আহা! আমি বলছি আপনার দাড়িতে ছাইয়ের টুকরো–
একই কথা। বলে বৃদ্ধ রহস্যভেদী আবার চোখ বুজে হেলান দিলেন।…
