নীচে নামো বাঁয়ে ঘোরো (কর্নেল সমগ্র) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
বিষ্ণুমূর্তি এবং দুই বাহাদুর
আমাদের বসিয়ে রেখে ছন্দা চলে গিয়েছিলেন। এই ঘরটা কিছুটা সাজানো গোছানো। দেয়ালে টাঙানো একটা ছবিতে ছন্দা এবং মৃগেন্দ্রকে দেখতে পেলাম। সম্ভবত বিয়ের পর তোলা ছবি। একটা জানালার পাশে টিনির লেখাপড়ার টেবিল এবং বইখাতা সাজানো। টেবিলে মৃগেন্দ্রের একটা বাঁধানো ছবি রাখা আছে। মৃগেন্দ্র সুদর্শন ছিলেন বলে মনে হল। অবশ্যি রাজবংশধরদের চেহারায় একটা উদ্ধত ধরনের লাবণ্য থাকে দেখেছি। কিংবা এটা আমার মতো সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষের চোখের ভুল!
কর্নেল মন্দিরের দিকের জানালায় গিয়ে বাইনোকুলারে কী দেখেছিলেন। একটু পরে সেখান থেকে সরে এসে চেয়ার টেনে বসলেন। বললেন, মন্দিরের পেছনে পুকুরটা একসময় জলা ছিল। অনেকখানি ভরাট করে বাড়ি উঠেছে। বাকিটাও ভরাট করা হচ্ছে।
বললাম, মন্দিরের ওখানে পুকুরঘাটে নামার দরজা দেখে এলাম। কেউ ওদিক থেকে পাঁচিল ডিঙিয়ে এসে ফুলগাছের আড়ালে ওত পেতেছিল হয় তো। তারপর যেই ভট্টচামশাই আছাড় খেয়ে পড়ে গেছেন, অমনি সে
জল্পনা করে লাভ নেই জয়ন্ত! কর্নেল আমার কথার ওপর বললেন। তবে হ্যাঁ। ছন্দা বলছিল ওই দরজাটা নাকি বহু বছর ভোলা হয়নি। তা ঠিক নয়। দরজায় সামনে আগাছার জঙ্গলটা লক্ষ্য করেছি। কিছু কিছু ঝোপ বেঁকে আছে। সেটা অবিশ্যি নানা কারণেই হতে পারে।
কর্নেল! আমি একটু উত্তেজিত হয়ে উঠলাম। কাল ভটচাযমশাই প্রথমে আপনাকে বলছিলেন ওঁর খটকা লেগেছে। পরে বললেন, আসল মূর্তিটা উদ্ধার করে দিতে হবে। তার মানে উনি বুঝতে পেরেছিলেন এই বিষ্ণুমূর্তি নকল!
কর্নেল হাসলেন, ওঁর খটকাতে আমারও খটকা লেগেছিল। যাই হোক, এখন ওসব কথা থাক্।
ছন্দা পাশের ঘরের দরজার পর্দা তুলে ট্রেতে দু পেয়ালা কফি আর এক প্লেট পটাটো চিপস্ নিয়ে এলেন। আস্তে বললেন, শ্বশুরমশাই আজ সওয়া দশটাতেই জেগে গেছেন। জিজ্ঞেস করেছিলেন, কারা এসেছে? আমি ওঁকে বললাম, দুজন ভদ্রলোক আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। একটু পরে ওঁদের নিয়ে আসছি। আপনারা কফি খান। আমি গেট বন্ধ করতে ভুলে গেছি। এখনই খাটালের গোরু-মোষ এসে ঢুকে পড়বে।
ছন্দা ব্যস্তভাবে চলে গেলেন। কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন, আমার মনে পড়ছে, কুমারবাহাদুর সত্যেন্দ্রনাথ বলতেন, এই বাড়িটা বেচে দিয়ে অন্য কোথাও চলে যাবেন। শুধু ওঁদের গৃহদেবতার জন্য তার পারছেন না। গৃহদেবতাকে স্থানচ্যুত করা নাকি পাপ।
আপনি তো সব কিছুতেই নাক গলান! হাসতে হাসতে বললাম। এই অদ্ভুত মন্দিরের ব্যাপারটা আপনার অজানা থেকে গেছে। আশ্চর্য!
কর্নেল একটু পরে বললেন, সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে আমি ক্যাক্টাস্ নিয়েই আলোচনা করতে আসতাম। উনি একজন ক্যাক্টাস্ বিশেষজ্ঞ। এই মন্দির সম্পর্কে উনি বিশেষ কিছু বলেননি। তাই আমারও কৌতূহল জাগেনি। তাছাড়া সব অভিজাত বা বনেদি পরিবারেরই ঠাকুরবাড়ি থাকে। কাজেই তা নিয়ে মাথা ঘামানোর কারণ ছিল না।
কিছুক্ষণ পরে ছন্দা ফিরে এলেন। বললেন, এতদিন ভটচাকাকুই শ্বশুরমশাইকে বাথরুমে নিয়ে যেতেন। দেখতে রোগা মানুষ হলেও ওঁর হাতে জোর ছিল। দুহাতে শ্বশুরমশাইকে বিছানা থেকে পাঁজাকোলা করে তুলতে পারতেন। এমন সমস্যায় পড়া গেছে। টিনিকে দিয়ে জংবাহাদুরকে আবার ডাকতে পাঠালাম। মনে ক্ষোভ আছে। তাই আসছে না। আপনারা প্লিজ আর একটু অপেক্ষা করুন।
কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, তুমি বীরেশ্বরবাবুর চিঠিটা কি খুঁজে দেখেছ?
ওঃ! একেবারে ভুলে গেছি। আমার মাথার ঠিক নেই দেখছি।
দেখ। ততক্ষণ আমরা নীচে ঘুরে আসি। আর যদি আপত্তি না থাকে, হলঘর থেকে মন্দিরে ঢোকার চাবিটা দাও। আমি আরেকবার মন্দিরটা দেখতে চাই।
ছন্দা বলল, ওই দরজা ছাড়াও মন্দিরে যাওয়ার একটা পথ আছে। আসুন দেখাচ্ছি।
সে আমাদের বারান্দায় নিয়ে গেল। তারপর শেষ একটা লোহার ঘোরালো সিঁড়ি দেখাল। সিঁড়ির মরচে ধরা। ধাপগুলো কোনওক্রমে টিকে আছে। সে বলল, ভেঙে পড়বে না! তবে সাবধানে একে-একে নামতে হবে। আমি অনেক সময় শর্ট কাটে এদিক থেকেও ঠাকুরবাড়িতে যাই। টিনি তো রোজ যখন-তখন নেমে যায়। অবিশ্যি ওর ওজন আর একজন বয়স্ক মানুষের ওজন
কর্নেল হাসলেন। আমার ওজন সহ্য করবে কি না পরীক্ষা করা যাক।
আমার ভয় করছিল। কিন্তু কর্নেলের সামরিক জীবনের ট্রেনিং আবার কাজে লাগল। দিব্যি নেমে গেলেন। আমি একসময় কর্নেলের তাগিদে কিছুদিন মাউন্টেনিয়ারিঙে ট্রেনিং নিয়েছিলাম। অনেক কসরত করে নেমে গেলাম। মন্দির প্রাঙ্গণের এক কোণে একটা ঝাপালো ছাতিম গাছ আছে। তাছাড়া সিঁড়িটা বাড়ির পশ্চিমদিকে এবং মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে কয়েক হাত দূরে বলে তখন চোখে পড়েনি।
এবার মন্দির প্রাঙ্গণে ঢুকতে একটু দুর্ভোগ সইতে হল। ফুলগাছগুলো ঠেলে সরিয়ে গুঁড়ি মেরে ঢুকতে হল। বললাম, কর্নেল! খুনী এখানেও লুকিয়ে থাকতে পারত। তাই না?
কর্নেল অন্যমনস্কভাবে বললেন, পারত। তবে তা হলে তাকে বাড়ির দোতলায় উঠতে হত।
কথাটা বলে উনি পুকুরঘাটের দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। দরজার সামনেটা আগাছার জঙ্গলে ঢেকে আছে সে-কথা আগেই বলেছি। কর্নেল সেখানে দাঁড়িয়ে কিছু দেখছিলেন। হঠাৎ বললেন, আশ্চর্য তো!
কী আশ্চর্য?
কিছু ঝোপ বেঁকে গেছে। ওই ঝোপটার ডাল ভেঙে গেছে। টাটকা ভাঙা। অথচ
উত্তেজিতভাবে বললাম, খুনী ঝোপটার ওখানেই ওত পেতে ছিল।
থাকতে পারে। কিন্তু দরজাটা–আশ্চর্য! দরজার হুড়কো ঠিকভাবে বসানো নেই। কেউ নিশ্চয় খুলেছিল। কিন্তু এত শিগগির কপাটের ওপর মাকড়সা জাল বুনে ফেলল?
পোকামাকড় বিষয়ে তো আপনি বিশেষজ্ঞ। বিদেশি পত্রিকায় প্রবন্ধ লেখেন। আমি একটা পত্রিকায় পড়েছিলাম, মাকড়সার জাল লম্বা করলে নাকি পাঁচশো মাইল হয়। এই জালটা লম্বা করে দেখবেন নাকি?
কর্নেল আমার রসিকতায় কান দিলেন না। ঝোপঝাড় ঠেলে কয়েক পা এগিয়ে গেলেন। তারপর সরে এসে বললেন, রাতে এই এলাকায় বৃষ্টি হয়েছিল। মাকড়সা জাল বুনেছে বৃষ্টি হয়ে যাওয়ার পর। কিন্তু বৃষ্টির আগে কেউ ওই দরজাটা খুলেছিল। কেন খুলেছিল বোঝা যাচ্ছে না।
বললাম, কর্নেল! এ সবের চেয়ে বড় প্রশ্ন–আপনাকেই কোর্ট করে বলছি, এই খুনের মোটিভ। আপনিই বলেন, মোটিভ খুঁজে পেলেই খুনীকে খুঁজে পাওয়া সহজ হয়।
কর্নেল একটু হেসে বললেন, তোমার কী ধারণা বলো শুনি?
ভটচাযমশাই আপনার বাড়ি থেকে আসার পর হয় তো কে মূর্তিচোর তা জানতে পেরেছিলেন। তাই খুনী তার মুখ চিরদিনের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে।
জানতে পারলে ছন্দাকে তিনি নিশ্চয় বলতেন। তাছাড়া তিনি তখনই টেলিফোনে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। ছন্দাও যোগাযোগ করতে পারত।
ছন্দাকে আমার সন্দেহ হচ্ছে।
কেন?
বীরেশ্বর সেন নামে ওঁর স্বামীর এক কলিগ ওঁকে চিঠি লিখেছিলেন। চিঠিটা উনি যেন আপনাকে দেখাতে অনিচ্ছুক। ভদ্রলোকের সঙ্গে ছন্দার–
কর্নেল চাপা গলায় বললেন, শাট আপ!
অবিশ্যি ওঁর মুখে কৌতুক ঝলমল করছিল। প্যান্ট-শার্ট থেকে ঝোপের আবর্জনা পরিষ্কার করে টুপি খুললেন কর্নেল। টুপি থেকে একটা পোকা তুলে ঝোপে ফেলে দিলেন। তারপর বললেন, জয়ন্ত! বীরেশ্বরবাবুর কথা আমরা ছন্দার কাছেই জেনেছি। তবে একটা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হল, ভটচাযমশাইয়ের অন্তিম মুহূর্তের কথাটা। বীরু!
এই সময় টিনি ফুলগাছের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল। মেয়েটির বয়স সাত-আট বছরের বেশি নয়। সে কর্নেলের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকার পর বলল, তোমার মুখে সাদা দাড়ি কেন?
কর্নেল সহাস্যে বললেন, তুমি স্কিপিং করতে করতে ছড়া বলো কেন?
দাদু শিখিয়ে দিয়েছেন। বলো না তোমার মুখে সাদা দাড়ি কেন?
ছড়াটা আবার বলো। তা হলে বলব।
টিনি আওড়াল–
নীচে নামো বাঁয়ে ঘোরো।
তবেই তোমার পোয়াবারো।
কর্নেল ওর চিবুকে তর্জনী ছুঁইয়ে গম্ভীর মুখে বললেন, আমার দাড়ি সাদা কেন, তা যদি তোমাকে বলে দিই, তাহলে তোমার দাদুর দাড়িও সাদা হয়ে যাবে।
দাদুর দাড়িই নেই।
কেন নেই?
দাদুকে গিয়ে জিজ্ঞেস করো না।
তোমার দাদু উঠেছেন?
হ্যাঁ। বাহাদুর এসে দাদুকে ওঠাল।
এই সময় দোতলার একটা জানালা থেকে ছন্দা ডাকলেন, টিনি! এখনও কী করছ? ওঁদের ডাকতে পাঠালাম না তোমাকে? সঙ্গে করে নিয়ে এস। নীচের দরজা খুলে দিয়েছি। সিঁড়ি দিয়ে উঠো না যেন।
টিনি বলল, সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করলে দাদু রাগ করে। তোমরা এদিকে এস।
এবার আমরা সেই করিডর দিয়ে হলঘরে ঢুকলাম। হঠাৎ আমার মনে হল ছন্দা ওই বিপজ্জনক সিঁড়ি দিয়ে তখন আমাদের যেন নামতে বাধ্য করলেন। কেন?
টিনি হলঘরে গিয়েই দৌড়ে ওপরে চলে গেল। কর্নেলের কাছে চুপিচুপি প্রশ্নটা তুললাম। কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, তুমি ছন্দা সম্পর্কে ক্রমশ বেশি সন্দেহপ্রবণ হয়ে পড়ছ জয়ন্ত!
আপনার মতো লম্বাচওড়া ওয়েটি মানুষের ভারে সিঁড়িটা ভেঙে পড়ার চান্স ছিল কিন্তু!
এবার কর্নেলের মুখে হাসি ফুটল। সেটা অবিশ্যি ঠিক।
অত উঁচু থেকে পড়লে আপনার কী অবস্থা হত বুঝতে পারছেন?
হু। হাড়গোড় ভাঙা দ হয়ে যেতাম।
তাহলে?
কর্নেল আমার কথায় কান দিলেন না। বললেন, যাই হোক, ছড়াটার একটা মানে যেন বোঝা যাচ্ছে। দোতলা থেকে নীচে নেমে এসে বাঁয়ে ঘুরলেই ঠাকুরবাড়ির দরজা। আর ডাইনে ঘুরলে–হ্যাঁ, ওই ছবিটা। গৃহ-দেবতা বিষ্ণুমূর্তির ছবি। দেখতে পাচ্ছ?
আমরা হলঘরে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম। দেখলাম, দেয়ালে চওড়া ফ্রেমে বাঁধানো একটা বিষ্ণুমূর্তির ফোটো টাঙানো আছে। এই সময় হলঘরের সিঁড়িতে বেঁটে গোলগোল আর শক্তসমর্থ গড়নের প্রৌঢ় একটা লোককে দেখতে পেলাম। তার পরনে খাকি হাফপ্যান্ট আর গেঞ্জি। সে থমকে দাঁড়িয়ে সেলাম দিয়ে বলল, কর্নিলসাব! আপ?
কর্নেল সহাস্যে বললেন, চিনতে পেরেছ জঙ্গবাহাদুর?
জি হাঁ কর্নিলসাব! আপ এত্তা বরষ বাদ এখানে আসলেন!
হ্যাঁ। প্রায় পনের বছর পরে। তা তুমি কেমন আছো বলো?
ভালো নেহি আছে কর্নিল সাব! আর এখানে আমার নোকরি নেহি আছে।
এসেই সে-খবর পেয়েছি।
জঙ্গবাহাদুর একটু হেসে চাপা গলায় বলল, ঠাকুরমশাই মার্ডার হইয়ে গেল। পুলিস আসল। আমাকে বহুরানি খবর ভেজেছিল। লেকিন আমি আসিনি। ঠাকুরমোশাই আচ্ছা আদমি ছিল না। উহি তো আমাকে নোকরি থেকে বরখাস্ত করিয়েছিল।
এই ঠাকুরমোশাই কতদিন ও বাড়িতে ছিলেন?
তিন বরষ হবে। আগের ঠাকুরমোশাই আচ্ছা আদমি ছিল। জদ্বাহাদুর ঘুরে ওপরটা দেখে নিয়ে বলল, বহুরানি খবর ভেজলেন দুসরাবার। কুমারসাবভি বললেন, ভুল হইয়ে গেছে। তুম্ ফির কাম করো।
হ্যাঁ। তুমি এ বাড়ির পুরনো লোক। তুমি কাজে বহাল হলে কুমারবাহাদুর আর বউরানির সুবিধা হবে।
জঙ্গবাহাদুর মুখে দুঃখের ছাপ ফুটিয়ে বলল, কুমারসাবের এত্তা বেমারি হইয়েছে, আমি জানতাম না কর্নিলসাব!
ওপর থেকে ছন্দা ডাকলেন, বাহাদুর! গল্প পরে হবে। ওঁদের আসতে বলো।
জঙ্গবাহাদুর আবার সেলাম ঠুকে নীচে কোথাও গেল। আমরা দোতলায় গিয়ে দেখি, ছন্দা দাঁড়িয়ে আছেন। বললেন, শ্বশুরমশাইকে আপনার আসার কথা বলেছি। ভেবেছিলাম ভটচাকাকুর দুঃসংবাদটা আপনার মুখ দিয়েই ওঁকে জানাব। কিন্তু জঙ্গবাহাদুর জানিয়ে ফেলল।
কর্নেল বললেন, ওঁর রিঅ্যাকশন কী?
শুনে গুম হয়ে গেলেন। কোনও কথা বললেন না। আপনারা আসুন।
ছন্দা আমাদের একটা ঘরে নিয়ে গেলেন। ঘরটা সেকেলে আসবাবে সাজানো। কয়েকটা আলমারি বইয়ে ভর্তি। সব জানালা বন্ধ। শুধু একটা জানালা খোলা আছে। জানালাটার পাশে একটা প্রকাণ্ড খাট। সেই খাটে কর্নেলের মতোই লম্বাচওড়া একজন বৃদ্ধ কয়েকটা বালিশে হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে বসে আছেন। ঘরের ভেতর শুধু ওই উত্তরের জানালা দিয়েই যেটুকু আলো আসছে।
খাটের পাশে দুটো চেয়ার আর একটা গোল টেবিল সাজানো আছে। কর্নেল এগিয়ে গিয়ে হাত বাড়ালেন। হ্যালো কুমারবাহাদুর!
সত্যেন্দ্রনাথের ডান হাতটা একটু উঠেই পড়ে গেল। বাঁ হাত বাড়িয়ে কর্নেলের হাত চেপে ধরলেন। তারপর ধরা গলায় বললেন, আমার বড় দুঃসময়ে আপনাকে পেয়ে মনে ভরসা এল। আপনাকে কতদিন দেখিনি!
প্রায় পনের বছর।
হবে। বসুন কর্নেলসায়েব!
আলাপ করিয়ে দিই। আমার তরুণ বন্ধু জয়ন্ত চৌধুরী। দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার সাংবাদিক।
সত্যেন্দ্রনাথ আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, বস বাবা! তুমি বলছি–কিছু মনে কোরো না!
আমরা বসলাম। কর্নেল বললেন, আপনার অসুখ শুনে দুঃখিত কুমারবাহাদুর!
আমাকে আর কুমারবাহাদুর বলবেন না প্লিজ! বউমা! কর্নেলসায়েব কিন্তু কফির ভক্ত।
ছন্দা কফি অলরেডি খাইয়েছে। আর কফি খাব না। আপনার এই অসুখ কবে হল?
গত মাসে হঠাৎ বাথরুমে পড়ে গেলাম। তারপর ডান হাত থেকে ডান পা অব্দি নিঃসাড়। সম্ভবত প্যারালেসিস। কিন্তু আপনি তো জানেন, জীবনে আমি ওষুধ খাইনি। আমি আমার পূজ্য দেবতা শ্রীবিষ্ণু আর নিজের ইচ্ছাশক্তিতে বিশ্বাসী। এ অসুখ শিগগির সেরে যাবে। এই তো আজই মনে হচ্ছে, অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেছি।
ছন্দা বললেন, আপনারা কথা বলুন। দরকার হলে আমাকে ডাকবেন।
ছন্দা বেরিয়ে যাওয়ার পর কর্নেল আস্তে বললেন, আপনার গৃহদেবতার মন্দিরে আজ ভোরে একটা মিসহ্যাপ হয়েছে।
সত্যেন্দ্রনাথ নির্বিকার মুখে বললেন, পাপের শাস্তি! নরহরি এ বাড়িতে ঢোকার পর থেকে একটার পর একটা–থাক্ ওসব কথা। আপনার খবর বলুন!
আমার খবর নতুন কিছু নেই। যথাপূর্বং। সেই পাখিপ্রজাতি অর্কিড ক্যাকটাস এবং মাঝে মাঝে রহস্যের গন্ধ পেলেই ছুটে বেড়ানো।
সত্যেন্দ্রনাথ ভুরু কুঁচকে তাকালেন। নরহরি ব্যাটাচ্ছেলের মৃত্যুরহস্যের গন্ধ পেয়েই যদি এখানে এসে থাকেন, তাহলে আপনাকে অনুরোধ করব, এটা নিয়ে মাথা ঘামাবেন না। তাছাড়া এতে সত্যি বলতে কী কোনও রহস্যই নেই। পুলিস নরহরির খুনীকে ঠিকই ধরে ফেলবে।
কর্নেল একটু হেসে বললেন, কাল বিকেলে নরহরিবাবু আমার কাছে গিয়েছিলেন।
আপনার কাছে? নরহরি গিয়েছিল?
হ্যাঁ। আপনার গৃহদেবতার আসল মূর্তি নাকি চুরি গেছে। আমাকে তা উদ্ধার করে দিতে হবে।
সত্যেন্দ্রনাথ প্রায় গর্জন করলেন, চোর! চোর! নিজেই চুরি করে বেচে দিয়ে সাধু সাজার জন্য আপনার কাছে গিয়েছিল!
কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, উনি বলছিলেন, মন্দিরের তালা খোলার কৌশল শুধু উনি এবং আপনি জানেন। আর কেউ জানে না। এখন উনি আর বেঁচে নেই। তাই বিষ্ণুমূর্তি সত্যি চুরি গেছে কি না দেখা দরকার।
সত্যেন্দ্রনাথ ডাকলেন, বউমা!
প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ছন্দা ঘরে ঢুকলেন। খাটের কাছে এসে বললেন, বলুন বাবা!
আজ তুমি ভোরে মন্দিরে প্রণাম করতে যাওনি?
ছন্দা মুখ নিচু করে বললেন, প্রণাম করেছি। তবে মন্দিরের দরজা বন্ধ ছিল। ভটচাঙ্কাকু উপুড় হয়ে পড়েছিলেন। মাথার পেছনে রক্ত। আপনাকে তো সব বললাম একটু আগে।
তা হলে মন্দিরের দরজা খোলা ছিল না?
না।
তুমি বাহাদুরকে ডাকো! আমাকে মন্দিরের দরজায় বসিয়ে রেখে আসবে। সে আমাকে রেখে ফিরে এলে তুমি হলঘরের দরজায় পাহারা দেবে। কেউ তালা খোলার কৌশল যেন না বুঝতে পারে। বুঝেছ?
হ্যাঁ বাবা!
যাও! বাহাদুরকে ডেকে আনো! বলে সত্যেন্দ্রনাথ কর্নেলের দিকে অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাসলেন। সরি কর্নেলসায়েব! আপনার বাইনোকুলার দিয়ে তালা খোলার কৌশল দেখার সুযোগ কিন্তু আপনাকে দিচ্ছি না। আপনারা দুজনে হলঘরে বসে থাকবেন।
ছন্দা তখনই বেরিয়ে গেলেন। কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, ঠিক আছে। আমি হলঘরেই বসে থাকব। আমি শুধু জানতে চাই সত্যিই আসল মূর্তি আছে, নাকি নেই।
আপনি কি বলতে চাইছেন চোর আসল মূর্তি হাতিয়ে নকল মূর্তি রেখেছে?
হ্যাঁ। নরহরিবাবু সেই কথাই বলছিলেন।
সত্যেন্দ্রনাথ আবার গর্জন করলেন, চোর! চোর! নরহরিই চুরি করেছে, তারপর টাকার বখরা নিয়ে স্যাঙাতদের সঙ্গে ঝামেলা বেঁধেছে। তখন তারা ওকে খুন করেছে। ওঃ! আমাদের পূর্বপুরুষের প্রতিষ্ঠা করা গৃহদেবতা।
তিনি মুখ ঘুরিয়ে অশ্রু সম্বরণ করলেন। একটু পরে বাহাদুর এসে ওঁকে দুহাতে পাঁজাকোলা করে তুলে ফেলল। অবাক হয়ে গেলাম! বাহাদুরের গায়ে দেখছি অসম্ভব জোর। আমরা তাকে অনুসরণ করলাম। হলঘরে নেমে সত্যেন্দ্রনাথ বললেন, বউমা! বাহাদুর ফিরে আসার পাঁচ মিনিট পরে আবার যেন আমাকে আনতে যায়। ওই পাঁচ মিনিটই যথেষ্ট। =
ছন্দা করিডরের দরজার তালা খুলে দিলেন। বাহাদুর সত্যেন্দ্রনাথকে নিয়ে ঢুকে গেল। আমরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। ভাবলাম, ছন্দাকে বলি, নরহরি ভট্টাচার্য কর্নেলকে মিথ্যা করে বলেছিলেন, উনি নাকি পঁয়ত্রিশ বছর এই মন্দিরের সেবাইত। কেন উনি মিথ্যা বলেছিলেন?
কিন্তু কর্নেল দেয়ালে টাঙানো বিষ্ণুমূর্তির ছবি দেখছেন এবং ছন্দা তার কাছে। গিয়ে চুপিচুপি কী যেন বলছেন। তাই কথাটা বলার সুযোগ পেলাম না।
বাহাদুর ফিরে এসে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। কিছুক্ষণ পরে কর্নেল ঘড়ি দেখে বললেন, পাঁচ মিনিট হয়ে গেছে। বাহাদুর! এবার তোমার কুমারসাহেবকে নিয়ে এস।
সত্যেন্দ্রনাথ বাহাদুরের কোলে চেপে এসে বাঁকা হেসে বললেন, নরহরি শুধু চোর নয়, মিথ্যুক। মূর্তি চুরি যায়নি। আসল মূর্তিই আছে। কর্নেলসায়েব! এবার আসুন! গল্প করা যাক। এই বাজে ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামিয়ে কোনও লাভ নেই। বরং এই মজাটা উপভোগ্য–এক বাহাদুর আর এক বাহাদুরকে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। তাই না?…
