মুকুন্দপুরের মনসা (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
পাঁচ
শিলিগুড়ির হোটেলেই ভাদুড়িমশাই একবার সত্যপ্রকাশকে তাঁদের বিগ্রহের কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন। তাতে সত্যপ্রকাশ বলেছিলেন, “এখন আপনারা খেয়ে-দেয়ে একটু বিশ্রাম করুন, পরে সব বলব।”
পরে আর বলা হয়নি। শিলিগুড়ি থেকে মুকুন্দপুরে আসবার পথে প্রসঙ্গটা আবার উঠেছিল। কিন্তু তখনও সত্যপ্রকাশ বলেছিলেন, “দেখুন ভাদুড়িমশাই; যা ঘটেছে, তার জিটা আমি বলতে পারি; কিন্তু এইভাবে সাঁটে বললে তো ব্যাপারটার তাৎপর্যই আপনারা বুঝতে পারবেন না। সেটা বুঝতে হলে গোটা ব্যাকগ্রাউন্ড আপনাদের জানা দরকার। ব্যাকগ্রাউন্ড মানে আমাদের ফ্যামিলি হিস্ট্রির সঙ্গে এই মূর্তির সম্পর্ক, আবার এই মূর্তির সঙ্গে মুকুন্দপুর গ্রামের মঙ্গল-অমঙ্গলের সম্পর্ক, কোনওটাই তো বাদ দেওয়া চলবে না, সবই আপনাদের জানা চাই। তা সে-সব কি আর গাড়ি চালাতে-চালাতে আমি আপনাদের বলতে পারব?”
পারা সত্যিই সম্ভব নয়। একে তো হাইওয়ের উপরে মাঝে-মাঝেই দেখা যাচ্ছে বিরাট-বিরাট সব গর্ত, তার উপরে আবার উল্টোদিক থেকে যে রকম কড়া হেডলাইট জ্বেলে ঝড়ের বেগে সব বিশাল বিশাল ট্রাক ছুটে আসছিল, আর সত্যপ্রকাশকে সারাক্ষণ রাস্তার উপরে চোখ রেখে যে রকম সন্তর্পণে তাদের সঙ্গে সংঘাত বাঁচিয়ে চলতে হচ্ছিল, তাতে আমার অন্তত মনে হল যে, স্টিয়ারিং হুইল যাঁর হাতে রয়েছে, তাঁকে আর এখন পারিবারিক ইতিহাস বলবার জন্য অনুরোধ না করাই ভাল।
বললুম, “ঠিক আছে। পরেই না হয় শুনব।”
সত্যপ্রকাশ বললেন, “সেটাই ভাল। খানিক বাদেই তো আমরা মুকুন্দপুর পৌঁছে যাচ্ছি, সুতরাং তাড়াহুড়ো করে লাভ নেই, রাত্তিরে খাওয়া-দাওয়ার পরে বরং ধীরেসুস্থে ডিটেলসে সব বলব। একটা ছবি আপনাদের দেখা দরকার। সেটাও তখন দেখানো যাবে।”
স্বীকার করা ভাল যে, মুকুন্দপুরে পৌঁছে আমি প্রথমটায় একটু দমে গিয়েছিলুম। জানি না মুকুন্দপুরে এখন ইলেকট্রিক লাইট আছে কি না, তবে এ যখনকার কথা বলছি, তখন ছিল না। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই অবশ্য ঘরে-ঘরে হ্যারিকেন আর শেজবাতি জ্বলে উঠল। তা ছাড়া উঠোনের ঠিক মাঝ বরাবর দুটি খুঁটি পুঁতে তাতে একটা তার খাটিয়ে রাখা হয়েছিল, সেই তারে ঝুলিয়ে দেওয়া হল মস্ত বড় হ্যাজাক বাতি। তার ফলে অন্ধকার তো দূর হলই, সারা বাড়ি একেবারে আলোয় আলো হয়ে গেল।
বাড়িটা অবশ্য সেদিন রাত্তিরে ভাল করে দেখা হয়নি, দেখেছিলুম তার পরদিন ভোরবেলায়। তবু এখানেই তার একটা বর্ণনা দিয়ে রাখি।
চৌধুরিদের বাড়িটা বেশ ছড়ানো গোছের। এদিকে গ্রামাঞ্চলে পাকাবাড়ি করবার রেওয়াজ নেই। সত্যবাবুরাও পাকাবাড়ি করেননি। ভিতরের ও বাইরের উঠোন ঘিরে ঘর দেখলুম অনেকগুলি। অধিকাংশ ঘরই একতলা। ঘরগুলির ভিত যেমন বাঁধানো, মেঝেগুলিও তেমনি পুরোদস্তুর মোজেইক করা, তবে সে-সব ঘরের দেওয়াল যেমন ইটের নয়, কাঠের, উপরেও তেমনি ঢালাই করা ছাতের বদলে রং-করা করোগেটেড টিনের চাল। ভিতরের উঠোনের চারদিকে চারটে ঘর; প্রতিটি ঘরের সামনে কাঠের রেলিং-এ ঘেরা বারান্দা। যেটা সবচেয়ে বড় ঘর, সেটা অবশ্য একতলা নয়, দোতলা, তার একতলার মেঝে বাঁধানো হলেও দোতলার মেঝে পালিশ করা কাঠের। একতলার ঘরেরই একদিক থেকে চমৎকার কাজ করা একটা কাঠের সিঁড়ি দোতলায় উঠে গেছে। এটা সত্যপ্রকাশের এলাকা। একতলাটা তাঁর বসবার ঘর, দোতলাটা শোবার। উঠোনের বাদবাকি তিন-দিকের তিনটে ঘরই একতলা। তার একটায় সত্যবাবুর মা আর পিসিমা থাকেন, একটায় কোনও অতিথি এলে তাঁকে থাকতে দেওয়া হয়। আর বাকি ঘরটার মাঝখানে পার্টিশান করা। পার্টিশানের একদিকে রান্নাঘর আর ভাঁড়ার, অন্যদিকে ডাইনিং টেবিল।
চৌধুরিদের উপাস্য দেবী মনসা। বাইরের উঠোনের একদিকে রয়েছে তাঁর মন্দির; অন্য দু’দিকের দুটো ঘরের একটায় থাকে সত্যপ্রকাশের বাবার আমলের পুরনো ভৃত্য রামদাস, আর অন্যটায় থাকেন পুরোহিত গোবিন্দ ভট্টাচার্য। ভট্টাচার্যমশাই এঁদের বেতনভোগী পুরোহিত, নিত্যপূজা ছাড়া তাঁর আর অন্য কোনও কাজ নেই। মন্দিরের একপাশে একটি বাঁধানো ইঁদারা। ভিতর-বাড়ির পিছনে একটি পুকুর কাটানো হয়েছিল। তবে সেটা এতই ছোট যে, পুকুর না বলে ডোবা বললেই ঠিক হয়। তাতে বাসন-কোসন মাজা ছাড়া অন্য কোনও কাজ হয় না। বাড়িতে একটা টিউবয়েলও আছে। কিন্তু তার জল কেউ খায় না। তার কারণ, মন্দিরের পাশের ওই ইঁদারার জল শুনলুম দারুণ ভাল। ও-জল খেলে নাকি পাথরও হজম হয়ে যায়। খিদেও হয় প্রচন্ডরকম। সত্যবাবু অন্তত খুব জাঁক করে তাঁদের ইঁদারার জলের এই গুণের কথাটা আমাদের শুনিয়ে রেখেছেন।
ভোরবেলায় উঠে ভাদুড়িমশাইয়ের সঙ্গে আমাদের ঘর থেকে বেরিয়ে যখন গোটা বাড়িটা ঘুরে দেখছি, তখন মন্দিরের পিছনে অর্থাৎ বাড়ির উত্তরদিকে একটা বিশাল বাগানও আমাদের চোখে পড়েছিল। বাগানের মধ্যে আর-একখানা ঘরও দেখেছিলুম আমরা। কিন্তু সে-কথায় পরে আসছি। রাত্তিরের কথাটাই বরং আগে সেরে নিই
ভাদুড়িমশাইয়ের সঙ্গে রবিবার সকালবেলায় টেলিফোনে কথা বলবার পরে সত্যপ্রকাশ সেইদিনই লোক পাঠিয়ে তাঁর মাকে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, সোমবার সকালের ফ্লাইটে আমরা শিলিগুড়িতে পৌঁছচ্ছি, তবে শিলিগুড়িতে আমরা রাত কাটাব না, সেখানে দুপুরের খাওয়া সেরে একটু বিশ্রাম নেব মাত্র, তারপর সেখান থেকে সত্যপ্রকাশের সঙ্গে রওনা হয়ে মুকুন্দপুরে চলে আসব, আর রাত্তিরের খাওয়া সারব মুকুন্দপুরেই। আমাদের জন্য রান্নাবান্না তাই করেই রাখা হয়েছিল। তবে পৌঁছতে দেরি হচ্ছে দেখে বাড়ির লোকেরা ভাবছিলেন যে, প্লেন হয়তো সেদিন খুবই দেরি করে শিলিগুড়িতে পৌঁছেছে, আমরা আর সেখান থেকে রওনা হতে পারিনি, রাতটা শিলিগুড়িতে কাটিয়ে পরদিন সকালে আমরা মুকুন্দপুরের দিকে রওনা হব।
আমরা এসে পড়ায় তাই সবাই দেখলুম দারুণ খুশি। সবচেয়ে বেশি খুশি রামদাস। তার কারণ, একমাত্র সে-ই নাকি বলেছিল যে, খোকাবাবুর কথার কখনও নড়চড় হয় না, একবার যখন আসবে বলেছে, তখন যত রাতই হোক, খোকাবাবু আসবেই।
সত্যপ্রকাশ তাঁর মায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “সত্যি নাকি মা?”
মা বললেন, “তা রামদাস একথা জাঁক করে বলতে পারে বটে। আমি তো এত দেরি দেখে ভাবছিলুম যে, আজ আর তোদের আসা হল না। কাজের লোকদের ছুটি দিয়ে তোর পিসিমাকে নিয়ে শুয়েও পড়েছিলুম। তা রামদাস বলল, ‘শুয়ে তো পড়ছ কর্তা-মা, একটু বাদেই তোমাকে আবার উঠতে হবে।’ এখন দেখছি, ঠিকই বলেছিল।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কাল সকালে এলেই পারতুম। রাত্তিরে এসে আপনাদের অসুবিধে ঘটানো হল।”
মা বললেন, “অসুবিধে আবার কিসের। রান্নাবান্না তো করাই আছে, শুধু একটু গরম করে দিতে হবে। আপনারা ততক্ষণে হাত-মুখ ধুয়ে নিন।”
বাথরুমে জল ধরে রাখাই ছিল। হাতমুখ ধুয়ে যে যার হ্যান্ডব্যাগ থেকে একপ্রস্ত পায়জামা আর পাঞ্জাবি বার করে নিয়ে, জামাকাপড় পালটে আমরা ডাইনিং টেবিলে এসে এক-একখানা চেয়ার টেনে বসে পড়লুম।
সত্যপ্রকাশ দেখলুম পাঞ্জাবির উপরে হালকা একটা জাম্পার চড়িয়ে এসেছেন। বললেন, “আপনারাও গরম কিছু পরলে পারতেন। একটু-একটু হিম পড়ছে, রাত বাড়ার সঙ্গে-সঙ্গে ঠান্ডাও বাড়বে। তার মানে যে শাল-দোশালার দরকার হবে তা নয়, পাতলা-মতো কিছু একটা গায়ে জড়িয়ে নেবেন, এখনকার ঠান্ডায় তাতেই কাজ চলে যাবে। তেমন কিছু সঙ্গে আছে তো? না থাকলে বলুন, আমি দিয়ে দিচ্ছি।”
বললুম, “না না, সঙ্গে করে বা এনেছি তা-ই যথেষ্ট।”
রামদাস এক কোণে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। সত্যপ্রকাশ তাকে বললেন, “বাবুদের বিছানার মশারি
খাটিয়ে দিয়েছ তো?”
“দিয়েছি খোকাবাবু।”
“গায়ে দেবার জন্যে হালকা একটা করে লেপও দিও। শেষ রাত্তিরে দরকার হতে পারে।”
“দুটো লাইসাম্পি দিয়েছি, তাতেই হবে।”
“তা হলে তুমি দাঁড়িয়ে থেকো না, রঙ্গিলার কাছে যাও, মেয়েটা একা রয়েছে।”
“একা থাকবে কেন, সেখানে তো আয়াই রয়েছে। তোমাদের খাওয়া শেষ হোক, তারপর এই বাবুদের শোবার ঘরে পৌঁছে দিয়ে আমি যাব।”
রামদাস দাঁড়িয়েই রইল। বোঝা গেল, আমাদের খাওয়া যতক্ষণ না শেষ হচ্ছে, ততক্ষণ সে এখান থেকে নড়বে না।
যে মেয়েটি পরিবেশন করছিল, তার নাম বোঝা গেল নিরু। সুশ্রী চেহারা, চালচলন সপ্রতিভ। বয়েস মনে হল বছর তিরিশ হবে। সিঁথিতে সিঁদুর নেই। তা সে বিধবা বলেও হতে পারে, আবার আদৌ বিয়ে হয়নি বলেও হতে পারে।
নিরু এঁদের কে হয়। রঙিলারই বা অসুখটা আসলে কী হয়েছে, এই দুটো প্রশ্ন আমার মনের মধ্যে দু-একবার উঁকি মেরেছিল ঠিকই, কিন্তু ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে দেখলুম, মুখ নিচু করে একেবারে চুপচাপ তিনি খেয়ে যাচ্ছেন, আমিও আর তাই এ নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলুম না। শুধু একবার বলেছিলুম যে, রান্না অতি চমৎকার হয়েছে, সবই কি এই মেয়েটি করেছে কি? তাতে সত্যপ্রকাশ বললেন, “আরে না, মশাই, তার জন্যে তো আলাদা লোকই রয়েছে, এই গ্রামের লোক, সকালবেলায় এসে সারাটা দিন থাকে, তারপর রাতের রান্নার পাট চুকিয়ে আটটা নাগাদ নিজের বাড়িতে চলে যায়।”
রান্না সতিই চমৎকার হয়েছিল। সত্যপ্রকাশ যে আমাদের জন্যে পঞ্চাশ ব্যঞ্জনের ফরমাশ দিয়ে রেখেছিলেন, তা নয়, তবে মাছই দেখলুম তিনরকম। তার মধ্যে রুই আর চিংড়িটাকে শনাক্ত করা গেল বটে, তবে তৃতীয়টাকে চিনতে পারলুম না।
সত্যপ্রকাশকে জিজ্ঞেস করায় তিনি বললেন, “এখানকার নদীর মাছ। চেপটি। সর্ষে-ঝালের পক্ষে একেবারে আদর্শ। খেয়ে নিন। এ মাছ কলকাতায় পাবেন না।” তারপর একটু থেমে বললেন, “মাংস না থাকায় একটু অসুবিধে হল, তাই না?
আমি বললুম, “সে কী কথা, এত চমৎকার মাছ পেলে কেউ মাংস চায়?”
“চাইলেও পেতেন না মশাই,” সত্যপ্রকাশ বললেন, “এ তো শহর নয়, গ্রাম। এখানে মাছ মেলে, মাংস মেলে না। মাংস যদি খেতে চান তো সেই আলিপুরদুয়ার থেকে কিনে আনতে হবে।”
ভাদুড়িমশাই এতক্ষণ একটাও কথা বলেননি, এইবারে মুখ তুলে বললেন, “আলিপুরদুয়ার এখান থেকে কতদূর?”
সত্যপ্রকাশ বললেন, “তা নেহাত কম হবে না, বরং হাসিমারাই কাছে।”
“মুকুন্দপুর কোথায়, সেটা বোঝাতে গিয়ে তা হলে আপনারা ‘আলিপুরদুয়ারের কাছে’ বলেন কেন?”
“হাসিমারার চেয়ে আলিপুরদুয়ার যেহেতু বেশি বিখ্যাত, তাই ওই নামটাই করতে হয়।” সত্যপ্রকাশ হাসলেন।
খাওয়ার পর্ব চুকেছে। রামদাস বলল, “চলুন, আপনাদের শোবার ঘর দেখিয়ে দিই।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “সত্যবাবু কি এখনই শুয়ে পড়বেন?”
সত্যপ্রকাশ বললেন, “আরে না মশাই। সবে তো দশটা বাজে। এত সকাল-সকাল আমি ঘুমোই না। আমার ঘুমোতে-ঘুমোতে সেই রাত বরোটা-একটা বাজবে।”
“এখন তা হলে কী করবেন?”
“সঙ্গে একটা হ্যাডলি চেজ রয়েছে। সেইটে পড়ব।”
“তার চেয়ে বরং যে কাজে এসেছি, সেই কাজে আমাদের সাহায্য করুন।” চারু ভাদুড়ি বললেন, “ঘুণ আমাদেরও পায়নি, সুতরাং সময়টাকে কাজে লাগানো যাক। মনসাদেবীর মূর্তি কীভাবে নিখোঁজ হল, শুনি।”
সত্যপ্রকাশ বললেন, “বেশ তো, চলুন, ড্রইংরুমে গিয়ে বসা যাক।”
মশলার ডিবে হাতে নিরু এসে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। ডিবের ভিতর থেকে এক টিপ মৌরি আর এলাচদানা তুলে নিয়ে সদ্য খাবার-ঘরের বাইরে পা বাড়িয়েছি। ঠিক সেই মুহূর্তে একটা চিৎকার শোনা গেল।
সত্যপ্রকাশ বললেন, “কী ব্যাপার? চিৎকারটা তোমারই ঘরের দিক থেকে এল না রামদাস? চলো তো একবার।”
আমরাও ওঁদের সঙ্গে যাচ্ছিলুম, সত্যপ্রকাশ আমাদের বাধা দিয়ে বললেন, “ব্যস্ত হবেন না, নিরুর সঙ্গে আপনারা ড্রইংরুমে গিয়ে বসুন, আমরা এখুনি গিয়ে দেখে আসছি ব্যাপারটা কী।”
